ধর্মের উৎপত্তি ও প্রয়োজন, মানুষের জাগতিক জীবনে নিত্য দুঃখ ও অশান্তির হাত থেকে পরিত্রাণ লাভের জন্য। ধর্ম প্রবক্তাগণের আবির্ভাব এবং অবদান এ জন্যেই মানব ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ও অবিস্মরণীয়। পৃথিবীর তাবৎ সকল ধর্ম প্রবক্তাগণ ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত মানব সন্তান। কিন্তু তাঁরা নিজেদের ধর্মমতকে সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং সর্বকালের জন্যে অত্যাবশ্যকীয় করার অমোঘ কৌশল হিসেবে নিজেদেরকে অদৃশ্য, সর্বকালীক, সর্বব্যাপ্ত, মহাশক্তিধর স্রষ্টার প্রেরিত একমাত্র প্রতিনিধি বলে প্রচার করেছেন। সেই অতিমানবীয়তার সুবাদে ধ্যান সাধনার কারণ রূপ কষ্ট বা ত্যাগ-তিতিক্ষাকে বরণ করা ছাড়াই, শুধুমাত্র পার্থিব ব্যবহারিক অভিজ্ঞতায় তাঁরা যখন যা বলেছেন, তৎসমুদয় খুব সহজেই সাধারণ মানুষের গ্রহণযোগ্যতা লাভে সক্ষম হয়েছে। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে তাঁদের কিছু কিছু অর্জন বেশ শ্রমলব্ধ বা কষ্টলব্ধ হলেও তাকে তাঁরা সেই মহাশক্তিধর স্রষ্টার দয়া, করুণা বা আদেশলব্ধ বক্তব্য বলে উল্লেখ করেছেন। অতএব, তাঁদের প্রচারিত ধর্মমতগুলোতে যদি কৃতিত্বের বা প্রশংসার কিছু থাকে, তা তাঁদের নহে-সেই অদৃশ্য মহাশক্তিরই প্রাপ্য। আর সেই অপৌরুষেয়তার সুবাদে, তাঁদের প্রচারিত ধর্মের আদেশ উপদেশ গুলোকে বিচার-বিশ্লেষণ করলে কিছু ব্যবহারিক নীতিবোধ ছাড়া, মৌলিক তত্ত্ব-তথ্য তেমন পাওয়া যায় না। এ কারণে, অনাগতে তাদের এ সকল মত ও পথ উপেক্ষিত হওয়ার ভয়ে তাঁদের কথিত বাক্য যৌক্তিক কি অযৌক্তিক, বাস্তব কি অবাস্তব, ভুল কি শুদ্ধ, প্রযোজ্য কি অপ্রযোজ্য, সংশোধনীয় কি অসংশোধনীয়-এ নিয়ে কোন বির্তকের অবকাশ সেখানে নেই। আদেশকর্তা যা বলেছেন, তা হুবহু সেভাবেই বিনাবির্তকে মেনে নিতে হবে। অন্ধ আবেগজাত ভক্তি বিশ্বাসই এ সকল মতবাদের মূল আশ্রয় রূপে তাই গণ্য হয়।
উপরোক্ত ধারার ধর্ম প্রবক্তাগণের সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী, কিছু খ্যাতনামা ব্যক্তিত্বের নাম বিশ্ব ধর্ম জগতে পরিদৃষ্ট হয়। তাঁরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোন ভাবেই ঈশ্বর বা স্রষ্টার অস্থিত্বে বিশ্বাসী নহেন। অথবা তেমন কোন মহাশক্তির কল্পনাকে, মানবিক তথা জাগতিক রহস্যের উদ্ঘাটনে এবং তৎসংশ্লিষ্ট সমস্যার সমাধানে নিষ্প্রয়োজন বলেও মনে করেছেন। মানুষের কাছে তাঁদের ধ্যান গবেষণালব্ধ অভিজ্ঞতাকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে, তাই তাঁরা প্রায় ক্ষেত্রে যুক্তিবাদ ও মনস্তাত্ত্বিকবাদের আশ্রয় নিয়েছেন। যাদের লক্ষ্য করে তাঁদের এই মতবাদ প্রচার, তাদের