Followers

Tuesday, July 25, 2017

জীবনের প্রকৃত প্রয়োজন সম্পর্কে বুদ্ধ দর্শন

জীবনটা আসলে কি? এই প্রশ্নে ভাববাদী দার্শনিকগণ আবেগ, বিশ্বাস ও অগাধ ভক্তি নির্ভর হয়ে স্থির করে নিয়েছেন; এমনকি তাঁরা অদ্বিতীয় অনড় বিশ্বাসের জেহাদী ঘোষণা দিয়ে বসেছেন যে, এ জীবন এক অনাদি, অনন্ত মহাশক্তি, যিনি সকলের অদৃশ্য থেকে এ বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সব কিছু আপন খেয়ালে সৃষ্টি ও ধ্বংস করে চলেছেন। আর তাঁর অমোঘ নির্দেশে ও ইচ্ছায় সেই সৃষ্টিকে উত্থান-পতনের স্রোতে মহাপ্রলয় নামক অনিবার্য ধ্বংসের দিকে বহমান রেখেছেন। এ দু’নয়নে দৃশ্যমান চন্দ্র, সূর্য থেকে শুরু করে অসংখ্য অদৃশ্যমান বস্তু ও প্রাণীকূল, ফলমূল, বৃক্ষ-লতা, নদী-নালা, পাহাড়-পর্বত; সব কিছুই তাই সেই অদৃশ্য মহাশক্তির দ্বারা সৃষ্ট, নিয়ন্ত্রিত ও ধ্বংসের অধীন। এই অদৃশ্য মহাশক্তিকে কেহ নাম দিয়েছেন আল্লাহ; কেহ বলেছেন ঈশ্বর; আবার কেহ বা বলেছেন মায়া; কেহ বা প্রকৃতি, নিয়তি ইত্যাদি। বস্তুবাদী, পরীক্ষণ-নিরীক্ষণ পন্থী বৈজ্ঞানিকেরা এ প্রসঙ্গে কী বলেন? এ জীবন ও জগতকে নিয়ে প্রতিনিয়ত উচ্ছারিত যে প্রশ্ন,  তাকে তাঁরা দু’ভাগে ভাগ করতে দেখা যায়; জড় ও অজর প্রাণ। জড় বলতে বস্তু বা পদার্থ; যা অণু, পরমাণু দ্বারা গঠিত। এই অণু-পরমাণুর জটিল প্রক্রিয়া হতে উদ্ভব হয় প্রাণের। এখানে তারা অদৃশ্য তৃতীয় কোন শক্তি-মহাশক্তির অসিত্মত্ব্‌ স্বীকার করতে মোটেই রাজি নহেন। গবেষণাগারে শব ব্যবচ্ছেদের ন্যায় তন্ন তন্ন করে বস্তুকে পরীক্ষণ, নিরীক্ষণ, সংশ্লেষণ, সংযোজন, বিয়োজনের মাধ্যমে ইদানিং কালের জীব বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার ‘জীন’, ‘ক্লোন’। এ সকল পদ্ধতিতে তাঁরা জীবন্ত ভেড়া থেকে মানুষ পর্যন্ত বানানোর অঙ্গীকার এখন করে ফেলেছেন-এমনকি বাস্তবায়িতও করেছেন। একদিকে ভাববাদী ধর্ম প্রবক্তা ও দার্শনিক এবং অপরদিকে বস্তুবাদী বৈজ্ঞানিকগণ; উভয়ে বর্তমান বিশ্বে এখন দুই বিপরীত মেরুতেই অবস্থান গ্রহণ করেছেন। এ ক্ষেত্রে বলা সঙ্গত যে, চর্ম চক্ষুর প্রত্যক্ষ গোচরীভূত, হাতে-নাতে প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক সাফল্যকে, এখন উঁড়িয়ে দেয়ার মতো ক্ষমতা, বর্তমানে কট্টরপন্থী ঘোর ভাববাদীরা পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেছেন ইদানিং কালের বিশ্বে। যায় যায় রব উঠেছে তাই, ভাববাদীদের আকাশ-কুসুম তাসের ঘরে। প্রদীপ নেভার আগে দপ্‌ করে জ্বলে উঠার ন্যায় তাঁরা এজন্যেই এখন জেহাদী, ক্রুসেডী, কুরুক্ষেত্রীদের ন্যায় হুংকার দিয়ে বলতে শুরু করেছেন; বিজ্ঞান নামক শয়তানের গলাটিপে মারো, তারা সুন্দর সুষম আদরনীয় মানব সমাজ, সভ্যতার নৈতিক ভ্‌িতকে একেবারে ধ্বংস করে দিচ্ছে। অথচ হাস্যকর দৃশ্য হলো, সেই ভাববাদী ভক্তবৃন্দ বিজ্ঞানের সাধনালব্ধ যাবতীয় ফসল বিনা দ্বিধায় ভোগ করতে কিন্তু এক পাও পিছিয়ে নেই। কোন অরুচি নেই বৈজ্ঞানিক প্রদত্ত সকল সুযোগ-সুবিধে ও আমোদ-প্রমোদ তাঁরা উপভোগ করতে। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে বিজ্ঞানের বর্তমান অগ্রগতি হাজার হাজার বছরের ভাববাদী ধর্ম ও দর্শনের প্রবল প্রতাপী সিংহাসনে এখন প্রবল ভূমিকম্পের সৃষ্টি করেছে। সুধী পাঠক! যীশু খৃষ্টের জন্মের পাঁচশো বছর আগে এবং হযরত মুহম্মদের এক হাজার বছর আগে প্রচারিত বিশ্বের প্রাচীনতম ধর্মমত মহান বুদ্ধের দর্শন এ প্রসঙ্গে কি বলেন? এই ধর্ম ও দর্শন বিজ্ঞানের বর্তমান অগ্রগতিতে প্রকম্পিত কি? ‘প্রাণ’ সম্পর্কীত বিজ্ঞানের অতি সামপ্রতিক আবিষ্কারের প্রশ্নে কী জবাব দেবে বুদ্ধের ধর্ম ও দর্শন? চারি আর্য সত্য জ্ঞান এবং প্রতীত্য সমুৎপাদ জ্ঞান এ দু’টি শব্দ বুদ্ধ দর্শনের মূল এবং অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চারি আর্য সত্য জ্ঞান অর্থে দুঃখ, দুঃখের কারণ, দুঃখের নিরোধ এবং নিরোধের উপায় জ্ঞান। প্রতীত্য সমুৎপাদ অর্থে জীবন দুঃখের উৎপত্তি ও নিরোধের উপায় সম্পর্কে মনস্তাত্তিক কার্য-কারণ বা হেতু-প্রত্যয় সম্পর্কে জ্ঞান। বুদ্ধ দর্শনের এ দুই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুদ্ধের