Followers

Tuesday, November 14, 2017

অচলা শ্রদ্ধায় প্রত্যক্ষ ফল


বাংলাদেশ স্বাধীন হবার কয়েকমাস পরের কথা। পড়ন্ত বিকেলে। বনভান্তেকে পানীয় দান করে বাড়ীর পথ ধরলেন প্রতুল বিকাশ চাকমা ও গঙ্গাধন চাকমা। পথের মধ্যে দেখা হল থানা সমবায় কর্মকর্তা জনাব শামসুল হক এবং মৎস্য কর্মকর্তা বাবু সুকুমার বড়ুয়ার সাথে। অমনি শামসুল হল বলে উঠলেন—‘আপনাদের সাথে দেখা হয়ে বেশ ভালো হল। আমি যাচ্ছি বনভান্তের কাছে-বিহারে। তাঁর কাছ থেকে দোয়া ও পরমার্শ নেবে। আমাকে একটু সাহায্য করতে হবে আপনাদেরকে। চলুন, আবার বিহারে। কারণ উনার সাথে তো আপনাদের-ই ভালো পরিচয় রয়েছে। পরিচিত মানুষ হলে কথা বলতে সুবিধা হয়। তদুপরি আমি তো আপনাদের ধর্মীয় রীতি-নীতি জানি না। আমাকে সেসব দেখিয়ে দিতে হবে, উনার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। আপনাদের সাহায্য পেলে আমি সবকথা খুলে বলতে পারবো। আর তিনিও ভালোভাবে পরামর্শ দিতে পারবেন। সুতুরাং আবার বিহারে চলুন। অন্তত আমাকে সাহায্য করার জন্য হলেও।’ শামসুল হক সাহেবের অনুরোধ গৃহীত হল। এবার চারজন মিলে বনভান্তের কাছে আসলেন। প্রতুল বিকাশদেরকে দেখে ভান্তে বলে উঠলেন—তোমরা আবার ফিরে আসলে যে। প্রতুল বিকাশ চাকমা শামসুল হককে দেখায়ে দিয়ে বললেন—ভান্তে, উনি আমাদেরকে নিয়ে আসলেন। আপনার কাছে বিশেষ একটা দরকার আছে উনার। সেই দরকারে উনি এসেছেন। আপনাকে একটা সমধান দিতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে বনভান্তে শামসুল হকের দিকে তাকিয়ে বললেন—কী দরকারে এসেছেন, বলতে পারেন নিদ্বির্ধায়। ভান্তের নিকট হতে এমন আন্তরিকতার ছোঁয়া সাড়া পেয়ে শামসুল হক অভিভূত হলেন। বিনীত ও ভক্তিপূর্ণ চিত্তে সবিস্তারে বলতে লাগলেন তার স্ত্রীর দুরারোগ্য ব্যাধির কথা। বেশ বিধ্বস্ত গলায় বললেন—অনেক চিকিৎসা করেও কিছুতেই রোগ আরোগ্যের দিকে যাচ্ছে না। তাই আপনার নিকট দোয়া নিতে এসেছি। আপনি না বলতে পারবেন না। আপনার প্রতি আমার দৃঢ় বিশ্বাস, অচলা শ্রদ্ধা রয়েছে। আপনি যদি আমার স্ত্রীকে দোয়া করেন, তাহলে ওর রোগ ছেড়ে যাবে। শামসুল হকের কথা শুনে মুচকি হাসলেন ভান্তে। তারপর বললেন—আমি তো কোন ডাক্তার, বৈদ্য বা কবিরাজ নই। যদি সেরূপ একজন হতাম, তাহলে না হয় আপনার স্ত্রীর জন্য ওষুধ দিয়ে দিতাম। প্রেসক্রিপশান লেখা দিয়ে আপনার হাতে ধরিয়ে দিতাম। এখন আমি তো এদু’টো মধ্যে কোনটা-ই করতে পারবো না। এবার ভান্তে অনেক পর্যায়ে ধর্মদেশনা প্রদান করা শুরু করলেন। 
আর্য্যশ্রাবক বনভান্তে

