গাথাপ্রসঙ্গ : ‘‘ফন্দনং চপলং চিত্তং” ‘‘স্পন্দিত চঞ্চল চিত্ত”- ইত্যাদি ধর্মদেশনা বুদ্ধ চালিকা পর্বতে বাস করার সময়ে আয়ুষ্মান মেঘিয়কে উদ্দেশ্য করে ভাষণ করেছিলেন।
বুদ্ধ চালিকা পর্বতে অবস্থানকালে আয়ুষ্মান মেঘিয় তাঁর (বুদ্ধের) সেবা করতেন। একদিন তিনি বুদ্ধের নিকট উপস্থত হয়ে তাঁকে বন্দনা করে বললেন- ‘‘ভন্তে, আমি গ্রামে যেতে ইচ্ছা করি।” বুদ্ধ আয়ুষ্মান মেঘিয়কে ‘‘যাও” বলে অনুমতি দিলেন। অনন-র আয়ুষ্মান মেঘিয় পূর্বাহ্ন সময়ে পাত্র-চীবর নিয়ে গ্রামে ভিক্ষায় প্রবেশ করলেন। গ্রামে ভিক্ষা করে ফিরে এসে ভোজনান্তে ক্রিমিকালা-নদীর তীরে গিয়ে পুনঃপুন চঙ্ক্রমণ ও পরিভ্রমন করতে করতে একটি আম্রকানন দেখে ভাবলেন- ‘‘এই আম্রকানন কতই প্রসাদ জননী! কতই রমনীয়া! ইহাই ধ্যানের জন্য উপযুক্ত স্থান। ভগবান আমাকে অনুমতি দিলে আমি এই আম্রবনে ধ্যানার্থ আসব।”
অতঃপর আয়ুষ্মান মেঘিয় ভগবানের নিকট উপস্থিত হয়ে তাঁকে বন্দনা করলেন এবং একপার্শ্বে উপবেশন করে বললেন- ‘‘ভন্তে, আমি পূর্বাহ্ন সময়ে পাত্র-চীবর নিয়ে গ্রামে ভিক্ষায় প্রবেশ করেছিলাম। সেখানে ভিক্ষা করে ভোজনান্তে ফিরবার সময় ক্রিমিকালা-নদীর তীরে গমন করলাম। সেখানে পদব্রজে পুনঃপুন চঙ্ক্রমণ করতে করতে প্রসাদ জননী রমনীয়া এক আম্রকানন দেখে ভাবলাম- ‘এই আম্রকানন কতই প্রসাদ জননী! কতই রমনীয়া! ইহাই ধ্যানের জন্য উপযুক্ত স্থান। ভগবান অনুমতি দিলে আমি এই আসব।’ ভন্তে, ভগবান যদি আমাকে অনুমতি দেন তবে আমি ঐ আম্রবনে ধ্যানের জন্য যাব।” আয়ুষ্মান মেঘিয় এরূপ বললে বুদ্ধ তাঁকে বললেন- ‘‘হে মেঘিয়! এখন আমি একাকী, অন্য কোন ভিক্ষুর আগমন পর্যন- অপেক্ষা কর।” বুদ্ধ এরূপ বলার পরও আয়ুষ্মান মেঘিয় দ্বিতীয়বারেও একই প্রার্থনা করলেন। বুদ্ধও দ্বিতীয়বারে একই উত্তর দিলেন। তৃতীয়বারেও আয়ুষ্মান মেঘিয় একই প্রার্থনা করলে বুদ্ধ বললেন- ‘‘হে মেঘিয়! যখন যেতে চাচ্ছ, তখন আর কি বলব। যদি সময় মনে কর, তবে তাই কর।”
অনন-র আয়ুষ্মান মেঘিয় আসন থেকে উঠে বুদ্ধকে অভিবাদন করে সেই আম্রবাগানের দিকে অগ্রসর হলেন। সেখানে গিয়ে আম্রবাগনে ধ্যান করার সময় তাঁর কাম-চিন্তা, ক্রোধ-চিন্তা ও হিংসা-চিন্তা বার বার বেশিভাবে মনে উঠতে লাগল। অবশেষে এই ত্রিবিধ পাপজনক অকুশল বিতর্ক দ্বারা আবদ্ধ হয়ে চিত্তকে দমন করতে না পেরে ধ্যান থেকে উঠে বুদ্ধের নিকট গমন