Followers

Saturday, January 14, 2017

অকুশল কর্ম উচ্ছেদপূর্বক সর্বজ্ঞতা


                       অকুশল কর্ম উচ্ছেদপূর্বক সর্বজ্ঞতা প্রাপ্তি প্রশ্ন-মীমাংসা

ভন্তে, বুদ্ধ সমস্ত অকুশল দগ্ধ করে সর্বজ্ঞতা প্রাপ্ত হয়েছেন? না অকুশল অবশিষ্ট রেখে প্রাপ্ত হয়েছেন? মহারাজ, সমস্ত অকুশল দগ্ধ করে, তিনি সর্বজ্ঞ হয়েছেন। একটি বিন্দু অকুশলও তাঁহার অবশিষ্ট নাই। ভন্তে, কোনদিন বুদ্ধের শরীরে দুঃখ বেদনা জাত হয়েছে কি? হাঁ মহারাজ, যখন রাজগৃহে ভগবানের পদ পাষাণদ্বারা ক্ষত হয়েছিল তখন তাঁহার রক্তাতিসার রোগ উৎপন্ন হয়েছিল। শরীর দোষযুক্ত হইলে কবিরাজ জীবক বিরেচন দিয়েছেন,যখন তাঁহার বাত ব্যাধি হয়, তখন সেবক স্থবির গরম জল সজ্জিত করে দিয়েছেন। যদি ভন্তে, যাবতীয় অকুশল দগ্ধ করিয়া বুদ্ধ সর্বজ্ঞ হন, তাহা হইলে তাঁহার পায়ে পাথরের ঘা হইবে, রক্তাতিসার হইবে, এই যে বচন তাহা মিছা। যদি এই বিপদ তাঁহার উপর হয়ে থাকে, তিনি যে অকুশল দগ্ধ করে সর্বজ্ঞ হয়েছেন তাহাও মিছা। ভন্তে, কর্ম বিনা কি কিছু ভোগ হইতে পারে? সমস্ত অনুভূত বিষয় কর্মমূলক। কর্মই অনুভূতি প্রদান করে। ইহাও উভয় সমস্যার বিষয়, মীমাংসা করুন।
মহারাজ, সমস্ত অনুভূতি কর্মমূলক নহে। আট প্রকার কারণে ঐ কর্ম- ফল ভোগ করতে হয়, যেই বেদনা বহু প্রাণী ভোগতে থাকে। সেই আট প্রকার কি? কোন কোন প্রাণী বাতজ, পিত্তজ, শ্লেষ্মজ, সন্নিপাতজ, ঋতুজ, বিরুদ্ধ আহার বিহার জাত, পরের উপক্রমজাত ও কর্মবিপাক জাত ব্যাধি ভোগ করে থাকে। তন্মধ্যে কর্ম সেই সত্ত্বদিগকে পীড়িত করে, তাহারা যে রোগের হেতুকে বিনাশ করে, তাহাদের সেই বচন মিথ্যা। ভন্তে, বাতজ হইতে উপক্রম জাত ব্যাধি পর্যন্ত যে সাত প্রকার ব্যাধি, এই সমস্ত কর্মফলেই উৎপাদিত, তাই এই ব্যাধিসমূহ কর্মজাত বলতে হবে। মহারাজ, যদি সমস্তই কর্মজাত ব্যাধি হয়, তাহা হইলে এইগুলির একটা বিভিন্ন প্রকার লক্ষণ দেখা যাইত না।
মহকারুণিক গৌতম বুদ্ধ