বললেন, পূর্বে জন্মে কেউ যদি কোন প্রাণীকে দণ্ড-অস্ত্রাদি দ্বারা নানাভাবে নির্যাতন-নিপীড়ন করে, তাহলে তাকে এ’জন্মে দুরারোগ্যে ব্যাধিতে ভূগতে হয়। রোগের জ্বালা-যন্ত্রণায় দুঃখ পেতে হয়। কর্মফল শেষ না হওয়া পর্যন্ত আরোগ্য লাভ হয় না। তবে হ্যাঁ, অনেক সময় বর্তমানে পুণ্যকর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে সেই অকুশল কর্মের বিপাক লঘু হয়ে যায়। অনেকে আবার শীলবান, মহাপুরুষের সেবা-পূজায় বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি, আপদ-বিপদ, অন্তরায়-উপদ্রব হতে পরিত্রাণ পেয়ে থাকেন। এভাবে ভান্তে অনেকক্ষণ ধর্মদেশনা প্রদান করলেন। অতঃপর তাদেরকে বিদায় করে দিলেন।
তারা ধীর পায়ে এগুতে থাকলেন থানা সদরের দিকে। শামসুল হকের মুখে কোন কথা নেই। চোখে-মুখে বেশ বিষণ্ণতার চিহ্ন। ধীর পায়ে হাঁটছেন। কিছু পথ অতিক্রম করার পর প্রতুল বিকাশ চাকমার দিকে তাকালেন। আর মনমরা ভঙ্গিমায় বললেন—মাষ্টার, বনভান্তে তো আমার স্ত্রীর রোগের ব্যাপারে কিছুই বললেন না। আমার কী আরও করার আছে, বলুন তো? শামসুল হকের একথা শুনে প্রতুল বিকাশ বললেন—তাহলে আপনি সেব্যাপারে কিছুই বুঝেন নি? শামসুল হক—কেমনে বুঝবো। কই, তিনি তো কিছুই বলেন নি। প্রতুল বিকাশ এবার গঙ্গাধন চাকমাকে জিজ্ঞাসা করলেন—আচ্ছা, আপনি এব্যাপারে কি বুঝেছেন, বলুন তো? গঙ্গাধন চাকমা মাথা নেড়ে বললেন, কী আর বুঝবো। ভান্তে সে ব্যাপারে কিছু বলেছেন বলে তো মনে হয় না। অমনি প্রতুল বিকাশ বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে বললেন—আমি কিন্তু ভান্তের ধর্মদেশনার মধ্যে এব্যাপারে পরোক্ষ অভিমত ধরতে পেরেছি। উনার ইঙ্গিতের কথা ধরতে পেরেছি। আসল কথা হল, মহাপুরুষেরা সাধারণত সরাসরি বলেন না। তাঁরা মানুষের উন্নতি-অবনতি, সুখ-দুঃখ, মঙ্গল-অমঙ্গল, আপদ-বিপদ সবকিছুই জানতে পারেন। তবে সরাসরি সেগুলো বলে দেন না, আকারে-ইঙ্গিতে বলে থাকেন মাত্র। আমাদেরকে সেই ইঙ্গিতে থেকে বুঝে নিতে হয়—কী হবে, কী করতে হবে। আপনাদের মনে আছে কিনা জানি না। শ্রদ্ধেয় ভান্তে দেশনার ফাঁকে বলেছেন, “অনেক শীলবান, মহাপুরুষের সেবা-পূজায় বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি, আপদ-বিপদ, অন্তরায়-উপদ্রব হতে পরিত্রাণ পেয়ে থাকেন।” শ্রদ্ধেয় বনভান্তে যে একজন মহাপুরুষ এটা তো সবাই মানে। আপনিও মানেন। তিনি তো নিশ্চয় বলবেন না যে আমি মহাপুরুষ; আমাকে সেবা-পূজা করলে আপনার স্ত্রী আরোগ্য হয়ে উঠবেন। আমি তো বলবো, আপনি সৎভাবে উপার্জিত বেতনের টাকায় ভান্তেকে কিছু দান করেন। সেটা খাবার জাতীয় দানীয় বস্তুও হতে পারে। তবে ভান্তের প্রতি অচলা শ্রদ্ধা বা পূর্ণ আস্থা রাখতে হবে। একথা শুনে শামসুল হক সাহেবের বোধোদয় হল। হ্যাঁ, তাই তো। ভান্তে সেরূপ বলেছেন