ধর্ম ও দর্শনকে একদিকে বর্তমান বিশ্বের অপরাপর ধর্ম সমূহের পর্যায়ভুক্ত যেমন করেছে, আবার বস্তু বিজ্ঞানের সাথেও নিজেকে সম্পৃক্ত করেছে গভীরভাবে। প্রাণের সৃষ্টি সম্পর্কে বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে বিশ্ব মানব সমাজের নৈতিক ধস্‌ নিয়ে অন্যান্য ধর্মের গুরুদের যেই উদ্বেগ, উৎকন্ঠা; সেই উৎকন্ঠা বৌদ্ধ ধর্ম গুরুদের থাকার কথা নহে। কেন থাকবে না, তা বুদ্ধের ধর্ম-দর্শনের মূলতত্ত্ব প্রতীত্য সমুৎপাদ জ্ঞান বা কার্যকারণ তত্ত্বকে নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করলেই বুঝা যাবে। কী বলেন তথাগত বুদ্ধ তাঁর চারি আর্য সত্য ও ‘প্রতীত্য সমুৎপাদ’ নামক তত্ত্ব দর্শনে? প্রিয় পাঠক চলুন, আমরা পর্যালোচনা করে দেখি বুদ্ধের এই চারি আর্য সত্য ও প্রতীত্য সমুৎপাদ দর্শনকে। স্থুল আবেগ বহুল এবং ভোগ নির্ভর, অসম্যক, অযথার্থদর্শী সাধারণ জীবন এবং দৈহিক নিপীড়নে সুফল হীন কৃচ্ছ সাধন-এ দুই অন্ত ত্যাগ করে দেহ-মনের সুস্থ ভারসাম্য তথা স্বাভাবিকতা নিয়ে, উদ্যম পরাক্রমের মাধ্যমে মহৎ লক্ষ্য অর্জনে যেই চেষ্টা সাধনা তাকে বলা হয় ‘মজ্ঝিম পতিপদা’ তথা মধ্যম পন্থী জীবন চর্যা। বুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় বলা হয়েছে, এভাবেই সম্ভব হয় প্রজ্ঞা নামক গভীর অন্তর্দৃষ্টি অর্জন। এরূপ গভীর অন্তর্দৃষ্টিতেই ধরা পড়ে এ জীবন ও জগত রহস্য। জীবন-দুঃখের চির অবসানে চারি আর্য সত্য দর্শনের ইহাই মূল কথা। বিনা কারণে কোন কার্যই এ পৃথিবীতে সংগঠিত হয় না; বুদ্ধের প্রতীত্য সমুৎপাদ তত্ত্ব দর্শনের মূল কথাও এটি। এ দুই দর্শনের সমন্বয় সাধন দ্বারা সর্ব দুঃখহীন যেই অপার মানসিক সুখ-শান্তি লাভ হয়, তার নাম দেয়া হয়েছে নির্বাণ। অর্থাৎ জীবন-মনের যেই স্তরে সকল প্রকার সংকীর্ণতার বান বা বন্ধনের অসিত্মত্ব আর খুঁজে পাওয়া যায় না, তাহাই নির্বাণ। নিজের ও পরের জীবনেই শুধু নহে; এ বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের জড়-অজড় সব কিছুতেই আমাদের জ্ঞাতে ও অজ্ঞাতে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত; এই ত্রিকালিক সম্পর্কীত হয়ে অবিরাম ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার যেই অনন্ত-বিশাল প্রবাহ বিদ্যমান; তার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে বুদ্ধের প্রতীত্য সমুৎপাদ তত্ত্বের সাথে আধুনিক জড় বিজ্ঞানের কোন বিরোধ নেই। পার্থক্য শুধু বিষয়ের প্রাধান্যতায়। বুদ্ধের প্রাধান্যতা মনের ব্যাপক বিশ্লেষণে; অপরদিকে আধুনিক বিজ্ঞানের প্রাধান্যতা বস্তুর ব্যাপক বিশ্লেষণে। মূলতঃ মনের যেই কৌতুহলী শক্তির প্রয়োগ জড় বিজ্ঞানের মূল ভিত্তি; সেই মনের অপার শক্তির আবিষ্কারক হলেন বুদ্ধ। তাই দেহ মন ও জাগতিক যাবতীয় কর্মকাণ্ডে সৃষ্টা নামক অদৃশ্য কাল্পনিক অসিত্মত্বের অপ্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বস্তু বিজ্ঞানী ও বুদ্ধ উভয়েই সম্পূর্ণ একমত। কারণ বিনা কারণে কোন কিছুর উদ্ভব অসম্ভব। এই অনিবার্য সত্যটি স্বীকার করে নিয়ে বুদ্ধের দর্শন এবং বিজ্ঞানের সিদ্ধান্ত হলো, একক কোন শক্তির দৃশ্য বা অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের সব কিছুকে আনা অসম্ভব। প্রত্যেকটি ঘটনা স্ব স্ব স্বভাব ও পরিস্থিতি সম্ভূত। তারা কার্যকারণ নিয়ম শৃঙ্খলার অধীন, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া মাত্র। জড়-বিজ্ঞান এখন জিনতত্ত্বের মাধ্যমে প্রাণ-বিজ্ঞানে তার জয়-যাত্রাকে অপ্রতিরোধী করে তুলেছে। এই প্রযুক্তি এখন জীবন্ত ভেড়া, এমনকি উর্বর মননশীলতা সম্পন্ন মানব পর্যন্ত বিজ্ঞানের গবেষণাগারে তৈরী করার যোগ্যতায় আশাবাদী হয়ে উঠেছে। আধুনিক প্রাণ বিজ্ঞানের এই সাফল্য, আড়াই হাজার বছর আগের শ্রেষ্ঠ মনোবিজ্ঞানী বুদ্ধের অনাত্মবাদ ও ক্ষণিকবাদকে এক অনন্য স্বীকৃতির আসনেই এখন প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিজ্ঞানের জয় যাত্রায় মহান বুদ্ধকে অগ্রজ বড়ো ভয়ের মর্যাদা দান করলো প্রশ্নাতীতভাবে। অপরদিকে বুদ্ধের দর্শন স্রষ্টাবাদীদেরকেও সঠিক পথ নির্দেশনা দিয়ে থাকেন এই বলে যে কেন আমরা অহেতুক