বাংলাদেশ স্বাধীন হবার কয়েকমাস পরের কথা। পড়ন্ত বিকেলে। বনভান্তেকে পানীয় দান করে বাড়ীর পথ ধরলেন প্রতুল বিকাশ চাকমা ও গঙ্গাধন চাকমা। পথের মধ্যে দেখা হল থানা সমবায় কর্মকর্তা জনাব শামসুল হক এবং মৎস্য কর্মকর্তা বাবু সুকুমার বড়ুয়ার সাথে। অমনি শামসুল হল বলে উঠলেন—‘আপনাদের সাথে দেখা হয়ে বেশ ভালো হল। আমি যাচ্ছি বনভান্তের কাছে-বিহারে। তাঁর কাছ থেকে দোয়া ও পরমার্শ নেবে। আমাকে একটু সাহায্য করতে হবে আপনাদেরকে। চলুন, আবার বিহারে। কারণ উনার সাথে তো আপনাদের-ই ভালো পরিচয় রয়েছে। পরিচিত মানুষ হলে কথা বলতে সুবিধা হয়। তদুপরি আমি তো আপনাদের ধর্মীয় রীতি-নীতি জানি না। আমাকে সেসব দেখিয়ে দিতে হবে, উনার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। আপনাদের সাহায্য পেলে আমি সবকথা খুলে বলতে পারবো। আর তিনিও ভালোভাবে পরামর্শ দিতে পারবেন। সুতুরাং আবার বিহারে চলুন। অন্তত আমাকে সাহায্য করার জন্য হলেও।’ শামসুল হক সাহেবের অনুরোধ গৃহীত হল। এবার চারজন মিলে বনভান্তের কাছে আসলেন। প্রতুল বিকাশদেরকে দেখে ভান্তে বলে উঠলেন—তোমরা আবার ফিরে আসলে যে। প্রতুল বিকাশ চাকমা শামসুল হককে দেখায়ে দিয়ে বললেন—ভান্তে, উনি আমাদেরকে নিয়ে আসলেন। আপনার কাছে বিশেষ একটা দরকার আছে উনার। সেই দরকারে উনি এসেছেন। আপনাকে একটা সমধান দিতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে বনভান্তে শামসুল হকের দিকে তাকিয়ে বললেন—কী দরকারে এসেছেন, বলতে পারেন নিদ্বির্ধায়। ভান্তের নিকট হতে এমন আন্তরিকতার ছোঁয়া সাড়া পেয়ে শামসুল হক অভিভূত হলেন। বিনীত ও ভক্তিপূর্ণ চিত্তে সবিস্তারে বলতে লাগলেন তার স্ত্রীর দুরারোগ্য ব্যাধির কথা। বেশ বিধ্বস্ত গলায় বললেন—অনেক চিকিৎসা করেও কিছুতেই রোগ আরোগ্যের দিকে যাচ্ছে না। তাই আপনার নিকট দোয়া নিতে এসেছি। আপনি না বলতে পারবেন না। আপনার প্রতি আমার দৃঢ় বিশ্বাস, অচলা শ্রদ্ধা রয়েছে। আপনি যদি আমার স্ত্রীকে দোয়া করেন, তাহলে ওর রোগ ছেড়ে যাবে। শামসুল হকের কথা শুনে মুচকি হাসলেন ভান্তে। তারপর বললেন—আমি তো কোন ডাক্তার, বৈদ্য বা কবিরাজ নই। যদি সেরূপ একজন হতাম, তাহলে না হয় আপনার স্ত্রীর জন্য ওষুধ দিয়ে দিতাম। প্রেসক্রিপশান লেখা দিয়ে আপনার হাতে ধরিয়ে দিতাম। এখন আমি তো এদু’টো মধ্যে কোনটা-ই করতে পারবো না। এবার ভান্তে অনেক পর্যায়ে ধর্মদেশনা প্রদান করা শুরু করলেন।
![]() |
| আর্য্যশ্রাবক বনভান্তে |
বললেন, পূর্বে জন্মে কেউ যদি কোন প্রাণীকে দণ্ড-অস্ত্রাদি দ্বারা নানাভাবে নির্যাতন-নিপীড়ন করে, তাহলে তাকে এ’জন্মে দুরারোগ্যে ব্যাধিতে ভূগতে হয়। রোগের জ্বালা-যন্ত্রণায় দুঃখ পেতে হয়। কর্মফল শেষ না হওয়া পর্যন্ত আরোগ্য লাভ হয় না। তবে হ্যাঁ, অনেক সময় বর্তমানে পুণ্যকর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে সেই অকুশল কর্মের বিপাক লঘু হয়ে যায়। অনেকে আবার শীলবান, মহাপুরুষের সেবা-পূজায় বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি, আপদ-বিপদ, অন্তরায়-উপদ্রব হতে পরিত্রাণ পেয়ে থাকেন। এভাবে ভান্তে অনেকক্ষণ ধর্মদেশনা প্রদান করলেন। অতঃপর তাদেরকে বিদায় করে দিলেন।
