মানুষ মাতৃক ভাবপ্রসূত অদ্ভূত প্রাণী। এক মূহুর্ত নির্লিপ্ত সময় বিদ্যমান নেই, যা মানুষের মন চিন্তা-ভাবনা থেকে অক্রিয় হয়ে পড়েন। তাঁরা যা ভাবেন তাই বড়ই অদ্ভূত। তাই মানব জাতিই অদ্ভূত শ্রেষ্ঠ প্রাণী। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দর্শনবাদে অতিক্রম করে সাফল্য অর্জন করেছে মানব জাতির অভিজ্ঞতা। পৃথিবীর বিখ্যাত বিখ্যাত দর্শন- ইসলামবাদ, খ্রিষ্টানবাদ, হিন্দুবাদ, ক্যাথলিকবাদ, প্রযুক্তি বিষয়ক বিজ্ঞানবাদ এবং বৌদ্ধবাদ ইত্যাদি ইত্যাদি মতবাদে গবেষণায় অগ্রগতি লাভ করতে করতে মানব জাতির মনস্তাত্ত্বিক দর্শন এখন বিভিন্ন বিভাগে বিভক্ত শিঁখরে এসেছে। তবে মানুষ যে, যেই বিভাগে অনড় থাকুক না কেন, প্রত্যেকটি মতবাদে বিশেষভাবে আবেগবদ্ধ জ্ঞান- বিজ্ঞানের সক্ষমতা অবশ্যই আছে। অর্থাৎ প্রত্যেক বিভাগের মানুষের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাবহুল জ্ঞানলব্ধ ধারণা আছে। তাহলে সেগুলো অস্বীকার করা অমানবিক। প্রত্যেক মানুষ তাঁদের স্পৃহাবশতঃ অধ্যয়ন নিজেরাই বাচাই করে নেবে।
এ পর্যায়ে এখন আমি আমার আকর্ষণীয় মতবাদ বৌদ্ধ দর্শনের আলোচনায় আসছি। যেমন বৌদ্ধধর্মের দর্শন অনুশীলনে কীভাবে জ্ঞানের গভীরতা আসে? এ প্রশ্নানুসারে→আমাদের মনে রাখতে হবে- বৌদ্ধধর্ম দু'টি বাস্তব সত্য। উচ্চতর জ্ঞান এবং প্রঁকৃতি সম্বন্ধীয় প্রত্যক্ষ উপলব্ধি বাস্তব জ্ঞান। এই দুইটি জ্ঞান বুদ্ধকে মহামানব সৃষ্টি করেছে। বুদ্ধ ক্ষণে ক্ষণে প্রঁকৃতির সত্য অনুসারে নিজের অভিজ্ঞ জ্ঞান বদলে নিতে পারতেন। তাই বৌদ্ধদর্শনের অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো প্রঁকৃতির সাথে এর গভীর সম্পর্ক। বৌদ্ধদের ধারণা হলো প্রঁকৃতি কারও দ্বারা সৃষ্ট নয়। এক্ষেত্রে বৌদ্ধধর্মে মহাজাগতিক অংশকেও কোন সৃষ্টিকর্তার দ্বারা সৃষ্ট বলে গ্রহণ করে না। তাই মানুষের জীবনের অস্তিত্বও প্রকৃতির একটা অংশমাত্র। বৌদ্ধধর্মে পরোক্ষ জ্ঞানের কোন স্থান নেই। আপনি বৌদ্ধ হিসেবে যা অনুশীলন করবেন, ভাববেন তাতে সম্পূর্ণ গভীর আবেগের তাড়না থাকতে হবে। কারণ বৌদ্ধজ্ঞান একমূখী শক্তি নয় বরং সৃজনশীল পদ্ধতিমূখী। বিশেষভাবে নিজের চিন্তা, ভাবকে অনুশীলনের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ অনুভূতি অর্জনের সামর্থ্যই হলো বৌদ্ধ দর্শনের গভীরতা অনুশীলন। যত গভীর ভাবে বুদ্ধ মার্গ পদ্ধতি অনুশীলিত করবেন তত বেশি উচ্চতর জ্ঞানের শিঁখরে আপনার অভিজ্ঞতার লক্ষ্য পৌছে যাবে। আপনি প্রশ্নের মাধ্যমেও জানতে পারেন, বৌদ্ধরা কেন এত সুখী? ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া ও ইউনিভার্সিটি অফ উইসকনসিনের দুইদল বিজ্ঞানী পৃথক পৃথক গবেষণাগারে গবেষণা করার পর জানিয়েছেন, বৌদ্ধধর্মাবলম্বীরা প্রকৃত সুখী এবং অন্য ধর্মাবলম্বীদের চেয়ে শান্ত প্রকৃতির হয়। