অল্পায়ূ সূত্র: পর্ব- ২
৮. ভিক্ষুগণ, শেষোক্ত মনুষ্যগণের মধ্যে ব্যাপকরূপে দুটি অসৎ ধর্মের উৎপত্তি হল-কর্কশ বাক্য এবং তুচ্ছ প্রলাপ। এর ফলে মনুষ্যের আয়ু লঘু হয়ে পাঁচ হাজার বৎসর থেকে তার সন্তান-সন্ততিগণের কেউ কেউ দ্বি-অর্ধ সহস্র কেউ কেউ দুই সহস্র বৎসর আয়ুসম্পন্ন হল।
৯. ভিক্ষুগণ, দ্বি-অর্ধ সহস্র বর্ষ আয়ুসম্পন্নের মানুষের মধ্যে আবার লোভ বিদ্বেষ দুটি বহু পরিমাণে উৎপত্তি হল। এর ফলে তার আয়ু ও বর্ণ হ্রাস হল। তদ্ধেতু তাদের সন্তান-সন্ততিগণ এক হাজার বৎসর আয়ুসম্পন্ন হল। এরূপে, এক সহস্র আয়ুসম্পন্ন মনুষ্যগণের মধ্যে মিথ্যাদৃষ্টি বহুপরিমাণে উৎপত্তি হল। এর ফলে তাদের আয়ু ও বর্ণ হ্রাস হল এবং তাদের সন্তান-সন্ততিগণ পাঁচশত বৎসর আয়ুসম্পন্ন হল।
১০. ভিক্ষুগণ, শেষে আবার মনুষ্যগণের ত্রিবিধ কর্ম বিপুলাকার ধারণ করল-অধর্ম, রাগ (অবৈধ যৌনসংসর্গ), বিষম লোভ এবং মিথ্যা ধর্ম (অসংযত লালসা)। এর কারণে তাদের আয়ু ও বর্ণ কমে গেল এবং তার সন্তান-সন্ততিগণ কেউ কেউ দ্বি-অর্ধশত (আড়াই শ) বৎসর, কেউ কেউ দুইশত বৎসর আয়ুসম্পন্ন হল।
১১. এরূপে, ভিক্ষুগণ, ধনহীনকে ধনদানের অভাবে বিপুল দারিদ্র্যের উৎপত্তি হল, উহার ফলে বিপুল চৌর্যের উৎপত্তি হল, উহার কারণে বিশাল অত্যাচারের উৎপত্তি হল, উহার ফলে প্রাণনাশের প্রসারতা বৃদ্ধি পেল, উহার ফলে মিথ্যা বাক্য, উহার ফলে পিশুন বাক্য, উহার ফলে ব্যভিচার, উহার কারণে কর্কশ বাক্য ও তুচ্ছ প্রলাপ; উহার ফলে লোভ ও বিদ্বেষ, উহার ফলে মিথ্যাদৃষ্টি, উহার ফলে অধর্ম-রাগ, বিষম লোভ এবং মিথ্যা ধর্ম, উহার ফলে মাতাপিতার প্রতি ভক্তিহীনতা এবং শ্রমণ-ব্রাহ্মণ ও কুলপ্রধানের প্রতি শ্রদ্ধাহীনতা ব্যাপকরূপে আবির্ভাব হল। এর ফলে মনুষ্যগণের আয়ু ও বর্ণ ড়্গীণ হল এবং দ্বি-অর্ধ শতবর্ষ আয়ুসম্পন্নগণের সন্তান-সন্ততিগণ একশত বর্ষ আয়ুধারী হল।
১২. হে ভিক্ষুগণ, এমন সময় আসবে যখন এই মনুষ্যগণের সন্তান- সন্ততিগণ দশ বৎসর আয়ুসম্পন্ন হবে। তখন ঐ দশ বৎসর আয়ুসম্পন্ন সকল মনুষ্যের কুমারীগণ (যুবতী নারীগণ) পাঁচ বৎসর বয়সে বিবাহযোগ্য হবে। ঐ সকল মনুষ্যগণের মধ্যে ঘৃত, নবনীত, তৈল, মধু, ফাণিত এবং লবণ এই সকল রসের স্বাদ লুপ্ত হবে। কোরদূষক উহাদের শ্রেষ্ঠ ভোজন (আহার) হবে। যেরূপ, ভিক্ষুগণ, এক্ষণে মাংস মিশ্রিত শালি অন্নশ্রেষ্ঠ ভোজন, সেরূপ কোরদূষক ঐ সকল মনুষ্যের শ্রেষ্ঠ ভোজন হবে। ঐ সকল