ধর্ম গায়ে মাখা বস্তু না। নয় বাহ্যিক বস্তুর নকশার প্রতীকও। এটা অনুভূতির শিহরণে বাঁধা এক প্রাণের সংযোগ। যা নিরন্তর সুখী এবং বিশ্ব মানবের একাত্মতা ভাব মানুষের জন্য। তাঁকে যদি আপনি কোখনো ভাবতে চান, অবশ্যই ভিন্ন একটি অনুভূতি নামক দেয়ালে হেয়াল দিয়ে দূর থেকে তাকান ধর্মের অস্তিত্ত্বর দিকে। যাঁর স্রোতে আপন মন হেড়ে যাবে ঐশ্বরিক দিব্য বস্তুর নিয়তিতে। আমি জানি এমন কিছু ব্যক্তি আছেন, যাঁরা ধর্মপ্রাণ নাম দিয়ে গায়ে মাখেন পবিত্র ধর্মকে। এঁদের মনে কিছুতেই শান্তি লাভ হয় না। কারণ এসব মানুষের অনুভূতির ক্রশটা ছিঁড়তে পারা কঠিন থাকে। যারপরণে সেই ব্যক্তির ভূল নিজের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। আর কোন সৎ আধ্যাত্মিক ব্যক্তিও যদি বলে দেয় উল্টো রিয়েকশান করে তাঁর ভাবের উপর। অথচ না পায় কোনো আঁলো। আমরা এমন কিছু ভাবি যে, ধর্ম ইতিহাসের কাহিনীর মতো। যেগুলো বই -পত্রিকায়, এবং সংবাদ গণমাধ্যমে পড়ে, ইতিহাসের মতো ভাবি ও জেনে রাখি। আসলে তেমন কিছু না। যাঁরা ইতিহাসের সারাংশ হিসেবে ধর্মবস্তুটি অনুমান করতে চায়, তাঁদের ঐ গবেষণা হচ্ছে, বাহ্যিক রঙ্গে দেখা কাতাল আকৃতির মতো। যা ভূল অনুমানে মনোনয়ন করা যেতে পারে। ধরূন! কোন এক অজ্ঞাত ব্যক্তি! কাতাল সম্পর্কে কিছুই জানে না। সে বাহিরের কাঁটা কাঁটা রং দেখে কাতালের সুমিষ্ট গুণ কীভাবে জানবে। যদি সেই ব্যক্তি ভিতরের মিষ্টকষা গুলো না ছিঁড়ে দেখে! তাহলে ব্যক্তির দোষ কী কাতাল নিবে? প্রসঙ্গগতে, ধর্মের বাহ্যিক প্রতিকৃতি দেখে মিথ্যাবান নৃপতিও প্রকৃত স্বাদ জানবে কী করে। সে যদি নিজের সত্যময় আবেগকে নিজের মধ্যে খুঁজে না পায়। তখন ভূল যে নিজের মধ্যে ব্যহমান তাও জানে না। এমন কিছু কল্পনাও করতে পারি না আমরা, ধর্ম যেন শৈশবের বিস্কুট খেলার মতো। যেখানে- সেখানে ঝুলে থাকার অমূল্য বন্তু। আমরা কোখনো ভাবি না, প্রতিনিয়ত নিজের আবেগের স্রোতে ভূল, খারাপ, পাপ, অন্যায় চিন্তাগুলো আবহ পরিক্রমায় বইছে। সেগুলোর মধ্যেই আমরা আমাদের অধর্মের জন্য দায়ী। এই যে, এতগুলো খারাপ এবং ভূল চিন্তার মাঝে কিভাবে ধর্মকে চিনব। কিরূপে ধর্মকে জানব! প্রতিনিয়ত একটার পর একটা খারাপ চিন্তা আমাদের মনকে ব্যস্ত রাখছে। ধর্মের উপলব্ধিতে কীভাবে আমি আপন ঠিকানা খুঁজে নেব? বুদ্ধ তাঁর মনস্তাত্ত্বিক