বুদ্ধ দর্শনে মনোজগত : অনুশীলন অভিজ্ঞা
-----ভদন্ত প্রজ্ঞাবংশ মহাথেরোর
মানব সভ্যতার ঊষালগ্ন হতে বিশ্বের দার্শনিকদের এক বিশাল এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এই সভ্যতার জন্ম দান, নিয়ন্ত্রণ এবং ক্রমিক উকর্ষতা দানে। আমি কে? আমার চারপাশে দু’নয়নে যা দেখতে পাচ্ছি, এ গুলো কোত্থেকে এলো, কার সৃষ্টি? মাত্র এ দুই কৌতূহলদীপ্ত প্রশ্ন থেকেই মানব সভ্যতার জন্ম আধ্যাত্মিকভাবে। আর জীবন ধারণের প্রতিকূূলতা জাত অস্বসিত্মবোধ থেকেই জন্ম নিল মানবের বস্তুগত সভ্যতা। অনস্বীকার্য যে, উভয় সভ্যতার জন্মের কেন্দ্র বিন্দু হলো ‘মন’। দার্শনিকদের দর্শন জগত বলতে, এই মনকে নিয়ে যাবতীয় কর্মকাণ্ডকে বুঝায়। এই দর্শন জগত তার বিশাল ব্যাপকতার কারণে বর্তমান বিশ্বে তা এখন তিনটি প্রধান শাখায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে- ধর্ম, দর্শন ও বিজ্ঞান এই তিন নামে। ‘মন’ রয়ে গেছে সকলের কেন্দ্র বিন্দুতে। এই ‘মন’ নিয়ে এ বিশ্বে যারা কিছু চিন্তা-ভাবনা করেছেন, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন, দৈনন্দিন জীবনে তার গতি-প্রকৃতি নির্ণয়ের চেষ্টা করেছেন এবং মৃত্যুকালে ও মৃত্যুর পরে এই মনের অবস্থা ও অবস্থান নির্ণয়ের চেষ্টা করেছেন; তাঁদের মধ্যে মানবপুত্র বুদ্ধের স্থান এভারেস্ট শৃঙ্গ সদৃশ এবং তাঁর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত মধ্যাহ্ন সূর্যের ন্যায় স্পষ্ট ও দীপ্তিমান। মহান বুদ্ধের দীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ বছরের বুদ্ধ জ্ঞান জাত ভাষণ ও যাবতীয় কর্মকাণ্ডকে ‘ত্রিপিটক’ নামে গ্রন্থাকারে ধারণ করা হয়েছে। এই মহান ত্রিপিটকের তিনটি প্রধান খণ্ডের একটি হলো- ‘অভিধর্ম পিটক’। অপর দুই খণ্ড হলো সূত্র পিটক ও বিনয় পিটক। এ দুই পিটকের বিষয়াবলীতে মন ও মননের অনেক উপাদান বিধৃত থাকলেও অভিধর্ম পিটকের সব কিছুই এই মন ও তার গতি-প্রকৃতির উপর ব্যাপক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নিয়েই সমৃদ্ধ। শুনতে অবাক লাগে, মহান বুদ্ধের পঁয়তাল্লিশ বছরের সমগ্র বাণীকে সংখ্যা গণনায় চুরাশি হাজার বলে নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলোর প্রত্যেকটিকে এক একটি ধর্মস্কন্ধ বলা হয়েছে। আর এই চুরাশি হাজার ধর্মস্কন্ধের মধ্যে শুধু অভিধর্ম পিটকের ভাগে পড়েছে অর্ধেক; বিয়াল্লিশ হাজার।
সেই অভিধর্মের ব্যাখ্যা মতে পঞ্চস্কন্ধ তথা এই দেহ ও মনের বিভাজন প্রক্রিয়াতে উপস্থাপিত ক্রম হলো- রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান। এই পাঁচটি ক্রমকে এক বাক্যে ‘পঞ্চস্কন্ধ’ বলা হয়। এখানে ‘রূপ’ বলতে এই দেহ সহ দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান এই বিশ্বচরাচরের যাবতীয় বস্তুকে বুঝায় এবং বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান বলতে এক কথায় ‘মন’কে নির্দেশ করা হয়েছে।