মনুষ্যগণের মধ্যে দশ কুশল কর্মপথ সম্পূর্ণরূপে বিলীন হয়ে যাবে, দশ অকুশল কর্মপথ অতিশয় প্রবল হবে। উহাদের (তাদের) মধ্যে ‘কুশল’ নামক কোন শব্দ থাকবে না। কুশলের কারণ কী প্রকারে থাকবে? উহাদের মধ্যে যারা মাতাপিতার প্রতি ভক্তিহীন এবং শ্রমণ-ব্রাহ্মণগণের ও কুলপ্রধানের প্রতি শ্রদ্ধাহীন হবে, তারাই পূজ্য ও প্রশংসাবান হবে। যেরূপ, ভিক্ষুগণ, বর্তমানে এই মাতাপিতা, শ্রমণ-ব্রাহ্মণ ও কুল প্রধানগণের শ্রদ্ধাভক্তি ও সম্মান করলে পূজ্য ও প্রশংসা লাভ করেন, কিন্তু তার বিপরীত তখন যারাই এদেরকে (মাতাপিতা ও প্রভৃতি) অশ্রদ্ধা, অভক্তি ও অসম্মান করবে তারাই পূজ্য ও প্রশংসা লাভ করবেন।
১৩. ভিক্ষুগণ, ঐ সকল মনুষ্যগণের মধ্যে মাতা, মাতাতুল্য, আচার্য ভার্যা অথবা গুরুপত্নীর জ্ঞান থাকবে না; ছাগ, ভেড়া, কুক্কুট, শুকর, শৃগাল, কুকুরের ন্যায় সব একাকার হয়ে যাবে। ঐ সকল মনুষ্যগণের মধ্যে পরস্পর তীব্র ক্রোধ, বিদ্বেষ মল-প্রদোষ এবং হত্যাচিত্ত পোষণ করবে-মাতারও পুত্রের প্রতি, পুত্রেরও মাতার প্রতি, পিতা পুত্রের প্রতি, পুত্র পিতার প্রতি, ভ্রাতার (ভাই) ভ্রাতার প্রতি, ভ্রাতা ভগিনীর প্রতি, ভগিনী (বোন) ভ্রাতার প্রতি, পরস্পরের প্রতি তীব্র ক্রোধ, হিংসা, মন-দূষিত এবং হনন (হত্যা) চিত্ত পোষণ করবে বা এরূপ মনোভাবের উৎপত্তি হবে। মৃগ (হরিণ) দেখে মৃগয়াসক্তের মনে যেরূপ মনোভাবের উদয় হয়, ঐ সকল মনুষ্যগণও পরস্পরের প্রতি ঐরূপ ভাবাপন্ন হবে।
১৪. ভিক্ষুগণ, ঐ সকল মনুষ্যের মধ্যে সপ্তাহকালব্যাপী শস্ত্রান্তরকল্পের (অন্তর কল্প) আবির্ভাব হবে; তারা পরস্পরকে পশুর ন্যায় জ্ঞান করবে (পশুর মত ভাবিবে); তাদের হস্তে তীড়্গ্ন অস্ত্রের উৎপত্তি হবে; তারা ঐ অস্ত্রের দ্বারা ‘এ পশু’ ‘এ পশু’ বলে পরস্পরের প্রাণ সংহার (হত্যা) করবে।
》 মনুষ্যগণের দীর্ঘায়ু হওয়ার কারণ
১৫. হে ভিক্ষুগণ, তখন ঐ সকল প্রাণী ও মনুষ্যগণের মধ্যে কারো কারো মনে এরূপ চিন্তা বা মনোভাবের উদয় হবে, ‘আমরা কারো অনিষ্ট করব না, অপরেও যেন আমাদের অনিষ্ট না করে; আমরা তৃণ অথবা বনগহনে অথবা বৃক্ষ-গহনে অথবা নদীবেষ্টিত দুর্গম স্থানে অথবা বিষম পাহাড়ে প্রবেশ করে বনফলমূলাহারী হয়ে জীবন যাপন করব।’ তারা ঐরূপ স্থানসমূহে গমন করে ইচ্ছানুরূপ জীবনযাপন করবে। তারা সপ্তাহ অতীত হলে ঐ সকল স্থান হতে বের হয়ে পরস্পরকে আলিঙ্গন করে সভাক্ষেত্রে মিলিত হয়ে একে অপরকে আশ্বাস দিয়ে গাইবে, ‘কী আনন্দ! হে মনুষ্য, তুমি এখনো জীবিত!’ ভিক্ষুগণ, তখন মনুষ্যগণ এরূপ চিন্তা করবে, ‘অকুশল
কর্মে নিযুক্ত হবার কারণে আমাদের বহু (ঘোর) জ্ঞাতিক্ষয় হয়েছে, অতএব আমরা কুশল কর্মে নিযুক্ত হব। কী কুশল কর্মে আমরা স্থিত হব।’ তারা প্রাণীহত্যা হতে বিরত হবে; এই কুশলকর্মে স্থিত হবে। কুশল ধর্মে স্থিত বা নিয়োজিত হবার কারণে তাদের আয়ু ও বর্ণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হবে।
১৬. এরূপে দশবর্ষ আয়ুসম্পন্ন মনুষ্যগণের সন্তান-সন্ততিগণ বিংশতি বর্ষ আয়ুসম্পন্ন হবে। তৎপরে, ভিক্ষুগণ, ঐ সকল মনুষ্য চিন্তা করবে-‘কুশলকর্মে নিয়োজিত হবার কারণে আমাদের আয়ু ও বর্ণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়েছে, অতএব, আমরা অধিক মাত্রায় কুশলকর্ম করব।
আমরা চুরি করা হতে বিরত হব, ব্যভিচার হতে বিরত হব, মিথ্যা বাক্যে হতে বিরত হব, পিশুন বাক্য হতে বিরত হব, কর্কশ বাক্য হতে বিরত হব, তুচ্ছ প্রলাপ হতে বিরত হব, লোভ পরিহার করব, হিংসা পরিহার করব, মিথ্যাদৃষ্টি পরিহার করব, অধর্ম-রাগ, বিষম লোভ এবং মিথ্যা ধর্মরূপ ত্রিবিধ ধর্ম পরিহার করব; অতএব, আমরা মাতৃ ও পিতৃ ভক্ত হব, শ্রমণ-ব্রাহ্মণ এবং কুল প্রধানগণের প্রতি শ্রদ্ধাবান হব, এই কুশলধর্মে স্থিত হব।’
তারা উক্ত কুশলধর্মে রত ও নিযুক্ত হবার ফলে তাদের আয়ু ও বর্ণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হবে। উহার ফলে বিশ বৎসর আয়ুসম্পন্ন মনুষ্যগণের সন্তান-সন্ততিগণ চত্বারিংশৎ (চল্লিশ) বৎসর আয়ু লাভ করবে।
চল্লিশ বৎসর আয়ু লাভী পুত্রগণ অশীতি বৎসর হবে; তাদের পুত্রগণের আয়ু একশত ষষ্টি (১৬০) বৎসর হবে; তাদের পুত্রগণের। আয়ু তিনশত বিশ বৎসর হবে; তাদের পুত্রগণের ছয়শত চল্লিশ বর্ষ হবে; তাদের পুত্রগণের আয়ু দুই সহস্র বর্ষ হবে; তাদের পুত্রগণের আয়ু চারি সহস্র হবে; তাদের পুত্রগণের আয়ু আট সহস্র বৎসর হবে;
তাদের পুত্রগণের আয়ু বিংশটি সহস্র বৎসর হবে; তাদের পুত্রগণের আয়ু চল্লিশ সহস্র বর্ষ হবে এবং তাদের পুত্রগণের আয়ু অশীতি সহস্র (৮০,০০০) বৎসর আয়ুসম্পন্ন হবে।
১৭. ভিক্ষুগণ, অশীতি সহস্র বর্ষ আয়ুসম্পন্ন মনুষ্যগণের কুমারীগণ পাঁচশতবর্ষ বয়সে বিবাহযোগ্য হবে। ঐ সকল মনুষ্যের মধ্যে ত্রিবিধ রোগের উৎপত্তি হবে-ইচ্ছা, ক্ষুধা ও জরা। ঐ সময় জম্বুদ্বীপ সমৃদ্ধ ও স্ফীত হবে। গ্রাম, নগর ও রাজধানীসমূহ এত ঘন সন্নিবিষ্ট হবে যে, কুক্কুটগণ একস্থান হতে অন্যস্থানে উড়ে যেতে পারিবে।