বৈকি। মুহূর্তেই তার দেহ-মন স্বস্তিতে ছেয়ে গেলে। সকৃতজ্ঞ চিত্তে বললেন—থ্যাংকস্‌‌, মাষ্টার সাব। আমি তো এভাবে ভাবতে পারি নি। আপনি ঠিক কথা-ই বলছেন। সত্যিই, শ্রদ্ধেয় ভান্তের ইঙ্গিতপূর্ণ কথা আপনি বুঝতে পেরেছেন। আমি আপনার কথামতো কাজ করবো। কয়েকদিন পর শামসুল হক সাহেব বনভান্তের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রেখে তার মাসিক বেতনের ১৫ টাকা দিয়ে খাদ্য-দ্রব্যাদি কিনে দিলেন। আর বাবু গঙ্গাধন চাকমার মাধ্যমে বনভান্তেকে দান করলেন। দান করার একসপ্তাহ পরে শামসুল হক ডাকে একটি চিঠি পেলেন। চিঠির খবরে তিনি মহা খুশি। মহা আনন্দে চিৎকার করে উঠলেন প্রায়। তার মনে আর আনন্দ, উচ্ছ্বাস ধরে না! কারণ তার স্ত্রীর রোগ উপশম হয়েছেন। এ’খবরটি সবার মুখে মুখে হল দু’য়েক দিনের মধ্যে। অমনি বনভান্তের প্রতি লোকজনের আরো বেশি প্রগাঢ় শ্রদ্ধা, বিশ্বাস উৎপন্ন হল।

সাধু সাধু সাধু

Wednesday, November 8, 2017

বৌদ্ধধর্ম ও বর্তমান বিশ্ব

ধর্ম অর্থ হলো গুণ। নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে কোন বস্তুর ক্রিয়া-বিক্রিয়াই হল উক্ত বস্তুর ভৌত ধর্ম। মানসের ক্ষেত্রে বভ অর্থে একটি মানুষ তার স্বকীয়সত্বার স্বতন্ত্র বৈশিষ্টের দ্বারা যে আদর্শ সৃষ্টি করে তাই তার ধর্ম। এ পৃথিবীতে সৃষ্ট প্রতিটি ধর্মই হল এক একজন (মহাপুরুষের) সাধকের আদর্শ। বুদ্ধের প্রবর্তিত ধর্ম হল বৌদ্ধ ধর্ম, আর বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে পৃথিবীর বর্তমান যে রূপ তাই হল বর্তমান বিশ্ব। বর্তমান বিশ্ব বিজ্ঞানের আশীর্বাদপুষ্ট। সুতরাং বৌদ্ধ ধর্ম এবং বর্তমান বিশ্বকে তুলনা করতে হলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভাবধারার সাথে বৌদ্ধ ধর্মকে তুলনা করতে হবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে এখানে বর্তমান বিশ্বের বৌদ্ধ জনসাধারণ এবং অন্যান্যদের বর্তমান সক্রিয় মৌল ভাবধারার বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। অনেকে বৌদ্ধ ধর্মকে বিজ্ঞানসম্মত ধর্ম বলে দাবী করেন।কিন্তু এ দাবী সম্পূর্ণ অর্থে রাখা যায় না। এখন বৌদ্ধ ধর্ম বিজ্ঞানের ভাবধারায় কতটুকু পরিপুষ্ট অর্থাৎ বর্তমান বিশ্বের ভাবধারার সাথে বৌদ্ধ ধর্মের কতটুকু মিল বা গরমিল রয়েছে তা যথেষ্ট আলোচ্য বিষয়।
