তাঁর প্রয়াণের পর থেকে থেমে যায় করুণার মহাসমুদ্র। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে এমন অতল করুণাময়ী মানুষ চির বিদায় নিলেন। চিকিৎসার জন্য পূজ্য বনভান্তেকে ২৬শে জানুয়ারী ২০১২সালে ঢাকা স্কয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসার কোনো ফল হয়নি তাই তিনি আর ফিরেননি আমাদের শ্রদ্ধার মন্দিরে। আজ তাঁকে স্মরণ করছি অকৃত্রিম শ্রদ্ধাভরে। তিনি ছিলেন আমাদের এক মহান পথপ্রদর্শক।
১৯২০ সালে ৮ই জানুয়ারী এই মহান পুরুষের শুভ জন্ম হয় রাঙামাটির মোরঘোনায়। তাঁর সান্নিধ্যে যারা এসেছিলেন তারা পূজ্য বনভান্তের জীবনাদর্শকে দেখে শ্রদ্ধাভরে বিশ্চিত হয়েছেন। যারা তার আদর্শের ছোঁয়া পায়নি তারা সেই মহান পুরুষের সন্ধানও পায়নি! তিনি ছোটবেলা থেকে ছিলেন ভোগে উদাসীন, ত্যাগে বিমল চন্দ্রের ন্যায়। কখনো স্ত্রী-পুত্র, ধন-জন আধিপত্য কামনা করেননি। একাহারী-একাকী জীবনাদর্শে তিনি ছিলেন আমৃত্যু সঙ্গী। বিশ্বের গুণীদের গুণ হিসাব করলে কীর্তিমান মানুষের ঊর্ধ্বে তিনি। স্ত্রী-পুত্র, ধনে-জনে, আধিপত্যে, মান প্রথিত যশ-বিলাস গুলোকে তিনি দুঃখ, দুঃখ সমুদয় প্রতিপদা ও ভারি বোঝা সদৃশ ভাবতেন। তাই তো স্ত্রী-পুত্র, ধন-জন আধিপত্য তাকে একবিন্দুও স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি ছিলেন প্রজ্ঞাবিমুক্তি ও চিত্তবিমুক্তিতে বলীয়ান পুরুষ। বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক, তার্কিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক সবকিছুর ঊর্ধ্ব শিখরে।
তিনটিলা থেকে ১৯৭৫ সালে রাঙ্গামাটিস্থ গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের পরামর্শক্রমে নব প্রতিষ্ঠিত রাজবন বিহারে এই দুর্লভ মানুষকে আমন্ত্রণ করে আনা হয় । রাজবন বিহারে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের সমাগম হতো কাঙ্খিত শ্রদ্ধায় পূজনীয়কে পূজা দিতে। এই মহান পুরুষ করুণাসিক্ত হৃদয়ে গ্রহণ করেন হাজারো ভক্তদের অনাবিল কাঙ্খিত শ্রদ্ধা। বীর উচ্ছ্বাসে গেয়ে যান মহান বুদ্ধের বাণী। প্রায় পঞ্চদশকেরও ঊর্ধ্বে অকাতরে জনগণের মাঝে বিলিয়ে যান বুদ্ধের অমৃত বাণী । থাইল্যান্ড, বার্মা, ভারত, শ্রীলঙ্কা, কম্বোডিয়া, ইত্যাদি দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে তার গুণমহিমা। বিভিন্ন গ্রন্থে বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত হয় তাঁর কীর্তি। তাঁর ত্যাগ-তিতিক্ষা ছিলো আমাদের মুগ্ধের কারণ। তিনি তিন দশকেরও অধিক কাল শয়ন ত্যাগে ব্রতী ছিলেন। দীর্ঘ ১২ বৎসর ধরে গভীর বনে ধ্যান করে হয়েছেন আজকের পূজ্য বনভান্তে।
.তাঁর দেশনা সকলকে আত্মজয়ী, আত্ম সচেতনতা, আত্মনিরর্ভুল হতে শেখায়। জাগ্রত করে সমগ্র মানব জাতির পরস্পর ভ্রাতৃত্ববোধ। যেখানে নেই কোনো ভেদাভেদ-বৈষম্য। তাই তিনি ছিলেন আমাদের ঐক্যর ধারক প্রণেতা। দেশের সকল মানুষের মাঝে জাগ্রত করেছেন মানবতাধর্মী বুদ্ধ ইতিহাসের চেতনা। কিন্তু আজ এমন গুণী মানুষকে গুটি কয়েকজনে সঠিক মূল্যায়ন করতে না পারাটা তাদের জন্য খুবই দুর্ভাগ্যের। সরকারীভাবে কোনো অগ্রাধিকার দেওয়া না হলেও লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়েছে। হয়ত জাতিবাদ, বৈষম্যবাদ তাকে মূল্যায়ন না করলেও মানবতা তাকে অবশ্যই মূল্যায়ন করেছিল। জনৈক কবি বলেছিলেন—
গাহি সাম্যের গান,
যেখানে আসিয়া এক হয়ে আছে,
সব বাধা ব্যবধান।
সেখানে মিশেছে
হিন্দু বৌদ্ধ, মুসলিম, খ্রিস্টান।
কৃতজ্ঞতা: শ্রীমৎ বীতশোক ভান্তে।