Followers

Friday, February 24, 2017

মনুষ্যগণের অল্পায়ূ কারণ- পর্ব ২

 অল্পায়ূ সূত্র: পর্ব- ২
৮. ভিক্ষুগণ, শেষোক্ত মনুষ্যগণের মধ্যে ব্যাপকরূপে দুটি অসৎ ধর্মের উৎপত্তি হল-কর্কশ বাক্য এবং তুচ্ছ প্রলাপ। এর ফলে মনুষ্যের আয়ু লঘু হয়ে পাঁচ হাজার বৎসর থেকে তার সন্তান-সন্ততিগণের কেউ কেউ দ্বি-অর্ধ সহস্র কেউ কেউ দুই সহস্র বৎসর আয়ুসম্পন্ন হল।
৯. ভিক্ষুগণ, দ্বি-অর্ধ সহস্র বর্ষ আয়ুসম্পন্নের মানুষের মধ্যে আবার লোভ বিদ্বেষ দুটি বহু পরিমাণে উৎপত্তি হল। এর ফলে তার আয়ু ও বর্ণ হ্রাস হল। তদ্ধেতু তাদের সন্তান-সন্ততিগণ এক হাজার বৎসর আয়ুসম্পন্ন হল। এরূপে, এক সহস্র আয়ুসম্পন্ন মনুষ্যগণের মধ্যে মিথ্যাদৃষ্টি বহুপরিমাণে উৎপত্তি হল। এর ফলে তাদের আয়ু ও বর্ণ হ্রাস হল এবং তাদের সন্তান-সন্ততিগণ পাঁচশত বৎসর আয়ুসম্পন্ন হল।
১০. ভিক্ষুগণ, শেষে আবার মনুষ্যগণের ত্রিবিধ কর্ম বিপুলাকার ধারণ করল-অধর্ম, রাগ (অবৈধ যৌনসংসর্গ), বিষম লোভ এবং মিথ্যা ধর্ম (অসংযত লালসা)। এর কারণে তাদের আয়ু ও বর্ণ কমে গেল এবং তার সন্তান-সন্ততিগণ কেউ কেউ দ্বি-অর্ধশত (আড়াই শ) বৎসর, কেউ কেউ দুইশত বৎসর আয়ুসম্পন্ন হল।
১১. এরূপে, ভিক্ষুগণ, ধনহীনকে ধনদানের অভাবে বিপুল দারিদ্র্যের উৎপত্তি হল, উহার ফলে বিপুল চৌর্যের উৎপত্তি হল, উহার কারণে বিশাল অত্যাচারের উৎপত্তি হল, উহার ফলে প্রাণনাশের প্রসারতা বৃদ্ধি পেল, উহার ফলে মিথ্যা বাক্য, উহার ফলে পিশুন বাক্য, উহার ফলে ব্যভিচার, উহার কারণে কর্কশ বাক্য ও তুচ্ছ প্রলাপ; উহার ফলে লোভ ও বিদ্বেষ, উহার ফলে মিথ্যাদৃষ্টি, উহার ফলে অধর্ম-রাগ, বিষম লোভ এবং মিথ্যা ধর্ম, উহার ফলে মাতাপিতার প্রতি ভক্তিহীনতা এবং শ্রমণ-ব্রাহ্মণ ও কুলপ্রধানের প্রতি শ্রদ্ধাহীনতা ব্যাপকরূপে আবির্ভাব হল। এর ফলে মনুষ্যগণের আয়ু ও বর্ণ ড়্গীণ হল এবং দ্বি-অর্ধ শতবর্ষ আয়ুসম্পন্নগণের সন্তান-সন্ততিগণ একশত বর্ষ আয়ুধারী হল।
১২. হে ভিক্ষুগণ, এমন সময় আসবে যখন এই মনুষ্যগণের সন্তান- সন্ততিগণ দশ বৎসর আয়ুসম্পন্ন হবে। তখন ঐ দশ বৎসর আয়ুসম্পন্ন সকল মনুষ্যের কুমারীগণ (যুবতী নারীগণ) পাঁচ বৎসর বয়সে বিবাহযোগ্য হবে। ঐ সকল মনুষ্যগণের মধ্যে ঘৃত, নবনীত, তৈল, মধু, ফাণিত এবং লবণ এই সকল রসের স্বাদ লুপ্ত হবে। কোরদূষক উহাদের শ্রেষ্ঠ ভোজন (আহার) হবে। যেরূপ, ভিক্ষুগণ, এক্ষণে মাংস মিশ্রিত শালি অন্নশ্রেষ্ঠ ভোজন, সেরূপ কোরদূষক ঐ সকল মনুষ্যের শ্রেষ্ঠ ভোজন হবে। ঐ সকল মনুষ্যগণের মধ্যে