জ্ঞানই সকল প্রকার সুখের মূল
শুভ নববর্ষ ১লা বৈশাখ ১৪০৮ বাংলা, ১৪ই এপ্রিল ২০০১ সাল, রোজ শনিবার। রাজবন বিহারে অনুষ্ঠিত সার্বজনীন সঙ্ঘদান, অষ্ট পরিস্কারদান ও পরিত্রাণ শ্রবণ অনুষ্ঠানে শ্রদ্ধেয় শ্রীমৎ সাধনানন্দ মহাস্থবির (বনভান্তে) মহোদয় সদ্ধর্ম দেশনা প্রদানকালে বলেন—সত্যপ্রিয় নামক জনৈক এক ভিক্ষু বলেছিলেন, দায়কেরা যদি আমাকে উত্তমরূপে চারি প্রত্যয়ের ব্যবস্থা করে দিতো আমি প্রব্রজ্যা ত্যাগ করতাম না। দায়কেরা আমাকে সে সব ব্যবস্থা করে দেয় নাই বলে প্রব্রজ্যা ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছি। আচ্ছা, এ কথা কি ঠিক? দায়কদের অভিমত হল সে নিজে ত্যাগের শিক্ষায় প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারে নাই এবং তার যদি পুণ্য পারমী না থাকে তাহলে আমাদেরকে দোষ দিয়ে কি লাভ হবে। স্বীয় কর্মের দোষেই সে ব্যর্থ হয়েছে আর আমাদের দোষ কোথায়। সত্যিই পুণ্যশক্তি ও জ্ঞানশক্তির অভাব হলে প্রব্রজিত হয়ে অবস্থান করা যায় না। মনে রাখতে হবে, বৌদ্ধধর্ম জ্ঞানীদের ধর্ম। অজ্ঞানী, হীন কাপুরুষের জন্য বৌদ্ধধর্ম নয়। অজ্ঞানীরা কিছুতেই এ’ধর্মের কূল কিনারা খুঁজে পায় না। বৌদ্ধধর্মের চরম ও পরম লক্ষ্য দুঃখমুক্তি নির্বাণ শুধুমাত্র জ্ঞানী ব্যক্তিরাই প্রত্যক্ষ করতে পারে। তাই যাদের মনচিত্তে জ্ঞান বিদ্যমান থাকে তাদের জন্য বৌদ্ধধর্ম সহজসাধ্য ও সুখের। তারা অনায়াসে এ’ ধর্মের মূলতত্ত্ব উপলব্ধি করতে পারে তথা বৌদ্ধধর্মের অত্যন্ত গভীরে প্রবেশ করতে সক্ষম। কিন্তু যাদের চিত্তে জ্ঞান নেই তাদের জন্য বৌদ্ধধর্ম দুর্ভেদ্য ও সুকঠিন। বর্তমান অকুশল কার্যকলাপে রত দায়ক দায়িকাদের উদ্দেশ্যে বনভান্তে বলেন, তোমরা অজ্ঞান বলেই এসব পাপকর্ম সম্পাদন করতেছ। তা না হলে এত অনার্য কাজ করেও কিভাবে নিঃসঙ্কোচে জনসমাজে বিচরণ করতেছ? তোমাদেরকে দেখলেও তো আমার লজ্জা পায়। কিন্তু তোমরা অজ্ঞানী বলেই পাপের প্রতি লজ্জাহীন ও ভয়হীন হয়ে অবস্থান করতেছ। তবুও আমি বলছি, তোমরা পাপকর্ম সম্পাদন করাকে লজ্জা ও ভয়রূপে দর্শন করতে সচেষ্ট থাক এবং অতিসত্বর নিজকে অকুশলকর্ম হতে বিরত রাখ। নচেৎ এরূপ পাপকর্মে নিয়োজিত থাকলে আগামী দশ/বার বৎসরে তোমাদেরকে আরো অনেক বেশি করুন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবেই। মনে রাখবে যারা অকুশলকর্মে লজ্জা ও ভয়শীল তাদের দ্বারা আর অকুশলকর্ম