Followers

Wednesday, November 8, 2017

বৌদ্ধধর্ম ও বর্তমান বিশ্ব

ধর্ম অর্থ হলো গুণ। নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে কোন বস্তুর ক্রিয়া-বিক্রিয়াই হল উক্ত বস্তুর ভৌত ধর্ম। মানসের ক্ষেত্রে বভ অর্থে একটি মানুষ তার স্বকীয়সত্বার স্বতন্ত্র বৈশিষ্টের দ্বারা যে আদর্শ সৃষ্টি করে তাই তার ধর্ম। এ পৃথিবীতে সৃষ্ট প্রতিটি ধর্মই হল এক একজন (মহাপুরুষের) সাধকের আদর্শ। বুদ্ধের প্রবর্তিত ধর্ম হল বৌদ্ধ ধর্ম, আর বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে পৃথিবীর বর্তমান যে রূপ তাই হল বর্তমান বিশ্ব। বর্তমান বিশ্ব বিজ্ঞানের আশীর্বাদপুষ্ট। সুতরাং বৌদ্ধ ধর্ম এবং বর্তমান বিশ্বকে তুলনা করতে হলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভাবধারার সাথে বৌদ্ধ ধর্মকে তুলনা করতে হবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে এখানে বর্তমান বিশ্বের বৌদ্ধ জনসাধারণ এবং অন্যান্যদের বর্তমান সক্রিয় মৌল ভাবধারার বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। অনেকে বৌদ্ধ ধর্মকে বিজ্ঞানসম্মত ধর্ম বলে দাবী করেন।কিন্তু এ দাবী সম্পূর্ণ অর্থে রাখা যায় না। এখন বৌদ্ধ ধর্ম বিজ্ঞানের ভাবধারায় কতটুকু পরিপুষ্ট অর্থাৎ বর্তমান বিশ্বের ভাবধারার সাথে বৌদ্ধ ধর্মের কতটুকু মিল বা গরমিল রয়েছে তা যথেষ্ট আলোচ্য বিষয়।
পৃথিবী সৃষ্টি, এর উপর অবস্থানরত মনুষ্যজাতি তথা অন্যান্য প্রানী ও বস্তুর সৃষ্টি এবং মহাবিশ্বের বিচিত্র বিষয়টি মানুষের জ্ঞানের অতীত এবং যথেষ্ট বিতর্কিত। বিজ্ঞান মনে করে এসব সৃষ্টির পেছনে কোন সৃষ্টিকর্তা নেই। বিজ্ঞান মনে করে সৃষ্টির আদি অবস্থায় পৃথিবী একটি অগ্নিগোলক ছিল এবং কোন প্রাণের অস্তিত্ব তখন ছিল না। ক্রমবিবর্তন ধারার মধ্যে দিয়ে মানুষ সৃষ্ট জীবকুলের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বে উপনীত হয়েছে। এদিকে কর্মবাদী বৌদ্ধ ধর্মও বস্তবাদকে সমর্থন করে এবং সৃষ্টিকর্তা বিশ্বাসে নাস্তিকপন্থী। তবে এসব সৃষ্টির বিষয়ে কোন বিষয়ে কোন তথ্যই বৌদ্ধ ধর্মে স্পষ্ট নয়। বৌদ্ধ ধর্ম আবার বিজ্ঞানের বিবর্তনবাদ থেকে সতন্ত্র হয়ে দাবী করে যে, জীবকুল একটি ক্রমিকচক্রে আবর্তিত। কর্মানুযায়ী তাদের স্থান নিদিষ্ট হয়ে মানব কিংবা অন্যান্য প্রাণী এবং অন্যান্য অদৃশ্য সত্বায় আবর্তিত হয়। বৌদ্ধ ধর্মে এ ক্রমিকচক্রকে একত্রিশটি লোকভূমি হিসেবে বিভক্ত করা হয়েছে।
বর্তমানে প্রতিক্ষেত্রে স্বীকার করা হয় যে, পৃথিবী একটি রণক্ষেত্র। প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে এখানে বেঁচে থাকতে হয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যৌথ সক্রিয়তায় বর্তমানে মানুষের বিভিন্ন সহজ ও জটিল কর্মধারার উদ্ভব হচ্ছে। এদিকে বৌদ্ধ ধর্মেও কর্মকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, অনিন্দনীয় কর্মই হল ধর্ম। মহাকারুনিকের অভিনব আবিষ্কার ও দুঃখমুক্তির উপায় আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গে সৎভাবে জীবিকার্জনের কথা বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে বলা হয়েছে যে, বৌদ্ধ ধর্ম অর্থনীতিকেও সমর্থন করে। এছাড়া মঙ্গল সূত্রের ৪নং ও ৫নং গাথায় যথাক্রমে বলা হয়েছে যে, শাস্ত্রাদি শিক্ষা করে বহুশ্রুত হওয়া, শিল্প শিক্ষা করা, বিনয়ী ও সুশিক্ষিত হওয়া এবং সুভাষিত বাক্য বলাই উত্তম মঙ্গল এবং মাতা-পিতার সেবা করা, স্ত্রী-পুত্রগণের ভরণপোষণ করা এবং সৎভাবে জীবিকার্জনই উত্তম মঙ্গল। এক্ষেত্রে বর্তমান বিশ্বের ভাবধারার সাথে বৌদ্ধ ধর্মের যথেষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে। তবে বৌদ্ধ ধর্ম সর্বদা শিক্ষাকে সুশিক্ষা এবং কর্মকে অনিন্দনীয় কর্ম হওয়ার গুরুত্বারোপ করছে। প্রকৃতপক্ষে মানুষ নিজের প্রয়োজনের তাগিদে ধর্ম এবং বর্তমান বিজ্ঞান উভয়ই সৃষ্টি করেছে। ধর্মের একটা সম্পূর্ণ দিক এবং আদর্শ থাকে, কিন্তু বিজ্ঞানের কোন দিক নেই। ফলে ধর্মের সাথে বিজ্ঞানের কোন ক্ষেত্রে মিল থাকলেও কোন না কোন ক্ষেত্রে গরমিল থাকে। ধর্ম হল সম্পূর্ণ মানুষের মানবিক বিশ্বাসের সমষ্টি।
বৌদ্ধ ধর্ম একটি সোপানরূপী ধর্ম। এতে অতিসাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে উচ্চতর দার্শনিকদের জন্যও বিভিন্ন কর্মপন্থার উল্লেখ রয়েছে। বৌদ্ধ ধর্মের উচ্চতর পর্যায়ে এমন দর্শনতত্ত্ব রয়েছে যা স্বাভাবিক অবস্থায় মানুষের বোধগম্য নয়। সর্বোপরি অন্যান্য ধর্মের মতো বৌদ্ধ ধর্মেও অদৃশ্য আধ্যাত্বিক শক্তির কথা উল্লেখ রয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, এসব কিছু যথেষ্ট ধ্যান-ধারনার মাধ্যমেই উপলব্ধি করা সম্ভব। ফলে স্বাভাবিক মানুষের জ্ঞানের অতীত থাকে এবং অত্যন্ত রহস্যের প্রভাব বিস্তার করে। এজন্য বৌদ্ধ ধর্মকে বুঝতে হলে অনুরূপভাবে অর্থাৎ ক্রমিকভাবে এক স্তর থেকে অন্যস্তরে যেতে হবে। এছাড়া বৌদ্ধ ধর্মকে কেউ সাধারণ মানুষের কাছে বুঝাতে গেলেও একই সূত্র অনুসরণ করতে হবে। বর্তমানে অনেকে ধর্মকে জনসাধারণের কাছে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হঠাৎ করে উচ্চতর দর্শনতত্ত্বের আশ্রয় নেন। এটা সম্ভবত নিজেকে জনসমক্ষে গুরুগম্ভীর ব্যক্তিত্ব ভাবাপন্ন করে উপস্থাপন করার একটা অপপ্রয়াস, আর যা ব্যাখ্যা তাও বৌদ্ধ ধর্মের দৃষ্টিতে কতটুকু দায়মুক্ত তা বিবেচ্য বিষয়। এভাবে বৌদ্ধ ধর্মের মৌলিক ভাবমূর্তি ক্ষূন্ন হয়। এক্ষেত্রে সরল জনসাধারণ অনেকে অন্ধভাবে সমর্থন করে আর বাস্তবধর্মী বিজ্ঞানের সংস্পর্শে আহুত অনেক বৌদ্ধ জনসাধারণ বৌদ্ধ ধর্মকে অনেকক্ষেত্রে গোপনে এড়িয়ে চলে।