দশ কুশল কর্মপথ সম্পূর্ণরূপে বিলীন হয়ে যাবে, দশ অকুশল কর্মপথ অতিশয় প্রবল হবে। উহাদের (তাদের) মধ্যে ‘কুশল’ নামক কোন শব্দ থাকবে না। কুশলের কারণ কী প্রকারে থাকবে? উহাদের মধ্যে যারা মাতাপিতার প্রতি ভক্তিহীন এবং শ্রমণ-ব্রাহ্মণগণের ও কুলপ্রধানের প্রতি শ্রদ্ধাহীন হবে, তারাই পূজ্য ও প্রশংসাবান হবে। যেরূপ, ভিক্ষুগণ, বর্তমানে এই মাতাপিতা, শ্রমণ-ব্রাহ্মণ ও কুল প্রধানগণের শ্রদ্ধাভক্তি ও সম্মান করলে পূজ্য ও প্রশংসা লাভ করেন, কিন্তু তার বিপরীত তখন যারাই এদেরকে (মাতাপিতা ও প্রভৃতি) অশ্রদ্ধা, অভক্তি ও অসম্মান করবে তারাই পূজ্য ও প্রশংসা লাভ করবেন।
১৩. ভিক্ষুগণ, ঐ সকল মনুষ্যগণের মধ্যে মাতা, মাতাতুল্য, আচার্য ভার্যা অথবা গুরুপত্নীর জ্ঞান থাকবে না; ছাগ, ভেড়া, কুক্কুট, শুকর, শৃগাল, কুকুরের ন্যায় সব একাকার হয়ে যাবে। ঐ সকল মনুষ্যগণের মধ্যে পরস্পর তীব্র ক্রোধ, বিদ্বেষ মল-প্রদোষ এবং হত্যাচিত্ত পোষণ করবে-মাতারও পুত্রের প্রতি, পুত্রেরও মাতার প্রতি, পিতা পুত্রের প্রতি, পুত্র পিতার প্রতি, ভ্রাতার (ভাই) ভ্রাতার প্রতি, ভ্রাতা ভগিনীর প্রতি, ভগিনী (বোন) ভ্রাতার প্রতি, পরস্পরের প্রতি তীব্র ক্রোধ, হিংসা, মন-দূষিত এবং হনন (হত্যা) চিত্ত পোষণ করবে বা এরূপ মনোভাবের উৎপত্তি হবে। মৃগ (হরিণ) দেখে মৃগয়াসক্তের মনে যেরূপ মনোভাবের উদয় হয়, ঐ সকল মনুষ্যগণও পরস্পরের প্রতি ঐরূপ ভাবাপন্ন হবে।
১৪. ভিক্ষুগণ, ঐ সকল মনুষ্যের মধ্যে সপ্তাহকালব্যাপী শস্ত্রান্তরকল্পের (অন্তর কল্প) আবির্ভাব হবে; তারা পরস্পরকে পশুর ন্যায় জ্ঞান করবে (পশুর মত ভাবিবে); তাদের হস্তে তীড়্গ্ন অস্ত্রের উৎপত্তি হবে; তারা ঐ অস্ত্রের দ্বারা ‘এ পশু’ ‘এ পশু’ বলে পরস্পরের প্রাণ সংহার (হত্যা) করবে।
》 মনুষ্যগণের দীর্ঘায়ু হওয়ার কারণ
১৫. হে ভিক্ষুগণ, তখন ঐ সকল প্রাণী ও মনুষ্যগণের মধ্যে কারো কারো মনে এরূপ চিন্তা বা মনোভাবের উদয় হবে, ‘আমরা কারো অনিষ্ট করব না, অপরেও যেন আমাদের অনিষ্ট না করে; আমরা তৃণ অথবা বনগহনে অথবা বৃক্ষ-গহনে অথবা নদীবেষ্টিত দুর্গম স্থানে অথবা বিষম পাহাড়ে প্রবেশ করে বনফলমূলাহারী হয়ে জীবন যাপন করব।’ তারা ঐরূপ স্থানসমূহে গমন করে ইচ্ছানুরূপ জীবনযাপন করবে। তারা সপ্তাহ অতীত হলে ঐ সকল স্থান হতে বের হয়ে পরস্পরকে আলিঙ্গন করে সভাক্ষেত্রে মিলিত হয়ে একে অপরকে আশ্বাস দিয়ে গাইবে, ‘কী আনন্দ! হে মনুষ্য, তুমি এখনো জীবিত!’ ভিক্ষুগণ, তখন মনুষ্যগণ এরূপ চিন্তা করবে, ‘অকুশল
