Followers

Sunday, January 7, 2018

পূজ্য বনভন্তের স্মরণে-


রাস্তায় দু’পাশে সারি সারি দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা নিবেদনে হাজার হাজার শোকাহত মানুষ। প্রত্যেকের হাতে নানা বর্ণের সুবাসভরা নানা রঙের ফুলের তোড়া।  কারো বুকে বুক ধাঁধাঁ অস্বস্তি আর কারো বুকে অশান্ত আত্মগ্লানির ধোঁয়া। সারিবদ্ধ মানুষেরা ভক্তিতে মনে মনে গেয়ে যায় সেই মহান মানবের কীর্তিগান। এভাবেই বিগত ৩০ জানুয়ারী ২০১২ইং এ সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ভক্তদের কাঁদিয়ে চলে গেলেন আর্যপুরুষ শ্রদ্ধেয় বনভান্তে।
তাঁর প্রয়াণের পর থেকে থেমে যায় করুণার মহাসমুদ্র। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে এমন অতল করুণাময়ী মানুষ চির বিদায় নিলেন। চিকিৎসার জন্য পূজ্য বনভান্তেকে  ২৬শে জানুয়ারী ২০১২সালে ঢাকা স্কয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসার কোনো ফল হয়নি তাই তিনি আর ফিরেননি আমাদের শ্রদ্ধার মন্দিরে। আজ তাঁকে স্মরণ করছি অকৃত্রিম শ্রদ্ধাভরে। তিনি ছিলেন আমাদের এক মহান পথপ্রদর্শক।

১৯২০ সালে ৮ই জানুয়ারী এই মহান পুরুষের শুভ জন্ম হয় রাঙামাটির মোরঘোনায়। তাঁর সান্নিধ্যে যারা এসেছিলেন তারা পূজ্য বনভান্তের জীবনাদর্শকে দেখে শ্রদ্ধাভরে বিশ্চিত হয়েছেন। যারা তার আদর্শের ছোঁয়া পায়নি তারা সেই মহান পুরুষের সন্ধানও পায়নি! তিনি ছোটবেলা থেকে ছিলেন ভোগে উদাসীন, ত্যাগে বিমল চন্দ্রের ন্যায়। কখনো স্ত্রী-পুত্র, ধন-জন আধিপত্য কামনা করেননি। একাহারী-একাকী জীবনাদর্শে তিনি ছিলেন আমৃত্যু সঙ্গী। বিশ্বের গুণীদের গুণ হিসাব করলে কীর্তিমান মানুষের ঊর্ধ্বে তিনি। স্ত্রী-পুত্র, ধনে-জনে, আধিপত্যে, মান প্রথিত যশ-বিলাস গুলোকে তিনি দুঃখ, দুঃখ সমুদয় প্রতিপদা ও ভারি বোঝা সদৃশ ভাবতেন। তাই তো স্ত্রী-পুত্র, ধন-জন আধিপত্য তাকে একবিন্দুও স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি ছিলেন প্রজ্ঞাবিমুক্তি ও চিত্তবিমুক্তিতে বলীয়ান পুরুষ। বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক, তার্কিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক সবকিছুর ঊর্ধ্ব শিখরে।
তিনটিলা থেকে ১৯৭৫ সালে রাঙ্গামাটিস্থ গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের পরামর্শক্রমে নব প্রতিষ্ঠিত রাজবন বিহারে এই দুর্লভ মানুষকে আমন্ত্রণ করে  আনা হয় । রাজবন বিহারে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের সমাগম হতো কাঙ্খিত শ্রদ্ধায় পূজনীয়কে পূজা দিতে। এই মহান পুরুষ করুণাসিক্ত হৃদয়ে গ্রহণ করেন হাজারো ভক্তদের অনাবিল কাঙ্খিত শ্রদ্ধা। বীর উচ্ছ্বাসে গেয়ে যান মহান বুদ্ধের বাণী। প্রায় পঞ্চদশকেরও ঊর্ধ্বে অকাতরে জনগণের মাঝে বিলিয়ে যান বুদ্ধের অমৃত বাণী । থাইল্যান্ড, বার্মা, ভারত, শ্রীলঙ্কা, কম্বোডিয়া, ইত্যাদি দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে তার গুণমহিমা। বিভিন্ন গ্রন্থে বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত হয় তাঁর কীর্তি। তাঁর ত্যাগ-তিতিক্ষা ছিলো আমাদের মুগ্ধের কারণ। তিনি তিন দশকেরও অধিক কাল শয়ন ত্যাগে ব্রতী ছিলেন। দীর্ঘ ১২ বৎসর ধরে গভীর বনে ধ্যান করে হয়েছেন আজকের পূজ্য বনভান্তে।

