এক সময় শ্রদ্ধেয় বনভান্তে নিজ আবাসিক ভবনে ভিক্ষুসঙ্ঘকে দেশনা প্রদান প্রসঙ্গে বলেন—তোমরা অজ্ঞান, তৃষ্ণার সহিত কোন কর্ম, কোন বাক্য, কোন চিন্তা করবে না। অজ্ঞান, তৃষ্ণার সহিত কর্ম, বাক্য, চিন্তা করলে দুঃখ পেতে হয়, পাপ সৃষ্টি হয় এবং নরকে পতিত হতে হয়। তাই তোমাদেরকে অজ্ঞান, তৃষ্ণার সহিত কোন কিছু করা ত্যাগ করে জ্ঞানের সহিত ও তৃষ্ণামুক্ত হয়ে কর্ম, বাক্য, চিন্তা করতে হবে। জ্ঞানের সহিত তৃষ্ণামুক্ত হয়ে কর্ম, বাক্য, চিন্তা করতে সক্ষম হলে সুখ, কুশল, জ্ঞান বৃদ্ধি পায়। তজ্জন্য অজ্ঞান, তৃষ্ণার সহিত কর্ম, বাক্য, চিন্তা করা হতে বিরত হয়ে তৃষ্ণামুক্ত হওত জ্ঞানের সহিত কর্ম, বাক্য, চিন্তা করা উচিত। তাতে নির্বাণ লাভ করতেও সহজ হবে। তোমরা যদি নির্বাণ লাভ করতে চাও তাহলে অজ্ঞান, তৃষ্ণা, অকুশল পরিত্যাগ করে জ্ঞান, কুশল, তৃষ্ণামুক্ত হতে চেষ্টাশীল হও। বনভান্তের উপদেশ কি জান? যা দ্বারা জ্ঞান উদয় হয়, কুশল অর্জিত হয় এবং তৃষ্ণা হতে মুক্ত হওয়া যায় তা’ কর। আর যা দ্বারা অজ্ঞান বাড়ে, অকুশল উৎপন্ন হয়, তৃষ্ণা উদয় হয় তা’ পরিত্যাগ কর। এক কথায় অজ্ঞান, অকুশল, তৃষ্ণা উৎপত্তি বন্ধ করে তৃষ্ণামুক্ত হয়ে জ্ঞান, কুশল উদয় করা। অজ্ঞান, অকুশল, তৃষ্ণার মধ্যে যদি মনচিত্ত আসক্ত হয়ে থাকে তবে দুঃখ হতে মুক্তি নেই বলে জানবে। কারণ অজ্ঞান, অকুশল, তৃষ্ণা এগুলো মারভুবন। মারভুবনে অবস্থান করলে কিছুতেই সংসার দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ করা সম্ভব হয় না। তোমরা উচ্চতর জ্ঞান, উচ্চতর সাধনা, উচ্চমনা, উচ্চাকাঙ্ক্ষী হয়ে চিত্তের নিমর্লতা রক্ষা করে অবস্থান কর। তাহলে মনচিত্ত হতে অজ্ঞান, অকুশল, তৃষ্ণা বিদূরীত হয়ে সহজে নির্বাণ লাভ করতে পারবে।
শ্রদ্ধেয় বনভান্তে বলেন—যারা স্বামী-স্ত্রী হয়ে, পুত্র-কন্যা নিয়ে সংসারী হওত কাম্য সুখ ভোগে রত তারা কি করতেছে জান? ঢেঁকী শাকের দোকান দিচ্ছে। রাস্তার ধারে বসে কলাগাছের পাতার উপর ঢেঁকীশাকের পুটলি খুলে বেচাকেনা করতেছে। তাদের সে ব্যবসা দেখতে যেমন অভদ্র, সাধারণ দেখায়, মুনাফাও খুবই কম। খুব বেশি কেনাবেচা করলে ষাট কি সত্তুর টাকার মত পাওয়া যাবে। উপরন্তু সে ব্যবস্যা অনেক কষ্টসাধ্যের তথা বহু পরিশ্রম করতে হয়। তোমরা প্রব্রজিতগণ ঘড়ির দোকান খুঁলে ঘড়ি ব্যবস্যা কর। সুন্দরভাবে দোকান তৈরি করতঃ মূল্যবান উন্নত প্রযুক্তির, সুন্দর ডিজাইনের ঘড়ি আমদানী করে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকার ঘড়ি বিক্রি কর। ঘড়ি ব্যবস্যা