Followers

Sunday, December 25, 2016

বর্তমান নাম-রূপসমূহের একার্থ-নানার্থ প্রশ্ন



                                            বর্তমান নাম-রূপসমূহের একার্থ নানার্থ প্রশ্ন-মীমাংসা

              রাজা বলিলেন-ভন্তে, জন্মগ্রহণ করে কে? স্থবির বলিলেন- মহারাজ, নাম-রূপ। এই বর্তমান নাম-রূপ কি? না মহারাজ, এই বর্র্তমান নামরূপ জন্মগ্রহণ করে না। কিন্তু এই নাম-রূপদ্বারা ভাল-মন্দ যাহা কাজ করা যায়, সেই কর্ম প্রভাবে অন্য নাম-রূপ জন্মগ্রহণ করে। ভন্তে, যদি এই নাম-রূপ জন্মগ্রহণ না করে, তাহা হইলে সে পাপকর্ম হইতে মুক্ত হইবে কি? স্থবির বলিলেন-যদি জন্মগ্রহণ না করে, মুক্ত হইবে। কিন্তু জন্মগ্রহণ করে বলিয়া পাপকর্ম হইতে মুক্ত হইবে না।
               উপমা প্রদান করুন। মহারাজ, কোন পুরুষ একজন লোকের আম চুরি করিল, সে চোরকে ধরিয়া রাজার নিকট আনিয়া বলিল-দেব, এই ব্যক্তি আমার আম চুরি করিয়াছে। চোর বলে-না দেব, আমি তাহার আম চুরি করি নাই। সে যে আম রোপণ করিয়াছিল, তাহা অন্য, আমি যাহা চুরি করিয়াছি, তাহা অন্য। কাজেই আমি দণ্ড প্রাপ্তির যোগ্য নহি। কেমন মহারাজ, সেই চোর দণ্ড পাইবে কি? হাঁ ভন্তে, পাইবে। কেন? সে যাহাই বলুক না, পূর্বের আমটি ছাড়িয়া দিলেও, শেষের আমটি চুরি করার দোষেও, দণ্ড প্রাপ্ত হইবে। এইরূপ মহারাজ, বর্তমান নাম-রূপ যাহা ভাল-মন্দ কার্য করে, তদ্দ্বারা অন্য নাম-রূপ জন্মগ্রহণ করে, সেই কারণে পাপ-মুক্ত হয় না।
          পুনরায় উপমা প্রদান করুন। যেমন মহারাজ, একজন পুরুষ শালি ধান্য চুরি করিল, ... একজন ইক্ষু চুরি করিল....এই উপমাগুলিও আমের ন্যায়।
যেমন একজন লোক হেমন্তকালে আগুন জ্বালিয়া শরীর উত্তপ্ত করতঃ আগুন না নিবাইয়া চলিয়া গেল। সেই আগুনদ্বারা একজন লোকের ক্ষেত্র জ্বলিয়া গেল। ক্ষেত্র স্বামী তাহাকে রাজার নিকট আনিয়া বলিল-দেব, এই ব্যক্তি আমার ক্ষেত্রটি জ্বালাইয়া দিয়াছে। সে বলে-দেব, আমি তাহার ক্ষেত্র দাহ করি নাই। আমি যে আগুন জ্বালিয়াছি, তাহা অন্য, যেই আগুনদ্বারা ক্ষেত্র জ্বলিয়াছে, তাহা অন্য। কাজেই আমি দ-যোগ্য নহি। কেমন মহারাজ, সে দণ্ড পাইবে কি? হাঁ, দণ্ড পাইবে। কি কারণে? সে যাহাই বলুক না কেন, আগের আগুন ছাড়িয়া দিলেও, পরের আগুনে হইলেও জ্বলিয়াছে। কাজেই সে দণ্ড পাইবে। এইরূপই মহারাজ, ভাল-মন্দ কাজ লইয়া জন্মগ্রহণ থাকিলে, নাম-রূপ পাপ-মুক্ত হয় না।