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, বৌদ্ধদের মস্তিস্কের যে অংশটি মানুষের মেজাজ ভাল রাখে এবং ইতিবাচক অনুভূতি সৃষ্টির জন্য দায়ী বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের মস্তিস্কের সেই অংশটি অধিক সক্রিয়। আর একদল বিজ্ঞানী মনে করেন ধ্যানই বৌদ্ধদের শান্তি ও সুখী হতে সাহায্য করে। অন্যদিকে অত্যাধুনিক স্ক্যানিং প্রযুক্তির সাহায্যে বলা হয়েছে ধ্যান নয় বরং আত্মসংযম এবং ইতিবাচক মনোভাবই বৌদ্ধদের সুখী ও শান্ত প্রকৃতির মানুষে পরিণত করে। ভূটান অন্যতম বৌদ্ধদেশ। এদেশের মানুষ বিশ্ব সুখী মানুষদের চেয়ে সবচেয়ে সুখী মানুষ এরা। প্রযুক্তির লিপ্সা এঁদের মনকে জয় করতে পারেনি। তাঁরা প্রযুক্তিকে ভাবে ইন্দ্রিয় অসংযমের কারণ। ইন্দ্রিয় অসংযম কারণে মানুষের মন সুখীবোধ থেকে সরে আসে। ভূটানবাসীর জ্ঞান প্রয়োগ ক্ষেত্রে বুদ্ধের জ্ঞান প্রয়োগের যথেষ্ট মিল আছে। বুদ্ধের ভাব সম্পূর্ণ বিয়ষীভূত সঠিক মীমাংসায় অনুভূত হয়েছে। মনের সঠিক সুস্থ ও সুখীবোধ ক্ষেত্রেও দিয়েছে স্থায়ী সমাধান। দুঃখ সূচনা ব্যবধানে বুদ্ধের মার্গ অন্যতম বৈশিষ্ট্য রয়েছে প্রতি পলে পলে বৌদ্ধদর্শন বর্ণনায়। মানসিক প্রশান্তি সংরক্ষণে মানুষের চিন্তা ভাবনায় ব্যাপক উপায় রয়েছে নিজস্ব সঠিক সিদ্ধান্ত এবং প্রজ্ঞাভিত্তিক সমাধানের উপর। বুদ্ধের চেতনা যেমন মুক্তমনা ভিত্তিক ব্যাঞ্জনাময় উপলব্ধি গ্রহণ করার শক্তি রয়েছে, তাঁর বৌদ্ধদর্শন ভিত্তিময় দেশনাও মুক্তমনায় সিক্ত। তাই বুদ্ধের ধর্ম মানে মানসিক বিকাশ এবং মনের প্রকৃত সত্যমাত্রা লাভ করা। মনকে গুরুত্ব বহন করে ইতিবাচক জ্ঞান অর্জনের শক্তি সৃষ্ট করার উপযোগী মানুষের মেনে নিতে হবে। বুদ্ধের পন্থা অবলম্বন করা মানে আত্মসচেতন অবলম্বন করে ইতিবাচক মনোভাব অনুশীলনে নিজেকে ব্যাপৃত রাখা। বুদ্ধ স্বাভাবিকভাবে কোনো বিষয় বা জিনিসকে মেনে নিতে পছন্দ করেনি। তিনি প্রত্যেক বিষয়ে গভীর তত্ত্বমূলক গবেষণা সহকারে মেনে নিতে এবং গ্রহণ করতে পছন্দ ছিলেন। তাঁর বিশেষ পদ্ধতি দু'ভাবে প্রয়োগ করতেন। যেমন সাধারণ সত্য এবং পরমার্থ সত্য। স্বাভাবিকভাবে যে বিষয় বা বস্তুর গুণ, মান, উপাদান, ও বৈশিষ্ট্য থাকবে সেগুলো হলো সাধারণ সত্যের বিষয়। আর যেগুলো বিশেষভাবে বা পারমার্থিকভাবে যে বিষয় বা বস্তুগুলোর গুণ, মান, উপাদান, এবং বৈশিষ্ট্য সম্পর্ক জ্ঞান থাকবে সেগুলো পরমার্থ সত্য হিসেবে ভাবা যায়। অনুভূতির ক্ষেত্রে বৌদ্ধ সাধনার উপায়গুলো সম্পূর্ণ আলাদা। কারণ ইন্দ্রিয়জাত বশত সমষ্ট অনুভূত বিষয়ের চেতনা সবগুলো সুখের অধীনে উৎপত্তি হয় না। কোখনো কোখনো দুঃখের কারণ হয়েও অনুভূতির সূচনা ঘটে থাকে প্রত্যেক মানুষের চিন্তা-চেতনায়। বিজ্ঞানের যাত্রা প্রতিনিয়ত অস্বাভাবিক জ্ঞান তাড়নায় গবেষণা করা হচ্ছে বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞ পরিশ্রমে। ঠিক বুদ্ধের দর্শনে সঠিক মাত্রায় আসা সহজ উপায় নেই। মানুষের থাকতে হয় গভীর মনোনিবেশ অনুশীলনের সক্ষমতা। একজন সাধারণ মানুষের জ্ঞান প্রয়োগের ক্ষেত্রে বৌদ্ধসাধনার স্থানে নিজেকে তুলনা করা চলে না। বৌদ্ধসাধনার অধিকারী হতে হলে গভীর মেধাযুক্ত জ্ঞান প্রয়োগের মানুষ হতে হবে। প্রত্যেক অভিজ্ঞতায় নিজেকে প্রমাণ মিলাতে হবে একজন তাৎপর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্যধারী সঠিক মানুষ। আপনার অনুশীলন হতে হবে সর্বজনব্যাপৃত।বৌদ্ধজ্ঞান সম্বন্ধে আপনার গভীরে পৌছতে হলে অসাধারণ চিন্তা-চেতনা, ভাব সম্প্রসারণ ও মেধাকে কাজে লাগিয়ে নিতে হবে। এবং সুক্ষ্ম বিচার শক্তি দিয়ে মানসিক সমাধান পাওয়ার কোনো উপায় নেই।
লেখক→ শ্রীমৎ বীতশোক ভিক্ষু।
প্রবন্ধক।

No comments:
Post a Comment