পৃথিবী সৃষ্টি, এর উপর অবস্থানরত মনুষ্যজাতি তথা অন্যান্য প্রানী ও বস্তুর সৃষ্টি এবং মহাবিশ্বের বিচিত্র বিষয়টি মানুষের জ্ঞানের অতীত এবং যথেষ্ট বিতর্কিত। বিজ্ঞান মনে করে এসব সৃষ্টির পেছনে কোন সৃষ্টিকর্তা নেই। বিজ্ঞান মনে করে সৃষ্টির আদি অবস্থায় পৃথিবী একটি অগ্নিগোলক ছিল এবং কোন প্রাণের অস্তিত্ব তখন ছিল না। ক্রমবিবর্তন ধারার মধ্যে দিয়ে মানুষ সৃষ্ট জীবকুলের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বে উপনীত হয়েছে। এদিকে কর্মবাদী বৌদ্ধ ধর্মও বস্তবাদকে সমর্থন করে এবং সৃষ্টিকর্তা বিশ্বাসে নাস্তিকপন্থী। তবে এসব সৃষ্টির বিষয়ে কোন বিষয়ে কোন তথ্যই বৌদ্ধ ধর্মে স্পষ্ট নয়। বৌদ্ধ ধর্ম আবার বিজ্ঞানের বিবর্তনবাদ থেকে সতন্ত্র হয়ে দাবী করে যে, জীবকুল একটি ক্রমিকচক্রে আবর্তিত। কর্মানুযায়ী তাদের স্থান নিদিষ্ট হয়ে মানব কিংবা অন্যান্য প্রাণী এবং অন্যান্য অদৃশ্য সত্বায় আবর্তিত হয়। বৌদ্ধ ধর্মে এ ক্রমিকচক্রকে একত্রিশটি লোকভূমি হিসেবে বিভক্ত করা হয়েছে।
বর্তমানে প্রতিক্ষেত্রে স্বীকার করা হয় যে, পৃথিবী একটি রণক্ষেত্র। প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে এখানে বেঁচে থাকতে হয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যৌথ সক্রিয়তায় বর্তমানে মানুষের বিভিন্ন সহজ ও জটিল কর্মধারার উদ্ভব হচ্ছে। এদিকে বৌদ্ধ ধর্মেও কর্মকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, অনিন্দনীয় কর্মই হল ধর্ম। মহাকারুনিকের অভিনব আবিষ্কার ও দুঃখমুক্তির উপায় আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গে সৎভাবে জীবিকার্জনের কথা বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে বলা হয়েছে যে, বৌদ্ধ ধর্ম অর্থনীতিকেও সমর্থন করে। এছাড়া মঙ্গল সূত্রের ৪নং ও ৫নং গাথায় যথাক্রমে বলা হয়েছে যে, শাস্ত্রাদি শিক্ষা করে বহুশ্রুত হওয়া, শিল্প শিক্ষা করা, বিনয়ী ও সুশিক্ষিত হওয়া এবং সুভাষিত বাক্য বলাই উত্তম মঙ্গল এবং মাতা-পিতার সেবা করা, স্ত্রী-পুত্রগণের ভরণপোষণ করা এবং সৎভাবে জীবিকার্জনই উত্তম মঙ্গল। এক্ষেত্রে বর্তমান বিশ্বের ভাবধারার সাথে বৌদ্ধ ধর্মের যথেষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে। তবে বৌদ্ধ ধর্ম সর্বদা শিক্ষাকে সুশিক্ষা এবং কর্মকে অনিন্দনীয় কর্ম হওয়ার গুরুত্বারোপ করছে। প্রকৃতপক্ষে মানুষ নিজের প্রয়োজনের তাগিদে ধর্ম এবং বর্তমান বিজ্ঞান উভয়ই সৃষ্টি করেছে। ধর্মের একটা সম্পূর্ণ দিক এবং আদর্শ থাকে, কিন্তু বিজ্ঞানের কোন দিক নেই। ফলে ধর্মের সাথে বিজ্ঞানের কোন ক্ষেত্রে মিল থাকলেও কোন না কোন ক্ষেত্রে গরমিল থাকে। ধর্ম হল সম্পূর্ণ মানুষের মানবিক বিশ্বাসের সমষ্টি।