কর্মে নিযুক্ত হবার কারণে আমাদের বহু (ঘোর) জ্ঞাতিক্ষয় হয়েছে, অতএব আমরা কুশল কর্মে নিযুক্ত হব। কী কুশল কর্মে আমরা স্থিত হব।’ তারা প্রাণীহত্যা হতে বিরত হবে; এই কুশলকর্মে স্থিত হবে। কুশল ধর্মে স্থিত বা নিয়োজিত হবার কারণে তাদের আয়ু ও বর্ণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হবে।
১৬. এরূপে দশবর্ষ আয়ুসম্পন্ন মনুষ্যগণের সন্তান-সন্ততিগণ বিংশতি বর্ষ আয়ুসম্পন্ন হবে। তৎপরে, ভিক্ষুগণ, ঐ সকল মনুষ্য চিন্তা  করবে-‘কুশলকর্মে নিয়োজিত হবার কারণে আমাদের আয়ু ও বর্ণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়েছে, অতএব, আমরা অধিক মাত্রায় কুশলকর্ম করব।
আমরা চুরি করা হতে বিরত হব, ব্যভিচার হতে বিরত হব, মিথ্যা বাক্যে হতে বিরত হব, পিশুন বাক্য হতে বিরত হব, কর্কশ বাক্য হতে বিরত হব, তুচ্ছ প্রলাপ হতে বিরত হব, লোভ পরিহার করব, হিংসা পরিহার করব, মিথ্যাদৃষ্টি পরিহার করব, অধর্ম-রাগ, বিষম লোভ এবং মিথ্যা ধর্মরূপ ত্রিবিধ ধর্ম পরিহার করব; অতএব, আমরা মাতৃ ও পিতৃ ভক্ত হব, শ্রমণ-ব্রাহ্মণ এবং কুল প্রধানগণের প্রতি শ্রদ্ধাবান হব, এই কুশলধর্মে স্থিত হব।’
তারা উক্ত কুশলধর্মে রত ও নিযুক্ত হবার ফলে তাদের আয়ু ও বর্ণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হবে। উহার ফলে বিশ বৎসর আয়ুসম্পন্ন মনুষ্যগণের সন্তান-সন্ততিগণ চত্বারিংশৎ (চল্লিশ) বৎসর আয়ু লাভ করবে।
চল্লিশ বৎসর আয়ু লাভী পুত্রগণ অশীতি বৎসর হবে; তাদের পুত্রগণের আয়ু একশত ষষ্টি (১৬০) বৎসর হবে; তাদের পুত্রগণের। আয়ু তিনশত বিশ বৎসর হবে; তাদের পুত্রগণের ছয়শত চল্লিশ বর্ষ হবে; তাদের পুত্রগণের আয়ু দুই সহস্র বর্ষ হবে; তাদের পুত্রগণের আয়ু চারি সহস্র হবে; তাদের পুত্রগণের আয়ু আট সহস্র বৎসর হবে;
তাদের পুত্রগণের আয়ু বিংশটি সহস্র বৎসর হবে; তাদের পুত্রগণের আয়ু চল্লিশ সহস্র বর্ষ হবে এবং তাদের পুত্রগণের আয়ু অশীতি সহস্র (৮০,০০০) বৎসর আয়ুসম্পন্ন হবে।
১৭. ভিক্ষুগণ, অশীতি সহস্র বর্ষ আয়ুসম্পন্ন মনুষ্যগণের কুমারীগণ পাঁচশতবর্ষ বয়সে বিবাহযোগ্য হবে। ঐ সকল মনুষ্যের মধ্যে ত্রিবিধ রোগের উৎপত্তি হবে-ইচ্ছা, ক্ষুধা ও জরা। ঐ সময় জম্বুদ্বীপ সমৃদ্ধ ও স্ফীত হবে। গ্রাম, নগর ও রাজধানীসমূহ এত ঘন সন্নিবিষ্ট হবে যে, কুক্কুটগণ একস্থান হতে অন্যস্থানে উড়ে যেতে পারিবে।
