Followers

Wednesday, April 19, 2017

বুদ্ধদর্শনে মনোজগত

বুদ্ধ দর্শনে মনোজগত : অনুশীলন অভিজ্ঞা
-----ভদন্ত প্রজ্ঞাবংশ মহাথেরোর


মানব সভ্যতার ঊষালগ্ন হতে বিশ্বের দার্শনিকদের এক বিশাল এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এই সভ্যতার জন্ম দান, নিয়ন্ত্রণ এবং ক্রমিক উকর্ষতা দানে। আমি কে? আমার চারপাশে দু’নয়নে যা দেখতে পাচ্ছি, এ গুলো কোত্থেকে এলো, কার সৃষ্টি? মাত্র এ দুই কৌতূহলদীপ্ত প্রশ্ন থেকেই মানব সভ্যতার জন্ম আধ্যাত্মিকভাবে। আর জীবন ধারণের প্রতিকূূলতা জাত অস্বসিত্মবোধ থেকেই জন্ম নিল মানবের বস্তুগত সভ্যতা। অনস্বীকার্য যে, উভয় সভ্যতার জন্মের কেন্দ্র বিন্দু হলো ‘মন’। দার্শনিকদের দর্শন জগত বলতে, এই মনকে নিয়ে যাবতীয় কর্মকাণ্ডকে বুঝায়। এই দর্শন জগত তার বিশাল ব্যাপকতার কারণে বর্তমান বিশ্বে তা এখন তিনটি প্রধান শাখায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে- ধর্ম, দর্শন ও বিজ্ঞান এই তিন নামে। ‘মন’ রয়ে গেছে সকলের কেন্দ্র বিন্দুতে। এই ‘মন’ নিয়ে এ বিশ্বে যারা কিছু চিন্তা-ভাবনা করেছেন, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন, দৈনন্দিন জীবনে তার গতি-প্রকৃতি নির্ণয়ের চেষ্টা করেছেন এবং মৃত্যুকালে ও মৃত্যুর পরে এই মনের অবস্থা ও অবস্থান নির্ণয়ের চেষ্টা করেছেন; তাঁদের মধ্যে মানবপুত্র বুদ্ধের স্থান এভারেস্ট শৃঙ্গ সদৃশ এবং তাঁর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত মধ্যাহ্ন সূর্যের ন্যায় স্পষ্ট ও দীপ্তিমান। মহান বুদ্ধের দীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ বছরের বুদ্ধ জ্ঞান জাত ভাষণ ও যাবতীয় কর্মকাণ্ডকে ‘ত্রিপিটক’ নামে গ্রন্থাকারে ধারণ করা হয়েছে। এই মহান ত্রিপিটকের তিনটি প্রধান খণ্ডের একটি হলো- ‘অভিধর্ম পিটক’। অপর দুই খণ্ড হলো সূত্র পিটক ও বিনয় পিটক। এ দুই পিটকের বিষয়াবলীতে মন ও মননের অনেক উপাদান বিধৃত থাকলেও অভিধর্ম পিটকের সব কিছুই এই মন ও তার গতি-প্রকৃতির উপর ব্যাপক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নিয়েই সমৃদ্ধ। শুনতে অবাক লাগে, মহান বুদ্ধের পঁয়তাল্লিশ বছরের সমগ্র বাণীকে সংখ্যা গণনায় চুরাশি হাজার বলে নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলোর প্রত্যেকটিকে এক একটি ধর্মস্কন্ধ বলা হয়েছে। আর এই চুরাশি হাজার ধর্মস্কন্ধের মধ্যে শুধু অভিধর্ম পিটকের ভাগে পড়েছে অর্ধেক; বিয়াল্লিশ হাজার।
সেই অভিধর্মের ব্যাখ্যা মতে পঞ্চস্কন্ধ তথা এই দেহ ও মনের বিভাজন প্রক্রিয়াতে উপস্থাপিত ক্রম হলো- রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান। এই পাঁচটি ক্রমকে এক বাক্যে ‘পঞ্চস্কন্ধ’ বলা হয়। এখানে ‘রূপ’ বলতে এই দেহ সহ দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান এই বিশ্বচরাচরের যাবতীয় বস্তুকে বুঝায় এবং বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান বলতে এক কথায় ‘মন’কে নির্দেশ করা হয়েছে।
অপরদিকে বুদ্ধ দর্শনের আলোকে এবং অনুপ্রেরণায় যে সকল ব্যক্তি জীবন-দুঃখের চির অবসানে একান্ত আগ্রহী তাদের বলা হয় বিদর্শন সাধক। তাঁদের অনুশীলিত উপায় বা পদ্ধতিকে বলা হয় বিদর্শন ভাবনা। এই বিদর্শন ভাবনা তথা বিশেষভাবে দর্শন বা সম্যক দর্শন প্রক্রিয়াতে ‘পঞ্চস্কন্ধ’ নামক এই দেহ ও মনের উপস্থাপন ক্রম হলো- নাম, তারপরে রূপ, তথা নামরূপ হিসেবে। ‘রূপ’কে বিভাজন, ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলা হয়েছে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের দৃশ্যমান, অদৃশ্যমান বস্তু বা বিষয় মাত্রই সব কিছুই ‘রূপ’। এই ‘রূপ’ দুই ভাগে বিভক্ত, বস্তুরূপ ও ভাবরূপ। আপন দেহ থেকে শুরু করে দৃশ্যমান সব কিছুই বস্তুরূপের অন্তর্গত; আর অদৃশ্যমান যত কিছু, যা পূর্ব অভিজ্ঞতা ও স্বীয় অনুভূতির সংযোগে মনে মনে কল্পনার আকার বা ছবির সৃষ্টি করা হয়, তার নাম ‘ভাব-রূপ’। ভাব-রূপ বহুলাংশে চক্ষু, কর্ণ জিহ্বাদি ইন্দ্রিয়ের উপর নির্ভরশীল বলে ইহাকে ‘ইন্দ্রিয়গত-রূপও বলা যায়। বস্তুগতরূপ হলো মাটি, জল, বায়ু এবং তাপ-এই চারি প্রধান উপাদানের সমষ্টিতে সৃষ্ট যাবতীয় বস্তু। আর ইন্দ্রিয়গত-রূপ বা ভাবগত রূপ হলো- চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, চর্ম ও মন-এই ছয় অনুভূতি উৎপত্তির উৎস বা ইন্দ্রিয় সমূহ।
শাস্ত্রীয় বিচারের এ সকল বিশ্লেষণ-ক্রম, আমার ব্যক্তিগত অনুশীলনের প্রাথমিক স্তরে যেভাবে ধরা দিয়েছে তা এই নিবন্ধে লিপিবদ্ধ করার ইচ্ছাটা এ জন্যেই যে, ভবিষ্যতে বুদ্ধের দর্শন রাজ্যে নবাগত কোন সাধক, গবেষককে তাঁর সাধনা-গবেষণায় তা কিঞ্চিত হলেও সাহায্য করতে পারে, এই লক্ষ্যে। বিশেষতঃ যারা বুদ্ধের বিশাল অভিধর্ম-শাস্ত্র রাজ্যে পূর্বে বিচরণ করার সুযোগ হয়নি, তাঁদের জন্যে আমার এই অভিজ্ঞতা কিঞ্চিত হলেও দিক-নির্দেশকের ভূমিকা পালন করতে পারে।