একদিকে যেমন ভদ্র, মার্জিত ভাব সম্পন্ন অন্যদিকে তেমনি অনেক বেশি মুনাফা অর্জিত হয়। পরিশ্রমও নেই বললে চলে। তবে সকলের পক্ষে ঘড়ির ব্যবস্যা করা সম্ভবপর হয়ে উঠে না। কারণ ঘড়ি ব্যবস্যা করতে হলে মোটা অঙ্কের পুঁজির প্রয়োজন রয়েছে। প্রথমে কয়েক লক্ষ টাকার বিনিময়ে দোকান প্রস্তুত করে নিতে হবে। তারপর উন্নত প্রযুক্তি, সুন্দর ডিজাইনের ঘড়ি ক্রয়ের জন্য কয়েক লক্ষ টাকার প্রয়োজন হবে। আবার, ঘড়ি বিক্রি করতেও বিক্রেতাকে শিক্ষিত হতে হয়। যেহেতু ঘড়ি বিক্রেতাকে ঘড়ির উন্নত প্রযুক্তি ও ডিজাইন অনুসারে মূল্য নির্ধারণ করতে হয় এবং ক্রেতাদিগকে ক্যাশমেমো প্রদান করতে হয়। শিক্ষিত না হলে এসব সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করা সম্ভব হয় না। এবং ঘড়ির ব্যবস্যায়ও উন্নতি, মুনাফা অর্জিত হবে না। তাই ঢেঁকী শাকের ব্যবসায়ীরা ইচ্ছা করলেও ঘড়ি ব্যবস্যা করতে পারবে না। তাদের ঘড়ি ব্যবস্যা করার মত মোটা অঙ্কের পূঁজি যেমন নেই, তেমনি তারা শিক্ষিতও নয়। লোকোত্তরধর্ম অনুশীলন করাকেই ঘড়ি ব্যবস্যা করা বুঝায়। আর লৌকিকধর্ম করাকে ঢেঁকী শাকের ব্যবস্যা করা বুঝায়। লোকোত্তরধর্মে কোন প্রকার দুঃখ নেই, তৃষ্ণা মুক্ত, স্বাধীন, অনাবিল সুখ লাভ হয়। কিন্তু লৌকিকধর্ম তৃষ্ণাযুক্ত, পরাধীন, দুঃখদায়ক ও দুঃখ উৎপাদক। লৌকিকধর্ম করলে দুঃখের মধ্যে দিনাতিপাত করতে হয়, দুঃখ হতে মুক্তি লাভ করা যায় না। অন্যদিকে মারভুবনে অবস্থান করাকেও ঢেঁকী শাকের ব্যবস্যার সহিত তুলনা করা চলে। আর অমারভুবনে অবস্থান করাকে ঘড়ি ব্যবস্যা সদৃশ বলে জানবে। তোমরা মারভুবনে অবস্থান না করে অমারভুবনে অবস্থান কর। তাহলে ঢেঁকী শাকের ব্যবস্যা ত্যাগ করতঃ ঘড়ি ব্যবস্যা করতে সমর্থ হবে বা লোকোত্তরধর্মে উন্নীত হতে পারবে।
লোকোত্তরধর্ম গ্রহণ করা অর্থ সুপথ অনুশীলন করা। আর লৌকিকধর্ম গ্রহণ করা অর্থ কুপথ অনুসরণ করা। ভগবান বুদ্ধ সত্ত্বদেরকে কুপথ থেকে সুপথে চালিত করেন। তাই বুদ্ধের নির্দেশিত পথকে ন্যায় পথ, সোজা পথ, ঠিক পথ বলা হয়। বুদ্ধ লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি সত্ত্বদেরকে সুপথে পরিচালিত করতে সক্ষম। সারথি যেমন অশ্বদেরকে সঠিক পথে চালিত করে নিয়ে যায়। তাই বুদ্ধের শিক্ষা কোনটা সুপথ, কোনটা কুপথ তা চিহ্নিত করে দিয়ে কুপথ ত্যাগ করে সুপথে পরিচালিত হওয়ার উপদেশ দেন। আমি তোমাদেরকে বলছি, তোমরা বুদ্ধের নির্দেশিত সুপথ অবলম্বন করে কুপথ পরিত্যাগ কর। কামের প্রতি লোভ, কামের আসক্তি, কামের প্রতি অজ্ঞানতা হয়ে হীন মনুষ্যগণ কুপথে পরিচালিত হওত অনন্ত দুঃখ ভোগ থাকে। তোমরা কামকে লোভ, আসক্তি করবে না। এবং কামের প্রতি অজ্ঞানতা হবে না তাহলে সুপথে প্রতিষ্ঠিত থাকতে সমর্থ হবে। মনে রাখবে, একমাত্র বুদ্ধের এ সকল উপদেশেই সুপথে পরিচালিত হতে পারা যায়। বুদ্ধের আবির্ভাবের ফলে জগতে নতুন করে সুখের অধ্যায় আরম্ভ হয়। তাই বলা হয়েছে—