জম্বুদ্বীপ নলবন এবং শরবনের ন্যায় নিরন্তর মনুষ্যাকীর্ণ হয়ে অবীচির ন্যায় দেখা যাবে। ঐ সময় বারাণসী কেতুমতী নামে রাজধানী হবে, উহা সমৃদ্ধ, জনবহুল, মনুষ্যাকীর্ণ হবে। ঐ সময়ে জম্বুদ্বীপে রাজধানী কেতুমতীসহ চুরাশি হাজার নগর থাকবে।
১৮. ভিক্ষুগণ, ঐ সময়ে রাজধানী কেতুমতী নগরে শঙ্খ নামে এক রাজার উৎপত্তি হবে, তিনি চক্রবর্তী, ধার্মিক, ধর্মরাজ, চতুরন্ত বিজেতা, জনপদের নিরাপত্তাপ্রাপ্ত এবং সপ্তরত্ন সমন্বিত হবেন। তার সহস্রাধিক পুত্র হবে-সকলেই সাহসী, বীরোপম, শত্রুসেনা দমনকারী; তিনি সসাগরা পৃথিবী বিনা দণ্ডে ও বিনা অস্ত্রে, মাত্র ধর্মের দ্বারা জয় করে বাস করবেন।
১৯. ভিক্ষুগণ, ঐ সময়ে জগতে মৈত্রেয় নামে অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ, বিদ্যাচরণসম্পন্ন, সুগত লোকজ্ঞ, অনুত্তর দম্য পুরুষ সারথী, দেবমনুষ্যের শাস্তা, বুদ্ধ ভগবানের আবির্ভাব হবে, যেরূপ আমি বর্তমান অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ হয়েছি। তিনি ইহলোক, দেবলোক, মারলোক, ব্রহ্মলোক এবং শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ, দেব ও মনুষ্যেগণকে সাক্ষাদ্দর্শনোদ্ভূত
জ্ঞান দ্বারা স্বয়ং অবগত হয়ে উপদিষ্ট করবেন, যেরূপ আমি বর্তমানে ইহলোক, দেবলোক, মারলোক, ব্রহ্মলোক এবং শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ, দেব ও মনুষ্যেগণের সাক্ষাদ্দর্শনোদ্ভুত জ্ঞান দ্বারা স্বয়ং অবগত হয়ে উপদিষ্ট করছি। তিনি যে ধর্মের প্রারম্ভ (আদি) কল্যাণময়, মধ্য কল্যাণময়, অন্ত কল্যাণময়, যা অর্থ ও শব্দসম্পদপূর্ণ, সর্বাঙ্গীন পূর্ণতাপ্রাপ্ত এবং যা বিশুদ্ধ ব্রহ্মচর্য সেই ধর্মের উপদেশ দান করবেন, যেরূপ আমি এক্ষণে করছি। তিনি অনেক সহস্র ভিক্ষু সমন্বিত সংঘের তত্ত্বাবধায়ক হবেন, যেরূপ আমি বর্তমানে হয়েছি।
তখন মনুষ্য আয়ু হবে অশীতি সহস্র বৎসর। জন্ম গ্রহণ করবেন ব্রাহ্মণকুলে। সপ্তম দিনে বোধিজ্ঞান লাভ করবেন। তার দেহের পরিমাণ অট্ঠাসি হাত। এই মৈত্রেয় (আর্যমিত্র) বুদ্ধ জগতে উৎপন্ন হয়ে বহু প্রাণীর কল্যাণ সাধন করবেন।

২০. অতঃপর ভিক্ষুগণ, রাজা পূর্বে রাজা মহাপনাদ কর্তৃক নির্মিত প্রাসাদকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করে উহাতে বাস করবেন। পরে তিনি উহা শ্রমণ-ব্রাহ্মণ, দুর্গত পথচারী, দরিদ্র যাচকগণকে দান করে অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ ভগবান মৈত্রেয়র নিকট কেশশ্মশ্রু মুণ্ডন করে কাষায় বস্ত্র পরিধান করে গৃহ হতে নিষ্ক্রান্ত হয়ে গৃহহীন প্রব্রজ্যা গ্রহণ করবেন। এরূপে প্রব্রজিত হয়ে তিনি নির্জনবাসী, অপ্রমত্ত, উৎসাহপূর্ণ, দৃঢ় সংকল্প হয়ে অনতিবিলম্বে