অদৃশ্য মহাশক্তির কল্পনায় আপন বিবেক বুদ্ধির বিসর্জন দিয়ে অন্ধ আবেগের ফানুসে ভাসমান থাকবো? মানুষকে সংযত সুশৃঙ্খল জীবন গঠনের লক্ষ্যে স্বর্গের আকর্ষণ, নরকের ভীতি, সাধারণ মানুষের বোধগম্যতায় আনতে, স্রষ্টা নামক কাল্পনিকতার আশ্রয় না নিয়েও তো পারা যায়। আমাদের এই দেহ মনের প্রতিটি ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার কার্যকারণ ভিত্তিক অনুসন্ধানেও তো সেই স্বর্গ-নরকের অসিত্মত্ব প্রমাণ করা যায়। ভালো কাজের ভালো ফল, মন্দ কাজের মন্দ ফল। ভালো কাজের জন্যে পুরস্কার এবং মন্দ কাজের জন্যে যেই শাসিত্ম, তা দেয়ার জন্যে আমার কর্মই তো একমাত্র নির্ধারক হয়ে পুরস্কার দাতা ও শাসিত্ম দাতা হয়ে থাকে। স্বর্গ-নরক তো মোটেই কাল্পনিক নহে। ইহারা তো একান্তই কার্য-কারণ তত্ত্ব ভিত্তিক কর্ম ও কর্মফলের এক একটি পরিস্থিতি বা অবস্থা মাত্র। ভালো কাজের পুরস্কার, আনন্দ ও তৃপ্তি। আর মন্দ কাজের স্বাভাবিক ফল হবে শাসিত্ম, দুঃখ, তাপ, হাহাকার। স্বর্গ-নরক তো এই ভালো-মন্দের অনিবার্য পরিণতির প্রতীকী শব্দ মাত্র। এমন বাস্তব সত্য নিয়ে এত মুখরোচক গল্প কেন? প্রাণী মাত্রেই সুখ, আরাম, শান্তি, নিরাপত্তা এসবের একান্ত প্রত্যাশী। এটাতো জড়-অজড় নির্বিশেষে প্রাণের স্বভাব ধর্ম। প্রাণের স্বাভাবিক গঠন বৈশিষ্ট্য থেকেই তার এ স্বভাব প্রবৃত্তির জন্ম। জড় প্রাণ সেই উদ্ভিদ লতাপাতা বলুন বা সচল প্রাণ মানুষ পশু পক্ষী কীটপতঙ্গই বলুন; সবাক-নির্বাক সবার মাঝেই তো একই প্রবণতা বিদ্যমান। সুখের প্রত্যাশা আর দুঃখের বিরোধীতা তো সবাই করে। দুঃখের মুক্তি থেকেই তো অনিবার্যভাবে সুখের জন্ম। অতএব, সুখের প্রত্যাশায় এত অবাস্তব গল্প কাহিনী কেন? তাই বুদ্ধ তথাগত এই দুঃখ-মুক্তির জন্যে এ কারণেই উপায় নির্দেশ করলেন, ‘চারি-আর্য-সত্য’ তত্ত্ব-দর্শনের মাধ্যমে। পাঠক, একটু ভাবলেই বুঝতে পারবেন বুদ্ধ প্রদর্শিত এই চারি আর্যসত্য দর্শন কী অসম্ভব রকমে অন্ধ আবেগ এবং সর্বপ্রকার কাল্পনিকতা মুক্ত। ডাক্তার যেমন রোগীর রোগযন্ত্রণা লাঘবের উপায় নির্ধারণে সর্ব প্রথম সন্ধান করেন রোগের বর্তমান লক্ষণ (রোগীর যন্ত্রণা, অসুবিধা, অস্বসিত্ম) কি কি; দ্বিতীয় পর্যায়ে সন্ধান করেন এই রোগের উৎপত্তির সম্ভাব্য কারণ কি কি হতে পারে ; তৃতীয় পর্যায়ে ঔষধ প্রয়োগের মাধ্যমে লক্ষ্য করেন রোগের হ্রাস-বৃদ্ধির গতি-প্রকৃতিকে এবং অন্তিম পর্যায়েই সঠিক ঔষধ প্রয়োগ করেন রোগের সম্পূর্ণ নির্মূল, ধ্বংস সাধনে। চিকিৎসা পদ্ধতির এই অবিকল পদ্ধতিই মহাজ্ঞানী তথাগত বুদ্ধ কর্তৃক অনুসৃত হয়েছে তাঁর চারি আর্যসত্য দর্শনতত্ত্বে। জীবনের যাবতীয় দুঃখের চির অবসানের যথার্থ দর্শন ‘চারিআর্যসত্য জ্ঞান’ ইহা কেবলমাত্র দর্শন নহে, ইহা একান্ত বাস্তবতা ভিত্তিক অনুশীলনধর্মী এক অভাবনীয়, অদ্বিতীয় উপায়। আর এ কারণেই বুদ্ধ তথাগতের কন্ঠে উদগীত হয়েছে-“একায়নো অয়ং ভিক্‌খবে মগ্‌গো সত্ত্বানং বিসুদ্ধিয়া, সোকো পরিদেবানং সমতিক্কমায়, দুঃখ-দোমনস্‌সানং অত্থঙ্গমায়, ঞায়স্‌স অধিগমায়, নিব্বানস্‌স সচ্চি কিরিয়ায়-যদিদং চত্তারো সতিপট্‌ঠান।”
 একমাত্র আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের যথার্থ অনুশীলনধর্মী জীবন গঠনের উপায় এই চারি প্রধান পদ্ধতিতে স্মৃতির অনুশীলন দ্বারাই প্রাণীগণের চিত্ত ও জীবন দৃষ্টি বিশুদ্ধি, শোক পরিতাপের সম্যক অতিক্রম, দুঃখ-দুর্মনাভাবের চির অবসান (অস্তগমন), জ্ঞান অধিগম এবং নির্বাণ সাক্ষাতকরণ সম্ভব হয়।
মহাজ্ঞানী বুদ্ধ প্রবর্ত্তিত চারি আর্য সত্য দর্শনের মূল কথা হলো জীবনে যত প্রকার সমস্যা আছে। সকল সমস্যাকে গভীর মনোনিবেশ সহকারে দুঃখ রূপেই জানা। সে সকল দুঃখের উৎপত্তির কারণ তখন স্বভাবতই তোমার জ্ঞান দৃষ্টিতে ধরা পড়বে। দ্বিতীয় পর্যায়ে তখন তোমার কর্তব্য হয়ে পড়বে দুঃখ উৎপত্তি বা সমস্যার এই কারণকে সজ্ঞানে অতি সাবধানে পরিত্যাগের জন্যে বুদ্ধ প্রদর্শিত অষ্টাঙ্গিক মার্গজীবী হয়ে সাধনায় ঐকান্তিকভাবে নিজেকে সমর্পিত করা। এই চেষ্টা সাধনার সময়ে তৃতীয় পর্যায়ে নিবিষ্ট চিত্তে লক্ষ্য রাখতে হবে উৎপন্ন প্রতিটি সমস্যা কিভাবে কোন পথে, কি উপায়ে একের পর এক বিদায় নিচ্ছে। তাই বৌদ্ধ দর্শনের পরিভাষায় বলা হয়েছে- দুঃখ সত্যকে জ্ঞাত হও, সমুদয় সত্যকে ত্যাগ করো, নিরোধ সত্যকে প্রত্যক্ষ করো এবং মার্গ সত্যকে গঠন করো।