পুনরায় উপমা প্রদান করুন। যেমন মহারাজ, কোন পুরুষ প্রদীপ লইয়া একটি ধাপে উঠিয়া ভোজন করিল, প্রদীপটি জ্বলিতে জ্বলিতে তৃণে ধরিল, তৃণ জ্বলিয়া ঘরে ধরিল, ঘর জ্বলিয়া গ্রাম দগ্ধ হইল। গ্রামবাসীরা তাহাকে ধরিয়া বলিল-কেন তুমি আমাদের গ্রামটি জ্বালাইয়া দিলে? সে বলে-আমি তোমাদের গ্রাম জ্বালাই নাই। আমি যে প্রদীপে ভোজন করিয়াছিলাম, সে অগ্নি অন্য, আর আগুনে যে গ্রাম জ্বলিয়াছে তাহা অন্য। উভয়ে বিবাদ করিতে করিতে রাজার নিকট উপস্থিত হইল। মহারাজ, এখন আপনি কার পক্ষে থাকিবেন? গ্রামবাসীর পক্ষে। কি কারণে? সে যাহা বলুক না কেন, তাহার উৎপন্ন অগ্নিদ্বারা গ্রাম দগ্ধ হইয়াছে। তদ্রূপ জন্মগ্রহণ থাকিলে নাম-রূপ পাপ-মুক্ত হয় না।
             পুনরায় উপমা প্রদান করুন। যেমন মহারাজ, কোন পুরুষ একটি শিশু কুমারীকে বিবাহ মানসে বরণ করিয়া শুল্ক (পণ) প্রদানপূর্বক চলিয়া গেল। কুমারী যখন বয়ঃপ্রাপ্তা হইল, তখন অন্য একজন পুরুষ শুল্ক দিয়া তাহাকে বিবাহ করিল। এমন সময় প্রথম ব্যক্তি আসিয়া বলে-হে পুরুষ, কেন তুমি আমার ভার্যা নিয়া গেলে? দ্বিতীয় ব্যক্তি বলিল-না আমি তোমার ভার্যা নিই নাই, তুমি যেই কুমারীকে শুল্ক দিয়াছিলে, সেই কুমারী অন্য,
             পুনরায় উপমা প্রদান করুন।-যেমন মহারাজ, গোপালকের হাত হইতে কোন পুরুষ একঘটী দুগ্ধ কিনিয়া পুনঃ তাহার হাতে রাখিয়া চলিয়া গেল। বলিল-কল্য লইয়া যাইব। পরদিন সেই দুগ্ধ দধি হইয়া গিয়াছে। সে আসিয়া বলিল-আমার দুগ্ধের ঘটীটা দাও। গোপালক দধির ঘটীটা দিল। দুগ্ধ ক্রেতা বলিল-আমি তোমার হাত হইতে দধি কিনি নাই, আমাকে দুগ্ধঘট দাও। গোপালক বলিল-আমি ঐ সব জানি না, তোমার ক্ষীরই ত দধি হইয়াছে। যদি তাহারা বিবাদ করিয়া আপনার নিকট আসে, আপনি তাহার কি ব্যবস্থা করিবেন? আমি গোপালকের মতেই মত দিব। কেন? দুগ্ধক্রেতা যাহাই বলুক না তাহার দুগ্ধই ত দধি হইয়াছে। এই প্রকারই মহারাজ, বর্তমান নাম-রূপ অন্য, প্রতিসন্ধি (জন্ম) কালে অন্য। কিন্তু পূর্বের নাম-রূপ হইতেই পরবর্তী নাম-রূপ হইয়াছে। সেই কারণে জন্মগ্রহণ থাকিলে নাম-রূপ পাপ-কর্ম মুক্ত হয় না। ভন্তে, আপনি সুদক্ষ।
আর আমি যেই বয়ঃপ্রাপ্তা যুবতী বিবাহ করিয়াছি, এই স্ত্রী অন্য। দুইজনে বিবাদ করিয়া যদি আপনার নিকট উপস্থিত হয়, তখন আপনি কি ব্যবস্থা করিবেন? ভন্তে, আমি পূর্ব ব্যক্তিকেই দিব। কি কারণে? সে যাহাই বলুক না, ঐ শিশু কুমারীই ত যুবতী হইয়াছিল। এই প্রকারই মহারাজ, মরণকাল পর্যন্ত অন্য নাম-রূপ, জন্মগ্রহণ কালে অন্য নাম-রূপ। তথাপি তাহা পূর্ব নাম-রূপ হইতেই উৎপন্ন হয়। সেই কারণে জন্মগ্রহণ থাকিলে নাম-রূপ পাপ-মুক্ত হয় না।

No comments:

Post a Comment