সম্পাদিত হয় না। এবং তারা নিম্নগামী না হয়ে দিন দিন ঊর্ধ্বগামীই হয়ে থাকে। ভগবান বুদ্ধ বলেছেন, যারা অকুশল পাপের প্রতি লজ্জা ও ভয়শীল তাদের নিকট অকুশল থাকতে পারে না; তারা অরহত্ব পর্যন্ত লাভ করতে পারে। কারণ অকুশল-পাপে লজ্জী এমন মহাপুরুষ জগতে দুর্লভ। তোমরা যত অকুশল পাপে লজ্জাশীল হবে ততই পাপকর্ম সম্পাদন করা হতে নিজকে মুক্ত রাখতে পারবে। অর্থাৎ তোমাদের নিকট পাপ আসতে পারবে না। ফলে সুখ শান্তি লাভ হবে। অন্যদিকে যত অকুশল পাপে লজ্জাহীন হবে ততই তোমাদেরকে পাপ অকুশলে গ্রাস করে ফেলে অসহ্য দুঃখ প্রদান করবে। তাই বলা হয়েছে “লজ্জা-ভয় দুই এই লোকের পালক। না থাকলে এ’দুই সমান তীর্যগ।” লজ্জা-ভয় না থাকলে কেহ মনুষ্য বলে গণ্য নয়।” “লজ্জা-ভয়হীন মানুষ পশু সমতুল্য। শুকর যেমন মানুষের পরিত্যক্ত মল ভক্ষণে কোনরূপ ঘৃণাবোধ করে না, লজ্জিত হয় না, তেমনি লজ্জা ও ভয় হীন মানুষ অকুশল পাপকর্ম সম্পাদনে কোন প্রকার দ্বিধাবোধ করে না। এতে তাদের না থাকে লোক ভয়, না থাকে নরক ভয়। লজ্জাও ভয়শীল মানুষ কখনো পাপকাজ করতে পারে না। এ’দুই গুণ স্বভাবতই লোককে পাপ থেকে নিবৃত্ত করে। এমন মানুষ সর্বদা পবিত্রভাবে জীবন-যাপন করে। পাপকর্মের প্রতি লজ্জায় এবং পাপের পরিণামের ভয়ে তারা পাপাচরণ করে না, পাপ থেকে দূরে থাকে। মনে রাখতে হবে, যেই ব্যক্তি দুঃখকে ভয় ও অকুশল পাপকে ঘৃণা করে সে নির্বাণ লাভ করতেও সক্ষম হয়। তজ্জন্য বলছি, তোমরা দুঃখের প্রতি ভয়শীল এবং পাপের প্রতি লজ্জাশীল হয়ে অবস্থান কর। যারা দুঃখকে ভয় করে না, এবং পাপকে ঘৃণা (লজ্জা) করে না তাদের জন্য নরকের রাস্তা সর্বদা উন্মুক্ত থাকে। মন্ত্রী (বর্তমানে সাবেক) কল্পরঞ্জন চাকমাকে লক্ষ্য করে বনভান্তে বলেন, কল্পরঞ্জন একদিন আমাকে বলেছিল ‘ভান্তে আমি স্বর্গে যেতে চাই।’ আমি তাকে বলেছিলাম তাহলে তুমি কারোর প্রতি রাগ করতে পারবে না, মিথ্যাবাক্য ভাষণ করতে পারবে না এবং কৃপণ হতে পারবে না। শুধু কল্পরঞ্জন চাকমাকে নয় তোমাদের সবাইকে বলছি, তোমরা রাগী, মিথ্যুক ও কৃপণ হবে না। যারা রাগী, মিথ্যুক ও কৃপণ তারা স্বর্গে যেতে পারে না। স্বর্গ সুখ লাভ করতে হলে তোমাদেরকে রাগ ত্যাগ করতে হবে, মিথ্যাবাক্য ভাষণ করা হতে নিজকে বিরত রাখতে হবে এবং চিত্ত থেকে কৃপণতা ভাবকে বিদূরীত করতে হবে। বুদ্ধ বলেছেন যারা ক্রোধহীন তারা স্বর্গপরায়ণ, যারা মিথ্যাবাক্য বলে না তারা স্বর্গপরায়ণ, যাদের অন্তরে কৃপণতা নেই তারা স্বর্গপরায়ণ। তোমরা যদি স্বর্গে যেতে চাও তবে রাগ করতে পারবে না, মিথ্যাবাক্য ভাষণ করতে পারবে না এবং কৃপণ হতে পারবে না। ইহাই স্বর্গ সুখ লাভের রাস্তা। মনে রাখবে স্বর্গ সুখ লাভের প্রত্যাশীগণকে এই রাস্তায় এগিয়ে যেতে হবে।