জম্বুদ্বীপ নলবন এবং শরবনের ন্যায় নিরন্তর মনুষ্যাকীর্ণ হয়ে অবীচির ন্যায় দেখা যাবে। ঐ সময় বারাণসী কেতুমতী নামে রাজধানী হবে, উহা সমৃদ্ধ, জনবহুল, মনুষ্যাকীর্ণ হবে। ঐ সময়ে জম্বুদ্বীপে রাজধানী কেতুমতীসহ চুরাশি হাজার নগর থাকবে।
১৮. ভিক্ষুগণ, ঐ সময়ে রাজধানী কেতুমতী নগরে শঙ্খ নামে এক রাজার উৎপত্তি হবে, তিনি চক্রবর্তী, ধার্মিক, ধর্মরাজ, চতুরন্ত বিজেতা, জনপদের নিরাপত্তাপ্রাপ্ত এবং সপ্তরত্ন সমন্বিত হবেন। তার সহস্রাধিক পুত্র হবে-সকলেই সাহসী, বীরোপম, শত্রুসেনা দমনকারী; তিনি সসাগরা পৃথিবী বিনা দণ্ডে ও বিনা অস্ত্রে, মাত্র ধর্মের দ্বারা জয় করে বাস করবেন।
১৯. ভিক্ষুগণ, ঐ সময়ে জগতে মৈত্রেয় নামে অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ, বিদ্যাচরণসম্পন্ন, সুগত লোকজ্ঞ, অনুত্তর দম্য পুরুষ সারথী, দেবমনুষ্যের শাস্তা, বুদ্ধ ভগবানের আবির্ভাব হবে, যেরূপ আমি বর্তমান অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ হয়েছি। তিনি ইহলোক, দেবলোক, মারলোক, ব্রহ্মলোক এবং শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ, দেব ও মনুষ্যেগণকে সাক্ষাদ্দর্শনোদ্ভূত
জ্ঞান দ্বারা স্বয়ং অবগত হয়ে উপদিষ্ট করবেন, যেরূপ আমি বর্তমানে ইহলোক, দেবলোক, মারলোক, ব্রহ্মলোক এবং শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ, দেব ও মনুষ্যেগণের সাক্ষাদ্দর্শনোদ্ভুত জ্ঞান দ্বারা স্বয়ং অবগত হয়ে উপদিষ্ট করছি। তিনি যে ধর্মের প্রারম্ভ (আদি) কল্যাণময়, মধ্য কল্যাণময়, অন্ত কল্যাণময়, যা অর্থ ও শব্দসম্পদপূর্ণ, সর্বাঙ্গীন পূর্ণতাপ্রাপ্ত এবং যা বিশুদ্ধ ব্রহ্মচর্য সেই ধর্মের উপদেশ দান করবেন, যেরূপ আমি এক্ষণে করছি। তিনি অনেক সহস্র ভিক্ষু সমন্বিত সংঘের তত্ত্বাবধায়ক হবেন, যেরূপ আমি বর্তমানে হয়েছি।
তখন মনুষ্য আয়ু হবে অশীতি সহস্র বৎসর। জন্ম গ্রহণ করবেন ব্রাহ্মণকুলে। সপ্তম দিনে বোধিজ্ঞান লাভ করবেন। তার দেহের পরিমাণ অট্ঠাসি হাত। এই মৈত্রেয় (আর্যমিত্র) বুদ্ধ জগতে উৎপন্ন হয়ে বহু প্রাণীর কল্যাণ সাধন করবেন।