ইহা একান্তই সত্য যে, দুঃখটা হলো প্রাণের স্বাভাবিক চাহিদা সেই ‘সুখ’ লাভের পথে একমাত্র প্রতিবন্ধক। তাই দুঃখ নামক এই প্রতিবন্ধকতাকে দূর করতে হলে মুক্তিকামীর প্রথম কর্তব্য হবে, এ সকল দুঃখের মূল কারণ যথাযথভাবে জানা। এই জানার জন্যে আমরা পূর্বঅভিজ্ঞ জনের অভিজ্ঞতার আশ্রয় নেয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ। অনন্ত জ্ঞানী বুদ্ধই হচ্ছেন আমাদের এই প্রয়াসের পরম নির্ভর যোগ্য আশ্রয়। বুদ্ধের সুগভীর অন্তর্দৃষ্টিতে ধরা পড়েছে যে, লোভ, দ্বেষ এবং মোহ নামক তিনটি মনোবৃত্তিই জীবনের যাবতীয় দুঃখ-ভোগান্তির মূল কারণ। এই লোভ, দ্বেষ, মোহ নামক চিত্তবৃত্তি তথা মানসিকতা গঠনের মূল উপাদান হচ্ছে অভিধর্মে উল্লেখিত বায়ান্ন প্রকার চৈতসিক। এগুলো মহাসতিপট্‌ঠান সূত্রে উল্লেখিত নিয়মে প্রথমে বিশেষভাবে অনুধাবনের চেষ্টা করতে হবে। অর্থাৎ স্মৃতি সাধনায় রত হতে হবে অবিরাম অবিচ্ছিন্ন ভাবে। এতে করে চলমান জীবনের যাবতীয় সুখানুভূতি, দুঃখানুভূতি আর উপেক্ষানুভূতির আবির্ভাব ও তিরোভাব স্বাভাবিক ভাবেই ধরা পড়বে নিজের কাছে। এই জানা ও এই বুঝাকে বলা হয় লৌকিয় সম্যক দৃষ্টি। লৌকিয় সম্যক দৃষ্টি জাত অভিজ্ঞতার ক্রমিক উৎকর্ষতায় যখন (আপন পরের) প্রতিটি চিত্ত ক্ষণের উৎপত্তি ও নিরোধধর্মীতাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব হয়, তখনই অনাসক্ত ভাব জাগ্রত হয়। এভাবে যখন আপন মন অনাসক্ত ভাব প্রাপ্ত হয় তখনই জাগে, লোকোত্তর সম্যক দৃষ্টি। এই যথার্থ জীবন দৃষ্টিই মানব জীবনের সুদুর্লভ সম্পদ। এই সম্পদের অধিকারী যিনি হবেন, তিনিই লাভ করবেন বুদ্ধ তথাগত নির্দেশিত চির অক্ষয় পরম সুখ, পরম শান্তি নির্বাণ। কামনা করি এ মানব জীবনে সকলের কাছে প্রিয় হোক, বুদ্ধ তথাগতের চির সত্য এই দুর্লভ অবদান। 
প্রাবন্ধিক: শ্রীমৎ প্রজ্ঞাবংশ মহাথেরো।
                প্যারিস।

Monday, July 10, 2017

বুদ্ধের মতে পুনর্জন্মের সরূপ,জ্ঞানমিত্র ভিক্ষু, থাইল্যান্ড হতে



অনেকেই বলেন বুদ্ধের পুনর্জন্ম ব্যাখ্যা কিরূপ, আসলেই কি যেই মানুষ মৃত্যুবরণ করে সেই মানুষই বা তার আত্মাই পুনর্জন্ম নেয়, নাকি মৃত্যুর পর মানুষের(প্রাণীর) আর দেহধারণই হয়না, নাকি বৌদ্ধ ধর্মে(ধম্মে) পুুনর্জন্মই নেই! প্রথমেই বলে নিই বৌদ্ধ ধর্মে পুনর্জন্ম আছে এবং প্রাণীর তৃষ্ণা বা আসক্তির ক্ষয় না হওয়া অবধি পুনর্জন্ম নেয়, তবে তা আত্মার পুনর্জন্ম নয়। বুদ্ধ নিত্য আত্মার অস্তিত্ব অস্বীকার করেছেন। এরকম শ্বাশ্বত আত্মা থাকলে নির্বাণ বা তৃষ্ণাক্ষয়ের বা বন্ধন মুক্তির প্রশ্ন আসে না। নিত্য আত্মাকে অস্বীকার করে বুদ্ধ মধ্যম নিকায়ের সর্বাসব সূত্র (২), অলগর্দোপম সূত্র (২২), ক্ষুদ্রবেদল্য সূত্র (৪৪), সংযুক্ত নিকায়ের খন্ধসংযুক্তের উপায়বর্গের অনাত্মলক্ষণ সূত্র প্রভৃতি সূত্রে আলোচনা করেছেন। বৌদ্ধধর্মে ব্যবহৃত ‘পুনর্জন্ম’ শব্দটি বুদ্ধপূর্বকালীন সময় হতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে বলে অনেকেই ভ্রান্তিবশতঃ বৈদিক ধর্মীয় পুনর্জন্মকে বুদ্ধ নির্দেশিত পুনর্জন্ম বলে ব্যাখ্যা করেন, যা সর্ব্বৈব মিথ্যা এবং বুদ্ধবাণীর অপব্যাখ্যা।  মূলত পুনর্ভব শব্দটিই বৌদ্ধ জন্মান্তর বিষয়ক শব্দ। পুনর্ভব কথার অর্থ হলো পুনর্বার জন্মগ্রহণের প্রবৃত্তি। মানুষ বা জীবের মধ্যে জন্মগ্রহণের প্রবৃত্তি (তৃষ্ণা) বিদ্যমান থাকায় তাকে জন্মগ্রহণ করতে হয়। এই তৃষ্ণাই জীবকে জন্ম গ্রহণ বা দেহধারণ করায়। আসক্তিবশে জীব কর্ম করে, যার ফল হচ্ছে অনাগত ভব। ‘ভব’ হচ্ছে কর্ম যার দরূণ জন্ম হয়। যে অবস্থায় জীব কর্ম করে তা হচ্ছে ভব। ভব থেকে উদ্ভূত হয় জাতি বা জন্ম, কাজেই পুনর্জন্মের কারণ হলো ভব। এখানে উল্লিখিত জাতি শব্দের অর্থ হচ্ছে জন্ম। এটি হচ্ছে পুনঃ প্রতিসন্ধি (জন্ম), অর্থাৎ পুনর্জন্ম বা পুনর্ভব এবং জাতি। প্রত্যুৎপন্নভবের আলোচনায় যে অঙ্গকে ‘বিজ্ঞান বা চেতনা’ নাম দেয়া হয় তাকে অনাগত ভবের সমীক্ষায় ‘জাতি’ বলা হয়। সোজা কথায়, জীব যদি জন্মগ্রহণ না করতো বা শরীর ধারণ না করতো তাহলে তাকে জরামরণের অধীন হতে হতো না, জরামরণাদি বিবিধ দুঃখ হতে মুক্তির কথাও আসতো না। কাজেই জীবের জরামরণের কারণ হলো জাতি বা জন্ম। তৃষ্ণাবশতঃ জীবের বারংবার জন্ম-মৃত্যু এবং আবার জন্ম-আবার মৃত্যুকে বুদ্ধ ‘দ্বাদশ নিদান’ বলেছেন।
