দেহ ও মন কোনটি আগে?
-----ভদন্ত প্রজ্ঞাবংশ মহাথেরো
দেহের উৎপত্তি আগে, না মন বা প্রাণের উৎপত্তি আগে এই নিয়ে বিতর্ক বহু প্রাচীন। পাখি আগে না ডিমটি আগে সৃষ্টিতত্ত নিয়ে এই দ্বান্ধিক বিতর্কের শেষ নেই। ঘন্টার পর ঘন্টা, দিনের পর দিন মাসের পর মাস বছরের পর বছর যুগান্তর চলে গেছে এই নিয়ে তবুও বিতর্কটির যৌক্তিক সমাধান কোন ধর্মপ্রবক্তা, কোন দার্শনিক, কোন বৈজ্ঞানিক অতীতে দিতে পারেননি। ভবিষ্যতেও কেহ দিতে পারবেন না বলে মহাজ্ঞানী বুদ্ধ সতর্ক করে দিয়েছেন। অতীতে এ প্রশ্নের সমাধানে অক্ষম হয়ে কোন কোন ধর্মপ্রবক্তা ঈশ্বর, স্রষ্টা- ইত্যাদি নামক কাল্পনিক অদৃশ্য মহাশক্তিকে আদি খুঁটি রূপে ধরে নিয়ে সৃষ্টি তত্ত্বের মহাকাব্য রচনা করেছেন। অধিকাংশ দার্শনিকগণও তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। তাই তাঁদেরকে বৌদ্ধিক পরিভাষায় শ্বাশ্বতবাদী বলা হয়। ঘোর বস্তুতান্ত্রিক বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিকগণ উপরোক্ত অদৃশ্য শক্তিকে অস্বীকার করেন। তাই মৃত্যুর পর জন্মান্তরবাদ বা স্বর্গ-নরকাদি কিছুতেই তাঁদের বিশ্বাস নেই এ নিয়ে মাথা ব্যথাও নেই। তাঁরা মননের এক নিবিষ্ট গবেষণায় বস্তুকে মানুষের ও জীব জগতের প্রয়োজনে ভোগ স্বাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধির কাজে লাগানোকে চূড়ান্ত প্রাধান্য দিয়ে চলেছেন।
-----ভদন্ত প্রজ্ঞাবংশ মহাথেরো
দেহের উৎপত্তি আগে, না মন বা প্রাণের উৎপত্তি আগে এই নিয়ে বিতর্ক বহু প্রাচীন। পাখি আগে না ডিমটি আগে সৃষ্টিতত্ত নিয়ে এই দ্বান্ধিক বিতর্কের শেষ নেই। ঘন্টার পর ঘন্টা, দিনের পর দিন মাসের পর মাস বছরের পর বছর যুগান্তর চলে গেছে এই নিয়ে তবুও বিতর্কটির যৌক্তিক সমাধান কোন ধর্মপ্রবক্তা, কোন দার্শনিক, কোন বৈজ্ঞানিক অতীতে দিতে পারেননি। ভবিষ্যতেও কেহ দিতে পারবেন না বলে মহাজ্ঞানী বুদ্ধ সতর্ক করে দিয়েছেন। অতীতে এ প্রশ্নের সমাধানে অক্ষম হয়ে কোন কোন ধর্মপ্রবক্তা ঈশ্বর, স্রষ্টা- ইত্যাদি নামক কাল্পনিক অদৃশ্য মহাশক্তিকে আদি খুঁটি রূপে ধরে নিয়ে সৃষ্টি তত্ত্বের মহাকাব্য রচনা করেছেন। অধিকাংশ দার্শনিকগণও তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। তাই তাঁদেরকে বৌদ্ধিক পরিভাষায় শ্বাশ্বতবাদী বলা হয়। ঘোর বস্তুতান্ত্রিক বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিকগণ উপরোক্ত অদৃশ্য শক্তিকে অস্বীকার করেন। তাই মৃত্যুর পর জন্মান্তরবাদ বা স্বর্গ-নরকাদি কিছুতেই তাঁদের বিশ্বাস নেই এ নিয়ে মাথা ব্যথাও নেই। তাঁরা মননের এক নিবিষ্ট গবেষণায় বস্তুকে মানুষের ও জীব জগতের প্রয়োজনে ভোগ স্বাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধির কাজে লাগানোকে চূড়ান্ত প্রাধান্য দিয়ে চলেছেন।
বৌদ্ধিক পরিভাষায় এ জাতীয় মনন ও প্রবৃত্তিকে উচ্ছেদবাদ বলা হয়। শ্বাশ্বতবাদ ও উচ্ছেদবাদ বুদ্ধের দৃষ্টিতে উভয়েই দুই অন্তবাদী, দুই চরমে অবস্থানকারী। বুদ্ধের দীর্ঘ পয়তাল্লিশ বছরের প্রচার জীবনে তিনি যেভাবে স্বীয় ধ্যান-গবেষণা লব্ধ অভিজ্ঞতাকে জনজীবন তথা জীবন জিজ্ঞাসার সমাধানে ব্যক্ত করেছেন; তা বিচার বিশ্লেষণ করলে প্রতীয়মান হয় যে, বুদ্ধ মতবাদ উপরোক্ত দুই চরম মতবাদের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান নিয়েছে। বুদ্ধ জীবন জিজ্ঞাসার সমাধানে স্রষ্টা ও সৃষ্টিতত্ত্বের প্রচলিত ধ্যান ধারণাকে যেমন গ্রহণ করেননি; অপরদিকে বৈজ্ঞানিকের প্রয়োগবাদ ভিত্তিক বস্তুর অন্তহীন নিছক ভোগাকাঙ্খায় জীবনের সার্থকতা খুঁজে পাননি। বুদ্ধ তাঁর অধীত জ্ঞানে স্পষ্ট দেখতে পেয়েছেন স্রষ্টা ও সৃষ্টি তত্ত্বই হউক অথবা বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদই হউক প্রত্যেকের প্রয়াসের মাঝে রয়েছে মানুষের সুখ শান্তি ও নিরাপত্তার অভাব বোধ। এক কথায় দুঃখ হতে মুক্তিই সকলের প্রকৃত উদ্দেশ্য। অথচ উপরোক্ত তত্ত্ব বা মতবাদ দুটি দুঃখ নামক সমস্যাটি উদ্ভবের মূল কারণ অনুসন্ধান না করে যেভাবে তাঁরা সে সমস্যার সমাধান দিতে চেয়েছেন, সে পথের শেষ পরিণতিতে স্রষ্টা ও সৃষ্টি তাত্ত্বিকেরা জন্ম দিয়েছেন, ধর্ম ও মতবাদের নামে সামপ্রদায়িক হীনমন্যতা। সেই হীনমন্যতার বাড়াবাড়ি পর্যবসিত হয়েছে ধর্মান্ধতা ও মতবাদ অন্ধত্বে। এই অন্ধত্ব শান্তি, সুখ ও নিরাপত্তার পরিবর্তে জন্ম দিয়ে চলেছে জেহাদ, ক্রসেড জাতীয় অসংখ্য সামপ্রদায়িক ও দলগত দাঙ্গা- হাঙ্গামা ও যুদ্ধ বিগ্রহের রক্ত-গঙ্গা। এই পরিণতি কি সুখের, না নিরাপত্তার?