অপরদিকে বুদ্ধ দর্শনের আলোকে এবং অনুপ্রেরণায় যে সকল ব্যক্তি জীবন-দুঃখের চির অবসানে একান্ত আগ্রহী তাদের বলা হয় বিদর্শন সাধক। তাঁদের অনুশীলিত উপায় বা পদ্ধতিকে বলা হয় বিদর্শন ভাবনা। এই বিদর্শন ভাবনা তথা বিশেষভাবে দর্শন বা সম্যক দর্শন প্রক্রিয়াতে ‘পঞ্চস্কন্ধ’ নামক এই দেহ ও মনের উপস্থাপন ক্রম হলো- নাম, তারপরে রূপ, তথা নামরূপ হিসেবে। ‘রূপ’কে বিভাজন, ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলা হয়েছে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের দৃশ্যমান, অদৃশ্যমান বস্তু বা বিষয় মাত্রই সব কিছুই ‘রূপ’। এই ‘রূপ’ দুই ভাগে বিভক্ত, বস্তুরূপ ও ভাবরূপ। আপন দেহ থেকে শুরু করে দৃশ্যমান সব কিছুই বস্তুরূপের অন্তর্গত; আর অদৃশ্যমান যত কিছু, যা পূর্ব অভিজ্ঞতা ও স্বীয় অনুভূতির সংযোগে মনে মনে কল্পনার আকার বা ছবির সৃষ্টি করা হয়, তার নাম ‘ভাব-রূপ’। ভাব-রূপ বহুলাংশে চক্ষু, কর্ণ জিহ্বাদি ইন্দ্রিয়ের উপর নির্ভরশীল বলে ইহাকে ‘ইন্দ্রিয়গত-রূপও বলা যায়। বস্তুগতরূপ হলো মাটি, জল, বায়ু এবং তাপ-এই চারি প্রধান উপাদানের সমষ্টিতে সৃষ্ট যাবতীয় বস্তু। আর ইন্দ্রিয়গত-রূপ বা ভাবগত রূপ হলো- চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, চর্ম ও মন-এই ছয় অনুভূতি উৎপত্তির উৎস বা ইন্দ্রিয় সমূহ।
শাস্ত্রীয় বিচারের এ সকল বিশ্লেষণ-ক্রম, আমার ব্যক্তিগত অনুশীলনের প্রাথমিক স্তরে যেভাবে ধরা দিয়েছে তা এই নিবন্ধে লিপিবদ্ধ করার ইচ্ছাটা এ জন্যেই যে, ভবিষ্যতে বুদ্ধের দর্শন রাজ্যে নবাগত কোন সাধক, গবেষককে তাঁর সাধনা-গবেষণায় তা কিঞ্চিত হলেও সাহায্য করতে পারে, এই লক্ষ্যে। বিশেষতঃ যারা বুদ্ধের বিশাল অভিধর্ম-শাস্ত্র রাজ্যে পূর্বে বিচরণ করার সুযোগ হয়নি, তাঁদের জন্যে আমার এই অভিজ্ঞতা কিঞ্চিত হলেও দিক-নির্দেশকের ভূমিকা পালন করতে পারে।
বিদর্শন শাস্ত্রীয় বিচারে ‘নাম> রূপ’ এই ক্রমটি অনুশীলনকারীগণের অভিজ্ঞতায় কিভাবে ধরা দিতে পারে সে সম্পর্কে আমার ইতিপূর্বে লিখিত নিবন্ধ ‘নাম আগে, না রূপ আগে’ এই শিরোনামে আলোচিত হয়েছে। পোমরা জ্ঞানাঙ্কুর বিহার ধ্যান কেন্দ্রের মুখপত্র ‘সমাধি’ পত্রিকায় ২০০১ সালে তা প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমান নিবন্ধে শুধু ‘নামুস্কন্ধের’ উৎপত্তি ও তার গতি প্রকৃতি নিয়েই আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকবে।
‘নামস্কন্ধ’ এর শাস্ত্রীয় উৎপত্তিক্রম হলো- বেদনা সংজ্ঞা> সংস্কার> বিজ্ঞান। বিদর্শন স্মৃতি অনুশীলন ক্ষেত্রে দেখা যায়, নাম-রূপ নামক ইহারা দু’ভাগে ভাগ হয়ে পড়ে। ষড়েন্দ্রিয়ের মধ্যে চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা এবং চর্ম এই পাঁচটি ইন্দ্রিয় হয়ে যায় প্রথম উৎপত্তি ক্রম; আর শুধু ‘মন’ ইন্দ্রিয় হয়ে পড়ে দ্বিতীয় উৎপত্তিক্রম। এক্ষেত্রে প্রথম উৎপত্তি ক্রমটি বহির্ভাগীয় এবং দ্বিতীয়টি অভ্যন্তরভাগীয়। বর্হিভাগীয় উৎপত্তি ক্রমের মধ্যে দেখা যায় বর্তমানকালীয় উপস্থিত মুহূর্তে তথা ঘটনাক্ষণে যখন যেই ইন্দ্রিয় পথে স্ব স্ব গ্রাহ্য বিষয় বস্তুর সংযোগ ঘটে, তখন তার থেকেই জন্ম নেয় ‘নাম-স্কন্ধের’ উৎপত্তি ক্রম। নিম্নোক্তভাবেই সেই উৎপত্তিক্রমটি সম্পাদিত হয়; বিজ্ঞান> সংস্কার> সংজ্ঞা> বেদনা। এই উৎপত্তিক্রমের বিশ্লেষণ ক্রম হতে পাঠক ও সাধকের বুঝে নেয়া সহজ হবে বিজ্ঞান, সংজ্ঞা, সংস্কার, বেদনা-এগুলোর পরিচয়। একটি উপমার মাধ্যমে বিষয়গুলোর উৎপত্তি ক্রম তুলে ধরা হচ্ছে-
