মানুষের সুখ দুঃখ ভোগের প্রকৃত কারণ তার মন
এক সময় শ্রদ্ধেয় বনভান্তে আর্যবন বিহারে খাগড়াছড়িস' ‘ছাত্র ছাত্রী আর্য ঐক্য পরিষদ’ কর্তৃক আয়োজিত দানানুষ্ঠানে ধর্মদেশনা প্রদানকালে বলেন—ধর্মদেশনা দেওয়া বা প্রদান করা অর্থ চারি আর্যসত্যকে ব্যাখ্যা করা। যেমন—দুঃখ আর্যসত্যের কথন, দেশনা, প্রজ্ঞাপন, স্থাপন, প্রকাশন; সমদুয় আর্য সত্যে সত্যের কথন, দেশনা, প্রজ্ঞাপন, স্থাপন, প্রকাশন; নিরোধ আর্য সত্যের সত্যের কথন, দেশনা, প্রজ্ঞাপন, স্থাপন, প্রকাশন; মার্গ আর্যসত্যের সত্যের কথন, দেশনা, প্রজ্ঞাপন, স্থাপন, প্রকাশন অতি সহজ, সরলভাবে ব্যাখ্যা করা। কথন অর্থ চারি আর্যসত্যের কথা ব্যতীত অন্য কোন বিষয়ে কথা না বলা। শুধুমাত্র দুঃখ কি, কোথা হতে দুঃখ উৎপন্ন হয়, কিসে দুঃখের পরিসমাপ্তি ঘটে, দুঃখ পরিসমাপ্তির উপায় কি? সেসব কথা বলা। দেশনা বলতে চারি আর্যসত্যকে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে ব্যাখ্যা করে জনসাধারণের সমক্ষে চারি আর্যসত্যকে তুলে ধরা। প্রজ্ঞাপন অর্থ ঘোষণা করা। অর্থাৎ বহুজনের হিতসুখ ও জ্ঞানচক্ষু উদয় করানোর তাগিদে চারি আর্যসত্যকে দিকে দিকে ঘোষণা করে দেওয়া। স্থাপন অর্থ প্রতিষ্ঠা করা। যেমন কোন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করলে তারিখ ও স্থানের নাম উল্লেখ করে প্রতিষ্ঠা করা হয়। ঠিক তদ্রূপ দেশনা প্রদান কাল হতে সেইরূপে মনচিত্তের মধ্যে চারি আর্যসত্যকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করা। প্রজ্ঞাপন অর্থ প্রকাশ করা। অর্থাৎ চারি আর্যসত্যকে সঠিক ধারণা দিয়ে যথাযথ উপমা সহকারে সুপ্রকাশিত করা। এই চারি আর্যসত্য ব্যতীত দুঃখমুক্তি লাভের কোন উপায় নেই, কেবল এ সত্যের দ্বারাই নির্বাণ লাভ করা যায় তা’ প্রকাশ করা। বলা বাহুল্য যে, ভগবান বুদ্ধ এভাবে চারি আর্যসত্যের কথন, দেশনা, প্রজ্ঞাপন, স্থাপন ও প্রকাশন অতি সহজ, সরলভাবে ব্যাখ্যা করতেন। বুদ্ধ শিষ্যের মধ্যে অগ্রশ্রাবক শারীপুত্র মহোদয়ও চারি আর্যসত্যের কথন, দেশনা, প্রজ্ঞাপন, স্থাপন ও প্রকাশনকে অতি সহজ, সরলভাবে ব্যাখ্যা করতে সমর্থ ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে ভগবান বুদ্ধ তথা শারীপুত্র মহোদয় কেহ নেই। আমি তো কিছুতেই তাদের মতন করে চারি আর্যসত্যকে ব্যাখ্যা করতে পারব না। আমার যতদূর সম্ভব শুধু তাই বলে যাব। চারি আর্যসত্য সম্পর্কে বললে বলতে হয়, জগতে দুঃখ আছে ইহা প্রথম সত্য। দুঃখ যখন বিদ্যমান আছে