যথার্থ পথাবলম্বী কুলপুত্রগণ যে সম্পদ লাভের জন্য গৃহত্যাগ করেন, সেই অনুত্তর ব্রহ্মচর্যের স্বয়ং জ্ঞাত হয়ে পূর্ণতা সাধন করবেন।

পৃথিবীর মনুষ্যগণের অল্পায়ূর কারণ

পৃথিবীতে মনুষ্যগণের অল্পায়ু ও দীর্ঘায়ু হওয়ার কারণ
》 মনুষ্যগণের অল্পায়ু হওয়ার কারণ:
১. দীর্ঘ নিকায় ‘চক্কবত্তি-সীহনাদ’ সূত্রে বর্ণিত আছে, একসময় রাজা গরীরদেরকে ধনদান না করার ফলে বিপুল দারিদ্র্যের আবির্ভাব হল। তখন পুরুষ পরের দ্রব্য চুরি করতে আরম্ভ করল। একদিন সেই পুরুষকে রজ্জু দ্বারা বন্ধন করে রাজার নিকট উপস্থিত করাল এবং বলল, ‘দেব, এই পুরুষ পরের দ্রব্য যা অদত্ত তা হস্তগত করেছে। তখন রাজা তাকে জিজ্ঞেস করল হয় সত্য কিনা? সে পুরুষ স্বীকার করলে, রাজা তাকে ধনদান করল এবং বলল এই ধন দ্বারা আপনার জীবিকা নির্বাহ কর ও মাতাপিতা, স্ত্রী-পুত্রের ভরণ পোষণ কর এবং   শীলবান ব্যক্তিদের নিকট দান ধর্ম অনুশীলন করে স্বর্গ সম্পত্তি লাভ কর।
২. হে ভিক্ষুগণ, প্রজাগণ শুনল, ‘যারা পর দ্রব্য যা অদত্ত গ্রহণ করে, যা চৌর্য কথিত হয়, তাই করে, রাজা তাদেরকে ধনদান করছেন। তা শুনে তারা চিন্তা করল, ‘আমরাও অদত্ত দ্রব্য গ্রহণপূর্বক যা চুরি কথিত হয় তাই করব।’ অনন্তর ভিক্ষুগণ, জনৈক পুরুষ তাই করে ধৃত হয়ে রাজসমীপে আনীত হলে রাজা কর্তৃক জিজ্ঞাসিত হয়ে অপরাধ স্বীকার করল এবং বলল জীবিকা নির্বাহের জন্য অভাবে সে ঐ কর্ম করেছে।
৩. হে ভিক্ষুগণ, তখন রাজা চিন্তা করলেন, ‘যারা পরের দ্রব্য অপহরণ করবে, আমি যদি তাদেরকে ধনদান করি, তা হলে এই চুরি বৃদ্ধি পাবে। অতএব, এই পুরুষের আমি উপযুক্ত দন্ডের বিধান করব, উহার মূলোচ্ছেদ করব, উহার শিরচ্ছেদ করব।’ অতঃপর ভিক্ষুগণ, রাজা কর্মচারীগণকে আদেশ দিলেন, এই পুরুষের বাহুদ্বয় পশ্চাদ্দিকে শক্ত রজ্জু দ্বারা দৃঢ়রূপে বন্ধন করে নগরের দক্ষিণদিকে উহার প্রতি উপযুক্ত দন্ডের প্রয়োগ কর, উহার মূলোচ্ছেদ কর, উহার শিরশ্ছেদ কর।’
৪. হে ভিক্ষুগণ, প্রজাগণ শ্রবণ করল যে যারা পরদ্রব্য চুরি করে রাজা তাদের প্রতি উপযুক্ত দন্ডের বিধান করে তাদের শিরশ্ছেদ করছেন। তারা চিন্তা করল, ‘আমরাও তীড়্গ্ন অস্ত্রাদি (শস্ত্র) তৈরি করিয়ে যাদের দ্রব্য অপহরণ করব তাদের প্রতি তীব্র দন্ডের প্রয়োগ করব, তাদের মূলোচ্ছেদ ও শিরশ্ছেদ করব।’
তখন তারা সেই তীড়্গ্ন শস্ত্রাদি নির্মাণ করে গ্রাম ও নগর লুণ্ঠনে নিযুক্ত হল, দস্যুবৃত্তিতে রত হল। তারা যাদের দ্রব্য অপহরণ করল, উক্তানুযায়ী তাদের শিরশ্ছেদ সাধন করল।