দর্শন অভিধর্ম পিটকে বলেছেন→ মানুষের মন থেকে ভূল চিন্তাকে তাড়ানো খুব কঠিন। যা জেদী শিকারী কুকুরের মতো। অন্যদিকে সৎ এবং ভাল চিন্তাকে তাড়ানো সহজই। যা তুলনা মূলক বনের হরিণের মতো। অথবা নিজের থেকে কুদৃষ্টিকে মুছে ফেলা বিরাট কঠিন। যা পাথরের দেয়ালে খোদাই করা অক্ষরের ন্যায়। অন্যথা মন থেকে সৎভাব চিন্তাকে হারিয়ে ফেলা খুবি সহজতর। যা জলে লেখনির অক্ষর সদৃশঃ। এভাবে কঠিন চিন্তার প্রবাহের মধ্যেই আমাদের জীবন অতীত হচ্ছে অনাবশেষ। ধর্ম বস্তুটির পূর্ণাংশও খুঁজে পাইনি একটি জীবন নয়, হাজার জীবনের বিনিময়েও। আমাদের ভাবতে হবে " ধর্ম আত্ম উপলব্ধির মনন আহার সদৃশ। তাই মন দিয়ে ধর্মের অস্তিত্ত্বকে খুঁজে নেওয়া সহজ। বাইরের গতানুক্রমিক পারিপার্শ্বিক সংগঠিত দৃশ্য থেকে নয়। সেগুলো শুধুমাত্র প্রত্যেক মানুষের প্রত্যেক চিন্তার সুগঠিত আবহ চক্র মাত্র। কাজেই সেই অংশকে নিয়ে আপনার ভাববাদ সৃষ্টির কোনো চুড়ান্ত নেই। ধর্ম মানে আত্মদৃষ্টিই হচ্ছে আত্মসুখের মূল।
সম্মান্বিত পাঠক, আসলে আমার এই প্রবন্ধটি লেখার কারণটা হচ্ছে, গত এক সময় কারোর লেখায় দেখলাম! সে স্ট্যাটাস করেছে ধর্মকে বেশী গবেষণা করা ঠিক না। বেশি বেশি গবেষণা করলে নাকি "ইমান" চলে যাবে। এই পরিপ্রক্ষিতে।
বিষয়টি ঠিক এরূপ না! ধর্মবোধের গভীরে যাওয়ার ক্ষেত্রে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষের " বোধশক্তি" র পূজিঁ অবশ্যই থাকতে হবে। বিশেষ করে বৌদ্ধধর্মে এই সূত্রটি প্রাণিধান করা হয়েছে। আবার বোধশক্তির সাথে সাথে যথাযথ ভাবে চারটি গুণও নিজের মধ্যে অনুশীলন করতে হবে। যেমন-
১.আত্মসমর্পন
২. আত্মোপলব্ধি
৩. আত্মোৎসুক
৪. আত্মশুদ্ধি ভাব
প্রথমত: আত্মসমর্পন মানে বাহ্যিক সংগঠিত ধর্ম এবং আধ্যাত্মিক সংগঠিত ধর্ম উভয়ই ধর্মে কুশল বিষয়ে নিজেকে সমর্পন করা। সেই কুশল বিষয়ে বিরুদ্ধ না করা।
২. দ্বিতীয়ত: আত্মোপলব্ধি অর্থ হল সেই সু-সংগঠিত ধর্মের বিষয়ে গভীর ভাবে নিজেকে নিবিষ্ট রাখা। বা পুনঃ পুনঃ বিচার করা। যাচাই বাচাই করে আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে গভীর বোধ সৃষ্টি করা।
৩.তৃতীয়ত: আত্মোৎসুক অর্থ হলো কুশল ধর্মসমূহে ইচ্ছাধীন বা সমুৎচ্ছুক থাকা।
৪. চতুর্থত: আত্মশুদ্ধি মানে প্রত্যেক চিন্তার ক্ষেত্রে নিজেকে শুদ্ধভাব বা চিত্তশুদ্ধি রেখে চলতে হবে।
