পূতিগাত্র তিষ্য স্থবিরের উপাখ্যান (গাথা ৪১)
গাথাপ্রসঙ্গ : ‘‘অচিরং বত’যং কযো” ‘‘অচিরেই এই শরীর”- এই ধর্মদেশনা বুদ্ধ শ্রাবস্তীতে অবস্থানকালে পূতিগাত্র তিষ্য স্থবিরকে উদ্দেশ্য করে ভাষণ করেছিলেন।
শ্রাবস্তীবাসী একজন কুলপুত্র বুদ্ধের নিকট ধর্ম শ্রবণ করে বুদ্ধশাসনে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে নিয়োজিত করে প্রব্রজিত হলেন। উপসম্পদা লাভ করে তাঁর নাম হল ‘তিষ্য স্থবির’। সময় অতিবাহিত হতে থাকলে হঠাৎ তাঁর শরীরে রোগ উৎপন্ন হল। সর্ষপের ন্যায় তাঁর শরীরে ফোঁড়া উঠল। ক্রমে সেগুলো বড় হতে হতে প্রথমে মূগডালের মত, পরে কলায়ের মত, পরে কদলীফলের মত, পরে আমলকীর মত, পরে কচি বেলে মত এবং অবশেষে পক্ক বেলের মত হয়ে ফেটে গেল। তাঁর শরীর বড় বড় ঘায়ে পরিপূর্ণ হল। লোকে তখন তাঁকে ‘‘পূতিগাত্র তিষ্য স্থবির” বলে ডাকত। ক্রমে তাঁর শরীরের অস্থিসমূহ শিথিল হতে লাগল। কেহই তাঁর সেবা করতে প্রস্থত ছিল না। তাঁর অন-র্বাস এবং বহির্বাস (উত্তরাসঙ্গ) পূঁজরক্তে ম্রক্ষিত দেখলে মনে হতো যেন জালিপিঠা। সঙ্গী ভিক্ষুরা তাঁর সেবা করতে না পেরে তাঁকে বাহিরে রেখে দিয়েছিলেন। তিনি অনাথের মত হয়ে গেলেন।
বুদ্ধগণ দিনে দুইবার পৃথিবী অবলোকন করতেন। প্রত্যূষকালে পৃথিবী অবলোকন করার সময় তাঁরা চক্রবালমুখ হতে আরম্ভ করে গন্ধকুটি (বুদ্ধগণের বাসস্থান) পর্যন- অবলোকন করে দেখেন বহির্বিশ্বে কোথায় কি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটছে। সেই সময় ভগবানের জ্ঞানজালে ধরা পড়ল ‘‘পূতিগাত্র তিষ্য স্থবির”। বুদ্ধ দেখলেন যে ঐ ভিক্ষুর অর্হত্ত্বলাভের উপনিশ্রয় আছে। কিন' রোগের কারণে তাঁকে সঙ্গী ভিক্ষুরা পরিত্যাগ করেছে। এখন আমি ব্যতীত এর অন্য কোন শরণ নেই।” বুদ্ধ তাঁর এ অবস্থা দেখে করুণাপরবশ হয়ে অগ্নিশালায় প্রবেশ করলেন। তারপর জল গরম করার পাত্রে জল দিয়ে চুল্লীতে চাপিয়ে জল গরম না হওয়া পর্যন- অগ্নিশালাতেই দাঁড়িয়ে থাকলেন। জল গরম হয়েছে জেনে সেই ভিক্ষু যেই মঞ্চে শুয়েছিলেন সেই মঞ্চের এক দিক উঠালেন ঐ ভিক্ষুকে অগ্নিশালায় নিয়ে যাবার জন্য। ভিক্ষুরা তা দেখে বললেন- ‘‘ভন্তে, আপনি সরে যান; আমরাই তাঁকে নিয়ে যাচ্ছি” বলে মঞ্চ উঠায়ে অগ্নিশালায় নিয়ে আসলেন। তারপর তিনি একটি