বিদর্শন শাস্ত্রীয় বিচারে ‘নাম> রূপ’ এই ক্রমটি অনুশীলনকারীগণের অভিজ্ঞতায় কিভাবে ধরা দিতে পারে সে সম্পর্কে আমার ইতিপূর্বে লিখিত নিবন্ধ ‘নাম আগে, না রূপ আগে’ এই শিরোনামে আলোচিত হয়েছে। পোমরা জ্ঞানাঙ্কুর বিহার ধ্যান কেন্দ্রের মুখপত্র ‘সমাধি’ পত্রিকায় ২০০১ সালে তা প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমান নিবন্ধে শুধু ‘নামুস্কন্ধের’ উৎপত্তি ও তার গতি প্রকৃতি নিয়েই আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকবে।
‘নামস্কন্ধ’ এর শাস্ত্রীয় উৎপত্তিক্রম হলো- বেদনা সংজ্ঞা> সংস্কার> বিজ্ঞান। বিদর্শন স্মৃতি অনুশীলন ক্ষেত্রে দেখা যায়, নাম-রূপ নামক ইহারা দু’ভাগে ভাগ হয়ে পড়ে। ষড়েন্দ্রিয়ের মধ্যে চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা এবং চর্ম এই পাঁচটি ইন্দ্রিয় হয়ে যায় প্রথম উৎপত্তি ক্রম; আর শুধু ‘মন’ ইন্দ্রিয় হয়ে পড়ে দ্বিতীয় উৎপত্তিক্রম। এক্ষেত্রে প্রথম উৎপত্তি ক্রমটি বহির্ভাগীয় এবং দ্বিতীয়টি অভ্যন্তরভাগীয়। বর্হিভাগীয় উৎপত্তি ক্রমের মধ্যে দেখা যায় বর্তমানকালীয় উপস্থিত মুহূর্তে তথা ঘটনাক্ষণে যখন যেই ইন্দ্রিয় পথে স্ব স্ব গ্রাহ্য বিষয় বস্তুর সংযোগ ঘটে, তখন তার থেকেই জন্ম নেয় ‘নাম-স্কন্ধের’ উৎপত্তি ক্রম। নিম্নোক্তভাবেই সেই উৎপত্তিক্রমটি সম্পাদিত হয়; বিজ্ঞান> সংস্কার> সংজ্ঞা> বেদনা। এই উৎপত্তিক্রমের বিশ্লেষণ ক্রম হতে পাঠক ও সাধকের বুঝে নেয়া সহজ হবে বিজ্ঞান, সংজ্ঞা, সংস্কার, বেদনা-এগুলোর পরিচয়। একটি উপমার মাধ্যমে বিষয়গুলোর উৎপত্তি ক্রম তুলে ধরা হচ্ছে-
মনে করুন, আপনার ‘চক্ষু’ ইন্দ্রিয় পথে হঠাৎ করে একটি উড়ন্ত পাখি পড়লো। এই পাখিটি আপনার চোখে পড়া মাত্রই চোখের পর্দা বা ‘লেন্স’ এর সাথে মসিত্মষ্কের সংযোগ তার নামক স্নায়ু মনো-বিজ্ঞানটিকে জাগ্রত করে বলেদিল কিছু একটা চোখে পড়েছে। সাথে সাথেই মনের দ্বিতীয় উপাদান স্মরণ শক্তি ‘সংস্কার’ বা তার পূর্ব অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার হতে সমাধান বের করে বলেদিল, যা পড়েছে, তা মানুষ নহে; পশু নহে ইহা পাখীর গোষ্ঠী ‘কাক’। সংস্কারের এই চিহ্নিত করণ বা বিচার সমাধানের নাম ‘সংজ্ঞা’। সংজ্ঞাকে বস্তুর প্রাথমিক পরিচিতি বা প্রাথমিক জ্ঞানও বলা হয়। সংজ্ঞার কাজ শেষ না হতেই, ‘বেদনা’ জাগ্রত হয়ে চক্ষুপথে পতিত এই কাকটির রস আস্বাদনে উদ্যোগী হলো, বন্ধু সংস্কারকে সাথী করে। অর্থাৎ এই কাক জাতটি ভালো নহে, চিকচিকে কালো, কন্ঠস্বর ভারী কর্কশ এবং খুবই ধূর্ত ইত্যাদি। সাধক বলুন তো, পাখি দেখা নিয়ে এই পর্যন্ত যা ঘটে গেল, কত সময় লাগলো? মোটেই না, একদম চোখের পলকে সব কর্ম শেষ। দেখুন কি অসম্ভব বিদ্যুত গতিতেই না এই ‘নাম’ তথা মনেন্দ্রিয় তার কার্য সিদ্ধিতে এত পটু, এত দক্ষ! এর সাথে পাল্লা দিতে গেলে তাই সাধকের এত হুঁশিয়ার, এত সাবধান হতে হয় যে, তার নাম হয়েছে ‘স্মৃতি সমপ্রজ্ঞান’। এই ‘স্মৃতি সমপ্রজ্ঞান’ হলো আড়াই হাজার বছরের বহু পরীক্ষিত এক অদ্বিতীয় চৌকিদার, প্রহরী। সাধক যাবত নিদ্রা না যান, তাবৎ এই প্রহরীরও বিন্দুমাত্র বিশ্রামের উপায় থাকে না। যদি দেখা যায় চৌকিদারটি, বিশ্রামের যথেষ্ট সুযোগ পাচ্ছে, তাহলে বলতে হবে সাধকের সাধনায় অগ্রগতি মোটেই হচ্ছে না।
এখন পূর্ব প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। বলেছিলাম, ‘নাম স্কন্ধের’ বেদনা তার বন্ধু সংস্কারকে নিয়ে কাকটির গুণাগুণ বিচার বা রস আস্বাদনে প্রস্থতি নিল। সাধক বলুন দেখি এই প্রস্থতির নাম কি? ইহার নাম ‘তৃষ্ণা’। এবার বলুন, কাকের সম্পর্কে বেদনা ও সংস্কার মিলে যে সব ধারণা ব্যক্ত করলো, তাতে কোন্‌ ধরণের ‘তৃষ্ণা’ আপনার মধ্যে জাগতে পারে? বিতৃষ্ণা বা বিরক্তি নহে কি? হ্যাঁ, এভাবেই চক্ষুর ন্যায় কর্ণ শব্দের প্রতি, নাসিকা গন্ধের প্রতি, জিহ্বা আস্বাদনের প্রতি এবং চর্ম শীত-উষ্ণ, শক্ত-কোমল-ইত্যাদি অনুভূতির প্রতি মুহূর্তে মুহূর্তে আসক্তি, বিরক্তি অথবা উপেক্ষা ভাব দ্বারা তৃষ্ণাকে জলের স্রোতের ন্যায় অবিচ্ছিন্ন গতিতে বহির্বিভাগীয় উৎপত্তি ক্রমের মাধ্যমে আলিঙ্গন করে চলেছে।
এবার তুলে ধরা যাক্‌ আভ্যন্তরীণ উৎপত্তি ক্রমের মধ্যে আমরা কী দেখতে পাচ্ছি। যদি সাধক বহির্ভাগীয় উৎপত্তিক্রমকে বাঁধা দিতে চোখ, কান, মুখ বন্ধ করে বসে থাকেন, তথাপি ‘মনেন্দ্রিয়’টি ঐ সব বহির্ভাগীয় ইন্দ্রিয় পাঁচটি দ্বারা পূর্বে যা রসদ সংগ্রহ করে, তার বিশাল ভাণ্ডারে ‘সংস্কার’ রূপে জমা রেখেছে, কেবল তা দিয়েও সে বহুকাল চালিয়ে দিতে পারে অনায়াসে। প্রশ্ন আসতে পারে সাধক যদি বাহির ইন্দ্রিয়গুলো বন্ধ করেন তখন আভ্যন্তরীণ উৎপত্তি ক্রমের মধ্যে ‘সংজ্ঞা’টির কোন কাজ থাকতে পারে কি? হ্যাঁ নাম-স্কন্ধের প্রত্যেকটি উপাদানের উপস্থিতি এুক্েষত্রেও অবশ্যই থাকবে। যেমন, কবি তার কক্ষে বসে দার্শনিক ধ্যানে বসে এবং বিজ্ঞানী তার গবেষণার বিষয় চিন্তায় যখন স্ব স্ব বিষয়ে আপন মনে ডুব দেন, তখন মনের কল্পনায় যেই ছবি গুলো একান্ত বাস্তব হয়ে উঠে এগুলোতে ‘সংজ্ঞার’ প্রাধান্য অবশ্যই তাকে, যদিও ‘বিজ্ঞান’টি ছাড়া বাকী চারটি উপাদানের সবকটিই বেকার বা অসিত্মত্বহীন হতে বাধ্য। অতএব, বহির্ভাগীয় উৎপত্তি ক্রম বলুন, কি অভ্যন্তর ভাগীয় মনোইন্দ্রিয়ের উৎপত্তিক্রমই বলুন, উভয় ক্ষেত্রে একই উৎপত্তিক্রম, বিজ্ঞান> সংস্কার> সংজ্ঞা> বেদনা-এই বিধির কোন ব্যতিক্রম নেই। এই বিষয়টিকে একটি উদাহরণ দ্বারা সহজ করা যেতে পারে। মনে করুন স্বপ্নে দেখলেন, আপনার বহু আকাঙ্খিত এক বন্ধু আপনার বাড়ীতে বেড়াতে এসেছেন। এক্ষেত্রে আপনি দু’টি অবস্থার সম্মুখীন হতে পারেন। এক, তাকে প্রতিদিনের দেখা প্রিয়জন হিসেবে স্বাগত জানাতে পারেন। দুই, শোক ও আনন্দাশ্রুর আবেগে তাকে বুকে জড়িয়ে স্মরণ করতে পারেন যে, এই প্রিয়জনের সাথে বহুকাল পরেই পুর্নমিলন হলো।