৯. ভিক্ষুগণ, দ্বি-অর্ধ সহস্র বর্ষ আয়ুসম্পন্নের মানুষের মধ্যে আবার লোভ বিদ্বেষ দুটি বহু পরিমাণে উৎপত্তি হল। এর ফলে তার আয়ু ও বর্ণ হ্রাস হল। তদ্ধেতু তাদের সন্তান-সন্ততিগণ এক হাজার বৎসর আয়ুসম্পন্ন হল। এরূপে, এক সহস্র আয়ুসম্পন্ন মনুষ্যগণের মধ্যে মিথ্যাদৃষ্টি বহুপরিমাণে উৎপত্তি হল। এর ফলে তাদের আয়ু ও বর্ণ হ্রাস হল এবং তাদের সন্তান-সন্ততিগণ পাঁচশত বৎসর আয়ুসম্পন্ন হল।
১০. ভিক্ষুগণ, শেষে আবার মনুষ্যগণের ত্রিবিধ কর্ম বিপুলাকার ধারণ করল-অধর্ম, রাগ (অবৈধ যৌনসংসর্গ), বিষম লোভ এবং মিথ্যা ধর্ম (অসংযত লালসা)। এর কারণে তাদের আয়ু ও বর্ণ কমে গেল এবং তার সন্তান-সন্ততিগণ কেউ কেউ দ্বি-অর্ধশত (আড়াই শ) বৎসর, কেউ কেউ দুইশত বৎসর আয়ুসম্পন্ন হল।
১১. এরূপে, ভিক্ষুগণ, ধনহীনকে ধনদানের অভাবে বিপুল দারিদ্র্যের উৎপত্তি হল, উহার ফলে বিপুল চৌর্যের উৎপত্তি হল, উহার কারণে বিশাল অত্যাচারের উৎপত্তি হল, উহার ফলে প্রাণনাশের প্রসারতা বৃদ্ধি পেল, উহার ফলে মিথ্যা বাক্য, উহার ফলে পিশুন বাক্য, উহার ফলে ব্যভিচার, উহার কারণে কর্কশ বাক্য ও তুচ্ছ প্রলাপ; উহার ফলে লোভ ও বিদ্বেষ, উহার ফলে মিথ্যাদৃষ্টি, উহার ফলে অধর্ম-রাগ, বিষম লোভ এবং মিথ্যা ধর্ম, উহার ফলে মাতাপিতার প্রতি ভক্তিহীনতা এবং শ্রমণ-ব্রাহ্মণ ও কুলপ্রধানের প্রতি শ্রদ্ধাহীনতা ব্যাপকরূপে আবির্ভাব হল। এর ফলে মনুষ্যগণের আয়ু ও বর্ণ ড়্গীণ হল এবং দ্বি-অর্ধ শতবর্ষ আয়ুসম্পন্নগণের সন্তান-সন্ততিগণ একশত বর্ষ আয়ুধারী হল।
১২. হে ভিক্ষুগণ, এমন সময় আসবে যখন এই মনুষ্যগণের সন্তান- সন্ততিগণ দশ বৎসর আয়ুসম্পন্ন হবে। তখন ঐ দশ বৎসর আয়ুসম্পন্ন সকল মনুষ্যের কুমারীগণ (যুবতী নারীগণ) পাঁচ বৎসর বয়সে বিবাহযোগ্য হবে। ঐ সকল মনুষ্যগণের মধ্যে ঘৃত, নবনীত, তৈল, মধু, ফাণিত এবং লবণ এই সকল রসের স্বাদ লুপ্ত হবে। কোরদূষক উহাদের শ্রেষ্ঠ ভোজন (আহার) হবে। যেরূপ, ভিক্ষুগণ, এক্ষণে মাংস মিশ্রিত শালি অন্নশ্রেষ্ঠ ভোজন, সেরূপ কোরদূষক ঐ সকল মনুষ্যের শ্রেষ্ঠ ভোজন হবে। ঐ সকল মনুষ্যগণের মধ্যে দশ কুশল কর্মপথ সম্পূর্ণরূপে বিলীন হয়ে যাবে, দশ অকুশল কর্মপথ অতিশয় প্রবল হবে। উহাদের (তাদের) মধ্যে ‘কুশল’ নামক কোন শব্দ থাকবে না। কুশলের কারণ কী প্রকারে থাকবে? উহাদের মধ্যে যারা মাতাপিতার প্রতি ভক্তিহীন এবং শ্রমণ-ব্রাহ্মণগণের ও কুলপ্রধানের প্রতি শ্রদ্ধাহীন হবে, তারাই পূজ্য ও প্রশংসাবান হবে। যেরূপ, ভিক্ষুগণ, বর্তমানে এই মাতাপিতা, শ্রমণ-ব্রাহ্মণ ও কুল প্রধানগণের শ্রদ্ধাভক্তি ও সম্মান করলে পূজ্য ও প্রশংসা লাভ করেন, কিন্তু তার বিপরীত তখন যারাই এদেরকে (মাতাপিতা ও প্রভৃতি) অশ্রদ্ধা, অভক্তি ও অসম্মান করবে তারাই পূজ্য ও প্রশংসা লাভ করবেন।
