Followers

Friday, June 16, 2017

নিজের কতটুকু জ্ঞান হয়েছে সে সম্বন্ধে আত্মপরীক্ষক হয়ে অবস্থ

                            নিজের কতটুকু জ্ঞান উদয় হয়েছে সে সম্বন্ধে আত্মপরীক্ষক হয়ে অবস্থান কর

এক সময় পূজ্য বনভান্তে নিজ আবাসিক ভবনে ভিক্ষুসঙ্ঘকে ধর্মদেশনা প্রদান প্রসঙ্গে বলেন—তোমরা যদি অজ্ঞান অবস্থায় থাক তাহলে তোমাদের মনচিত্ত কি করতেছে? কোথায় যাচ্ছে? কি (আলম্বন) নিয়ে অবস্থান করে? এসব কিছুই জানতে পারবে না। অজ্ঞানীদের পক্ষে মনচিত্ত সম্বন্ধে জানা সম্ভব নয়। কিন্তু জ্ঞানীরা তাদের মনচিত্ত কি করতেছে? কোথায় যাচ্ছে? কি নিয়ে অবস্থান করে? সব কিছুই জানতে পারে। তারা সর্বদা স্বীয় চিত্তকে পর্যবেক্ষণ করে থাকে। তাই স্বীয় চিত্ত সম্বন্ধে তারা সম্পূর্ণ জ্ঞাত থাকে। তোমরাও প্রত্যেকে নিজের চিত্ত সম্বন্ধে পরিজ্ঞাত হয়ে অবস্থান কর। তোমাদেরকে স্বীয় চিত্ত কি করতেছে? কোথায় যাচ্ছে? কি নিয়ে অবস্থান করে? সেগুলো পর্যবেক্ষণ করতঃ চিত্তকে দেখতে হবে, জানতে হবে। এটাকে বলে জ্ঞান। এরূপে জ্ঞানের সহিত অবস্থান করতে সক্ষম হলে সুখ লাভ হয়। যারা নিজের চিত্ত কি করতেছে? কোথায় যাচ্ছে? কি নিয়ে অবস্থান করে? এসব কিছুই জানে না, আমি তাদেরকে তির্যক প্রাণীর (গরু, ছাগল) মত হয়ে অবস্থান করতেছে বলে থাকি। এবার শ্রদ্ধেয় ভান্তে ভিক্ষুসঙ্ঘকে প্রশ্ন করেন—তোমাদের চিত্ত কি করে, কোথায় যায়, কি নিয়ে থাকে, সেগুলো তোমরা জান কি? ভান্তে, সব সময় জানা সম্ভব হয় না। জানতেই হবে; না জানলে তো তোমাদেরকেও অজ্ঞানীই বলতে হবে। জ্ঞানীরা সর্বদা স্বীয় চিত্তকে পর্যবেক্ষণ করে থাকে। চিত্ত কি করতেছে? কোথায় যাচ্ছে? কি নিয়ে অবস্থান করে? এসব বিষয় জানাই তো জ্ঞানীদের কাজ। স্বীয় চিত্ত সম্বন্ধে জানাটা জ্ঞান, আর না জানাটা অজ্ঞান। যারা জ্ঞানের সহিত অবস্থান করে তারা স্বীয় চিত্ত সম্বন্ধে জানতে সক্ষম হয়। কিন্তু যারা অজ্ঞানের সহিত অবস্থান করে তারা স্বীয় চিত্ত সম্বন্ধে জানতে অক্ষম। পূজ্য বনভান্তে ভিক্ষুসঙ্ঘকে প্রশ্ন করে বলেন—এখন তোমরাই বলো, তোমরা জ্ঞানী হবে নাকি অজ্ঞানী হবে?  ভান্তে, আমরা জ্ঞানী হবো। যারা জ্ঞানী তারা স্বীয় চিত্ত কি করে? কোথায় যায়? কি নিয়ে থাকে? সবই দেখতে পায়, জানতে পারে। কিন্তু যারা অজ্ঞানী তারা স্বীয় চিত্ত কি করে? কোথায় যায়? কি নিয়ে থাকে? কিছুই দেখতে পায় না, জানতে পারে না। তবে তাদের চিত্ত কি বসে রয়েছে? চিত্তের স্বভাব কোন না কোন একটা করেই যাওয়া। সেটা ভালোর দিক হোক আর মন্দের দিক হোক। আর অজ্ঞানীদের চিত্ত তো মন্দের দিকেই ধাবিত হয়। স্বীয় চিত্ত সম্বন্ধে জানে