মনে করুন, আপনার ‘চক্ষু’ ইন্দ্রিয় পথে হঠাৎ করে একটি উড়ন্ত পাখি পড়লো। এই পাখিটি আপনার চোখে পড়া মাত্রই চোখের পর্দা বা ‘লেন্স’ এর সাথে মসিত্মষ্কের সংযোগ তার নামক স্নায়ু মনো-বিজ্ঞানটিকে জাগ্রত করে বলেদিল কিছু একটা চোখে পড়েছে। সাথে সাথেই মনের দ্বিতীয় উপাদান স্মরণ শক্তি ‘সংস্কার’ বা তার পূর্ব অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার হতে সমাধান বের করে বলেদিল, যা পড়েছে, তা মানুষ নহে; পশু নহে ইহা পাখীর গোষ্ঠী ‘কাক’। সংস্কারের এই চিহ্নিত করণ বা বিচার সমাধানের নাম ‘সংজ্ঞা’। সংজ্ঞাকে বস্তুর প্রাথমিক পরিচিতি বা প্রাথমিক জ্ঞানও বলা হয়। সংজ্ঞার কাজ শেষ না হতেই, ‘বেদনা’ জাগ্রত হয়ে চক্ষুপথে পতিত এই কাকটির রস আস্বাদনে উদ্যোগী হলো, বন্ধু সংস্কারকে সাথী করে। অর্থাৎ এই কাক জাতটি ভালো নহে, চিকচিকে কালো, কন্ঠস্বর ভারী কর্কশ এবং খুবই ধূর্ত ইত্যাদি। সাধক বলুন তো, পাখি দেখা নিয়ে এই পর্যন্ত যা ঘটে গেল, কত সময় লাগলো? মোটেই না, একদম চোখের পলকে সব কর্ম শেষ। দেখুন কি অসম্ভব বিদ্যুত গতিতেই না এই ‘নাম’ তথা মনেন্দ্রিয় তার কার্য সিদ্ধিতে এত পটু, এত দক্ষ! এর সাথে পাল্লা দিতে গেলে তাই সাধকের এত হুঁশিয়ার, এত সাবধান হতে হয় যে, তার নাম হয়েছে ‘স্মৃতি সমপ্রজ্ঞান’। এই ‘স্মৃতি সমপ্রজ্ঞান’ হলো আড়াই হাজার বছরের বহু পরীক্ষিত এক অদ্বিতীয় চৌকিদার, প্রহরী। সাধক যাবত নিদ্রা না যান, তাবৎ এই প্রহরীরও বিন্দুমাত্র বিশ্রামের উপায় থাকে না। যদি দেখা যায় চৌকিদারটি, বিশ্রামের যথেষ্ট সুযোগ পাচ্ছে, তাহলে বলতে হবে সাধকের সাধনায় অগ্রগতি মোটেই হচ্ছে না।
এখন পূর্ব প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। বলেছিলাম, ‘নাম স্কন্ধের’ বেদনা তার বন্ধু সংস্কারকে নিয়ে কাকটির গুণাগুণ বিচার বা রস আস্বাদনে প্রস্থতি নিল। সাধক বলুন দেখি এই প্রস্থতির নাম কি? ইহার নাম ‘তৃষ্ণা’। এবার বলুন, কাকের সম্পর্কে বেদনা ও সংস্কার মিলে যে সব ধারণা ব্যক্ত করলো, তাতে কোন্ ধরণের ‘তৃষ্ণা’ আপনার মধ্যে জাগতে পারে? বিতৃষ্ণা বা বিরক্তি নহে কি? হ্যাঁ, এভাবেই চক্ষুর ন্যায় কর্ণ শব্দের প্রতি, নাসিকা গন্ধের প্রতি, জিহ্বা আস্বাদনের প্রতি এবং চর্ম শীত-উষ্ণ, শক্ত-কোমল-ইত্যাদি অনুভূতির প্রতি মুহূর্তে মুহূর্তে আসক্তি, বিরক্তি অথবা উপেক্ষা ভাব দ্বারা তৃষ্ণাকে জলের স্রোতের ন্যায় অবিচ্ছিন্ন গতিতে বহির্বিভাগীয় উৎপত্তি ক্রমের মাধ্যমে আলিঙ্গন করে চলেছে।
এবার তুলে ধরা যাক্ আভ্যন্তরীণ উৎপত্তি ক্রমের মধ্যে আমরা কী দেখতে পাচ্ছি। যদি সাধক বহির্ভাগীয় উৎপত্তিক্রমকে বাঁধা দিতে চোখ, কান, মুখ বন্ধ করে বসে থাকেন, তথাপি ‘মনেন্দ্রিয়’টি ঐ সব বহির্ভাগীয় ইন্দ্রিয় পাঁচটি দ্বারা পূর্বে যা রসদ সংগ্রহ করে, তার বিশাল ভাণ্ডারে ‘সংস্কার’ রূপে জমা রেখেছে, কেবল তা দিয়েও সে বহুকাল চালিয়ে দিতে পারে অনায়াসে। প্রশ্ন আসতে পারে সাধক যদি বাহির ইন্দ্রিয়গুলো বন্ধ করেন তখন আভ্যন্তরীণ উৎপত্তি ক্রমের মধ্যে ‘সংজ্ঞা’টির কোন কাজ থাকতে পারে কি? হ্যাঁ নাম-স্কন্ধের প্রত্যেকটি উপাদানের উপস্থিতি এুক্েষত্রেও অবশ্যই থাকবে। যেমন, কবি তার কক্ষে বসে দার্শনিক ধ্যানে বসে এবং বিজ্ঞানী তার গবেষণার বিষয় চিন্তায় যখন