১৩. ভিক্ষুগণ, ঐ সকল মনুষ্যগণের মধ্যে মাতা, মাতাতুল্য, আচার্য ভার্যা অথবা গুরুপত্নীর জ্ঞান থাকবে না; ছাগ, ভেড়া, কুক্কুট, শুকর, শৃগাল, কুকুরের ন্যায় সব একাকার হয়ে যাবে। ঐ সকল মনুষ্যগণের মধ্যে পরস্পর তীব্র ক্রোধ, বিদ্বেষ মল-প্রদোষ এবং হত্যাচিত্ত পোষণ করবে-মাতারও পুত্রের প্রতি, পুত্রেরও মাতার প্রতি, পিতা পুত্রের প্রতি, পুত্র পিতার প্রতি, ভ্রাতার (ভাই) ভ্রাতার প্রতি, ভ্রাতা ভগিনীর প্রতি, ভগিনী (বোন) ভ্রাতার প্রতি, পরস্পরের প্রতি তীব্র ক্রোধ, হিংসা, মন-দূষিত এবং হনন (হত্যা) চিত্ত পোষণ করবে বা এরূপ মনোভাবের উৎপত্তি হবে। মৃগ (হরিণ) দেখে মৃগয়াসক্তের মনে যেরূপ মনোভাবের উদয় হয়, ঐ সকল মনুষ্যগণও পরস্পরের প্রতি ঐরূপ ভাবাপন্ন হবে।
১৪. ভিক্ষুগণ, ঐ সকল মনুষ্যের মধ্যে সপ্তাহকালব্যাপী শস্ত্রান্তরকল্পের (অন্তর কল্প) আবির্ভাব হবে; তারা পরস্পরকে পশুর ন্যায় জ্ঞান করবে (পশুর মত ভাবিবে); তাদের হস্তে তীড়্গ্ন অস্ত্রের উৎপত্তি হবে; তারা ঐ অস্ত্রের দ্বারা ‘এ পশু’ ‘এ পশু’ বলে পরস্পরের প্রাণ সংহার (হত্যা) করবে।
》 মনুষ্যগণের দীর্ঘায়ু হওয়ার কারণ
১৫. হে ভিক্ষুগণ, তখন ঐ সকল প্রাণী ও মনুষ্যগণের মধ্যে কারো কারো মনে এরূপ চিন্তা বা মনোভাবের উদয় হবে, ‘আমরা কারো অনিষ্ট করব না, অপরেও যেন আমাদের অনিষ্ট না করে; আমরা তৃণ অথবা বনগহনে অথবা বৃক্ষ-গহনে অথবা নদীবেষ্টিত দুর্গম স্থানে অথবা বিষম পাহাড়ে প্রবেশ করে বনফলমূলাহারী হয়ে জীবন যাপন করব।’ তারা ঐরূপ স্থানসমূহে গমন করে ইচ্ছানুরূপ জীবনযাপন করবে। তারা সপ্তাহ অতীত হলে ঐ সকল স্থান হতে বের হয়ে পরস্পরকে আলিঙ্গন করে সভাক্ষেত্রে মিলিত হয়ে একে অপরকে আশ্বাস দিয়ে গাইবে, ‘কী আনন্দ! হে মনুষ্য, তুমি এখনো জীবিত!’ ভিক্ষুগণ, তখন মনুষ্যগণ এরূপ চিন্তা করবে, ‘অকুশল
কর্মে নিযুক্ত হবার কারণে আমাদের বহু (ঘোর) জ্ঞাতিক্ষয় হয়েছে, অতএব আমরা কুশল কর্মে নিযুক্ত হব। কী কুশল কর্মে আমরা স্থিত হব।’ তারা প্রাণীহত্যা হতে বিরত হবে; এই কুশলকর্মে স্থিত হবে। কুশল ধর্মে স্থিত বা নিয়োজিত হবার কারণে তাদের আয়ু ও বর্ণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হবে।