শ্রদ্ধেয় বনভান্তে বলেন—যারা স্বামী-স্ত্রী হয়ে, পুত্র-কন্যা নিয়ে সংসারী হওত কাম্য সুখ ভোগে রত তারা কি করতেছে জান? ঢেঁকী শাকের দোকান দিচ্ছে। রাস্তার ধারে বসে কলাগাছের পাতার উপর ঢেঁকীশাকের পুটলি খুলে বেচাকেনা করতেছে। তাদের সে ব্যবসা দেখতে যেমন অভদ্র, সাধারণ দেখায়, মুনাফাও খুবই কম। খুব বেশি কেনাবেচা করলে ষাট কি সত্তুর টাকার মত পাওয়া যাবে। উপরন্তু সে ব্যবস্যা অনেক কষ্টসাধ্যের তথা বহু পরিশ্রম করতে হয়। তোমরা প্রব্রজিতগণ ঘড়ির দোকান খুঁলে ঘড়ি ব্যবস্যা কর। সুন্দরভাবে দোকান তৈরি করতঃ মূল্যবান উন্নত প্রযুক্তির, সুন্দর ডিজাইনের ঘড়ি আমদানী করে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকার ঘড়ি বিক্রি কর। ঘড়ি ব্যবস্যা একদিকে যেমন ভদ্র, মার্জিত ভাব সম্পন্ন অন্যদিকে তেমনি অনেক বেশি মুনাফা অর্জিত হয়। পরিশ্রমও নেই বললে চলে। তবে সকলের পক্ষে ঘড়ির ব্যবস্যা করা সম্ভবপর হয়ে উঠে না। কারণ ঘড়ি ব্যবস্যা করতে হলে মোটা অঙ্কের পুঁজির প্রয়োজন রয়েছে। প্রথমে কয়েক লক্ষ টাকার বিনিময়ে দোকান প্রস্তুত করে নিতে হবে। তারপর উন্নত প্রযুক্তি, সুন্দর ডিজাইনের ঘড়ি ক্রয়ের জন্য কয়েক লক্ষ টাকার প্রয়োজন হবে। আবার, ঘড়ি বিক্রি করতেও বিক্রেতাকে শিক্ষিত হতে হয়। যেহেতু ঘড়ি বিক্রেতাকে ঘড়ির উন্নত প্রযুক্তি ও ডিজাইন অনুসারে মূল্য নির্ধারণ করতে হয় এবং ক্রেতাদিগকে ক্যাশমেমো প্রদান করতে হয়। শিক্ষিত না হলে এসব সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করা সম্ভব হয় না। এবং ঘড়ির ব্যবস্যায়ও উন্নতি, মুনাফা অর্জিত হবে না। তাই ঢেঁকী শাকের ব্যবসায়ীরা ইচ্ছা করলেও ঘড়ি ব্যবস্যা করতে পারবে না। তাদের ঘড়ি ব্যবস্যা করার মত মোটা অঙ্কের পূঁজি যেমন নেই, তেমনি তারা শিক্ষিতও নয়। লোকোত্তরধর্ম অনুশীলন করাকেই ঘড়ি ব্যবস্যা করা বুঝায়। আর লৌকিকধর্ম করাকে ঢেঁকী শাকের ব্যবস্যা করা বুঝায়। লোকোত্তরধর্মে কোন প্রকার দুঃখ নেই, তৃষ্ণা মুক্ত, স্বাধীন, অনাবিল সুখ লাভ হয়। কিন্তু লৌকিকধর্ম তৃষ্ণাযুক্ত, পরাধীন, দুঃখদায়ক ও দুঃখ উৎপাদক। লৌকিকধর্ম করলে দুঃখের মধ্যে