স্ব স্ব বিষয়ে আপন মনে ডুব দেন, তখন মনের কল্পনায় যেই ছবি গুলো একান্ত বাস্তব হয়ে উঠে এগুলোতে ‘সংজ্ঞার’ প্রাধান্য অবশ্যই তাকে, যদিও ‘বিজ্ঞান’টি ছাড়া বাকী চারটি উপাদানের সবকটিই বেকার বা অসিত্মত্বহীন হতে বাধ্য। অতএব, বহির্ভাগীয় উৎপত্তি ক্রম বলুন, কি অভ্যন্তর ভাগীয় মনোইন্দ্রিয়ের উৎপত্তিক্রমই বলুন, উভয় ক্ষেত্রে একই উৎপত্তিক্রম, বিজ্ঞান> সংস্কার> সংজ্ঞা> বেদনা-এই বিধির কোন ব্যতিক্রম নেই। এই বিষয়টিকে একটি উদাহরণ দ্বারা সহজ করা যেতে পারে। মনে করুন স্বপ্নে দেখলেন, আপনার বহু আকাঙ্খিত এক বন্ধু আপনার বাড়ীতে বেড়াতে এসেছেন। এক্ষেত্রে আপনি দু’টি অবস্থার সম্মুখীন হতে পারেন। এক, তাকে প্রতিদিনের দেখা প্রিয়জন হিসেবে স্বাগত জানাতে পারেন। দুই, শোক ও আনন্দাশ্রুর আবেগে তাকে বুকে জড়িয়ে স্মরণ করতে পারেন যে, এই প্রিয়জনের সাথে বহুকাল পরেই পুর্নমিলন হলো।
-----ভদন্ত প্রজ্ঞাবংশ মহাথেরোর
মানব সভ্যতার ঊষালগ্ন হতে বিশ্বের দার্শনিকদের এক বিশাল এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এই সভ্যতার জন্ম দান, নিয়ন্ত্রণ এবং ক্রমিক উকর্ষতা দানে। আমি কে? আমার চারপাশে দু’নয়নে যা দেখতে পাচ্ছি, এ গুলো কোত্থেকে এলো, কার সৃষ্টি? মাত্র এ দুই কৌতূহলদীপ্ত প্রশ্ন থেকেই মানব সভ্যতার জন্ম আধ্যাত্মিকভাবে। আর জীবন ধারণের প্রতিকূূলতা জাত অস্বসিত্মবোধ থেকেই জন্ম নিল মানবের বস্তুগত সভ্যতা। অনস্বীকার্য যে, উভয় সভ্যতার জন্মের কেন্দ্র বিন্দু হলো ‘মন’। দার্শনিকদের দর্শন জগত বলতে, এই মনকে নিয়ে যাবতীয় কর্মকাণ্ডকে বুঝায়। এই দর্শন জগত তার বিশাল ব্যাপকতার কারণে বর্তমান বিশ্বে তা এখন তিনটি প্রধান শাখায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে- ধর্ম, দর্শন ও বিজ্ঞান এই তিন নামে। ‘মন’ রয়ে গেছে সকলের কেন্দ্র বিন্দুতে। এই ‘মন’ নিয়ে এ বিশ্বে যারা কিছু চিন্তা-ভাবনা করেছেন, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন, দৈনন্দিন জীবনে তার গতি-প্রকৃতি নির্ণয়ের চেষ্টা করেছেন এবং মৃত্যুকালে ও মৃত্যুর পরে এই মনের অবস্থা ও অবস্থান নির্ণয়ের চেষ্টা করেছেন; তাঁদের মধ্যে মানবপুত্র বুদ্ধের স্থান এভারেস্ট শৃঙ্গ সদৃশ এবং তাঁর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত মধ্যাহ্ন সূর্যের ন্যায় স্পষ্ট ও দীপ্তিমান। মহান বুদ্ধের দীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ বছরের বুদ্ধ জ্ঞান জাত ভাষণ ও যাবতীয় কর্মকাণ্ডকে ‘ত্রিপিটক’ নামে গ্রন্থাকারে ধারণ করা হয়েছে। এই মহান ত্রিপিটকের তিনটি প্রধান খণ্ডের একটি হলো- ‘অভিধর্ম পিটক’। অপর দুই খণ্ড হলো সূত্র পিটক ও বিনয় পিটক। এ দুই পিটকের বিষয়াবলীতে মন ও মননের অনেক উপাদান বিধৃত থাকলেও অভিধর্ম পিটকের সব কিছুই এই মন ও তার গতি-প্রকৃতির উপর ব্যাপক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নিয়েই সমৃদ্ধ। শুনতে অবাক লাগে, মহান বুদ্ধের পঁয়তাল্লিশ বছরের সমগ্র বাণীকে সংখ্যা গণনায় চুরাশি হাজার বলে নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলোর প্রত্যেকটিকে এক একটি ধর্মস্কন্ধ বলা হয়েছে। আর এই চুরাশি হাজার ধর্মস্কন্ধের মধ্যে শুধু অভিধর্ম পিটকের ভাগে পড়েছে অর্ধেক; বিয়াল্লিশ হাজার।
সেই অভিধর্মের ব্যাখ্যা মতে পঞ্চস্কন্ধ তথা এই দেহ ও মনের বিভাজন প্রক্রিয়াতে উপস্থাপিত ক্রম হলো- রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান। এই পাঁচটি ক্রমকে এক বাক্যে ‘পঞ্চস্কন্ধ’ বলা হয়। এখানে ‘রূপ’ বলতে এই দেহ সহ দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান এই বিশ্বচরাচরের যাবতীয় বস্তুকে বুঝায় এবং বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান বলতে এক কথায় ‘মন’কে নির্দেশ করা হয়েছে।
অপরদিকে বুদ্ধ দর্শনের আলোকে এবং অনুপ্রেরণায় যে সকল ব্যক্তি জীবন-দুঃখের চির অবসানে একান্ত আগ্রহী তাদের বলা হয় বিদর্শন সাধক। তাঁদের অনুশীলিত উপায় বা পদ্ধতিকে বলা হয় বিদর্শন ভাবনা। এই বিদর্শন ভাবনা তথা বিশেষভাবে দর্শন বা সম্যক দর্শন প্রক্রিয়াতে ‘পঞ্চস্কন্ধ’ নামক এই দেহ ও মনের উপস্থাপন ক্রম হলো- নাম, তারপরে রূপ, তথা নামরূপ হিসেবে। ‘রূপ’কে বিভাজন, ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলা হয়েছে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের দৃশ্যমান, অদৃশ্যমান বস্তু বা বিষয় মাত্রই সব কিছুই ‘রূপ’। এই ‘রূপ’ দুই ভাগে বিভক্ত, বস্তুরূপ ও ভাবরূপ। আপন দেহ থেকে শুরু করে দৃশ্যমান সব কিছুই বস্তুরূপের অন্তর্গত; আর অদৃশ্যমান যত কিছু, যা পূর্ব অভিজ্ঞতা ও স্বীয় অনুভূতির সংযোগে মনে মনে কল্পনার আকার বা ছবির সৃষ্টি করা হয়, তার নাম ‘ভাব-রূপ’। ভাব-রূপ বহুলাংশে চক্ষু, কর্ণ জিহ্বাদি ইন্দ্রিয়ের উপর নির্ভরশীল বলে ইহাকে ‘ইন্দ্রিয়গত-রূপও বলা যায়। বস্তুগতরূপ হলো মাটি, জল, বায়ু এবং তাপ-এই চারি প্রধান উপাদানের সমষ্টিতে সৃষ্ট যাবতীয় বস্তু। আর ইন্দ্রিয়গত-রূপ বা ভাবগত রূপ হলো- চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, চর্ম ও মন-এই ছয় অনুভূতি উৎপত্তির উৎস বা ইন্দ্রিয় সমূহ।
শাস্ত্রীয় বিচারের এ সকল বিশ্লেষণ-ক্রম, আমার ব্যক্তিগত অনুশীলনের প্রাথমিক স্তরে যেভাবে ধরা দিয়েছে তা এই নিবন্ধে লিপিবদ্ধ করার ইচ্ছাটা এ জন্যেই যে, ভবিষ্যতে বুদ্ধের দর্শন রাজ্যে নবাগত কোন সাধক, গবেষককে তাঁর সাধনা-গবেষণায় তা কিঞ্চিত হলেও সাহায্য করতে পারে, এই লক্ষ্যে। বিশেষতঃ যারা বুদ্ধের বিশাল অভিধর্ম-শাস্ত্র রাজ্যে পূর্বে বিচরণ করার সুযোগ হয়নি, তাঁদের জন্যে আমার এই অভিজ্ঞতা কিঞ্চিত হলেও দিক-নির্দেশকের ভূমিকা পালন করতে পারে।
বিদর্শন শাস্ত্রীয় বিচারে ‘নাম> রূপ’ এই ক্রমটি অনুশীলনকারীগণের অভিজ্ঞতায় কিভাবে ধরা দিতে পারে সে সম্পর্কে আমার ইতিপূর্বে লিখিত নিবন্ধ ‘নাম আগে, না রূপ আগে’ এই শিরোনামে আলোচিত হয়েছে। পোমরা জ্ঞানাঙ্কুর বিহার ধ্যান কেন্দ্রের মুখপত্র ‘সমাধি’ পত্রিকায় ২০০১ সালে তা প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমান নিবন্ধে শুধু ‘নামুস্কন্ধের’ উৎপত্তি ও তার গতি প্রকৃতি নিয়েই আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকবে।