না বলে অজ্ঞানীরা বিবিধ পাপ করে অনন্ত দুঃখের শিকার হয়। কারণ চিত্তকে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে চালিত না করলে কুকর্মের দিকে ধাবিত হয়, কুকর্ম হতে ফিরায়ে আনা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই আবারো বলছি, তোমাদেরকে অবশ্যই স্বীয় চিত্ত সম্বন্ধে জানতে হবে। আমার সাথে বলো “আমাদের চিত্ত কি করতেছে? কোথায় যাচ্ছে? কি নিয়ে অবস্থান করে? এগুলো আমাদেরকে জানতে হবে, দেখতে হবে”। তোমরা যদি সেরূপ জ্ঞানের সহিত অবস্থান করতে সমর্থ হও, তাহলে সুখের অধিকারী হতে পারবে। বুদ্ধ বলেছেন—হে ভিক্ষুগণ! আপনাকে আপনি পরীক্ষা করবে। অর্থাৎ নিজের চিত্তে কতটুকু জ্ঞান উদয় হয়েছে, সেটা পর্যবেক্ষণ করা। আমার চিত্তে এতকুটু জ্ঞানের উদয় হয়েছে, সে সম্বন্ধে আত্মপরীক্ষক হয়ে অবস্থান করা। বনভান্তে ভিক্ষুসঙ্ঘের উদ্দেশ্যে বলেন, তেমাদের কাজ হল নিজের জ্ঞান সম্বন্ধে (নিজকে নিজে) পরীক্ষা করে দেখা। তোমাদেরকে কোন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে কোন প্রফেসার বা প্রিন্সিপালের নিকট পরীক্ষা দিতে হবে না। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা সমূহ প্রকৃত জ্ঞানের পরীক্ষা নয়; অজ্ঞানের পরীক্ষা। সেরূপ পরীক্ষা দ্বারা স্বীয় চিত্ত সম্বন্ধে কিছুই জানা যায় না। পূজ্য বনভান্তে প্রশ্ন করেন—তোমাদের পরীক্ষা কি রকম? ভান্তে, আমার নিজের কতটুকু জ্ঞান অর্জিত হয়েছে সেটা পরীক্ষা করা। হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। অপরকে পরীক্ষা করা নয় নিজকে নিজে পরীক্ষা করাই জ্ঞানীদের কাজ। তোমরা সর্বদা নিজের কতটুকু জ্ঞান উদয় হয়েছে সে সম্বন্ধে আত্মপরীক্ষক হয়ে অবস্থান কর। এতে জ্ঞান বৃদ্ধি পাবে, দুঃখমুক্তি নির্বাণ লাভ করা সহজ হবে।
তোমরা কোনকিছু দেখলে শুধুমাত্র ‘দেখছি, দেখছি’ বলে স্মৃতি করবে। মানুষ দেখছি, কুকুর বিড়াল দেখছি, পুরুষ দেখছি, মহিলা দেখছি, অমুককে দেখছি, সমুককে দেখছি ইত্যাদি বলে দৃশ্যতঃ বিষয়ে চিন্তা করা যাবে না। কারণ দৃশ্যতঃ বিষয়ে ‘আমি মানুষ দেখেছি, পুরুষ দেখেছি, মহিলা দেখেছি’ বলে বিচার করলে তাতে সেই সেই বিষয়ে চিত্ত উৎপন্ন হয়। আর সে চিত্তের দ্বারা তখন কাম-ক্রোধাদি ভাবগুলোর উদয় হতে থাকে, রিপুসমূহ মনে স্থান খুঁজে পায়। এ অবস্থায় রিপুসমূহ মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলে ধ্যান ভঙ্গ হয়ে যায়। মনকে ধ্যান বিষয়ে ফিরায়ে আনতে দুঃখ পেতে হয়। কোন শব্দ শুনলেও শুধুমাত্র ‘শুনছি (বা শব্দ) শুনছি’ বলে স্মৃতি করবে। মানুষের শব্দ শুনছি, পশু-পক্ষীর শব্দ শুনছি, পুরুষের শব্দ শুনছি, মহিলার শব্দ শুনছি, কথাবার্তার শব্দ শুনছি, গানের শব্দ শুনছি, বাঘের শব্দ শুনছি, ভলস্ন্লুকের শব্দ শুনছি, হাতির শব্দ শুনছি, অমনুষ্যের শব্দ শুনছি (ভূত-প্রেত-যক্ষ) ইত্যাদি বলে শব্দকে বিচার করা যাবে না। কারণ শব্দকে অমুকের শব্দ, সমুকের শব্দ বলে চিন্তা করলে সেই সেই বিষয়ে চিত্ত উৎপন্ন হয়। সেই চিত্ত বিবিধ প্রকারে দুঃখ সৃষ্টি করে থাকে। কোন গন্ধ নাকে এলেও শুধুমাত্র ‘গন্ধ (বা গন্ধ পাচ্ছি), গন্ধ’ বলে স্মৃতি করবে। মানুষের গন্ধ পাচ্ছি, বাঘের গন্ধ পাচ্ছি, বানরের গন্ধ পাচ্ছি, পুরুষের গন্ধ পাচ্ছি, মহিলার গন্ধ পাচ্ছি, সুগন্ধ পাচ্ছি, দুর্গন্ধ পাচ্ছি বলে গন্ধকে বিচার করতে পারবে না। কারণ ‘এটা অমুকের গন্ধ’, ‘সেটা সমুকের গন্ধ’ বলে বিচার করলে সেই সেই চিত্ত উৎপন্ন হয়। সেই চিত্ত বিবিধ দুঃখের হেতু হয়ে থাকে। কোন কিছুর রসাস্বাদন করলেও শুধুমাত্র ‘খাচ্ছি (বা গিলছি) খাচ্ছি’ বলে স্মৃতি করবে। কি খাচ্ছি? কিসের টক্‌ খাচ্ছি? কিসের মিষ্টি খাচ্ছি? কিসের ঝাল খাচ্ছি? ইত্যাদি বলে খাদনীয় দ্রব্যে বিচার করা যাবে না। কারণ তাতে সেই সেই বিষয়ে চিত্ত উৎপন্ন হয়ে বিবিধ দুঃখ সৃষ্টি করে থাকে। মনে কোন চিন্তা উদয় হলেও শুধুমাত্র ‘চিন্তা করছি’ বলে স্মৃতি করবে। কি বিষয় চিন্তা করছি তা’ বিচার করা যাবে না। কারণ তাতে সেই সেই বিষয়ে চিত্ত উৎপন্ন হয়ে বিবিধ দুঃখের হেতু হয়ে থাকে। এভাবে সর্বদা স্মৃতির সহিত অবস্থান করবে। যাতে কোন কাম-ক্রোধাদি ভাবগুলো উদয় হতে না পারে। রিপুসমূহ মনে স্থান খুঁজে না পায়। অজ্ঞান দূরীভূত হয়ে জ্ঞান বৃদ্ধি পেতে থাকে। পূজ্য বনভান্তে ভিক্ষুসঙ্ঘকে প্রশ্ন করেন—এসব উপদেশ মনে থাকবে তো? ভান্তে, থাকবে। তাহলে সর্বদা স্মৃতির সহিত অবস্থান কর। ইহাই জ্ঞান লাভ ও দুঃখমুক্তি নির্বাণ উপলব্ধি করার উপায়।
তিনি আরো বলেন—তোমরা কখনো মূর্খের সঙ্গে মিশতে যাবে না। মূর্খের সঙ্গে মিশলে বা বন্ধুত্ব করলে বিবিধ দুঃখ, দুর্দশা, দুর্ভোগ পোহাতে হয়। বিপদ যেন নিত্য সঙ্গী হয়ে অনুসরণ করতে থাকে। মূর্খের সংসর্গে কোন উপকার, মঙ্গল সাধিত হয় না; বরং পরিহানি, অধঃপতন সুনিশ্চিত হয় মাত্র। বলা যায়, মূর্খের সংসর্গ সর্বনাশই ডেকে আনে। তাই মূর্খ থেকে সর্বদা দূরে সরে থাকা বাঞ্ছনীয়। কখনো মূর্খদেরকে বিশ্বাস করতে নেই। কিন্তু পণ্ডিতের সঙ্গে বন্ধুত্বের কোন বিকল্প নেই। তাদের সহিত মিশলে কোন বিপদে পড়তে হয় না; অধঃপতন, পরিহানি হবার শঙ্কা থাকে না। বরঞ্চ তাদের সৎগুণ আপন জীবনে প্রতিফলিত হয়ে নিজের উন্নতি, শ্রীবৃদ্ধি ও সুখ বর্ধিত হয়। তাদের সান্নিধ্যে সদ্ধর্মের জ্ঞানচক্ষু উদয় হয়, সুবুদ্ধি জাগ্রত হয়; দুঃখমুক্তি নির্বাণ লাভের পথও সুগম হয়ে থাকে। তাদের সংসর্গই করা উচিত। এটি বলার অপেক্ষা রাখে না যে, মূর্খের সংসর্গ সব সময় পরিত্যাজ্য আর পণ্ডিতের সংসর্গ সর্বপ্রকার কাম্য। তাই তো বলা হয়েছে—