(দ্বাদশ নিদান জানার জন্য মধ্যম নিকায়ের ৩৮ নং সূত্র মহা তৃষ্ণাসংক্ষয় সূত্র দেখুন, অথবা পুজ্য জ্যোতিঃপাল মহাথের লিখিত ‘কর্মতত্ত্ব’ বই দেখুন।)আবার অনেকে লিখছেন, পিতার চেতনাই পুত্র রূপে জন্ম নেয় বা পুত্রের চেতনা রূপে জন্ম নেয়। মৃত ব্যক্তি কখনই পুনরায় জন্ম গ্রহণ করে না। কেবলমাত্র প্রজননের মাধ্যমে সন্তান-সন্ততিরূপে তার চেতনার (বিজ্ঞান বা মন) আবির্ভাব হয়; যেটিও বিভ্রান্তকারী ব্যাখ্যা। বস্তুতপক্ষে, পিতার চেতনা বা বিজ্ঞান পিতার নিজের, পুত্রের চেতনা বা বিজ্ঞান পুত্রের; কোনও একজনের চেতনা অপরকোনও জনের নিকট প্রবাহিত হয় না। যদি তাই হয় তবে, পিতার জীবিতাবস্থায় পিতার চেতনা কোথায় যাবে, যারা সন্তানের পিতা নন তাদের কি হবে? পিতার কর্মফল কি পুত্রই ভোগ করবে? পিতা কি তার কর্মের ফল হতে নিষ্কৃতি পাবে? সুতরাং একের চেতনা অপরের কাছে গিয়ে যে উৎপন্ন হয় বলে অনেকের ভ্রান্ত অভিমত, তা বুদ্ধবিরোধি মত। প্রতিটি জীবই নির্বাণ উপলব্ধি না করা অবধি নিজেরই কর্মের সংস্কারবশতঃ মরণের পর বিভিন্ন প্রাণীতে জন্ম নেয় বা পুনর্ভবিত হয়। “মৃত ব্যক্তি কখনই পুনরায় জন্ম গ্রহণ করে না” এই কথা যারা বলেন তারা বুদ্ধবাক্যের অপব্যাখ্যা করেন বুঝে বা না বুঝে।
মধ্যম নিকায়ের ভয়ভৈরব(৪), মহাঅশ্বপুর(৪০) প্রভৃতি বহু সূত্রে বুদ্ধ মুক্তকণ্ঠে জাতিস্মরজ্ঞানবলে কর্মবশতঃ জীবগণের চ্যুতি-উৎপত্তি, সুগতি-দুর্গতি স্বীকার করেছেন। বুদ্ধ নিজেই তাঁর অতীত জীবনে যে বিভিন্ন জন্মপরিগ্রহণ করেছিলেন তার প্রমাণ পাই খুদ্দক নিকায়ের ধর্মপদের জরাবর্গের ১৫৩-১৫৪ নং গাথায়(অনেকজাতি সংসারং); মধ্যম নিকায়ের দ্বিধাবিতর্ক সূত্রে(১৯) । দ্বিধাবিতর্ক সূত্রে বুদ্ধ তাঁর জাতিস্মর বা পুর্বনিবাস অনুস্মৃতি জ্ঞানের দ্বারা বুদ্ধত্ব লাভের রাতে কিভাবে নিজের ও অপর জীবগণের চ্যুতি-উৎপত্তি অবগত হয়েছেন সেই বিষয়ের ধারাবাহিক বিবরণ উল্লিখিত হয়েছে। সেখানে বুদ্ধ বলছেন “...সেই অবস্থায় আমি নানা প্রকারে বহু পূর্বজন্ম অনুস্মরণ করি এক জন্ম, দুই জন্ম, তিন জন্ম, চার জন্ম, পাঁচ জন্ম, দশ জন্ম, বিশ জন্ম, ত্রিশ জন্ম, চল্লিশ জন্ম, পঞ্চাশ জন্ম, শত জন্ম, সহস্র জন্ম, এমনকি শতসহস্র জন্ম, বহু সংবর্তকল্পে, বহু বিবর্তকল্পে, এমনকি বহু সংবর্ত-বিবর্তকল্পে ঐ স্থানে আমি ছিলাম, এই ছিল আমার নাম, এই আমার গোত্র, এই আমার জাতিবর্ণ, এই আমার আহার, এইরূপ আমার সুখদুঃখ অনুভব, এই আমার পরমায়ু, তথা হইতে চ্যুত হয়ে আমি এস্থানে (এই যোনিতে) আমি উৎপন্ন হই, সেখানে ছিল আমার এই নাম, এই গোত্র, এই জাতিবর্ণ, এই আহার, এরূপ সুখদুদুঃখ অনুভব, এই পরমায়ু, তথা হইতে চ্যুত হইয়া আমি অত্র (এই যোনিতে) উৎপন্ন হয়েছি। ইতি আকার ও উদ্দেশ্য, স্বরূপ ও গতিসহ নানাপ্রকারে বহু পূর্বজন্ম অনুস্মরণ করি।” তদ্রুপ অপরাপর প্রাণীগণের জন্ম-মৃত্যু ইত্যাদি। এবং বলেছেন, “বিমুক্ত চিত্তে ‘বিমুক্ত হইয়াছি’ এই জ্ঞান উদিত হল, উন্নত জ্ঞানে জানতে পারলাম চিরতরে “জন্মক্ষয়” হয়েছে। উপরোক্ত বুদ্ধবাণী অনুসারে বুুদ্ধ নিজেই যে বিভিন্ন কূলে জন্ম নিয়েছেন বুদ্ধত্ব লাভের সেই প্রমাণ সুষ্পষ্ট। 
উপরোক্ত ব্যাখ্যায় কারোও চেতনা অপরকারো চেতনারূপে প্রবাহিত হয়নি, হয়না। এবং এতেই বুঝা যায় মৃত ব্যক্তি পুনরায় জন্ম নেয়। খুুদ্দক নিকায়ের মিলিন্দ প্রশ্ন’র লক্ষণ প্রশ্নের দ্বিতীয় বর্গ, এবং বিমতি বিচ্ছেদ প্রশ্ন পরিচ্ছদ দেখুন নাম রূপ বা কে, কিভাবে জন্মগ্রহণ করে তা জানার জন্য।