তাহলে দুঃখোৎপত্তি কারণ অবশ্যই আছে, ইহা দ্বিতীয় সত্য। যেহেতু দুঃখ আছে সুতরাং দুঃখের শেষ বা নিরোধও আছে ইহা তৃতীয় সত্য। রোগ থেকে আরোগ্য লাভের জন্য যেমন ওষুধ সেবন করতে হয়। তেমনি দুঃখের হাত থেকে রেহাই পাবার জন্য একটা মার্গও রয়েছে ইহা চতুর্থ সত্য। পঞ্চস্কন্ধ দুঃখ আর্যসত্য অভিজ্ঞা দ্বারা জ্ঞাত হতে হবে। অবিদ্যা, তৃষ্ণা সমুদয় আর্যসত্য অভিজ্ঞা দ্বারা পরিহার করতে হবে। নির্বাণ নিরোধ আর্যসত্য অভিজ্ঞা দ্বারা প্রত্যক্ষ করতে হবে। শমথ বিদর্শন মার্গসত্য অভিজ্ঞা দ্বারা গঠন করতে হবে। অভিজ্ঞা বা উচ্চতর জ্ঞানের দ্বারা চারি আর্যসত্যকে যথার্থভাবে জানতে না দেওয়া পাপিষ্ঠ মারের কাজ। কারণ চারি আর্যসত্য সম্বন্ধে সত্ত্বগণকে অজ্ঞ করে রাখতে পারলে ইচ্ছামত এদিকে সেদিকে পরিচালিত করতে তার সহজ হয়। বলা বাহুল্য চারি আর্যসত্যের জ্ঞান অর্জন হলে মার আর কিছুতেই সত্ত্বগণকে অজ্ঞ করতে রাখতে পারে না। দুঃখ সম্বন্ধে জ্ঞান অর্জন হলে দুঃখকে দেখতে পেলে, দুঃখকে বুঝতে পারলে কেহ কি আর দুঃখের মধ্যে থাকতে চাইবে? কেহই তো জেনে শুনে দুঃখে পতিত হতে চাই না। অন্যদিকে দুঃখের কারণ সম্বন্ধে জ্ঞান অর্জন হলেও অনাকাঙ্ক্ষিত সেই দুঃখের উৎপত্তিকে সবাই বন্ধ করতে প্রত্যাশী হয়। এমনিতে পূর্বে উৎপত্তি হওয়া দুঃখের পীড়নে সবাই কাতর, তার উপর আরো দুঃখের উৎপত্তি? কেহই সমর্থন করতে পারে না। দুঃখের নিরোধ সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ হলে দুঃখ নিরোধে কি সুখ তা’ প্রত্যক্ষ হয়। আর সুখকে সবাই সানন্দে গ্রহণ করতে ইচ্ছুক। কাজেই দুঃখ নিরোধের উপায় নির্বাণ সুখের অবস্থান করে। দুঃখ নিরোধগামিনী জ্ঞান অর্জন হলে সবাই সে মার্গ অবলম্বনে দুঃখের পরিসমাপ্তি ঘটায়ে থাকে। তোমরা যদি জ্ঞানে দুর্বল হয়ে যাও তাহলে মার তোমাদেরকে ইচ্ছা মত চালাতে থাকবে। বারবার দুঃখের মধ্যে পতিত হওত দুঃখেই অবস্থান করতে হবে তোমাদেরকে। সেই দুঃখের হাত থেকে মুক্তি লাভ করতে পারবে না। তজ্জন্য তোমরা জ্ঞান অর্জন করতে চেষ্টাশীল হও। জ্ঞান অর্জনের জন্য দৃঢ় প্রত্যয়ী হলে সেই পথে যে রকম বাঁধা উপস্থিত হোক না কেন বীর বিক্রমে তা’ অতিক্রম করতঃ জ্ঞানের চরম শিখরে পৌঁছতে সক্ষম হবে। তাই ভগবান বুদ্ধ সত্ত্বদিগকে চারি আর্যসত্য জ্ঞান দান করে মারকে পরাভূত করতে সাহায্য করতেন। যার ফলে সেই সময় সত্ত্বগণ দুঃখকে চিরতরে ধ্বংস করে নির্বাণ পরম সুখ প্রত্যক্ষ করতে সমর্থ হয়েছিল। তজ্জন্য বুদ্ধের সময়কালীন মার তার প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি।