১৬. এরূপে দশবর্ষ আয়ুসম্পন্ন মনুষ্যগণের সন্তান-সন্ততিগণ বিংশতি বর্ষ আয়ুসম্পন্ন হবে। তৎপরে, ভিক্ষুগণ, ঐ সকল মনুষ্য চিন্তা করবে-‘কুশলকর্মে নিয়োজিত হবার কারণে আমাদের আয়ু ও বর্ণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়েছে, অতএব, আমরা অধিক মাত্রায় কুশলকর্ম করব।
আমরা চুরি করা হতে বিরত হব, ব্যভিচার হতে বিরত হব, মিথ্যা বাক্যে হতে বিরত হব, পিশুন বাক্য হতে বিরত হব, কর্কশ বাক্য হতে বিরত হব, তুচ্ছ প্রলাপ হতে বিরত হব, লোভ পরিহার করব, হিংসা পরিহার করব, মিথ্যাদৃষ্টি পরিহার করব, অধর্ম-রাগ, বিষম লোভ এবং মিথ্যা ধর্মরূপ ত্রিবিধ ধর্ম পরিহার করব; অতএব, আমরা মাতৃ ও পিতৃ ভক্ত হব, শ্রমণ-ব্রাহ্মণ এবং কুল প্রধানগণের প্রতি শ্রদ্ধাবান হব, এই কুশলধর্মে স্থিত হব।’
তারা উক্ত কুশলধর্মে রত ও নিযুক্ত হবার ফলে তাদের আয়ু ও বর্ণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হবে। উহার ফলে বিশ বৎসর আয়ুসম্পন্ন মনুষ্যগণের সন্তান-সন্ততিগণ চত্বারিংশৎ (চল্লিশ) বৎসর আয়ু লাভ করবে।
চল্লিশ বৎসর আয়ু লাভী পুত্রগণ অশীতি বৎসর হবে; তাদের পুত্রগণের আয়ু একশত ষষ্টি (১৬০) বৎসর হবে; তাদের পুত্রগণের। আয়ু তিনশত বিশ বৎসর হবে; তাদের পুত্রগণের ছয়শত চল্লিশ বর্ষ হবে; তাদের পুত্রগণের আয়ু দুই সহস্র বর্ষ হবে; তাদের পুত্রগণের আয়ু চারি সহস্র হবে; তাদের পুত্রগণের আয়ু আট সহস্র বৎসর হবে;
তাদের পুত্রগণের আয়ু বিংশটি সহস্র বৎসর হবে; তাদের পুত্রগণের আয়ু চল্লিশ সহস্র বর্ষ হবে এবং তাদের পুত্রগণের আয়ু অশীতি সহস্র (৮০,০০০) বৎসর আয়ুসম্পন্ন হবে।
১৭. ভিক্ষুগণ, অশীতি সহস্র বর্ষ আয়ুসম্পন্ন মনুষ্যগণের কুমারীগণ পাঁচশতবর্ষ বয়সে বিবাহযোগ্য হবে। ঐ সকল মনুষ্যের মধ্যে ত্রিবিধ রোগের উৎপত্তি হবে-ইচ্ছা, ক্ষুধা ও জরা। ঐ সময় জম্বুদ্বীপ সমৃদ্ধ ও স্ফীত হবে। গ্রাম, নগর ও রাজধানীসমূহ এত ঘন সন্নিবিষ্ট হবে যে, কুক্কুটগণ একস্থান হতে অন্যস্থানে উড়ে যেতে পারিবে।
জম্বুদ্বীপ নলবন এবং শরবনের ন্যায় নিরন্তর মনুষ্যাকীর্ণ হয়ে অবীচির ন্যায় দেখা যাবে। ঐ সময় বারাণসী কেতুমতী নামে রাজধানী হবে, উহা সমৃদ্ধ, জনবহুল, মনুষ্যাকীর্ণ হবে। ঐ সময়ে জম্বুদ্বীপে রাজধানী কেতুমতীসহ চুরাশি হাজার নগর থাকবে।