পূজ্য বনভান্তে আরো বলেন—আমি তো দেখছি তোমরা সবাই সীমাহীন দুঃখের মধ্যে রয়েছ। সেই দুঃখ হতে কবে তোমাদের ত্রাণ লাভ হবে জান? যখন তোমাদের ধর্মজ্ঞান, ধর্মচক্ষু, উদয় হবে। ধর্মজ্ঞান, ধর্মচক্ষু কিভাবে উদয় হয়? সর্বদা অলোভ, অদ্বেষ, অমোহের সহিত অবস্থান করলে ধর্মজ্ঞান উদয় হয়। যারা লোভমুক্ত, হিংসামুক্ত ও অজ্ঞানমুক্ত তথা লোভ, হিংসা, অজ্ঞানের সহিত চালিত হয় না তাদের ধর্মজ্ঞান ও ধর্মচক্ষু উদয় হয়ে থাকে। এভাবে ধর্মজ্ঞান ধর্মচক্ষু উদয় হলে তখন আর কোন দুঃখ থাকে না। অনাবিল নির্বাণসুখ উপলব্ধি হয়। একবার সাধন তালুকদার আমাকে প্রশ্ন করেছিল ‘ভান্তে আপনি তো সংসার ধর্মে আবদ্ধ হননি,আপনি কিভাবে সংসারী জীবন-যাপন করাকে দুঃখ বলে জানলেন?’ আমরা স্ত্রী, পুত্র-কন্যার সহিত সংসারী জীবন-যাপন করতেছি। সেটা যদি দুঃখময় হয় থাকে আমরা না হয় তা জানব; আপনি জানলেন কিরূপে? আমি বললাম হ্যাঁ আমি সংসারী হই নি একথা ঠিক। তবে সংসারী না হয়েও সেটা জানার উপায় রয়েছে। যেমন ধর তোমার হাতটা আগুনে পুড়ে গেছে। এবং সেই ক্ষতস্থানে সামান্য আঘাত পেলেই তুমি ছট্পট্ কর, ব্যথার জ্বালায় কাতর হয়ে পড়। তোমার সেই দুঃখময় অবস্থা দেখে অন্যজনেরা কি দুঃখ জানতে পারবে না? নিশ্চয় পারবে। আর তাদের স্বীয় হাত যাতে পুড়ে না যায় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকবে। ঠিক তদ্রূপ,আমিও সেইরূপে তোমাদের সংসারী জীবনের দুঃখ-কষ্টময় ঘটনাবলী দর্শন করে সংসারী জীবনের দুঃখ অনুভব করি, দুঃখ দর্শন করি এবং দুঃখ বলে জানি। সঙ্গে সঙ্গে আমাকে যাতে সেই দুঃখের বিভীষিকাময় অগ্নিতে পক্ক হতে না হয় তজ্জন্য সদা সতর্কতার সহিত অবস্থান করে থাকি। ভিক্ষুদেরকে এইরূপে গৃহীদের দুঃখময় সংসারী জীবন-যাপন দেখে তাতে বীতশ্রদ্ধ হয়ে অবস্থান করতে হবে।
