Followers

Monday, May 29, 2017

বুদ্ধ দর্শনে যুক্তি, ড: নীরুকুমার চাকমা

 বুদ্ধ দর্শনে যুক্তি
ড: নীরুকুমার চাকমা [ অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ]
বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চিন্তা-ধারনা ও বিশ্বাসের পরিবর্তন ঘটেছে অনেক। বিজ্ঞানের সিদ্ধান্তগুলো অভিজ্ঞতালব্ধ ও প্রমাণ সাপেক্ষ; এবং এ কারণে অবৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত বা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে সত্য বলে অপ্রমাণিত কোন কিছুকেই আধুনিক মানুষ সহজে জানতে বা গ্রহণ করতে নারাজ। শিক্ষিত সমাজের কাছে তাই ধর্মের আবেদন নগণ্য। ধর্মীয় মতবাদকে সাধারনত মনে করা হয় অবৈজ্ঞানিক, অন্ধবিশ্বাসভিত্তিক অযৌক্তিক। অন্যান্য ধর্মের উপর এ অভিযোগ চাপানো গেলেও বুদ্ধ ধর্মের উপর চাপানো কিন্তু যুক্তি-সজ্ঞত বলে মনে হয় না। খ্রিষ্ট জম্মের সেই ষষ্ট শতাব্দিতে উৎপত্তি হলেও বুদ্ধধর্ম আসলে একটি আধুনিক ধর্ম, বৈজ্ঞানিক ধর্ম, যুক্তির ধর্ম। বুদ্ধের সুমহান উপদেশ, বানী ও চিন্তাধারাই বুদ্ধদর্শনের উৎস ও ভিত্তি। অন্য কথায়, বুদ্ধের ধর্মই আসলে বুদ্ধ দর্শন। বুদ্ধ দর্শনের প্রধান বৈশিষ্টই হচ্ছে স্বাধীন চিন্তা। স্বাধীন চিন্তার এ গতিধারা যুগে যুগে বিকশিত হয়েছে বিচিত্র ভঙ্গিমায়। ধর্মের কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস এ দর্শনকে কলুষিত করতে পারেনি কোনদিন। অতিজাগতিক বা অতীন্দ্রিয় ব্রহ্ম বা ইশ্বরের অন্ধবিশ্বাস এ দর্শনে থাঁই পাইনি কনোদিন।যুক্তির স্বচ্ছতা ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ এ দর্শনের প্রাণ।
হিন্দু ধর্ম, খ্রিস্ট ধর্ম, ও ইসলামধর্মের ভিত্তি হচ্ছে বিশ্বাস, কিন্তু বুদ্ধ ধর্মের ভিত্তি হচ্ছে যুক্তি। বুদ্ধের বানী ও উপদেশকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করলে বা নির্বিচারে গ্রহণ করলে বুদ্ধ ধর্মকে বুঝা যাবে না। একমাত্র যুক্তির মাধ্যমে বুদ্ধ ধর্মকে জানা বা বুঝা সম্ভব। বুদ্ধ যীশু খ্রিষ্টের মতো ঈশ্বরের সন্তান নন, শ্রীকৃষ্ণের মতো ভগবান নন, হযরত মুহম্মদের (দঃ) মতো পয়গম্বরও নন। রাজপুত্র হলেও তিনি ছিলেন আমাদের মতই রক্ত মাংসের মানুষ যিনি নিজের সাধনাবলে বুদ্ধত্ব লাভ করে ইতিহাসে মহামানব বলে পরিচিত হবার গৌ্রব অর্জন করেন। অন্যান্য ধর্ম প্রচারকরা যেখানে নিজেদের বানীগুলোকেই এক মাত্র পরম সত্য বলে দাবী করেন এবং এগুলোকেই অন্ধভাবে ও নির্বিচারে গ্রহণ করার জন্যে আহ্বান জানান, বুদ্ধ সেখানে তাঁর অনুগামীদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ‘আমি যা বলছি তা তোমরা নির্বিচারে মেনে নিওনা, আমার কথাকে তোমরা নিজেরা পরিক্ষা করে দেখ।’ এত বড় কথা যুক্তিবাদী ছাড়া আর কে বলতে পারে?
এ জীবন ও জগতকে বুদ্ধ বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন। নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে উপলদ্ধি করেছেন, বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ দ্বারা বিচার করেছেন, যুক্তি দিয়ে বুঝাবার চেষ্টা করেছে। অন্যান্য ধর্ম যেখানে বিশ্বাসকে প্রাধান্য দিয়েছে, বুদ্ধ ধর্ম সেখানে প্রাধান্য দিয়েছে বুদ্ধিকে, যুক্তিকে এবং এ জীবন ও জগতের সব জিনিসের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করেছেন। বুদ্ধের মতে জগতের প্রত্যেক্তি জিনিস কার্যকারণ শৃঙ্খলাবদ্ধ। কোন বস্তুই স্বয়ং উৎপন্ন হইনা একটি ঘটনা অন্য একটি ঘটনা থেকে সঞ্জাত। সবকিছুই উৎপত্তি হয় ঘটনা থেকে। বুদ্ধ দর্শনে এ তত্ত্বকে বলা হয় ‘প্রতীত্যসমুৎপাদ’। এ তত্ত্বানুসারে আমাদের জীবন দুঃখময় , এ দুঃখের কারণ আছে, এ দঃখ থেকে মুক্তিও পাওয়া যায়। জীবন যে দুঃখময় তা অস্বীকার করার উপায় নেই। বুদ্ধ নিত্য, অপরিবর্তনশীল, চিরস্থায়ী ও অবিনশ্বর বলে কোন জিনিজের অস্তিত্বকে স্বীকার করেন না। তাঁর মতে জগতের সবকিছু পরিবর্তনশীল, সারা বিশ্বে চলেছে বস্তুর বিরামহীন পরিবর্তন ও রূপান্তর। আমাদের জীবন হচ্ছে এক অবিরাম প্রবাহ-আবির্ভাব ও তিরোভাব এক অন্তহীন স্রোত, এ জগতে শাশ্বত সত্তা বলতে কোন জিনিস নেই।বুদ্ধ দর্শনের এ বৈজ্ঞানিকমত পরবর্তীকালে মার্ক্স ও এঙ্গলকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছে। অধিবিদ্যায় বা শুদ্ধ তত্ত্ব জিজ্ঞাসায় বুদ্ধ কোনদিন আগ্রহী ছিলেন না। তাঁর দর্শন ছিল সম্পূর্ণভাবে জীবন মুখী। জীবন সমস্যা সমাধানে যে জিনিস কোন প্রয়োজনে আসে না, বুদ্ধ সে জিনিসকে সম্পূর্ণভাবে বর্জন করেছেন. বুদ্ধের মতে, জগত কি নিত্য না অনিত্য, সসীম না অসীম, ঈশ্বর আছে কি নেই এ ধরণের তত্ত্ব বিচারে আত্ত্বনিয়োগ করা অর্থহীন এবং সময়ের অপচয় মাত্র, কারণ এতে দুঃখের নিবৃত্তি হয় না, জিবনের লক্ষ্য অর্জিত হয় না। বুদ্ধ দর্শনের বৈশিষ্ট্য তাই শুদ্ধ তত্ত্ব বিচার নয়,দুঃখ থেকে মুক্তিলাভের চেস্তা করা। এ মুক্তির প্রশ্নে বুদ্ধ ধর্ম যে মত পোষণ করে তা নিঃসন্দেহে বৈজ্ঞানিক ও যুক্তিবাদী.।