আর্য্যশ্রাবক পূজ্য বনভন্তে।

এখানে বন্ধুকে দেখার কাজে দেখছি, বাস্তব চর্ম চক্ষু-ইন্দ্রিয়ের কোন উপস্থিতি না থাকলেও সেই চক্ষু-ইন্দ্রিয় পূর্বে মনেন্দ্রিয়কে এই বন্ধু সম্পর্কে যেই আকার, আকৃতি দান করেছিল তা এখন স্বপ্নে হুবহু সেভাবেই উপস্থিত হতে পারে, অর্থাৎ বর্তমানে যুবক বন্ধুটি স্বপ্নেও একই যুবকরূপে দর্শন অথবা তার প্রদত্ত ছবির উপর, কল্পনার রং-এ রাঙিয়ে ভবিষ্যতের কোন রূপ প্রকল্প হিসেবেও আবির্ভূত হতে পারে অর্থাৎ স্বপ্নে বন্ধুটিকে খুব রুগ্ন, বৃদ্ধ বলে মনে হচ্ছে, ইত্যাদি। বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক ও কবি সাহিত্যিকগণ এভাবেই বিজ্ঞান চিত্তের বর্তমানকে ভিত্তি করে অতীত বা অনাগতের ছবি আঁকেন। এটা মনেন্দ্রিয়ের মূল উৎস বিজ্ঞান চিত্তের তথা জীবিতেন্দ্রিয়ের অনন্য সাধারণ শক্তি-যা অতীতের অসংখ্য জন্ম জন্মান্তরের স্মৃতি সংরক্ষন করতে সক্ষম। এই বিজ্ঞান চিত্তটি এমন এক পর্যায়ে অবস্থান করেই জাগ্রত অবস্থায় হউক বা ঘুমন্ত অবস্থায় হউক, সার্বক্ষণিক অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায় প্রাণীর জীবনে কাজ করে যায় অবিচ্ছিন্ন ভাবে, যতক্ষণ জীব প্রাণে বেঁচে থাকে। শুধু তা-ই নহে, মৃত্যু ক্ষণে জীবের জন্মান্তর ঘটানোর দায়-দায়িত্বও অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্ত এবং এককভাবে এই বিজ্ঞান চিত্তটি গ্রহণ করে, অনন্তকালের সংসারে সে তার রাজত্বকে সমপ্রসারিত করে থাকে। পৃথিবীতে যত ধর্ম-দার্শনিকগণ ছিলেন ও বর্তমানে আছেন, তন্মধ্যে একমাত্র মহান বুদ্ধ এবং তাঁর সার্থক উত্তরাধিকারীগণ ব্যতীত বিজ্ঞান চিত্ত বা জীবিতেন্দ্রিয়ের এই অনন্ত কালের সীমারেখা কেহই দেখেননি।
বিজ্ঞান চিত্তের অনন্তকাল ব্যাপী এই সমপ্রসারণ গতিকে রোধ করা একান্তই প্রয়োজন; এ জন্যেই যে, তা আমাদের জন্যে বর্তমানে যেমন, অতীত এবং ভবিষ্যতেও অনুরূপ অনন্ত দুঃখ সৃষ্টির প্রধান নায়ক। যেই ‘অবিদ্যা বা অজ্ঞতা’কে বুদ্ধ তথাগত সর্ব দুঃখের মূল কারণ রূপে চিহ্নিত করেছেন তার অপর নাম ‘বিজ্ঞান-চিত্ত’। ইহাকে প্রতিসন্ধি চিত্তও বলা হয়। ‘মনো পূব্বঙ্গমা ধম্মা’ বলে সর্ব বিষয়ে অগ্রগামী, নেতৃত্ব দানকারী রূপে যেই ‘মন’ টির কথা বুদ্ধ ধর্মপদের শতাধিক বাণীর সর্ব প্রথমেই উল্লেখ করেছেন, তাও এই বিজ্ঞান চিত্ত। মহান ধম্মপদের সেই প্রথম গাথাটিতে- “মনসা চে পদুট্‌ঠেন, ......পসন্নেন ভাসতি বা করোতি বা”-বলে বুদ্ধ যাকে নির্দেশ করেছেন তা ‘নাম স্কন্ধের’ অভ্যন্তরভাগীয় উৎপত্তিক্রমের ‘বেদনা’ পর্বভূক্ত বিষয়। কর্ম সম্পাদনের চূুড়ান্ত পর্যায়ে কর্মকে বীজে পরিণত করার চূড়ান্ত স্তর হলো এই ‘বেদনা’। ইহার পরবর্তী পর্যায় তৃষ্ণা। স্মরণ রাখা দরকার অবিদ্যা, মোহ বা ভ্রান্ত ধারণা তথা অনন্তকালের আত্মা নামক দৃঢ় বিশ্বাসই বিজ্ঞান-চিত্তের জনক। আবার সেই বিজ্ঞান চিত্তই অবিদ্যার উৎস হয়ে কাজ করে। সেই বিজ্ঞান চিত্তকে ‘বেদনা’ স্তরের অনুভূতিজাত প্রতিক্রিয়া বা আসক্তি, বিরক্তি ও তৃষ্ণা সংযুক্ত উপেক্ষা হতে মুক্ত রাখতে পারলে, তথা বেদনানুদর্শন সতিপট্‌ঠানে উল্লেখিত যাবতীয় সংযোজন হতে বিচ্ছিন্ন করতে পারলেই বিজ্ঞান চিত্তের সমপ্রসারণ বন্ধ হয় ; জন্মান্তরগতি নিরুদ্ধ হয়, অবিদ্যা-তৃষ্ণা জাত যাবতীয় সংস্কার নির্মূল হয় এবং সর্ব দুঃখহীন পরমা শান্তি নির্বাণ অধিগত হয়। বেদনা রহিত এই বিজ্ঞান চিত্তের অপর নাম ‘অনাসক্ত সউপাদিশেষ নির্বাণ’। সংস্কারের যাবতীয় সুখ-দুঃখে অনাসক্ত, নির্বিকার এই সুদুর্লভ চিত্তভাব গঠন করা বা লাভ করা কোন গুরু বা মহাপুরুষ, এমনকি সেই সম্যক সম্বুদ্ধের আশীর্বাদেও সম্ভব নহে। ইহা একান্তই নিজের ঐকান্তিক ইচ্ছা, চেষ্টা, প্রযত্ন, অধ্যাবসায় সহ একজন সত্যদর্শী, সম্যক দৃষ্টির হিতকামী তথা কল্যাণ মিত্রের স্ব অভিজ্ঞতা জাত উপদেশ দ্বারা আযত্বকরণ সম্ভব হয়।এক্ষেত্রে তেমন কল্যাণমিত্র পাওয়া যদি না যায়, তাহলে সমগ্র ত্রিপিটকের সার-সত্য মহাসতিপট্‌ঠান সূত্র এবং তৎ অনুসৃত চারি আর্য সত্য জ্ঞান ও প্রতীত্যসমুৎপাদ নীতিজাত জ্ঞানকে পরম কল্যাণমিত্রের আসনে বসায়ে, সেই আলোকে আপন মনোজগত গঠন করতে হবে। তার জন্যে সাধনা অবিরাম চালিয়ে যেতে হবে, প্রয়োজনে আমরণ কাল। কারণ, এই সৎ, মহৎ প্রচেষ্টার মধ্যে একদিকে পাওয়া যায় নির্মল পবিত্র আনন্দ এবং শান্ত-দান্ত জ্ঞানময় জীবনের অপার আস্বাদন। অপর দিকে দুঃখ মুক্তির অপার পারমী শক্তি সঞ্চয় হতে থাকে ক্রম বর্ধমান গতিতে। অতএব,
    সত্য পথচারী বিশ্বাসীর,
     চির উন্নত থাকে শির।
     সকল দীনতা, হীনমন্যতা,
     ধুয়ে মুছে যাবে, নাহি অন্যথা ;
     সোনালী উষার নির্মল আলো,
     ঘোর অমানিশা বিদীর্ণ করিয়া,
     দেখিবে, দেখিবেই হে মহাবীর!