ভগবান বুদ্ধ বলেছেন, তোমাদের এতো দুঃখ কেন? এসো আমি তোমাদেরকে শান্তির সন্ধান দিতেছি। সেই দুঃখ কি? জন্ম দুঃখ, জরা দুঃখ, ব্যাধি দুঃখ, মরণ দুঃখ, অপ্রিয় সংযোগ দুঃখ, প্রিয় বিয়োগ দুঃখ, ঈপ্সিত বস্তুর অলাভ দুঃখ। তার উপর অন্ন-বস্ত্র, অর্থ-বিত্তের অভাবজনিত দুঃখসহ স্বামী-স্ত্রীতে, পুত্র-কন্যার সাথে মতবিরোধ, কথাবার্তায় অমিল; আত্মীয়-স্বজন; পাড়াপ্রতিবেশীর সহিত দ্বন্দ্ব-কলহ, মনোমালিন্য ইত্যাদি হাজারো প্রকার দুঃখ রয়েছে। বুদ্ধের মত অনুসারে দেহধারণ এবং জন্মগ্রহণ করার দরুন এসব দুঃখ ভোগ করতে হয়। দেহধারণ ও জন্মগ্রহণ করার হেতু নিরুদ্ধ হলে এইসব দুঃখেরও পরিসমাপ্তি ঘটে যায়। কেন দেহধারণ ও জন্মগ্রহণ করতে হয়? অবিদ্যার কারণে। সুতরাং অবিদ্যাতে বিদ্যা উৎপত্তি দ্বারা দেহধারণ এবং জন্মগ্রহণ করার হেতু সম্পূর্ণরূপে নিরোধ করতে পারলে যাবতীয় দুঃখরাশি নিরোধ হয়ে যায়। তাহলে দেখা যাচ্ছে অবিদ্যার কারণে তোমরা দুঃখ পাচ্ছ। দুঃখ হতে মুক্তির উপায় খুঁজে পাচ্ছ না। সেই অবিদ্যার মূলোচ্ছেদ করে বিদ্যা উৎপত্তি করতে পারলে যাবতীয় দুঃখের পরিসমাপ্তি ঘটবে, শান্তির সন্ধানে মিলবে। বিদ্যা বা জ্ঞানের সহিত সদ্ধর্ম আচরণে সুখ লাভ হয়। কাজেই, সুখের লাভের জন্য তোমরা সদ্ধর্ম আচরণ কর। অবিদ্যার অন্ধকারে নিমজ্জিত না থেকে জ্ঞানের আলোয় এসো তাহলে অবশ্যই তোমাদের সুখের, শান্তির সন্ধান মিলবে। জ্ঞানের সহিত চালিত হয়ে অমারভুবনে থাকলে সুখ লাভ হয়, কিন্তু অজ্ঞানের সহিত চালিত হয়ে মারভুবনে থাকলে সীমাহীন দুঃখ কষ্টের মধ্যে থাকতে হয়। তাই বলছি, তোমরা অজ্ঞানের অন্ধকারজগত এই মারভুবনে না থেকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত অমারভুবনে চলে এসো। এখানে কোন প্রকার দুঃখ, অশান্তি নেই, রয়েছে অনাবিল শান্তি সুখের পূর্ণ গ্যারান্টি।
তোমরা সৎ উপায়ে জীবন-যাপন কর, অসৎ উপায়ে জীবন-যাপন করবে না। কখনো পঞ্চ নিষিদ্ধ বাণিজ্যে নিজকে নিয়োজিত করবে না। সেই পঞ্চ নিষিদ্ধ বাণিজ্য কি? মৎস্য, মাংস, (বা প্রাণী) অস্ত্র, সুরা (মাদক দ্রব্য), বিষের ব্যবসা। এসব বাণিজ্য দ্বারা সবসময় পাপ উৎপন্ন হয় দুঃখ উৎপন্ন হয়। বুদ্ধের উপদেশ মত পঞ্চ নিষিদ্ধ বাণিজ্যের মাধ্যমে জীবন-যাপন না করে যা অন্য প্রাণী দুঃখ বিরহিত ও অকুশল বর্জিত পবিত্র নির্দোষ সেরূপ সৎ উপায়ে জীবিকা নির্বাহ করতে সচেষ্ট থাক। একদিন জ্যোতিসার আমাকে বলেছিল ‘ভান্তে আজকে আমাদের গমন পথে ভেদভেদী এলাকায় কয়েকজন মহিলাকে শন বোঝাই করে এনে বাজারে বিক্রি করতে দেখেছি’। তাদেরকে দেখে আমার ভীষণ লজ্জা লেগেছিল। আমি বললাম-কেন, বাজারে শন বিক্রি করতেছে সেখানে লজ্জা কিসের? তারা তো অন্যায় কাজ করতেছে