Saturday, May 27, 2017

মানুষের সুখ-দুঃখের কারণ তাঁর মন

মানুষের সুখ দুঃখ ভোগের প্রকৃত কারণ তার মন
এক সময় শ্রদ্ধেয় বনভান্তে আর্যবন বিহারে খাগড়াছড়িস' ‘ছাত্র ছাত্রী আর্য ঐক্য পরিষদ’ কর্তৃক আয়োজিত দানানুষ্ঠানে ধর্মদেশনা প্রদানকালে বলেন—ধর্মদেশনা দেওয়া বা প্রদান করা অর্থ চারি আর্যসত্যকে ব্যাখ্যা করা। যেমন—দুঃখ আর্যসত্যের কথন, দেশনা, প্রজ্ঞাপন, স্থাপন, প্রকাশন; সমদুয় আর্য সত্যে সত্যের কথন, দেশনা, প্রজ্ঞাপন, স্থাপন, প্রকাশন; নিরোধ আর্য সত্যের সত্যের কথন, দেশনা, প্রজ্ঞাপন, স্থাপন, প্রকাশন; মার্গ আর্যসত্যের সত্যের কথন, দেশনা, প্রজ্ঞাপন, স্থাপন, প্রকাশন অতি সহজ, সরলভাবে ব্যাখ্যা করা। কথন অর্থ চারি আর্যসত্যের কথা ব্যতীত অন্য কোন বিষয়ে কথা না বলা। শুধুমাত্র দুঃখ কি, কোথা হতে দুঃখ উৎপন্ন হয়, কিসে দুঃখের পরিসমাপ্তি ঘটে, দুঃখ পরিসমাপ্তির উপায় কি? সেসব কথা বলা। দেশনা বলতে চারি আর্যসত্যকে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে ব্যাখ্যা করে জনসাধারণের সমক্ষে চারি আর্যসত্যকে তুলে ধরা। প্রজ্ঞাপন অর্থ ঘোষণা করা। অর্থাৎ বহুজনের হিতসুখ ও জ্ঞানচক্ষু উদয় করানোর তাগিদে চারি আর্যসত্যকে দিকে দিকে ঘোষণা করে দেওয়া। স্থাপন অর্থ প্রতিষ্ঠা করা। যেমন কোন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করলে তারিখ ও স্থানের নাম উল্লেখ করে প্রতিষ্ঠা করা হয়। ঠিক তদ্রূপ দেশনা প্রদান কাল হতে সেইরূপে মনচিত্তের মধ্যে চারি আর্যসত্যকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করা। প্রজ্ঞাপন অর্থ প্রকাশ করা। অর্থাৎ চারি আর্যসত্যকে সঠিক ধারণা দিয়ে যথাযথ উপমা সহকারে সুপ্রকাশিত করা। এই চারি আর্যসত্য ব্যতীত দুঃখমুক্তি লাভের কোন উপায় নেই, কেবল এ সত্যের দ্বারাই নির্বাণ লাভ করা যায় তা’ প্রকাশ করা। বলা বাহুল্য যে, ভগবান বুদ্ধ এভাবে চারি আর্যসত্যের কথন, দেশনা, প্রজ্ঞাপন, স্থাপন ও প্রকাশন অতি সহজ, সরলভাবে ব্যাখ্যা করতেন। বুদ্ধ শিষ্যের মধ্যে অগ্রশ্রাবক শারীপুত্র মহোদয়ও চারি আর্যসত্যের কথন, দেশনা, প্রজ্ঞাপন, স্থাপন ও প্রকাশনকে অতি সহজ, সরলভাবে ব্যাখ্যা করতে সমর্থ ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে ভগবান বুদ্ধ তথা শারীপুত্র মহোদয় কেহ নেই। আমি তো কিছুতেই তাদের মতন করে চারি আর্যসত্যকে ব্যাখ্যা করতে পারব না। আমার যতদূর সম্ভব শুধু তাই বলে যাব। চারি আর্যসত্য সম্পর্কে বললে বলতে হয়, জগতে দুঃখ আছে ইহা প্রথম সত্য। দুঃখ যখন বিদ্যমান আছে তাহলে দুঃখোৎপত্তি কারণ অবশ্যই আছে, ইহা দ্বিতীয় সত্য। যেহেতু দুঃখ আছে সুতরাং দুঃখের শেষ বা নিরোধও আছে ইহা তৃতীয় সত্য। রোগ থেকে আরোগ্য লাভের জন্য যেমন ওষুধ সেবন করতে হয়। তেমনি দুঃখের হাত থেকে রেহাই পাবার জন্য একটা মার্গও রয়েছে ইহা চতুর্থ সত্য। পঞ্চস্কন্ধ দুঃখ আর্যসত্য অভিজ্ঞা দ্বারা জ্ঞাত হতে হবে। অবিদ্যা, তৃষ্ণা সমুদয় আর্যসত্য অভিজ্ঞা দ্বারা পরিহার করতে হবে। নির্বাণ নিরোধ আর্যসত্য অভিজ্ঞা দ্বারা প্রত্যক্ষ করতে হবে। শমথ বিদর্শন মার্গসত্য অভিজ্ঞা দ্বারা গঠন করতে হবে। অভিজ্ঞা বা উচ্চতর জ্ঞানের দ্বারা চারি আর্যসত্যকে যথার্থভাবে জানতে না দেওয়া পাপিষ্ঠ মারের কাজ। কারণ চারি আর্যসত্য সম্বন্ধে সত্ত্বগণকে অজ্ঞ করে রাখতে পারলে ইচ্ছামত এদিকে সেদিকে পরিচালিত করতে তার সহজ হয়। বলা বাহুল্য চারি আর্যসত্যের জ্ঞান অর্জন হলে মার আর কিছুতেই সত্ত্বগণকে অজ্ঞ করতে রাখতে পারে না। দুঃখ সম্বন্ধে জ্ঞান অর্জন হলে দুঃখকে দেখতে পেলে, দুঃখকে বুঝতে পারলে কেহ কি আর দুঃখের মধ্যে থাকতে চাইবে? কেহই তো জেনে শুনে দুঃখে পতিত হতে চাই না। অন্যদিকে দুঃখের কারণ সম্বন্ধে জ্ঞান অর্জন হলেও অনাকাঙ্ক্ষিত সেই দুঃখের উৎপত্তিকে সবাই বন্ধ করতে প্রত্যাশী হয়। এমনিতে পূর্বে উৎপত্তি হওয়া দুঃখের পীড়নে সবাই কাতর, তার উপর আরো দুঃখের উৎপত্তি? কেহই সমর্থন করতে পারে না। দুঃখের নিরোধ সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ হলে দুঃখ নিরোধে কি সুখ তা’ প্রত্যক্ষ হয়। আর সুখকে সবাই সানন্দে গ্রহণ করতে ইচ্ছুক। কাজেই দুঃখ নিরোধের উপায় নির্বাণ সুখের অবস্থান করে। দুঃখ নিরোধগামিনী জ্ঞান অর্জন হলে সবাই সে মার্গ অবলম্বনে দুঃখের পরিসমাপ্তি ঘটায়ে থাকে। তোমরা যদি জ্ঞানে দুর্বল হয়ে যাও তাহলে মার তোমাদেরকে ইচ্ছা মত চালাতে থাকবে। বারবার দুঃখের মধ্যে পতিত হওত দুঃখেই অবস্থান করতে হবে তোমাদেরকে। সেই দুঃখের হাত থেকে মুক্তি লাভ করতে পারবে না। তজ্জন্য তোমরা জ্ঞান অর্জন করতে চেষ্টাশীল হও। জ্ঞান অর্জনের জন্য দৃঢ় প্রত্যয়ী হলে সেই পথে যে রকম বাঁধা উপস্থিত হোক না কেন বীর বিক্রমে তা’ অতিক্রম করতঃ জ্ঞানের চরম শিখরে পৌঁছতে সক্ষম হবে। তাই ভগবান বুদ্ধ সত্ত্বদিগকে চারি আর্যসত্য জ্ঞান দান করে মারকে পরাভূত করতে সাহায্য করতেন। যার ফলে সেই সময় সত্ত্বগণ দুঃখকে চিরতরে ধ্বংস করে নির্বাণ পরম সুখ প্রত্যক্ষ করতে সমর্থ হয়েছিল। তজ্জন্য বুদ্ধের সময়কালীন মার তার প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি।
শাস্ত্রে উল্লেখ আছে-বুদ্ধ যখন গয়ার বোধিমূলে ধ্যান রত ছিলেন মার তখন চিন্তা করতে লাগল। “এ’শাক্য রাজপুত্র যদি জ্ঞান লাভ করে, বুদ্ধ হয়ে যায়, লোকদের যদি উপদেশ দেয় তাহলে আমাররাজ্য তো ধ্বংস হয়ে যাবে”। কাজেই যে কোন উপায়ে হোক তাঁকে ধ্যান চ্যুত করাতে হবে। অমনি মার সৈন্য সামন্ত নিয়ে বুদ্ধকে আক্রমণ করতে থাকে। কিন্তু বুদ্ধকে ধ্যান চ্যুত করা দূরে থাক, এক চুলও নাড়াতে সক্ষম হল না। বরং বুদ্ধ মারকে পরাজিত করে বুদ্ধত্ব লাভ করেন। আর দুঃখে পীড়িত সত্ত্বগণকে দুঃখ হতে মুক্তি লাভের পথ দেখাতে শুরু করেন। এদিকে বর্তমানে মার আমাকেও ভালো চোখে দেখতেছে না। কারণ আমি সদ্ধর্ম প্রচার করার দরুন তার শক্তি খর্ব হয়ে যাচ্ছে। তবে এটা বলা বাহুল্য যে, বর্তমানে শুধু আমাকেই মার একটু সমীহের চোখে দেখছে মাত্র।
শ্রদ্ধেয় বনভান্তে আরও বলেন—মার চারটি বিষয় লাভে বাঁধা-বিপত্তি সৃষ্টি করে দেয়। সে চারটি কি? কুশলকর্ম সম্পাদন, জ্ঞান লাভ করা, নির্বাণ প্রত্যক্ষ করণ, সংসার দুঃখ হতে মুক্তি লাভ করণ, এই চারটি বিষয় লাভে বাঁধা দেয়। মার কি বলে জান? যারা এ’চারটি বিষয় লাভ করতে চাই, আমি তাদেরকে ব্যর্থ করে দিব। ঐ বিষয়সমূহ অর্জন করাকে আমি কিছুতেই সহ্য করতে পারি না। আর কিভাবেই বা সহ্য করব। ঐ গুলো অর্জন হলে তো তারা আমাকে পরাজিত করে ফেলবে। আমাকে তাদের কাছে পদানত হয়ে যেতে হবে। তাদেরকে আমার কথামত পরিচালনা করতে পারব না। সত্ত্বগণ লোভ, হিংসা, অজ্ঞানতা দ্বারা নানা প্রকার অনাচার, অত্যাচারে নিয়োজিত থাকলে অকুশল, পাপমূলক কর্মে রত দেখলে মার খুব খুশী হয়। সত্ত্বগণ যত অকুশল, পাপকর্মে নিয়োজিত থাকে মার তত বেশি আনন্দিত হয়। সেই পাপীদেরকে নানাভাবে সাহায্য সহযোগিতা করতে মার সিদ্ধহস্ত। মার হল পাপী লোকদের রাজা। দুর্দমনীয়দের মধ্যে মারের শক্তি অতীব শক্তিশালী। এমন কোন খারাপ কর্ম বা বাক্য নেই যা’ মারের দ্বারা সম্পাদিত হয় না। যত অকুশল, পাপ ঝগড়া-বিবাদ, কাটাকাটি, মারমারি, চাঁদাবাজী, সন্ত্রাসী, মস্তানী, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, অরাজকতা সৃষ্টিকর্তা হল মার। সকল প্রকার খারাপ কাজে মার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ্ভাবে মার জড়িত থাকে। বর্তমানে তোমরাও যে সকল অকুশলকর্মে জড়িত রয়েছ সে সকল অকুশলকর্ম হতে নিজকে বিরত রাখ। বিরত রাখতে পারলে নিশ্চিত নিরয়গামী হওয়া হতে রক্ষা পাবে। অন্যদিকে, তোমাদেরকে অকুশল কর্ম হতে বারণ করলেও আমার কথায় কর্ণপাত কর না। তাই মাঝে মাঝে চিন্তা হয় তোমাদেরকে বারণ করব কি না? একটা উপমার কথা বলি-আচ্ছা ধর, কয়েক জন লোক একটা পথ ধরে এগিয়ে চলতে পথের ধারে বিশ্রামরত অন্য এক জনের সাথে সাক্ষাৎ হল। তারা বিশ্রাম রত ব্যক্তির সাথে কিছু আলাপ করে আবার এগিয়ে চলতে লাগল। এদিকে বিশ্রামরত ব্যক্তির পূর্ব হতে জানা ছিল যে, সে পথে একটা ভীমরুলের বাসা রয়েছে। সুতরাং পথিকগণ কিছু অগ্রসর হলে ভীমরুলের কবলে পড়বে। সে ব্যক্তি যদি পথিকগণের হিতকামী হয়, তাহলে তাদেরকে সে পথে যেতে বারণ করবে। আর যদি ভীমরুলের কামড় খাওয়াতে ইচ্ছুক হয় তবে বারণ করবে না। আমার অবস্থাও অনেকটা সে রকম নয় কি? তবে আমি তোমাদেরকে অকুশল সম্পাদন করা হতে বারণ করতে চাই। কিন্তু তোমরা তো আমার কথায় কর্ণপাত করতে প্রস্তুত নও। তবু আমি তোমাদেরকে ভবিষ্যতে যেন দুঃখে পতিত হতে না হয় তার জন্য সতর্ক করে দিচ্ছি। আমার কথা কর্ণপাত না করলে আমাকে কিন্তু দোষারোপ করতে পারবে না। একদিন জনৈক চাক্‌মা উপাসক আমাকে বলেছিল, ভান্তে আমাদের মঙ্গলের জন্য আপনাকে অবশ্যই বারণ করতে হবে। আমাদেরকে অনুশাসন করতে হবে, বিধি নিষেধ আরোপ করতে হবে। আপনার সেই অনুশাসনের কথা শুনে আমরা কিছুটা হলেও সতর্ক হবো। কারণ যেখানে পশুরা পর্যন্ত অনুশাসন মেনে চলে, সেখানে আমরা মানুষ হয়ে কেন মানবো না? অবশ্যই মানবো। আপনি যদি অনুশাসন, বিধি নিষেধ আরোপ না করেন, কে করবে? কাজেই ভান্তে, আপনি চেষ্টা করে দেখেন। আর তাই আমিও বিবিধ প্রকারে যুক্তি, উপমা উত্থাপন করে তোমাদেরকে পাপ হতে বিরত থাকতে উপদেশ দিই। এবং পাপ বিরতির অনুশাসন করে থাকি। অনেকে নাকি আমার কাছে আসতে ভয় পায়। তার প্রকৃত কারণ কি জান? মারই তাদেরকে বাঁধা প্রদান করে থাকে। হুমকি দেয় যে, বনভান্তের কাছে যাবে না, তিনি তোমাকে বকা দিবেন। আর মারের সেই হুমকির ফলে তারা ভয় পেয়ে আমার কাছে আসতে চায় না। আমি তোমাদেরকে বলে দিচ্ছি-তোমরা মারের সকল প্রকার বাঁধা-বিপত্তি, প্রলোভন অতিক্রম করে পুণ্যকর্ম সম্পাদন করতে থাক। পুণ্যকর্ম সম্পাদন করতে হলে মারের প্রভাবে সৃষ্ট সব বাঁধা-বিপত্তি বীর বিক্রমে অতিক্রম করা চাই। মারের বাঁধা-বিপত্তিকে অতিক্রম না করে পুণ্যকর্ম সম্পাদন করা যায় না। তাই পুণ্যকর্ম সম্পাদন করতে বীর হয়ে যাও। হীন কাপুরুষ হলে চলবে না। যারা বীর তারা মারের হুমকি, বাঁধা বিপত্তিকে নির্ভীক চিত্তে জয় কর। যাতে পুণ্যকর্ম করতে কোন প্রকার কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়।
শ্রদ্ধেয় বনভান্তে বলেন—বৌদ্ধধর্ম আচরণে ইহলোকে যেমন প্রত্যক্ষ ফল প্রদান করে পরলোকেও অধিকতর মঙ্গল সাধিত হয়। আবার, এই ধর্মে ফল প্রাপ্তির জন্যর কোন নির্দিষ্ট সময় বাঁধা নেই। ইহার ফলোৎপাদনে কোন প্রকার বিলম্ব হয় না। যখনই সঠিকভাবে প্রতিপালিত হয় তখনই তার ফল পাওয়া যায়। ইহা শুধু কথার কথা নয়, কেবল উপদেশ বাক্যও নয়। বৌদ্ধধর্ম কখনো কাল্পনিক ধর্ম নহে। এ’ধর্মের মাধ্যমে প্রকৃত বিমুক্তি সুখ লাভ হয়। তাই এখানে ‘এসো দেখো,’ বলে বিচার বিবেচনা করার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। আমিও তোমাদেরকে বলছি, তোমাদের মত শিক্ষিত ছেলেরা সদ্ধর্মে দীক্ষিত হয়ে আমার কাছে বৌদ্ধধর্ম শিক্ষা করতে এগিয়ে আসো। সত্যিই কি বৌদ্ধধর্মে সুখ অর্জিত হয়? নির্বাণ সুখ কি? এ গুলো গবেষণা কর। দশবল বুদ্ধের শাসন রক্ষা করার জন্য উদ্যোগী, ভালো শিষ্যের প্রয়োজন রয়েছে। আমার পক্ষে একাই সেসব কাজ ত্বরান্বিত করা সম্ভব হচ্ছে না। দশবল বুদ্ধের শাসন রক্ষা কল্পে আমার আরো বি এ, এম এ, ডক্টর, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যারিষ্টার ডিগ্রীধারী শিষ্যের প্রয়োজন রয়েছে। দশবল বুদ্ধের শাসন রক্ষা করতে পারলে দেব-মনুষ্য সকলের অশেষ হিতসুখ, মঙ্গল সাধিত হয়। বর্তমানে বুদ্ধের শাসন উন্নতি, শ্রীবৃদ্ধি ও স্থিতি রাখার জন্য সকলের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া খুব প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