বৌদ্ধ ধর্ম একটি সোপানরূপী ধর্ম। এতে অতিসাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে উচ্চতর দার্শনিকদের জন্যও বিভিন্ন কর্মপন্থার উল্লেখ রয়েছে। বৌদ্ধ ধর্মের উচ্চতর পর্যায়ে এমন দর্শনতত্ত্ব রয়েছে যা স্বাভাবিক অবস্থায় মানুষের বোধগম্য নয়। সর্বোপরি অন্যান্য ধর্মের মতো বৌদ্ধ ধর্মেও অদৃশ্য আধ্যাত্বিক শক্তির কথা উল্লেখ রয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, এসব কিছু যথেষ্ট ধ্যান-ধারনার মাধ্যমেই উপলব্ধি করা সম্ভব। ফলে স্বাভাবিক মানুষের জ্ঞানের অতীত থাকে এবং অত্যন্ত রহস্যের প্রভাব বিস্তার করে। এজন্য বৌদ্ধ ধর্মকে বুঝতে হলে অনুরূপভাবে অর্থাৎ ক্রমিকভাবে এক স্তর থেকে অন্যস্তরে যেতে হবে। এছাড়া বৌদ্ধ ধর্মকে কেউ সাধারণ মানুষের কাছে বুঝাতে গেলেও একই সূত্র অনুসরণ করতে হবে। বর্তমানে অনেকে ধর্মকে জনসাধারণের কাছে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হঠাৎ করে উচ্চতর দর্শনতত্ত্বের আশ্রয় নেন। এটা সম্ভবত নিজেকে জনসমক্ষে গুরুগম্ভীর ব্যক্তিত্ব ভাবাপন্ন করে উপস্থাপন করার একটা অপপ্রয়াস, আর যা ব্যাখ্যা তাও বৌদ্ধ ধর্মের দৃষ্টিতে কতটুকু দায়মুক্ত তা বিবেচ্য বিষয়। এভাবে বৌদ্ধ ধর্মের মৌলিক ভাবমূর্তি ক্ষূন্ন হয়। এক্ষেত্রে সরল জনসাধারণ অনেকে অন্ধভাবে সমর্থন করে আর বাস্তবধর্মী বিজ্ঞানের সংস্পর্শে আহুত অনেক বৌদ্ধ জনসাধারণ বৌদ্ধ ধর্মকে অনেকক্ষেত্রে গোপনে এড়িয়ে চলে।

বুদ্ধ তার সমসাময়িক কালে নিজে এবং দ্বারা তার ধর্ম সুন্দরভাবে যুক্তির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করে দিয়েছিলেন। বুদ্ধ যে যে অবস্থায় ছিলেন সেই অবস্থায় যাতে বৌদ্ধ ধর্মের আদর্শ নিয়ে চলতে পারে তার জন্যও ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। যেমন গৃহীদের পঞ্চশীল, উপাসক-উপাসিকাদের জন্য অষ্টশীল, শ্রমণদের জন্য দশশীল, ভিক্ষুদের জন্য ২২৭ শীল ইত্যাদি। এজন্য তখন বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি অনেক মানুষ দুর্বল হয়ে পড়েছিল। বর্তমানে বৌদ্ধ ধর্মকে পুঁজি করে অনেকে উন্নতি লাভ করলেও তুলনামূলকভাবে বৌদ্ধ ধর্ম আজ ক্রম অবনতির সিঁড়িতে। মূলত এর প্রকৃত স্বরূপ বিশ্লেষন করার মতো জ্ঞানীদের যেমন ঘাটতি পড়েছে তেমনি অন্যান্য জনও এটি মূল্যায়নে আদৌ সচেতন নয়। এছাড়া বিশ্বের অনেক বৌদ্ধও বৌদ্ধ ধর্মের আদর্শ থেকে বিচ্যুতিমূলক কর্মকান্ডে জড়িত যাতে মানবিক মৌলিক ধর্মও অপদস্থের স্বীকার হয়। বলা যায় যুগের প্রভাবে ক্রমে ক্রমে মূল্যবোধের অবক্ষয়ের জন্যই বৌদ্ধ ধর্মকে মূল্যায়ন করা আজ সাধারণ মানুষের কাছে দুরূহ হয়ে পড়েছে। বুদ্ধ নিজেই চিন্তা করে শেষ পর্যন্ত বুঝতে পেরেছিলেন যে, পৃথিবীতে তাঁর ধর্মকে মূল্যায়ন করার মত মানুষ আছে এবং এজন্যই তিনি তাঁর ধর্ম প্রচার করেছেন। অতএব একটু সচেতনতার দ্বারা যদি বিশ্বের জনসাধারণ বৌদ্ধ ধর্মকে মূল্যায়নে সক্ষম হয় তাহলে বৌদ্ধ ধর্মের মত একটি কর্মবাদী ধর্মের আদর্শের মাধ্যমে একটি গতিশীল ও সমৃদ্ধশালী পৃথিবী গড়া সম্ভব।