মহারাজ, শীত, উষ্ণ, ক্ষুধা, পিপাসা, অতিভোজন, স্থান ভেদ, অতিরিক্ত পরিশ্রম, আধাবন, উপক্রম ও কর্ম বিপাক এই দশটি কারণে বায়ু কোপিত হয়। কর্ম বিপাক ব্যতীত নয়টি কারণ অতীতেও ছিল না, ভবিষ্যতে এইগুলি হইবে না। শুধু বর্তমান ভবেই উৎপন্ন হয়। সেই কারণে এইরূপ বলবেন না যে সমস্ত বেদনা কর্ম-জাত।
মহারাজ, তিনটি কারণে পিত্ত কোপিত হয়-শীত, উষ্ণ ও বিরুদ্ধ ভোজনদ্বারা। তিনটি কারণে শ্লেষ্মা কোপিত হয়-শীত, উষ্ণ ও অন্ন পানীয়দ্বারা। মহারাজ, যাহা বায়ুকর, যাহা পিত্তকর ও যাহা শ্লেষ্মাকর উহারা স্বীয় স্বীয় কারণে কোপিত হয়ে মিশ্রিত হইয়া স্বীয় স্বীয় বেদনা আকর্ষণ করে থাকে। ঋতু পরিবর্তনে যে বেদনা তাহা ঋতুযোগে উৎপন্ন হয়। একস্থানে এক ঘরে, বদ্ধঘরে বহুদিন বাস করার দরুন যে বেদনা উৎপন্ন হয়, তাহা বিরুদ্ধ আহার বিহারেই হয়। ঔপক্রমিক রোগটি দুই প্রকারে হয়। অপরের ক্রিয়া প্রয়োগে ও কর্ম বিপাকে জাত হয়। কর্ম বিপাকজ বেদনা পূর্বকৃত কর্মফলে হয়ে থাকে। এই আটটি কারণে মহারাজ, কর্ম বিপাক জাত অল্প, বেশীরভাগ অপরাপর কারণে হয়। যাহারা মূর্খ তাহারা মনে করে, সমস্ত কর্ম বিপাক জাত। সেই কর্মফলের ব্যবস্থা বুদ্ধজ্ঞানে ব্যতীত অন্য কাহারও নির্ণয় করবার সাধ্য নাই।
মহারাজ, ভগবানের পায়ে যে পাথর পড়ে ক্ষত হয়ে থাকে, সেই অনুভূতি বায়ুজ, পিত্তজ, শ্লেষ্মজ, সন্নিপাতজ, ঋতু পরিবর্তন জাত, বিরুদ্ধ আহার-বিহার জাত ও কর্ম বিপাক জাত ব্যাধি নহে। তাহা পরের উপক্রমবলেই হইয়াছে বলিয়া ঔপক্রমিক বেদনা। মহারাজ, বহুলক্ষ বৎসর ব্যাপিয়া দেবদত্ত বুদ্ধের প্রতি শত্রর্বতা আচরণ করিয়া আসিতেছিল, দেবদত্ত সেই আক্রোশে বৃহৎ শিলাখণ্ড বুদ্ধের মাথায় ফেলিবার ইচ্ছায় ছুড়েছিল। তৎক্ষণাৎ দুইটি শৈল এসে বুদ্ধের মাথায় না পড়িতেই আটক করেছিল। সেই পর্বত দুইটির পরস্পর সঙ্ঘাতে একটুকরা পাথরকণা উঠিয়ে ভগবানের পায়ে পড়ে, উহাতে সামান্য রক্ত দেখা দিয়েছিল। মহারাজ, হয়ত কর্ম বিপাকে, নচেৎ ক্রিয়া হইতে বুদ্ধের বেদনা হয়েছিল, তাহা ছাড়া অন্য বেদনা নহে। যেমন মহারাজ, হয় ক্ষেত্রের দোষে বীজ গজায় না, নয় বীজের দোষে। যেমন হয়ত উদরের দোষে ভোজন জীর্ণ হয় না, নচেৎ আহারের দোষে। কিন্তু মহারাজ, এই কথা ঠিক যে বুদ্ধের কর্ম বিপাক বেদনা নাই ও আহার বিহার বেদনাও নাই। অবশিষ্ট কারণে ভগবানের বেদনা উৎপন্ন হইতে পারে, কিন্তু সেই বেদনাদ্বারা বুদ্ধের জীবন নাশ সম্ভব নহে। মহারাজ, এই চারিভূতযুক্ত কায়ে ইষ্টানিষ্ট ও শুভাশুভ বেদনা দেখা দিবেই। যেমন আকাশে ঢিল ছুঁড়িলে মাটীতে পড়া স্বাভাবিক, তাই বলিয়া কি পূর্বকৃত কর্মে ঢিল মাটিতে পড়ে? না ভন্তে, এমন কোন হেতু মহাপৃথিবীর নাই, যেহেতু মহাপৃথিবী কুশলাকুশল বিপাক অনুভব করিতে পারে। কেবল বর্তমান অকর্মক হেতুদ্বারা সেই ঢিল পৃথিবীতে পড়ে মাত্র। এই উপমায় যেমন মহাপৃথিবী তেমন বুদ্ধ। যেমন ঢিল স্বভাবতঃ মহাপৃথিবীতে পড়ে, এই প্রকার বুদ্ধের পূর্বে অকৃত কর্মদ্বারা সেই শিলাখণ্ড পায়ে পড়িয়াছে। মহারাজ, এই জগতে মনুষ্যেরা মহাপৃথিবীকে ভেদ করে, খনন করে, তাই বলিয়া কি তাহারা পূর্বের কৃত পৃথিবীকে ভেদ করে ও খনন করে? না ভন্তে, এই প্রকার মহারাজ, যেই শিলাখণ্ড ভগবানের পায়ে পড়েছিল, তাহা পূর্বকৃত কর্মদ্বারা বুদ্ধের পায়ে পড়ে নাই। বুদ্ধের নিকট যে রক্তাতিসার হল, তাহাও পূর্বকৃত কর্মদ্বারা হয় নাই। তাহা সন্নিপাতবলেই হয়েছে। ভগবানের যাহা কিছু কায়িক রোগ হয়, সেই সমস্ত কর্মফলে হয় না। ষড়বিধ কারণের অন্যতম কারণেই হয়ে থাকে।
তাই ভগবান সংযুক্ত নিকায়ে ‘মোলিয় সীবক, বর্ণনায় বলেছেন- “সীবক, এই শরীরে যাহা কিছু অনুভূতি জাত হয়, তুমি তাহা নিজেই জ্ঞাত হইবে, যেমন কোন কোন ব্যক্তির পিত্তরোগাদি উৎপন্ন হইয়া থাকে। জগতেও ইহা সত্যসম্মত যে, পিত্তরোগে অনেকে দুঃখ ভোগে। ইহার মধ্যে কোন কোন শ্রমণ-ব্রাহ্মণ এইরূপ বাদী ও এইরূপ দৃষ্টিসম্পন্ন আছে, এই পুরুষ সুখ-দুঃখ উপেক্ষা যে ভোগিতেছে, তৎ-সমস্ত পূর্বকৃত কর্মহেতু। ইহাতে যাহা নিজে জানে তাহাও অতিক্রম করে, যাহা লোকে সত্যসম্মত, তাহাও অতিক্রম করে, সেই কারণে আমি এই শ্রমণ-ব্রাহ্মণদিগের মতকে মিথ্যা বিশ্বাস বলিতেছি।” এই কারণে মহারাজ সমস্ত বেদনা কর্ম বিপাকজ নহে। সমস্ত অকুশল দগ্ধ করিয়া বুদ্ধ সর্বজ্ঞতা প্রাপ্ত বলিয়া ধারণা করুন। সাধু ভন্তে, তাহাতে আমি সম্মতি প্রকাশ করিতেছি।

No comments:

Post a Comment