তোমরা সব সময় বুদ্ধ, ধর্ম, সংঘের প্রতি প্রসন্ন মনে অবস্থান করবে। ত্রিরত্নের প্রতি প্রসন্ন হলে মনচিত্ত কখনো বিপথগামী হতে পারে না। কায়-বাক্য-মন এই ত্রিবিধ কর্মসমূহকে প্রসন্ন বা নির্মল চিত্তে সম্পাদন করতে সক্ষম হলে মহৎ ফলের অধিকারী হবে। কেহ যদি প্রসন্ন চিত্তে কোন কথা বলে কিংবা কাজ করে অথবা মনন করে সুখ তাকে সততই ছায়ার ন্যায় অনুসরণ করে। তাই তোমরা প্রসন্ন মনে কাজ করবে, প্রসন্ন মনে বাক্য প্রয়োগ করবে। তবেই তোমাদের দীর্ঘকাল হিতসুখ, মঙ্গল সাধিত হবে। এবং বহুবিধ পুণ্য সঞ্চয় হয়ে থাকবে। দেহের ছায়া সর্বদা দেহকে আশ্রয় করে তাকে, দেহ হতে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। তেমনি পুণ্যার্থীর পুণ্য ছায়াও সব সময় থাকে অনুসরণ করতে থাকে। পক্ষান্তরে দূষিত মনে কাজ করলে, দূষিত মনে কথা বললে পদে পদে দুঃখ পেতে হয়। শকটবাহী বলদের পদানুগামী ঘূর্ণমান চক্রের ন্যায় দুঃখ তাকে অনুসরণ করে। বলা যায়, মানুষের সুখ-দুঃখের প্রকৃত কারণ হল তার মন। মনই জীবনকে গড়ে তোলে সুখী কিংবা দুঃখী করে। মন যদি প্রসন্ন বা নিষ্পাপের দিকে চলে তবে সুখ আর মন যদি দূষিত পথে বিচরণশীল হয় তাহলে দুঃখের সীমা থাকে না। কাজেই তোমরা আজ হতে সবাই সাবধান হয়ে যাও। স্বীয় মনচিত্তের দিকে লক্ষ্য রাখ, যাতে দূষিত পথের দিকে ধাবিত হতে না পারে। সর্বদা যেন নিষ্পাপ মার্গে বিচরণশীল হয়। এই কাজে যদি সফল হতে পার তবে কোন দুঃখ তোমাদের কাছে আসতে পারবে না।
পরিশেষে তিনি বলেন—তোমরা আমার দেশনা বুঝতে পারছ কি? নাকি অনাবাদী জমিতে, ঘন তৃণের ওপর বীজ বপন করলাম এতোক্ষণ। অনাবাদী জমিতে বীজ বপন করলে তো বহু ফলন লাভের আশা দূরের কথা, বীজগুলোও নষ্ট হয়ে যাবে। কিছুই লাভ হবে না। যারা জ্ঞানী তারা আমার দেশনা বুঝতে পারে, হৃদয়ে ধারণ করতে পারে এবং সে অনুসারে আচরণ করে মহাসুখের অধিকারী হয়। কিন্তু অজ্ঞানীরা এ সমস্ত জ্ঞানের বিষয় কোনমতে বুঝতে পারে না, হৃদয়ে ধারণ করতে পারে না। আর আচরণ করা তো তাদের কাছে আকাশ-কুসুম কল্পনা মাত্র। তোমরা যারা জ্ঞানী তারা আমার এ’দেশনার মমার্থ বুঝতে চেষ্টাশীল হও। এবং স্বীয় জীবনকে সেই আলোকে পরিচালিত কর। একদিন দেখবে এর সুফল অবশ্যই লাভ করতে পারবে। আজকের আমার এ’দেশনার প্রভাবে তোমাদের যদি জ্ঞান উদয় হয়ে অজ্ঞানতা বিদূরীত হয়, মিথ্যাভাব বিদূরীত হয়ে সত্যভাব উদয় হয় তাহলে তোমাদের পরম সুখ লাভ হবে। তোমার আর অধোগতি হবে না, সকল প্রকার দুঃখ, দুর্দশা নিঃশেষ হয়ে যাবে। তাই আবারো বলছি, তোমাদের যদি সত্যভাব উদয় হয়, জ্ঞান উদয় হয় তোমরা সুখী হতে পারবে। তোমাদের ভবিষ্যত চিরসুখ, শান্তিতে সমৃদ্ধিময় হয়ে উঠবে। আর অজ্ঞান, মিথ্যাভাব উদয় হয় তাহলে ভবিষ্যত ঘোর অন্ধকার বলে জানবে। তোমরা সকলে জ্ঞান, সত্যভাব উদয় করতে আপ্রাণ চেষ্টা কর। সে কাজে শত বাধা-বিপত্তি আসলেও পিছ পা হবে না। বরং সুপ্রোথিত ইন্দ্রখীলের ন্যায় সুদৃঢ়ভাবে বীর্যকে আকঁড়ে রেখে উন্নতি দিকে অগ্রসর হবে। এই প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে পারলে একদিন না একদিন জ্ঞান, সত্যভাব লাভ হবেই। আর সত্যভাব, জ্ঞান লাভ হলে সমস্ত দুঃখ-যাতনা, অজ্ঞান বিদূরীত হয়ে জ্ঞানের আলোকে আলোকিত হবে। সর্বদা মনে রাখবে—
সত্যভাব যতদিনে না উদিবে তব মনে,
ভব দুঃখ হবে না মোচন।
সাধু, সাধু, সাধু