তারা ধীর পায়ে এগুতে থাকলেন থানা সদরের দিকে। শামসুল হকের মুখে কোন কথা নেই। চোখে-মুখে বেশ বিষণ্ণতার চিহ্ন। ধীর পায়ে হাঁটছেন। কিছু পথ অতিক্রম করার পর প্রতুল বিকাশ চাকমার দিকে তাকালেন। আর মনমরা ভঙ্গিমায় বললেন—মাষ্টার, বনভান্তে তো আমার স্ত্রীর রোগের ব্যাপারে কিছুই বললেন না। আমার কী আরও করার আছে, বলুন তো? শামসুল হকের একথা শুনে প্রতুল বিকাশ বললেন—তাহলে আপনি সেব্যাপারে কিছুই বুঝেন নি? শামসুল হক—কেমনে বুঝবো। কই, তিনি তো কিছুই বলেন নি। প্রতুল বিকাশ এবার গঙ্গাধন চাকমাকে জিজ্ঞাসা করলেন—আচ্ছা, আপনি এব্যাপারে কি বুঝেছেন, বলুন তো? গঙ্গাধন চাকমা মাথা নেড়ে বললেন, কী আর বুঝবো। ভান্তে সে ব্যাপারে কিছু বলেছেন বলে তো মনে হয় না। অমনি প্রতুল বিকাশ বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে বললেন—আমি কিন্তু ভান্তের ধর্মদেশনার মধ্যে এব্যাপারে পরোক্ষ অভিমত ধরতে পেরেছি। উনার ইঙ্গিতের কথা ধরতে পেরেছি। আসল কথা হল, মহাপুরুষেরা সাধারণত সরাসরি বলেন না। তাঁরা মানুষের উন্নতি-অবনতি, সুখ-দুঃখ, মঙ্গল-অমঙ্গল, আপদ-বিপদ সবকিছুই জানতে পারেন। তবে সরাসরি সেগুলো বলে দেন না, আকারে-ইঙ্গিতে বলে থাকেন মাত্র। আমাদেরকে সেই ইঙ্গিতে থেকে বুঝে নিতে হয়—কী হবে, কী করতে হবে। আপনাদের মনে আছে কিনা জানি না। শ্রদ্ধেয় ভান্তে দেশনার ফাঁকে বলেছেন, “অনেক শীলবান, মহাপুরুষের সেবা-পূজায় বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি, আপদ-বিপদ, অন্তরায়-উপদ্রব হতে পরিত্রাণ পেয়ে থাকেন।” শ্রদ্ধেয় বনভান্তে যে একজন মহাপুরুষ এটা তো সবাই মানে। আপনিও মানেন। তিনি তো নিশ্চয় বলবেন না যে আমি মহাপুরুষ; আমাকে সেবা-পূজা করলে আপনার স্ত্রী আরোগ্য হয়ে উঠবেন। আমি তো বলবো, আপনি সৎভাবে উপার্জিত বেতনের টাকায় ভান্তেকে কিছু দান করেন। সেটা খাবার জাতীয় দানীয় বস্তুও হতে পারে। তবে ভান্তের প্রতি অচলা শ্রদ্ধা বা পূর্ণ আস্থা রাখতে হবে। একথা শুনে শামসুল হক সাহেবের বোধোদয় হল। হ্যাঁ, তাই তো। ভান্তে সেরূপ বলেছেন বৈকি। মুহূর্তেই তার দেহ-মন স্বস্তিতে ছেয়ে গেলে। সকৃতজ্ঞ চিত্তে বললেন—থ্যাংকস্, মাষ্টার সাব। আমি তো এভাবে ভাবতে পারি নি। আপনি ঠিক কথা-ই বলছেন। সত্যিই, শ্রদ্ধেয় ভান্তের ইঙ্গিতপূর্ণ কথা আপনি বুঝতে পেরেছেন। আমি আপনার কথামতো কাজ করবো। কয়েকদিন পর শামসুল হক সাহেব বনভান্তের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রেখে তার মাসিক বেতনের ১৫ টাকা দিয়ে খাদ্য-দ্রব্যাদি কিনে দিলেন। আর বাবু গঙ্গাধন চাকমার মাধ্যমে বনভান্তেকে দান করলেন। দান করার একসপ্তাহ পরে শামসুল হক ডাকে একটি চিঠি পেলেন। চিঠির খবরে তিনি মহা খুশি। মহা আনন্দে চিৎকার করে উঠলেন প্রায়। তার মনে আর আনন্দ, উচ্ছ্বাস ধরে না! কারণ তার স্ত্রীর রোগ উপশম হয়েছেন। এ’খবরটি সবার মুখে মুখে হল দু’য়েক দিনের মধ্যে। অমনি বনভান্তের প্রতি লোকজনের আরো বেশি প্রগাঢ় শ্রদ্ধা, বিশ্বাস উৎপন্ন হল।