ভুল দর্শন, ভুল তত্ত ও ভুল মতবাদের শেষ পরিণতি ঠিক এমনই। মানুষের সুখের জন্যে, মানুষের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্যেই যদি ধর্মমত, দর্শন ও মতবাদের প্রয়োজন হবে-তা কেন তবে আবার সেই মানুষ হননে ইন্ধন যোগাবে? ক্ষমতা ও ভোগলিপ্সা, নেতৃত্বাভিলাষী অহংকার ও শক্তি মদমত্ততা এ সকল কুপ্রবৃত্তিজাত যে কোন মতবাদ, এভাবেই স্ববিরোধিতা প্রকাশ করে থাকে। একই ভ্রান্তির চর্চা আমরা দেখতে পাই আধুনিক বস্তু-তান্ত্রিক দর্শন মাক্স বাদের মধ্যে। ইহা মানুষের মেধা, মনন ও অনালস্য প্রবৃত্তিকে অস্বীকার করে ধনের সমবন্টনে সাম্যবাদের সুখ-শান্তি ও নিরাপত্তা দেখেছেন। ইহা যেমন এক অবিচার-তার চেয়েও মারাত্মক ভুল; শ্রেণী সংগ্রামের অপব্যাখ্যায় হিংসা, জিঘাংসার মাধ্যমে পেশী শক্তিতে শান্তি আনয়নের প্রয়াসে। এই মতবাদ যে সত্য নহে, মাত্র কয়েক দশকের মধ্যেই প্রমাণিত হয়ে গেল সোভিয়েত ও চীনে তাদের আদর্শচ্যুতির মাধ্যমে।
তথাগত বুদ্ধ তাই সৃষ্টি তত্ত্ব ও বৈজ্ঞানিক বা মাক্সের ভোগতত্ত এ দুই চরম অন্তের কোনটির প্রতি ধাবিত না হয়ে, শুধু মানুষ নহে, প্রাণ নামক বিষয়টির সমগ্র রাজ্যের প্রকৃতঃ স্বভাব, স্বরূপ ও তার গতি প্রকৃতির উপর এক নিবিষ্ট চিন্তা গবেষণা, ধ্যান অনুধ্যানে তিনি নিবেদিত হয়েছিলেন সুদীর্ঘকাল। তাঁর এই ব্যাপক পর্যবেক্ষণ ও বিচার বিশ্লেষণের মূল লক্ষ্যও ছিল এক- প্রাণী জগতের দুঃখের চির অবসান। তিনি দুঃখ মুক্তির এই গবেষণায় চিকিৎসা বিদ্যার পদ্ধতিই অবলম্বন করলেন। কারণ “দুঃখ” জীবনের জন্যে রোগ জাতীয় একটি মহাসমস্যা।
রোগাক্রান্ত রোগী যেমন অস্বসিত্ম ও যন্ত্রণা কাতর হয়ে সেই রোগ-মুক্তির জন্যে ছট্পট্ করে থাকে; একইভাবে প্রাণী মাত্রেই দুঃখকে পছন্দ করে না। সেই দুঃখ হতে মুক্তি লাভের উপায় সন্ধানে তাই সে সদা তৎপর থাকে। বুদ্ধ তাঁর গবেষণা কর্মে চিকিৎসকের ন্যায় চারিটি পর্যায় দুঃখের চির অবসানের জন্যে অবলম্বন করেছেন। যথা-
(১) তিনি আপনপর দুঃখ নামক সমস্যাটির বর্তমান অবস্থাকে ব্যাপক ও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন, চিকিৎসকের ন্যায় সংসার রোগীর নিকিট থেকে জাগতিক দুঃখ রোগের অস্থিত্বকে ব্যাপকভাবে অনুসন্ধান করেছেন।
(২) দ্বিতীয় পর্যায়ে সেই দুঃখের উৎপত্তি কারণকে অনুসন্ধান
করে লোভ, দ্বেষ, মোহ- এই তিনটিকে অবিষ্কার করলেন।
(৩) তৃতীয় পর্যায়ে তিনি দুঃখের বর্তমান অবস্থা ও এই অবস্থার অতীত কারণ অবগত হতে গিয়ে দেখলেন এগুলো নিরোধধর্মী। এগুলো যে কারণে উৎপন্ন হয়, তার বিপরীত কারণ দ্বারা ধ্বংস হয়। চিকিৎসা জগতে যেমন বিপরীত প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন তা রোগ উপশম করে থাকেন।
(৪) চতুর্থ পর্যায়ে তিনি দুঃখের চির অবসানের সেই পথ নির্দেশ করলেন, আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ অনুশীলনের মাধ্যমে। চিকিৎসক যেভাবে রোগীকে প্রেসক্রিপশন প্রদান করেন। রোগ নিরাময়ে ডাক্তার প্রেসক্রিপশন দানের পর ডাক্তারের দায়িত্ব শেষ হয়। অতঃপর সম্পূর্ণ দায়-দায়িত্ব বর্তায় রোগীর উপর। রোগীকে সেই প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ঔষধ পথ্য সংগ্রহ করতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ঔষধ পথ্য খেতে হবে। যতদিন রোগ আরোগ্য না হয় ততদিন মাঝে মাঝে ডাক্তারকে রোগের পরবর্তী পরিস্থিতি অবগত করাতে হয়।
প্রয়োজন বোধে ডাক্তার ঔষধ পরিবর্তন করে দেন।
চিকিৎসা বিদ্যার এই পদ্ধতিই নানা সমস্যায় নিত্য জর্জরিত অশান,ত্ম চঞ্চল, বিক্ষিপ্ত চিত্ত সম্পন্ন মানুষকে অবলম্বন করতে হবে তার জীবন দুঃখের চির অবসানে। ইহাই বুদ্ধের আবিস্কার এবং বুদ্ধের শিক্ষা-উপদেশ। এই উপদেশকে বলা হয় চারি আর্যসত্য জ্ঞান এবং প্রতীত্য সমুৎপাদ নীতি জ্ঞান। বুদ্ধ আবিষ্কৃত এই দুই জ্ঞানের পরিচয় এবং তা আয়ত্ব করতে ব্যাপক আলোচনা প্রয়োজন। বর্তমান নিবন্ধে তা সম্ভব নহে বিধায় এখানে সংকেত টুকু মাত্র দেয়া হলো।
১। চারি আর্য সত্য জ্ঞান : (১) দুঃখের সম্পর্কে ব্যাপক জ্ঞান, (২) দুঃখের কারণ তথা লোভ-দ্বেষ-মোহের সম্পর্কে ব্যাপক জ্ঞান অর্থাৎ কত বিচিত্রভাবে দুঃখের এই কারণ সমূহ জীবনে দুঃখের আগমন ঘটায় তা সূক্ষ্মতি-সূক্ষ্মভাবে অবগত হওয়া, (৩) দুঃখের নিরোধে জ্ঞান এবং (৪) সেই দুঃখ নিরোধের উপায় সম্পর্কে জ্ঞান।
২। প্রতীত্য সমুৎপাদনীতি জ্ঞান : (১) অবিদ্যা সম্পর্কে জ্ঞান, (২) অবিদ্যার কারণে উৎপন্ন ‘সংস্কার’ সম্পর্কে জ্ঞান, (৩) সংস্কারের কারণে উৎপন্ন ‘বিজ্ঞান’ সম্পর্কে জ্ঞান, (৪) বিজ্ঞানের কারণে উৎপন্ন ‘নাম-রূপ’ সম্পর্কে জ্ঞান, (৫) নাম- রূপের কারণে উৎপন্ন ‘ষড়ায়তন’ সম্পর্কে জ্ঞান, (৬) ষড়ায়তনের কারণে উৎপন্ন ‘স্পর্শ’ সম্পর্কে জ্ঞান, (৭) স্পর্শের কারণে উৎপন্ন ‘বেদনা’ সম্পর্কে জ্ঞান, (৮) বেদনার কারণে উৎপন্ন ‘তৃষ্ণা’
সম্পর্কে জ্ঞান, (৯) তৃষ্ণার কারণে উৎপন্ন ‘উপাদান’ সম্পর্কে জ্ঞান, (১০) উপাদানের কারণে উৎপন্ন ‘ভব’ সম্পর্কে জ্ঞান, (১১) ভবের কারণে উৎপন্ন ‘জন্ম’ সম্পর্কে জ্ঞান এবং (১২) জন্মের
কারণে উৎপন্ন ক্ষুধা, তৃষ্ণা, রোগ, বার্ধক্য, প্রিয় বিচ্ছেদ, অপ্রিয় সংযোগ, ইচ্ছিত বস্তু অলাভ-এ সকল অনিবার্য দুঃখ সম্পর্কে জ্ঞান।