দিনাতিপাত করতে হয়, দুঃখ হতে মুক্তি লাভ করা যায় না। অন্যদিকে মারভুবনে অবস্থান করাকেও ঢেঁকী শাকের ব্যবস্যার সহিত তুলনা করা চলে। আর অমারভুবনে অবস্থান করাকে ঘড়ি ব্যবস্যা সদৃশ বলে জানবে। তোমরা মারভুবনে অবস্থান না করে অমারভুবনে অবস্থান কর। তাহলে ঢেঁকী শাকের ব্যবস্যা ত্যাগ করতঃ ঘড়ি ব্যবস্যা করতে সমর্থ হবে বা লোকোত্তরধর্মে উন্নীত হতে পারবে।
লোকোত্তরধর্ম গ্রহণ করা অর্থ সুপথ অনুশীলন করা। আর লৌকিকধর্ম গ্রহণ করা অর্থ কুপথ অনুসরণ করা। ভগবান বুদ্ধ সত্ত্বদেরকে কুপথ থেকে সুপথে চালিত করেন। তাই বুদ্ধের নির্দেশিত পথকে ন্যায় পথ, সোজা পথ, ঠিক পথ বলা হয়। বুদ্ধ লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি সত্ত্বদেরকে সুপথে পরিচালিত করতে সক্ষম। সারথি যেমন অশ্বদেরকে সঠিক পথে চালিত করে নিয়ে যায়। তাই বুদ্ধের শিক্ষা কোনটা সুপথ, কোনটা কুপথ তা চিহ্নিত করে দিয়ে কুপথ ত্যাগ করে সুপথে পরিচালিত হওয়ার উপদেশ দেন। আমি তোমাদেরকে বলছি, তোমরা বুদ্ধের নির্দেশিত সুপথ অবলম্বন করে কুপথ পরিত্যাগ কর। কামের প্রতি লোভ, কামের আসক্তি, কামের প্রতি অজ্ঞানতা হয়ে হীন মনুষ্যগণ কুপথে পরিচালিত হওত অনন্ত দুঃখ ভোগ থাকে। তোমরা কামকে লোভ, আসক্তি করবে না। এবং কামের প্রতি অজ্ঞানতা হবে না তাহলে সুপথে প্রতিষ্ঠিত থাকতে সমর্থ হবে। মনে রাখবে, একমাত্র বুদ্ধের এ সকল উপদেশেই সুপথে পরিচালিত হতে পারা যায়। বুদ্ধের আবির্ভাবের ফলে জগতে নতুন করে সুখের অধ্যায় আরম্ভ হয়। তাই বলা হয়েছে—
![]() |
| আর্ট: Suponkar Chakma |
জগতের নতুন অধ্যায় আরম্ভ হইল,
জগতে শিক্ষা দিতে জগত গুরু এল।
হিংসাহিংসি, দলা-দলি সবি ভুলে যাবে,
সমগ্র বসুধা এবার প্রেমেতে ভাসিবে।
ভগবান বুদ্ধ বিশ্বের সকল জীবের প্রতি মৈত্রী, শান্তি ও কল্যাণের জন্যে তাঁর ধর্ম প্রচার করেছেন। এবং ত্যাগের মাধ্যমে অনাবিল সুখ অন্বেষণের শিক্ষা দিয়েছেন। তাই বুদ্ধের শিক্ষা সত্ত্বদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করে এবং প্রকৃত সুখ অর্জন করতে এক মহৌষধ স্বরূপ। আমি খাগড়াছড়িতে ছাত্রদের মধ্যে বিভেদ দূরকরণার্থে বলেছিলাম—
ভাইয়ে ভাইয়ে জড়িয়ে গলা, মুছে ফেল তোমরা মনের ময়লা,
হর্ষ তেজে দাঁড়াও তোরা, হোক তবে সুখের স্থান।
