Followers

Friday, June 23, 2017

বনভন্তেকে কি অরহৎ হতে হবে কি??


লেখকঃ- উজ্জ্বল বড়ুয়া বাসু
কেউ বলে বনভান্তে অর্হৎ, আবার কেউ বা বলে বনভান্তে অর্হৎ হলে তাঁর শরীরে ইনজেকশন পুশ করা হলো কেন? কেউ বলে দাহক্রিয়া করলেই তো ধরা পড়তো কোনটা সত্য কোনটা মিথ্যা, আবার কেউবা একটু রঙ লাগিয়ে প্রচার করে ভান্তের দেহ থেকে নাকি দুর্গন্ধ বেরিয়েছে আরো কত কি? আমার প্রশ্ন বনভান্তে কে কি অর্হৎ হতেই হবে?
প্রিয় পাঠক, আমরা মনুষ্যজাতির স্বভাব এটাই যে আমরা মানুষের ভালো দিক গুলো যতটুকু না প্রচার করি তার চেয়ে বেশী প্রচার করতে ইচ্ছুক খারাপ দিকটা। গুণীর সমাদর খুব কমই হয়। কৃতজ্ঞতাপরায়ণ মানুষের বড়ই অভাব। আর তাই সমাজে গুণীর সংখ্যা দিন দিন কমেই যাচ্ছে। যেখানে গুণীর সমাদর হয় না সেখানে গুণী ব্যক্তিরা যে জন্মগ্রহণ করে না।
প্রথমেই অর্হত্ব ফল লাভ নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক, সংক্ষেপে যিনি অরি বা তৃষ্ণার ক্ষয় সাধন করেন তিনিই অর্হৎ। অর্হৎ এর পুনর্জন্ম হয় না। সাধারণত একজন অর্হৎ ই চিনতে পারেন আরেকজনকে অর্হৎকে। অন্যদিকে দাহক্রিয়া শেষে প্রাপ্ত ধাতু দেখে সাধারণ লোকজনেরা অর্হৎ চিহ্নিত করতে পারে। অবশ্য অর্হৎ এর বৈশিষ্ট্য যেমন- নির্ভয়ী, আলস্যজয়ী, নিদ্রাজয়ী, অচঞ্চল এসব গুণ দেখেও অনেকে অর্হৎ বলে ধারণা করতে পারেন তবে এই ধারণা শতভাগ নির্ভূল নাও হতে পারে। তাই নিশ্চিত হওয়ার জন্য দাহক্রিয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।
এবার আসি বনভান্তে অর্হৎ কিনা এই বিষয়ে। ধরুন প্রমাণিত হল বনভান্তে অর্হৎ, তাহলে কি হবে? তাহলে যারা পূজ্য ভান্তেকে মনে অর্হৎ বলে ধারণ করেছেন তারা নিশ্চিত হবেন, তাদের শ্রদ্ধা আরো অনেকগুণ বেড়ে যাবে। সাথে যারা দ্বিধান্বিত ছিলেন কিংবা যারা বনভান্তেকে অর্হৎ মানতে নারাজ তারাও চুপ হয়ে যাবে। তাদের ভূল ভাঙবে।
আচ্ছা যদি প্রমাণিত হয় বনভান্তে অর্হৎ নন তাহলে কি হবে? তাহলে যারা অর্হৎ বলে ধারণা পোষণ করে আছেন মনে তাদের ধারণা ভূল ছিল এটাই প্রমাণিত হবে। আবারো বলছি, বনভান্তেকে কি অর্হৎ হতেই হবে? বনভান্তে যদি অর্হৎ না হন তবে বৌদ্ধ সমাজ কি তাঁর অবদানের কথা ভূলে যাবেন? এটা ভূলে গেলে চলবেনা যা বনভান্তে বৌদ্ধ সমাজে সদ্ধর্মের পুণর্জাগরন সৃষ্ঠি করেছেন। কি করেন নাই তিনি?