Thursday, May 18, 2017

জ্ঞানই সকল প্রকার সুখের মূল

জ্ঞানই সকল প্রকার সুখের মূল
শুভ নববর্ষ ১লা বৈশাখ ১৪০৮ বাংলা, ১৪ই এপ্রিল ২০০১ সাল, রোজ শনিবার। রাজবন বিহারে অনুষ্ঠিত সার্বজনীন সঙ্ঘদান, অষ্ট পরিস্কারদান ও পরিত্রাণ শ্রবণ অনুষ্ঠানে শ্রদ্ধেয় শ্রীমৎ সাধনানন্দ মহাস্থবির (বনভান্তে) মহোদয় সদ্ধর্ম দেশনা প্রদানকালে বলেন—সত্যপ্রিয় নামক জনৈক এক ভিক্ষু বলেছিলেন, দায়কেরা যদি আমাকে উত্তমরূপে চারি প্রত্যয়ের ব্যবস্থা করে দিতো আমি প্রব্রজ্যা ত্যাগ করতাম না। দায়কেরা আমাকে সে সব ব্যবস্থা করে দেয় নাই বলে প্রব্রজ্যা ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছি। আচ্ছা, এ কথা কি ঠিক? দায়কদের অভিমত হল সে নিজে ত্যাগের শিক্ষায় প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারে নাই এবং তার যদি পুণ্য পারমী না থাকে তাহলে আমাদেরকে দোষ দিয়ে কি লাভ হবে। স্বীয় কর্মের দোষেই সে ব্যর্থ হয়েছে আর আমাদের দোষ কোথায়। সত্যিই পুণ্যশক্তি ও জ্ঞানশক্তির অভাব হলে প্রব্রজিত হয়ে অবস্থান করা যায় না। মনে রাখতে হবে, বৌদ্ধধর্ম জ্ঞানীদের ধর্ম। অজ্ঞানী, হীন কাপুরুষের জন্য বৌদ্ধধর্ম নয়। অজ্ঞানীরা কিছুতেই এ’ধর্মের কূল কিনারা খুঁজে পায় না। বৌদ্ধধর্মের চরম ও পরম লক্ষ্য দুঃখমুক্তি নির্বাণ শুধুমাত্র জ্ঞানী ব্যক্তিরাই প্রত্যক্ষ করতে পারে। তাই যাদের মনচিত্তে জ্ঞান বিদ্যমান থাকে তাদের জন্য বৌদ্ধধর্ম সহজসাধ্য ও সুখের। তারা অনায়াসে এ’ ধর্মের মূলতত্ত্ব উপলব্ধি করতে পারে তথা বৌদ্ধধর্মের অত্যন্ত গভীরে প্রবেশ করতে সক্ষম। কিন্তু যাদের চিত্তে জ্ঞান নেই তাদের জন্য বৌদ্ধধর্ম দুর্ভেদ্য ও সুকঠিন। বর্তমান অকুশল কার্যকলাপে রত দায়ক দায়িকাদের উদ্দেশ্যে বনভান্তে বলেন, তোমরা অজ্ঞান বলেই এসব পাপকর্ম সম্পাদন করতেছ। তা না হলে এত অনার্য কাজ করেও কিভাবে নিঃসঙ্কোচে জনসমাজে বিচরণ করতেছ? তোমাদেরকে দেখলেও তো আমার লজ্জা পায়। কিন্তু তোমরা অজ্ঞানী বলেই পাপের প্রতি লজ্জাহীন ও ভয়হীন হয়ে অবস্থান করতেছ। তবুও আমি বলছি, তোমরা পাপকর্ম সম্পাদন করাকে লজ্জা ও ভয়রূপে দর্শন করতে সচেষ্ট থাক এবং অতিসত্বর নিজকে অকুশলকর্ম হতে বিরত রাখ। নচেৎ এরূপ পাপকর্মে নিয়োজিত থাকলে আগামী দশ/বার বৎসরে তোমাদেরকে আরো অনেক বেশি করুন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবেই। মনে রাখবে যারা অকুশলকর্মে লজ্জা ও ভয়শীল তাদের দ্বারা আর অকুশলকর্ম সম্পাদিত হয় না। এবং তারা নিম্নগামী না হয়ে দিন দিন ঊর্ধ্বগামীই হয়ে থাকে। ভগবান বুদ্ধ বলেছেন, যারা অকুশল পাপের প্রতি লজ্জা ও ভয়শীল তাদের নিকট অকুশল থাকতে পারে না; তারা অরহত্ব পর্যন্ত লাভ করতে পারে। কারণ অকুশল-পাপে লজ্জী এমন মহাপুরুষ জগতে দুর্লভ। তোমরা যত অকুশল পাপে লজ্জাশীল হবে ততই পাপকর্ম সম্পাদন করা হতে নিজকে মুক্ত রাখতে পারবে। অর্থাৎ তোমাদের নিকট পাপ আসতে পারবে না। ফলে সুখ শান্তি লাভ হবে। অন্যদিকে যত অকুশল পাপে লজ্জাহীন হবে ততই তোমাদেরকে পাপ অকুশলে গ্রাস করে ফেলে অসহ্য দুঃখ প্রদান করবে। তাই বলা হয়েছে “লজ্জা-ভয় দুই এই লোকের পালক। না থাকলে এ’দুই সমান তীর্যগ।” লজ্জা-ভয় না থাকলে কেহ মনুষ্য বলে গণ্য নয়।” “লজ্জা-ভয়হীন মানুষ পশু সমতুল্য। শুকর যেমন মানুষের পরিত্যক্ত মল ভক্ষণে কোনরূপ ঘৃণাবোধ করে না, লজ্জিত হয় না, তেমনি লজ্জা ও ভয় হীন মানুষ অকুশল পাপকর্ম সম্পাদনে কোন প্রকার দ্বিধাবোধ করে না। এতে তাদের না থাকে লোক ভয়, না থাকে নরক ভয়। লজ্জাও ভয়শীল মানুষ কখনো পাপকাজ করতে পারে না। এ’দুই গুণ স্বভাবতই লোককে পাপ থেকে নিবৃত্ত করে। এমন মানুষ সর্বদা পবিত্রভাবে জীবন-যাপন করে। পাপকর্মের প্রতি লজ্জায় এবং পাপের পরিণামের ভয়ে তারা পাপাচরণ করে না, পাপ থেকে দূরে থাকে। মনে রাখতে হবে, যেই ব্যক্তি দুঃখকে ভয় ও অকুশল পাপকে ঘৃণা করে সে নির্বাণ লাভ করতেও সক্ষম হয়। তজ্জন্য বলছি, তোমরা দুঃখের প্রতি ভয়শীল এবং পাপের প্রতি লজ্জাশীল হয়ে অবস্থান কর। যারা দুঃখকে ভয় করে না, এবং পাপকে ঘৃণা (লজ্জা) করে না তাদের জন্য নরকের রাস্তা সর্বদা উন্মুক্ত থাকে। মন্ত্রী (বর্তমানে সাবেক) কল্পরঞ্জন চাকমাকে লক্ষ্য করে বনভান্তে বলেন, কল্পরঞ্জন একদিন আমাকে বলেছিল ‘ভান্তে আমি স্বর্গে যেতে চাই।’ আমি তাকে বলেছিলাম তাহলে তুমি কারোর প্রতি রাগ করতে পারবে না, মিথ্যাবাক্য ভাষণ করতে পারবে না এবং কৃপণ হতে পারবে না। শুধু কল্পরঞ্জন চাকমাকে নয় তোমাদের সবাইকে বলছি, তোমরা রাগী, মিথ্যুক ও কৃপণ হবে না। যারা রাগী, মিথ্যুক ও কৃপণ তারা স্বর্গে যেতে পারে না। স্বর্গ সুখ লাভ করতে হলে তোমাদেরকে রাগ ত্যাগ করতে হবে, মিথ্যাবাক্য ভাষণ করা হতে নিজকে বিরত রাখতে হবে এবং চিত্ত থেকে কৃপণতা ভাবকে বিদূরীত করতে হবে। বুদ্ধ বলেছেন যারা ক্রোধহীন তারা স্বর্গপরায়ণ, যারা মিথ্যাবাক্য বলে না তারা স্বর্গপরায়ণ, যাদের অন্তরে কৃপণতা নেই তারা স্বর্গপরায়ণ। তোমরা যদি স্বর্গে যেতে চাও তবে রাগ করতে পারবে না, মিথ্যাবাক্য ভাষণ করতে পারবে না এবং কৃপণ হতে পারবে না। ইহাই স্বর্গ সুখ লাভের রাস্তা। মনে রাখবে স্বর্গ সুখ লাভের প্রত্যাশীগণকে এই রাস্তায় এগিয়ে যেতে হবে।
পূজ্য বনভান্তে আরো বলেন—আমি তো দেখছি তোমরা সবাই সীমাহীন দুঃখের মধ্যে রয়েছ। সেই দুঃখ হতে কবে তোমাদের ত্রাণ লাভ হবে জান? যখন তোমাদের ধর্মজ্ঞান, ধর্মচক্ষু, উদয় হবে। ধর্মজ্ঞান, ধর্মচক্ষু কিভাবে উদয় হয়? সর্বদা অলোভ, অদ্বেষ, অমোহের সহিত অবস্থান করলে ধর্মজ্ঞান উদয় হয়। যারা লোভমুক্ত, হিংসামুক্ত ও অজ্ঞানমুক্ত তথা লোভ, হিংসা, অজ্ঞানের সহিত চালিত হয় না তাদের ধর্মজ্ঞান ও ধর্মচক্ষু উদয় হয়ে থাকে। এভাবে ধর্মজ্ঞান ধর্মচক্ষু উদয় হলে তখন আর কোন দুঃখ থাকে না। অনাবিল নির্বাণসুখ উপলব্ধি হয়। একবার সাধন তালুকদার আমাকে প্রশ্ন করেছিল ‘ভান্তে আপনি তো সংসার ধর্মে আবদ্ধ হননি,আপনি কিভাবে সংসারী জীবন-যাপন করাকে দুঃখ বলে জানলেন?’ আমরা স্ত্রী, পুত্র-কন্যার সহিত সংসারী জীবন-যাপন করতেছি। সেটা যদি দুঃখময় হয় থাকে আমরা না হয় তা জানব; আপনি জানলেন কিরূপে? আমি বললাম হ্যাঁ আমি সংসারী হই নি একথা ঠিক। তবে সংসারী না হয়েও সেটা জানার উপায় রয়েছে। যেমন ধর তোমার হাতটা আগুনে পুড়ে গেছে। এবং সেই ক্ষতস্থানে সামান্য আঘাত পেলেই তুমি ছট্‌পট্‌ কর, ব্যথার জ্বালায় কাতর হয়ে পড়। তোমার সেই দুঃখময় অবস্থা দেখে অন্যজনেরা কি দুঃখ জানতে পারবে না? নিশ্চয় পারবে। আর তাদের স্বীয় হাত যাতে পুড়ে না যায় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকবে। ঠিক তদ্রূপ,আমিও সেইরূপে তোমাদের সংসারী জীবনের দুঃখ-কষ্টময় ঘটনাবলী দর্শন করে সংসারী জীবনের দুঃখ অনুভব করি, দুঃখ দর্শন করি এবং দুঃখ বলে জানি। সঙ্গে সঙ্গে আমাকে যাতে সেই দুঃখের বিভীষিকাময় অগ্নিতে পক্ক হতে না হয় তজ্জন্য সদা সতর্কতার সহিত অবস্থান করে থাকি। ভিক্ষুদেরকে এইরূপে গৃহীদের দুঃখময় সংসারী জীবন-যাপন দেখে তাতে বীতশ্রদ্ধ হয়ে অবস্থান করতে হবে।