সাধু সাধু সাধু
তারা ধীর পায়ে এগুতে থাকলেন থানা সদরের দিকে। শামসুল হকের মুখে কোন কথা নেই। চোখে-মুখে বেশ বিষণ্ণতার চিহ্ন। ধীর পায়ে হাঁটছেন। কিছু পথ অতিক্রম করার পর প্রতুল বিকাশ চাকমার দিকে তাকালেন। আর মনমরা ভঙ্গিমায় বললেন—মাষ্টার, বনভান্তে তো আমার স্ত্রীর রোগের ব্যাপারে কিছুই বললেন না। আমার কী আরও করার আছে, বলুন তো? শামসুল হকের একথা শুনে প্রতুল বিকাশ বললেন—তাহলে আপনি সেব্যাপারে কিছুই বুঝেন নি? শামসুল হক—কেমনে বুঝবো। কই, তিনি তো কিছুই বলেন নি। প্রতুল বিকাশ এবার গঙ্গাধন চাকমাকে জিজ্ঞাসা করলেন—আচ্ছা, আপনি এব্যাপারে কি বুঝেছেন, বলুন তো? গঙ্গাধন চাকমা মাথা নেড়ে বললেন, কী আর বুঝবো। ভান্তে সে ব্যাপারে কিছু বলেছেন বলে তো মনে হয় না। অমনি প্রতুল বিকাশ বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে বললেন—আমি কিন্তু ভান্তের ধর্মদেশনার মধ্যে এব্যাপারে পরোক্ষ অভিমত ধরতে পেরেছি। উনার ইঙ্গিতের কথা ধরতে পেরেছি। আসল কথা হল, মহাপুরুষেরা সাধারণত সরাসরি বলেন না। তাঁরা মানুষের উন্নতি-অবনতি, সুখ-দুঃখ, মঙ্গল-অমঙ্গল, আপদ-বিপদ সবকিছুই জানতে পারেন। তবে সরাসরি সেগুলো বলে দেন না, আকারে-ইঙ্গিতে বলে থাকেন মাত্র। আমাদেরকে সেই ইঙ্গিতে থেকে বুঝে নিতে হয়—কী হবে, কী করতে হবে। আপনাদের মনে আছে কিনা জানি না। শ্রদ্ধেয় ভান্তে দেশনার ফাঁকে বলেছেন, “অনেক শীলবান, মহাপুরুষের সেবা-পূজায় বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি, আপদ-বিপদ, অন্তরায়-উপদ্রব হতে পরিত্রাণ পেয়ে থাকেন।” শ্রদ্ধেয় বনভান্তে যে একজন মহাপুরুষ এটা তো সবাই মানে। আপনিও মানেন। তিনি তো নিশ্চয় বলবেন না যে আমি মহাপুরুষ; আমাকে সেবা-পূজা করলে আপনার স্ত্রী আরোগ্য হয়ে উঠবেন। আমি তো বলবো, আপনি সৎভাবে উপার্জিত বেতনের টাকায় ভান্তেকে কিছু দান করেন। সেটা খাবার জাতীয় দানীয় বস্তুও হতে পারে। তবে ভান্তের প্রতি অচলা শ্রদ্ধা বা পূর্ণ আস্থা রাখতে হবে। একথা শুনে শামসুল হক সাহেবের বোধোদয় হল। হ্যাঁ, তাই তো। ভান্তে সেরূপ বলেছেন বৈকি। মুহূর্তেই তার দেহ-মন স্বস্তিতে ছেয়ে গেলে। সকৃতজ্ঞ চিত্তে বললেন—থ্যাংকস্, মাষ্টার সাব। আমি তো এভাবে ভাবতে পারি নি। আপনি ঠিক কথা-ই বলছেন। সত্যিই, শ্রদ্ধেয় ভান্তের ইঙ্গিতপূর্ণ কথা আপনি বুঝতে পেরেছেন। আমি আপনার কথামতো কাজ করবো। কয়েকদিন পর শামসুল হক সাহেব বনভান্তের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রেখে তার মাসিক বেতনের ১৫ টাকা দিয়ে খাদ্য-দ্রব্যাদি কিনে দিলেন। আর বাবু গঙ্গাধন চাকমার মাধ্যমে বনভান্তেকে দান করলেন। দান করার একসপ্তাহ পরে শামসুল হক ডাকে একটি চিঠি পেলেন। চিঠির খবরে তিনি মহা খুশি। মহা আনন্দে চিৎকার করে উঠলেন প্রায়। তার মনে আর আনন্দ, উচ্ছ্বাস ধরে না! কারণ তার স্ত্রীর রোগ উপশম হয়েছেন। এ’খবরটি সবার মুখে মুখে হল দু’য়েক দিনের মধ্যে। অমনি বনভান্তের প্রতি লোকজনের আরো বেশি প্রগাঢ় শ্রদ্ধা, বিশ্বাস উৎপন্ন হল।
সাধু সাধু সাধু