বর্তমান নিবন্ধের বিচার্য বিষয় “দেহ আগে না মন আগে” এর সম্যক সমাধানে উপনীত হতে পারলে, যেই মহাসৌভাগ্য একজন ব্যক্তির জীবনে উৎপন্ন হয়; তা হলো উপরোক্ত দুই মহাজ্ঞান; সেই প্রতীত্য সমুৎপাদ নীতিজ্ঞান, এবং চারি আর্যসত্য জ্ঞান। এই মহাসৌভাগ্য লাভের জন্যে মহাজ্ঞানী তথাগত বুদ্ধের উপদেশ
তথা দিক নির্দেশনাকে নিম্নোক্তভাবে উপস্থাপিত করা যায়।
প্রথমে বিচার করা প্রয়োজন ‘দেহ’ এবং ‘মন’ এ দুটি সম্পর্কে বুদ্ধ কি বলেন। সাধারণ চর্ম চোখের বিশ্লেষণে দেহটা বত্রিশ প্রকার অঙ্গ প্রত্যঙ্গ নিয়ে গঠিত। যথা- চুল, লোম, নখ, দাঁত, চামড়া, মাংস, স্নায়ু, অস্থি, অস্থিমজ্জা, হৃদপিন্ড, যকৃত, ক্লোম, প্লীহা, ফুস্ফুস্, বৃহৎঅন্ত্র, ক্ষুদ্রঅন্ত্র, উদর, বিষ্ঠা, মাথার মগজ, পিত্ত, শ্লেষ্মা, পুঁজ, রক্ত, ঘর্ম, মেদ, অশ্রু, বসা, থু থু, সিকনী, লালা, মুত্র। শব-ব্যবচ্ছেদ বিদ্যায় একটি দেহকে বিভাজিত করলেও প্রায় এই প্রত্যঙ্গ গুলো পাওয়া যায়। বুদ্ধের মতে দেহ নিয়ে এই অভিজ্ঞতাকে চর্ম চোখের সাধারণ জ্ঞান তথা সংজ্ঞা বা সংজানন জ্ঞান বলা হয়। জ্ঞানের ক্রম উৎকর্ষতার এই প্রাথমিক ধাপের পরবর্তী ধাপ হলো বিজানন জ্ঞান। আধুনিক প্রচলিত ভাষায় আমরা তাকে “বিজ্ঞান” বলে থাকি। বিজানন জ্ঞানের এই স্তরে বুদ্ধ ‘দেহ’ কে মোট চারটি অংশে বিভাজন করেছেন। যথা- মাটি, জল, বায়ু এবং তাপ। তিনি দেহ গঠিত
হওয়ার এই চারিটিকে “চত্তারো মহাভূতো” বা চারি মহাধাতু উপাদান বলেছেন। মহাপ্রাজ্ঞ বুদ্ধের দৃষ্টিতে কেবল মাত্র দেহ নহে এই বিশ্ব চরাচরে প্রাণ অপ্রাণ, গ্রহ, নক্ষত্র যতকিছু চোখে দেখা যায় তৎ সমুদয় বস্তুও গঠিত হয়েছে এই চারি মহাধাতু উপাদান দ্বারা। আধুনিক বিজ্ঞান প্রাণ-অপ্রাণ যাবতীয় বস্তুকে অনুপরমাণুতে বিভাজিত করতে গিয়েও এই বস্তু তত্তে উপনীত হয়েছে।
বিজ্ঞান জগতে অতি সামপ্রতিক দুটি আবিষ্কার হলো ‘ইন্টারনেট’ এবং ‘জিন প্রযুক্তি।’ বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ ব্যবস্থায় ইন্টারনেট এর সাফল্য পুরো বিশ্বকে এখন হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছে। অপরদিকে ‘জিন প্রযুক্তিতে’ জীবের দেহ ও মনের গঠন কৌশল নিখুতভাবে ধরতে পেরে এখন বিজ্ঞানের গবেষণাগারে ইচ্ছামতো রক্তমাংসের মানুষ তৈরী করছে।
কাল্পনিক ঈশ্বর বিশ্ববাসীরা তাতে বাঁধা দিলেও স্রষ্টা ও সৃষ্টি সম্পর্কে বুদ্ধের আবিষ্কৃত সৃষ্টিতত্ত্বই যে চরম সত্য, আধুনিক বিজ্ঞানীরা বহুকাল পরে বস্তু দিয়ে তা সপ্রমাণ করলেন।
বিজ্ঞানের প্রযুক্তিগত এই সাফল্য প্রমাণ করে দিল বস্তু হতেই প্রাণের জন্ম। তাই বস্তু আগে, প্রাণ পরে।
বস্তুতত্ত্বের এই স্তরে বুদ্ধও দেখিয়েছেন মাটি, জল, বায়ু এবং তাপ এই চারি মহাধাতু উপাদানের প্রত্যেকটির মধ্যে স্থিত থাকে বর্ণ, গন্ধ, রস (নির্যাস), ওজ (শক্তি) এই নামে চারিটি গুণাবলী। মাটি, জল, বায়ু, তাপ এবং বর্ণ, গন্ধ, রস, ওজ-মোট এই আটটি বিষয়কে বলেছেন অষ্টকলাপ। বস্তুতঃ অষ্টকলাপ হতে সম্যুৎপন্ন শক্তিই হলো প্রাণ বা জীবন শক্তি। বুদ্ধের ভাষায় এই জীবন শক্তিকে বলা হয়েছে ‘জীবিতেন্দ্রিয়ং’ ‘বিঞ্ঞানং’।
এই জীবিতেন্দ্রিয় বা বিজ্ঞান নামক শক্তিটি দেহজাত চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহবা ও দেহ এই প্রত্যঙ্গগুলোর সাথে নানা বিষয়ের আঘাত হওয়ার ফলে জন্ম নেয় ‘চিত্ত’ নামক এক জটিল অনুভূতি শক্তি বা ধারণা। এই অনুভূতি শক্তিই কেসেট রেকর্ডারের মতো বর্হিজগত হতে প্রতিনিয়ত সংগ্রহ ও ধারণ করতে গিয়ে ‘চিত্ত’ বা ‘মনের’ যেই স্বভাব গঠিত হয়েছে সে সম্পর্কে বুদ্ধের উক্তি- ‘ফন্দনং চপলং চিত্তং’ অর্থাৎ চিত্তের স্বভাব ধর্ম হলো সদা কম্পমানতা স্পন্দনশীলতা। চিত্তের এই কম্পন ও উল্লম্পনতার কারণ চক্ষু, কর্ণাদির দ্বারা বর্হিজগতের বিষয় বা আলম্বন হতে প্রাপ্ত আঘাত। মনের আরো একটি স্বভাব সম্পর্কে বুদ্ধ বলেছেন “মনো পুব্বঙ্গমো ধম্মা, মনো সেট্ঠো মনোময়” অর্থাৎ চিত্ত দ্বারা আহরিত যাবতীয় বিষয়ের ধারণা, সংরক্ষণ ও পরিকল্পনায়, পরিচালনায় মনই সর্বদা নেতৃত্ব দেয়। মোট কথা পূর্বোক্ত বর্ণনা হতে আমরা এখন অতি সহজে এই চুড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, দেহ হতে মনের উৎপত্তি। অতএব ‘দেহ আগে না মন আগে’ প্রশ্নটির উত্তরে বুদ্ধের ব্যাখ্যায় প্রমাণিত হয়েছে দেহের উৎপত্তি আগে, মনের উৎপত্তি পরে।
মাতৃগর্ভে পিতার শুক্র হতে একটি শিশুর ভ্রুণের উৎপত্তি ও তার ক্রমবিকাশের প্রতি লক্ষ্য করেই আধুনিক জীব বিজ্ঞানও এখন বুদ্ধ আবিষ্কৃত সেই একই তত্ত্বটিতে উপনীত হয়েছে। বুদ্ধ বলেছেন এই দেহধারীগণ আসলে কোন প্রাণী, সত্ত্ব বা জীব নহে; ইহারা “নিস্সত্তো, নিজ্জীবো, সুঞ্ঞো, ধাতুমত্তমেবেতং।” অর্থাৎ প্রাণী বা জীবেরা হচ্ছে আসলে নিষ্প্র্রাণ, নির্জীব, শূন্য। মাটি, জল, বায়ু, তাপ এই চারি মহাধাতু সমষ্টিই হচ্ছে এই প্রাণী জগত। চিত্তের উৎপত্তি ও গতি (বিভিন্ন বিষয়ে চিন্তন, অনুচিন্তন) সম্পর্কে বুদ্ধের অভিমত-“সুদ্ধ ধম্মং পবত্তন্তি।” অর্থাৎ ঘড়ির নিয়ম মাফিক আবর্তনের ন্যায় চক্ষু, কর্ণাদি ইন্দ্রিয় (ংবহংব ড়ৎমধহব) পথে চারি পাশে বিরাজিত পরিবেশ হতে প্রাপ্ত বিষয়বস্তু বা আলম্বনের সংস্পর্শ জাত আঘাতের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়াই হচ্ছে এই চিত্ত প্রবাহ। বিষয় বস্তুর সংস্পর্শজাত চিত্তপ্রবাহ বা কম্পনের অপর নাম সুখ-দুঃখ উপশমাদি বেদনা অনুভূতি বা ধর্ম। সুখ, দুঃখ ও উপেক্ষা এই ত্রিবিধ বেদনা বা অনুভূতি হতে জন্ম নেয় ভালো-মন্দ কর্মের। সেই কর্ম যতক্ষণ পর্যন্ত চিত্ত প্রবাহে বা স্রোতে চিন্তন, অনুচিন্তনের মাধ্যমে আবর্ত্তিত হতে থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে বলা হয় মনোময় কর্ম।