ভগবান বুদ্ধ বলেছেন, তোমাদের এতো দুঃখ কেন? এসো আমি তোমাদেরকে শান্তির সন্ধান দিতেছি। সেই দুঃখ কি? জন্ম দুঃখ, জরা দুঃখ, ব্যাধি দুঃখ, মরণ দুঃখ, অপ্রিয় সংযোগ দুঃখ, প্রিয় বিয়োগ দুঃখ, ঈপ্সিত বস্তুর অলাভ দুঃখ। তার উপর অন্ন-বস্ত্র, অর্থ-বিত্তের অভাবজনিত দুঃখসহ স্বামী-স্ত্রীতে, পুত্র-কন্যার সাথে মতবিরোধ, কথাবার্তায় অমিল; আত্মীয়-স্বজন; পাড়াপ্রতিবেশীর সহিত দ্বন্দ্ব-কলহ, মনোমালিন্য ইত্যাদি হাজারো প্রকার দুঃখ রয়েছে। বুদ্ধের মত অনুসারে দেহধারণ এবং জন্মগ্রহণ করার দরুন এসব দুঃখ ভোগ করতে হয়। দেহধারণ ও জন্মগ্রহণ করার হেতু নিরুদ্ধ হলে এইসব দুঃখেরও পরিসমাপ্তি ঘটে যায়। কেন দেহধারণ ও জন্মগ্রহণ করতে হয়? অবিদ্যার কারণে। সুতরাং অবিদ্যাতে বিদ্যা উৎপত্তি দ্বারা দেহধারণ এবং জন্মগ্রহণ করার হেতু সম্পূর্ণরূপে নিরোধ করতে পারলে যাবতীয় দুঃখরাশি নিরোধ হয়ে যায়। তাহলে দেখা যাচ্ছে অবিদ্যার কারণে তোমরা দুঃখ পাচ্ছ। দুঃখ হতে মুক্তির উপায় খুঁজে পাচ্ছ না। সেই অবিদ্যার মূলোচ্ছেদ করে বিদ্যা উৎপত্তি করতে পারলে যাবতীয় দুঃখের পরিসমাপ্তি ঘটবে, শান্তির সন্ধানে মিলবে। বিদ্যা বা জ্ঞানের সহিত সদ্ধর্ম আচরণে সুখ লাভ হয়। কাজেই, সুখের লাভের জন্য তোমরা সদ্ধর্ম আচরণ কর। অবিদ্যার অন্ধকারে নিমজ্জিত না থেকে জ্ঞানের আলোয় এসো তাহলে অবশ্যই তোমাদের সুখের, শান্তির সন্ধান মিলবে। জ্ঞানের সহিত চালিত হয়ে অমারভুবনে থাকলে সুখ লাভ হয়, কিন্তু অজ্ঞানের সহিত চালিত হয়ে মারভুবনে থাকলে সীমাহীন দুঃখ কষ্টের মধ্যে থাকতে হয়। তাই বলছি, তোমরা অজ্ঞানের অন্ধকারজগত এই মারভুবনে না থেকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত অমারভুবনে চলে এসো। এখানে কোন প্রকার দুঃখ, অশান্তি নেই, রয়েছে অনাবিল শান্তি সুখের পূর্ণ গ্যারান্টি।
তোমরা সৎ উপায়ে জীবন-যাপন কর, অসৎ উপায়ে জীবন-যাপন করবে না। কখনো পঞ্চ নিষিদ্ধ বাণিজ্যে নিজকে নিয়োজিত করবে না। সেই পঞ্চ নিষিদ্ধ বাণিজ্য কি? মৎস্য, মাংস, (বা প্রাণী) অস্ত্র, সুরা (মাদক দ্রব্য), বিষের ব্যবসা। এসব বাণিজ্য দ্বারা সবসময় পাপ উৎপন্ন হয় দুঃখ উৎপন্ন হয়। বুদ্ধের উপদেশ মত পঞ্চ নিষিদ্ধ বাণিজ্যের মাধ্যমে জীবন-যাপন না করে যা অন্য প্রাণী দুঃখ বিরহিত ও অকুশল বর্জিত পবিত্র নির্দোষ সেরূপ সৎ উপায়ে জীবিকা নির্বাহ করতে সচেষ্ট থাক। একদিন জ্যোতিসার আমাকে বলেছিল ‘ভান্তে আজকে আমাদের গমন পথে ভেদভেদী এলাকায় কয়েকজন মহিলাকে শন বোঝাই করে এনে বাজারে বিক্রি করতে দেখেছি’। তাদেরকে দেখে আমার ভীষণ লজ্জা লেগেছিল। আমি বললাম-কেন, বাজারে শন বিক্রি করতেছে সেখানে লজ্জা কিসের? তারা তো অন্যায় কাজ করতেছে না; চুরি-ডাকাতি, চাঁদাবাজি, চোরাচালানি কিছুই করতেছে না। কালক্রমে গরিবকুলে জন্মগ্রহণ করলে জীবন বাঁচানোর তাগিদে শন বিক্রি করতে হবে, কাঠ বিক্রি করতে হবে এটা স্বাভাবিক। ভবচক্রে কখনো গরিব, কখনো মহাধনীকুলে জন্মগ্রহণ করতে হয় কর্মানুসারে। শাস্ত্রে দেখা যায়, বোধিসত্ত্ব অবস্থায় বুদ্ধ নিজেও শন, কাঠ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেছিলেন। তদুপরি শন, কাঠ, বাঁশ বিক্রি করলে তো পাপ হয় না। তৎদ্বারা অকুশল উৎপন্ন হয়ে নিম্নগামী হবার কোন সম্ভাবনা নেই; মরণের পর চারি অপায়ে পতিত হবার কারণও নিহিত নেই। কাজেই আমি তাদের জীবিকাকে সম্যক জীবিকা বলব। শন, কাঠ, বাঁশ বিক্রি না করে তারা যদি নদীতে জাল ফেলে মাছ বিক্রি করত, বন্যপশু শিকার করে মাংস বিক্রি করত এবং মদ তৈরি করে বিক্রি করত তাহলে লজ্জা পাওয়ার কারণ থাকত-তোমার। যেহেতু ঐসব জীবিকাসমূহ মিথ্যা জীবিকার অন্তর্গত ও বুদ্ধ কর্তৃক গর্হিত, নিন্দিত কাজ। বলা যায়, কেহকে চুরি, ডাকাতি, মাস্তানী, সন্ত্রাসী, চোরাচালানী সহ অস্ত্র ব্যবসা এবং মৎস্য, মাংস, মদ-গাঁজা-হেরোইন বিক্রির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতে দেখলে তবেই আমি লজ্জা পেতাম। যেহেতু সে সব ব্যবসার মাধ্যমে বর্তমানে আর্থিক স্বাচ্ছল্যের সহিত জীবন-যাপন করতে সক্ষম হলেও মৃত্যুর পরজন্মে ভয়ানক দুঃখ ভোগ করা ছাড়া অন্য গত্যন্তর থাকে না। তাদেরকে নরক, প্রেত, অসুর, তির্যককুলে জন্মগ্রহণ করতঃ অনন্তকাল ব্যাপীদুঃখ ভোগ করতেই হবে। যারা গরিবকুলে জন্মধারণ করেও উত্তমকার্য এবং সদুপায়ে জীবন-যাপন করে তাদের ঊর্ধ্বগতি সুনিশ্চিত। তাই তোমরা সব সময় সদুপায়ে জীবন-যাপনে তৎপর থাক। অসুদপায়ে জীবন-যাপন করা হতে নিজকে বিরত রাখ।
তিনি বলেন—আজকাল অনেক নর-নারী আমার নিকট এসে চাকুরি লাভের জন্য আশীর্বাদ প্রার্থনা করে। আমি তাদেরকে বলি-আচ্ছা, তোমাদের যদি প্রভূত সম্পত্তি, কোটি টাকা থাকত চাকুরির জন্য আশীর্বাদ প্রার্থনা করতে কি?। করতে না। তখন চাকুরি করার প্রয়োজন হয়ে পড়ত না। সেই সম্পত্তি কিভাবে উৎপন্ন হয় জান? বুদ্ধ বলেছেন, শ্রদ্ধা সর্বসম্পত্তি উদয়ের আদি ভূমি। একমাত্র শ্রদ্ধার বলেই সম্পত্তি উৎপন্ন হয়ে থাকে। সেই শ্রদ্ধা কি? কর্মফলের প্রতি বিশ্বাস এবং চারি আর্যসত্যের প্রতি বিশ্বাস। কারণ যাদের কর্মফলের প্রতি বিশ্বাস থাকে তারা অকুশলকর্ম সম্পাদন করতে পারে না। বরঞ্চ সর্বদা শীলাচারণই করে থাকে। আর সেই শীল পালনের ফলে নতুন সম্পত্তি লাভ হয়। অন্যদিকে চারি আর্যসত্যে বিশ্বাস করা মানে বুদ্ধকে বিশ্বাস করা। বুদ্ধকে বিশ্বাস করলে পাপ করা যায় না। তোমরা যতই বুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে ততই সম্পত্তি লাভ হবে। আর যত বুদ্ধকে (বুদ্ধের জ্ঞানকে) অবিশ্বাস করবে ততই সম্পত্তি হ্রাস পাবে, দিন দিন গরিব হতে হবে। আমার বাস্তব অভিজ্ঞা থেকে বলতে পারি, আমি বুদ্ধের প্রতি গভীর বিশ্বাস বা শ্রদ্ধা রেখে আর্যমার্গ অনুসরণ করেছি বলে বর্তমানে আমার এরূপ ফলাফল অর্জিত হয়েছে। বুদ্ধের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা অটুট রাখতে না পারলে এসব জ্ঞান সম্পত্তি লাভ করা সম্ভব হতো না। বুদ্ধ রতন সূত্রে বলেছেন, ইহলোকে বা পরলোকে অথবা স্বর্গলোকে যা কিছু মূল্যবান রত্ন (সম্পদ) আছে; এদের কোনটিই বুদ্ধ রত্নের সমান নহে। তাই তোমরা যদি বুদ্ধের ভাষিত উপদেশে গভীর শ্রদ্ধাশীল হয়ে অকুশলকর্ম হতে নিজকে বিরত রেখে কুশলকর্মে আত্মনিয়োগ কর তাহলে বুদ্ধ রত্ন থেকে সম্পত্তি উদয় হবেই। যেই স্ত্রী বা পুরুষের চিত্তে শ্রদ্ধা বিদ্যমান থাকে সেই দরিদ্র নহেন, তার জীবন অব্যর্থ। তারা কর্মফল, পরকালের প্রতি অনুপ্রাণিত হয়ে সর্বদা কুশলে নিয়োজিত হওত অতিসত্বর ধন সম্পদের মালিক হতে সক্ষম হয়। তাদের ক্ষেত্রে বেশি পরিমাণ শষ্য উৎপন্ন হয়; ব্যবসা-বাণিজ্যে লোকসান না হয়ে সর্বদা লাভ হয়, আর বন্ধু-বান্ধব ও পাড়া প্রতিবেশীরা সব সময় সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। এবম্বিধ বহু উপায়ে তাদের সর্বদা উন্নতি, শ্রীবৃদ্ধিই লাভ হয়ে থাকে।

