Followers

Wednesday, June 21, 2017

তোমরা পোকায় খাওয়া টক আম খাবে না।

বনভান্তে বলেন—ভগবান বুদ্ধের নির্দেশিত মার্গ হল সুমার্গ এবং বুদ্ধের শিক্ষা হল সুশিক্ষা। আমি তো দেখছি বর্তমানে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যে শিক্ষা দেয়া হচ্ছে সেগুলো প্রকৃত সুশিক্ষা নয়। ছাত্র-ছাত্রীরাও কর্ম সংস্থানের সুবিধার্থে একটা সার্টিফিকেট লাভের আশায় সে শিক্ষা গ্রহণ করতেছে। তাই আমি সে শিক্ষাকে পেটের ধান্ধায় শিক্ষা বলে উল্লেখ করি। বুদ্ধের শিক্ষাই উত্তম, এই শিক্ষার মাধ্যমে যাবতীয় দুঃখের পরিসমাপ্তি ঘটে যায়। নির্বাণে পরম সুখ লাভ হয়। একমাত্র বুদ্ধের শিক্ষার মাধ্যমেই দুঃখমুক্তি নির্বাণ লাভ করা যায়। অন্য কোন শিক্ষার মাধ্যমে নির্বাণ লাভ করা যায় না। আমি আমার শিষ্যদেরকে বুদ্ধের শিক্ষাই দিই-অন্য কোন শিক্ষা নয়। বাংলাদেশের প্রত্যেক (ইউনিভার্সিটি) বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক অধ্যাপক আমার নিকট সাক্ষাৎ করতে এসেছে। এবং তারা সবাই স্বীকার করেছে যে তাদের কাছে অসাধারণ জ্ঞান নেই, তারা সাধারণ জ্ঞানের অধিকারী মাত্র। আচ্ছা, তোমাদের কাছে তারা এ’ কথা স্বীকার করবে কি? করবে না। এমন কি অন্য সব ভিক্ষুর কাছেও স্বীকার করবে না। কারণ বর্তমানের ভিক্ষুরাও অসাধারণ জ্ঞানের অধিকারী হতে পারেনি। বনভান্তে জনৈক ভিক্ষুর নামোল্লেখ করে বলেন, সে কিনা বাঘাইছড়ি থানার নির্বাহী কর্মকর্তাকে নমস্কার করে (ওখানকার লোকজন আমাকে বলেছিল)। অথচ আমি বাঘাইছড়িতে ফাং-এ গেলে সেই টি, এন, ও আমার কাছে দানীয় বস্তু সহ সশ্রদ্ধায় সাক্ষাৎ করতে আসে। আচ্ছা, সেই ভিক্ষুটি তাকে যখন নমস্কার করে তখন তার চিত্তে কি উদয় হবে বল তো? বনভান্তেও ভিক্ষু, এই ভিক্ষুটিও ভিক্ষু। কিন্তু তাদের আচরণ তো সম্পূর্ণ বিপরীত। এসব কেন হচ্ছে? ভিক্ষুদের জ্ঞানের দুর্বলতার জন্যই তাদের হীন আচরণ দ্বারা বর্তমান ভিক্ষুদের হীনতাভাব প্রকাশ হচ্ছে। কারণ তারা নিম্নস্তরের সাধনা অনুশীলনে রত রয়েছে। তাদের নিকট উচ্চস্তরের সাধনা বিদ্যমান নেই; উচ্চতর জ্ঞান নেই। দায়কের প্রদত্ত দানীয় সামগ্রী সর্বস্ব হয়ে তারা অবস্থান করছে। 