করলেন। সেখানে গিয়ে বুদ্ধকে বন্দনা করে একপাশে বসলেন এবং তাঁর কাম-বিতর্কাদির কথা বুদ্ধকে প্রকাশ করলেন। বু্দ্ধ তখন আয়ুষ্মান মেঘিয়কে উপদেশ দিয়ে বললেন- ‘‘হে মেঘিয়! চিত্ত-বিমুক্তি বা আর্হত্ত্ব-ফল-সমাধি অপূর্ণ থাকলে পাঁচটি ধর্ম দ্বারা তা পরিপূর্ণ হয়। সেই পাঁচটি ধর্ম কি কি? হে মেঘিয়! চিত্ত যখন সম্পূর্ণ বিমুক্তি লাভ করতে পারে না তখন কল্যাণ-মিত্র বা সৎগুরুর আশ্রয় নিতে হয়, কল্যাণ-মিত্রের সাহার্য নিতে হয় এবং তিনি যা বলেন কায়মনে তদনুযায়ী আচরণকারী হতে হয়। হে মেঘিয়! অমুক্ত ব্যক্তির চিত্ত সম্পূর্ণ বিমুক্তি-লাভ করার জন্য এই প্রথম উপায়। ইহা কল্যাণ-মিত্রতা।
হে মেঘিয়! দ্বিতীয়তঃ ভিক্ষুকে শীলবান হতে হয়, বিনয়শীলে প্রতিষ্ঠিত থাকতে হয়। চলাফেরা আচার-গোচর সুন্দর করতে হয় ও অল্পমাত্র পাপেও ভীত হতে হয় এবং শিক্ষাপদসমূহ গ্রহণ করে তদনুযায়ী আচরণ শিক্ষা করতে হয়। হে মেঘিয় অনর্হতের অর্হৎ হবার জন্য এটি দ্বিতীয় ধর্ম।
হে মেঘিয়! তৃতীয়তঃ এমন সকল আলাপ করতে হয় যাতে মন নিষ্পাপ ও উন্মুক্ত হয়, সংসার দুঃখে একান- উৎকণ্ঠিত হয় এবং সংসারে অ েরররররররনননরনভিরতি ও আসক্তিহীন হয় এবং যা চিত্তের নিরোধ ও উপশম আনয়ন করে আর যা বিশেষ জ্ঞান, সম্বোধি ও নির্বাণ প্রদান করে। উক্ত প্রকারের বাক্যালাপ ইচ্ছামতে সহজে বেশিভাবে লাভ করতে পারলে চিত্ত পাপ থেকে মুক্ত হয়। চিত্ত বিমুক্তি লাভের উপায় স্বরূপ ইহা তৃতীয় ধর্ম।
হে মেঘিয়! চতুর্থতঃ ভিক্ষুকে পাপ পরিত্যাগের জন্য ও পুণ্য লাভের জন্য উৎসাহী, শক্তিমান ও দৃঢ় পরাক্রমশালী হয়ে বিচরণ করতে হয় এবং সর্বদা নিষ্পাপ ধর্মপরায়ণ হতে হয়। ইহা অনর্হতের অর্হত্ত্ব ফল লাভের চতুর্থ উপায়।
হে মেঘিয়! পঞ্চমতঃ ভিক্ষুকে জ্ঞানবান হতে হয়, স্কন্ধসমূহের উৎপত্তি ও বিলয় জ্ঞানদায়িনী প্রজ্ঞাসম্পন্ন হতে হয়, যেই জ্ঞানের দ্বারা নির্বাণ সম্মুখীভূত হয়, সাংসারিক আনন্দ নাশ হয় ও সম্যকরূপে দুঃখের ক্ষয় সাধন হয়, সেরূপ জ্ঞান লাভ করতে হয়। হে মেঘিয়! অনর্হতের অর্হত্ত্ব ফল লাভের এটি পঞ্চম উপায়।
