Followers

Monday, July 10, 2017

বুদ্ধের মতে পুনর্জন্মের সরূপ,জ্ঞানমিত্র ভিক্ষু, থাইল্যান্ড হতে



অনেকেই বলেন বুদ্ধের পুনর্জন্ম ব্যাখ্যা কিরূপ, আসলেই কি যেই মানুষ মৃত্যুবরণ করে সেই মানুষই বা তার আত্মাই পুনর্জন্ম নেয়, নাকি মৃত্যুর পর মানুষের(প্রাণীর) আর দেহধারণই হয়না, নাকি বৌদ্ধ ধর্মে(ধম্মে) পুুনর্জন্মই নেই! প্রথমেই বলে নিই বৌদ্ধ ধর্মে পুনর্জন্ম আছে এবং প্রাণীর তৃষ্ণা বা আসক্তির ক্ষয় না হওয়া অবধি পুনর্জন্ম নেয়, তবে তা আত্মার পুনর্জন্ম নয়। বুদ্ধ নিত্য আত্মার অস্তিত্ব অস্বীকার করেছেন। এরকম শ্বাশ্বত আত্মা থাকলে নির্বাণ বা তৃষ্ণাক্ষয়ের বা বন্ধন মুক্তির প্রশ্ন আসে না। নিত্য আত্মাকে অস্বীকার করে বুদ্ধ মধ্যম নিকায়ের সর্বাসব সূত্র (২), অলগর্দোপম সূত্র (২২), ক্ষুদ্রবেদল্য সূত্র (৪৪), সংযুক্ত নিকায়ের খন্ধসংযুক্তের উপায়বর্গের অনাত্মলক্ষণ সূত্র প্রভৃতি সূত্রে আলোচনা করেছেন। বৌদ্ধধর্মে ব্যবহৃত ‘পুনর্জন্ম’ শব্দটি বুদ্ধপূর্বকালীন সময় হতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে বলে অনেকেই ভ্রান্তিবশতঃ বৈদিক ধর্মীয় পুনর্জন্মকে বুদ্ধ নির্দেশিত পুনর্জন্ম বলে ব্যাখ্যা করেন, যা সর্ব্বৈব মিথ্যা এবং বুদ্ধবাণীর অপব্যাখ্যা।  মূলত পুনর্ভব শব্দটিই বৌদ্ধ জন্মান্তর বিষয়ক শব্দ। পুনর্ভব কথার অর্থ হলো পুনর্বার জন্মগ্রহণের প্রবৃত্তি। মানুষ বা জীবের মধ্যে জন্মগ্রহণের প্রবৃত্তি (তৃষ্ণা) বিদ্যমান থাকায় তাকে জন্মগ্রহণ করতে হয়। এই তৃষ্ণাই জীবকে জন্ম গ্রহণ বা দেহধারণ করায়। আসক্তিবশে জীব কর্ম করে, যার ফল হচ্ছে অনাগত ভব। ‘ভব’ হচ্ছে কর্ম যার দরূণ জন্ম হয়। যে অবস্থায় জীব কর্ম করে তা হচ্ছে ভব। ভব থেকে উদ্ভূত হয় জাতি বা জন্ম, কাজেই পুনর্জন্মের কারণ হলো ভব। এখানে উল্লিখিত জাতি শব্দের অর্থ হচ্ছে জন্ম। এটি হচ্ছে পুনঃ প্রতিসন্ধি (জন্ম), অর্থাৎ পুনর্জন্ম বা পুনর্ভব এবং জাতি। প্রত্যুৎপন্নভবের আলোচনায় যে অঙ্গকে ‘বিজ্ঞান বা চেতনা’ নাম দেয়া হয় তাকে অনাগত ভবের সমীক্ষায় ‘জাতি’ বলা হয়। সোজা কথায়, জীব যদি জন্মগ্রহণ না করতো বা শরীর ধারণ না করতো তাহলে তাকে জরামরণের অধীন হতে হতো না, জরামরণাদি বিবিধ দুঃখ হতে মুক্তির কথাও আসতো না। কাজেই জীবের জরামরণের কারণ হলো জাতি বা জন্ম। তৃষ্ণাবশতঃ জীবের বারংবার জন্ম-মৃত্যু এবং আবার জন্ম-আবার মৃত্যুকে বুদ্ধ ‘দ্বাদশ নিদান’ বলেছেন।