শাস্ত্রে উল্লেখ আছে-বুদ্ধ যখন গয়ার বোধিমূলে ধ্যান রত ছিলেন মার তখন চিন্তা করতে লাগল। “এ’শাক্য রাজপুত্র যদি জ্ঞান লাভ করে, বুদ্ধ হয়ে যায়, লোকদের যদি উপদেশ দেয় তাহলে আমাররাজ্য তো ধ্বংস হয়ে যাবে”। কাজেই যে কোন উপায়ে হোক তাঁকে ধ্যান চ্যুত করাতে হবে। অমনি মার সৈন্য সামন্ত নিয়ে বুদ্ধকে আক্রমণ করতে থাকে। কিন্তু বুদ্ধকে ধ্যান চ্যুত করা দূরে থাক, এক চুলও নাড়াতে সক্ষম হল না। বরং বুদ্ধ মারকে পরাজিত করে বুদ্ধত্ব লাভ করেন। আর দুঃখে পীড়িত সত্ত্বগণকে দুঃখ হতে মুক্তি লাভের পথ দেখাতে শুরু করেন। এদিকে বর্তমানে মার আমাকেও ভালো চোখে দেখতেছে না। কারণ আমি সদ্ধর্ম প্রচার করার দরুন তার শক্তি খর্ব হয়ে যাচ্ছে। তবে এটা বলা বাহুল্য যে, বর্তমানে শুধু আমাকেই মার একটু সমীহের চোখে দেখছে মাত্র।
শ্রদ্ধেয় বনভান্তে আরও বলেন—মার চারটি বিষয় লাভে বাঁধা-বিপত্তি সৃষ্টি করে দেয়। সে চারটি কি? কুশলকর্ম সম্পাদন, জ্ঞান লাভ করা, নির্বাণ প্রত্যক্ষ করণ, সংসার দুঃখ হতে মুক্তি লাভ করণ, এই চারটি বিষয় লাভে বাঁধা দেয়। মার কি বলে জান? যারা এ’চারটি বিষয় লাভ করতে চাই, আমি তাদেরকে ব্যর্থ করে দিব। ঐ বিষয়সমূহ অর্জন করাকে আমি কিছুতেই সহ্য করতে পারি না। আর কিভাবেই বা সহ্য করব। ঐ গুলো অর্জন হলে তো তারা আমাকে পরাজিত করে ফেলবে। আমাকে তাদের কাছে পদানত হয়ে যেতে হবে। তাদেরকে আমার কথামত পরিচালনা করতে পারব না। সত্ত্বগণ লোভ, হিংসা, অজ্ঞানতা দ্বারা নানা প্রকার অনাচার, অত্যাচারে নিয়োজিত থাকলে অকুশল, পাপমূলক কর্মে রত দেখলে মার খুব খুশী হয়। সত্ত্বগণ যত অকুশল, পাপকর্মে নিয়োজিত থাকে মার তত বেশি আনন্দিত হয়। সেই পাপীদেরকে নানাভাবে সাহায্য সহযোগিতা করতে মার সিদ্ধহস্ত। মার হল পাপী লোকদের রাজা। দুর্দমনীয়দের মধ্যে মারের শক্তি অতীব শক্তিশালী। এমন কোন খারাপ কর্ম বা বাক্য নেই যা’ মারের দ্বারা সম্পাদিত হয় না। যত অকুশল, পাপ ঝগড়া-বিবাদ, কাটাকাটি, মারমারি, চাঁদাবাজী, সন্ত্রাসী, মস্তানী, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, অরাজকতা সৃষ্টিকর্তা হল মার। সকল প্রকার খারাপ কাজে মার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ্ভাবে মার জড়িত থাকে। বর্তমানে তোমরাও যে সকল অকুশলকর্মে জড়িত রয়েছ সে সকল অকুশলকর্ম হতে নিজকে বিরত রাখ। বিরত রাখতে পারলে নিশ্চিত নিরয়গামী হওয়া হতে