নির্বাণ লাভের চারটি সোপান। স্রোতাপত্তি সোপান, সকৃদাগামী সোপান, অনাগামী সোপান এবং অরহত সোপান। তোমরা গৃহীদের মধ্যে কেহ যদি স্রোতাপত্তি মার্গফল লাভ কর তাহলে আর চাকুরি করতে পারবে না, চাকুরি ছেড়ে দিতে হবে। কারণ চাকুরি করা এটা অধীন কাজ। স্রোতাপত্তি লাভীগণ কারোর অধীনে থাকতে পারে না। তবে স্রোতাপত্তি লাভীগণ কিভাবে জীবিকা নির্বাহ করবে? তারা স্বাধীন কাজ চাষবাদ এবং ব্যবসা বাণিজ্যের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। নিজেদের পর্যাপ্ত পরিমাণ ধান্য জমি ও বাগান বাগিচায় স্বয়ং নিজে অথবা চাকর-বাকর দ্বারা শস্য উৎপাদন করে জীবিকা নির্বাহের মাধ্যমে সুশৃঙ্খল জীবন-যাপন করবে। ব্যবসা বলতে আবার ছোটখাটো ব্যবসা যা দেখতে খুব নগণ্য, যেমন মুদির দোকান, শাক-সবজির ব্যবসা ইত্যাদির ধরনের করাও চলবে না। উন্নত মানের ও প্রশংসনীয় ব্যবসা যেমন—ঘড়ি তথা ইলেকট্রনিক দ্রব্য সামগ্রীর দোকান, চশমা, পোশাক পরিচ্ছেদের দোকান, মিল, ফ্যাক্টরী খুলে পরিচালনা করা ইত্যাদি মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করা চায়। বলা বাহুল্য, পঞ্চ নিষিদ্ধ বাণিজ্যে তো কল্পনাই করা যাবে না। যদি সেইরূপ ব্যবসা ও চাষাবাসের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ না থাকে তাহলে সকালে স্রোতাপত্তি লাভ করার পর বিকালেই মৃত্যুবরণ করতে হবে। কারণ স্রোতাপত্তি লাভীদের পক্ষে চাকুরি ও অসদ্‌ উপায়ে অর্জিত অর্থ তথা মিথ্যাজীবিকার মাধ্যমে জীবন-যাপন করা অসম্ভব। তাদেরকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও সদ্‌ভাবে অবস্থান করতে হয়। বুদ্ধের সময়ে সাতান্ন হাজার গৃহী মার্গফল লাভী ছিল। তারাও সদ্‌ ব্যবসা এবং চাষাবাস করে জীবিকা নির্বাহ করেছিল। শাস্ত্রে দেখা যায়, যাদের সেইরূপ উপায়ে জীবিকা নির্বাহের কোন সুযোগ ছিল না তারা মার্গফলে প্রতিষ্ঠিত হবার সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুবরণ করেছিল। তবে তাদের সেই মৃত্যুবরণ কোন পরিহানির ইঙ্গিত বহন করে না বরং তারা মৃত্যুর সাথে সাথে স্বর্গলোকে অথবা মহা বিভব সম্পদের অধিকারী হয়ে জন্মগ্রহণ করতঃ অনন্ত সুখের ভাগী হয়েছিল। যা বেঁচে থাকলে তাদের পক্ষে লাভ করা সম্ভব হতো না। যারা সব সময় পঞ্চশীলধর্ম সযত্নে রক্ষা করে থাকে তাদেরকে চূল স্রোতাপত্তি বলা হয়। তারা মৃত্যুর পর স্বর্গে কিংবা মনুষ্যলোকে ধনী, উচ্চবংশে জন্মগ্রহণ করতঃ বিপুল সুখের ভাগী হয়। কোন প্রকার অধোগতি, নিম্নগামী হবার সম্ভবনা থাকে না।

পরিশেষে পূজ্য ভান্তে বলেন—অজ্ঞানী ব্যক্তির স্বভাব হল পরের ক্ষতিসাধন করা। তারা অপরকে লাঞ্ছিত, অপমানিত, রুঢ়বাক্য প্রয়োগ, গায়ের জোর প্রদর্শন করা সহ বিবিধ উপায়ে দুঃখ যাতনা দিতে পারাকে মহা আনন্দের ব্যাপার ও সুখ বলে মনে করে। বর্তমানে সেরূপ খারাপ কাজের মাধ্যমে তারা বীরদর্পে চলাফেরা করতে সক্ষম হলেও মৃত্যুর পর তার বিষময় বিপাকের ফলে নরকে পতিত হয়ে অনন্ত দুঃখের ভাগী হয়। কিন্তু জ্ঞানী ব্যক্তিরা কারোর অনিষ্ট, অহিত কামনা করে না। বরং পরের মঙ্গল কামনা, সুখ কামনা, উপকার সাধন ও সর্বজীবের প্রতি দয়াশীল হয়ে অবস্থান করে থাকে। এতে তাদের দিবা-রাত্রি পুণ্য বৃদ্ধি পায়, যার ফলে তারা ইহপরকালে সুখের ভাগী হয়। বুদ্ধের উপদেশ মত তোমরাও শত্রু-মিত্র সবাইকে সমানভাবে দয়া কর, কারোর ক্ষতিসাধন ও অমঙ্গল কামনা করবে না। উত্তমভাবেই ধর্মাচরণ কর, ধর্মচারী ব্যক্তির সুখ বৃদ্ধি পায়। ধর্মচারীকে ধর্মেই রক্ষা করে; ধর্মচারী ব্যক্তি কখনো চারি অপায়ে পতিত হয় না। ধর্মচারী ব্যক্তি ইহলোকে পরলোকে সুখে থাকেন।
তোমরা হীন, অনার্য কাজসমূহ হতে নিজকে দূরে সরে রাখ। কখনো অনার্য কাজে আত্মনিয়োগ করবে না। বরং শীলপালন কর, নিজকে পুণ্যকর্মে ব্যাপৃত রাখ তাহলে সুখ লাভে সমর্থ হবেই। আজকে বাংলা নববর্ষ উদ্‌যাপন উপলক্ষ্যে তোমরা যে দানাদি পুণ্যকর্ম ও পরিত্রাণ শ্রবণ করলে এগুলো কি জান? কুশলকাজ বা সদ্ধর্ম। আবার এই কুশলকাজ কেন করতে হয়? উন্নতি, শ্রীবৃদ্ধি ও সুখ লাভের জন্য। তাই তোমরা সবাই বলো “এই পুণ্যকর্মের দ্বারা আমাদের সর্বদা উন্নতি, শ্রীবৃদ্ধি সাধিত হোক। আমাদের কখনো অধোগতি, পরিহানি না ঘটুক।” সঙ্গে সঙ্গে তোমাদেরকে এই প্রতিজ্ঞা করা উচিত যে, এই নতুন বৎসরে আমরা অকুশলকার্য না করে কুশলকার্যই সম্পাদন করব। সেই পুণ্যকার্য যাতে আমাদের জন্য উন্নতি, সমৃদ্ধি ও সুখ বয়ে আনে। তজ্জন্য বলছি, তোমরা সর্বদা জ্ঞান এবং কুশলের সহিত অবস্থান করতে সচেষ্ট থাক। জ্ঞানের বল, কুশলের বল থাকলে সর্বদিকে জয়যুক্ত হওয়া যায়, সুখ লাভ হয়। অজ্ঞানের অন্ধকারে না থেকে তোমরা জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয়ে অবস্থান কর। অকুশলকর্ম পরিত্যাগ করে কুশলকর্ম সম্পাদন কর। মিথ্যাধর্ম বাদ দিয়ে সত্যধর্মে আত্মনিয়োগ কর। তাহলে তোমাদের সুখ শান্তি, উন্নতি, শ্রীবৃদ্ধি লাভ হবেই। মনে রাখতে হবে, সত্যধর্মে আত্মনিয়োগ করতে সক্ষম হলে জন্ম-জরা-ব্যাধি-মরণাদি দুঃখ হতে মুক্ত হতে পারবে। মনচিত্তের মধ্যে মিথ্যাধর্ম, অজ্ঞান থাকলে দুঃখ পেতে হয়। মনচিত্ত থেকে মিথ্যাধর্ম, অজ্ঞানকে বিদূরীত করতঃ জ্ঞানের সহিত অবস্থান করাই উত্তম। তোমরা সদা সর্বদা জ্ঞানের সহিত নিজকে পরিচালিত কর। এতে তোমাদের পরম সুখ অর্জিত হবে, উন্নতি হবে, শ্রীবৃদ্ধি সাধিত হবে। জ্ঞানই সকল সুখ, শান্তি, উন্নতি ও শ্রীবৃদ্ধির মূল। সেই জ্ঞান অর্জিত হয়ে তোমাদের যাবতীয় দুঃখ দূর হয়ে সুখ শান্তি, উন্নতি, শ্রীবৃদ্ধি হোক-এই আশীর্বাদ রইল।
                                                             সাধু, সাধু, সাধু