‘নামস্কন্ধ’ এর শাস্ত্রীয় উৎপত্তিক্রম হলো- বেদনা সংজ্ঞা> সংস্কার> বিজ্ঞান। বিদর্শন স্মৃতি অনুশীলন ক্ষেত্রে দেখা যায়, নাম-রূপ নামক ইহারা দু’ভাগে ভাগ হয়ে পড়ে। ষড়েন্দ্রিয়ের মধ্যে চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা এবং চর্ম এই পাঁচটি ইন্দ্রিয় হয়ে যায় প্রথম উৎপত্তি ক্রম; আর শুধু ‘মন’ ইন্দ্রিয় হয়ে পড়ে দ্বিতীয় উৎপত্তিক্রম। এক্ষেত্রে প্রথম উৎপত্তি ক্রমটি বহির্ভাগীয় এবং দ্বিতীয়টি অভ্যন্তরভাগীয়। বর্হিভাগীয় উৎপত্তি ক্রমের মধ্যে দেখা যায় বর্তমানকালীয় উপস্থিত মুহূর্তে তথা ঘটনাক্ষণে যখন যেই ইন্দ্রিয় পথে স্ব স্ব গ্রাহ্য বিষয় বস্তুর সংযোগ ঘটে, তখন তার থেকেই জন্ম নেয় ‘নাম-স্কন্ধের’ উৎপত্তি ক্রম। নিম্নোক্তভাবেই সেই উৎপত্তিক্রমটি সম্পাদিত হয়; বিজ্ঞান> সংস্কার> সংজ্ঞা> বেদনা। এই উৎপত্তিক্রমের বিশ্লেষণ ক্রম হতে পাঠক ও সাধকের বুঝে নেয়া সহজ হবে বিজ্ঞান, সংজ্ঞা, সংস্কার, বেদনা-এগুলোর পরিচয়। একটি উপমার মাধ্যমে বিষয়গুলোর উৎপত্তি ক্রম তুলে ধরা হচ্ছে-
মনে করুন, আপনার ‘চক্ষু’ ইন্দ্রিয় পথে হঠাৎ করে একটি উড়ন্ত পাখি পড়লো। এই পাখিটি আপনার চোখে পড়া মাত্রই চোখের পর্দা বা ‘লেন্স’ এর সাথে মসিত্মষ্কের সংযোগ তার নামক স্নায়ু মনো-বিজ্ঞানটিকে জাগ্রত করে বলেদিল কিছু একটা চোখে পড়েছে। সাথে সাথেই মনের দ্বিতীয় উপাদান স্মরণ শক্তি ‘সংস্কার’ বা তার পূর্ব অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার হতে সমাধান বের করে বলেদিল, যা পড়েছে, তা মানুষ নহে; পশু নহে ইহা পাখীর গোষ্ঠী ‘কাক’। সংস্কারের এই চিহ্নিত করণ বা বিচার সমাধানের নাম ‘সংজ্ঞা’। সংজ্ঞাকে বস্তুর প্রাথমিক পরিচিতি বা প্রাথমিক জ্ঞানও বলা হয়। সংজ্ঞার কাজ শেষ না হতেই, ‘বেদনা’ জাগ্রত হয়ে চক্ষুপথে পতিত এই কাকটির রস আস্বাদনে উদ্যোগী হলো, বন্ধু সংস্কারকে সাথী করে। অর্থাৎ এই কাক জাতটি ভালো নহে, চিকচিকে কালো, কন্ঠস্বর ভারী কর্কশ এবং খুবই ধূর্ত ইত্যাদি। সাধক বলুন তো, পাখি দেখা নিয়ে এই পর্যন্ত যা ঘটে গেল, কত সময় লাগলো? মোটেই না, একদম চোখের পলকে সব কর্ম শেষ। দেখুন কি অসম্ভব বিদ্যুত গতিতেই না এই ‘নাম’ তথা মনেন্দ্রিয় তার কার্য সিদ্ধিতে এত পটু, এত দক্ষ! এর সাথে পাল্লা দিতে গেলে তাই সাধকের এত হুঁশিয়ার, এত সাবধান হতে হয় যে, তার নাম হয়েছে ‘স্মৃতি সমপ্রজ্ঞান’। এই ‘স্মৃতি সমপ্রজ্ঞান’ হলো আড়াই হাজার বছরের বহু পরীক্ষিত এক অদ্বিতীয় চৌকিদার, প্রহরী। সাধক যাবত নিদ্রা না যান, তাবৎ এই প্রহরীরও বিন্দুমাত্র বিশ্রামের উপায় থাকে না। যদি দেখা যায় চৌকিদারটি, বিশ্রামের যথেষ্ট সুযোগ পাচ্ছে, তাহলে বলতে হবে সাধকের সাধনায় অগ্রগতি মোটেই হচ্ছে না।
এখন পূর্ব প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। বলেছিলাম, ‘নাম স্কন্ধের’ বেদনা তার বন্ধু সংস্কারকে নিয়ে কাকটির গুণাগুণ বিচার বা রস আস্বাদনে প্রস্থতি নিল। সাধক বলুন দেখি এই প্রস্থতির নাম কি? ইহার নাম ‘তৃষ্ণা’। এবার বলুন, কাকের সম্পর্কে বেদনা ও সংস্কার মিলে যে সব ধারণা ব্যক্ত করলো, তাতে কোন্ ধরণের ‘তৃষ্ণা’ আপনার মধ্যে জাগতে পারে? বিতৃষ্ণা বা বিরক্তি নহে কি? হ্যাঁ, এভাবেই চক্ষুর ন্যায় কর্ণ শব্দের প্রতি, নাসিকা গন্ধের প্রতি, জিহ্বা আস্বাদনের প্রতি এবং চর্ম শীত-উষ্ণ, শক্ত-কোমল-ইত্যাদি অনুভূতির প্রতি মুহূর্তে মুহূর্তে আসক্তি, বিরক্তি অথবা উপেক্ষা ভাব দ্বারা তৃষ্ণাকে জলের স্রোতের ন্যায় অবিচ্ছিন্ন গতিতে বহির্বিভাগীয় উৎপত্তি ক্রমের মাধ্যমে আলিঙ্গন করে চলেছে।