নিকট তা গ্রহণীয়, না অগ্রহণীয়; তার যাচাই বাছাইয়ে; সেই সাধারণ মানুষের আপন বিবেক বোধের স্বাধীনতা; তাই তাঁরা সর্বোতভাবে স্বীকার করে নিয়েছেন। এ কারণে, এ সকল ধর্ম প্রবক্তাদের প্রচারিত অভিমত, অন্ধ আবেগ তাড়িত, যু্ক্তিহীন কাল্পনিক ভক্তি বিশ্বাসকে পুঁজি না করে; গণমানুষের মুক্ত বিচার বুদ্ধি ও স্বাধীনতাকে, স্বমতবাদ প্রচারের আশ্রয় রূপে গ্রহণ করেছেন। উপরোক্ত সংক্ষিপ্ত আলোচনার আলোকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হবে যে, গৌতম বুদ্ধের উদ্ভাবিত উপায়ের মধ্যে অতি মানবীয় অলৌকিক কোন পন্থা অবলম্বন করা হয়নি। একান্ত ব্যক্তিগত জিজ্ঞাসা, এবং ব্যক্তিগত অকৃত্রিম প্রয়াস, এবং তাঁর বুদ্ধি ও মেধার গভীর অনুসন্ধানীর তৎপরতা, তাঁকে দান করেছে অভাবনীয় সাফল্য। তাই ঈশ্বর, স্রষ্টা, অবতার-ইত্যাদি কোন প্রকার অতিমানবীয়তার আশ্রয়ে তিনি নিজ অভিজ্ঞাকে, সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্যে প্রয়াসী হতে; তাঁকে কদাপি দেখা যায়নি। পৃথিবীর তাবৎ সকল ধর্ম প্রবক্তাগণ, যাঁরা প্রচার জগতে ব্যাপকতা পেয়েছেন, সেই যীশুখৃষ্ট এবং হযরত মুহম্মদ (সঃ); তাঁরা সমস্যার উৎপত্তি ও বিনাশের কারণ রূপে স্রষ্টা নামক শক্তিকে নির্দেশ করেছেন। মানুষের ভাল-মন্দ, সুখ-দুঃখ সবকিছু সেই স্রষ্টারই ইচ্ছা নির্ভর। তাই সর্ব প্রকারে, সেই মহাশক্তির সনেত্মাষ বিধানমূলক কিছু নৈতিক কার্যক্রমের উপরেই নির্ভর করবে, মানুষের সুখ-শান্তি, সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা। ব্যক্তিগত কর্মের ফলকে ঈশ্বর নির্ভর করে দিয়ে, সেই ঈশ্বরের প্রতি একান্ত আত্ম নিবেদনই এ সকল ধর্ম প্রচারকদের ধর্ম মতের মূল বক্তব্য। ক্ষুধাটা আমার; তাই খাদ্যের অন্বেষণ, সংগ্রহ এবং খাওয়ার দায়-দায়িত্ব আমারই। তবে ক্ষুধা নিবৃত্তি জাত সুখ দাতা হবেন ঈশ্বর। যুক্তিটি ঠিক এমনই দাঁড়ায়।
ঈশ্বর নির্ভর ধর্মীয় মতবাদের সকল কর্মকান্ড, এমন একটি আত্ম প্রবঞ্চনামূলক হওয়ার কারণে; সে সকল মতবাদের অনুরাগীরা কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, খুব সহজেই তারা আত্ম প্রবঞ্চনামূলক স্ববিরোধী আচরণে লিপ্ত হতে উৎসাহী হয়ে পড়েন। তাই তাঁদের চরিত্রে সুবিধাবাদী, পেশীবাদী, শঠ ও প্রতারণাবাদী প্রবণতা সবিশেষ লক্ষ্যনীয়। স্বীয় মতবাদ অপরের উপর জোর করে, ছলে-বলে-কৌশলে চাপিয়ে দেয়ার ঐতিহাসিক প্রবণতায় তখন তাঁরা জন্ম দেয় কুরুক্ষেত্র, ক্রুসেড ইত্যাদির ন্যায় ধর্মযুদ্ধ এবং এক হাতে ধর্মগ্রন্থ, অপর হাতে অসির উত্তোলন। যুগ বিবর্তনে তাঁদের এই চরিত্র পোষাক বদল করলেও, তা ধারবাহিকভাবে বিদ্যমান থাকে, এ সকল অন্ধ আবেগ সর্বস্ব মতবাদগুলোর মধ্যে; জন্মগত