.তাঁর দেশনা সকলকে আত্মজয়ী, আত্ম সচেতনতা, আত্মনিরর্ভুল হতে শেখায়। জাগ্রত করে সমগ্র মানব জাতির পরস্পর ভ্রাতৃত্ববোধ। যেখানে নেই কোনো ভেদাভেদ-বৈষম্য। তাই তিনি ছিলেন আমাদের ঐক্যর ধারক প্রণেতা। দেশের সকল মানুষের মাঝে জাগ্রত করেছেন মানবতাধর্মী বুদ্ধ ইতিহাসের চেতনা। কিন্তু আজ এমন গুণী মানুষকে গুটি কয়েকজনে সঠিক মূল্যায়ন করতে না পারাটা তাদের জন্য খুবই দুর্ভাগ্যের। সরকারীভাবে কোনো অগ্রাধিকার দেওয়া না হলেও লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়েছে। হয়ত জাতিবাদ, বৈষম্যবাদ তাকে মূল্যায়ন না করলেও মানবতা তাকে অবশ্যই মূল্যায়ন করেছিল। জনৈক কবি বলেছিলেন—
গাহি সাম্যের গান,
যেখানে আসিয়া এক হয়ে আছে,
সব বাধা ব্যবধান।
সেখানে মিশেছে
হিন্দু বৌদ্ধ, মুসলিম, খ্রিস্টান।

কৃতজ্ঞতা: শ্রীমৎ বীতশোক ভান্তে।

বৌদ্ধধর্ম কেন সেরা ? -লেখক রাহুল বড়ুয়া

গৌতম বুদ্ধের মহা আবিস্কার প্রতীত্যসমুদপাদ নীতি বা কার্যকারণ নীতির মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক উপায়ে তিনি ধর্মের ব্যাখ্যা করেছেন। বুদ্ধের ধর্মের মূল শিক্ষা হল-

সমস্ত পাপ কাজ থেকে বিরত থাকা, কুশল কর্ম সম্পদান করা এবং নিজের চিত্তকে নির্মল রাখা।

আবার তথাগত বুদ্ধের শিক্ষা সমস্ত মানবজাতির জন্য। জীব জগতের সমস্ত প্রাণীগণ দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ করতে চাইলে তথাগত বুদ্ধের পথ অনুশীলনের মাধ্যমে দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ করতে পারবো। তথাগত বুদ্ধ বলছেন শীল, সমাধি, প্রজ্ঞার অনুশীলন বিহীন কারও দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ করা সম্ভব নয়।শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞার অনুশীলন করতে হলে আমাদের আর্যঅষ্টাঙ্গিক মার্গ বা Eightfold path অনুসরন করতে হবে।
বুদ্ধ আর্যঅষ্টাঙ্গিক মার্গের তিনটি মার্গকে শীলের মুল হিসাবে ব্যাখ্যা করেছেন। এই তিনটি হল- সম্যক বাক্য, সম্যক কর্ম ও সম্যক জীবিকা। তিনটি মার্গকে সমাধি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। এই তিনটি হল- সম্যক প্রচেষ্টা, সম্যক স্মৃতি ও সম্যক সমাধি। দুইটি মার্গকে ব্যাখ্যা করেছেন প্রজ্ঞা হিসেবে। প্রজ্ঞার এই দুই পথ হল- সম্যক দৃষ্টি ও সম্যক সঙ্কল্প। তাই সৎ দৃষ্টি, সৎ সংকল্প, সৎ বাক্য, সৎ চিন্তা,, সৎ কর্ম, সৎ জীবিকা, সৎ প্রচেষ্টা, সৎ স্মৃতি ও সৎ সমাধিকে অষ্ট বিশুদ্ধ পথ বলে অভিহিত করা হয়েছে।
মহামানব বুদ্ধ ছিলেন অহিংসা, ন্যায় ও সাম্যনীতির এক বলিষ্ঠ কণ্ঠ।অনুশাসন ছিল আত্মজয় ও আত্মপ্রতিষ্ঠার পক্ষে। তাই তার ধর্মে কোনো অলৌকিকত্ব নেই, নেই কোনো ঈশ্বরস্তুতি কিংবা ভক্তিবাদ। আছে শুধু বুদ্ধি ও বিবেকশাণিত যুক্তি ও আত্মজিজ্ঞাসা। আছে নিজকে দেখার, জানার ও বিচার করার পরম শিক্ষা। এটাই বৌদ্ধধর্মের মূল দর্শন। বৌদ্ধধর্মে কোনো ধরনের জাতি-বর্ণভেদ নেই, নেই কোনো ধরনের শ্রেণীবৈষম্যও। মানুষ হিসেবে তিনি সবাইকে দেখেছেন একই দৃষ্টিতে, সমজ্ঞানে। তাই বুদ্ধবাণীতে বারবার ধ্বনিত হয়েছে অহিংসা, শান্তি ও বিশ্বপ্রেমের কথা। উচ্চারিত হয়েছে মহাসাম্য ও মহামৈত্রীর কথা।

