Followers

Sunday, January 7, 2018

বৌদ্ধধর্ম কেন সেরা ? -লেখক রাহুল বড়ুয়া

গৌতম বুদ্ধের মহা আবিস্কার প্রতীত্যসমুদপাদ নীতি বা কার্যকারণ নীতির মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক উপায়ে তিনি ধর্মের ব্যাখ্যা করেছেন। বুদ্ধের ধর্মের মূল শিক্ষা হল-

সমস্ত পাপ কাজ থেকে বিরত থাকা, কুশল কর্ম সম্পদান করা এবং নিজের চিত্তকে নির্মল রাখা।

আবার তথাগত বুদ্ধের শিক্ষা সমস্ত মানবজাতির জন্য। জীব জগতের সমস্ত প্রাণীগণ দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ করতে চাইলে তথাগত বুদ্ধের পথ অনুশীলনের মাধ্যমে দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ করতে পারবো। তথাগত বুদ্ধ বলছেন শীল, সমাধি, প্রজ্ঞার অনুশীলন বিহীন কারও দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ করা সম্ভব নয়।শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞার অনুশীলন করতে হলে আমাদের আর্যঅষ্টাঙ্গিক মার্গ বা Eightfold path অনুসরন করতে হবে।
বুদ্ধ আর্যঅষ্টাঙ্গিক মার্গের তিনটি মার্গকে শীলের মুল হিসাবে ব্যাখ্যা করেছেন। এই তিনটি হল- সম্যক বাক্য, সম্যক কর্ম ও সম্যক জীবিকা। তিনটি মার্গকে সমাধি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। এই তিনটি হল- সম্যক প্রচেষ্টা, সম্যক স্মৃতি ও সম্যক সমাধি। দুইটি মার্গকে ব্যাখ্যা করেছেন প্রজ্ঞা হিসেবে। প্রজ্ঞার এই দুই পথ হল- সম্যক দৃষ্টি ও সম্যক সঙ্কল্প। তাই সৎ দৃষ্টি, সৎ সংকল্প, সৎ বাক্য, সৎ চিন্তা,, সৎ কর্ম, সৎ জীবিকা, সৎ প্রচেষ্টা, সৎ স্মৃতি ও সৎ সমাধিকে অষ্ট বিশুদ্ধ পথ বলে অভিহিত করা হয়েছে।
মহামানব বুদ্ধ ছিলেন অহিংসা, ন্যায় ও সাম্যনীতির এক বলিষ্ঠ কণ্ঠ।অনুশাসন ছিল আত্মজয় ও আত্মপ্রতিষ্ঠার পক্ষে। তাই তার ধর্মে কোনো অলৌকিকত্ব নেই, নেই কোনো ঈশ্বরস্তুতি কিংবা ভক্তিবাদ। আছে শুধু বুদ্ধি ও বিবেকশাণিত যুক্তি ও আত্মজিজ্ঞাসা। আছে নিজকে দেখার, জানার ও বিচার করার পরম শিক্ষা। এটাই বৌদ্ধধর্মের মূল দর্শন। বৌদ্ধধর্মে কোনো ধরনের জাতি-বর্ণভেদ নেই, নেই কোনো ধরনের শ্রেণীবৈষম্যও। মানুষ হিসেবে তিনি সবাইকে দেখেছেন একই দৃষ্টিতে, সমজ্ঞানে। তাই বুদ্ধবাণীতে বারবার ধ্বনিত হয়েছে অহিংসা, শান্তি ও বিশ্বপ্রেমের কথা। উচ্চারিত হয়েছে মহাসাম্য ও মহামৈত্রীর কথা।

আরেকটি বিষয় বৌদ্ধধর্মকে অন্যান্য ধর্ম হতে অনন্য করেছে, আর তা হল নির্বাণ। বৌদ্ধধর্ম ছাড়া সকল ধর্মের একমাত্র লক্ষ্য হল স্বর্গ লাভ করা বা নরকে হতে রেহাই পাওয়া। কিন্তু বৌদ্ধধর্ম শুধুমাত্র স্বর্গ নরকেই সন্তুষ্ট নয়। স্বর্গকে গৌতম বুদ্ধ পৃথিবী বা মনুষ্যভূমি হতে একটি উন্নততর আর নরককে একটি নিম্মস্তরের অবস্থা বলে মনে করতেন। তাই তিনি স্বর্গে যাওয়া আর নরক হতে রেহাই পাওয়াকেই মূল বলে গুরুত্ব দেননি। স্বর্গ আর নরককে মানুষ পৃথিবীর মানুষের মতই ভোগ বিলাসে মত্ত বা যন্ত্রনায় কাতর। বুদ্ধ মানুষকে সকল দুঃখ সকল শৃঙ্খল হতে মুক্তি দিতে নির্বাণ লাভের কথা বলেছেন। নির্বাণ হল স্বর্গ ও নরক হতে উন্নততম একটি অবস্থা যেখানে মানুষ ভোগ বিলাস, দুঃখ কষ্টের প্রাপ্তি হতে মুক্ত।নির্বানগামীগণ আনন্দ বেদনা, লোভ, লজ্জা বা ভয় হতে মুক্ত। নির্বাণ প্রাপ্তির পর প্রাণী জন্ম জন্মান্তরের বন্ধন হতে মুক্ত হয়ে চির শান্তি লাভ করে। তাই বলাহয় নির্বাণ পরম সুখ।

বৌদ্ধধর্ম এমন একটি ধর্ম যে ধর্ম প্রচারিত হয়েছে শুধু মাত্র জ্ঞান সুধা বিতরণ ও মৈত্রী করুণা প্রদর্শনের মাধ্যমে। এই ধর্ম প্রচার করতে গিয়ে কোন দিন একটি মানুষকে আঘাত করা হয়নি। শুধু তাই নয় বৌদ্ধধর্ম প্রচার করতে গিয়ে একফোঁটা পশু রক্তও কোনদিন ঝরেনি। অথচ সকল শক্তির উত্স (?) ঈশ্বরের প্রেরিত ধর্ম সমুহের যুদ্ধ বিগ্রহ বা কলহের কারণে পৃথিবীতে সবচে বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। প্রাণীর কথা বাদ দিলাম, ঈশ্বরের কাল্পনিক শক্তির কাছে বা দয়ার কাছে বলি হয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষকে খুন হচ্ছে। বৌদ্ধধর্ম এই পাপ হতে মানুষকে মুক্ত করতে পেরেছে। তাই বৌদ্ধধর্মকে মহাশান্তি মহাপ্রেমের ধর্ম বলা হয়।

মহামানব গৌতম বুদ্ধের জন্ম, চারিত্রিক গুনাবলী, বুদ্ধত্বলাভের প্রক্রিয়া অত্যন্ত মর্যাদাদায়ক। বৌদ্ধধর্মের প্রচার ও ধর্মের আভ্যন্তরীণ দর্শন অত্যন্ত চমৎকার ও সুব্যাখ্যাত। তাই সকল মুক্ত চিন্তার স্বাধীন মানুষ বা সুধী মহলে সমাদৃত। এই ধর্ম প্রচারে যেমন রক্তপাত নেই ধর্মপালনেও নেই কোন হানাহানি। ফলে জোর জবরদস্তী করে বৌদ্ধধর্ম প্রচার করতে হয়না। নির্বাণ লাভের মাধ্যমে এই ধর্মে চিরশান্তি চির মুক্তির বাণী ঘোষণা করা হয়েছে।

No comments:

Post a Comment