কর্ম তার মনোময় কর্মের সীমা অতিক্রম করে যখন বাক্যে ও দৈহিক অঙ্গ প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে প্রকাশিত হয় তখন তাকে বাককর্ম ও কায়কর্ম বলে। মনোময় কর্মকেই “ধর্ম” বলে বুদ্ধ কর্তৃক উক্ত হয়েছে। সেই ধর্মের পরিণতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে বুদ্ধের দুটি বিখ্যাত উপমা এখানে প্রদত্ত হলো-
“মনো পুব্বঙ্গমো ধম্মা, মনো সেট্ঠ মনোময়া,
মনসা চে পদুট্ঠেন ভাসতি ব করোতি ব,
ততো নং দুক্খ মন্বেতি চক্কং ব বহতোপদং॥”
অর্থাৎ মন চিত্তে উৎপন্ন যাবতীয় মনোময় বিষয় সমূহে নেতৃত্বে দেয়। তাই মন কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরই তা কথায় বা দৈহিকভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। প্রদুষ্ট মনে কথা বললেবা দৈহিকভাবে কোন কাজ করলে তার পরিণতিতে দুঃখ উৎপন্ন হয়। সেই দুঃখ ভারী শকটবাহী বলদের পশ্চাতে ঘূর্ণায়মান চাকার ন্যায় দুষ্কর্মীকে দুঃখ-যন্ত্রণা প্রদান করতে করতে দুষ্কর্মীর অনুসরণ করে। দ্বিতীয় উপমায় বলা হয়েছে :
মনো পুব্বঙ্গমা ধম্মা মনো সেট্ঠ মনোময়,
মনসা চে পসন্নেন ভাসতি ব করোতি ব
ততো নং সুখ মন্বেতি ছায়া বা অনপায়িনী।
অর্থাৎ- চিত্তে উৎপন্ন যাবতীয় মনোময় বিষয় সমূহে মনই নেতৃত্ব দেয়। মন স্থির সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরেই তা বাক্যে বা দেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ দ্বারা প্রকাশিত হয়। তাই প্রসন্ন বা পবিত্র মনে কেহ কোন কথা বললে বা দৈহিকভাবে কোন কাজ করলে, তাতে সুখ উৎপন্ন হয়। সেই সুখ দেহের অপরিত্যাজ্য ছায়ার ন্যায়
সুকর্মীকে সুখ শান্তি প্রদান করে থাকে। বুদ্ধের দর্শনে চিত্তের এই উৎপত্তি এবং গতিটি কিভাবে বর্তমান জীবনটিকে সুখ-দুঃখে সম্পৃক্ত করায় এবং সীমানা অতিক্রম করে বর্তমান জন্ম থেকে জন্মান্তরে পরিভ্রমণ করায়; এখন তা প্রদর্শন করা কর্তব্য। তা না হলে বৌদ্ধরা কিভাবে ঈশ্বরবাদ ও জড় বিজ্ঞানবাদের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান গ্রহণ করে, জীবন ও জগৎ রহস্য সম্পর্কে নিজেদেরকে ভিন্ন অথচ এক অত্যন্ত বাস্তব যৌক্তিক জীবনের অধিকারী হতে পারেন তা অপ্রমাণিত থাকবে। বুদ্ধ বুদ্ধত্ব জ্ঞানলাভের পর মুহূর্তে স্বীয় জীবনের প্রত্যক্ষ উপলব্ধিতে জন্মান্তর সম্পর্কে উক্তি করলেন :-
অনেক জাতি সংসারং সন্ধাবিস্সং অনিব্বিসং;
গহকারকো গবেস্সন্তি দুক্খ জাতি পুনপ্পুনং।
গহকারকো দিট্ঠোসি, পুন গেহং ন কাহসি;
সব্বতে ফাসুকা ভগ্গ, গহকূটং বিসঙ্খিতং।
বিসঙ্খারা গতং চিত্তং তণ্হানং খয়মজ্ঝগা।
অর্থাৎ- দেহ ধারণের ফলে বহু দুঃখ ভোগ করতে হয় দেখে, এই দেহ রূপ গৃহটির নির্মাণ কর্তার সন্ধানে বহুজন্ম পরিভ্রমণ করেছি। কিন্তু তার দেখা না পেয়ে পুনপুনঃ দেহ ধারণের কারণে বার বার বহু দুঃখ যন্ত্রণা আমাকে ভোগ করতে হয়েছে। এবারে এই দেহ গৃহকারকের দেখা পেলাম। তাঁর রচিত গৃহের চুড়া খুঁটি সব
ভেঙ্গে চুড়মার করে দিলাম। তৃষ্ণা নামক ভোগাকাঙ্খা জাত সংস্কারই (চিত্ত) এই গৃহ নির্মাণ কর্তা। এখন আমার সেই তৃষ্ণা ক্ষয় হয়েছে, সংস্কারের বন্ধন হতে চিত্ত বিমুক্ত হয়েছে। তাই দেহ ধারণকারী হে তৃষ্ণা! তুমি এখন পুনঃ দেহ রূপ গৃহ আর নির্মাণ করতে পারবে না।
বুদ্ধ তথাগতের এই স্বগতোক্তিকে বিশ্লেষণ করলে জন্ম থেকে জন্মান্তরে কে এই প্রাণীগণকে নিয়ে যায়-তা দৃশ্যমান হয়। তৃষ্ণা জাত সংস্কারই এই নিয়ামক। তৃষ্ণা হলো মনোপুত বিষয়কে ভোগ করার ইচ্ছা, অমনোপুত বিষয়কে ত্যাগ করার ইচ্ছা, কোন কোন বিষয়ে উপেক্ষা বা উদাসীন থাকার ইচ্ছা। সংস্কার হলো, সেই ভোগ, ত্যাগ আর উপেক্ষা নামক ইচ্ছাকে ভিত্তি করে উৎপন্ন বিষয় বা আলম্বনের মানসিক ছাপ বা ছবি। মৃত্যু শয্যা
শায়িত মুমুর্ষ ব্যক্তি বা এমতাবস্থায় পতিত যে কোন প্রাণীর দেহের সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গ স্নায়ু তন্ত্রীর কর্মশক্তি শিথিল হওয়ার কারণে দেহ অনুভূতিহীন হয়ে গেলেও, তার চিত্ত অনুভূতিহীন হয়ে গেলেও তার চিত্ত তখনো সচল থাকে। সেই চিত্তে উক্ত সংস্কার নামক মানসিক ছবিগুলো তখন মুমুর্ষ ব্যক্তির মানসপটে ফিল্মের ন্যায় আনাগোনা শুরু করে। তৃষ্ণা নামক ইচ্ছা শক্তিটি তখন চুম্বকীয় শক্তিতে পরিণত হয়ে থাকে। জীবনে সেই ব্যক্তি যে ইচ্ছাটির প্রতি প্রবল আসক্ত ছিল বা যে কাজটি প্রতিনিয়ত সম্পাদন করতে করতে সে দারুণ অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল, তার মানসিক ছাপ বা সংস্কারটিই স্বাভাবিক ভাবে তখন তার মুমুর্ষ অবস্থার চিত্ত গতিকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করতে থাকে।
তখন সেই প্রবল গতিময় চিত্ত জোঁকের ন্যায় কম্পিত অবস্থায় কিছুক্ষণ অনুসন্ধান অনুচিন্তনের পর, সেই প্রবলতর শক্তিমান মানসিক ছবিটিকে আলম্বন করে তদনুযায়ী অনুকূল অবস্থানে উল্লম্পন দেয়, এই দেহ ত্যাগ করে অন্যদেহের মাতা-পিতার চিত্ত অনুকূল কোন গর্ভাশয়ে আশ্রয় গ্রহণ করতে। শত সহস্র বর্ষ আগে