================

বর্তমান ছাত্র-শিক্ষক বনাম বুদ্ধ ভাষিত শিক্ষানীতি

বর্তমান ছাত্র-শিক্ষক
বনাম বুদ্ধ ভাবিত শিক্ষানীতি
-----ভদন্ত প্রজ্ঞাবংশ মহাথেরোর


“ছাত্রানং অধ্যয়নং তপ” অর্থাৎ ছাত্রদের অধ্যয়ন হবে মুণি ঋষিদের তপস্যা তুল্য। ইহা সংস্কৃত প্রবাদ বাক্য। প্রাচীনকালে ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল মুণি-ঋষিদের তপোবনের পর্ণ শালায়, বৃহৎ বৃক্ষ ছায়ায় খোলা আকাশ তলে। কোলাহল মুখরিত গ্রাম-নগরের কর্মব্যস্ত পরিবেশ হতে অনতি দূরে, ঋষি তুল্য ধ্যান-গম্ভীর, সংযত আচার গোচর সম্পন্ন আচার্যগণের স্বনির্ভর এই শিক্ষা কেন্দ্রসমূহে। শাস্ত্রীয় ও আধ্যাত্মিক শিক্ষার পাশাপাশি ব্যবহারিক যাবতীয় শিক্ষা হাতে-কলমে পাওয়ার সার্বিক ব্যবস্থা তখন তথায় ছিল। আধ্যাত্মিক শিক্ষা দেওয়া হতো উন্নত চরিত্র গঠনার্থে। আর, তা ছিল সার্বজনীন এবং বাধ্যতামূলক। ব্যবহারিক শিক্ষা দেয়া হত তৎকালীন বর্ণবাদ ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থার অনুকুলে যেমন ব্রাহ্মণের সন্তানকে মন্ত্রশাস্ত্র, বেদশাস্ত্র; ক্ষত্রিয়ের সন্তানকে রাজ্যশাসন ও অস্ত্র বিদ্যা; বৈশ্যের সন্তানকে বাণিজ্য ও অর্থশাস্ত্র। কিন্তু শূদ্রের জন্যে কৃষি ও সেবাদাসের যে বৃত্তি তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় নির্ধারিত ছিল; তা সেই শ্রেণীর মানুষকে শিক্ষা দানের কোন ছবি এ সকল বিদ্যাপীঠে দেখা যায় না। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় বা বৈশ্যের কুলজাত গরীব শিক্ষার্থীর জন্যেই গুরুদক্ষিণা স্বরূপ, অগত্যার গতি হিসেবে শ্রমনির্ভর উৎপাদনমূলক জীবন জীবিকা সে কৃষি কর্মটি গুরু গৃহে বরাদ্দ ছিল; সেই শিক্ষাকেন্দ্র শিক্ষার্র্র্থীরূপে গৃহীত হলে। জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন মুখি এই দিকটিকে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রাচীনযুগ থেকে মধ্যযুগীয় শিক্ষা পর্ব পর্যন্ত সীমাহীন অযত্ন ও অবহেলার কারণেই, আধুনিক বিজ্ঞান সভ্যতার উন্মেষের সৌভাগ্য হতে চরমভাবে বঞ্চিত হলো, দর্শনে ও আধ্যাত্মিকতায় উচ্চতম এই ভারত উপমহাদেশটি। কেবলমাত্র উপ-মহাদেশটিই নহে, বলতে গেলে সমগ্র এশিয়া মহাদেশ। কারণ, ভারতীয় সভ্যতা, বিশেষ করে বৌদ্ধ সভ্যতা হাজার বছর ধরে কম বেশী প্রভাবিত করেছে সমগ্র এশিয়া মহাদেশকে। বৌদ্ধ সভ্যতায় বর্ণভেদ প্রথা অস্বীকার করা হয়েছে কেবলমাত্র সন্যাস জীবনে। সমাজ ও রাষ্ট্র যন্ত্রে তা অটুট ছিল পুরো মাত্রায়; এমনকি সম্রাট অশোকের মতো নিখাঁত বুদ্ধ মতবাদে বিশ্বাসী প্রবল প্রতাপী সম্রাটের রাজত্বে পর্যন্ত।
প্রাচীন ছাত্র সমাজ তপস্যা জ্ঞানে অধ্যয়নকে গ্রহণ করতো; একথা নিঃসন্দেহে সত্য। যদিও সকলের জীবনে সে তপস্যায় সিদ্ধি লাভ বা সেই তপস্যার ফল কখনো এক হতো না। দেখা যায় যতদিন শিক্ষা পর্ব সমাপ্ত না হতো; ততোদিন কোন শিক্ষার্থী গৃহাভিমুখি হতো না। তাদের শিক্ষা জীবন একমাত্র গুরুপত্নী ও গুরুপরিবার ছাড়া দ্বিতীয় কোন লোকালয় বা গৃহী-পরিবেশের সাথে সংস্রব সম্ভব ছিল না। এই একটি মাত্র পরিবারের সহজ সান্নিধ্যও ছিল অতিশয় দুর্লভ। বহুর মাঝে মাত্র দু’এক জন গুরুর হৃদয় জয়কারী অতি মেধাবীর ভাগ্যেই ছিল সেই দুর্লভ সুযোগ। ফলে বিপরীত লিঙ্গের সম্পর্ক বর্জিত ব্রহ্মচর্য জীবন ছিল তাদের অনিবার্য। এতে করে শিক্ষার্থীদের চিত্ত বিনোদন বা অবকাশ যাপনও ছিল, কোন না কোন শিক্ষণীয় বিষয়-বৈচিত্রে নিমগ্ন। চব্‌্িবশ ঘন্টা রুটিনের ছকে আবদ্ধ ছিল এই শিক্ষার্থী জীবন। অথচ তেমন জীবনও কখনো দেহ-মনের এক ঘেয়েমি নামক বন্দীত্বের অভিশাপে আক্রান্ত হতো না। দেখা যেতো শিক্ষার বৈচিত্রময়ীতার কারণে, জ্ঞানময় রুচি পরিবর্তনের মাঝে মঙ্গলময় প্রদীপ্ত জীবনেই ভাস্বর হয়ে উঠতো প্রতিটি শিক্ষার্থী। এমন শিক্ষা জীবনকে তাপসের তপস্যার চেয়েও উত্তম এবং শ্রেষ্ঠ বলা শ্রেয়। কারণ, তাপস তপস্যা করেন কোন একটি মাত্র বিষয়কে অবলম্বন করে। অপরদিকে একজন ছাত্রকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হয় জাগতিক ব্যবহারিক জীবনের বহুমুখী প্রয়োজনের দিকে লক্ষ্য রেখে, নানা বিষয়ে।
প্রাচীন, এমনকি মধ্যযুগীয় শিক্ষা পর্বে, সেই ঊনবিংশ শতাব্দীর একেবারে শেষ প্রান্ত পর্যন্ত এই উপমহাদেশের শিক্ষায় সেই পাঠশালা পদ্ধতি বিদ্যমান ছিল। তখনো পর্যন্ত আধুনিক পাশ্চাত্যের ‘ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য’ নামক ব্যক্তি কেন্দ্রিক অহংবাদ, এদেশে অভিশাপ রূপে আবির্ভূত হয়নি। তাই শিক্ষা জগতে শিক্ষকের শিক্ষকতা ছিল নেশাধর্মী; জীবন জীবিকার তাগিদে নিছক পেশা সর্বস্ব নহে। এতে করে ভারতীয় সভ্যতার সুমহান ঐতিহ্যবাহী আদর্শ ‘আচারিয়ো পিতরো বিয় মেতং’ গুরু শিষ্যের নিকট পিতা তুল্য, এই কথাটির তাৎপর্য তখনো মস্নান হয়ে যায়নি। তাই শিক্ষক ছাত্রকে সন্তান জ্ঞানে স্নেহ ও শাসনের নিগড়ে আবদ্ধ করতে পারতেন অতি সহজেই। এমন আপত্য মধুর বন্ধনে আবদ্ধ ছাত্রের উপায় কোথা, শিক্ষা গুরুকে পিতার ন্যায় শ্রদ্ধা ও ভীতির বশে মান্য না করে? ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে এমন আন্তরিক সম্পর্কের পরিবেশ শিক্ষা জগতে বিদ্যমান থাকার কারণেই সেকালের গুরু গৃহবাসী ছাত্র কিশোরে শিক্ষা করতে গিয়ে, ভরা যৌবনে গুরুর আশীর্বাদ ধন্য একজন পরিপূর্ণ মানুষ হয়েই ফিরে আসতেন মাতা-পিতার কোলে, আলোয় আলোয় ভরে তুলতে। আর সেই ছাত্র আমরণ কাল আপন হৃদয় বেদীতে, জ্ঞানদাতা সেই শিক্ষাগুরুকে পূজা করতেন দেবজ্ঞানে, সূর্য জ্ঞানে। শিক্ষা গুরুও দূর হতে বিদ্যা-দানের সার্থকতায় পরম তৃপ্তি লাভ করতেন শিষ্যের অধীত বিদ্যা তার ব্যবহারিক জীবনে শুক্ল পক্ষের চন্দ্রের মতো দিন দিন বিকশিত হতে দেখে।