তোমরা তোমাদের মনের মধ্যে উৎপন্ন হিংসা ময়লাকে বিদূরীত কর। কারণ সে হিংসা ময়লা দ্বারা কখনো শান্তি লাভ হয় না, সুখ বয়ে আসে না। কুলুষিত মনচিত্ত দ্বারা বৌদ্ধধর্ম আচরণ করাও যায় না। তাই তোমরা সেসব ময়লা ধূঁয়ে মুছে ফেল। সে ময়লা কি? লোভ, দ্বেষ, মোহ, মান, মিথ্যাদৃষ্টি, বিচিকিৎসা, আলস্য, ঔদ্ধত্য, নির্লজ্জতা ও নির্ভয়তা এ দশবিধ ক্লেশই মনের ময়লা। ক্লেশ কাকে বলে? যা দ্বারা মনচিত্ত কলুষিত, পীড়িত, ব্যাধিগ্রস্ত, মলিন ও নীচ হয় তাকে ক্লেশ বলে। বুদ্ধ ধর্মপদে বলেছেন, লৌহ হতে উৎপন্ন ময়লা যেমন লৌহকে নষ্ট করে ঠিক তেমনি আপনার চিত্তে উৎপন্ন ময়লা আপনাকেই বিনষ্ট করবে। তাই তোমরা স্বীয় চিত্তের ময়লাকে বিধৌত করে পরিষ্কার হয়ে যাও। কলুষিত চিত্তকে নির্মল করে ফেল। তাহলে চিত্তের কলুষিত ভাব দ্বারা বিনষ্ট হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকবে না। বুদ্ধ আরো বলেছেন, অনাবৃত্তি মন্ত্রের ময়লা, অসংস্কার ঘরের ময়লা, দুশ্চরিত্র স্ত্রীলোকের ময়লা, আলস্য দেহের ময়লা, ইহ-পর কালের ময়লা পাপকর্ম, অবিদ্যাই সর্বপেক্ষা নিকৃষ্ট ময়লা। হে ভিক্ষুগণ! এই ময়লা বর্জন করে তোমরা সকলে নির্মল হও। কর্মকার যেমন রজতের ময়লা একটু একটু বিদূরীত করে, ঠিক মেধাবী ব্যক্তিও আপনার ময়লা ক্ষণে ক্ষণে বিদূরীত করবেন। অর্থাৎ আপনার চিত্তকে নিজের বসে আনবেন। আমি আবারো তোমাদেরকে বলছি, তোমরা অবিদ্যা ময়লাকে বিদূরীত করতঃ চিত্তকে নির্মল কর। নির্মল চিত্তই সকল সুখের আকর।
শ্রদ্ধেয় বনভান্তে বলেন, তোমরা ক্লেশ ত্যাগ কর, স্কন্ধ ত্যাগ কর। ক্লেশ তোমাদের নিত্য দুঃখদায়ক। ক্লেশের কাজ সত্ত্বদিগকে সর্বদা দুঃখ প্রদান করতে থাকা। তাই এ দুঃখদায়ক ক্লেশকে পরিত্যাগ করা অবশ্যই কর্তব্য। আবার পঞ্চস্কন্ধও নিত্য দুঃখ প্রদান করতে থাকে। সেহেতু পঞ্চস্কন্ধকে ত্যাগ করা আবশ্যক নহে কি? হ্যাঁ অবশ্যই। বুদ্ধ বলেছেন—রূপ আমি নই, আমার নয়, আমার আত্ম নয়; বেদনা আমি নই, আমার নয়, আমার আত্ম নয়; সংজ্ঞা আমি নই, আমার নয়, আমার আত্ম নয়; সংস্কার আমি নই, আমার নয়, আমার আত্ম নয়; বিজ্ঞান আমি নই, আমার নয়, আমার আত্ম নয়। যা নিজস্ব নয় তা’ ত্যাগ কর। পঞ্চস্কন্ধ ত্যাগ করলে দীর্ঘকাল হিতসুখ সাধিত হবে। ক্লেশ ও স্কন্ধকে ত্যাগ করতে না পারলে ভীষণ দুঃখ পেতে হয়। তাদেরকে ক্লেশ উন্মাদ ও স্কন্ধ উন্মাদ বলা যায়। ক্লেশ উন্মাদগণ ক্লেশ চেতনা পাপ চেতনা করতঃ নানা অনাচার, অত্যাচারে লিপ্ত থাকে। বর্তমানে যে সব চুরি, ডাকাতি, মারামারি, বন্দুক যুদ্ধ, ভাংচুরের খবর সেসবই ক্লেশ উন্মাদের কাজ। আর স্কন্ধ উন্মাদেরা সব কিছুতেই আমি আমার ধারণা করে সেগুলো নিজের আয়ত্তে আনার চেষ্টায় ব্যাপৃত থাকে। আমার স্ত্রী, আমার পুত্র-কন্যা, আমার ধনজন, আমার জায়গা-জমি বলে বলে এসবের মালিকানা দাবি করাই স্কন্ধ উন্মাদের কাজ।