হাতলযুক্ত দ্রোণ (মগ) আনিয়ে হালকা গরমজলে সিঞ্চন করে ভিক্ষুদের বললেন ঐ ভিক্ষুর উত্তরাসঙ্গ নিয়ে গরমজলে ভিজায়ে গাত্রমার্জন করে স্নান করালেন। স্নান করাতে করাতে উত্তরাসঙ্গটি শুকায়ে গেল। সেই উত্তরাসঙ্গ তাঁকে পরায়ে অন-র্বাস খুলে ঐ জলে মর্দন করে রৌদ্রে শুকাতে দিলেন। তাঁর শরীর হতে জল শুকাতে শুকাতে অন-র্বাস শুকায়ে গেল। তিনি অন-র্বাস ও বহির্বাস পরিধান করে একাগ্রচিত্ত হয়ে মঞ্চে (চকিতে) শুয়ে পড়লেন। বুদ্ধ তাঁর মাথার কাছে দাঁড়িয়ে তাঁকে বললেন- ‘‘হে ভিক্ষু, তোমার এই শরীর চেতনাহীন ও নিরুপকার হয়ে অকিঞ্চিৎকর অঙ্গারের ন্যায় অবিলম্বে ভূতলে শায়িত হবে।”- ইহা বলে বুদ্ধ এ গাথাটি দেশনা করেছিলেন। (দেশনাবসানে পূতিগাত্র তিষ্য স্থবির প্রতিসম্ভিদাসহ অর্হত্ত্বফলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। অন্যান্য অনেকে স্রোতাপত্তিফলাদি লাভ করেছিলেন। স্থবিরও অর্হত্ত্ব লাভ করে পরিনির্বাপিত হয়েছিলেন। বুদ্ধ তাঁর শরীরকৃত্য করায়ে অস্থিধাতুসমূহ নিয়ে চৈত্য নির্মাণ করায়েছিলেন)।
ব্যাখ্যা
অচিরং বত’যং কাযো : অচিরেই এ শরীর শায়িত হবে। স্বাভাবিক শয়ন হিসাবে এই শরীর মাটির উপরেই শায়িত হবে।
ছুদ্ধো : তুচ্ছ অর্থাৎ চেতনাহীন (বিজ্ঞানহীন) হয়ে তুচ্ছ ঘৃণিত ত্যাজ্য হতে শায়িত হবে।
নিরত্থংব কলিঙ্গরং : নিরর্থক কাষ্ঠখণ্ডের ন্যায় অর্থাৎ অকিঞ্চিৎকর অঙ্গারের ন্যায় কিংবা নিরুপকার নিরর্থক কাষ্ঠখণ্ডের ন্যায়।
মর্মোদ্ঘাটন : কাষ্ঠ সম্ভারার্থী মনুষ্যেরা অরণ্যে প্রবেশ করে সোজা কাঠকে সোজাভাবে বাঁকা কাঠকে বাঁকাভাবে ছেদন করে কাষ্ঠসম্ভার নিয়ে আসে। অবশিষ্ট পোকা-খাওয়া, পঁচা, অসার, গ্রনি'যুক্ত কাষ্ঠখণ্ড সেখানেই ফেলে দেয়। অন্য কাষ্ঠহরণকারীরা এসে সেগুলো গ্রহণ করে না। অন্যগুলো মাটিতেই পড়ে থাকে। সেগুলো কেউ কেউ নিয়ে এসে ছোটখাট কাজে লাগায় যেমন মঞ্চের খিল, পদধৌত করার কাষ্ঠখণ্ড, ফলকপীঠ ইত্যাদি। কিন' এই শরীরে যে কেশ-লোমাদি বত্রিশ প্রকার অশুচি দ্রব্যের ভাগ আছে তার কোন ভাগই মঞ্চের খিল বা অন্যান্য উপকারক দ্রব্যের ন্যায় কোন কাজে লাগে না। এই শরীরের সমস- অংশই নিরর্থক কাষ্ঠখণ্ডের ন্যায় চেতনাহীন হয়ে অচিরেই ভূমিতে শায়িত হবে।
‘‘অচিরে রহিবে হায়! ভূশায়িত এই কায়,