এই চার পদ্ধতি অনুসরণ করলে আরও সহজ হবে।
আমার মনে হয় ধর্ম যতই গবেষণা করা হয় ততই ধর্মের গৌঁড়ামী দূর হয়। বরং ব্যক্তিত্বও খোঁজ পায়। একজন মানুষের কাছ থেকে মুক্তি পায় মানসিক সংকীর্ণতা। তরলীয় এসিড পদার্থ দিয়ে সোনার ময়লাকে পরিস্কার করে সোনাকে নতুনত্ব খাঁটি সোনা করা হয়। জগতে শোধন সুধা দিয়ে মানব জাতির মনকে পবিত্র করা যায়। সেথা হলো একমাত্র ধর্ম। যেই চিরস্থির পরম্পরা মানব জাতিকে উজ্জ্বলতায় আঁলো প্রদান করে। জগতে তথাগত বুদ্ধই এই ধর্মের প্রবর্তক।
বৌদ্ধধর্মে বোধশক্তি বা উপলব্ধি হলো ধর্মদর্শনের গভীরে যাওয়ার পুজিঁ। বোধশক্তি ছাড়াই কোন দর্শনের সাধনাপূর্ণ লাভ করা যায় না। কোন ক্রেতা যেমন পয়সা বিনিময় না থাকলে কোন দ্রব্যই লাভ করতে পারেন না। ঠিক তেমনি বৌদ্ধধর্মে উন্নতি হতে হলে শ্রদ্ধা ও বোধশক্তি বা উপলব্ধি থাকতে হবে। শ্রদ্ধা ও বোধশক্তি না থাকলে বৌদ্ধদর্শনের মাত্রা অর্জন করা যায় না। ব্যক্তিস্বাধীন প্রয়োজনে বোধশক্তি বা উপলব্ধি হলো একান্তই ব্যক্তিগত সাধনাপুষ্ট ব্যপার। সাধনা অধম হলে আত্মশক্তির পূর্ণ বিকাশ দূরে থাক স্বতই আত্ম-উন্মোচনের প্রকৃত জ্ঞানও অর্জন সম্ভব হবে না। বুদ্ধবাণীর ভিত্তিসরুপ চতুরার্য সত্যতো প্রত্যেক বাস্তবসত্ত্বাকে উন্মোচন করে, নির্দেশ করে প্রকৃত মুক্তির দর্শন। ধর্ম্ম আপনার অস্তিত্ত্ব থেকে দুরে নয়। সেই প্রকৃত বস্তুটি অজ্ঞতা আবরণে নির্দিষ্ট আছে। আপনার ভিতরে দেখুন, আত্মানুসন্ধান করুন। ধম্ম স্বতই ব্যক্তিসত্ত্বাকে মুক্তি দিতে লেগেই আছে। কারোর প্রতি মমতাহীন ভাষা, কথা, কায়িক আচরণের বিধান এই ধর্মে নেই। শুধুমাত্র মানুষের সমতা রক্ষার প্রয়োজনে গৌতম বুদ্ধ এর বিনিময়ে ভালোবাসা, সহিষ্ণুতা, দয়া, করুণা ও আদরের বিবেচনাটুকু বিধানভূক্ত করেছেন। এ সমষ্ট শিক্ষা নৈতিক পালনের ক্ষেত্রে মানুষ নিজেরাই দায়িত্ববান হতে হবে। মানব জাতির জীবন অবাক চেতনার ধারাশূলে জীবিকার প্রণালীবদ্ধ। মোহশূলে এর সুমহান বিকল্প পথটি খুঁজে পান না। আসলে ব্যক্তিগত আত্ম- উন্মোচন থাকলে সর্বদিক বুদ্ধের সত্যময় সু-পরিকল্পিত বিধান পাওয়া সম্ভব। প্রকৃত মানব চেতনাকে উন্মোচিত করতে হলে বৌদ্ধদর্শনের সাধনা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় আরোপ মেনে নিতে হবে। তবে বৌদ্ধদর্শনের সাধনা লাভ করতে হলে আত্মবিবেচিত বোধ থাকতে হবে।