করিয়া মূর্খের সনে পণ্ডিত বিহার,
জ্ঞানযোগে সর্বপাপ করি পরিহার।
দুঃখমুক্তি নির্বাণ প্রত্যক্ষ করতে হলে তোমাদের প্রবল বীর্যের সহিত সাধনামার্গে অগ্রসর হতে হবে। শত বাধা, বিপত্তিতেও নিরুৎসাহ হওয়া যাবে না। এমন কি সেই লক্ষ্য অর্জনে জীবনপণ বাজি রাখতেও প্রস্তুত থাকতে হবে; কোন অবস্থাতে পিছপা হতে পারবে না। বুদ্ধের সময়কালীন ভিক্ষুগণ কি রকম সংকল্প করে জঙ্গলে প্রবেশ করত জান? ‘আমি বীর্যরূপ কবচ দ্বারা কায়া, জীবনের মমতা ত্যাগ করে কাননে প্রবেশ করব; অরহত না হওয়া পর্যন্ত এ’কানন হতে বের হবো না। ভগবান বুদ্ধও গৃহত্যাগ করার পর গয়াধামের নৈরঞ্জনা নদীর তীরে এসে এরূপে সংকল্প করেছিলেন—
করিয়াছি পণ করে প্রাণপণ,
মুক্তির পথ অন্বেষিব,
সাধিতে নারিলে নৈরঞ্জনা নদী তীরে,
এ জীবন বিসর্জিব।
তোমাদেরকেও ভগবান বুদ্ধ প্রমুখ সেই ভিক্ষুগণের দৃঢ় বীর্যপূর্ণ সাধনাকে স্বীয় জীবনের আদর্শরূপে গ্রহণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। জঙ্গলে গিয়ে সাধনা করার সময় যদি কখনো চিত্তে দুর্বলতা ভাব প্রকাশ পায় তখন ভগবান বুদ্ধপ্রমুখ ভিক্ষুগণের সেই বীর্যদৃপ্ত সংকল্পের কথা স্মরণ করবে। তাহলে চিত্তে পুনরায় অসাধারণ মনোবল ফিরে আসবে। সেরূপ অসাধারণ মনোবল ও অপরাজেয় বীর্য দ্বারা বীর বিক্রমের সহিত মারকে পরাজিত করা যায়। কারণ প্রবল ইচ্ছাশক্তির কাছে তৃষ্ণাকেও হার মানতে হয়। তোমরা যদি একান্তই নির্বাণ লাভের আত্ম-প্রত্যয়ী হয়ে সাধনায় নেমে পড়, তাহলে তোমাদের নির্বাণ অধিগত হবেই। সেরূপ আত্মপ্রত্যয়ী সাধনা করতে পারবে কি? ‘আমি অরহত্ব লাভ না করা পর্যন্ত কোন অন্ন-পানীয় স্পর্শ করব না, রুম হতে বের হবো না’ এরূপ দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হয়ে ভাবনায় বসতে পারবে কি? প্রবল বীর্য বলে বলীয়ান হলে পারবে-অন্যথায় নয়। কিন্তু তোমাদেরকে সেরূপ বলীয়ান বলে মনে হচ্ছে না। এবার পূজ্য বনভান্তে ভিক্ষুসঙ্ঘকে প্রশ্ন করেন—বুদ্ধের সময়কালীন ভিক্ষুগণ কি রকম সংকল্পবদ্ধ হয়ে সাধনা করেছিল? ভান্তে, তাঁরা এরূপে সংকল্পবদ্ধ হতো ‘আমি বীর্যরূপ কবচ দ্বারা কায়া জীবনের মমতা ত্যাগ করে কাননে প্রবেশ করব; অর্হৎ না হওয়া পর্যন্ত এ’কানন হতে বের হবো না’। হ্যাঁ, বুদ্ধের সময়কালীন ভিক্ষুগণ সেরূপ দৃঢ় বীর্যবান ছিলেন। তোমরাও তাঁদের মত দৃঢ় বীর্যবান হতে সচেষ্ট থাক।

No comments:

Post a Comment