রক্ষা পাবে। অন্যদিকে, তোমাদেরকে অকুশল কর্ম হতে বারণ করলেও আমার কথায় কর্ণপাত কর না। তাই মাঝে মাঝে চিন্তা হয় তোমাদেরকে বারণ করব কি না? একটা উপমার কথা বলি-আচ্ছা ধর, কয়েক জন লোক একটা পথ ধরে এগিয়ে চলতে পথের ধারে বিশ্রামরত অন্য এক জনের সাথে সাক্ষাৎ হল। তারা বিশ্রাম রত ব্যক্তির সাথে কিছু আলাপ করে আবার এগিয়ে চলতে লাগল। এদিকে বিশ্রামরত ব্যক্তির পূর্ব হতে জানা ছিল যে, সে পথে একটা ভীমরুলের বাসা রয়েছে। সুতরাং পথিকগণ কিছু অগ্রসর হলে ভীমরুলের কবলে পড়বে। সে ব্যক্তি যদি পথিকগণের হিতকামী হয়, তাহলে তাদেরকে সে পথে যেতে বারণ করবে। আর যদি ভীমরুলের কামড় খাওয়াতে ইচ্ছুক হয় তবে বারণ করবে না। আমার অবস্থাও অনেকটা সে রকম নয় কি? তবে আমি তোমাদেরকে অকুশল সম্পাদন করা হতে বারণ করতে চাই। কিন্তু তোমরা তো আমার কথায় কর্ণপাত করতে প্রস্তুত নও। তবু আমি তোমাদেরকে ভবিষ্যতে যেন দুঃখে পতিত হতে না হয় তার জন্য সতর্ক করে দিচ্ছি। আমার কথা কর্ণপাত না করলে আমাকে কিন্তু দোষারোপ করতে পারবে না। একদিন জনৈক চাক্মা উপাসক আমাকে বলেছিল, ভান্তে আমাদের মঙ্গলের জন্য আপনাকে অবশ্যই বারণ করতে হবে। আমাদেরকে অনুশাসন করতে হবে, বিধি নিষেধ আরোপ করতে হবে। আপনার সেই অনুশাসনের কথা শুনে আমরা কিছুটা হলেও সতর্ক হবো। কারণ যেখানে পশুরা পর্যন্ত অনুশাসন মেনে চলে, সেখানে আমরা মানুষ হয়ে কেন মানবো না? অবশ্যই মানবো। আপনি যদি অনুশাসন, বিধি নিষেধ আরোপ না করেন, কে করবে? কাজেই ভান্তে, আপনি চেষ্টা করে দেখেন। আর তাই আমিও বিবিধ প্রকারে যুক্তি, উপমা উত্থাপন করে তোমাদেরকে পাপ হতে বিরত থাকতে উপদেশ দিই। এবং পাপ বিরতির অনুশাসন করে থাকি। অনেকে নাকি আমার কাছে আসতে ভয় পায়। তার প্রকৃত কারণ কি জান? মারই তাদেরকে বাঁধা প্রদান করে থাকে। হুমকি দেয় যে, বনভান্তের কাছে যাবে না, তিনি তোমাকে বকা দিবেন। আর মারের সেই হুমকির ফলে তারা ভয় পেয়ে আমার কাছে আসতে চায় না। আমি তোমাদেরকে বলে দিচ্ছি-তোমরা মারের সকল প্রকার বাঁধা-বিপত্তি, প্রলোভন অতিক্রম করে পুণ্যকর্ম সম্পাদন করতে থাক। পুণ্যকর্ম সম্পাদন করতে হলে মারের প্রভাবে সৃষ্ট সব বাঁধা-বিপত্তি বীর বিক্রমে অতিক্রম করা চাই। মারের বাঁধা-বিপত্তিকে অতিক্রম না করে পুণ্যকর্ম সম্পাদন করা যায় না। তাই পুণ্যকর্ম সম্পাদন করতে বীর হয়ে যাও। হীন কাপুরুষ হলে চলবে না। যারা বীর তারা মারের হুমকি, বাঁধা বিপত্তিকে নির্ভীক চিত্তে জয় কর। যাতে পুণ্যকর্ম করতে কোন প্রকার কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়।