১৮. ভিক্ষুগণ, ঐ সময়ে রাজধানী কেতুমতী নগরে শঙ্খ নামে এক রাজার উৎপত্তি হবে, তিনি চক্রবর্তী, ধার্মিক, ধর্মরাজ, চতুরন্ত বিজেতা, জনপদের নিরাপত্তাপ্রাপ্ত এবং সপ্তরত্ন সমন্বিত হবেন। তার সহস্রাধিক পুত্র হবে-সকলেই সাহসী, বীরোপম, শত্রুসেনা দমনকারী; তিনি সসাগরা পৃথিবী বিনা দণ্ডে ও বিনা অস্ত্রে, মাত্র ধর্মের দ্বারা জয় করে বাস করবেন।
১৯. ভিক্ষুগণ, ঐ সময়ে জগতে মৈত্রেয় নামে অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ, বিদ্যাচরণসম্পন্ন, সুগত লোকজ্ঞ, অনুত্তর দম্য পুরুষ সারথী, দেবমনুষ্যের শাস্তা, বুদ্ধ ভগবানের আবির্ভাব হবে, যেরূপ আমি বর্তমান অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ হয়েছি। তিনি ইহলোক, দেবলোক, মারলোক, ব্রহ্মলোক এবং শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ, দেব ও মনুষ্যেগণকে সাক্ষাদ্দর্শনোদ্ভূত
জ্ঞান দ্বারা স্বয়ং অবগত হয়ে উপদিষ্ট করবেন, যেরূপ আমি বর্তমানে ইহলোক, দেবলোক, মারলোক, ব্রহ্মলোক এবং শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ, দেব ও মনুষ্যেগণের সাক্ষাদ্দর্শনোদ্ভুত জ্ঞান দ্বারা স্বয়ং অবগত হয়ে উপদিষ্ট করছি। তিনি যে ধর্মের প্রারম্ভ (আদি) কল্যাণময়, মধ্য কল্যাণময়, অন্ত কল্যাণময়, যা অর্থ ও শব্দসম্পদপূর্ণ, সর্বাঙ্গীন পূর্ণতাপ্রাপ্ত এবং যা বিশুদ্ধ ব্রহ্মচর্য সেই ধর্মের উপদেশ দান করবেন, যেরূপ আমি এক্ষণে করছি। তিনি অনেক সহস্র ভিক্ষু সমন্বিত সংঘের তত্ত্বাবধায়ক হবেন, যেরূপ আমি বর্তমানে হয়েছি।
তখন মনুষ্য আয়ু হবে অশীতি সহস্র বৎসর। জন্ম গ্রহণ করবেন ব্রাহ্মণকুলে। সপ্তম দিনে বোধিজ্ঞান লাভ করবেন। তার দেহের পরিমাণ অট্ঠাসি হাত। এই মৈত্রেয় (আর্যমিত্র) বুদ্ধ জগতে উৎপন্ন হয়ে বহু প্রাণীর কল্যাণ সাধন করবেন।
২০. অতঃপর ভিক্ষুগণ, রাজা পূর্বে রাজা মহাপনাদ কর্তৃক নির্মিত প্রাসাদকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করে উহাতে বাস করবেন। পরে তিনি উহা শ্রমণ-ব্রাহ্মণ, দুর্গত পথচারী, দরিদ্র যাচকগণকে দান করে অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ ভগবান মৈত্রেয়র নিকট কেশশ্মশ্রু মুণ্ডন করে কাষায় বস্ত্র পরিধান করে গৃহ হতে নিষ্ক্রান্ত হয়ে গৃহহীন প্রব্রজ্যা গ্রহণ করবেন। এরূপে প্রব্রজিত হয়ে তিনি নির্জনবাসী, অপ্রমত্ত, উৎসাহপূর্ণ, দৃঢ় সংকল্প হয়ে অনতিবিলম্বে
যথার্থ পথাবলম্বী কুলপুত্রগণ যে সম্পদ লাভের জন্য গৃহত্যাগ করেন, সেই অনুত্তর ব্রহ্মচর্যের স্বয়ং জ্ঞাত হয়ে পূর্ণতা সাধন করবেন।