আরেকটি বিষয় বৌদ্ধধর্মকে অন্যান্য ধর্ম হতে অনন্য করেছে, আর তা হল নির্বাণ। বৌদ্ধধর্ম ছাড়া সকল ধর্মের একমাত্র লক্ষ্য হল স্বর্গ লাভ করা বা নরকে হতে রেহাই পাওয়া। কিন্তু বৌদ্ধধর্ম শুধুমাত্র স্বর্গ নরকেই সন্তুষ্ট নয়। স্বর্গকে গৌতম বুদ্ধ পৃথিবী বা মনুষ্যভূমি হতে একটি উন্নততর আর নরককে একটি নিম্মস্তরের অবস্থা বলে মনে করতেন। তাই তিনি স্বর্গে যাওয়া আর নরক হতে রেহাই পাওয়াকেই মূল বলে গুরুত্ব দেননি। স্বর্গ আর নরককে মানুষ পৃথিবীর মানুষের মতই ভোগ বিলাসে মত্ত বা যন্ত্রনায় কাতর। বুদ্ধ মানুষকে সকল দুঃখ সকল শৃঙ্খল হতে মুক্তি দিতে নির্বাণ লাভের কথা বলেছেন। নির্বাণ হল স্বর্গ ও নরক হতে উন্নততম একটি অবস্থা যেখানে মানুষ ভোগ বিলাস, দুঃখ কষ্টের প্রাপ্তি হতে মুক্ত।নির্বানগামীগণ আনন্দ বেদনা, লোভ, লজ্জা বা ভয় হতে মুক্ত। নির্বাণ প্রাপ্তির পর প্রাণী জন্ম জন্মান্তরের বন্ধন হতে মুক্ত হয়ে চির শান্তি লাভ করে। তাই বলাহয় নির্বাণ পরম সুখ।

বৌদ্ধধর্ম এমন একটি ধর্ম যে ধর্ম প্রচারিত হয়েছে শুধু মাত্র জ্ঞান সুধা বিতরণ ও মৈত্রী করুণা প্রদর্শনের মাধ্যমে। এই ধর্ম প্রচার করতে গিয়ে কোন দিন একটি মানুষকে আঘাত করা হয়নি। শুধু তাই নয় বৌদ্ধধর্ম প্রচার করতে গিয়ে একফোঁটা পশু রক্তও কোনদিন ঝরেনি। অথচ সকল শক্তির উত্স (?) ঈশ্বরের প্রেরিত ধর্ম সমুহের যুদ্ধ বিগ্রহ বা কলহের কারণে পৃথিবীতে সবচে বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। প্রাণীর কথা বাদ দিলাম, ঈশ্বরের কাল্পনিক শক্তির কাছে বা দয়ার কাছে বলি হয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষকে খুন হচ্ছে। বৌদ্ধধর্ম এই পাপ হতে মানুষকে মুক্ত করতে পেরেছে। তাই বৌদ্ধধর্মকে মহাশান্তি মহাপ্রেমের ধর্ম বলা হয়।