মহাতৃষ্ণাসংক্ষয় সূত্রে বলা আছে তিনের সংযোগে গর্ভসঞ্চার হয়। মাতাপিতার দৈহিক মিলন হল, অথচ মাতা ঋতুমতী হইলেন না, এবং গন্ধর্বও উপস্থিত হল না, তা হলে গর্ভসঞ্চার হয় না। (মধ্যম নিকায়ের অর্থকথা প্রপঞ্চসূদনী অনুসারে ‘গন্ধর্ব’ অর্থে স্বীয় প্রাক্তন বা কর্মবশে জন্মগ্রহণকারী সত্ত্ব। জনক-জননীর দৈহিক মিলনের সুযোগ নিয়েই গন্ধর্ব মাতৃজঠরে প্রবিষ্ট হয়ে গর্ভসঞ্চার করে )(দেখুন মধ্যম নিকায়, বেণীমাধব বড়–য়ার বাংলা অনুবাদ, মহাতৃষ্ণাসংক্ষয় সূত্রের ফুটনোট)। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যানুসারে, যদি গর্ভ উৎপাদনে সমর্থ পুরুষের শুক্র গন্তব্যস্থানে উপনীত হয় তবেই গর্ভসঞ্চার হয়।) মাতাপিতার দৈহিক মিলন হইল, মাতাও ঋতুমতী হইলেন, অথচ গন্ধর্ব উপস্থিত হল না, তা হলেও গর্ভসঞ্চার হয় না। মাতাপিতার দৈহিক মিলন হইল, মাতা ঋতুমতী হইলেন, গন্ধর্বও উপস্থিত হল, সে ক্ষেত্রেই এই তিনের সংযোগে গর্ভসঞ্চার হয়। এখানে পুনর্জন্মের তিনপ্রকার হেতু বিদ্যমান এবং জেনে রাখা কর্তব্য যে এই তিনজন অবশ্যই তাদের স্ব-স্ব চেতনা নিয়েই থাকে। পিতার চেতনা পুত্রে প্রবাহিত হয় না। জৈবিক কারণবশতঃ পিতা-মাতার কিছু আকার আকৃতি সন্তান সন্ততিতে দৃশ্যমান হয়।
                সুতরাং বুদ্ধ বর্ণিত পুনর্জন্মে মৃত্যুর পর প্রাণীর পুনারির্ভাব হয়, এটা আত্মবাদ নয়। কর্ম সৃষ্টি হলেই, সংস্কার থাকলেই, উপাদান থাকলেই ভব হবে, ভব হলে অবশ্যই জন্ম হবে। যারা আর্যঅষ্টাঙ্গিক মার্গানুযায়ী চলবে তারা কর্ম-সংস্কার-উপাদান ইত্যাদি অবিদ্যা বা অজ্ঞানতার ধ্বংস করতে পারলেই জন্ম নিরুদ্ধ হবে।

Saturday, July 8, 2017

ধর্ম প্রবক্তাদের মধ্যে গৌতম বুদ্ধের ব্যক্তিত্ব -ভদন্ত প্রজ্ঞাবংশ মহাথেরো


ধর্মের উৎপত্তি ও প্রয়োজন, মানুষের জাগতিক জীবনে নিত্য দুঃখ ও অশান্তির হাত থেকে পরিত্রাণ লাভের জন্য। ধর্ম প্রবক্তাগণের আবির্ভাব এবং অবদান এ জন্যেই মানব ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ও অবিস্মরণীয়। পৃথিবীর তাবৎ সকল ধর্ম প্রবক্তাগণ ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত মানব সন্তান। কিন্তু তাঁরা নিজেদের ধর্মমতকে সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং সর্বকালের জন্যে অত্যাবশ্যকীয় করার অমোঘ কৌশল হিসেবে নিজেদেরকে অদৃশ্য, সর্বকালীক, সর্বব্যাপ্ত, মহাশক্তিধর স্রষ্টার প্রেরিত একমাত্র প্রতিনিধি বলে প্রচার করেছেন। সেই অতিমানবীয়তার সুবাদে ধ্যান সাধনার কারণ রূপ কষ্ট বা ত্যাগ-তিতিক্ষাকে বরণ করা ছাড়াই, শুধুমাত্র পার্থিব ব্যবহারিক অভিজ্ঞতায় তাঁরা যখন যা বলেছেন, তৎসমুদয় খুব সহজেই সাধারণ মানুষের গ্রহণযোগ্যতা লাভে সক্ষম হয়েছে।  তবে কোন কোন ক্ষেত্রে তাঁদের কিছু কিছু অর্জন বেশ শ্রমলব্ধ বা কষ্টলব্ধ হলেও তাকে তাঁরা  সেই মহাশক্তিধর স্রষ্টার দয়া, করুণা বা আদেশলব্ধ বক্তব্য বলে উল্লেখ করেছেন। অতএব, তাঁদের প্রচারিত ধর্মমতগুলোতে যদি কৃতিত্বের বা প্রশংসার কিছু থাকে, তা তাঁদের নহে-সেই অদৃশ্য মহাশক্তিরই প্রাপ্য। আর সেই অপৌরুষেয়তার সুবাদে, তাঁদের প্রচারিত ধর্মের আদেশ উপদেশ গুলোকে বিচার-বিশ্লেষণ করলে কিছু ব্যবহারিক নীতিবোধ ছাড়া, মৌলিক তত্ত্ব-তথ্য তেমন পাওয়া যায় না। এ কারণে, অনাগতে তাদের এ সকল মত ও পথ উপেক্ষিত হওয়ার ভয়ে তাঁদের কথিত বাক্য যৌক্তিক কি অযৌক্তিক, বাস্তব কি অবাস্তব, ভুল কি শুদ্ধ, প্রযোজ্য কি অপ্রযোজ্য, সংশোধনীয় কি অসংশোধনীয়-এ নিয়ে কোন বির্তকের অবকাশ সেখানে নেই। আদেশকর্তা যা বলেছেন, তা হুবহু সেভাবেই বিনাবির্তকে মেনে নিতে হবে। অন্ধ আবেগজাত ভক্তি বিশ্বাসই এ সকল মতবাদের মূল আশ্রয় রূপে তাই গণ্য হয়।
উপরোক্ত ধারার ধর্ম প্রবক্তাগণের সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী, কিছু খ্যাতনামা ব্যক্তিত্বের নাম বিশ্ব ধর্ম জগতে পরিদৃষ্ট হয়। তাঁরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোন ভাবেই ঈশ্বর বা স্রষ্টার অস্থিত্বে বিশ্বাসী নহেন। অথবা তেমন কোন মহাশক্তির কল্পনাকে, মানবিক তথা জাগতিক রহস্যের উদ্ঘাটনে এবং তৎসংশ্লিষ্ট সমস্যার সমাধানে নিষ্প্রয়োজন বলেও মনে করেছেন। মানুষের কাছে তাঁদের ধ্যান গবেষণালব্ধ অভিজ্ঞতাকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে, তাই তাঁরা প্রায় ক্ষেত্রে যুক্তিবাদ ও মনস্তাত্ত্বিকবাদের আশ্রয় নিয়েছেন। যাদের লক্ষ্য করে তাঁদের এই মতবাদ প্রচার, তাদের নিকট তা গ্রহণীয়, না অগ্রহণীয়; তার যাচাই বাছাইয়ে; সেই সাধারণ মানুষের আপন