ঘৃণিত, বিজ্ঞানহীন, নিরর্থক কাষ্ঠ প্রায়।”
গাথাপ্রসঙ্গ : ‘‘অচিরং বত’যং কযো” ‘‘অচিরেই এই শরীর”- এই ধর্মদেশনা বুদ্ধ শ্রাবস্তীতে অবস্থানকালে পূতিগাত্র তিষ্য স্থবিরকে উদ্দেশ্য করে ভাষণ করেছিলেন।
শ্রাবস্তীবাসী একজন কুলপুত্র বুদ্ধের নিকট ধর্ম শ্রবণ করে বুদ্ধশাসনে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে নিয়োজিত করে প্রব্রজিত হলেন। উপসম্পদা লাভ করে তাঁর নাম হল ‘তিষ্য স্থবির’। সময় অতিবাহিত হতে থাকলে হঠাৎ তাঁর শরীরে রোগ উৎপন্ন হল। সর্ষপের ন্যায় তাঁর শরীরে ফোঁড়া উঠল। ক্রমে সেগুলো বড় হতে হতে প্রথমে মূগডালের মত, পরে কলায়ের মত, পরে কদলীফলের মত, পরে আমলকীর মত, পরে কচি বেলে মত এবং অবশেষে পক্ক বেলের মত হয়ে ফেটে গেল। তাঁর শরীর বড় বড় ঘায়ে পরিপূর্ণ হল। লোকে তখন তাঁকে ‘‘পূতিগাত্র তিষ্য স্থবির” বলে ডাকত। ক্রমে তাঁর শরীরের অস্থিসমূহ শিথিল হতে লাগল। কেহই তাঁর সেবা করতে প্রস্থত ছিল না। তাঁর অন-র্বাস এবং বহির্বাস (উত্তরাসঙ্গ) পূঁজরক্তে ম্রক্ষিত দেখলে মনে হতো যেন জালিপিঠা। সঙ্গী ভিক্ষুরা তাঁর সেবা করতে না পেরে তাঁকে বাহিরে রেখে দিয়েছিলেন। তিনি অনাথের মত হয়ে গেলেন।
বুদ্ধগণ দিনে দুইবার পৃথিবী অবলোকন করতেন। প্রত্যূষকালে পৃথিবী অবলোকন করার সময় তাঁরা চক্রবালমুখ হতে আরম্ভ করে গন্ধকুটি (বুদ্ধগণের বাসস্থান) পর্যন- অবলোকন করে দেখেন বহির্বিশ্বে কোথায় কি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটছে। সেই সময় ভগবানের জ্ঞানজালে ধরা পড়ল ‘‘পূতিগাত্র তিষ্য স্থবির”। বুদ্ধ দেখলেন যে ঐ ভিক্ষুর অর্হত্ত্বলাভের উপনিশ্রয় আছে। কিন' রোগের কারণে তাঁকে সঙ্গী ভিক্ষুরা পরিত্যাগ করেছে। এখন আমি ব্যতীত এর অন্য কোন শরণ নেই।” বুদ্ধ তাঁর এ অবস্থা দেখে করুণাপরবশ হয়ে অগ্নিশালায় প্রবেশ করলেন। তারপর জল গরম করার পাত্রে জল দিয়ে চুল্লীতে চাপিয়ে জল গরম না হওয়া পর্যন- অগ্নিশালাতেই দাঁড়িয়ে থাকলেন। জল গরম হয়েছে জেনে সেই ভিক্ষু যেই মঞ্চে শুয়েছিলেন সেই মঞ্চের এক দিক উঠালেন ঐ ভিক্ষুকে অগ্নিশালায় নিয়ে যাবার জন্য। ভিক্ষুরা তা দেখে বললেন- ‘‘ভন্তে, আপনি সরে যান; আমরাই তাঁকে নিয়ে যাচ্ছি” বলে মঞ্চ উঠায়ে অগ্নিশালায় নিয়ে আসলেন। তারপর তিনি একটি হাতলযুক্ত