লেখকঃ বিধায়ক চাকমা

Sunday, November 5, 2017

এ ধরণীর গর্বে ধন গৌতম বুদ্ধ

এ ধরণীর গর্বের ধন গৌতম বুদ্ধ
= ড. কাজী নূরুল ইসলাম=
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
গৌতম বুদ্ধ কেবলমাত্র বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক বা একজন মহান দার্শনিক নন। তিনি মানবজাতির গৌরব। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়- তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মানুষ। হিন্দু পণ্ডিতদের অনেকে এমনকি মহাত্না গান্ধী গৌতম বুদ্ধকে মনে করতেন একজন অবতার হিসাবে। দীর্ঘদিন ধরে অনেক মুসলিম গবেষক মনে করতেন যে, গৌতম বুদ্ধ একজন নবী ছিলেন। পৃথিবীতে দ্বিতীয় কোন ব্যক্তি নেই যাঁকে নিয়ে এত টানাটানি।তিনি অবতার ছিলেন কি-না বা একজন নবী ছিলেন কি-না তা জানি না, তবে এটুকু নির্দ্ধিধায় বলতে পারি, তিনি ছিলেন এ ধরণীর গর্বের ধন।
মানবতাবাদ এই মহান দার্শনিক মনব কল্যাণের জন্য ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। তিনি সুন্দরী স্ত্রী, শিশু-সন্তান, পিতা-মাতা এবং রাজ্য ত্যাগ করেছেন কোন স্বর্গ লাভের জন্য নয় বা কোন পরমেশ্বরকে পাবার উদ্দ্যেশ্য নয়। তার একমাত্র লক্ষ্য ছিল, মানুষকে কীভাবে দুঃখ-কষ্ট ও হতাশার হাত থেকে মুক্ত করা যায়। দীর্ঘ ছয় বছর ধরে যে কঠোর কৃচ্ছ সাধনার মাধ্যমে দুঃখের হাত থেকে মুক্তির পথের সন্ধান করেছেন তার তুলনা নিনি নিজেই।
তিনি ছিলেন একজন সমাজ সংস্কারক। তিনি হিন্দু ধর্মের বর্ণ প্রথার বিরুদ্ধে প্রচণ্ড সংগ্রামে লিপ্ত ছিলেন দীর্ঘ ৪৫ বছর। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রীয়, বৈশ্য ও শুদ্রের বিভাজন তিনি মানতেন না। সব বর্ণের মানুষকে তিনি সমান দৃষ্টিতে দেখতেন এবং সমভাবে শ্রদ্ধা করতেন। মানব সভ্যতার ইতিহাসে তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি সমাজে সার্বজনীনরূপে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেন। এখন থেকে অাড়াই হাজার বছর আগে এ ধরণের উদ্যোগ যে কত বড় মাপের তা কেবলমাত্র ইতিহাসবিদ এবং সমাজতত্ত্ববিদরাই অনুধাবন করতে পারবেন।
পাশ্চাত্যের অনেকে দাবী করেন যে, দর্শনের উৎপত্তি হয়েছে গ্রীসে। কিন্তু এ কথা সত্য নয়। গ্রীসের প্রথম দার্শনিক থেলিসের জন্মের বহু আগেই গৌতম বুদ্ধের দর্শন এ দেশকে আলোড়িত করেছিল। আজ পাশ্চাত্যের দেশগুলো অস্তিত্ববাদ (-------) যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদ (---------), প্রয়োগ বাদ (----) ইত্যাদি সমকালীন দার্শনিক সম্প্রদায় নিয়ে গর্ববোধ করে। কিন্তু তারা জানেনা এবং আমরাও অনেকে জানি না যে এ সমস্ত দর্শনের জন্ম বিগত একশত বছরে পাশ্চাত্যে হয়নি। এ জাতীয় দর্শনের উদ্ভব ঘটেছে আড়াই হাজার বছর আগে গৌতম বুদ্ধের হাতে।