উচ্চারিত মানুষ বা প্রাণীকূলের বিশাল শব্দভাণ্ডার যেমন আকাশে স্থিত বায়ুতে ইতর তরঙ্গ শক্তি সৃষ্টি করে এখনো বিরাজ করছে; একইভাবে কোন কোন মানুষ বা প্রাণী মৃত্যুক্ষণে ইচ্ছা শক্তির দুর্বলতা বা গর্ভ নির্বাচনে অক্ষমতার কারণে, উপরোক্ত ভাবে অন্য দেহে আশ্রয় গ্রহণে অক্ষম হলে; কিছুকাল স্বীয় পরিচিত পরিবেশে (জ্ঞাতী স্বজনের আশেপাশে) ইচ্ছা শক্তিরূপে অদৃশ্যে অবস্থান করে থাকে। জীবিত জ্ঞাতীগণ তাদের এই অস্থির অসহায় অবস্থায় পুণ্যদান জনিত ইচ্ছাশক্তি দিয়ে তাদেরকে সাহায্য করে, উত্তম গর্ভে জন্ম ধারণে শক্তি
যোগাতে পারে। বৌদ্ধ ধর্মে ইহাই জন্মান্তরবাদ। এতদূর পর্যন্ত অনাত্মবাদী বৌদ্ধধর্মে এই পর্যন্ত আত্মার স্বীকৃতির পরিধি। এই পরিধিকে বলা হয় সংসার বা লোক চক্রবাল। যতদিন পর্যন্ত মানুষ তথা প্রাণীগণ বুদ্ধ কথিত তৃষ্ণা ও সংস্কারের বন্ধন মুক্ত হতে না পারছে, ততদিন তাকে এই সংসার আবর্তে পুনঃপুন দেহ ধারণ করে, জন্ম থেকে জন্মান্তরে ধাবিত হতেই হবে। আর ভোগ করতে হবে অনন্ত দুঃখ যন্ত্রণা। ধনী হোক দরিদ্র হোক-সকলেই দেহ ধারণের উপদ্রব যন্ত্রণার অধীন। যে দিন প্রজ্ঞার আলোকে এই দুঃখ যন্ত্রণাকে তীব্রভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে, সেদিন সে তার হাত থেকে মুক্তি কামনায় ছট্পট্ করবেই করবে। তৃষ্ণা আর সংস্কারের বন্ধন ছিন্ন করতে রাজপুত্র সিদ্ধার্থের ন্যায় সংসারের যাবতীয় ভোগাকাঙ্খাকে তখন সে বিষ্টার ন্যায় ত্যাগ করতে পারবে। দেহ ধারণ জনিত ক্ষুধা, শীত-গরম, বৃষ্টি- কাঁদা, মশা-মাছি, রোগ-পীড়া, জরা-বার্ধক্য, প্রিয় বিচ্ছেদ, অপ্রিয় সংযোগ, আকাঙ্খিত বসত্মূ বা বিষয় লাভ না করা, সর্বোপরি মরণভীতি; এসকল অনিবার্য উপদ্রব, দুঃখ-যন্ত্রণাকে গভীর ভাবে উপলব্ধি করতে পারলেই সন্ন্যাসী সিদ্ধার্থের উচ্চারিত বজ্র কঠোর সংকল্পের ন্যায় সেই দুঃখ মুক্তিকামী জনও তখন দাঁত চেপে জিহ্বার অগ্রভাগকে তালুতে ঠেকিয়ে দেহের সমস্ত মাংস পেশী আর মেরুদণ্ডকে লৌহের মতো শক্ত করে উচ্চারণ করবে- ইহাসনে শুষ্য তুমে শরীরং তগস্থি মাংসং প্রলয়ঞ্চ যাতু; অপ্রাপ্য বোধিং, বহুকল্প দুর্লভং, নৈবৎশ্মনাৎ কাযমতস্য লিস্যতে।
এ আসনে শরীর মোর যাক্রে শুকায়ে;
চর্ম অস্থি মাংস যাক সব প্রলয়ে ডুবিয়ে।
বহু কল্প দুর্লভ ধন অপ্রাপ্য বোধি;
টলিবে না আসন হতে প্রাপ্তি অবধি।
জীবন দুঃখ মুক্তির তীব্র অভিলাষী এমন সংকল্প এমন দৃঢ় বীর্য পরাক্রমী না হলে, অন্য কোন শক্তি দিয়ে সংসার মায়ার বন্ধনকে ছিন্ন করা অসম্ভব। অবিদ্যাচ্ছন্ন অনন্ত জন্মের বিশাল সংস্কার রাশী এমন বীর্যবান জীবন-মরণ প্রতীজ্ঞাবদ্ধ জনই উত্তীর্ণ হয়ে থাকেন। তাঁদের মহা সৌভাগ্যবান ভগবান বলা হয় এ কারণেই। লোকুত্তর পুরুষ বা আর্য পুদগল এমন ব্যক্তিগণের মনে তখন আর কোন প্রশ্ন থাকে না-এই সৃষ্টি ও তার স্রষ্টার রহস্য নিয়ে। প্রশ্ন থাকে না আত্মা অনিত্য, না চির শাশ্বত, দেহ আগে না মন আগে-এই নিয়ে।
ভুল দর্শন, ভুল তত্ত ও ভুল মতবাদের শেষ পরিণতি ঠিক এমনই। মানুষের সুখের জন্যে, মানুষের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্যেই যদি ধর্মমত, দর্শন ও মতবাদের প্রয়োজন হবে-তা কেন তবে আবার সেই মানুষ হননে ইন্ধন যোগাবে? ক্ষমতা ও ভোগলিপ্সা, নেতৃত্বাভিলাষী অহংকার ও শক্তি মদমত্ততা এ সকল কুপ্রবৃত্তিজাত যে কোন মতবাদ, এভাবেই স্ববিরোধিতা প্রকাশ করে থাকে। একই ভ্রান্তির চর্চা আমরা দেখতে পাই আধুনিক বস্তু-তান্ত্রিক দর্শন মাক্স বাদের মধ্যে। ইহা মানুষের মেধা, মনন ও অনালস্য প্রবৃত্তিকে অস্বীকার করে ধনের সমবন্টনে সাম্যবাদের সুখ-শান্তি ও নিরাপত্তা দেখেছেন। ইহা যেমন এক অবিচার-তার চেয়েও মারাত্মক ভুল; শ্রেণী সংগ্রামের অপব্যাখ্যায় হিংসা, জিঘাংসার মাধ্যমে পেশী শক্তিতে শান্তি আনয়নের প্রয়াসে। এই মতবাদ যে সত্য নহে, মাত্র কয়েক দশকের মধ্যেই প্রমাণিত হয়ে গেল সোভিয়েত ও চীনে তাদের আদর্শচ্যুতির মাধ্যমে।
তথাগত বুদ্ধ তাই সৃষ্টি তত্ত্ব ও বৈজ্ঞানিক বা মাক্সের ভোগতত্ত এ দুই চরম অন্তের কোনটির প্রতি ধাবিত না হয়ে, শুধু মানুষ নহে, প্রাণ নামক বিষয়টির সমগ্র রাজ্যের প্রকৃতঃ স্বভাব, স্বরূপ ও তার গতি প্রকৃতির উপর এক নিবিষ্ট চিন্তা গবেষণা, ধ্যান অনুধ্যানে তিনি নিবেদিত হয়েছিলেন সুদীর্ঘকাল। তাঁর এই ব্যাপক পর্যবেক্ষণ ও বিচার বিশ্লেষণের মূল লক্ষ্যও ছিল এক- প্রাণী জগতের দুঃখের চির অবসান। তিনি দুঃখ মুক্তির এই গবেষণায় চিকিৎসা বিদ্যার পদ্ধতিই অবলম্বন করলেন। কারণ “দুঃখ” জীবনের জন্যে রোগ জাতীয় একটি মহাসমস্যা।
রোগাক্রান্ত রোগী যেমন অস্বসিত্ম ও যন্ত্রণা কাতর হয়ে সেই রোগ-মুক্তির জন্যে ছট্পট্ করে থাকে; একইভাবে প্রাণী মাত্রেই দুঃখকে পছন্দ করে না। সেই দুঃখ হতে মুক্তি লাভের উপায় সন্ধানে তাই সে সদা তৎপর থাকে। বুদ্ধ তাঁর গবেষণা কর্মে চিকিৎসকের ন্যায় চারিটি পর্যায় দুঃখের চির অবসানের জন্যে অবলম্বন করেছেন। যথা-
(১) তিনি আপনপর দুঃখ নামক সমস্যাটির বর্তমান অবস্থাকে ব্যাপক ও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন, চিকিৎসকের ন্যায় সংসার রোগীর নিকিট থেকে জাগতিক দুঃখ রোগের অস্থিত্বকে ব্যাপকভাবে অনুসন্ধান করেছেন।
(২) দ্বিতীয় পর্যায়ে সেই দুঃখের উৎপত্তি কারণকে অনুসন্ধান
করে লোভ, দ্বেষ, মোহ- এই তিনটিকে অবিষ্কার করলেন।
(৩) তৃতীয় পর্যায়ে তিনি দুঃখের বর্তমান অবস্থা ও এই অবস্থার অতীত কারণ অবগত হতে গিয়ে দেখলেন এগুলো নিরোধধর্মী। এগুলো যে কারণে উৎপন্ন হয়, তার বিপরীত কারণ দ্বারা ধ্বংস হয়। চিকিৎসা জগতে যেমন বিপরীত প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন তা রোগ উপশম করে থাকেন।