পূজ্য ভান্তের আগে কেউ কি শুধুমাত্র সংঘের জন্য বৌদ্ধ হাসপাতাল নির্মাণ হবে এই চিন্তা করেছিলেন? কেউ করুক বা না করুক বনভান্তে বাস্তবে তা করে দেখিয়েছেন। রেঙ্গুন বৌদ্ধ মিশন প্রেস ধ্বংস হয়ে ত্রিপিটক অনুবাদ প্রচার এক প্রকার থেমেই গিয়েছিল। বনভান্তে পুণরায় ত্রিপিটক প্রকাশনী তথা প্রেস চালু করেছেন শুধুমাত্র সদ্ধর্মের প্রচারের জন্য। প্রজ্ঞাবংশ ভান্তেকে পৃষ্ঠপোষকতা দান করেছেন ত্রিপিটক অনুবাদে, ফলে প্রজ্ঞাবংশ ভান্তে ও বনভান্তের অনেক শিষ্য ত্রিপিটক খন্ড অনুবাদ করেছেন অনেকগুলো, অনেকেই এখনও রত আছেন ত্রিপিটক অনুবাদে। ফলে অচিরেই আমরা সম্পূর্ণ ত্রিপিটক বাংলায় পাবো এই আশা এখন আর স্বপ্ন নয়। বনভান্তের প্রেরণায় নির্মিত হয়েছে পালি কলেজ। রাজবন বিহারে নির্মিত হয়েছে পাঁচতলা বিশিষ্ট বৌদ্ধ ধর্মীয় বইয়ের লাইব্রেরী। তাঁর শিষ্যরা এখন মায়ানমার থেকে অভিধর্ম শিখে এসে অভিধর্ম গবেষণা কেন্দ্র তৈরী করবেন সেই আশাও পোষণ করেন।
মূলত সাধনানন্দ মহাস্থবির (বনভান্তে) ছিলেন একজন ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ যাঁর আবির্ভাবে রাঙামাটি হয়ে উঠে পাহাড়ী-বাঙালী, জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষ প্রত্যেকের জন্য এক শান্তির জনপদ। মুসলিম-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সকলের কাছে সমানভাবে পূঁজনীয় হয়ে উঠেন তিনি তাঁর আপন কর্ম মহিমায়। কে হিন্দু, কে বৌদ্ধ, সেটা তাঁর কাছে বড় ছিল না। আমরা সবাই মানুষ আর দুঃখপীড়িত মানুষকে মুক্তির পথ দেখানোই ছিল তাঁর ব্রত। আর তাই এদেশের রাষ্ট্রনায়ক, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক থেকে শুরু করে দূর-দুরান্ত থেকে রাঙামাটির রাজবন বিহারে অসংখ্য মানুষের সমাগম হতো বিভিন্ন সময়ে তাঁকে এক নজর দেখার জন্য, তাঁর মুখনিশ্রিত বাণী শ্রবণের জন্য।
তাঁর অবস্থানের কারণে রাঙামাটিতে প্রাণীহত্য, মাদকদ্রব্য সেবন ও বিক্রয় অনেকাংশেই কমে যায়। রাজনৈতিক সংকটের সময় দেখা গেছে সারাদেশে হরতাল পালিত হলেও রাজবন বিহারে কোন অনুষ্ঠান থাকলে সেই অনুষ্ঠানের প্রতি সম্মান রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সেই হরতালের আওতামুক্ত রাখতো রাঙামাটিকে। রাজবন বিহারে হাসপাতাল নির্মিত হওয়ার পূর্বে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিশেষ দল নিজেদের হেলিকপ্টারে করে তাঁকে সেবা দেওয়ার জন্য হাসপাতালে নিয়ে গেছেন এমনও দেখা যায়।
প্রিয় পাঠক, এরকম অসংখ্য গুণে গুণবান পূজ্য ভান্তে অর্হৎ কি না এটা আজ তাই বড় প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে না। তাকে অর্হৎ হতেই হবে এমন কোন কথা নাই। তিনি অর্হৎ হোন বা না হোন আমাদের হৃদয়ে তাঁর অবস্থান হবে চির সমুজ্জ্বল। তাঁর মহৎ কর্মগুলো তাঁর হয়ে সহস্র শতাব্দী কথা বলবে। অনেকে তাঁর দেহ দাহ করা হচ্ছে না কেন এটা নিয়েও দ্বন্ধে জড়িয়ে পড়ে। তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চায়......

No comments:

Post a Comment