অভ্যাস, বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের কারণে। যু্ক্তি, বুদ্ধি ও আপন কর্ম নির্ভরতার কারণে, বুদ্ধের মতবাদ প্রচার প্রসারে কোন যুগে, কোন কালে, অস্ত্রশক্তি বা পেশী শক্তির মহড়া প্রদর্শনের অথবা কুট কৌশল অবলম্বনের প্রয়োজন হয়নি। বুদ্ধ তাঁর ধর্মমত প্রচার প্রসারে মানব জাতিকে সর্ব প্রথম উপহার দিয়েছিলেন ত্যাগ এবং নৈতিকতার উচ্চতম গুণে সুপ্রতিষ্ঠিত ‘সংঘ’ নামক সমষ্টিগত জীবনের এক মহতী আদর্শ। এ মহনীয় সমষ্টি হয়ে থাকে বুদ্ধের উপদিষ্ট শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞায় সমৃদ্ধ।
তৃতীয় পর্যায়ের ধর্ম প্রবক্তাগণ নিজেদেরকে মানবীয় যুক্তিকে ঈশ্বরের সরাসরি ঈশ্বর বলে দাবী করেছেন। আর সেই ঈশ্বরই যুগের প্রয়োজনে দুষ্টের দমনে এবং শিষ্টের পালনে মনুষ্য রূপে পৃথিবীতে আবির্ভূত হন। তাঁরা নিজেই নিজেকে অবতার বলে পরিচয় দিয়েছেন। অথবা তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল পরবর্তী শাস্ত্র রচয়িতারা, সেভাবেই এসব ধর্ম প্রবক্তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য জন সমক্ষে তুলে ধরেছেন। এ শ্রেণীর ধর্ম প্রবক্তাগণের অনুসারীদের বহুত্ববাদী বা অবতারবাদী বলা হয়। তাঁরা আপন বহুমুখি সমস্যার সমাধানে; এক একটি সমস্যার মুক্তিতে এক একজন কাল্পনিক দেব-দেবীর আশ্রয় গ্রহণ করে থাকেন।
ধর্ম প্রবক্তাগণের উপরোক্ত শ্রেণী বিন্যাসের মধ্যে গৌতম বুদ্ধ হলেন, একান্ত ভাবে যুক্তি ও বাস্তববাদী এক অসাধারণ পর্যায়ের ব্যক্তিত্ব। তিনি জন্মগত সূত্রে ছিলেন হিমালয়ের পাদবর্তী রাজ্য কপিলাবস্তু রাজ্যের অধিকারী মহারাজ শুদ্ধোধনের পুত্র। তৎকালীন ধনী-শ্রেষ্ঠী, রাজা মহারাজাদের ভোগ-বিলাসের প্রচলিত উপকরণ সমূহে প্রাচুর্য্যের কোন ব্যতিক্রম ছিল না, তাঁর জীবনেও। শীত, গ্রীষ্ম ও বর্ষা এই তিন প্রধান ঋতু উপভোগী তিনটি পৃথক পৃথক প্রাসাদে তার জন্যে বাড়তি কিছু ভোগ-বিলাসের ব্যবস্থা ছিল। ভোগের আতিশয্য তাঁর মনে ভোগের প্রতি বিতৃষ্ণার জন্ম দেয়। তৎকালে বারাণসীর শ্রেষ্ঠী পুত্র যশ এর মনেও এমনতরো বিতৃষ্ণা, মহাউপদ্রব রূপে দেখা দিয়েছিল। কিন্তু রাজপুত্র সিদ্ধার্থের মনে তেমনটি না হয়ে, প্রশ্ন দেখা দিল, জাগতিক জীবনে তিনটি অনিবার্য দুঃখ এই ব্যাধি, বার্ধক্য আর মৃত্যুর হাত থেকে চির অব্যহতি পাওয়ার কোন উপায় আছে কিনা। এ নিয়ে জীবন জিজ্ঞাসার তীব্র তাগিদ, তাঁকে ভোগ-বিলাসপূর্ণ রাজকীয় জীবনের পরিবর্তে, ঝুট্ ঝামেলা মুক্ত এবং অতিসংক্ষিপ্ত অথচ মুক্ত বিহঙ্গ সদৃশঃ সামান্য ভিক্ষা নির্ভর সন্ন্যাস জীবন গ্রহণে অনুপ্রাণিত করে। রাজকুমার সিদ্ধার্থের সন্ন্যাস জীবনের দীর্ঘ ছয় বছরের অন্বেষার পুরোটাই ছিল, দুঃখ মুক্তির উপায় সন্ধানে প্রচলিত প্রথাকে নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অনুশীলনের অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ। কিন্তু প্রচলিত কোন পন্থায়, আত্ম-জিজ্ঞাসার সদুত্তর না পেয়ে; একান্ত নিজস্ব উদ্ভাবিত পথই শেষ পর্যন্ত তাঁকে গ্রহণ করতে হলো। আর এ পথে অগ্রসর হতে গিয়ে জীবনের অতীত, বর্তমান ও অনাগত দুঃখের সামগ্রিক স্বরূপটা; তাঁর গভীর জ্ঞান জালে অবশেষে ধরা পড়লো। দুঃখের সেই সর্বগ্রাসী স্বরূপটাকে, তিনি যেভাবে একটি সুশৃঙ্খল উপায়ে গবেষণা ও ব্যাখ্যা দান করলেন; দেখা গেল তা রোগ নিরাময়ে চিকিৎসা শাস্ত্রের সেই সুশৃঙ্খল পদ্ধতির মতোই শৃঙ্খলাবদ্ধ। দেহধারীর নিকট ব্যাধি যেমন একটি অনিবার্য দুঃখদায়ক সমস্যা; তেমনি এই জাগতিক জীবন সংশ্লিষ্ট সমুদয় সমস্যাই তো দুঃখদায়ক। সেই দুঃখের চির অবসানে বুদ্ধ আবিষ্কৃত পদ্ধতির নাম চারি আর্যসত্য জ্ঞান এবং প্রতীত্যসমুৎপাদ নীতি জ্ঞান। এই জীবন সংশ্লিষ্ট বুদ্ধ মতবাদটির প্রচার-প্রসার ও স্থিতির জন্যে প্রয়োজন একান্ত নিবেদিতপ্রাণ। এতে অভাবনীয় ঋদ্ধিশক্তির যেই বিষ্ফোরণ ঘটে, তার চুম্বকীয় আকর্ষণ মানুষের হৃদয় জয় করে নিতে পারে অতি সহজে। তাই সত্যিকার ভাবে বলতে গেলে বুদ্ধমত প্রচারে প্রয়োজন মৈত্রী, করুণা, মুদিতা, উপেক্ষাগুণ সম্পন্ন শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞা সমৃদ্ধ একতাবদ্ধ এক সাংঘিক জীবন। রাজশক্তি, ধনশক্তি বা জনশক্তি বুদ্ধমত প্রচারে অহিংসা নীতি দ্বারা প্রভাবিত হলে, তা সহায়ক উপাদান হয় মাত্র। বিশ্বের ধর্ম প্রবক্তাদের মধ্যে বুদ্ধের ব্যক্তিত্বের ইহাই অত্যুজ্জ্বল বিশেষত্ব ইহাই প্রভেদ।
তৃতীয় পর্যায়ের ধর্ম প্রবক্তাগণ নিজেদেরকে মানবীয় যুক্তিকে ঈশ্বরের সরাসরি ঈশ্বর বলে দাবী করেছেন। আর সেই ঈশ্বরই যুগের প্রয়োজনে দুষ্টের দমনে এবং শিষ্টের পালনে মনুষ্য রূপে পৃথিবীতে আবির্ভূত হন। তাঁরা নিজেই নিজেকে অবতার বলে পরিচয় দিয়েছেন। অথবা তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল পরবর্তী শাস্ত্র রচয়িতারা, সেভাবেই এসব ধর্ম প্রবক্তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য জন সমক্ষে তুলে ধরেছেন। এ শ্রেণীর ধর্ম প্রবক্তাগণের অনুসারীদের বহুত্ববাদী বা অবতারবাদী বলা হয়। তাঁরা আপন বহুমুখি সমস্যার সমাধানে; এক একটি সমস্যার মুক্তিতে এক একজন কাল্পনিক দেব-দেবীর আশ্রয় গ্রহণ করে থাকেন।