বুদ্ধ তার সমসাময়িক কালে নিজে এবং দ্বারা তার ধর্ম সুন্দরভাবে যুক্তির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করে দিয়েছিলেন। বুদ্ধ যে যে অবস্থায় ছিলেন সেই অবস্থায় যাতে বৌদ্ধ ধর্মের আদর্শ নিয়ে চলতে পারে তার জন্যও ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। যেমন গৃহীদের পঞ্চশীল, উপাসক-উপাসিকাদের জন্য অষ্টশীল, শ্রমণদের জন্য দশশীল, ভিক্ষুদের জন্য ২২৭ শীল ইত্যাদি। এজন্য তখন বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি অনেক মানুষ দুর্বল হয়ে পড়েছিল। বর্তমানে বৌদ্ধ ধর্মকে পুঁজি করে অনেকে উন্নতি লাভ করলেও তুলনামূলকভাবে বৌদ্ধ ধর্ম আজ ক্রম অবনতির সিঁড়িতে। মূলত এর প্রকৃত স্বরূপ বিশ্লেষন করার মতো জ্ঞানীদের যেমন ঘাটতি পড়েছে তেমনি অন্যান্য জনও এটি মূল্যায়নে আদৌ সচেতন নয়। এছাড়া বিশ্বের অনেক বৌদ্ধও বৌদ্ধ ধর্মের আদর্শ থেকে বিচ্যুতিমূলক কর্মকান্ডে জড়িত যাতে মানবিক মৌলিক ধর্মও অপদস্থের স্বীকার হয়। বলা যায় যুগের প্রভাবে ক্রমে ক্রমে মূল্যবোধের অবক্ষয়ের জন্যই বৌদ্ধ ধর্মকে মূল্যায়ন করা আজ সাধারণ মানুষের কাছে দুরূহ হয়ে পড়েছে। বুদ্ধ নিজেই চিন্তা করে শেষ পর্যন্ত বুঝতে পেরেছিলেন যে, পৃথিবীতে তাঁর ধর্মকে মূল্যায়ন করার মত মানুষ আছে এবং এজন্যই তিনি তাঁর ধর্ম প্রচার করেছেন। অতএব একটু সচেতনতার দ্বারা যদি বিশ্বের জনসাধারণ বৌদ্ধ ধর্মকে মূল্যায়নে সক্ষম হয় তাহলে বৌদ্ধ ধর্মের মত একটি কর্মবাদী ধর্মের আদর্শের মাধ্যমে একটি গতিশীল ও সমৃদ্ধশালী পৃথিবী গড়া সম্ভব।
লেখকঃ বিধায়ক চাকমা

No comments:

Post a Comment