হে মেঘিয়! যে ভিক্ষু সৎগুরুর সেবা করে, কল্যাণ-মিত্রের সাহার্য গ্রহণ করে, সৎগুরুর প্রতি যার বেশি টান, সে-ই আশা করতে পারে যে, সে শীলবান হতে পারবে, চারি অপায় ও সংসারবর্ত দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ করতে পারবে। হে মেঘিয়! কল্যাণ-মিত্র-সেবী, কল্যাণ-সহায় ও কল্যাণ-মিত্রের প্রতি চিত্তাকর্ষণ সম্পন্ন ভিক্ষুই আশা করতে পারে যে সে পাপ ত্যাগ ও পুণ্য বৃদ্ধির জন্য উৎসাহ-উদ্যোগ সম্পন্ন হবে, শক্তিমান ও দৃঢ় পরাক্রমশালী হবে; শীলবান, প্রাতিমোক্ষ সংযমে সংযত, আচার-গোচর সম্পন্ন পাপভীরু হবে, শীল গ্রহণ করে পালন করবে, মনের পবিত্রতা সাধক চিত্তের বিকাশক একান- নিষ্কৃতি, বিরাগ, নিরোধ ও শানি-র আবাহক অভিজ্ঞা, সম্বোধি ও নির্বাণদায়ক মার্গ ইচ্ছামত সহজে লাভ করতে পারবে এবং যেই জ্ঞানের দ্বারা উদয় অস- সম্বন্ধে জানা যায়, আর্য নির্বাণ লাভ ও সম্যক দুঃখের ক্ষয় করা যায় সেই জ্ঞানে জ্ঞানবান হবে।”
অনন-র বুদ্ধ মেঘিয়কে সম্বোধন করে আরো বললেন- ‘‘হে মেঘিয়! তুমি ঐ সময় গুরুতর অপরাধ (অন্যায়) করেছ। মেঘিয়! তোমাকে বলেছিলাম যে আমি একাকী আছি, যতক্ষণ না অন্য কোন ভিক্ষু আসে তুমি আমার নিকট থেকে চলে যেও না। কিন' তুমি আমাকে একাকী রেখে চলে গেছ। এরূপ আচরণ করলে কোন ভিক্ষুই তার চিত্তকে বশ (দমন) করতে পারবে না। কারণ চিত্ত অত্যন- লঘু। ইহাকে নিজের বশে রাখতেই হবে।”- ইহা বলে বুদ্ধ এই গাথা দুইটি দেশনা করেছিলেন। (দেশনাবসানে মেঘিয় স্থবির স্রোতাপত্তিফলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন এবং অন্যান্য অনেকেও স্রোতাপন্ন হয়েছিলেন। উপস্থিত জনগণের নিকটও এই ধর্মদেশনা সার্থক হয়েছিল)।
ব্যাখ্যা
ফন্দনং : স্পন্দনশীল। এখানে স্পন্দনশীল বলতে রূপাদি পঞ্চ আলম্বনের দ্বারা সদা টলায়মান বুঝতে হবে।
চপলং : চঞ্চল অর্থাৎ একই অবস্থায় বেশিক্ষণ থাকতে না পারা গ্রাম্য বালকের ন্যায় চিত্ত বেশিক্ষণ একই আলম্বনে বা বিষয়ে থাকতে পারে না বলেই চঞ্চল।
দূরক্খং : দূরক্ষ্য অর্থাৎ যেমন ঘেরা দেওয়া শস্যক্ষেত্র হতেও গরু সুযোগ পেলেই শস্য ভক্ষণ করে, রক্ষা করা যায় না, তদ্রূপ এক একটি ‘সপ্রায়’ বা হিতকর আলম্বনেও চিত্তকে বেশিক্ষণ ধরে রাখা যায় না বলেই চিত্তে ‘দূরক্ষ্য’ বলা হয়েছে।
দুন্নিবারযং : দুর্নিবার্য। বিপরীত বা অহিতকর আলম্বন গমন হতে চিত্তকে নিবারিত করা কষ্টকর বলে ‘দুর্নিবার্য’ বলা হয়েছে।
উসুকারো’ব তেজনং : শর প্রস্থতকারী যেমন শরকে অর্থাৎ যেমন শর প্রস্থতকারী অরণ্য হতে বঙ্কদণ্ড (বাঁকা লাঠি) আহরণ করে এর ছাল ছড়ায়ে কাঞ্জিয় তৈল বা যাগুভাতের উপর ভাসমান ঘন তৈলজাতীয় পদার্থের দ্বারা ম্রক্ষিত করে অঙ্গারগর্তে তপ্ত করে গাছের শক্ত কীলক বা খোঁটার দ্বারা সোজা করে, এমন কি একটি চুলকেও বিদ্ধ করা যায় মত তীক্ষ্ণ ও ঋজু করে ‘‘উজুং করোতি”। পরে তদ্দ্বারা রাজা এবং রাজমহামাত্যদের নানাবিধ কোশল প্রদর্শন করে অনেক সৎকার-সম্মান লাভ করে। ঠিক তদ্রূপ ‘মেধাবী’ বা বিজ্ঞ ব্যক্তি স্পন্দনশীলাদি স্বভাবযুক্ত চিত্তকে ধুতাঙ্গ এবং অরণ্যাবাসবশে স্থূল ক্লেশাদি হতে মুক্ত করে শ্রদ্ধারূপ স্নেহপদার্থের দ্বারা সিক্ত করে কায়িক এবং চৈতসিক বীর্যের দ্বারা তপ্ত করে শমথ এবং বিদর্শন ধ্যানের খোঁটায় বেঁধে ঋজু, অকুটিল, দমিত এবং শান- করে। অতঃপর সংস্কারসমূহকে যথাযথভাবে জেনে মহা অবিদ্যাস্কন্ধকে বিদীর্ণ করে ‘ত্রিবিদ্যা-ষড়াভিজ্ঞা-নবলোকোত্তর ধর্ম’ ইত্যাদিকে বিশেষভাবে হস-গত করে অগ্রদক্ষিণার্হ অবস্থা লাভ করেন অর্থাৎ শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেন।পরিফন্দতিদং চিত্তং : এই চিত্ত স্পন্দিত হয় অর্থাৎ যেমন উদকরূপ আলয় হতে উৎক্ষিপ্ত এবং স্থলে নিক্ষিপ্ত মৎস্য জল না পেয়ে ছট্ফট্ করে, তদ্রূপ পঞ্চ কামগুণরূপ আলয়াভিরত চিত্ত তা হতে উদ্ধার লাভ করে মারের রাজ্য নামক কুমার্গ দূর করতে ‘বিদর্শন কর্মস্থানে’ ক্ষিপ্ত এবং কায়িক-চৈতসিক বীর্যের দ্বারা সন্তাপিত হয়ে ছট্ফট্ করে, থাকতে সমর্থ হয় না। এরূপ অবস্থা হলেও বিদর্শন ধুর ত্যাগ না করে মেধাবী ব্যক্তি উপরিউক্ত নিয়মে ঋজু কর্মনীয় সম্পাদন করে থাকেন। অন্য ব্যাখ্যা হচ্ছে- এই মাররাজ্য বা ক্লেশবর্ত্মকে ত্যাগ না করে স্থিত চিত্ত সেই বারিজ মৎস্যের ন্যায় ছট্ফট্ করে। সেজন্য ‘‘মারধেয্যং পহাতবে” যে ক্লেশবর্ত্ম নামক মাররাজ্যের দ্বারা ছট্ফট্ করে তা পরিত্যাজ্য।
মর্মোদ্ঘাটন : শর প্রস্থতকারী যেমন শরকে সোজা করতঃ প্রস্থত করে, তদ্রূপ জ্ঞানী ব্যক্তি নিজ স্পন্দনশীল, চঞ্চল, দূরক্ষ্য এবং দুর্নিবার্য চিত্তকে ঋজু করেন অর্থাৎ নিজ বশে আনয়ন করেন।
জল হতে উত্থিত এবং স্থলে প্রক্ষিপ্ত মৎস্য যেমন ছট্ফট্ করতে থাকে, সেরূপ পঞ্চকামগুণ বিনির্মুক্ত চিত্ত মারের রাজ্য অতিক্রম করার জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকে।
‘‘অস্থির চঞ্চল চিত্ত, দুষ্কর রক্ষণ নিবারণ,
মেধাবী করেন সোজা, ধানুষ্কের শরের মতন।
স্থলেতে উক্ষিপ্ত মৎস্য, জলে যেতে করে ধরফর,
‘মারের’ বন্ধন হতে চিত্ত চাহে মুক্তি নিরন-;র।”

No comments:
Post a Comment