(দ্বাদশ নিদান জানার জন্য মধ্যম নিকায়ের ৩৮ নং সূত্র মহা তৃষ্ণাসংক্ষয় সূত্র দেখুন, অথবা পুজ্য জ্যোতিঃপাল মহাথের লিখিত ‘কর্মতত্ত্ব’ বই দেখুন।)আবার অনেকে লিখছেন, পিতার চেতনাই পুত্র রূপে জন্ম নেয় বা পুত্রের চেতনা রূপে জন্ম নেয়। মৃত ব্যক্তি কখনই পুনরায় জন্ম গ্রহণ করে না। কেবলমাত্র প্রজননের মাধ্যমে সন্তান-সন্ততিরূপে তার চেতনার (বিজ্ঞান বা মন) আবির্ভাব হয়; যেটিও বিভ্রান্তকারী ব্যাখ্যা। বস্তুতপক্ষে, পিতার চেতনা বা বিজ্ঞান পিতার নিজের, পুত্রের চেতনা বা বিজ্ঞান পুত্রের; কোনও একজনের চেতনা অপরকোনও জনের নিকট প্রবাহিত হয় না। যদি তাই হয় তবে, পিতার জীবিতাবস্থায় পিতার চেতনা কোথায় যাবে, যারা সন্তানের পিতা নন তাদের কি হবে? পিতার কর্মফল কি পুত্রই ভোগ করবে? পিতা কি তার কর্মের ফল হতে নিষ্কৃতি পাবে? সুতরাং একের চেতনা অপরের কাছে গিয়ে যে উৎপন্ন হয় বলে অনেকের ভ্রান্ত অভিমত, তা বুদ্ধবিরোধি মত। প্রতিটি জীবই নির্বাণ উপলব্ধি না করা অবধি নিজেরই কর্মের সংস্কারবশতঃ মরণের পর বিভিন্ন প্রাণীতে জন্ম নেয় বা পুনর্ভবিত হয়। “মৃত ব্যক্তি কখনই পুনরায় জন্ম গ্রহণ করে না” এই কথা যারা বলেন তারা বুদ্ধবাক্যের অপব্যাখ্যা করেন বুঝে বা না বুঝে।
মধ্যম নিকায়ের ভয়ভৈরব(৪), মহাঅশ্বপুর(৪০) প্রভৃতি বহু সূত্রে বুদ্ধ মুক্তকণ্ঠে জাতিস্মরজ্ঞানবলে কর্মবশতঃ জীবগণের চ্যুতি-উৎপত্তি, সুগতি-দুর্গতি স্বীকার করেছেন। বুদ্ধ নিজেই তাঁর অতীত জীবনে যে বিভিন্ন জন্মপরিগ্রহণ করেছিলেন তার প্রমাণ পাই খুদ্দক নিকায়ের ধর্মপদের জরাবর্গের ১৫৩-১৫৪ নং গাথায়(অনেকজাতি সংসারং); মধ্যম নিকায়ের দ্বিধাবিতর্ক সূত্রে(১৯) । দ্বিধাবিতর্ক সূত্রে বুদ্ধ তাঁর জাতিস্মর বা পুর্বনিবাস অনুস্মৃতি জ্ঞানের দ্বারা বুদ্ধত্ব লাভের রাতে কিভাবে নিজের ও অপর জীবগণের চ্যুতি-উৎপত্তি অবগত হয়েছেন সেই বিষয়ের ধারাবাহিক বিবরণ উল্লিখিত হয়েছে। সেখানে বুদ্ধ বলছেন “...সেই অবস্থায় আমি নানা প্রকারে বহু পূর্বজন্ম অনুস্মরণ করি এক জন্ম, দুই জন্ম, তিন জন্ম, চার জন্ম, পাঁচ জন্ম, দশ জন্ম, বিশ জন্ম, ত্রিশ জন্ম, চল্লিশ জন্ম, পঞ্চাশ জন্ম, শত জন্ম, সহস্র জন্ম, এমনকি শতসহস্র জন্ম, বহু সংবর্তকল্পে, বহু বিবর্তকল্পে, এমনকি বহু সংবর্ত-বিবর্তকল্পে ঐ স্থানে আমি ছিলাম, এই ছিল আমার নাম, এই আমার গোত্র, এই আমার জাতিবর্ণ, এই আমার আহার, এইরূপ আমার সুখদুঃখ অনুভব, এই আমার পরমায়ু, তথা হইতে চ্যুত হয়ে আমি এস্থানে (এই যোনিতে) আমি উৎপন্ন হই, সেখানে ছিল আমার এই নাম, এই গোত্র, এই জাতিবর্ণ, এই আহার, এরূপ সুখদুদুঃখ অনুভব, এই