ধন পরিহানি, যশ পরিহানি সামান্য মাত্র; কিন্তু প্রজ্ঞা পরিহানি অধিক পরিহানি। মনে রাখবে, ধন সামান্য, যশ সামান্য এগুলোর পরিহানিতে তেমন কিছু আসে যায় না। তদুপরি এসব পুনরায় (সহজে) লাভ করা যায়। কিন্তু প্রজ্ঞার পরিহানি হলে একেবারে রসাতলে যাবে বলে জানবে। তাই আমার সাথে বলো “ধন পরিহানি, যশ পরিহানি সামান্য মাত্র। কিন্তু প্রজ্ঞার পরিহানি অধিক পরিহানি”। আমরা প্রজ্ঞার পরিহানি হতে দেবো না, আমাদের যাতে প্রজ্ঞার পরিহানি না হয়-সে ব্যাপারে সজাগ থাকব। যার কাছে প্রজ্ঞা থাকে, তার কাছে শীলও থাকে। প্রজ্ঞাবান কখনো দুঃশীল হতে পারে না। তাই যারা প্রজ্ঞাবান তারা শীলবান, যারা শীলবান তারা ধার্মিক। শীল-প্রজ্ঞার দ্বারাই দেব-মনুষ্যের মধ্যে জয়যুক্ত হওয়া সম্ভব। দুষ্প্রাজ্ঞ, দুঃশীল হলে সর্বদা পরাজয়ের গস্ন্লানি বহন করে চলতে হয়। পরিহানি ছায়ার মতন অনুসরণ করে। তখন আর দুঃখের সীমা থাকে না। দুষ্প্রাজ্ঞ কাকে বলে? যারা দুঃখ কি, জানে না; দুঃখ সমুদয় কি, জানে না; দুঃখ নিরোধ কি, জানে না; দুঃখ নিরোধের উপায় কি, জানে না; তারাই দুষ্প্রাজ্ঞ। প্রজ্ঞাবান কাকে বলে? যারা দুঃখ কি, জানে; দুঃখ সমুদয় কি, জানে; দুঃখ নিরোধ কি, জানে; দুঃখ নিরোধের উপায় কি জানে; তারাই প্রজ্ঞাবান। তোমরা প্রত্যেক দায়ক-দায়িকাবৃন্দ প্রজ্ঞাবান হও, কখনো দুষ্প্রাজ্ঞ হবে না। প্রজ্ঞাবান হতে পারলেই যথেষ্ট; ধন-যশের চিন্তা করতে হবে না। মনে রাখবে, ধন-যশ সামান্য, তুচ্ছ; প্রজ্ঞাই আসল সম্পদ। তোমাদের যদি প্রজ্ঞার পরিহানি ঘটে তাহলে আমিও লজ্জিত হবো। কাজেই সাবধান, প্রজ্ঞার পরিহানি হয় মত কোন কার্য করবে না। এতে তোমাদের সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি লাভ হবে।
তোমরা জ্ঞান বলে উচ্চতা লাভ করবে। হীন, নীচ কাজসমূহ সম্পাদন করবে না। সেই জ্ঞান কি? চারি আর্যসত্য জ্ঞান। এ’ চারি আর্যসত্য জ্ঞানের দ্বারা তোমাদেরকে উচ্চতা লাভ করতে হবে। চারি আর্যসত্য জ্ঞানের মাধ্যমে মনচিত্ত পাপপঙ্ক হতে অনেক উর্ধ্বে বিচরণ করলে তখন আর অজ্ঞানমূলক নীচ (অকুশল) কর্ম সম্পাদন করা যায় না। মনে রাখবে, এবম্বিধ উপায়ে উচ্চতর জ্ঞান, উচ্চতর সাধনা অনুশীলন করলে প্রকৃত সুখ লাভ হয়, যাবতীয় দুঃখ থেকে চির নিবৃত্তি লাভ হয়। তোমরা উচ্চতর জ্ঞান, উচ্চতর