বিবেক বোধের স্বাধীনতা; তাই তাঁরা সর্বোতভাবে স্বীকার করে নিয়েছেন। এ কারণে, এ সকল ধর্ম প্রবক্তাদের প্রচারিত অভিমত, অন্ধ আবেগ তাড়িত, যু্ক্তিহীন কাল্পনিক ভক্তি বিশ্বাসকে পুঁজি না করে; গণমানুষের মুক্ত বিচার বুদ্ধি ও স্বাধীনতাকে, স্বমতবাদ প্রচারের আশ্রয় রূপে গ্রহণ করেছেন। উপরোক্ত সংক্ষিপ্ত আলোচনার আলোকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হবে যে, গৌতম বুদ্ধের উদ্ভাবিত উপায়ের মধ্যে অতি মানবীয় অলৌকিক কোন পন্থা অবলম্বন করা হয়নি। একান্ত ব্যক্তিগত জিজ্ঞাসা, এবং ব্যক্তিগত  অকৃত্রিম প্রয়াস, এবং তাঁর বুদ্ধি ও মেধার গভীর অনুসন্ধানীর তৎপরতা, তাঁকে দান করেছে অভাবনীয় সাফল্য। তাই ঈশ্বর, স্রষ্টা, অবতার-ইত্যাদি কোন প্রকার অতিমানবীয়তার আশ্রয়ে তিনি নিজ অভিজ্ঞাকে, সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্যে প্রয়াসী হতে; তাঁকে কদাপি দেখা যায়নি। পৃথিবীর তাবৎ সকল ধর্ম প্রবক্তাগণ, যাঁরা প্রচার জগতে ব্যাপকতা পেয়েছেন, সেই যীশুখৃষ্ট এবং হযরত মুহম্মদ (সঃ); তাঁরা সমস্যার উৎপত্তি ও বিনাশের কারণ রূপে স্রষ্টা নামক শক্তিকে নির্দেশ করেছেন। মানুষের ভাল-মন্দ, সুখ-দুঃখ সবকিছু সেই স্রষ্টারই ইচ্ছা নির্ভর। তাই সর্ব প্রকারে, সেই মহাশক্তির সনেত্মাষ বিধানমূলক কিছু নৈতিক কার্যক্রমের উপরেই নির্ভর করবে, মানুষের সুখ-শান্তি, সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা। ব্যক্তিগত কর্মের ফলকে ঈশ্বর নির্ভর করে দিয়ে, সেই ঈশ্বরের প্রতি একান্ত আত্ম নিবেদনই এ সকল ধর্ম প্রচারকদের ধর্ম মতের মূল বক্তব্য। ক্ষুধাটা আমার; তাই খাদ্যের অন্বেষণ, সংগ্রহ এবং খাওয়ার দায়-দায়িত্ব আমারই। তবে ক্ষুধা নিবৃত্তি জাত সুখ দাতা হবেন ঈশ্বর। যুক্তিটি ঠিক এমনই দাঁড়ায়।
ঈশ্বর নির্ভর ধর্মীয় মতবাদের সকল কর্মকান্ড, এমন একটি আত্ম প্রবঞ্চনামূলক হওয়ার কারণে; সে সকল মতবাদের অনুরাগীরা কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, খুব সহজেই তারা আত্ম প্রবঞ্চনামূলক স্ববিরোধী আচরণে লিপ্ত হতে উৎসাহী হয়ে পড়েন। তাই তাঁদের চরিত্রে সুবিধাবাদী, পেশীবাদী, শঠ ও প্রতারণাবাদী প্রবণতা সবিশেষ লক্ষ্যনীয়। স্বীয় মতবাদ অপরের উপর জোর করে, ছলে-বলে-কৌশলে চাপিয়ে দেয়ার ঐতিহাসিক প্রবণতায় তখন তাঁরা জন্ম দেয় কুরুক্ষেত্র, ক্রুসেড ইত্যাদির ন্যায় ধর্মযুদ্ধ এবং এক হাতে ধর্মগ্রন্থ, অপর হাতে অসির উত্তোলন। যুগ বিবর্তনে তাঁদের এই চরিত্র পোষাক বদল করলেও, তা ধারবাহিকভাবে বিদ্যমান থাকে, এ সকল অন্ধ আবেগ সর্বস্ব মতবাদগুলোর মধ্যে; জন্মগত  অভ্যাস, বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের কারণে। যু্ক্তি, বুদ্ধি ও আপন কর্ম নির্ভরতার কারণে, বুদ্ধের মতবাদ প্রচার প্রসারে কোন যুগে, কোন কালে, অস্ত্রশক্তি বা পেশী শক্তির মহড়া প্রদর্শনের অথবা কুট কৌশল অবলম্বনের প্রয়োজন হয়নি। বুদ্ধ তাঁর ধর্মমত প্রচার প্রসারে মানব জাতিকে সর্ব প্রথম উপহার দিয়েছিলেন ত্যাগ এবং নৈতিকতার উচ্চতম গুণে সুপ্রতিষ্ঠিত ‘সংঘ’ নামক সমষ্টিগত জীবনের এক মহতী আদর্শ। এ মহনীয় সমষ্টি হয়ে থাকে বুদ্ধের উপদিষ্ট শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞায় সমৃদ্ধ।
 তৃতীয় পর্যায়ের ধর্ম প্রবক্তাগণ নিজেদেরকে মানবীয় যুক্তিকে ঈশ্বরের সরাসরি ঈশ্বর বলে দাবী করেছেন। আর সেই ঈশ্বরই যুগের প্রয়োজনে দুষ্টের দমনে এবং শিষ্টের পালনে মনুষ্য রূপে পৃথিবীতে আবির্ভূত হন। তাঁরা নিজেই নিজেকে অবতার বলে পরিচয় দিয়েছেন। অথবা তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল পরবর্তী শাস্ত্র রচয়িতারা, সেভাবেই এসব ধর্ম প্রবক্তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য জন সমক্ষে তুলে ধরেছেন। এ শ্রেণীর ধর্ম প্রবক্তাগণের অনুসারীদের বহুত্ববাদী বা অবতারবাদী বলা হয়। তাঁরা আপন বহুমুখি সমস্যার সমাধানে; এক একটি সমস্যার মুক্তিতে এক একজন কাল্পনিক দেব-দেবীর আশ্রয় গ্রহণ করে থাকেন।