না; চুরি-ডাকাতি, চাঁদাবাজি, চোরাচালানি কিছুই করতেছে না। কালক্রমে গরিবকুলে জন্মগ্রহণ করলে জীবন বাঁচানোর তাগিদে শন বিক্রি করতে হবে, কাঠ বিক্রি করতে হবে এটা স্বাভাবিক। ভবচক্রে কখনো গরিব, কখনো মহাধনীকুলে জন্মগ্রহণ করতে হয় কর্মানুসারে। শাস্ত্রে দেখা যায়, বোধিসত্ত্ব অবস্থায় বুদ্ধ নিজেও শন, কাঠ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেছিলেন। তদুপরি শন, কাঠ, বাঁশ বিক্রি করলে তো পাপ হয় না। তৎদ্বারা অকুশল উৎপন্ন হয়ে নিম্নগামী হবার কোন সম্ভাবনা নেই; মরণের পর চারি অপায়ে পতিত হবার কারণও নিহিত নেই। কাজেই আমি তাদের জীবিকাকে সম্যক জীবিকা বলব। শন, কাঠ, বাঁশ বিক্রি না করে তারা যদি নদীতে জাল ফেলে মাছ বিক্রি করত, বন্যপশু শিকার করে মাংস বিক্রি করত এবং মদ তৈরি করে বিক্রি করত তাহলে লজ্জা পাওয়ার কারণ থাকত-তোমার। যেহেতু ঐসব জীবিকাসমূহ মিথ্যা জীবিকার অন্তর্গত ও বুদ্ধ কর্তৃক গর্হিত, নিন্দিত কাজ। বলা যায়, কেহকে চুরি, ডাকাতি, মাস্তানী, সন্ত্রাসী, চোরাচালানী সহ অস্ত্র ব্যবসা এবং মৎস্য, মাংস, মদ-গাঁজা-হেরোইন বিক্রির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতে দেখলে তবেই আমি লজ্জা পেতাম। যেহেতু সে সব ব্যবসার মাধ্যমে বর্তমানে আর্থিক স্বাচ্ছল্যের সহিত জীবন-যাপন করতে সক্ষম হলেও মৃত্যুর পরজন্মে ভয়ানক দুঃখ ভোগ করা ছাড়া অন্য গত্যন্তর থাকে না। তাদেরকে নরক, প্রেত, অসুর, তির্যককুলে জন্মগ্রহণ করতঃ অনন্তকাল ব্যাপীদুঃখ ভোগ করতেই হবে। যারা গরিবকুলে জন্মধারণ করেও উত্তমকার্য এবং সদুপায়ে জীবন-যাপন করে তাদের ঊর্ধ্বগতি সুনিশ্চিত। তাই তোমরা সব সময় সদুপায়ে জীবন-যাপনে তৎপর থাক। অসুদপায়ে জীবন-যাপন করা হতে নিজকে বিরত রাখ।
তিনি বলেন—আজকাল অনেক নর-নারী আমার নিকট এসে চাকুরি লাভের জন্য আশীর্বাদ প্রার্থনা করে। আমি তাদেরকে বলি-আচ্ছা, তোমাদের যদি প্রভূত সম্পত্তি, কোটি টাকা থাকত চাকুরির জন্য আশীর্বাদ প্রার্থনা করতে কি?। করতে না। তখন চাকুরি করার প্রয়োজন হয়ে পড়ত না। সেই সম্পত্তি কিভাবে উৎপন্ন হয় জান? বুদ্ধ বলেছেন, শ্রদ্ধা সর্বসম্পত্তি উদয়ের আদি ভূমি। একমাত্র শ্রদ্ধার বলেই সম্পত্তি উৎপন্ন হয়ে থাকে। সেই শ্রদ্ধা কি? কর্মফলের প্রতি বিশ্বাস এবং চারি আর্যসত্যের প্রতি বিশ্বাস। কারণ যাদের কর্মফলের প্রতি বিশ্বাস থাকে তারা অকুশলকর্ম সম্পাদন করতে পারে না। বরঞ্চ সর্বদা শীলাচারণই করে থাকে। আর সেই শীল পালনের ফলে নতুন সম্পত্তি লাভ হয়। অন্যদিকে চারি আর্যসত্যে বিশ্বাস করা মানে বুদ্ধকে বিশ্বাস করা। বুদ্ধকে বিশ্বাস করলে পাপ করা যায় না। তোমরা যতই বুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে ততই সম্পত্তি লাভ হবে। আর যত বুদ্ধকে (বুদ্ধের জ্ঞানকে) অবিশ্বাস করবে ততই সম্পত্তি হ্রাস পাবে, দিন দিন গরিব হতে হবে। আমার বাস্তব অভিজ্ঞা থেকে বলতে পারি, আমি বুদ্ধের প্রতি গভীর বিশ্বাস বা শ্রদ্ধা রেখে আর্যমার্গ অনুসরণ করেছি বলে বর্তমানে আমার এরূপ ফলাফল অর্জিত হয়েছে। বুদ্ধের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা অটুট রাখতে না পারলে এসব জ্ঞান সম্পত্তি লাভ করা সম্ভব হতো না। বুদ্ধ রতন সূত্রে বলেছেন, ইহলোকে বা পরলোকে অথবা স্বর্গলোকে যা কিছু মূল্যবান রত্ন (সম্পদ) আছে; এদের কোনটিই বুদ্ধ রত্নের সমান নহে। তাই তোমরা যদি বুদ্ধের ভাষিত উপদেশে গভীর শ্রদ্ধাশীল হয়ে অকুশলকর্ম হতে নিজকে বিরত রেখে কুশলকর্মে আত্মনিয়োগ কর তাহলে বুদ্ধ রত্ন থেকে সম্পত্তি উদয় হবেই। যেই স্ত্রী বা পুরুষের চিত্তে শ্রদ্ধা বিদ্যমান থাকে সেই দরিদ্র নহেন, তার জীবন অব্যর্থ। তারা কর্মফল, পরকালের প্রতি অনুপ্রাণিত হয়ে সর্বদা কুশলে নিয়োজিত হওত অতিসত্বর ধন সম্পদের মালিক হতে সক্ষম হয়। তাদের ক্ষেত্রে বেশি পরিমাণ শষ্য উৎপন্ন হয়; ব্যবসা-বাণিজ্যে লোকসান না হয়ে সর্বদা লাভ হয়, আর বন্ধু-বান্ধব ও পাড়া প্রতিবেশীরা সব সময় সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। এবম্বিধ বহু উপায়ে তাদের সর্বদা উন্নতি, শ্রীবৃদ্ধিই লাভ হয়ে থাকে।
নির্বাণ লাভের চারটি সোপান। স্রোতাপত্তি সোপান, সকৃদাগামী সোপান, অনাগামী সোপান এবং অরহত সোপান। তোমরা গৃহীদের মধ্যে কেহ যদি স্রোতাপত্তি মার্গফল লাভ কর তাহলে আর চাকুরি করতে পারবে না, চাকুরি ছেড়ে দিতে হবে। কারণ চাকুরি করা এটা অধীন কাজ। স্রোতাপত্তি লাভীগণ কারোর অধীনে থাকতে পারে না। তবে স্রোতাপত্তি লাভীগণ কিভাবে জীবিকা নির্বাহ করবে? তারা স্বাধীন কাজ চাষবাদ এবং ব্যবসা বাণিজ্যের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। নিজেদের পর্যাপ্ত পরিমাণ ধান্য জমি ও বাগান বাগিচায় স্বয়ং নিজে অথবা চাকর-বাকর দ্বারা শস্য উৎপাদন করে জীবিকা নির্বাহের মাধ্যমে সুশৃঙ্খল জীবন-যাপন করবে। ব্যবসা বলতে