তোমরা অকৃতজ্ঞ, মিথ্যাদৃষ্টি, নরাধমের সংস্পর্শ ত্যাগ কর। কারণ অকৃতজ্ঞ ব্যক্তি মহাপাপী। কণ্টকময় স্থানে বাস করা কি দুঃখজনক তদপেক্ষা অকৃতজ্ঞ লোকের সহিত বাস করা দুঃখজনক। তারা কখনো উপকারীর উপকার স্বীকার করে না। বুদ্ধ বলেছেন অকৃতজ্ঞ ব্যক্তির কখনো সুখ লাভ হয় না। তোমরা কৃজ্ঞতা স্বীকার করবে, অকৃজ্ঞত হয়ো না। মিথ্যাদৃষ্টি বিপরীত মার্গে পরিচালিত করে। এ মিথ্যাদৃষ্টিই সত্যকে মিথ্যা, মিথ্যাকে সত্য; ন্যায়কে অন্যায়, অন্যায়কে ন্যায় বলে দিক নির্দেশনা করে। তাই মিথ্যাদৃষ্টি সম্পন্ন পুদ্গলের সত্য, ন্যায়, সার লাভ হয় না। মিথ্যাদৃষ্টি বিদ্যমান থাকলে কখনো নির্বাণ লাভ হবে না। নরাধম ব্যক্তি উঁই ইঁদুরের মতন ক্ষতি ছাড়া কোন উপকার সাধন করতে পারে না। বুদ্ধ বলেছেন—
ধরাতলে নারধম, খল আছে যত,
ঠিক তারা উঁই আর ইঁদুরে মতন।
বর্তমানে মানুষগুলো উঁই ইঁদুরের মতন হয়ে গেছে। তারা একে অপরের ক্ষতিসাধন ছাড়া উপকার, মঙ্গল কিছুই করতে পারছে না। তাদের সেসব হীন মানসিকতা সম্পন্ন কাজের দ্বারা দেশের দিন দিন ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে-উন্নতি কিছু হচ্ছে না।
পরিশেষে তিনি বলেন—মার হল পাপী লোকের রাজা। মার মানুষের মনে বিতর্ক উৎপন্ন করে দিয়ে অকুশলকর্মের দিকে ধাবিত করায়। বুদ্ধ যখন বোধিমূলে ধ্যানরত ছিলেন মার তখন ভেবেছিল—এই শাক্যরাজ পুত্র যদি জ্ঞান লাভ করতে পারে; লোকেদের উপদেশ দেয় তাহলে আমাররাজ্য ধ্বংস হয়ে যাবে। কাজেই আমি বুদ্ধকে জ্ঞান লাভ করতে দেবো না। এই ভেবে মার বুদ্ধকে নানাভাবে আক্রমণ করে ধ্যান হতে চ্যুত করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে ছিল। কিন্তু বুদ্ধকে ধ্যান হতে চ্যুত করতে পারে নি। বরং নিজেই পরাজিত হয়েছিল। বর্তমানেও যারা কুশলকর্ম করতে, জ্ঞান লাভ করতে, নির্বাণ যেতে ইচ্ছুক হয় তাদেরকে মার নানাভাবে প্রলোভন দেখায়ে আক্রমণ করবে। মার কুশলকর্ম, জ্ঞান লাভ ও নির্বাণ লাভ করতে শত সহস্র প্রকারে অন্তরায় সৃষ্টি করে দেয়। কারণ এগুলো মারের কর্তব্য। তাই তোমাদেরকে দৃঢ় বীর্যের সহিত নানাবিধ বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করতে হবে। বীর সৈনিকের ন্যায় পিছু না হটে মারের সঙ্গে যুদ্ধে এগিয়ে যেতে হবে এবং মারের সকল প্রকার অশুভ শক্তি পরাহত করে নির্বাণ লাভে সচেষ্ট থাকতে হবে। এভাবে মারের বাধা-বিপত্তি, ছিন্ন-ভিন্ন করতঃ নির্বাণ লাভ করে পরম সুখের অধিকারী হও।
সাধু, সাধু, সাধু

No comments:
Post a Comment