Tuesday, May 16, 2017

পূজ্য বনভন্তের ভবিষ্যত বাণী এবং কিছু কথা

পূজ্য বনভান্তের ভবিষ্যত বাণী এবং কিছু কথা
লিখেছেন-উজ্জ্বল বড়ুয়া বাসু
স্বীয় অন্তরের মধ্যে যেসব ভিক্ষুসংঘকে পরম শ্রদ্ধায় লালিত করি তাদের মধ্যে একজন হচ্ছেন পূজ্য সাধক সাধনানন্দ মহাস্থবির (বনভান্তে)।ভান্তেকে অরহৎ বা অরহৎ নয় সেই দৃষ্টিতে আমি দেখিনা, আমি দেখি তাকে বৌদ্ধ পুনর্জাগরণের এক পুরোধা হিসেবে। আর তাই আমার মনের সুপ্ত কুশল চেতনা পূরণ করতে গিয়ে যখন শ্মশানভূমি ধ্যানচর্চা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার কাজে হাত দিই তখন পূজ্য বনভান্তের নামে সেখানে একটি ধ্যান কুটির নির্মাণ করি। পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের দিনে তারই ৪১জন শিষ্যকে নিয়ে আসি ঐ কুটিরটি উদ্বোধন করার জন্য।
দিনটি ছিল ২০১১ সালের ০১ এপ্রিল।সেদিন শতাধিক ভিক্ষু উপস্থিত থেকে প্রার্থনা কক্ষ, চংক্রমণঘর সহ আরো দুটি ধ্যান কুটিরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করা হয়।এই অনুষ্ঠানটি করতে গিয়ে এক মহাবিপদে পড়ে যাই সেটা হচ্ছে- অনুষ্ঠানের আগের এক সপ্তাহ একটানা প্রতিদিনই কোন না কোন সময়ে বৃষ্টি হচ্ছে। আমরা করইয়ানগর গ্রামবাসী ০৫ হাজার মানুষের খাওয়া ও সদ্ধর্ম শ্রবণের জন্য সুব্যবস্থা করি। কিন্তু অনুষ্ঠানে যদি বৃষ্টি হয় তবে সব কিছুই পন্ড হয়ে যাবে প্রতিনিয়ত এই ভয় মনে কাজ করছিল আবার অনুষ্ঠানটির প্রস্তাব যেহেতু আমি-ই করেছিলাম তাই কোন কারণে পন্ড হলে কি হবে সেই ভেবে ভয়টা আমার মধ্যে একটু বেশী-ই কাজ করছিল।
যাই হোক মনে সাহস নিতাম এই বলে যে এতো বড় পুন্যময় কাজ করতেছি রক্ষা পাবোই কোন না কোন ভাবে। যাই হোক অনুষ্ঠানের আগের দিন রাতে সন্ধ্যা ০৭টা থেকে বৃষ্টি শুরু হল একটানা চলছেই এবার সবাই আশা ছেড়ে দিল যে পরদিন অনুষ্ঠান হবে না কারণ আমাদের পুরো আয়োজন ছিল জমির মধ্যে যেখানে পানি জমে যেত। একজন কিন্তু সে সময় অভয় দিল। তিনি আর কেউ নন পুজ্য বনভান্তে। রাজবন বিহারে একটা প্রথা ছিল যে পরদিন সকালে কোথাও যাওয়ার আগে রাতে শিষ্যরা ভান্তের সাথে দেখা করতেন অনুমতি নিতেন। এক্ষেত্রেও তাই হল পূজ্য ভান্তের কাছে শিষ্যরা গেল অনুমতি নিতে সাথে বৃষ্টির শঙ্কার কথাও উল্লেখ করলেন। পূজ্য ভান্তে তাদের জানালেন যে, রাত ১০টার পর হতে বৃষ্টি হবেনা তোমরা নিঃসঙ্কোচে যাও। বাস্তবেই তাই ঘটলো।
আর্য্যশ্রাবক বনভন্তে
আমাদের গ্রাম থেকে যে দুজন ব্যক্তি আনতে গিয়েছিলেন ভান্তেদের, তারাই খবর গুলো আমাদের জানালেন। বাস্তবেও তার হাতে নাতে প্রমাণ পাওয়া গেল। রাতে ১০টা পর্যন্ত এত বৃষ্টি হলো অথচ সকালে জমিতে কোন পানি নেই বললেই চলে। অনুষ্ঠানের দিন বৃষ্টি তো দুরে থাক প্রচন্ড রোদে যেন সবাই কাহিল হয়ে পড়লাম। সতিপট্ঠান সূত্র পাঠের পূর্বাহ্নে দেখি অনেকের হাতে পাখা গরমে অবস্থান করা দায়। অথচ যেই সুত্রপাঠ শুরু হল সাথে সাথে হঠাৎ করে এমন বাতাস আসলো যে পুরো পরিবেশই ঠান্ডা করে দিলো, সবাই নীরবে সূত্রপাঠ করলো।
অনুষ্ঠান শেষ হলো আমাদের চাওয়া অনুসারেই কোন বিঘ্নতা ছাড়াই। পূজ্য বনভান্তের সেইদিনের ভবিষ্যতবাণী তথা অভয় বাণীর কথা শুনলে আজো গায়ে শিহরণ জাগে। বর্তমানে দেখা যায় কতজন কত ভাবে পুজ্য ভান্তের প্রশংসার পাশাপাশি নিন্দাও করে। শুধু এটুকুই বলতে চাই বৌদ্ধ সমাজ বিনির্মাণে পুজ্য ভান্তের অবদান কখনোই ভুলার নয়, নিন্দুকেরা যতই নিন্দা করুক, বনভান্তে বর্তমান বৌদ্ধ সমাজের এক অদ্বিতীয় মহাপুরুষ। পুজ্য ভান্তের পাদমূলে নতশিরে বন্দনা জানাচ্ছি।

