তথাগতের সত্তগণের প্রতি হিতাচরণ প্রশ্ন-মীমাংসা
ভন্তে, আপনারা বলিয়া থাকেন-‘তথাগত সত্ত্বগণের অহিত দূর করিয়া হিত সম্পাদন করেন।’ পুনরায় বলেন-অগ্নিস্কন্ধ সূত্র দেশনা সময়ে ষাটজন ভিক্ষুর রক্ত বমি হইয়াছিল, এই কারণে আমি বলিতে চাই তিনি হিতের পরিবর্তে অহিত করিয়াছেন। যদি হিতার্থ ধর্মদেশনা করেন, এই যে রক্ত বমি তাহা মিছা, না হয় হিতার্থ ধর্ম দেশনা এইটি মিছা, ইহার মীমাংসা করুন।
মহারাজ, সত্যই সর্বসত্ত্বের হিতার্থ তথাগত দেশনা করেন, আর এই যে ভিক্ষুদের রক্ত বমি, তাহা তথাগতের কৃতকার্য নহে। সেইটা তাহাদেরই কর্মের প্রভাবে। ভন্তে, বুদ্ধ যদি সেই সূত্র দেশনা না করিতেন, সত্যই তাঁহাদের রক্ত বমি হইত কি? না মহারাজ, তাহারা বাস্তবিক দুর্নীতি- পরায়ণ, তাই বুদ্ধের দেশনা শুনিয়া তাহাদের পরিদাহ উৎপন্ন হইয়াছিল। সেই পরিদাহ কারণে তাহাদের রক্ত বমি হয়। তাহা হইলে ভন্তে, তথাগতই সেই নষ্টের মূল। যেমন ভন্তে, একটি সাপ গর্তে প্রবেশ করিল, একজন লোক মাটি নিবার জন্য তথায় আসিয়া যতই মাটি লইতে লাগিল ততই গর্তটি মাটিতে পূর্ণ হইয়া গেল। কাজেই সাপ নিঃশ্বাস ফেলিতে না পারিয়া গর্তে মরিয়া গেল। তাহা হইলে ভন্তে বলিতে হইবে, পুরুষের কৃত কর্মদ্বারা সাপটি মরিয়া গেল। হাঁ মহারাজ। এই প্রকার ভন্তে, তথাগতই ভিক্ষুদের রক্ত বমির মূল। মহারাজ, তথাগত ধর্মদেশনা করিলেও তাহাদের প্রতি ক্রোধ চিত্ত পোষণ করিয়া করেন নাই। মৈত্রী চিত্তেই করিয়াছেন। এইভাবে ধর্মদেশনা করিলে, যাঁহারা সুনীতিপরায়ণ তাঁহারা ধর্মজ্ঞান লাভ করিয়া থাকেন। যাহারা-দুর্নীতিপরায়ণ তাহাদের পতন হইয়া থাকে। যেমন মহারাজ,
 |
| গৌতম বুদ্ধ |
আম-জাম-মধুক ফলের গাছ ধরিয়া নাড়া দিলে, সেই গাছে যেই ফলগুলি সারযুক্ত, যেইগুলির বোঁটা শক্ত সেইগুলি থাকিয়া যায়, যেইগুলির বোঁটায় পঁচা ধরিয়াছে, সেইগুলি পড়িয়া যায়। এই প্রকার মহারাজ, বুদ্ধের দেশনায় ক্রোধ চিত্ত নাই, তাই সুশীলের শ্রীবৃদ্ধি হয়, দুঃশীলের পতন হয়। যেমন মহারাজ, কৃষক ধান্য রোপণ করিবার জন্য ক্ষেত্র কর্ষণ করে, সেই কর্ষণের দরুন বহু লক্ষ তৃণ মরিয়া যায়, এই প্রকার তথাগত মৈত্রীচিত্তে ধর্মদেশনা করেন, তাহাতে সুশীলের উন্নতি হয়, দুঃশীল তৃণতুল্য মরিয়া যায়। যেমন মানুষ রসের জন্য ইক্ষু যন্ত্রে পেষণ করে, তখন যন্ত্রের মুখে যেই সব কৃমি থাকে, তাহারা পিষিয়া যায়। সেইরূপ তথাগত পরিপক্ব জ্ঞানদান মানসে সত্ত্বদিগকে জাগাইতে তিনি ধর্ম-যন্ত্র চালাইয়া থাকেন, তন্মধ্যে যাহারা দুঃশীল তাহারা কৃমির ন্যায় মরিয়া থাকে। ভন্তে, সেই ভিক্ষুরা ঐ ধর্মদেশনায় পতিত হইয়াছে নয় কি? মহারাজ, বৃক্ষ মসৃণকারী গাছটি রক্ষা করিয়া সোজাভাবে পরিশুদ্ধ করে কি? হাঁ ভন্তে, যাহা বর্জনীয়, তাহা ফেলিয়া গাছটাকে রক্ষা করিয়া পরিশুদ্ধ করে। এই প্রকার মহারাজ, তথাগত পরিষদের সকলকে রক্ষা করিতে গেলে জ্ঞানবানদিগকে জ্ঞান দিতে পারেন না, তাই যাহারা দুঃশীল তাহাদিগকে দূর করিয়া জ্ঞানবানদিগকে জ্ঞানদান করেন। যাহারা দুঃশীল তাহাদের নিজের কর্ম প্রভাবেই পতন হইবে। যেমন মহারাজ, কদলী, বাঁশ ও অশ্বতরীর মধ্যে ফল উৎপন্ন হইলে নিজের ফল প্রভাবে তাহারা নষ্ট হইয়া যায়। এই প্রকার দুঃশীলদেরও পতন হইয়া থাকে। যেমন চোরেরা নিজের কুকার্য গুণে নিজের চক্ষু উৎপাটন করে, নিজকে শূলে দেয় ও শিরচ্ছেদ দুঃখ পাইয়া থাকে। এই প্রকার মহারাজ দুঃশীলতা প্রভাবে জিন শাসন হইতে দুঃশীলদের পতন হইয়া থাকে। যেই ষাটজন ভিক্ষুর রক্ত বমি হইয়াছে, তাহা ভগবানের দ্বারাও নহে, অপরের দ্বারাও নহে, কেবল নিজেরই কর্মের দোষে। যেমন কোন পুরুষ জন-সঙ্ঘকে অমৃত দান করিল। বহু লোক সেই অমৃত ভোজন করিয়া নীরোগত্ব প্রাপ্ত হইল, দীর্ঘায়ু লাভ করিল ও সমস্ত বিঘ্ন মুক্ত হইল। অন্য এক পুরুষ সেই অমৃত অন্যায়ভাবে ভোজন করিয়া মরিয়া গেল। মহারাজ, আপনি কি সেই অমৃতদানকারী অপুণ্য প্রাপ্ত হইল বলিবেন? না ভন্তে, এই প্রকার ভগবান দশ সহস্র লোক মণ্ডলে দেবমনুষ্যগণকে দান দিয়াছেন, তন্মধ্যে যাঁহারা পুণ্যবান তাঁহারা ধর্মামৃত প্রভাবে জ্ঞানলাভ করিয়া থাকেন, আর যাহারা হীনপুণ্য তাহারা ধ্বংস হইয়া থাকে। মহারাজ, ভোজন সত্ত্বগণের জীবন রক্ষা করে, তাহাও কেহ কেহ ভোগ করিয়া বিসূচিকা রোগে মরে, তাহাতে কি ভোজনদাতার অপুণ্য হইবে? না ভন্তে। এই প্রকার মহারাজ, তথাগত অযুত লোকমণ্ডলে দেব-মনুষ্যদিগকে ধর্মামৃত দান করিয়া থাকেন। তন্মধ্যে যেই জীবগণ উন্নত, তাঁহারা ধর্মামৃত লাভ করিয়া থাকেন, আর যাহারা অনুন্নত, তাহাদের ধর্মামৃত প্রভাবে ধ্বংস ও পতন হয়। সাধু ভন্তে, নাগসেন।
It's good website. Thanks
ReplyDelete