মহামানব গৌতম বুদ্ধের জন্ম, চারিত্রিক গুনাবলী, বুদ্ধত্বলাভের প্রক্রিয়া অত্যন্ত মর্যাদাদায়ক। বৌদ্ধধর্মের প্রচার ও ধর্মের আভ্যন্তরীণ দর্শন অত্যন্ত চমৎকার ও সুব্যাখ্যাত। তাই সকল মুক্ত চিন্তার স্বাধীন মানুষ বা সুধী মহলে সমাদৃত। এই ধর্ম প্রচারে যেমন রক্তপাত নেই ধর্মপালনেও নেই কোন হানাহানি। ফলে জোর জবরদস্তী করে বৌদ্ধধর্ম প্রচার করতে হয়না। নির্বাণ লাভের মাধ্যমে এই ধর্মে চিরশান্তি চির মুক্তির বাণী ঘোষণা করা হয়েছে।

Tuesday, January 2, 2018

ধর্ম আমাদের প্রকৃত আধ্যাত্মিক বোধের খোরাক এবং গভীর ভাবাবেগ- শ্রীমৎ বীতশোক ভিক্ষু


ধর্ম গায়ে মাখা বস্তু না। নয় বাহ্যিক বস্তুর নকশার প্রতীকও। এটা অনুভূতির শিহরণে বাঁধা এক প্রাণের সংযোগ। যা নিরন্তর সুখী এবং বিশ্ব মানবের একাত্মতা ভাব মানুষের জন্য। তাঁকে যদি আপনি কোখনো ভাবতে চান, অবশ্যই ভিন্ন একটি অনুভূতি নামক দেয়ালে হেয়াল দিয়ে দূর থেকে তাকান ধর্মের অস্তিত্ত্বর দিকে। যাঁর স্রোতে আপন মন হেড়ে যাবে ঐশ্বরিক দিব্য বস্তুর নিয়তিতে। আমি জানি এমন কিছু ব্যক্তি আছেন, যাঁরা ধর্মপ্রাণ নাম দিয়ে গায়ে মাখেন পবিত্র ধর্মকে। এঁদের মনে কিছুতেই শান্তি লাভ হয় না। কারণ এসব মানুষের অনুভূতির ক্রশটা ছিঁড়তে পারা কঠিন থাকে। যারপরণে সেই ব্যক্তির ভূল নিজের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। আর কোন সৎ আধ্যাত্মিক ব্যক্তিও যদি বলে দেয় উল্টো রিয়েকশান করে তাঁর ভাবের উপর।  অথচ না পায় কোনো আঁলো। আমরা এমন কিছু ভাবি যে, ধর্ম ইতিহাসের কাহিনীর মতো। যেগুলো বই -পত্রিকায়, এবং সংবাদ গণমাধ্যমে পড়ে, ইতিহাসের মতো ভাবি ও জেনে রাখি।  আসলে তেমন কিছু না। যাঁরা ইতিহাসের সারাংশ হিসেবে ধর্মবস্তুটি অনুমান করতে চায়, তাঁদের ঐ গবেষণা হচ্ছে, বাহ্যিক রঙ্গে দেখা কাতাল আকৃতির মতো। যা ভূল অনুমানে মনোনয়ন করা যেতে পারে। ধরূন! কোন এক অজ্ঞাত ব্যক্তি!  কাতাল সম্পর্কে কিছুই জানে না। সে বাহিরের কাঁটা কাঁটা রং দেখে কাতালের সুমিষ্ট গুণ কীভাবে জানবে। যদি সেই ব্যক্তি ভিতরের মিষ্টকষা গুলো না ছিঁড়ে দেখে! তাহলে ব্যক্তির দোষ কী কাতাল নিবে? প্রসঙ্গগতে, ধর্মের বাহ্যিক প্রতিকৃতি দেখে মিথ্যাবান নৃপতিও প্রকৃত স্বাদ জানবে কী করে। সে যদি নিজের সত্যময় আবেগকে নিজের মধ্যে খুঁজে না পায়। তখন ভূল যে নিজের মধ্যে ব্যহমান তাও জানে না। এমন কিছু কল্পনাও করতে পারি না আমরা, ধর্ম যেন শৈশবের বিস্কুট খেলার