আবার ছোটখাটো ব্যবসা যা দেখতে খুব নগণ্য, যেমন মুদির দোকান, শাক-সবজির ব্যবসা ইত্যাদির ধরনের করাও চলবে না। উন্নত মানের ও প্রশংসনীয় ব্যবসা যেমন—ঘড়ি তথা ইলেকট্রনিক দ্রব্য সামগ্রীর দোকান, চশমা, পোশাক পরিচ্ছেদের দোকান, মিল, ফ্যাক্টরী খুলে পরিচালনা করা ইত্যাদি মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করা চায়। বলা বাহুল্য, পঞ্চ নিষিদ্ধ বাণিজ্যে তো কল্পনাই করা যাবে না। যদি সেইরূপ ব্যবসা ও চাষাবাসের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ না থাকে তাহলে সকালে স্রোতাপত্তি লাভ করার পর বিকালেই মৃত্যুবরণ করতে হবে। কারণ স্রোতাপত্তি লাভীদের পক্ষে চাকুরি ও অসদ্ উপায়ে অর্জিত অর্থ তথা মিথ্যাজীবিকার মাধ্যমে জীবন-যাপন করা অসম্ভব। তাদেরকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও সদ্ভাবে অবস্থান করতে হয়। বুদ্ধের সময়ে সাতান্ন হাজার গৃহী মার্গফল লাভী ছিল। তারাও সদ্ ব্যবসা এবং চাষাবাস করে জীবিকা নির্বাহ করেছিল। শাস্ত্রে দেখা যায়, যাদের সেইরূপ উপায়ে জীবিকা নির্বাহের কোন সুযোগ ছিল না তারা মার্গফলে প্রতিষ্ঠিত হবার সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুবরণ করেছিল। তবে তাদের সেই মৃত্যুবরণ কোন পরিহানির ইঙ্গিত বহন করে না বরং তারা মৃত্যুর সাথে সাথে স্বর্গলোকে অথবা মহা বিভব সম্পদের অধিকারী হয়ে জন্মগ্রহণ করতঃ অনন্ত সুখের ভাগী হয়েছিল। যা বেঁচে থাকলে তাদের পক্ষে লাভ করা সম্ভব হতো না। যারা সব সময় পঞ্চশীলধর্ম সযত্নে রক্ষা করে থাকে তাদেরকে চূল স্রোতাপত্তি বলা হয়। তারা মৃত্যুর পর স্বর্গে কিংবা মনুষ্যলোকে ধনী, উচ্চবংশে জন্মগ্রহণ করতঃ বিপুল সুখের ভাগী হয়। কোন প্রকার অধোগতি, নিম্নগামী হবার সম্ভবনা থাকে না।

পরিশেষে পূজ্য ভান্তে বলেন—অজ্ঞানী ব্যক্তির স্বভাব হল পরের ক্ষতিসাধন করা। তারা অপরকে লাঞ্ছিত, অপমানিত, রুঢ়বাক্য প্রয়োগ, গায়ের জোর প্রদর্শন করা সহ বিবিধ উপায়ে দুঃখ যাতনা দিতে পারাকে মহা আনন্দের ব্যাপার ও সুখ বলে মনে করে। বর্তমানে সেরূপ খারাপ কাজের মাধ্যমে তারা বীরদর্পে চলাফেরা করতে সক্ষম হলেও মৃত্যুর পর তার বিষময় বিপাকের ফলে নরকে পতিত হয়ে অনন্ত দুঃখের ভাগী হয়। কিন্তু জ্ঞানী ব্যক্তিরা কারোর অনিষ্ট, অহিত কামনা করে না। বরং পরের মঙ্গল কামনা, সুখ কামনা, উপকার সাধন ও সর্বজীবের প্রতি দয়াশীল হয়ে অবস্থান