Monday, May 8, 2017

আত্মোপলব্ধি অবক্ষয়ের চেতনায় মানবতা


 আত্মোপলব্ধি অবক্ষয়ের চেতনায় মানবতা
শ্রীমৎ বীতশোক ভিক্ষু। পর্ব -১
জুরাছড়ি সুবলং শাখা বন বিহার।
মানুষ যতক্ষণ পর্য্যন্ত অর্থতঃভাবে সক্রিয় থাকবে ততক্ষণ তারা সুখী থাকবে, কিন্তু এই অর্থত যখন প্রকৃতির বিপর্যয় ধারা ধ্বংস বা নিধন হবে, তখন মানুষের আত্মহারার সময় আসবে। এতেই মানুষের দুঃখের সূচনা হবে।কারণ বর্তমান মানুষ বিভিন্ন অধ্যসাচী শিক্ষায় গর্বিত, মোহিত, বেহুঁশিত মননে ইষ্ট হয়ে তাঁদের কর্ম, চিন্তা, উপলব্ধি অবক্ষয় পথে চলেছে। বিজ্ঞান প্রযুক্তি পদ্ধতি এবং শিক্ষা পদ্ধতির অভিজ্ঞতা মানুষকে সৃজনশীলতা দান করলেও মানুষ বড়ই মনস্তাত্ত্বিক চাপে ঘাবড়েঁ আছে। আজ বিশ্ব মানব ধার্মিকতামূখী নয়। ধর্মের অস্তিত্ত্ব পুরোপুরি অস্বীকার করার প্রয়াসে এগোচ্ছে কালের কবলে দিন দিন। অধার্মিকতা হওয়ার বিশেষ কারণ একদিকে বিশ্বের শিক্ষা প্রাতিষ্ঠানিক অবদান এবং অন্যদিকে বিজ্ঞানপ্রযুক্তিবাদ। শিক্ষালব্ধ এবং শিক্ষামূখী উভয়ই মানুষ শিক্ষাকেতু হয়ে স্বীয় জ্ঞান,কৌশল, বুদ্ধি, ভাবকে সম্পূর্ণ দাপট হিসেবে ব্যবহার করাই ধর্মকে প্রধান আশ্রয় হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে না।তাঁরা ধর্মকে ব্যবহার করছে রাজনৈতিকতা, সামাজিকতা, এবং হুজুগে। আবার কিছু মানুষ মানবতার মুখ্যধারী হয়ে মানবতাকে প্রধান ধর্ম হিসেবে মেনে নিয়ে আত্মমুক্তি ধর্মের সদিচ্ছাভাব ভুলে গিয়েছে। ধর্মকে এই অর্থে শিক্ষিতকলমী মানুষেরা ব্যবহার করে না যে, ধর্ম মানে প্রকৃত সুখবোধ উপলব্ধি চেতনা বা আত্মমুক্তি। যা আত্মপাপ নিস্কৃতি করা প্রকৃত মনন বোধ। একজন শিক্ষিত মানুষ যদি শিক্ষাকে মানবীয় মূখ্য আশ্রয়  হিসেবে মেনে নেন তাহলে বিশ্ব-ব্রম্মাণ্ড ভূ-পৃষ্ঠে ধর্মপ্রবর্তক গুরুকে মানা হবে কেন?  এজন্য শিক্ষিত সমাজের মানুষরা ধর্মবাদ নিষ্প্রয়োজনবোধ মনে করছে।। অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানগত শিক্ষানুগ মানুষের অনুসারে ধর্ম ব্যবহার চলে না। সেক্ষেত্রে কিছু শিক্ষিত মানুষ চিন্তা করে,  আসলে ধর্ম অজ্ঞ লোকদের জন্য অগ্রগামী। তাঁদের জোঁড়ালো বিশ্বাস- শিক্ষায় মানুষের সবকিছু সমাধান দেবে। এজন্য শিক্ষিতরা ধর্মানুরাগে বিশ্বাস বঞ্চিত হওয়া থেকে দিন দিন ব্যাপক হারে বৃদ্ধি হতে চলেছে। তাঁদের সংখ্যা নাস্তিক্যবাদ। কিন্তু শিক্ষিত মানুষ এই ধারণা থেকে বঞ্চিত যে, বিশ্বব্যাপী যে শিক্ষা প্রচলিত রয়েছে, সেখানে মোহের অন্ত নয় বরং এ শিক্ষা বিশ্বব্যাপী মানুষের হুমকির ছালে চ্যালেঞ্জিং।।যিনি   শ্রাদ্ধভাব গুরু থেকে শিক্ষা নিয়েছেন, সেই গুরু অন্য বিদ্যায় আগ্রহী। তার মানে গুরুর মোহও শেষ নহেতু গুরুও এখনো শৈক্ষ্য। এ থেকে বুঝা যায়, শিক্ষা মানুষের অন্ধত্ব নিবৃতি করে না। ধর্মই মানুষের অন্ধত্ব নিরসন করতে পারে। তবে কেন ধর্মের উর্ধ্বে মানুষ নিজেকে প্রতিপত্তিত্ব করবে? সেথা আসল ব্যক্তিত্ব প্রকাশ পায় না। এজন্য মানুষের স্বীকার করতে হবে বরং ধর্মহীন ব্যক্তি নিকৃষ্ট মানব। মানবীয় চেতনা থেকে বঞ্চিত। আমরা যদি ধর্মের দিক দিয়ে প্রাণীগুলোকে গবেষণা করি, অবশ্যই দেখতে পায়, তির্য্যকপ্রাণীদের ধর্ম বিশ্বাস মনোন্দ্রিয় সক্ষমতা নেই। কারণ বুদ্ধের যুক্তিতে তির্য্যকপ্রাণীরা অহেতুক প্রাণ।"( মানবের মতো ধর্ম, সংস্কৃতি,জ্ঞানাভ্যাস জনন ঈন্দ্রিয় ক্ষমতা ইতর প্রাণীগুলোর নেই-তাই অহেতুক)" মানবদের হেতুপূর্ণ বিজ্ঞান ইন্দ্রিয় সংবলিত- চিন্তন,মনন, বিজানন ক্ষমতা আছে বলে ধর্মবোধ শক্তি প্রয়োজন আছে। তবে ইতররা চিন্তন, মনন, বিজানন চেতনাশক্তিতে পঙ্গু ইন্দ্রিয়। যা আছে তা খুব দুর্বল।
পরম পূজ্য বনভন্তে


 মানুষ আত্মহারা হয় কেন?
    মানবীয় বোধে প্রত্যেক মানুষের স্বকীয়তা সুস্বভাব  ও সম্মান রক্ষার আত্মবোধ প্রভাব আছে। যাঁরা মানবীয়(Human) চেতনায় অগ্র তাঁদের জীবন এতই সুন্দর যে, মনে হয় মানুষের মাঝে সেই মানুষটি প্রকৃত মানুষের মনটি খুঁজে পেয়েছেন, তাই তিনি সুখী। তবে ধর্মাবোধ মাধ্যমে সুখী থাকা আর মানবতাবোধ নিয়ে সুখী থাকা তফাৎ আছে। আমরা বুঝি, ধর্মই মানুষের মনের মাত্রাসমষ্টি যেমন- পাপ, দুশ্চিন্তা,উদ্বেগ,মনস্তাপ, অশান্তি,আসক্তি, ক্লিষ্ট, ইত্যাদি থেকে চিরতরে মুক্তি দিয়ে সর্বশেষ সুখীবোধ লাভ করে আত্মস্বস্তি, আত্মসন্তুষ্টি ও আত্মসুখের মন গঠন করে। মানবতার সুখ সাময়িক দুশ্চিন্তার নিবৃতি মাত্র। মানবীয় সমষ্টিগত চিন্তার মধ্যে দিয়ে মানুষের যে সুখ উৎপন্ন হয় তা সময়, কাল, ও ঋতুগত এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে পরিবর্তন হতে পারে। কারণ ইন্দিয়জাত স্পৃহা জনিত মানসিক সম্পূর্ণ পরিবর্তনের সাথে মিল আছে। তবে মানবতার চেতনা যাঁর স্বভাবগত হোক, জ্ঞানলব্ধ জনিত হোক, অথবা পরোপকার বশতঃ হোক মানব শব্দটি নিয়ে মানবতা। প্রকৃত মানবের চিহ্ন মানবতাভাব। মানবতার আত্মোপলব্ধি দ্ধারা মানুষ সদ্ ভাব বঝায় রাখতে পারেন।। এই সদ্ ভাবের অভাব থাকলে মানুষ মান-যশঃ- সম্মান থেকে বঞ্চিত থাকেন। অসম্মান-অযঃশ- অগ্রাহ্যত কারণে মানুষের আত্মোপলব্ধি অবক্ষয় হতে পারে। আর আমি আত্মাহারা শব্দটি কেন ব্যবহার করেছি! এটা এ অর্থে যে, ভৌগলিকগত মানুষগুলোর জীবিকার একমাত্র স্বার্থ হচ্ছে- আর্থিক, স্বাস্থ্য, শিক্ষা,চিকিৎসা, বাসস্থান এই পাচটির সুবিধাপুষ্ট সুখের তাগিদে জৈবিক পরিতৃপ্তির কারণ। কিন্তু এগুলো পৃথিবীর প্রাকৃতিক নিয়মের বিধানে অবধারিত। প্রকৃতির নিয়মের ঋতু যখন সঠিক নিয়মে চলে তাহলে বিজ্ঞানপ্রযুক্তির উপাদান, কৃষিবিদের উপাদান, অর্থনৈতিকের উপাদান, স্বাস্থ্যগত উপাদান ইত্যাদি সবকিছুর উপাদানের চাহিদাও সঠিক পর্যায়ে চলবে। আর্থিকভাবে অভাব জনিত মানুষের আত্মহারার শেষ নেই। অভাবী মানুষের আত্মোপলব্ধি ক্ষমতা হ্রাস পায়। মস্তিস্কের কাজও গোঁছালো হয় না। এতে আত্মশক্তি অগোঁছালো জনিত কারণে মনের মাত্রা অসঠিক ধ্যান-ধারণায় সমুদ্ধত হয়।
 শিক্ষালব্ধ জ্ঞান এবং ধর্মীয় জ্ঞান উভয়ই জ্ঞান কি মানবতার প্রতীক?
 আমরা জানি, শিক্ষা কখনো মানুষের জ্ঞান, চিন্তা, ভাব, বুদ্ধি, কৌশল এবং অভিজ্ঞতাকে একমূখী প্রভাব ফেলে না। একটি বিষয় বা একটি কাজকে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে বুঝতে এবং প্রয়োগ করতে যে অভিজ্ঞতা ব্যবহার করি তা হচ্ছে শিক্ষালব্ধ ধারণার কারণে। আমি মনে করি, এই বোধেচ্ছার অবদানে শিক্ষার মান কম নয়। শিক্ষা বরংশ একমূখী জ্ঞানকে ভিন্নখাতে বিশ্লেষণ করার শক্তি-প্রয়াস প্রদান করে। আমি উপরে যে বিষয়ালোকে বলে এসেছি, আমি কিন্তু শিক্ষাকে অসর্থন দিতে কোন যুক্তি উপস্থাপন করতে চাইনি। শিক্ষা মানব জাতির প্রারূঢ় স্তম্ভ।  আমি বুঝাতে চেষ্টা করেছি, শিক্ষিত মানুষের অধার্মিক গতিপথ অযৌক্তিক এবং অবাঞ্চিত। প্রত্যেক জাতি মানুষের শিক্ষার মূল্যায়নত্ব থাকতে হবে। কেননা ইহা মানসিক বিপ্লবে গড়াঁ চৌমূখী চেতনার জাগরণী বার্তা।
ধর্ম এবং শিক্ষার গুণের মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য নেই। বিজ্ঞান এবং বৌদ্ধধর্মের দর্শনের মধ্যে যেমন বেশি দুরত্ব নেই। ঠিক তেমনি শিক্ষা ও ধর্মের মধ্যে পার্থক্যও সামান্য। শিক্ষাখাতের গুণ যেমন- একটি কাজকে ভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করা আর ধর্মের গুণ হচ্ছে- সেই কাজকে একই পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করে হিতকর অর্থে মূল্যায়ন করে পূর্ণাঙ্গ সুবিধা লাভ করা। তবে শিক্ষার পদ্ধতির উদ্দেশ্যে হচ্ছে কাজের অভিজ্ঞতাকে জনস্বার্থ ও নিজের স্বার্থে প্রভাব ফেলা। ধর্মের উদ্দেশ্য হচ্ছে একটি স্বার্থহীন সুবিধায় কাজকে রুপান্তর করা। একই মূল্যায়নে মানবতার কাজেও শিক্ষা এবং ধর্ম  সেবা প্রদান করে।
পর্ব- ১