মতো। যেখানে- সেখানে ঝুলে থাকার অমূল্য বন্তু। আমরা কোখনো ভাবি না, প্রতিনিয়ত নিজের আবেগের স্রোতে ভূল, খারাপ, পাপ, অন্যায় চিন্তাগুলো আবহ পরিক্রমায় বইছে। সেগুলোর মধ্যেই আমরা আমাদের অধর্মের জন্য দায়ী। এই যে, এতগুলো খারাপ এবং ভূল চিন্তার মাঝে কিভাবে ধর্মকে চিনব। কিরূপে ধর্মকে জানব! প্রতিনিয়ত একটার পর একটা খারাপ চিন্তা আমাদের মনকে ব্যস্ত রাখছে। ধর্মের উপলব্ধিতে কীভাবে আমি আপন ঠিকানা খুঁজে নেব? বুদ্ধ তাঁর মনস্তাত্ত্বিক দর্শন অভিধর্ম পিটকে বলেছেন→ মানুষের মন থেকে ভূল চিন্তাকে তাড়ানো খুব কঠিন। যা জেদী শিকারী কুকুরের মতো। অন্যদিকে সৎ এবং ভাল চিন্তাকে তাড়ানো সহজই। যা তুলনা মূলক বনের হরিণের মতো। অথবা নিজের থেকে কুদৃষ্টিকে মুছে ফেলা বিরাট কঠিন। যা পাথরের দেয়ালে খোদাই করা অক্ষরের ন্যায়। অন্যথা মন থেকে সৎভাব চিন্তাকে হারিয়ে ফেলা খুবি সহজতর। যা জলে লেখনির অক্ষর সদৃশঃ। এভাবে কঠিন চিন্তার প্রবাহের মধ্যেই আমাদের জীবন অতীত হচ্ছে অনাবশেষ। ধর্ম বস্তুটির পূর্ণাংশও খুঁজে পাইনি একটি জীবন নয়, হাজার জীবনের বিনিময়েও। আমাদের ভাবতে হবে " ধর্ম আত্ম উপলব্ধির মনন আহার সদৃশ। তাই মন দিয়ে ধর্মের অস্তিত্ত্বকে খুঁজে নেওয়া সহজ। বাইরের গতানুক্রমিক পারিপার্শ্বিক সংগঠিত দৃশ্য থেকে নয়। সেগুলো শুধুমাত্র প্রত্যেক মানুষের প্রত্যেক চিন্তার সুগঠিত আবহ চক্র মাত্র। কাজেই সেই অংশকে নিয়ে আপনার ভাববাদ সৃষ্টির কোনো চুড়ান্ত নেই। ধর্ম মানে আত্মদৃষ্টিই হচ্ছে আত্মসুখের মূল।
সম্মান্বিত পাঠক, আসলে আমার এই প্রবন্ধটি লেখার কারণটা হচ্ছে, গত এক সময় কারোর লেখায় দেখলাম!  সে স্ট্যাটাস করেছে ধর্মকে বেশী গবেষণা করা ঠিক না। বেশি বেশি গবেষণা করলে নাকি "ইমান" চলে যাবে। এই পরিপ্রক্ষিতে।
বিষয়টি ঠিক এরূপ না! ধর্মবোধের গভীরে যাওয়ার ক্ষেত্রে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষের " বোধশক্তি" র পূজিঁ অবশ্যই থাকতে হবে। বিশেষ করে বৌদ্ধধর্মে এই সূত্রটি প্রাণিধান করা হয়েছে। আবার বোধশক্তির সাথে সাথে যথাযথ ভাবে চারটি গুণও নিজের মধ্যে অনুশীলন করতে হবে। যেমন-
১.আত্মসমর্পন
২. আত্মোপলব্ধি
৩. আত্মোৎসুক
৪. আত্মশুদ্ধি ভাব
প্রথমত: আত্মসমর্পন মানে বাহ্যিক সংগঠিত ধর্ম এবং আধ্যাত্মিক সংগঠিত ধর্ম উভয়ই ধর্মে কুশল বিষয়ে নিজেকে সমর্পন করা। সেই কুশল বিষয়ে বিরুদ্ধ না করা।