বৌদ্ধধর্ম সর্বদা আত্মনিবেদিত ধর্ম। এই ধর্ম সব সময় আত্মবিশ্লষণ করে। অন্য কাউকে বিশ্লেষণ করা এই ধর্মের অভ্যাস আনুগত্যতা নেই। আত্মনিবৃতিতার্থে আত্মবিশ্লেষণ। বৌদ্ধধর্ম কারোর প্রতিপক্ষরুপ আচরণের শিক্ষা বা উপদেশ দেয় না। ইহার শিক্ষা শুধুমাত্র পাপ, অপরাধ, এবং অসত্য প্রতিপক্ষ হয়ে কথা বলে, শিক্ষা বা উপদেশ নির্দেশনা প্রয়াস করে।
ইহার প্রথম সূত্র: শুধুমাত্র বিশ্বব্রম্মাণ্ডের মানুষ ও প্রাণী সবাই একই প্রেমের ফ্রেমে বাঁধা প্রাণজাতি। অর্থাৎ প্রেম নামক জালেই আবদ্ধ। আত্মনিবৃতির চারিতার্থ পূর্ণ না হলে এই ধর্মের আসনে অধিগত হওয়ার কোন সুরাহা নেই। তাই বুদ্ধ প্রত্যেক চিন্তাকে দৃঢ়ভাবে পরিশুদ্ধ পদ্ধতিতে ব্যবহার করতে বলেছেন। কোন চিন্তার প্রথাকে হুজুগে গ্রহণ বা উপধারণ করতে বলেননি। তিনি এও বলেছেন যে, সততই প্রত্যেক মানুষের চিন্তার উদ্রেক পরাক্রম ও অজেয় পদ্ধতিতে সৃষ্টি হবেই, তাই বলে প্রমত্ততারুপ প্রবাহ মাত্রিকতা অবলম্বন করে সেই চিন্তার স্রোতে নিজেকে হেলিয়ে দেওয়া যুক্তিযুক্ত মনে করা হয় না। বুদ্ধ শুধুমাত্র মনে করেছেন অপ্রমত্ত বা সংযম ভাব পদ্ধতিতে চিন্তাকে ব্যবহার করার প্রয়োজনীয়তাকে। নানা কারণ অস্থিরযুক্ত মনন থেকে মানুষ প্রত্যকটির সমস্যা মুখোমুখি হতে যান। তবু সংযম বা দমন ধারাবাহিত পদ্ধতিকে ভূলে যায় প্রত্যেক মতোয়ারা মানুষ। তাই মানুষ মাত্রিক নিজের সমস্যাই নিজেরাই অধিকারী। অথচ বেহাল ভাবুক হয়ে কেউ কাউকে দোষারোপ করার প্রয়োজনে পক্ষ-প্রতিপক্ষ চেতনায় উভয়ই ধ্বংস হতে শুরু করে। এভাবে মানুষের সুশীল সমাজকে ফিরে পেতে পারে না। বুদ্ধ সেটাকে "হিংসা" নামক ধ্বংসাবশেষ অগ্নি নাম দিয়েছেন। ইহাতে দগ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা অবশ্যই আছে। তাঁর কারণে মানুষ ধ্বংস হওয়ারও হেতু নির্দিষ্ট আছে। বুদ্ধ নিষেধও করেছেন মানবজাতিকে→ তোমরা হিংসাগ্নিতে দগ্ধ হইওনা। এর পরিবর্তে তিনি দিয়েছেন- মৈত্রীর অনুশীলনের পদ্ধতি। ইহাই মানব জাতির শান্ত থাকার প্রয়াস। এই সূত্রধরে মানব জাতিরাই একে অপরকে স্নেহদর্শনে আবদ্ধ থাকবে।
প্রাবন্ধিক: শ্রীমৎ বীতশোক ভিক্ষু
সুবলং শাখা বন বিহার, জুরাছড়ি।
প্রাবন্ধিক: শ্রীমৎ বীতশোক ভিক্ষু
সুবলং শাখা বন বিহার, জুরাছড়ি।
No comments:
Post a Comment