প্রিয় পাঠক! বলুন, সার্থক শিক্ষার সেই গৌরব মণ্ডিত ঐতিহ্যের দেশের বাসিন্দা হয়ে, এখন আমাদের চারিপাশে কী দেখতে পাচ্ছি? এদেশের শিক্ষা জগতের এই বেহাল অবস্থার জন্যে দায়ী কে? এ কালের জ্ঞান পিপাসু তাপসিক চরিত্রের সেই পবিত্র শিক্ষাকে, বৃটিশেরা সর্বপ্রথম তাদের উপনিবেশিক শাসন-শোষণের কদর্য মানসিকতায় কলুষিত করলো। পিয়ন ও কেরানী সৃষ্টির নীল নক্সায়, দাস্য মনোবৃত্তির জন্ম দিল পবিত্র শিক্ষাঙ্গনে। জনতার অসনেত্মাষ আর চাপের মুখে বৃটিশেরা এদেশ ছাড়লেও তাদের দেয়া উপহার চাকুরী সর্বস্ব সেই দাস্য মনোবৃত্তির শিক্ষিত মানসিকতাকে, আমরা এখনো ত্যাগ করতে পারলাম কৈ? এই হীন মানসিকতার শিকার হয়ে, নেশা নামক পবিত্র শিক্ষকতা জীবন এখন পেশায় পরিণত হয়েছে। নেশায় ত্যাগ স্বীকার তথা নিজেকে সম্পূর্ণ উজার করে দেয়ার কষ্ট স্বীকারে, কোন বিরক্তি বোধ জাগে না। জাগেনা কোন অনীহা, অনাগ্রহ বোধ। শিক্ষকতাকে নেশা হিসেবে গ্রহণকারী শিক্ষক, তাই নিজেকে উজাড় করে দিয়ে অকাতরে আপন অধিগত জ্ঞান স্বীয় ছাত্রকে বিলিয়ে দিতে পারেন অতি সহজে। শিক্ষকের এই আন্তরিকতার মাত্রা জ্ঞানহীনতা, হিসাব-বুদ্ধিহীনতা থাকতে পারে। জ্ঞান পিপাসু নয় এমন ছাত্রের নিকট এই শিক্ষক বিরক্তিকর হতে পারেন। কিন্তু খাঁটি ছাত্রের জন্যে শিক্ষকের এই অবিরাম উৎস ধারা হয়ে থাকে মহাসৌভাগ্যের চাবিকাটি। শিক্ষকতাকে নেশা হিসেবে গ্রহণকারী শিক্ষক, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে ভারসাম্য হীনব্যক্তি বলেও প্রতীয়মান হতে পারেন। কিন্তু তেমন শিক্ষকই যে সংশ্লিষ্ট জাতির মেরুদণ্ড ও প্রাণ, সে কথা স্মরণ রাখার দায়-দায়িত্ব তখন বর্তায় সমাজ ও রাষ্ট্রের জনগণ এবং অভিভাবকগণের উপর। এই আদর্শ শিক্ষকের পারিবারিক চাহিদা পরিপূরণ এবং সামাজিক মর্যাদা দান করতে ছাত্রের অভিভাবক ও সরকার অক্ষম হলে, শিক্ষা জগতে নেমে আসবে বিরাট অভিশাপ। আমাদের দেশের শিক্ষা ও শিক্ষাঙ্গণকে বাণিজ্যিকীকরণ, মনগড়া পাঠ্যসূচীর কারণে বিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষে শিক্ষক ও ছাত্রের অমনস্কতা, সনদপত্রীয় কৃত্রিম মোহে পরীক্ষার ক্ষেত্রে দূর্নীতি, রাজনীতি বণিকদের উস্‌কে দেয়া ছাত্র রাজনীতির নামে নৈরাজ্য, ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে পারস্পরিক দায়িত্ববোধ ও শ্রদ্ধা গৌরবহীনতা, মেধার বিকাশ হীনতা ইত্যাদি সবকিছুর জন্য দায়ী উপরোক্ত উদাসীনতা আর অবহেলা। আদর্শ শিক্ষক কখনো অর্থলোভী, ভোগ-লিপ্সু হতে পারেন না। ঝরসঢ়ষব ষরারহম যরময :যরহশরহম এই মনোবৃত্তিই হয় আদর্শ শিক্ষকের জীবনের অলংকার। কিন্তু, আমাদের চারিপাশে বিজ্ঞানের অবদান, আর ভোগ লুলুপ অজ্ঞানের বাড়াবাড়িতে, সেই ভোগ-লিপ্সা অজগরের শ্বাসের মতো ছাত্র-শিক্ষক পরম্পরা আমাদের বিবেক-বুদ্ধিকে আজ যেভাবে নিত্য গ্রাস করে চলেছে, সেখানে একজন আদর্শ শিক্ষক স্বীয় পরিবারের ক্রমবর্ধমান ভোগ-চাহিদার চাপের মুখে, কতক্ষণ স্থির থাকতে পারেন। কান টানলেই মাথা নোয়াতে হয়। ফলে ভোগ তান্ত্রিক অত্যাধুনিকতার এই রাক্ষুসী পরিবেশে, উপরোক্ত ইংরেজী উপদেশ বাক্যটি ধুলায় লুণ্ঠিত হতে বাধ্য। ভোগলিপ্সু অক্‌টোপাশের সহস্র বাহুতে আবদ্ধ আজকের বস্তু-তান্ত্রিক বিশ্বমানব সভ্যতায়, জীবন সমস্যা নানা দেশে নানা ভাবে দিন দিন তীব্র অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। কী ধনী রাষ্ট্র, কী গরীব রাষ্ট্র, সর্বত্রই সুখ-শান্তি নামক অনুভূতিগুলো মরুভূমিতে জলের তরঙ্গবৎ মরিচীকাই যেন হয়ে উঠেছে।
এক দিকে অন্ধ আবেগ নির্ভর কাল্পনিক ধর্ম, অপরদিকে তৃষ্ণার্ত ঘোর বস্তুতান্ত্রিক আশাবাদী বৈজ্ঞানিক মতবাদ, এ দুই চরমের মধ্যবর্তী হলো বুদ্ধ শিক্ষা ও বুদ্ধের দর্শন। জীবন ও জগতের ভেতরে বাইরে অবিরাম পরিবর্তনের প্রতি সচেতন না থেকে, মৃত্যু বা ধ্বংস নামক অনিবার্য পরিণতিতেই কেবল আমরা ভীত, সন্ত্রস্থ থাকি। তাই মানব মনে কেবল একটি জিনিসই বার বার প্রতিধ্বনিত হয়, আমি সুখ চাই, আমি শান্তি চাই নিরাপত্তা চাই, সমৃদ্ধি চাই। বুদ্ধ বলেন সব কিছুই যেহেতু অনিত্য, সেখানে সুখ ও শান্তি নামক বিষয়গুলোও তো নিত্য নহে, চির শাশ্বত নহে। তাই সুখ-দুঃখ দিবা রাত্রির ন্যায় আসবে আর যাবে। এই অনিত্যধর্মী সুখ-শান্তি এবং দুঃখ যন্ত্রণার প্রতি স্বীয় চিত্তে সর্বদা আসক্তি-বিরক্তিহীন অনাসক্ত নিরপেক্ষ ভাব-গঠন করতে পারার মধ্যেই লুকানো আছে নৈর্বাণিক শান্তি ও সুখের চির স্থায়িত্বের গ্যারান্টি।
বুদ্ধ অনুরাগী একজন ছাত্র বুদ্ধের এই দর্শন ও শিক্ষাকে স্বীয় জীবনে ও মনে দৃঢ়ভাবে আয়ত্ব করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে, তার ব্যবহারিক শিক্ষা জীবনের পাশাপাশি। অর্থাৎ তাকে বাহ্যিক ও আধ্যাত্মিক উভয় শিক্ষায় সমানভাবে দক্ষতা অর্জন করতে হবে। এই দক্ষতা অর্জনের পথে নিম্নোক্ত বুদ্ধ শিক্ষা সমূহকে অনুশীলন পূর্বক জীবনে আয়ত্ব করতে হবে তাকে। তার আনুক্রমিকতা হবে নিম্নরূপ :