এবার তুলে ধরা যাক্ আভ্যন্তরীণ উৎপত্তি ক্রমের মধ্যে আমরা কী দেখতে পাচ্ছি। যদি সাধক বহির্ভাগীয় উৎপত্তিক্রমকে বাঁধা দিতে চোখ, কান, মুখ বন্ধ করে বসে থাকেন, তথাপি ‘মনেন্দ্রিয়’টি ঐ সব বহির্ভাগীয় ইন্দ্রিয় পাঁচটি দ্বারা পূর্বে যা রসদ সংগ্রহ করে, তার বিশাল ভাণ্ডারে ‘সংস্কার’ রূপে জমা রেখেছে, কেবল তা দিয়েও সে বহুকাল চালিয়ে দিতে পারে অনায়াসে। প্রশ্ন আসতে পারে সাধক যদি বাহির ইন্দ্রিয়গুলো বন্ধ করেন তখন আভ্যন্তরীণ উৎপত্তি ক্রমের মধ্যে ‘সংজ্ঞা’টির কোন কাজ থাকতে পারে কি? হ্যাঁ নাম-স্কন্ধের প্রত্যেকটি উপাদানের উপস্থিতি এুক্েষত্রেও অবশ্যই থাকবে। যেমন, কবি তার কক্ষে বসে দার্শনিক ধ্যানে বসে এবং বিজ্ঞানী তার গবেষণার বিষয় চিন্তায় যখন স্ব স্ব বিষয়ে আপন মনে ডুব দেন, তখন মনের কল্পনায় যেই ছবি গুলো একান্ত বাস্তব হয়ে উঠে এগুলোতে ‘সংজ্ঞার’ প্রাধান্য অবশ্যই তাকে, যদিও ‘বিজ্ঞান’টি ছাড়া বাকী চারটি উপাদানের সবকটিই বেকার বা অসিত্মত্বহীন হতে বাধ্য। অতএব, বহির্ভাগীয় উৎপত্তি ক্রম বলুন, কি অভ্যন্তর ভাগীয় মনোইন্দ্রিয়ের উৎপত্তিক্রমই বলুন, উভয় ক্ষেত্রে একই উৎপত্তিক্রম, বিজ্ঞান> সংস্কার> সংজ্ঞা> বেদনা-এই বিধির কোন ব্যতিক্রম নেই। এই বিষয়টিকে একটি উদাহরণ দ্বারা সহজ করা যেতে পারে। মনে করুন স্বপ্নে দেখলেন, আপনার বহু আকাঙ্খিত এক বন্ধু আপনার বাড়ীতে বেড়াতে এসেছেন। এক্ষেত্রে আপনি দু’টি অবস্থার সম্মুখীন হতে পারেন। এক, তাকে প্রতিদিনের দেখা প্রিয়জন হিসেবে স্বাগত জানাতে পারেন। দুই, শোক ও আনন্দাশ্রুর আবেগে তাকে বুকে জড়িয়ে স্মরণ করতে পারেন যে, এই প্রিয়জনের সাথে বহুকাল পরেই পুর্নমিলন হলো।
| আর্য্যশ্রাবক পূজ্য বনভন্তে। |
এখানে বন্ধুকে দেখার কাজে দেখছি, বাস্তব চর্ম চক্ষু-ইন্দ্রিয়ের কোন উপস্থিতি না থাকলেও সেই চক্ষু-ইন্দ্রিয় পূর্বে মনেন্দ্রিয়কে এই বন্ধু সম্পর্কে যেই আকার, আকৃতি দান করেছিল তা এখন স্বপ্নে হুবহু সেভাবেই উপস্থিত হতে পারে, অর্থাৎ বর্তমানে যুবক বন্ধুটি স্বপ্নেও একই যুবকরূপে দর্শন অথবা তার প্রদত্ত ছবির উপর, কল্পনার রং-এ রাঙিয়ে ভবিষ্যতের কোন রূপ প্রকল্প হিসেবেও আবির্ভূত হতে পারে অর্থাৎ স্বপ্নে বন্ধুটিকে খুব রুগ্ন, বৃদ্ধ বলে মনে হচ্ছে, ইত্যাদি। বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক ও কবি সাহিত্যিকগণ এভাবেই বিজ্ঞান চিত্তের বর্তমানকে ভিত্তি করে অতীত বা অনাগতের ছবি আঁকেন। এটা মনেন্দ্রিয়ের মূল উৎস বিজ্ঞান চিত্তের তথা জীবিতেন্দ্রিয়ের অনন্য সাধারণ শক্তি-যা অতীতের অসংখ্য জন্ম জন্মান্তরের স্মৃতি সংরক্ষন করতে সক্ষম। এই বিজ্ঞান চিত্তটি এমন এক পর্যায়ে অবস্থান করেই জাগ্রত অবস্থায় হউক বা ঘুমন্ত অবস্থায় হউক, সার্বক্ষণিক অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায় প্রাণীর জীবনে কাজ করে যায় অবিচ্ছিন্ন ভাবে, যতক্ষণ জীব প্রাণে বেঁচে থাকে। শুধু তা-ই নহে, মৃত্যু ক্ষণে জীবের জন্মান্তর ঘটানোর দায়-দায়িত্বও অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্ত এবং এককভাবে এই বিজ্ঞান চিত্তটি গ্রহণ করে, অনন্তকালের সংসারে সে তার রাজত্বকে সমপ্রসারিত করে থাকে। পৃথিবীতে যত ধর্ম-দার্শনিকগণ ছিলেন ও বর্তমানে আছেন, তন্মধ্যে একমাত্র মহান বুদ্ধ এবং তাঁর সার্থক উত্তরাধিকারীগণ ব্যতীত বিজ্ঞান চিত্ত বা জীবিতেন্দ্রিয়ের এই অনন্ত কালের সীমারেখা কেহই দেখেননি।