(৪) চতুর্থ পর্যায়ে তিনি দুঃখের চির অবসানের সেই পথ নির্দেশ করলেন, আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ অনুশীলনের মাধ্যমে। চিকিৎসক যেভাবে রোগীকে প্রেসক্রিপশন প্রদান করেন। রোগ নিরাময়ে ডাক্তার প্রেসক্রিপশন দানের পর ডাক্তারের দায়িত্ব শেষ হয়। অতঃপর সম্পূর্ণ দায়-দায়িত্ব বর্তায় রোগীর উপর। রোগীকে সেই প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ঔষধ পথ্য সংগ্রহ করতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ঔষধ পথ্য খেতে হবে। যতদিন রোগ আরোগ্য না হয় ততদিন মাঝে মাঝে ডাক্তারকে রোগের পরবর্তী পরিস্থিতি অবগত করাতে হয়।
প্রয়োজন বোধে ডাক্তার ঔষধ পরিবর্তন করে দেন।
চিকিৎসা বিদ্যার এই পদ্ধতিই নানা সমস্যায় নিত্য জর্জরিত অশান,ত্ম চঞ্চল, বিক্ষিপ্ত চিত্ত সম্পন্ন মানুষকে অবলম্বন করতে হবে তার জীবন দুঃখের চির অবসানে। ইহাই বুদ্ধের আবিস্কার এবং বুদ্ধের শিক্ষা-উপদেশ। এই উপদেশকে বলা হয় চারি আর্যসত্য জ্ঞান এবং প্রতীত্য সমুৎপাদ নীতি জ্ঞান। বুদ্ধ আবিষ্কৃত এই দুই জ্ঞানের পরিচয় এবং তা আয়ত্ব করতে ব্যাপক আলোচনা প্রয়োজন। বর্তমান নিবন্ধে তা সম্ভব নহে বিধায় এখানে সংকেত টুকু মাত্র দেয়া হলো।
১। চারি আর্য সত্য জ্ঞান : (১) দুঃখের সম্পর্কে ব্যাপক জ্ঞান, (২) দুঃখের কারণ তথা লোভ-দ্বেষ-মোহের সম্পর্কে ব্যাপক জ্ঞান অর্থাৎ কত বিচিত্রভাবে দুঃখের এই কারণ সমূহ জীবনে দুঃখের আগমন ঘটায় তা সূক্ষ্মতি-সূক্ষ্মভাবে অবগত হওয়া, (৩) দুঃখের নিরোধে জ্ঞান এবং (৪) সেই দুঃখ নিরোধের উপায় সম্পর্কে জ্ঞান।
২। প্রতীত্য সমুৎপাদনীতি জ্ঞান : (১) অবিদ্যা সম্পর্কে জ্ঞান, (২) অবিদ্যার কারণে উৎপন্ন ‘সংস্কার’ সম্পর্কে জ্ঞান, (৩) সংস্কারের কারণে উৎপন্ন ‘বিজ্ঞান’ সম্পর্কে জ্ঞান, (৪) বিজ্ঞানের কারণে উৎপন্ন ‘নাম-রূপ’ সম্পর্কে জ্ঞান, (৫) নাম- রূপের কারণে উৎপন্ন ‘ষড়ায়তন’ সম্পর্কে জ্ঞান, (৬) ষড়ায়তনের কারণে উৎপন্ন ‘স্পর্শ’ সম্পর্কে জ্ঞান, (৭) স্পর্শের কারণে উৎপন্ন ‘বেদনা’ সম্পর্কে জ্ঞান, (৮) বেদনার কারণে উৎপন্ন ‘তৃষ্ণা’
সম্পর্কে জ্ঞান, (৯) তৃষ্ণার কারণে উৎপন্ন ‘উপাদান’ সম্পর্কে জ্ঞান, (১০) উপাদানের কারণে উৎপন্ন ‘ভব’ সম্পর্কে জ্ঞান, (১১) ভবের কারণে উৎপন্ন ‘জন্ম’ সম্পর্কে জ্ঞান এবং (১২) জন্মের
কারণে উৎপন্ন ক্ষুধা, তৃষ্ণা, রোগ, বার্ধক্য, প্রিয় বিচ্ছেদ, অপ্রিয় সংযোগ, ইচ্ছিত বস্তু অলাভ-এ সকল অনিবার্য দুঃখ সম্পর্কে জ্ঞান।
বর্তমান নিবন্ধের বিচার্য বিষয় “দেহ আগে না মন আগে” এর সম্যক সমাধানে উপনীত হতে পারলে, যেই মহাসৌভাগ্য একজন ব্যক্তির জীবনে উৎপন্ন হয়; তা হলো উপরোক্ত দুই মহাজ্ঞান; সেই প্রতীত্য সমুৎপাদ নীতিজ্ঞান, এবং চারি আর্যসত্য জ্ঞান। এই মহাসৌভাগ্য লাভের জন্যে মহাজ্ঞানী তথাগত বুদ্ধের উপদেশ
তথা দিক নির্দেশনাকে নিম্নোক্তভাবে উপস্থাপিত করা যায়।
প্রথমে বিচার করা প্রয়োজন ‘দেহ’ এবং ‘মন’ এ দুটি সম্পর্কে বুদ্ধ কি বলেন। সাধারণ চর্ম চোখের বিশ্লেষণে দেহটা বত্রিশ প্রকার অঙ্গ প্রত্যঙ্গ নিয়ে গঠিত। যথা- চুল, লোম, নখ, দাঁত, চামড়া, মাংস, স্নায়ু, অস্থি, অস্থিমজ্জা, হৃদপিন্ড, যকৃত, ক্লোম, প্লীহা, ফুস্ফুস্, বৃহৎঅন্ত্র, ক্ষুদ্রঅন্ত্র, উদর, বিষ্ঠা, মাথার মগজ, পিত্ত, শ্লেষ্মা, পুঁজ, রক্ত, ঘর্ম, মেদ, অশ্রু, বসা, থু থু, সিকনী, লালা, মুত্র। শব-ব্যবচ্ছেদ বিদ্যায় একটি দেহকে বিভাজিত করলেও প্রায় এই প্রত্যঙ্গ গুলো পাওয়া যায়। বুদ্ধের মতে দেহ নিয়ে এই অভিজ্ঞতাকে চর্ম চোখের সাধারণ জ্ঞান তথা সংজ্ঞা বা সংজানন জ্ঞান বলা হয়। জ্ঞানের ক্রম উৎকর্ষতার এই প্রাথমিক ধাপের পরবর্তী ধাপ হলো বিজানন জ্ঞান। আধুনিক প্রচলিত ভাষায় আমরা তাকে “বিজ্ঞান” বলে থাকি। বিজানন জ্ঞানের এই স্তরে বুদ্ধ ‘দেহ’ কে মোট চারটি অংশে বিভাজন করেছেন। যথা- মাটি, জল, বায়ু এবং তাপ। তিনি দেহ গঠিত
হওয়ার এই চারিটিকে “চত্তারো মহাভূতো” বা চারি মহাধাতু উপাদান বলেছেন। মহাপ্রাজ্ঞ বুদ্ধের দৃষ্টিতে কেবল মাত্র দেহ নহে এই বিশ্ব চরাচরে প্রাণ অপ্রাণ, গ্রহ, নক্ষত্র যতকিছু চোখে দেখা যায় তৎ সমুদয় বস্তুও গঠিত হয়েছে এই চারি মহাধাতু উপাদান দ্বারা। আধুনিক বিজ্ঞান প্রাণ-অপ্রাণ যাবতীয় বস্তুকে অনুপরমাণুতে বিভাজিত করতে গিয়েও এই বস্তু তত্তে উপনীত হয়েছে।
বিজ্ঞান জগতে অতি সামপ্রতিক দুটি আবিষ্কার হলো ‘ইন্টারনেট’ এবং ‘জিন প্রযুক্তি।’ বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ ব্যবস্থায় ইন্টারনেট এর সাফল্য পুরো বিশ্বকে এখন হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছে। অপরদিকে ‘জিন প্রযুক্তিতে’ জীবের দেহ ও মনের গঠন কৌশল নিখুতভাবে ধরতে পেরে এখন বিজ্ঞানের গবেষণাগারে ইচ্ছামতো রক্তমাংসের মানুষ তৈরী করছে।
কাল্পনিক ঈশ্বর বিশ্ববাসীরা তাতে বাঁধা দিলেও স্রষ্টা ও সৃষ্টি সম্পর্কে বুদ্ধের আবিষ্কৃত সৃষ্টিতত্ত্বই যে চরম সত্য, আধুনিক বিজ্ঞানীরা বহুকাল পরে বস্তু দিয়ে তা সপ্রমাণ করলেন।
বিজ্ঞানের প্রযুক্তিগত এই সাফল্য প্রমাণ করে দিল বস্তু হতেই প্রাণের জন্ম। তাই বস্তু আগে, প্রাণ পরে।