১. বুদ্ধ অনুরাগী ছাত্রকে অদৃশ্য শক্তি বা কাল্পনিক ঈশ্বরবাদীতা নামক বিশ্বাস ত্যাগ করতে হবে। কারণ এই কাল্পনিক যুক্তিবাদ মানুষকে পরমত অসহিষ্ণুতা, অন্ধ গোঁড়ামীতা, যুক্তিহীন উগ্র আবেগ প্রবণতা, প্রবল সামপ্রদায়িকতা এবং অদৃষ্ট লিপি বা ভাগ্যবাদীতার শিকার করে। আমার দ্বারা অন্যের সাথে যে সকল বাক্যালাপ হয়, যে সকল কাজ আমি নিত্য সম্পাদন করি, প্রতিমুহূর্তে যে সকল চিন্তা, পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ আমাকে নিজস্ব বিবেক বুদ্ধি দিয়েই নিতে হয়; আর এসব কিছুর ভিত্তিতেই যেখানে জীবনের সাফল্য-অসাফল্য, উন্নতি-বিপর্যয়, সুখ-দুঃখ, সৃষ্টি হচ্ছে; ঈশ্বরবাদিতা সেখানে এই নিরেট বাস্তব সত্যকে চরম অবজ্ঞা করতে শেখায়। শান্ত মন এবং নিরপেক্ষ বিচার মানসিকতার অভাবে, উপরোক্ত কারণগুলোর গভীরে যেতে না পেরে, আমরা চর্মচোখে, চর্মকানে প্রভাবিত হয়ে বাইরের কোন না কোন ব্যক্তি বা বিষয়কে আমরা তাই দায়ী করে বসি। এই মহাভ্রান্তি হতে জন্ম নেয় পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ-ঈর্ষা, ঝগ্‌ড়া, মারা-মারি, দলাদলি, অবিশ্বাস, অন্ধ প্রেম, স্নেহ, স্বার্থপরতা, চুরি-ডাকাতি, ঘুষ-দুর্নীতি-এ সকল মহা পাপের। আর এই পাপই আমার এবং আমার সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের দুঃখ, ভোগান্তি ও যাবতীয় অশান্তির কারণ হচ্ছে। বুদ্ধ অনুরাগী একজন ছাত্র এভাবে সম্যক দৃষ্টি সম্পন্ন এবং দৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে আপন সুখ-দুঃখের জন্যে কখনো অন্যকে দায়ী করেন না। তিনি আপন পর যাবতীয় সুখ-দুঃখের জন্যে স্বকর্মকেই দায়ী করেন। সেই ছাত্র যখনই কোন অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হবেন, তখন তার কর্ম স্বকীয়তা জ্ঞান, এই অসাধারণ আত্মবিশ্বাস তাকে হঠাৎ উত্তেজিত হওয়ার আবেগ প্রবণতাকে মুহূর্তের মধ্যেই উদাও করে দেবে। তখন তিনি ধীর-শান্ত ও অকম্পিত নির্ভিক চিত্তে, সেই বিপদ বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবেলায় আশ্চর্য অসীম শক্তি সাহস লাভ করেন, আপন দেহ-মনে।
চঞ্চল অস্থিরতার কারণে জীবনে কোন কোন ঘটনায় বিস্মৃতির জন্ম হয়। আবার কোন কোন সময় ঘটনাটির উদ্ভবের কারণ অনুসন্ধানের গভীরে যাওয়ার মতো মানসিক ভারসাম্যতাও থাকে না। ফলে উপস্থিত যে ব্যক্তির দ্বারা তা ঘটলো, আমাদের স্থূল বুদ্ধি তাকেই সরাসরি চিহ্নিত করি, দায়ী করি। বুদ্ধের শিক্ষা ও উপদেশ হলো, এ মতো পরিস্থিতিতে স্বীয় চিত্তকে, ঘটনাটি সম্পর্কে হুট করে, হাঁ বা না-এমন কোন পক্ষ অবলম্বন করতে না দিয়ে আপাতঃ নিরপেক্ষ ভাব দ্বারা মনের ভারসাম্য বজায় রাখা। এতে প্রাথমিক উত্তেজনার ভাব প্রশমিত হয়ে যাবে। এই প্রশমিত চিত্তে উদ্ভূত ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের গভীরে যাওয়া সম্ভব হয়। এই প্রক্রিয়া মানব মনে সুক্ষ্ম বিচার বিশ্লেষণী ক্ষমতা, জ্ঞান এবং প্রজ্ঞা উৎপত্তির প্রধান সহায় হয়। এই প্রক্রিয়া একজন মেধাহীন ছাত্রকেও পরবর্তীতে অসাধারণ মেধাবী ছাত্রে পরিণত করে, একজন সাধারণ ব্যক্তিকে দক্ষ ও দূরদর্শী নায়কত্ব গুণের অধিকারী করে।
২. উপরোক্ত কর্ম স্বকীয়তাজ্ঞান এবং সম্যক দৃষ্টি শক্তি উৎপত্তির প্রধান উৎস হলো দেহে ও মনে সংযমতা সাধন। এই সংযমতায় কিছু নীতির অনুশীলন একান্ত অপরিহার্য। ছাত্র-ছাত্রীর জীবনে একে বলা হয় ব্রহ্মচর্য ব্রত। এই ব্রত গ্রহণ না করলে শিক্ষার্থী জীবন কখনো পরিপূর্ণ বিকাশের শক্তি লাভ করতে পারে না। জ্ঞান অর্জনের প্রচেষ্টা যেহেতু তপস্যার নামান্তর, তাই ব্রহ্মচর্য ব্রত গ্রহণ ছাড়া কোন তপস্যায় সিদ্ধি লাভ একান্ত অসম্ভব। অতএব ছাত্র-ছাত্রীকে তাদের জ্ঞান-সাধনার এই পর্বে অবশ্যই নিম্নোক্ত আটটি সংযম ব্রত, স্থান-কাল-পাত্র বিচার বিবেচনায় পালন করতে হবে। যথা :
(ক) কোন জনের প্রতি হিংসা, ঈর্ষা, বিদ্বেষ চিত্ত, আঘাত ও হত্যা চিত্ত উৎপন্ন না করে সর্বদা মৈত্রী ও ক্ষমা চিত্ত পোষণ করা।
(খ) অন্যের দ্রব্যের প্রতি লোভ-চিত্ত, চুরি চিত্ত উৎপন্ন না করে স্বলব্ধ শ্রমদ্বারা উৎপন্ন বস্তুতে সন্তুষ্ট থাকা। নিজে কম ভোগ করে, অন্যকে দানের ইচ্ছা বলবতী রাখা। বিশেষ প্রয়োজনে আগে বা পরে অনুমতি গ্রহণ অথবা ফেরত দানের চেতনায় কারো দ্রব্য গ্রহণ করা।
(গ) এই দেহ স্ত্রীর হউক বা পুরুষের হউক, একই উপাদান মাটি, জল, বায়ু, তাপ এই চারিটি পদার্থ দ্বারা সৃষ্ট। চামড়া, মাংস, স্নায়ু, অস্থি, রক্ত, মল, মূত্র, ঘর্ম, কফ, থুথু, সিকনি-ইত্যাদি পঁচনশীল দুর্গন্ধময় ঘৃণিত বস্তু দ্বারা এই দেহ গঠিত। এভাবে স্বদেহ ও পরদেহের প্রতিনিয়ত অনাসক্ত ভাবকে লালন করতে হবে। এবং সাথে সাথে ভাবতে হবে- এই দেহ এক ভয়ঙ্কর মহাশত্রু। ইহার কারণেই নানাজনের নিকট থেকে নানা নিন্দা, আক্রোশ, আক্রমণ, মরণভীতি উৎপন্ন হচ্ছে। শারীরিক ও মানসিক অশান্তির এবং ক্ষুধা, তৃষ্ণা, রোগ, শোক ও শীত গ্রীষ্মাদি উপদ্রবের শিকার হই দেহ নামক, মহাশত্রুটির কারণেই। তাই এমন মহা দুঃখ পূর্ণ দেহের প্রতি, নারী-পুরুষ ইত্যাদি কাল্পনিক ধারণায়; তৃষ্ণা, আসক্তি ও মোহগ্রস্থ হয়ে জলন্ত দুঃখকে মহা সুখ মনে করা কি জ্ঞানের পরিচায়ক? ছাত্র জীবনে এইডস নামক মরণ ব্যাধির গ্রাস থেকে আত্মরক্ষার্থে নিয়ত এই বিজ্ঞোচিত ভাবনা দ্বারা নিজদেহ ও পরদেহের প্রতি আসক্তি বর্জন করা।
(ঘ) সজ্ঞানে এমনকি হাসি তামাসা বশে হলেও মিথ্যা বাক্য, কর্কশ বাক্য, ভেদ সৃষ্টিকারী বাক্য, অর্থহীন বাজে আলাপ-ইত্যাদি সম্পূর্ণ বর্জন করে সর্বদা সত্য, ন্যায়ী অর্থপুর্ণ যুক্তিবাদী, মিলনবাদী ও প্রিয়-মধুরভাষী হওয়া একান্ত প্রয়োজন।
(ঙ) যে কোন উগ্র নেশা জাতীয় দ্রব্য; যেমন- মদ, গাজা, ভাঙ, হিরোইন, ফেন্সিডিল, সুরা-ইত্যাদি সেবনকে মরণ বিষ জ্ঞানে সম্পূর্ণ বর্জন করা। এমনকি পান, চা, সিগারেট জাতীয় দ্রব্য-যা ক্ষুধা-তৃষ্ণা নিবারণের সহায়ক না হয়ে, নানা জটিল ব্যধির জন্ম দেয় এবং ব্যয় বাহুল্যতা বৃদ্ধির কারণ হয়; তেমন মৃদু নেশা জাতীয় দ্রব্যও সম্পূর্ণরূপে বর্জন করা।
(চ) নাচ, গান, বাদ্য-বাজনা ইত্যাদিতে অতিরিক্ত সময় ব্যয় না করে, শুধু মাত্র মনোরঞ্জন, চিত্ত বিনোদন মূলক গান-বাজনা, যা স্বীয় কৃষ্টি সংস্কৃতির বিকাশ, রক্ষা ও সৎ আদর্শের প্রচারের মাধ্যম তাই কেবল শিক্ষা করা।
(ছ) ভোগ লিপ্সা, কাম মাদকতা উৎপাদনকারী ব্যয় বহুল দ্রব্য; যেমন-স্বর্ণালংকার, পরিধেয় বস্ত্রের নগ্ন ফ্যাশন বর্জনকারী হওয়া। এবং
(জ) আয়-ব্যয়ে মাত্রাজ্ঞান সম্পন্ন হওয়া।