২. দ্বিতীয়ত: আত্মোপলব্ধি অর্থ হল সেই সু-সংগঠিত ধর্মের বিষয়ে গভীর ভাবে নিজেকে নিবিষ্ট রাখা। বা পুনঃ পুনঃ বিচার করা। যাচাই বাচাই করে আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে গভীর বোধ সৃষ্টি করা।
৩.তৃতীয়ত: আত্মোৎসুক অর্থ হলো কুশল ধর্মসমূহে ইচ্ছাধীন বা সমুৎচ্ছুক থাকা।
৪. চতুর্থত: আত্মশুদ্ধি মানে প্রত্যেক চিন্তার ক্ষেত্রে নিজেকে শুদ্ধভাব বা চিত্তশুদ্ধি রেখে চলতে হবে।
এই চার পদ্ধতি অনুসরণ করলে আরও সহজ হবে।
আমার মনে হয় ধর্ম যতই গবেষণা করা হয় ততই ধর্মের গৌঁড়ামী দূর হয়। বরং ব্যক্তিত্বও খোঁজ পায়। একজন মানুষের কাছ থেকে মুক্তি পায় মানসিক সংকীর্ণতা। তরলীয় এসিড পদার্থ দিয়ে সোনার ময়লাকে পরিস্কার করে সোনাকে নতুনত্ব খাঁটি সোনা করা হয়। জগতে শোধন সুধা দিয়ে মানব জাতির মনকে পবিত্র করা যায়। সেথা হলো একমাত্র ধর্ম। যেই চিরস্থির পরম্পরা মানব জাতিকে উজ্জ্বলতায় আঁলো প্রদান করে। জগতে তথাগত বুদ্ধই এই ধর্মের প্রবর্তক।
বৌদ্ধধর্মে বোধশক্তি বা উপলব্ধি হলো ধর্মদর্শনের গভীরে যাওয়ার পুজিঁ। বোধশক্তি ছাড়াই কোন দর্শনের সাধনাপূর্ণ লাভ করা যায় না। কোন ক্রেতা যেমন পয়সা বিনিময় না থাকলে কোন দ্রব্যই লাভ করতে পারেন না। ঠিক তেমনি বৌদ্ধধর্মে উন্নতি হতে হলে শ্রদ্ধা ও বোধশক্তি বা উপলব্ধি থাকতে হবে। শ্রদ্ধা ও বোধশক্তি না থাকলে বৌদ্ধদর্শনের মাত্রা অর্জন করা যায় না। ব্যক্তিস্বাধীন প্রয়োজনে বোধশক্তি বা উপলব্ধি হলো একান্তই ব্যক্তিগত সাধনাপুষ্ট ব্যপার। সাধনা অধম হলে আত্মশক্তির পূর্ণ বিকাশ দূরে থাক স্বতই আত্ম-উন্মোচনের প্রকৃত জ্ঞানও অর্জন সম্ভব হবে না। বুদ্ধবাণীর ভিত্তিসরুপ চতুরার্য সত্যতো প্রত্যেক বাস্তবসত্ত্বাকে উন্মোচন করে, নির্দেশ করে প্রকৃত মুক্তির দর্শন। ধর্ম্ম আপনার অস্তিত্ত্ব থেকে দুরে নয়। সেই প্রকৃত বস্তুটি অজ্ঞতা আবরণে নির্দিষ্ট আছে। আপনার ভিতরে দেখুন, আত্মানুসন্ধান করুন। ধম্ম স্বতই ব্যক্তিসত্ত্বাকে মুক্তি দিতে লেগেই আছে। কারোর প্রতি মমতাহীন ভাষা, কথা, কায়িক আচরণের বিধান এই ধর্মে নেই। শুধুমাত্র মানুষের সমতা রক্ষার প্রয়োজনে গৌতম বুদ্ধ এর বিনিময়ে ভালোবাসা, সহিষ্ণুতা, দয়া, করুণা ও আদরের বিবেচনাটুকু বিধানভূক্ত করেছেন। এ সমষ্ট শিক্ষা নৈতিক পালনের ক্ষেত্রে মানুষ নিজেরাই দায়িত্ববান হতে হবে। মানব জাতির জীবন অবাক চেতনার ধারাশূলে জীবিকার প্রণালীবদ্ধ। মোহশূলে এর সুমহান বিকল্প পথটি খুঁজে পান না। আসলে ব্যক্তিগত আত্ম- উন্মোচন থাকলে সর্বদিক বুদ্ধের সত্যময় সু-পরিকল্পিত বিধান পাওয়া সম্ভব। প্রকৃত মানব চেতনাকে উন্মোচিত করতে হলে বৌদ্ধদর্শনের সাধনা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় আরোপ মেনে নিতে হবে। তবে বৌদ্ধদর্শনের সাধনা লাভ করতে হলে আত্মবিবেচিত বোধ থাকতে হবে।