দ্রোণ (মগ) আনিয়ে হালকা গরমজলে সিঞ্চন করে ভিক্ষুদের বললেন ঐ ভিক্ষুর উত্তরাসঙ্গ নিয়ে গরমজলে ভিজায়ে গাত্রমার্জন করে স্নান করালেন। স্নান করাতে করাতে উত্তরাসঙ্গটি শুকায়ে গেল। সেই উত্তরাসঙ্গ তাঁকে পরায়ে অন-র্বাস খুলে ঐ জলে মর্দন করে রৌদ্রে শুকাতে দিলেন। তাঁর শরীর হতে জল শুকাতে শুকাতে অন-র্বাস শুকায়ে গেল। তিনি অন-র্বাস ও বহির্বাস পরিধান করে একাগ্রচিত্ত হয়ে মঞ্চে (চকিতে) শুয়ে পড়লেন। বুদ্ধ তাঁর মাথার কাছে দাঁড়িয়ে তাঁকে বললেন- ‘‘হে ভিক্ষু, তোমার এই শরীর চেতনাহীন ও নিরুপকার হয়ে অকিঞ্চিৎকর অঙ্গারের ন্যায় অবিলম্বে ভূতলে শায়িত হবে।”- ইহা বলে বুদ্ধ এ গাথাটি দেশনা করেছিলেন। (দেশনাবসানে পূতিগাত্র তিষ্য স্থবির প্রতিসম্ভিদাসহ অর্হত্ত্বফলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। অন্যান্য অনেকে স্রোতাপত্তিফলাদি লাভ করেছিলেন। স্থবিরও অর্হত্ত্ব লাভ করে পরিনির্বাপিত হয়েছিলেন। বুদ্ধ তাঁর শরীরকৃত্য করায়ে অস্থিধাতুসমূহ নিয়ে চৈত্য নির্মাণ করায়েছিলেন)।
ব্যাখ্যা
![]() |
| মহাকারুণাময় বুদ্ধের রোগীর সেবাদান |
ছুদ্ধো : তুচ্ছ অর্থাৎ চেতনাহীন (বিজ্ঞানহীন) হয়ে তুচ্ছ ঘৃণিত ত্যাজ্য হতে শায়িত হবে।
নিরত্থংব কলিঙ্গরং : নিরর্থক কাষ্ঠখণ্ডের ন্যায় অর্থাৎ অকিঞ্চিৎকর অঙ্গারের ন্যায় কিংবা নিরুপকার নিরর্থক কাষ্ঠখণ্ডের ন্যায়।
মর্মোদ্ঘাটন : কাষ্ঠ সম্ভারার্থী মনুষ্যেরা অরণ্যে প্রবেশ করে সোজা কাঠকে সোজাভাবে বাঁকা কাঠকে বাঁকাভাবে ছেদন করে কাষ্ঠসম্ভার নিয়ে আসে। অবশিষ্ট পোকা-খাওয়া, পঁচা, অসার, গ্রনি'যুক্ত কাষ্ঠখণ্ড সেখানেই ফেলে দেয়। অন্য কাষ্ঠহরণকারীরা এসে সেগুলো গ্রহণ করে না। অন্যগুলো মাটিতেই পড়ে থাকে। সেগুলো কেউ কেউ নিয়ে এসে ছোটখাট কাজে লাগায় যেমন মঞ্চের খিল, পদধৌত করার কাষ্ঠখণ্ড, ফলকপীঠ ইত্যাদি। কিন' এই শরীরে যে কেশ-লোমাদি বত্রিশ প্রকার অশুচি দ্রব্যের ভাগ আছে তার কোন ভাগই মঞ্চের খিল বা অন্যান্য উপকারক দ্রব্যের ন্যায় কোন কাজে লাগে না। এই শরীরের সমস- অংশই নিরর্থক কাষ্ঠখণ্ডের ন্যায় চেতনাহীন হয়ে অচিরেই ভূমিতে শায়িত হবে।
‘‘অচিরে রহিবে হায়! ভূশায়িত এই কায়,
ঘৃণিত, বিজ্ঞানহীন, নিরর্থক কাষ্ঠ প্রায়।”

No comments:
Post a Comment