সাধনা অনুশীলন কর। যারা উচ্চতর জ্ঞান ও উচ্চতর সাধনা অনুশীলন করে তারাই সুখী, তারাই দুঃখ থেকে মুক্ত। কখনো নিম্নস্তরের সাধনা ও হীন জ্ঞানের সহিত অবস্থান করো না। যারা হীন জ্ঞান ও নিম্নস্তরের সাধনা অনুশীলন করে, তারা ইহকালেও দুঃখ ভোগ করে, পরকালেও দুঃখ ভোগ করে। তাদের জন্য ইহ-পর উভয়কালও দুর্বিষহ দুঃখপূর্ণ হয়ে থাকে।
পরিশেষে তিনি বলেন—তোমরা ধর্মজ্ঞান, ধর্মচক্ষু লাভ করতে সচেষ্ট থাক। ধর্মজ্ঞান, ধর্মচক্ষু লাভ হলে আর পাপমূলক কর্মসমূহ সম্পাদন করতে পারবে না। কারণ ধর্মজ্ঞান, ধর্মচক্ষু লাভ হলে পাপকর্ম সম্পাদন করতে লজ্জা লাগবে। বর্তমানে তোমাদের ধর্মজ্ঞান, ধর্মচক্ষু নেই বলে পাপকর্ম সম্পাদনে লজ্জা পাচ্ছ না। নিঃসঙ্কোচেই একের পর এক পাপকর্ম সম্পাদন করে যাচ্ছ। যেদিন ধর্মজ্ঞান, ধর্মচক্ষু উদয় (লাভ) হবে, সেদিন হতে যাবতীয় পাপকর্ম পরিত্যাগ করবে। উপস্থিত দায়ক-দায়িকাদের দিকে তাকিয়ে পূজ্য বনভান্তে প্রশ্ন করেন—এখন কেন পাপকর্ম সম্পাদন করতেছ? দায়ক-দায়িকাবৃন্দ একবাক্যে উত্তর দিলেন—ভান্তে, আমাদের ধর্মজ্ঞান, ধর্মচক্ষু লাভ হয়নি বলে। বনভান্তে—হ্যাঁ, ঠিক। যেদিন তোমাদের ধর্মজ্ঞান, ধর্মচক্ষু লাভ হবে সেদিন তোমরা আপনা-আপনি সমস্ত পাপকর্ম পরিত্যাগ করবে, আমাকেও আর বেশি উপদেশ দিতে হবে না। তাহলে তোমাদের কর্তব্য কি? ধর্মজ্ঞান, ধর্মচক্ষু লাভ করতে সচেষ্ট থাকাই তোমাদের কর্তব্য। আমার সাথে বলো “আমাদের অচিরেই ধর্মজ্ঞান, ধর্মচক্ষু লাভ হউক। এই ধর্মজ্ঞান, ধর্মচক্ষু লাভ করে আমরা যাবতীয় পাপ ত্যাগ করতঃ চিরশান্তি, চিরসুখ অর্জনে যেন সমর্থ হই; যাতে আমাদের অধোগতি না হয়, ঊর্ধ্বগতিই হয়; পরিহানি না হয়ে শ্রীবৃদ্ধিই যেন হয়; এবং আমাদের ইহকাল-পরকালে যেন সুখ লাভ হয়।” আমি আবারো বলছি, তোমরা ধর্মজ্ঞান, ধর্মচক্ষু লাভে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হও। কোন প্রকার বিলম্ব বা অবহেলা না করে সেই প্রতিজ্ঞা পরিপূরণে যত্নশীল হও। এতে তোমাদের দিন দিন শ্রীবৃদ্ধি হবে, পরিহানি হবে না; ঊর্ধ্বগতি লাভ হবে, নিম্নগামী হবে না এবং পরম সুখ শান্তির ঠিকানা খুঁজে পাবে। তোমাদের অতিসত্বর ধর্মজ্ঞান, ধর্মচক্ষু লাভ হোক। যাতে তোমাদের সুখ, শান্তি, মঙ্গল বয়ে আনে।
সাধু, সাধু, সাধু

No comments:

Post a Comment