করে থাকে। এতে তাদের দিবা-রাত্রি পুণ্য বৃদ্ধি পায়, যার ফলে তারা ইহপরকালে সুখের ভাগী হয়। বুদ্ধের উপদেশ মত তোমরাও শত্রু-মিত্র সবাইকে সমানভাবে দয়া কর, কারোর ক্ষতিসাধন ও অমঙ্গল কামনা করবে না। উত্তমভাবেই ধর্মাচরণ কর, ধর্মচারী ব্যক্তির সুখ বৃদ্ধি পায়। ধর্মচারীকে ধর্মেই রক্ষা করে; ধর্মচারী ব্যক্তি কখনো চারি অপায়ে পতিত হয় না। ধর্মচারী ব্যক্তি ইহলোকে পরলোকে সুখে থাকেন।
তোমরা হীন, অনার্য কাজসমূহ হতে নিজকে দূরে সরে রাখ। কখনো অনার্য কাজে আত্মনিয়োগ করবে না। বরং শীলপালন কর, নিজকে পুণ্যকর্মে ব্যাপৃত রাখ তাহলে সুখ লাভে সমর্থ হবেই। আজকে বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন উপলক্ষ্যে তোমরা যে দানাদি পুণ্যকর্ম ও পরিত্রাণ শ্রবণ করলে এগুলো কি জান? কুশলকাজ বা সদ্ধর্ম। আবার এই কুশলকাজ কেন করতে হয়? উন্নতি, শ্রীবৃদ্ধি ও সুখ লাভের জন্য। তাই তোমরা সবাই বলো “এই পুণ্যকর্মের দ্বারা আমাদের সর্বদা উন্নতি, শ্রীবৃদ্ধি সাধিত হোক। আমাদের কখনো অধোগতি, পরিহানি না ঘটুক।” সঙ্গে সঙ্গে তোমাদেরকে এই প্রতিজ্ঞা করা উচিত যে, এই নতুন বৎসরে আমরা অকুশলকার্য না করে কুশলকার্যই সম্পাদন করব। সেই পুণ্যকার্য যাতে আমাদের জন্য উন্নতি, সমৃদ্ধি ও সুখ বয়ে আনে। তজ্জন্য বলছি, তোমরা সর্বদা জ্ঞান এবং কুশলের সহিত অবস্থান করতে সচেষ্ট থাক। জ্ঞানের বল, কুশলের বল থাকলে সর্বদিকে জয়যুক্ত হওয়া যায়, সুখ লাভ হয়। অজ্ঞানের অন্ধকারে না থেকে তোমরা জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয়ে অবস্থান কর। অকুশলকর্ম পরিত্যাগ করে কুশলকর্ম সম্পাদন কর। মিথ্যাধর্ম বাদ দিয়ে সত্যধর্মে আত্মনিয়োগ কর। তাহলে তোমাদের সুখ শান্তি, উন্নতি, শ্রীবৃদ্ধি লাভ হবেই। মনে রাখতে হবে, সত্যধর্মে আত্মনিয়োগ করতে সক্ষম হলে জন্ম-জরা-ব্যাধি-মরণাদি দুঃখ হতে মুক্ত হতে পারবে। মনচিত্তের মধ্যে মিথ্যাধর্ম, অজ্ঞান থাকলে দুঃখ পেতে হয়। মনচিত্ত থেকে মিথ্যাধর্ম, অজ্ঞানকে বিদূরীত করতঃ জ্ঞানের সহিত অবস্থান করাই উত্তম। তোমরা সদা সর্বদা জ্ঞানের সহিত নিজকে পরিচালিত কর। এতে তোমাদের পরম সুখ অর্জিত হবে, উন্নতি হবে, শ্রীবৃদ্ধি সাধিত হবে। জ্ঞানই সকল সুখ, শান্তি, উন্নতি ও শ্রীবৃদ্ধির মূল। সেই জ্ঞান অর্জিত হয়ে তোমাদের যাবতীয় দুঃখ দূর হয়ে সুখ শান্তি, উন্নতি, শ্রীবৃদ্ধি হোক-এই আশীর্বাদ রইল।
সাধু, সাধু, সাধু