৫. এরূপে, ভিক্ষুগণ, দরিদ্রকে ধনদানের অভাবে বড় দারিদ্রোর উৎপত্তি হল, দারিদ্র্যের বৃদ্ধি হলে চৌর্য বৃদ্ধি হল, চৌর্য বৃদ্ধি হলে প্রাণীহত্যা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হল, প্রাণীহত্যার বৃদ্ধিতে মিথ্যা বাক্যের বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হলে মনুষ্যগণের আয়ু ও বর্ণ ড়্গীণ হল, আয়ু ও বর্ণ হ্রাসপ্রাপ্ত হলে অশীতি সহস্র বর্ষ আয়ুসম্পন্ন মনুষ্যগণের সন্তান-সন্ততিগণ চল্লিশ (চত্বারিংশৎ) সহস্র বর্ষ আয়ুসম্পন্ন হল। চত্বারিংশৎ (চল্লিশ) সহস্র বর্ষ আয়ুসম্পন্ন মনুষ্যগণের মধ্যে একজন পুরুষ চুরি অপরাধ করল। ধৃত হয়ে সে রাজ সম্মুখে উপস্থিত হলে রাজা তাকে চুরি অপরাধের সত্যতা সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলে তখন ঐ ব্যক্তি (অপরাধী) অপরাধ স্বীকার করল না, স্বেচ্ছায় মিথ্যা বলল।
৬. এরূপে, ভিক্ষুগণ, দরিদ্রকে ধনদানের অভাবে ব্যাপকভাবে দারিদ্র্যের আবির্ভাব হল, ক্রমে দারিদ্র্যে থেকে চুরি, চুরি থেকে প্রাণীহত্যা, প্রাণীহত্যা থেকে মিথ্যা বাক্যের বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হলে মনুষ্যগণের আয়ু ও বর্ণ ড়্গীণ (কম) হলে, আয়ু ও বর্ণ লঘু হলে চত্বারিংশৎ (চল্লিশ) সহস্র (হাজার) বর্ষ আয়ুসম্পন্ন মনুষ্যগণের সন্তান-সন্ততিগণ বিংশতি (বিশ) সহস্র আয়ুসম্পন্ন হল। ভিক্ষুগণ, বিংশতি সহস্র বর্ষ (বৎসর) আয়ুসম্পন্ন মনুষ্যগণের মধ্যে একজন পুরুষ অদত্ত পরদ্রব্য গ্রহণ করে চুরি অপরাধ করল। অপর একজন পুরুষ হিংসায় প্রণোদিত হয়ে তার বিরুদ্ধে রাজার নিকট সংবাদ দিল।
৭. এরূপে, ভিক্ষুগণ, দরিদ্রকে ধনদানের অভাবে প্রচুর পরিমাণে ধনহীনতার উৎপত্তি হল, ক্রমে ক্রমে চৌর্য, প্রাণীহত্যা, মিথ্যাবাক্য, মিথ্যা বাক্য বৃদ্ধির সাথে পৈশুন্যর (পিশুন) আবির্ভাব হল, এর ফলে মনুষ্যগণের আয়ু ও বর্ণ ক্ষয় হল এবং বিংশতি সহস্র বর্ষ আয়ুসম্পন্ন মনুষ্যগণের সন্তান-সন্ততিগণ দশ সহস্র বৎসর আয়ুসম্পন্ন হল। দশ সহস্র বৎসর আয়ুসম্পন্ন মনুষ্যগণের কেউ কেউ সুরূপ এবং কেউ কেউ কুরূপ হল, যারা কুরূপ হল তারা সুরূপের প্রতি আসক্ত হয়ে পরদার (কামসেবা) গমন করল। এরূপে দরিদ্রকে ধনদানের অভাবে
বিপুলভাবে দারিদ্র্যের উৎপত্তি হল, ক্রমে ক্রমে চৌর্য-প্রাণীহত্যা, মিথ্যাবাক্য, পিশুন বাক্য, পিশুন বাক্যের বৃদ্ধি
লাভ হলে ব্যাপকরূপে ব্যভিচারের আবির্ভাব হল, উহার ফলে
মানব মুক্তির পথ প্রদর্শক গৌতম