বস্তুতত্ত্বের এই স্তরে বুদ্ধও দেখিয়েছেন মাটি, জল, বায়ু এবং তাপ এই চারি মহাধাতু উপাদানের প্রত্যেকটির মধ্যে স্থিত থাকে বর্ণ, গন্ধ, রস (নির্যাস), ওজ (শক্তি) এই নামে চারিটি গুণাবলী। মাটি, জল, বায়ু, তাপ এবং বর্ণ, গন্ধ, রস, ওজ-মোট এই আটটি বিষয়কে বলেছেন অষ্টকলাপ। বস্তুতঃ অষ্টকলাপ হতে সম্যুৎপন্ন শক্তিই হলো প্রাণ বা জীবন শক্তি। বুদ্ধের ভাষায় এই জীবন শক্তিকে বলা হয়েছে ‘জীবিতেন্দ্রিয়ং’ ‘বিঞ্ঞানং’।
এই জীবিতেন্দ্রিয় বা বিজ্ঞান নামক শক্তিটি দেহজাত চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহবা ও দেহ এই প্রত্যঙ্গগুলোর সাথে নানা বিষয়ের আঘাত হওয়ার ফলে জন্ম নেয় ‘চিত্ত’ নামক এক জটিল অনুভূতি শক্তি বা ধারণা। এই অনুভূতি শক্তিই কেসেট রেকর্ডারের মতো বর্হিজগত হতে প্রতিনিয়ত সংগ্রহ ও ধারণ করতে গিয়ে ‘চিত্ত’ বা ‘মনের’ যেই স্বভাব গঠিত হয়েছে সে সম্পর্কে বুদ্ধের উক্তি- ‘ফন্দনং চপলং চিত্তং’ অর্থাৎ চিত্তের স্বভাব ধর্ম হলো সদা কম্পমানতা স্পন্দনশীলতা। চিত্তের এই কম্পন ও উল্লম্পনতার কারণ চক্ষু, কর্ণাদির দ্বারা বর্হিজগতের বিষয় বা আলম্বন হতে প্রাপ্ত আঘাত। মনের আরো একটি স্বভাব সম্পর্কে বুদ্ধ বলেছেন “মনো পুব্বঙ্গমো ধম্মা, মনো সেট্ঠো মনোময়” অর্থাৎ চিত্ত দ্বারা আহরিত যাবতীয় বিষয়ের ধারণা, সংরক্ষণ ও পরিকল্পনায়, পরিচালনায় মনই সর্বদা নেতৃত্ব দেয়। মোট কথা পূর্বোক্ত বর্ণনা হতে আমরা এখন অতি সহজে এই চুড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, দেহ হতে মনের উৎপত্তি। অতএব ‘দেহ আগে না মন আগে’ প্রশ্নটির উত্তরে বুদ্ধের ব্যাখ্যায় প্রমাণিত হয়েছে দেহের উৎপত্তি আগে, মনের উৎপত্তি পরে।
মাতৃগর্ভে পিতার শুক্র হতে একটি শিশুর ভ্রুণের উৎপত্তি ও তার ক্রমবিকাশের প্রতি লক্ষ্য করেই আধুনিক জীব বিজ্ঞানও এখন বুদ্ধ আবিষ্কৃত সেই একই তত্ত্বটিতে উপনীত হয়েছে। বুদ্ধ বলেছেন এই দেহধারীগণ আসলে কোন প্রাণী, সত্ত্ব বা জীব নহে; ইহারা “নিস্সত্তো, নিজ্জীবো, সুঞ্ঞো, ধাতুমত্তমেবেতং।” অর্থাৎ প্রাণী বা জীবেরা হচ্ছে আসলে নিষ্প্র্রাণ, নির্জীব, শূন্য। মাটি, জল, বায়ু, তাপ এই চারি মহাধাতু সমষ্টিই হচ্ছে এই প্রাণী জগত। চিত্তের উৎপত্তি ও গতি (বিভিন্ন বিষয়ে চিন্তন, অনুচিন্তন) সম্পর্কে বুদ্ধের অভিমত-“সুদ্ধ ধম্মং পবত্তন্তি।” অর্থাৎ ঘড়ির নিয়ম মাফিক আবর্তনের ন্যায় চক্ষু, কর্ণাদি ইন্দ্রিয় (ংবহংব ড়ৎমধহব) পথে চারি পাশে বিরাজিত পরিবেশ হতে প্রাপ্ত বিষয়বস্তু বা আলম্বনের সংস্পর্শ জাত আঘাতের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়াই হচ্ছে এই চিত্ত প্রবাহ। বিষয় বস্তুর সংস্পর্শজাত চিত্তপ্রবাহ বা কম্পনের অপর নাম সুখ-দুঃখ উপশমাদি বেদনা অনুভূতি বা ধর্ম। সুখ, দুঃখ ও উপেক্ষা এই ত্রিবিধ বেদনা বা অনুভূতি হতে জন্ম নেয় ভালো-মন্দ কর্মের। সেই কর্ম যতক্ষণ পর্যন্ত চিত্ত প্রবাহে বা স্রোতে চিন্তন, অনুচিন্তনের মাধ্যমে আবর্ত্তিত হতে থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে বলা হয় মনোময় কর্ম।
কর্ম তার মনোময় কর্মের সীমা অতিক্রম করে যখন বাক্যে ও দৈহিক অঙ্গ প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে প্রকাশিত হয় তখন তাকে বাককর্ম ও কায়কর্ম বলে। মনোময় কর্মকেই “ধর্ম” বলে বুদ্ধ কর্তৃক উক্ত হয়েছে। সেই ধর্মের পরিণতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে বুদ্ধের দুটি বিখ্যাত উপমা এখানে প্রদত্ত হলো-
“মনো পুব্বঙ্গমো ধম্মা, মনো সেট্ঠ মনোময়া,
মনসা চে পদুট্ঠেন ভাসতি ব করোতি ব,
ততো নং দুক্খ মন্বেতি চক্কং ব বহতোপদং॥”
অর্থাৎ মন চিত্তে উৎপন্ন যাবতীয় মনোময় বিষয় সমূহে নেতৃত্বে দেয়। তাই মন কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরই তা কথায় বা দৈহিকভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। প্রদুষ্ট মনে কথা বললেবা দৈহিকভাবে কোন কাজ করলে তার পরিণতিতে দুঃখ উৎপন্ন হয়। সেই দুঃখ ভারী শকটবাহী বলদের পশ্চাতে ঘূর্ণায়মান চাকার ন্যায় দুষ্কর্মীকে দুঃখ-যন্ত্রণা প্রদান করতে করতে দুষ্কর্মীর অনুসরণ করে। দ্বিতীয় উপমায় বলা হয়েছে :
মনো পুব্বঙ্গমা ধম্মা মনো সেট্ঠ মনোময়,
মনসা চে পসন্নেন ভাসতি ব করোতি ব
ততো নং সুখ মন্বেতি ছায়া বা অনপায়িনী।
অর্থাৎ- চিত্তে উৎপন্ন যাবতীয় মনোময় বিষয় সমূহে মনই নেতৃত্ব দেয়। মন স্থির সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরেই তা বাক্যে বা দেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ দ্বারা প্রকাশিত হয়। তাই প্রসন্ন বা পবিত্র মনে কেহ কোন কথা বললে বা দৈহিকভাবে কোন কাজ করলে, তাতে সুখ উৎপন্ন হয়। সেই সুখ দেহের অপরিত্যাজ্য ছায়ার ন্যায়
সুকর্মীকে সুখ শান্তি প্রদান করে থাকে। বুদ্ধের দর্শনে চিত্তের এই উৎপত্তি এবং গতিটি কিভাবে বর্তমান জীবনটিকে সুখ-দুঃখে সম্পৃক্ত করায় এবং সীমানা অতিক্রম করে বর্তমান জন্ম থেকে জন্মান্তরে পরিভ্রমণ করায়; এখন তা প্রদর্শন করা কর্তব্য। তা না হলে বৌদ্ধরা কিভাবে ঈশ্বরবাদ ও জড় বিজ্ঞানবাদের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান গ্রহণ করে, জীবন ও জগৎ রহস্য সম্পর্কে নিজেদেরকে ভিন্ন অথচ এক অত্যন্ত বাস্তব যৌক্তিক জীবনের অধিকারী হতে পারেন তা অপ্রমাণিত থাকবে। বুদ্ধ বুদ্ধত্ব জ্ঞানলাভের পর মুহূর্তে স্বীয় জীবনের প্রত্যক্ষ উপলব্ধিতে জন্মান্তর সম্পর্কে উক্তি করলেন :-
অনেক জাতি সংসারং সন্ধাবিস্সং অনিব্বিসং;
গহকারকো দিট্ঠোসি, পুন গেহং ন কাহসি;