এই আটটি সংযমতা অনুশীলন সমৃদ্ধ ছাত্র জীবন, তার পরবর্তী সমগ্র জীবনকে কেমনতরো নিশ্চিত সুখী ও সমৃদ্ধশালী করে তুলতে সক্ষম, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ছাত্র জীবনে অধ্যয়নের সাথে একাত্ম করে এই সংযম সাধনাটি বজায় রাখলে, কোন ছাত্র মুখস' বিদ্যায় বিশেষ কৃতিত্ব প্রদর্শন করতে না পারলেও তার শান্ত সংযত আচরণ ও গম্ভীর চরিত্রের দেবোপম মাধুর্য, অনায়াসে জয় করতে পারে সকলের হৃদয়। ফলে তার ছাত্র জীবনের সাধনা হয় সার্থক ও সফল। এমন ছাত্র পরবর্তী জীবনে অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান চিকিৎসা ইত্যাদি অনিবার্য প্রয়োজনের অভাবে যেমন কোনদিন কষ্ট পায় না; তেমনি সংসারজীবী হলে স্বামী-স্ত্রী-পুত্র-কন্যা, মাতা-পিতা, ভাই-বন্ধু, জ্ঞাতী-স্বজনদের নিয়েও কোন প্রকার শারিরীক-মানসিক কষ্টে পতিত হতে হয় না; যদি না তার অতীতের অলঙ্ঘনীয় কোন দুষ্কর্মের বিপাক না থাকে।
উপরোক্ত আদর্শে বুদ্ধ অনুরাগী ছাত্রের জন্মদানে শিক্ষক ও শিক্ষালয়ের ভূমিকা যেমন অনন্য; একইভাবে মাতা-পিতা, নিকট জ্ঞাতী ও নিকট প্রতিবেশীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও অনস্বীকার্য। কারণ শিশুদের শৈশব ও কৈশোরে সহজাত প্রাথমিক বিদ্যালয় হলো পরিবার ও প্রতিবেশী। বিশেষ করে আদর্শ ও সচেতন মাতা-পিতার সজাগ অনুশাসন অর্থাৎ সন্তান গড়ার কৌশলে দক্ষ ও পারদর্শী হওয়াকে এক্ষেত্রে সার্থক মাতৃত্ব-পিতৃত্ব বলে। যে সকল মাতা-পিতা সন্তান গড়ার মনস্তাত্ত্বিক প্রয়োগ বিধিতে পারদর্শী, তাঁদের সন্তান কখনো মাতা-পিতার আশানুরূপ না হয়ে পারে না। তাই সন্তানের জনক-জননী হওয়ার আগে উপরোক্ত দক্ষতা অর্জনে সংসারগামী প্রত্যেক নারী-পুরুষকে অবশ্যই স্বতঃস্ফূর্ত, স্বশিক্ষিত অথবা প্রতিষ্ঠান ভিত্তিক শিশু মানোবিজ্ঞানের উপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ একান্ত কর্তব্য। এই প্রশিক্ষণ গ্রহণে মাতা-পিতাকে উৎসাহিত করতে হলে তাদের সামনে কৃতি সন্তানের মাতা-পিতাকে আচার্য গুরুদেবের ন্যায় সামাজিকভাবে সম্মানিত করতে হবে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে। তাঁদের সন্তানের জন্যে, যে ত্যাগ তিতিক্ষা তাঁরা বরণ করেছেন; মুক্ত মনে সকলকে তার প্রশংসা করতে হবে-
১. সন্তানকে ধার্মিক রূপে গড়ে তোলার জন্যে প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় বিহারে নিয়ে গিয়ে পুষ্প, প্রদীপ, সুগন্ধ দ্রব্যাদি দিয়ে বুদ্ধ পূজা, বন্দনা, শীলগ্রহণ ও ভিক্ষুদের খাদ্য ভোজ্যাদি দান দেয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে; ২. সপ্তাহের ছুটির দিনে ধর্মীয় আচার ব্যবহারাদি শিক্ষা গ্রহণে শিশুকে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে। ৩. মাতা-পিতারা শিশু বা সন্তানদের সামনে মিথ্যা, কর্কশ বাক্য, সমপ্রলাপ বাক্য না বলে; চুরি না করে, ব্যাভিচারী না করে; হিংসা, ক্রোধ দ্বন্দ্ব, কলহ, প্রাণী হত্যা না করে; নেশা জাতীয় যাবতীয় দ্রব্য বর্জন করে; সর্বদা সংযমী, মিতব্যয়ী, প্রিয় মধুর ভাষী হয়ে; সন্তানদেরকেও সেভাবে সংযমতায় অভ্যস্ত করে তুলতে হবে; ৪. নিজেরা ভোরে ৪টায় ঘুম থেকে উঠে, ধ্যান বন্দনায় যেমন তৎপর হতে হবে; তেমনি সন্তানদেরও জাগ্রত করায়ে ধ্যান-বন্দনার পর অধ্যয়নে নিয়োজিত করতে হবে। ৫. রাত ১০টার পরে কেহই জেগে না থেকে, সকলে একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়ার অভ্যাস গঠন করতে হবে; ৬. ভোরে খালি পেটে এক লিটারের অধিক জল পানের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে; ৭. ভোরে কিছুক্ষণ যোগব্যায়ামের অভ্যাস করতে হবে; ৮. নির্দিষ্ট স্থানে পায়খানা-প্রস্রাব, কফ, থুথু ফেলার অভ্যাস করতে হবে; ৯. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন বস্ত্র ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে; ১০. পরিষ্কার, নির্দোষ লঘু পাচ্য খাদ্য গ্রহণ, বাজারে, পথের ধারে, স্কুলে, যখন তখন খাদ্য গ্রহণ হতে বিরত রাখার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে, এবং ১১. পারিবারিক কাজে দায়িত্ব জ্ঞান, নিয়মিত দৈনিক রুটিন মেনে চলার অভ্যাস, সন্তানদের জীবনে শৈশব হতে গড়ে তোলা। এ সকলই হলো সার্থক মাতা-পিতার আদর্শ-ব্রত। সামাজিক সভা, অনুষ্ঠানাদিতে এভাবে সন্তান গঠনে উৎসাহী মাতা-পিতার; এই আদর্শ এই ত্যাগ-তিতিক্ষারই প্রশংসা করতে হবে। ফলে অন্যান্য মাতা-পিতারাও এতে উদ্বুদ্ধ হবেন, উৎসাহিত হবেন।
উপরোক্ত ভাবে জীবন গঠনে সার্থক মাতা-পিতার প্রতি বিনীত, গৌরবশীল সন্তানদেরকে পুরস্কৃত করার জন্যে, বৎসরে এক বা দুইবার পূর্ণিমাদি অনুষ্ঠান উপলক্ষে পুরস্কার বিতরণী সভার আয়োজন করা; সমাজ নেতৃত্ব ও সভা-সংগঠনাদির নৈতিক দায়-দায়িত্বের অঙ্গ।
তাই অধ্যয়নের পাশাপাশি কলেজগামী ছাত্র-ছাত্রীগণের দায়িত্ব হবে তাদের মেধা ও স্মৃতি শক্তির বিকাশে নিয়মিতভাবে সকালে ও বিকালে আধঘন্টা বা একঘন্টা ধ্যান অনুশীলন করা এবং সপ্তাহের ছুটির দিনে প্রাথমিক হতে মাধ্যমিক পর্বের ছাত্র-ছাত্রীদেরকে অবৈতনিকভাবে দুই তিন ঘন্টা কোচিং জাতীয় শিক্ষা দান এবং স্ব-স্ব এলাকার গ্রামে মহল্লায় সেবা, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদির উপর প্রশিক্ষণ গ্রহণের ব্যবস্থা করা। এ সকল কাজে সর্বদা ব্যয় বাহুল্যতা বর্জন করে, মহল্লা বা গ্রামীণ পর্যায়ে চাঁদা সংগ্রহের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করা।
মনে রাখতে হবে আজকে যেজন আদর্শ ছাত্র, আগামীতে সেই হবে আদর্শ শিক্ষক, আদর্শ মাতা-পিতা, আদর্শ সমাজকর্মী ও আদর্শ জাতীয় নেতৃত্ব। তেমন ছাত্রের দ্বারাই জন্ম নেবে একটি আদর্শ পরিবার, আদর্শ সমাজ ও আদর্শ রাষ্ট্রের ভিত্তি। এই মহনীয় জীবন অর্জনে সকল ছাত্র-ছাত্রীরাই বুদ্ধ অনুরাগী হোক-এই কামনা রইলো বর্তমান ও অনাগত ছাত্র সমাজের প্রতি।
সাধু! সাধু! সাধু!