মানবগণের আয়ু ও বর্ণ লঘু হয়ে দশ সহস্র বৎসর আয়ুসম্পন্ন মানবগণের সন্তান-সন্ততিগণ পাঁচ হাজার বৎসর আয়ুবিশিস্নষ্ট হল।
পর্ব -০১*

Thursday, February 23, 2017

একজন দক্ষকর্মী বনভন্তের অন্যতম শিষ্য

Check out Bitashok Bhante (@BitashokBhante): https://twitter.com/BitashokBhante?s=09

"অচিরেই এই শরীর"

পূতিগাত্র তিষ্য স্থবিরের উপাখ্যান (গাথা ৪১)

গাথাপ্রসঙ্গ : ‘‘অচিরং বত’যং কযো” ‘‘অচিরেই এই শরীর”- এই ধর্মদেশনা বুদ্ধ শ্রাবস্তীতে অবস্থানকালে পূতিগাত্র তিষ্য স্থবিরকে উদ্দেশ্য করে ভাষণ করেছিলেন।
শ্রাবস্তীবাসী একজন কুলপুত্র বুদ্ধের নিকট ধর্ম শ্রবণ করে বুদ্ধশাসনে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে নিয়োজিত করে প্রব্রজিত হলেন। উপসম্পদা লাভ করে তাঁর নাম হল ‘তিষ্য স্থবির’। সময় অতিবাহিত হতে থাকলে হঠাৎ তাঁর শরীরে রোগ উৎপন্ন হল। সর্ষপের ন্যায় তাঁর শরীরে ফোঁড়া উঠল। ক্রমে সেগুলো বড় হতে হতে প্রথমে মূগডালের মত, পরে কলায়ের মত, পরে কদলীফলের মত, পরে আমলকীর মত, পরে কচি বেলে মত এবং অবশেষে পক্ক বেলের মত হয়ে ফেটে গেল। তাঁর শরীর বড় বড় ঘায়ে পরিপূর্ণ হল। লোকে  তখন তাঁকে ‘‘পূতিগাত্র তিষ্য স্থবির” বলে ডাকত। ক্রমে তাঁর শরীরের অস্থিসমূহ শিথিল হতে লাগল। কেহই তাঁর সেবা করতে প্রস্থত ছিল না। তাঁর      অন-র্বাস এবং বহির্বাস (উত্তরাসঙ্গ) পূঁজরক্তে ম্রক্ষিত দেখলে মনে হতো যেন জালিপিঠা। সঙ্গী ভিক্ষুরা তাঁর সেবা করতে না পেরে তাঁকে বাহিরে রেখে দিয়েছিলেন। তিনি অনাথের মত হয়ে গেলেন।
বুদ্ধগণ দিনে দুইবার পৃথিবী অবলোকন করতেন। প্রত্যূষকালে পৃথিবী অবলোকন করার সময় তাঁরা চক্রবালমুখ হতে আরম্ভ করে গন্ধকুটি (বুদ্ধগণের বাসস্থান) পর্যন- অবলোকন করে দেখেন বহির্বিশ্বে কোথায় কি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটছে। সেই সময় ভগবানের জ্ঞানজালে ধরা পড়ল ‘‘পূতিগাত্র তিষ্য স্থবির”। বুদ্ধ দেখলেন যে ঐ ভিক্ষুর অর্হত্ত্বলাভের উপনিশ্রয় আছে। কিন' রোগের কারণে তাঁকে সঙ্গী ভিক্ষুরা পরিত্যাগ করেছে। এখন আমি ব্যতীত এর অন্য কোন শরণ নেই।” বুদ্ধ তাঁর এ অবস্থা দেখে করুণাপরবশ হয়ে অগ্নিশালায় প্রবেশ করলেন। তারপর জল গরম করার পাত্রে জল দিয়ে চুল্লীতে চাপিয়ে জল গরম না হওয়া পর্যন- অগ্নিশালাতেই দাঁড়িয়ে থাকলেন। জল গরম হয়েছে জেনে সেই ভিক্ষু যেই মঞ্চে শুয়েছিলেন সেই মঞ্চের এক দিক উঠালেন ঐ ভিক্ষুকে অগ্নিশালায় নিয়ে যাবার জন্য। ভিক্ষুরা তা দেখে