বৌদ্ধধর্ম সর্বদা আত্মনিবেদিত ধর্ম। এই ধর্ম সব সময় আত্মবিশ্লষণ করে। অন্য কাউকে বিশ্লেষণ করা এই ধর্মের অভ্যাস আনুগত্যতা নেই। আত্মনিবৃতিতার্থে আত্মবিশ্লেষণ। বৌদ্ধধর্ম কারোর প্রতিপক্ষরুপ আচরণের শিক্ষা বা উপদেশ দেয় না। ইহার শিক্ষা শুধুমাত্র পাপ, অপরাধ, এবং অসত্য প্রতিপক্ষ হয়ে কথা বলে, শিক্ষা বা উপদেশ নির্দেশনা প্রয়াস করে। 
ইহার প্রথম সূত্র: শুধুমাত্র বিশ্বব্রম্মাণ্ডের মানুষ ও প্রাণী সবাই একই প্রেমের ফ্রেমে বাঁধা প্রাণজাতি। অর্থাৎ প্রেম নামক জালেই আবদ্ধ। আত্মনিবৃতির চারিতার্থ পূর্ণ না হলে এই ধর্মের আসনে অধিগত হওয়ার কোন সুরাহা নেই। তাই বুদ্ধ প্রত্যেক চিন্তাকে দৃঢ়ভাবে পরিশুদ্ধ পদ্ধতিতে ব্যবহার করতে বলেছেন। কোন চিন্তার প্রথাকে হুজুগে গ্রহণ বা উপধারণ করতে বলেননি। তিনি এও বলেছেন যে, সততই প্রত্যেক মানুষের চিন্তার উদ্রেক পরাক্রম ও অজেয় পদ্ধতিতে সৃষ্টি হবেই, তাই বলে প্রমত্ততারুপ প্রবাহ মাত্রিকতা অবলম্বন করে সেই চিন্তার স্রোতে নিজেকে হেলিয়ে দেওয়া যুক্তিযুক্ত মনে করা হয় না। বুদ্ধ শুধুমাত্র মনে করেছেন অপ্রমত্ত বা সংযম ভাব পদ্ধতিতে চিন্তাকে ব্যবহার করার প্রয়োজনীয়তাকে। নানা কারণ অস্থিরযুক্ত মনন থেকে মানুষ প্রত্যকটির সমস্যা মুখোমুখি হতে যান। তবু সংযম বা দমন ধারাবাহিত পদ্ধতিকে ভূলে যায় প্রত্যেক মতোয়ারা মানুষ। তাই মানুষ মাত্রিক নিজের সমস্যাই নিজেরাই অধিকারী। অথচ বেহাল ভাবুক হয়ে কেউ কাউকে দোষারোপ করার প্রয়োজনে পক্ষ-প্রতিপক্ষ চেতনায় উভয়ই ধ্বংস হতে শুরু করে। এভাবে মানুষের  সুশীল সমাজকে ফিরে পেতে পারে না। বুদ্ধ সেটাকে "হিংসা" নামক ধ্বংসাবশেষ অগ্নি নাম দিয়েছেন। ইহাতে দগ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা অবশ্যই আছে। তাঁর কারণে মানুষ ধ্বংস হওয়ারও হেতু নির্দিষ্ট আছে। বুদ্ধ নিষেধও করেছেন মানবজাতিকে→ তোমরা হিংসাগ্নিতে দগ্ধ হইওনা। এর পরিবর্তে তিনি দিয়েছেন- মৈত্রীর অনুশীলনের পদ্ধতি। ইহাই মানব জাতির শান্ত থাকার প্রয়াস। এই সূত্রধরে মানব জাতিরাই একে অপরকে স্নেহদর্শনে আবদ্ধ থাকবে।
প্রাবন্ধিক: শ্রীমৎ বীতশোক ভিক্ষু
সুবলং শাখা বন বিহার,  জুরাছড়ি।