ধর্ম প্রবক্তাগণের উপরোক্ত শ্রেণী বিন্যাসের মধ্যে গৌতম বুদ্ধ হলেন, একান্ত ভাবে যুক্তি ও বাস্তববাদী এক অসাধারণ পর্যায়ের ব্যক্তিত্ব। তিনি জন্মগত সূত্রে ছিলেন হিমালয়ের পাদবর্তী রাজ্য কপিলাবস্তু রাজ্যের অধিকারী মহারাজ শুদ্ধোধনের পুত্র। তৎকালীন ধনী-শ্রেষ্ঠী, রাজা মহারাজাদের ভোগ-বিলাসের প্রচলিত উপকরণ সমূহে প্রাচুর্য্যের কোন ব্যতিক্রম ছিল না, তাঁর জীবনেও। শীত, গ্রীষ্ম ও বর্ষা এই তিন প্রধান ঋতু উপভোগী তিনটি পৃথক পৃথক প্রাসাদে তার জন্যে বাড়তি কিছু ভোগ-বিলাসের ব্যবস্থা ছিল। ভোগের আতিশয্য তাঁর মনে ভোগের প্রতি বিতৃষ্ণার জন্ম দেয়। তৎকালে বারাণসীর শ্রেষ্ঠী পুত্র যশ এর মনেও এমনতরো বিতৃষ্ণা, মহাউপদ্রব রূপে দেখা দিয়েছিল। কিন্তু রাজপুত্র সিদ্ধার্থের মনে তেমনটি না হয়ে, প্রশ্ন দেখা দিল, জাগতিক জীবনে তিনটি অনিবার্য দুঃখ এই ব্যাধি, বার্ধক্য আর মৃত্যুর হাত থেকে চির অব্যহতি পাওয়ার কোন উপায় আছে কিনা। এ নিয়ে জীবন জিজ্ঞাসার তীব্র তাগিদ, তাঁকে ভোগ-বিলাসপূর্ণ রাজকীয় জীবনের পরিবর্তে, ঝুট্ ঝামেলা মুক্ত এবং অতিসংক্ষিপ্ত অথচ মুক্ত বিহঙ্গ সদৃশঃ সামান্য ভিক্ষা নির্ভর সন্ন্যাস জীবন গ্রহণে অনুপ্রাণিত করে। রাজকুমার সিদ্ধার্থের সন্ন্যাস জীবনের দীর্ঘ ছয় বছরের অন্বেষার পুরোটাই ছিল, দুঃখ মুক্তির উপায় সন্ধানে প্রচলিত প্রথাকে নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অনুশীলনের অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ। কিন্তু প্রচলিত কোন পন্থায়, আত্ম-জিজ্ঞাসার সদুত্তর না পেয়ে; একান্ত নিজস্ব উদ্ভাবিত পথই শেষ পর্যন্ত তাঁকে গ্রহণ করতে হলো। আর এ পথে অগ্রসর হতে গিয়ে জীবনের অতীত, বর্তমান ও অনাগত দুঃখের সামগ্রিক স্বরূপটা; তাঁর গভীর জ্ঞান জালে অবশেষে ধরা পড়লো। দুঃখের সেই সর্বগ্রাসী স্বরূপটাকে, তিনি যেভাবে একটি সুশৃঙ্খল উপায়ে গবেষণা ও ব্যাখ্যা দান করলেন; দেখা গেল তা রোগ নিরাময়ে চিকিৎসা শাস্ত্রের সেই সুশৃঙ্খল পদ্ধতির মতোই শৃঙ্খলাবদ্ধ। দেহধারীর নিকট ব্যাধি যেমন একটি অনিবার্য দুঃখদায়ক সমস্যা; তেমনি এই জাগতিক জীবন সংশ্লিষ্ট সমুদয় সমস্যাই তো দুঃখদায়ক। সেই দুঃখের চির অবসানে বুদ্ধ আবিষ্কৃত পদ্ধতির নাম চারি আর্যসত্য জ্ঞান এবং প্রতীত্যসমুৎপাদ নীতি জ্ঞান। এই জীবন সংশ্লিষ্ট বুদ্ধ মতবাদটির প্রচার-প্রসার ও স্থিতির জন্যে প্রয়োজন একান্ত নিবেদিতপ্রাণ। এতে অভাবনীয় ঋদ্ধিশক্তির যেই বিষ্ফোরণ ঘটে, তার চুম্বকীয় আকর্ষণ মানুষের হৃদয় জয় করে নিতে পারে অতি সহজে। তাই সত্যিকার ভাবে বলতে গেলে বুদ্ধমত প্রচারে প্রয়োজন মৈত্রী, করুণা, মুদিতা, উপেক্ষাগুণ সম্পন্ন শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞা সমৃদ্ধ একতাবদ্ধ এক সাংঘিক জীবন। রাজশক্তি, ধনশক্তি বা জনশক্তি বুদ্ধমত প্রচারে অহিংসা নীতি দ্বারা প্রভাবিত হলে, তা সহায়ক উপাদান হয় মাত্র। বিশ্বের ধর্ম প্রবক্তাদের মধ্যে বুদ্ধের ব্যক্তিত্বের ইহাই অত্যুজ্জ্বল বিশেষত্ব ইহাই প্রভেদ।
No comments:
Post a Comment