পরমায়ু, তথা হইতে চ্যুত হইয়া আমি অত্র (এই যোনিতে) উৎপন্ন হয়েছি। ইতি আকার ও উদ্দেশ্য, স্বরূপ ও গতিসহ নানাপ্রকারে বহু পূর্বজন্ম অনুস্মরণ করি।” তদ্রুপ অপরাপর প্রাণীগণের জন্ম-মৃত্যু ইত্যাদি। এবং বলেছেন, “বিমুক্ত চিত্তে ‘বিমুক্ত হইয়াছি’ এই জ্ঞান উদিত হল, উন্নত জ্ঞানে জানতে পারলাম চিরতরে “জন্মক্ষয়” হয়েছে। উপরোক্ত বুদ্ধবাণী অনুসারে বুুদ্ধ নিজেই যে বিভিন্ন কূলে জন্ম নিয়েছেন বুদ্ধত্ব লাভের সেই প্রমাণ সুষ্পষ্ট। 
উপরোক্ত ব্যাখ্যায় কারোও চেতনা অপরকারো চেতনারূপে প্রবাহিত হয়নি, হয়না। এবং এতেই বুঝা যায় মৃত ব্যক্তি পুনরায় জন্ম নেয়। খুুদ্দক নিকায়ের মিলিন্দ প্রশ্ন’র লক্ষণ প্রশ্নের দ্বিতীয় বর্গ, এবং বিমতি বিচ্ছেদ প্রশ্ন পরিচ্ছদ দেখুন নাম রূপ বা কে, কিভাবে জন্মগ্রহণ করে তা জানার জন্য।
মহাতৃষ্ণাসংক্ষয় সূত্রে বলা আছে তিনের সংযোগে গর্ভসঞ্চার হয়। মাতাপিতার দৈহিক মিলন হল, অথচ মাতা ঋতুমতী হইলেন না, এবং গন্ধর্বও উপস্থিত হল না, তা হলে গর্ভসঞ্চার হয় না। (মধ্যম নিকায়ের অর্থকথা প্রপঞ্চসূদনী অনুসারে ‘গন্ধর্ব’ অর্থে স্বীয় প্রাক্তন বা কর্মবশে জন্মগ্রহণকারী সত্ত্ব। জনক-জননীর দৈহিক মিলনের সুযোগ নিয়েই গন্ধর্ব মাতৃজঠরে প্রবিষ্ট হয়ে গর্ভসঞ্চার করে )(দেখুন মধ্যম নিকায়, বেণীমাধব বড়–য়ার বাংলা অনুবাদ, মহাতৃষ্ণাসংক্ষয় সূত্রের ফুটনোট)। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যানুসারে, যদি গর্ভ উৎপাদনে সমর্থ পুরুষের শুক্র গন্তব্যস্থানে উপনীত হয় তবেই গর্ভসঞ্চার হয়।) মাতাপিতার দৈহিক মিলন হইল, মাতাও ঋতুমতী হইলেন, অথচ গন্ধর্ব উপস্থিত হল না, তা হলেও গর্ভসঞ্চার হয় না। মাতাপিতার দৈহিক মিলন হইল, মাতা ঋতুমতী হইলেন, গন্ধর্বও উপস্থিত হল, সে ক্ষেত্রেই এই তিনের সংযোগে গর্ভসঞ্চার হয়। এখানে পুনর্জন্মের তিনপ্রকার হেতু বিদ্যমান এবং জেনে রাখা কর্তব্য যে এই তিনজন অবশ্যই তাদের স্ব-স্ব চেতনা নিয়েই থাকে। পিতার চেতনা পুত্রে প্রবাহিত হয় না। জৈবিক কারণবশতঃ পিতা-মাতার কিছু আকার আকৃতি সন্তান সন্ততিতে দৃশ্যমান হয়।
                সুতরাং বুদ্ধ বর্ণিত পুনর্জন্মে মৃত্যুর পর প্রাণীর পুনারির্ভাব হয়, এটা আত্মবাদ নয়। কর্ম সৃষ্টি হলেই, সংস্কার থাকলেই, উপাদান থাকলেই ভব হবে, ভব হলে অবশ্যই জন্ম হবে। যারা আর্যঅষ্টাঙ্গিক মার্গানুযায়ী চলবে তারা কর্ম-সংস্কার-উপাদান ইত্যাদি অবিদ্যা বা অজ্ঞানতার ধ্বংস করতে পারলেই জন্ম নিরুদ্ধ হবে।

No comments:

Post a Comment