বললেন- ‘‘ভন্তে, আপনি সরে যান; আমরাই তাঁকে নিয়ে যাচ্ছি” বলে মঞ্চ উঠায়ে অগ্নিশালায় নিয়ে আসলেন। তারপর তিনি একটি হাতলযুক্ত দ্রোণ (মগ) আনিয়ে হালকা গরমজলে সিঞ্চন করে ভিক্ষুদের বললেন ঐ ভিক্ষুর উত্তরাসঙ্গ নিয়ে গরমজলে ভিজায়ে গাত্রমার্জন করে স্নান করালেন। স্নান করাতে করাতে উত্তরাসঙ্গটি শুকায়ে গেল। সেই উত্তরাসঙ্গ তাঁকে পরায়ে অন-র্বাস খুলে ঐ জলে মর্দন করে রৌদ্রে শুকাতে দিলেন। তাঁর শরীর হতে জল শুকাতে শুকাতে অন-র্বাস শুকায়ে গেল। তিনি অন-র্বাস ও বহির্বাস পরিধান করে একাগ্রচিত্ত হয়ে মঞ্চে (চকিতে) শুয়ে পড়লেন। বুদ্ধ তাঁর মাথার কাছে দাঁড়িয়ে তাঁকে বললেন- ‘‘হে ভিক্ষু, তোমার এই শরীর চেতনাহীন ও নিরুপকার হয়ে অকিঞ্চিৎকর অঙ্গারের ন্যায় অবিলম্বে ভূতলে শায়িত হবে।”- ইহা বলে বুদ্ধ এ গাথাটি দেশনা করেছিলেন। (দেশনাবসানে পূতিগাত্র তিষ্য স্থবির প্রতিসম্ভিদাসহ অর্হত্ত্বফলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। অন্যান্য অনেকে স্রোতাপত্তিফলাদি লাভ করেছিলেন। স্থবিরও অর্হত্ত্ব লাভ করে পরিনির্বাপিত হয়েছিলেন। বুদ্ধ তাঁর শরীরকৃত্য করায়ে অস্থিধাতুসমূহ নিয়ে চৈত্য নির্মাণ করায়েছিলেন)।
ব্যাখ্যা
মহাকারুণাময় বুদ্ধের রোগীর সেবাদান
অচিরং বত’যং কাযো : অচিরেই এ শরীর শায়িত হবে। স্বাভাবিক শয়ন হিসাবে এই শরীর মাটির উপরেই শায়িত হবে।
ছুদ্ধো : তুচ্ছ অর্থাৎ চেতনাহীন (বিজ্ঞানহীন) হয়ে তুচ্ছ ঘৃণিত ত্যাজ্য হতে শায়িত হবে।
নিরত্থংব কলিঙ্গরং : নিরর্থক কাষ্ঠখণ্ডের ন্যায় অর্থাৎ অকিঞ্চিৎকর অঙ্গারের ন্যায় কিংবা নিরুপকার নিরর্থক কাষ্ঠখণ্ডের ন্যায়।
মর্মোদ্‌ঘাটন : কাষ্ঠ সম্ভারার্থী মনুষ্যেরা অরণ্যে প্রবেশ করে সোজা কাঠকে সোজাভাবে বাঁকা কাঠকে বাঁকাভাবে ছেদন করে কাষ্ঠসম্ভার নিয়ে আসে। অবশিষ্ট পোকা-খাওয়া, পঁচা, অসার, গ্রনি'যুক্ত কাষ্ঠখণ্ড সেখানেই ফেলে দেয়। অন্য কাষ্ঠহরণকারীরা এসে সেগুলো গ্রহণ করে না। অন্যগুলো মাটিতেই পড়ে থাকে। সেগুলো কেউ কেউ নিয়ে এসে ছোটখাট কাজে লাগায় যেমন মঞ্চের খিল, পদধৌত করার কাষ্ঠখণ্ড, ফলকপীঠ ইত্যাদি। কিন' এই শরীরে যে কেশ-লোমাদি বত্রিশ প্রকার অশুচি দ্রব্যের ভাগ আছে তার কোন ভাগই মঞ্চের খিল বা অন্যান্য উপকারক দ্রব্যের ন্যায় কোন কাজে লাগে না। এই শরীরের সমস- অংশই নিরর্থক কাষ্ঠখণ্ডের ন্যায় চেতনাহীন হয়ে অচিরেই ভূমিতে শায়িত হবে।
‘‘অচিরে রহিবে হায়! ভূশায়িত এই কায়,
ঘৃণিত, বিজ্ঞানহীন, নিরর্থক কাষ্ঠ প্রায়।”