পাশ্চাত্যে অস্তিত্ববাদের উদ্ভব হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে। এ দর্শনের মূল কথা হলো পৃথিবীর মানুষ দুঃখ কষ্ট বেদনার জ্বালায় অতিষ্ঠ।তাদের অস্তিত্ব আজ বিপন্ন। কাজেই আমাদের চিন্তা-চেতনা-জ্ঞান সাধনার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত কী করে দুঃখের হাত থেকে বাঁচতে পারি। গত শতাব্দিতে পাশ্চাত্যের অস্তিত্ববাদী দার্শনিকগণ যে বক্তব্য উপস্থাপন করে পৃথিবীময় আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন সে বক্তব্যই আরও সহজ এবং সরল করে বলে গেছেন গৌতম বুদ্ধ আড়াই হাজার বছর আগে। তাই অবশ্যই বলতে হবে, তিনি অস্তিত্ববাদী দর্শনের জনক।
যৌক্তি প্রত্যক্ষবাদ দর্শনের ইতিহাসে বিপ্লব এনেছে। এ সম্প্রদায়ের দার্শনিকগণ অধিবিদ্যার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, অধিবিদ্যাকে দর্শনের আলোচনার বাইরে ঠেলে দিয়েছেন। তাদের বক্তব্য হলো যা যাচাইযোগ্য নয় তা-ই অর্থহীন। আর এ কারণেই তারা ঈশ্বর, আত্না, মরণোত্তর জীবন ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনাকে অর্থহীন বলেছেন। কিন্তু পাশ্চাত্যে যোক্তিক প্রত্যক্ষবাদীরা যে কথা বলে সমকালীন বিশ্বে প্রশংসা কুড়াচ্ছেন সে কথাই গৌতম বুদ্ধ অনেক আগে বলে গেছেন। তিনি অধিবিদ্যা বিষয়ক প্রশ্নের উত্তর দেয়া থেকে বিরত থাকতেন। কারণ এ সমস্ত বিষয়ে পক্ষে ও বিপক্ষে অনেক কথা বলা যায়। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত উপনীত হওয়া যায় না। তাই এ বিষয় সর্ম্পকে আলোচনাকে তিনি বলেছেন অর্থহীন। আর এ করণে সার্বিক মূল্যায়নের পর এ কথা অনস্বীকার্য যে তিনিওই যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদেরও জনক।
প্রয়োগবাদী দর্শন মূলতঃ সমকালীন আমেরিকান দার্শনিকদের অবদান বলে মনে করা হয়। এ দর্শনের মূলমন্ত্র হলো যা কাজে লাগে অর্থাৎ যার উপযোগিতা আছে তাই অর্থপূর্ণ বা তাৎপর্যপূর্ণ।যার ব্যহারিক মুল্য নেই বা উপকারে আসে না তা নিয়ে ভাবা বা আলোচনা করা নিরর্থক। প্রয়োগবাদীদের শিক্ষা দর্শন বর্তমান বিশ্বের প্রায় সব দেশেই সাদরে গ্ররহীত হয়েছে। এই দর্শনের যে প্রধান কথা তা হলো প্রয়োজনীয়তা বা ব্যবহারিক মূল্য বা উপযোগিতা। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, গৌতম বুদ্ধ মানব ইতিহাসে প্রথম ব্যক্তি যিনি চিন্তা-চেতনা জ্ঞান সাধনার ক্ষেত্রে উপযোগিতাকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। আর সে কারণে সার্বিক মূল্যায়নের পর নিঃসন্দেহে এবং নির্দ্বিধায় বলা যায়, তিনিই প্রয়োগবাদী জীবন দর্শনের জনক।
জার্মান দার্শনিক শোপেনহাওয়ারের মতে বৌদ্ধধর্ম হলো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধর্ম। এখানে বলা প্রয়োজন যে, গৌতম বুদ্ধের শিক্ষা দ্বারা নীতি বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। কতিপয় বিষয়ে তাদের দর্শন অভিন্ন।
তাঁরা উভয়েই মনে করেন যে, এ জগৎ দুঃখে পরিপূর্ণ এবং আমরা সবাই দুঃখের সাগরে ভাসছি। শোপেনহাওয়ার বলেন যে, “হতে চাওয়া” “বাঁচতে চাওয়া” ইত্যাদি হচ্ছে দুঃখের মূলে। গৌতম বুদ্ধও কামনা বাসনাকেই সমস্ত দুঃখের কারণ বলে মনে করতেন। তিনি বলেন, যেহেতু আমাদের কামনা বাসনার শেষ নেই সেহেতু আমাদের দুঃখের শেষ নেই। শোপেনহাওয়ার বলেন, আমাদের সাধ অনন্ত তাই দুঃখও অনন্ত। তাঁরা উভয়েই মনে করেন যে মৃত্যু আমাদের দুঃখের হাত থেকে বাঁচাতে পারেন না, মৃত্যু দুঃখের ব্যাপারে কোন সমাধান নয়। গৌতম বুদ্ধের শিক্ষাকে শোপেনহাওয়ারের কাছে অন্য যে কোন ধর্মীয় নেতার শিক্ষার চেয়ে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ এবং মানবাজাতির কল্যাণের জন্য অধিকতর গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়েছে আর সে কারনে খ্রিস্টান ঘরে জন্মগ্রহণ করে এবং খ্রিস্ট পরিবেশে বড় হবার পরও তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে বৌদ্ধ ধর্মই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধর্ম।

বার্ট্রান্ড রাসেলের মতো দার্শনিকও ছিলেন গৌতম বুদ্ধের প্রতি একান্ত শ্রদ্ধাশীল। জীবনের শেষ পর্যায়ে এক সাক্ষাৎকারে তিনি অপকটে স্বীকার করেন যে, পৃথিবীর অন্য যে কোন ধর্মের তুলনায় তিনি বৌদ্ধ দর্শনকে অধিক পছন্দ করেন। তবে বৌদ্ধ ধর্মের শুরুতে যে শিক্ষা প্রচলিত ছিল কেবলমাত্র সেটাকেই তিনি ভালবাসতেন ও শ্রদ্ধা করতেন। তাঁর মতো এই নিবন্ধকারও মনে করেন যে, বৌদ্ধ ধর্মের প্রাথমিক স্তরেই গৌতম বুদ্ধের শিক্ষা ছিল অবিকৃত। আজ ২৫৫৭ বুদ্ধাব্দের শুরুতেই সংশ্লিষ্ট সকলের প্রার্থনা হোক, গৌতম বুদ্ধের মুল ও অবিকৃত শিক্ষার নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হোক এবং বুদ্ধবাণী সারা পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিরাট ভূমিকা পালন করুক।

লেখক পরিচিতিঃ ড. কাজী নূরুল ইসলাম, প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, বিশ্বধর্মতত্ব বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।