বিজ্ঞান চিত্তের অনন্তকাল ব্যাপী এই সমপ্রসারণ গতিকে রোধ করা একান্তই প্রয়োজন; এ জন্যেই যে, তা আমাদের জন্যে বর্তমানে যেমন, অতীত এবং ভবিষ্যতেও অনুরূপ অনন্ত দুঃখ সৃষ্টির প্রধান নায়ক। যেই ‘অবিদ্যা বা অজ্ঞতা’কে বুদ্ধ তথাগত সর্ব দুঃখের মূল কারণ রূপে চিহ্নিত করেছেন তার অপর নাম ‘বিজ্ঞান-চিত্ত’। ইহাকে প্রতিসন্ধি চিত্তও বলা হয়। ‘মনো পূব্বঙ্গমা ধম্মা’ বলে সর্ব বিষয়ে অগ্রগামী, নেতৃত্ব দানকারী রূপে যেই ‘মন’ টির কথা বুদ্ধ ধর্মপদের শতাধিক বাণীর সর্ব প্রথমেই উল্লেখ করেছেন, তাও এই বিজ্ঞান চিত্ত। মহান ধম্মপদের সেই প্রথম গাথাটিতে- “মনসা চে পদুট্ঠেন, ......পসন্নেন ভাসতি বা করোতি বা”-বলে বুদ্ধ যাকে নির্দেশ করেছেন তা ‘নাম স্কন্ধের’ অভ্যন্তরভাগীয় উৎপত্তিক্রমের ‘বেদনা’ পর্বভূক্ত বিষয়। কর্ম সম্পাদনের চূুড়ান্ত পর্যায়ে কর্মকে বীজে পরিণত করার চূড়ান্ত স্তর হলো এই ‘বেদনা’। ইহার পরবর্তী পর্যায় তৃষ্ণা। স্মরণ রাখা দরকার অবিদ্যা, মোহ বা ভ্রান্ত ধারণা তথা অনন্তকালের আত্মা নামক দৃঢ় বিশ্বাসই বিজ্ঞান-চিত্তের জনক। আবার সেই বিজ্ঞান চিত্তই অবিদ্যার উৎস হয়ে কাজ করে। সেই বিজ্ঞান চিত্তকে ‘বেদনা’ স্তরের অনুভূতিজাত প্রতিক্রিয়া বা আসক্তি, বিরক্তি ও তৃষ্ণা সংযুক্ত উপেক্ষা হতে মুক্ত রাখতে পারলে, তথা বেদনানুদর্শন সতিপট্ঠানে উল্লেখিত যাবতীয় সংযোজন হতে বিচ্ছিন্ন করতে পারলেই বিজ্ঞান চিত্তের সমপ্রসারণ বন্ধ হয় ; জন্মান্তরগতি নিরুদ্ধ হয়, অবিদ্যা-তৃষ্ণা জাত যাবতীয় সংস্কার নির্মূল হয় এবং সর্ব দুঃখহীন পরমা শান্তি নির্বাণ অধিগত হয়। বেদনা রহিত এই বিজ্ঞান চিত্তের অপর নাম ‘অনাসক্ত সউপাদিশেষ নির্বাণ’। সংস্কারের যাবতীয় সুখ-দুঃখে অনাসক্ত, নির্বিকার এই সুদুর্লভ চিত্তভাব গঠন করা বা লাভ করা কোন গুরু বা মহাপুরুষ, এমনকি সেই সম্যক সম্বুদ্ধের আশীর্বাদেও সম্ভব নহে। ইহা একান্তই নিজের ঐকান্তিক ইচ্ছা, চেষ্টা, প্রযত্ন, অধ্যাবসায় সহ একজন সত্যদর্শী, সম্যক দৃষ্টির হিতকামী তথা কল্যাণ মিত্রের স্ব অভিজ্ঞতা জাত উপদেশ দ্বারা আযত্বকরণ সম্ভব হয়।এক্ষেত্রে তেমন কল্যাণমিত্র পাওয়া যদি না যায়, তাহলে সমগ্র ত্রিপিটকের সার-সত্য মহাসতিপট্ঠান সূত্র এবং তৎ অনুসৃত চারি আর্য সত্য জ্ঞান ও প্রতীত্যসমুৎপাদ নীতিজাত জ্ঞানকে পরম কল্যাণমিত্রের আসনে বসায়ে, সেই আলোকে আপন মনোজগত গঠন করতে হবে। তার জন্যে সাধনা অবিরাম চালিয়ে যেতে হবে, প্রয়োজনে আমরণ কাল। কারণ, এই সৎ, মহৎ প্রচেষ্টার মধ্যে একদিকে পাওয়া যায় নির্মল পবিত্র আনন্দ এবং শান্ত-দান্ত জ্ঞানময় জীবনের অপার আস্বাদন। অপর দিকে দুঃখ মুক্তির অপার পারমী শক্তি সঞ্চয় হতে থাকে ক্রম বর্ধমান গতিতে। অতএব,
সত্য পথচারী বিশ্বাসীর,
চির উন্নত থাকে শির।
সকল দীনতা, হীনমন্যতা,
ধুয়ে মুছে যাবে, নাহি অন্যথা ;
সোনালী উষার নির্মল আলো,
ঘোর অমানিশা বিদীর্ণ করিয়া,
দেখিবে, দেখিবেই হে মহাবীর!
================