বিসঙ্খারা গতং চিত্তং তণ্হানং খয়মজ্ঝগা।
অর্থাৎ- দেহ ধারণের ফলে বহু দুঃখ ভোগ করতে হয় দেখে, এই দেহ রূপ গৃহটির নির্মাণ কর্তার সন্ধানে বহুজন্ম পরিভ্রমণ করেছি। কিন্তু তার দেখা না পেয়ে পুনপুনঃ দেহ ধারণের কারণে বার বার বহু দুঃখ যন্ত্রণা আমাকে ভোগ করতে হয়েছে। এবারে এই দেহ গৃহকারকের দেখা পেলাম। তাঁর রচিত গৃহের চুড়া খুঁটি সব
ভেঙ্গে চুড়মার করে দিলাম। তৃষ্ণা নামক ভোগাকাঙ্খা জাত সংস্কারই (চিত্ত) এই গৃহ নির্মাণ কর্তা। এখন আমার সেই তৃষ্ণা ক্ষয় হয়েছে, সংস্কারের বন্ধন হতে চিত্ত বিমুক্ত হয়েছে। তাই দেহ ধারণকারী হে তৃষ্ণা! তুমি এখন পুনঃ দেহ রূপ গৃহ আর নির্মাণ করতে পারবে না।
বুদ্ধ তথাগতের এই স্বগতোক্তিকে বিশ্লেষণ করলে জন্ম থেকে জন্মান্তরে কে এই প্রাণীগণকে নিয়ে যায়-তা দৃশ্যমান হয়। তৃষ্ণা জাত সংস্কারই এই নিয়ামক। তৃষ্ণা হলো মনোপুত বিষয়কে ভোগ করার ইচ্ছা, অমনোপুত বিষয়কে ত্যাগ করার ইচ্ছা, কোন কোন বিষয়ে উপেক্ষা বা উদাসীন থাকার ইচ্ছা। সংস্কার হলো, সেই ভোগ, ত্যাগ আর উপেক্ষা নামক ইচ্ছাকে ভিত্তি করে উৎপন্ন বিষয় বা আলম্বনের মানসিক ছাপ বা ছবি। মৃত্যু শয্যা
শায়িত মুমুর্ষ ব্যক্তি বা এমতাবস্থায় পতিত যে কোন প্রাণীর দেহের সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গ স্নায়ু তন্ত্রীর কর্মশক্তি শিথিল হওয়ার কারণে দেহ অনুভূতিহীন হয়ে গেলেও, তার চিত্ত অনুভূতিহীন হয়ে গেলেও তার চিত্ত তখনো সচল থাকে। সেই চিত্তে উক্ত সংস্কার নামক মানসিক ছবিগুলো তখন মুমুর্ষ ব্যক্তির মানসপটে ফিল্মের ন্যায় আনাগোনা শুরু করে। তৃষ্ণা নামক ইচ্ছা শক্তিটি তখন চুম্বকীয় শক্তিতে পরিণত হয়ে থাকে। জীবনে সেই ব্যক্তি যে ইচ্ছাটির প্রতি প্রবল আসক্ত ছিল বা যে কাজটি প্রতিনিয়ত সম্পাদন করতে করতে সে দারুণ অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল, তার মানসিক ছাপ বা সংস্কারটিই স্বাভাবিক ভাবে তখন তার মুমুর্ষ অবস্থার চিত্ত গতিকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করতে থাকে।
তখন সেই প্রবল গতিময় চিত্ত জোঁকের ন্যায় কম্পিত অবস্থায় কিছুক্ষণ অনুসন্ধান অনুচিন্তনের পর, সেই প্রবলতর শক্তিমান মানসিক ছবিটিকে আলম্বন করে তদনুযায়ী অনুকূল অবস্থানে উল্লম্পন দেয়, এই দেহ ত্যাগ করে অন্যদেহের মাতা-পিতার চিত্ত অনুকূল কোন গর্ভাশয়ে আশ্রয় গ্রহণ করতে। শত সহস্র বর্ষ আগে
উচ্চারিত মানুষ বা প্রাণীকূলের বিশাল শব্দভাণ্ডার যেমন আকাশে স্থিত বায়ুতে ইতর তরঙ্গ শক্তি সৃষ্টি করে এখনো বিরাজ করছে; একইভাবে কোন কোন মানুষ বা প্রাণী মৃত্যুক্ষণে ইচ্ছা শক্তির দুর্বলতা বা গর্ভ নির্বাচনে অক্ষমতার কারণে, উপরোক্ত ভাবে অন্য দেহে আশ্রয় গ্রহণে অক্ষম হলে; কিছুকাল স্বীয় পরিচিত পরিবেশে (জ্ঞাতী স্বজনের আশেপাশে) ইচ্ছা শক্তিরূপে অদৃশ্যে অবস্থান করে থাকে। জীবিত জ্ঞাতীগণ তাদের এই অস্থির অসহায় অবস্থায় পুণ্যদান জনিত ইচ্ছাশক্তি দিয়ে তাদেরকে সাহায্য করে, উত্তম গর্ভে জন্ম ধারণে শক্তি
যোগাতে পারে। বৌদ্ধ ধর্মে ইহাই জন্মান্তরবাদ। এতদূর পর্যন্ত অনাত্মবাদী বৌদ্ধধর্মে এই পর্যন্ত আত্মার স্বীকৃতির পরিধি। এই পরিধিকে বলা হয় সংসার বা লোক চক্রবাল। যতদিন পর্যন্ত মানুষ তথা প্রাণীগণ বুদ্ধ কথিত তৃষ্ণা ও সংস্কারের বন্ধন মুক্ত হতে না পারছে, ততদিন তাকে এই সংসার আবর্তে পুনঃপুন দেহ ধারণ করে, জন্ম থেকে জন্মান্তরে ধাবিত হতেই হবে। আর ভোগ করতে হবে অনন্ত দুঃখ যন্ত্রণা। ধনী হোক দরিদ্র হোক-সকলেই দেহ ধারণের উপদ্রব যন্ত্রণার অধীন। যে দিন প্রজ্ঞার আলোকে এই দুঃখ যন্ত্রণাকে তীব্রভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে, সেদিন সে তার হাত থেকে মুক্তি কামনায় ছট্পট্ করবেই করবে। তৃষ্ণা আর সংস্কারের বন্ধন ছিন্ন করতে রাজপুত্র সিদ্ধার্থের ন্যায় সংসারের যাবতীয় ভোগাকাঙ্খাকে তখন সে বিষ্টার ন্যায় ত্যাগ করতে পারবে। দেহ ধারণ জনিত ক্ষুধা, শীত-গরম, বৃষ্টি- কাঁদা, মশা-মাছি, রোগ-পীড়া, জরা-বার্ধক্য, প্রিয় বিচ্ছেদ, অপ্রিয় সংযোগ, আকাঙ্খিত বসত্মূ বা বিষয় লাভ না করা, সর্বোপরি মরণভীতি; এসকল অনিবার্য উপদ্রব, দুঃখ-যন্ত্রণাকে গভীর ভাবে উপলব্ধি করতে পারলেই সন্ন্যাসী সিদ্ধার্থের উচ্চারিত বজ্র কঠোর সংকল্পের ন্যায় সেই দুঃখ মুক্তিকামী জনও তখন দাঁত চেপে জিহ্বার অগ্রভাগকে তালুতে ঠেকিয়ে দেহের সমস্ত মাংস পেশী আর মেরুদণ্ডকে লৌহের মতো শক্ত করে উচ্চারণ করবে- ইহাসনে শুষ্য তুমে শরীরং তগস্থি মাংসং প্রলয়ঞ্চ যাতু; অপ্রাপ্য বোধিং, বহুকল্প দুর্লভং, নৈবৎশ্মনাৎ কাযমতস্য লিস্যতে।
এ আসনে শরীর মোর যাক্রে শুকায়ে;
চর্ম অস্থি মাংস যাক সব প্রলয়ে ডুবিয়ে।
বহু কল্প দুর্লভ ধন অপ্রাপ্য বোধি;
টলিবে না আসন হতে প্রাপ্তি অবধি।
জীবন দুঃখ মুক্তির তীব্র অভিলাষী এমন সংকল্প এমন দৃঢ় বীর্য পরাক্রমী না হলে, অন্য কোন শক্তি দিয়ে সংসার মায়ার বন্ধনকে ছিন্ন করা অসম্ভব। অবিদ্যাচ্ছন্ন অনন্ত জন্মের বিশাল সংস্কার রাশী এমন বীর্যবান জীবন-মরণ প্রতীজ্ঞাবদ্ধ জনই উত্তীর্ণ হয়ে থাকেন। তাঁদের মহা সৌভাগ্যবান ভগবান বলা হয় এ কারণেই। লোকুত্তর পুরুষ বা আর্য পুদগল এমন ব্যক্তিগণের মনে তখন আর কোন প্রশ্ন থাকে না-এই সৃষ্টি ও তার স্রষ্টার রহস্য নিয়ে। প্রশ্ন থাকে না আত্মা অনিত্য, না চির শাশ্বত, দেহ আগে না মন আগে-এই নিয়ে।

No comments:
Post a Comment