শ্রদ্ধেয় বনভান্তে বলেন—বৌদ্ধধর্ম আচরণে ইহলোকে যেমন প্রত্যক্ষ ফল প্রদান করে পরলোকেও অধিকতর মঙ্গল সাধিত হয়। আবার, এই ধর্মে ফল প্রাপ্তির জন্যর কোন নির্দিষ্ট সময় বাঁধা নেই। ইহার ফলোৎপাদনে কোন প্রকার বিলম্ব হয় না। যখনই সঠিকভাবে প্রতিপালিত হয় তখনই তার ফল পাওয়া যায়। ইহা শুধু কথার কথা নয়, কেবল উপদেশ বাক্যও নয়। বৌদ্ধধর্ম কখনো কাল্পনিক ধর্ম নহে। এ’ধর্মের মাধ্যমে প্রকৃত বিমুক্তি সুখ লাভ হয়। তাই এখানে ‘এসো দেখো,’ বলে বিচার বিবেচনা করার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। আমিও তোমাদেরকে বলছি, তোমাদের মত শিক্ষিত ছেলেরা সদ্ধর্মে দীক্ষিত হয়ে আমার কাছে বৌদ্ধধর্ম শিক্ষা করতে এগিয়ে আসো। সত্যিই কি বৌদ্ধধর্মে সুখ অর্জিত হয়? নির্বাণ সুখ কি? এ গুলো গবেষণা কর। দশবল বুদ্ধের শাসন রক্ষা করার জন্য উদ্যোগী, ভালো শিষ্যের প্রয়োজন রয়েছে। আমার পক্ষে একাই সেসব কাজ ত্বরান্বিত করা সম্ভব হচ্ছে না। দশবল বুদ্ধের শাসন রক্ষা কল্পে আমার আরো বি এ, এম এ, ডক্টর, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যারিষ্টার ডিগ্রীধারী শিষ্যের প্রয়োজন রয়েছে। দশবল বুদ্ধের শাসন রক্ষা করতে পারলে দেব-মনুষ্য সকলের অশেষ হিতসুখ, মঙ্গল সাধিত হয়। বর্তমানে বুদ্ধের শাসন উন্নতি, শ্রীবৃদ্ধি ও স্থিতি রাখার জন্য সকলের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া খুব প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
তোমরা সব সময় বুদ্ধ, ধর্ম, সংঘের প্রতি প্রসন্ন মনে অবস্থান করবে। ত্রিরত্নের প্রতি প্রসন্ন হলে মনচিত্ত কখনো বিপথগামী হতে পারে না। কায়-বাক্য-মন এই ত্রিবিধ কর্মসমূহকে প্রসন্ন বা নির্মল চিত্তে সম্পাদন করতে সক্ষম হলে মহৎ ফলের অধিকারী হবে। কেহ যদি প্রসন্ন চিত্তে কোন কথা বলে কিংবা কাজ করে অথবা মনন করে সুখ তাকে সততই ছায়ার ন্যায় অনুসরণ করে। তাই তোমরা প্রসন্ন মনে কাজ করবে, প্রসন্ন মনে বাক্য প্রয়োগ করবে। তবেই তোমাদের দীর্ঘকাল হিতসুখ, মঙ্গল সাধিত হবে। এবং বহুবিধ পুণ্য সঞ্চয় হয়ে থাকবে। দেহের ছায়া সর্বদা দেহকে আশ্রয় করে তাকে, দেহ হতে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। তেমনি পুণ্যার্থীর পুণ্য ছায়াও সব সময় থাকে অনুসরণ করতে থাকে। পক্ষান্তরে দূষিত মনে কাজ করলে, দূষিত মনে কথা বললে পদে পদে দুঃখ পেতে হয়। শকটবাহী বলদের পদানুগামী ঘূর্ণমান চক্রের ন্যায় দুঃখ তাকে অনুসরণ করে। বলা যায়, মানুষের সুখ-দুঃখের প্রকৃত কারণ হল তার মন। মনই জীবনকে গড়ে তোলে সুখী কিংবা দুঃখী করে। মন যদি প্রসন্ন বা নিষ্পাপের দিকে চলে তবে সুখ আর মন যদি দূষিত পথে বিচরণশীল হয় তাহলে দুঃখের সীমা থাকে না। কাজেই তোমরা আজ হতে সবাই সাবধান হয়ে যাও। স্বীয় মনচিত্তের দিকে লক্ষ্য রাখ, যাতে দূষিত পথের দিকে ধাবিত হতে না পারে। সর্বদা যেন নিষ্পাপ মার্গে বিচরণশীল হয়। এই কাজে যদি সফল হতে পার তবে কোন দুঃখ তোমাদের কাছে আসতে পারবে না।
পরিশেষে তিনি বলেন—তোমরা আমার দেশনা বুঝতে পারছ কি? নাকি অনাবাদী জমিতে, ঘন তৃণের ওপর বীজ বপন করলাম এতোক্ষণ। অনাবাদী জমিতে বীজ বপন করলে তো বহু ফলন লাভের আশা দূরের কথা, বীজগুলোও নষ্ট হয়ে যাবে। কিছুই লাভ হবে না। যারা জ্ঞানী তারা আমার দেশনা বুঝতে পারে, হৃদয়ে ধারণ করতে পারে এবং সে অনুসারে আচরণ করে মহাসুখের অধিকারী হয়। কিন্তু অজ্ঞানীরা এ সমস্ত জ্ঞানের বিষয় কোনমতে বুঝতে পারে না, হৃদয়ে ধারণ করতে পারে না। আর আচরণ করা তো তাদের কাছে আকাশ-কুসুম কল্পনা মাত্র। তোমরা যারা জ্ঞানী তারা আমার এ’দেশনার মমার্থ বুঝতে চেষ্টাশীল হও। এবং স্বীয় জীবনকে সেই আলোকে পরিচালিত কর। একদিন দেখবে এর সুফল অবশ্যই লাভ করতে পারবে। আজকের আমার এ’দেশনার প্রভাবে তোমাদের যদি জ্ঞান উদয় হয়ে অজ্ঞানতা বিদূরীত হয়, মিথ্যাভাব বিদূরীত হয়ে সত্যভাব উদয় হয় তাহলে তোমাদের পরম সুখ লাভ হবে। তোমার আর অধোগতি হবে না, সকল প্রকার দুঃখ, দুর্দশা নিঃশেষ হয়ে যাবে। তাই আবারো বলছি, তোমাদের যদি সত্যভাব উদয় হয়, জ্ঞান উদয় হয় তোমরা সুখী হতে পারবে। তোমাদের ভবিষ্যত চিরসুখ, শান্তিতে সমৃদ্ধিময় হয়ে উঠবে। আর অজ্ঞান, মিথ্যাভাব উদয় হয় তাহলে ভবিষ্যত ঘোর অন্ধকার বলে জানবে। তোমরা সকলে জ্ঞান, সত্যভাব উদয় করতে আপ্রাণ চেষ্টা কর। সে কাজে শত বাধা-বিপত্তি আসলেও পিছ পা হবে না। বরং সুপ্রোথিত ইন্দ্রখীলের ন্যায় সুদৃঢ়ভাবে বীর্যকে আকঁড়ে রেখে উন্নতি দিকে অগ্রসর হবে। এই প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে পারলে একদিন না একদিন জ্ঞান, সত্যভাব লাভ হবেই। আর সত্যভাব, জ্ঞান লাভ হলে সমস্ত দুঃখ-যাতনা, অজ্ঞান বিদূরীত হয়ে জ্ঞানের আলোকে আলোকিত হবে। সর্বদা মনে রাখবে—
সত্যভাব যতদিনে না উদিবে তব মনে,
ভব দুঃখ হবে না মোচন।
সাধু, সাধু, সাধু
No comments:
Post a Comment