Sunday, April 2, 2017

চিত্ত ঠিক করে, মনে লয়

চিত্ত ঠিক করে, মনে লয়
-----ভদন্ত প্রজ্ঞাবংশ মহাথেরোর


শ্রদ্ধেয় বনভন্তে বলেন, মিলা-মরদ (মেয়ে ও পুরুষ) একে অন্যকে প্রথমে চিত্তে ঠিক করে, পরে মনটি লয়। এ সময়ে মেয়ে ও পুরুষ উভয়ে থাকে বাইরে পঞ্চ-স্কন্ধ (দেহ ও মন) রূপে। তখন তারা চক্ষু দ্বারা একে অন্যকে চিন্তার স্তরে নিয়ে যায়। এখানে চিত্ত চিন্তা শুরু করে এইভাবে- মেয়েটি ভাবে এই পুরুষটি যুবক, সে সুন্দর সুঠাম স্বাসে'্যর অধিকারী, তার চোখ এমন, চোখের ভ্রু এমন, নাক এমন, কান এমন, কপাল এমন, চুল এমন, ওষ্ঠ এমন, দাঁত এমন, মুখ মন্ডল এমন, গলা এমন, স্কন্ধ এমন, বক্ষ এমন, কোমর এমন, বাহুদ্বয় এমন, উরুদ্বয় এমন, জঙ্ঘা এমন, পদদ্বয় এমন, হাতের আঙ্গুল এমন, পায়ের আঙ্গুল এমন। এভাবে যুবকের দৃশ্যমান সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে মেয়েটির চোখ ও চিত্ত গো গ্রাসে গ্রহণ করে। অতঃপর তার মনোযোগ আকর্ষণার্থে নারী সুলভ ছলা-কলা প্রদর্শনে রত হয়। যুবকটির চিত্তও যখন একই ভাবে মেয়েটির সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গুণাগুণ বিচারে নিয়োজিত হয়, তখন পছন্দ হলে মন রাজি হয়, মেয়েটিকে দৈহিকভাবে কাছে পাওয়ার। দৈহিকভাবে কাছে পাওয়ার জন্যে তখন সে উপায় সন্ধান করে, চেষ্টা চালায়। মানব মনের এই চেষ্টাকে বনভন্তে বলেন বন্দুক মারামারী। এই বন্দুক মারামারীও চলে দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অঙ্গ-ভঙ্গি দিয়ে। মুখের হাসি, চোখের ইশারা, মুখে হাই তোলা, ঘাঁড় বাকানো, হাতের আঙ্গুল দিয়ে মুখ খোঁচানো, গালে হাত বুলানো, বক্ষ প্রদর্শন, প্রেম নিবেদন মূলক ফিল্মী গান গাওয়া-ইত্যাদি নানা উপায়ে।
মেয়েটির মনও যদি যুবকটিকে পছন্দ করে, তখন তাকে পাওয়ার জন্য উপরোক্ত অঙ্গ-ভঙ্গিসহ চুল দোলানো, কপালের উপর ইচ্ছাকৃতভাবে নিয়ে আসা চুল বার বার সরানো। স্তন্যদ্বয়ের গোড়া দেখা যায় মতো অন্তর্বাস (বেলাউজ) পরিধান করা, ঘাড় থেকে পেছনে বেশী কিছু অংশ দেখা যায় মতো অন্তর্বাস পরিধান করা, বক্ষের বস্ত্র ঘন ঘন ফেলে দিয়ে স্তন্যের আকার প্রদর্শন করা, যুবককে দেখলে এক পলক দেখে নিয়ে মাথা নীচু করা, মাটি আচড়ানো, হাঁটার সময়ে পাছা ভাগ দোলানো সহ আরো অনেক প্রকার মেয়েলী স্বভাব পরিদর্শনে রত হয়।
এভাবে পরস্পরে একে অন্যকে আকর্ষণে এক একজন হয়ে উঠে উপন্যাস ফিল্ম এর নায়ক নায়িকা এমন পরিস্থিতিকেই শ্রদ্ধেয় বনভন্তে বলেন, তখন নারী-পুরুষ একে অন্যকে মারে ষ্টেনগান; মনে মনে দৈহিক মিলন ঘটালে মারে ব্রেনগান; বাস্তবে দৈহিক মিলন হলে মারে মেশিনগান। এই মারামারীই তোমাকে লজ্জা দেবে, পোড়া দেবে, ফেলে যাবে। ইহা পাপ, দুঃখ, মিথ্যা ও অসার। এই পাপ, দুঃখ, মিথ্যা ও অসারত্ব হতে মুক্তি লাভ করতে চাইলে, তোমাদেরকে অবশ্যই বন্দুক মারামারী বন্ধ করতে হবে। বল, বন্দুক মারামারী বন্ধ করতে তোমাদের সাধ্য আছে কি নাই? বল, তোমাদের সাধ্যে কুলায় কি, কুলায় না? না কুলালে বন্দুক মারামারী করতেই হবে।
বাস্তবে আমাদের মা-বাবা, নিকট আত্মীয়রাও নির্লজ্জভাবে, একান্ত অন্ধভাবে আমাদেরকে এই বন্দুক মারামারীতে লাগিয়ে দিতে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ করে থাকে। কারণ, তারা নিজেরাও এই বন্দুক মারামারীকে পছন্দ করে। তারাও এই মারামারীতে লিপ্ত। এ যেন মদের নেশা। মদখোর যেভাবে অন্যজনকেও মদপানে উৎসাহিত করে। মদখোর যেমন মাদকতা, মত্ততাকে তারা সুখ মনে করে, এই মা-বাবা রূপ মাতালেরাও আপন পুত্র-কন্যাদেরকে মাতাল বানানোকে নিজ কর্তব্য মনে করে। পুত্র, কন্যার কামাচারকে তারা পছন্দ করে, সুখ মনে করে। এ এক আশ্চর্য পাশবিক আচরণ।
নারী-পুরুষের এই কামনেশা আশ্চর্যজনক ভাবে এমন গভীর যে, একটি সন্তানকে জন্মদানের পর থেকে দিবা-রাত্র তাকে নিয়ে চিন্তা, উৎকন্ঠা, ব্যস্ততা ও দায়-দায়িত্ব এসব উপদ্রবকে কোন অবস্থাতেই দুঃখ বলে তারা ভাবতে পারে না। শুধু তা-ই নহে, দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর, সন্তান পালনের উপদ্রবকে বরঞ্চ নিজেদের দায়-দায়িত্ব বলেই তারা ধরে নেয়। কখনো তাকে দুঃখ বলে সত্যিকার ভাবে তারা বিশ্বাস করে না। নারী-পুরুষের এই মোহ, এই মাতালভাব তাই তাকে একটির পর একটি সন্তান লাভে উদ্বুদ্ধ করে। কখনো পরিণাম চিন্তা করার সুযোগটুকুও দেয় না।
বনভন্তের শিষ্যপ্রধান শ্রদ্ধেয় প্রজ্ঞালঙ্কার মহাথেরো।

অজ্ঞতার মোহে মোহিত হয়ে আসক্তি-তৃষ্ণার লতা, তখন দিনে দিনে অবিরাম, অবিচ্ছিন্নভাবে কেবল বাড়তেই থাকে। এক একটি সন্তানকে ঘিরে মা-বাবা নামক মোহগ্রস্তরা কত স্বপ্ন, কত আশা-আকাঙ্খার জাল বুনে তার সীমা নেই। এই জালের পরিধি যতই বাড়ে, কর্ম বন্ধনের গিটও ততই বাড়ে। এই গিট্‌ একদিন ছিঁড়ে, এই জাল একদিন ছিঁড়ে, ইঁদুরে একদিন কাটে কখন? যখন রোগাক্রান্ত হয়ে শিশুটি পঙ্গু হয়; কিশোর সন্তান যখন জলে ডুবে, গাড়ী চাপায় মরে; যুবক সন্তান যখন নেশাসক্ত হয়ে চুরি, ডাকাতি, হত্যা, রাহাজানিতে লিপ্ত হয়ে, বিয়ে দেয়ার পরে, পুত্র যদি অন্ধভাবে স্ত্রীর বশীভূত হয়ে পড়ে কন্যা যদি মা-বাবার অমনোপুত ছেলের সাথে পালিয়ে যায়। এতে বাবা-মা মনস্তাপ, হা-হুতাশ করে; চোখের জল ফেলে, বুক-ফাটা কান্নায় গড়াগড়ি দেয়; সন্তানের উপর নির্ভর বৃদ্ধ পিতা-মাতা সন্তানকে হারিয়ে স্বামী স্ত্রীকে, স্ত্রী স্বামীকে হারিয়ে বুক ভেঙ্গে যায়; দু’চোখে অন্ধকার দেখে; তখনো কি তারা দুঃখকে সত্যিকারভাবে বুঝে? না, বুঝে না। এই বুঝে না বলেই তারা এত দুঃখ, এত বেদনা, এত মনস্তাপে জ্বলে পুড়ে ছাঁই হয়ে গেলেও অল্প দিনের ব্যবধানেই মিথ্যা আশার মায়া-মরিচিকায় আস্তে আস্তে সব ভুলে যায়। তাই তারা আবার নিত্য-নব আশা-আকাঙ্খার জাল বুনে, স্বপ্ন দেখে। একেই বলে সংসার।
================