ধর্ম প্রবক্তাগণের উপরোক্ত শ্রেণী বিন্যাসের মধ্যে গৌতম বুদ্ধ হলেন, একান্ত ভাবে যুক্তি ও বাস্তববাদী এক অসাধারণ পর্যায়ের ব্যক্তিত্ব। তিনি জন্মগত সূত্রে ছিলেন হিমালয়ের পাদবর্তী রাজ্য কপিলাবস্তু রাজ্যের অধিকারী মহারাজ শুদ্ধোধনের পুত্র। তৎকালীন ধনী-শ্রেষ্ঠী, রাজা মহারাজাদের ভোগ-বিলাসের প্রচলিত উপকরণ সমূহে প্রাচুর্য্যের কোন ব্যতিক্রম ছিল না, তাঁর জীবনেও। শীত, গ্রীষ্ম ও বর্ষা এই তিন প্রধান ঋতু উপভোগী তিনটি পৃথক পৃথক প্রাসাদে তার জন্যে বাড়তি কিছু ভোগ-বিলাসের ব্যবস্থা ছিল।  ভোগের আতিশয্য তাঁর মনে ভোগের প্রতি বিতৃষ্ণার জন্ম দেয়। তৎকালে বারাণসীর শ্রেষ্ঠী পুত্র যশ এর মনেও এমনতরো বিতৃষ্ণা, মহাউপদ্রব রূপে দেখা দিয়েছিল। কিন্তু রাজপুত্র সিদ্ধার্থের মনে তেমনটি না হয়ে, প্রশ্ন দেখা দিল, জাগতিক জীবনে তিনটি অনিবার্য দুঃখ এই ব্যাধি, বার্ধক্য আর মৃত্যুর হাত থেকে চির অব্যহতি পাওয়ার কোন উপায় আছে কিনা। এ নিয়ে জীবন জিজ্ঞাসার তীব্র তাগিদ, তাঁকে ভোগ-বিলাসপূর্ণ রাজকীয় জীবনের পরিবর্তে, ঝুট্ ঝামেলা মুক্ত এবং অতিসংক্ষিপ্ত অথচ মুক্ত বিহঙ্গ সদৃশঃ সামান্য ভিক্ষা নির্ভর সন্ন্যাস জীবন গ্রহণে অনুপ্রাণিত করে। রাজকুমার সিদ্ধার্থের সন্ন্যাস জীবনের দীর্ঘ ছয় বছরের অন্বেষার পুরোটাই ছিল, দুঃখ মুক্তির উপায় সন্ধানে প্রচলিত প্রথাকে নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অনুশীলনের অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ। কিন্তু প্রচলিত কোন পন্থায়, আত্ম-জিজ্ঞাসার সদুত্তর না পেয়ে; একান্ত নিজস্ব উদ্ভাবিত পথই শেষ পর্যন্ত তাঁকে গ্রহণ করতে হলো। আর এ পথে অগ্রসর হতে গিয়ে জীবনের অতীত, বর্তমান ও অনাগত দুঃখের সামগ্রিক স্বরূপটা; তাঁর গভীর জ্ঞান জালে অবশেষে ধরা পড়লো। দুঃখের সেই সর্বগ্রাসী স্বরূপটাকে, তিনি যেভাবে একটি সুশৃঙ্খল উপায়ে গবেষণা ও ব্যাখ্যা দান করলেন; দেখা গেল তা রোগ নিরাময়ে চিকিৎসা শাস্ত্রের সেই সুশৃঙ্খল পদ্ধতির মতোই শৃঙ্খলাবদ্ধ। দেহধারীর নিকট ব্যাধি যেমন একটি অনিবার্য দুঃখদায়ক সমস্যা; তেমনি এই জাগতিক জীবন সংশ্লিষ্ট সমুদয় সমস্যাই তো দুঃখদায়ক। সেই দুঃখের চির অবসানে বুদ্ধ আবিষ্কৃত পদ্ধতির নাম চারি আর্যসত্য জ্ঞান এবং প্রতীত্যসমুৎপাদ নীতি জ্ঞান। এই জীবন সংশ্লিষ্ট বুদ্ধ মতবাদটির প্রচার-প্রসার ও স্থিতির জন্যে প্রয়োজন একান্ত নিবেদিতপ্রাণ। এতে অভাবনীয় ঋদ্ধিশক্তির যেই বিষ্ফোরণ ঘটে, তার চুম্বকীয় আকর্ষণ মানুষের হৃদয় জয় করে নিতে পারে অতি সহজে। তাই সত্যিকার ভাবে বলতে গেলে বুদ্ধমত প্রচারে প্রয়োজন মৈত্রী, করুণা, মুদিতা, উপেক্ষাগুণ সম্পন্ন শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞা সমৃদ্ধ একতাবদ্ধ এক সাংঘিক জীবন। রাজশক্তি, ধনশক্তি বা জনশক্তি বুদ্ধমত প্রচারে অহিংসা নীতি দ্বারা প্রভাবিত হলে, তা সহায়ক উপাদান হয় মাত্র। বিশ্বের ধর্ম প্রবক্তাদের মধ্যে বুদ্ধের ব্যক্তিত্বের ইহাই অত্যুজ্জ্বল বিশেষত্ব ইহাই প্রভেদ।

Thursday, July 6, 2017

ঐতিহাসিক সমন্বয়

ঐতিহাসিক ঘটনার সমন্বয়
লিখেছেনঃ    সুবল বড়ুয়া
আষাঢ়ী পূর্ণিমা বুদ্ধের পাঁচটি ঐতিহাসিক ঘটনার সমন্বয়

সিদ্ধার্থ গৌতম বা তথাগত বুদ্ধ মানবকুলে জন্ম নেয়ার জন্য তাঁর মাতৃগর্ভে (রাণী মহামায়া) প্রতিসন্ধি গ্রহণ, সিদ্ধার্থেও গৃহত্যাগ, সর্বপ্রথম গৌতম বুদ্ধ কর্তৃক ধর্মচক্র প্রবর্তন সূত্র দেশনা বা বৌদ্ধ ধর্মমত প্রচার, প্রাতিহার্য ঋদ্ধি তথা আধ্যাত্মিক শক্তি প্রদর্শন এবং গৌতম বুদ্ধের পরলোকগত মা (রাণী মহামায়া) কে অভিধর্ম দেশনা।
মহামানব সিদ্ধার্থ গৌতম ও তথাগত সম্যক সম্বুদ্ধের জন্মপূর্ব এবং জন্মোত্তর জীবনের পাঁচটি ঐতিহাসিক এই ৫টি ঘটনার সমন্বয় আষাঢ়ী পূর্ণিমা। বৌদ্ধদের পরম কল্যাণময় ও পুণ্যময় তিথি আষাঢ়ী পূর্ণিমা।
এই পূর্ণিমা তিথিতেই তথাগত গৌতম বুদ্ধ ভিক্ষুদের জন্য বর্ষাব্রতের নিয়মও প্রবর্তন করেন। এসব প্রেক্ষাপটে আষাঢ়ী পূর্ণিমা বৌদ্ধদের অত্যন্ত স্মরণীয়-বরণীয় তিথি। বৌদ্ধদের জন্য এটি একটি পরম মুহুর্ত ও শুভ দিন।
বৌদ্ধ শাস্ত্র মতে, বৌদ্ধ জীবন নানা কারণে ঐতিহাসিকভাবে অর্থবহ এবং গুরুত্বপূর্ণ। এই আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে গৌতম বুদ্ধ সিদ্ধার্থ রূপে মায়াদেবীর গর্ভে প্রতিসন্ধি গ্রহণ করেন। উল্লেখ্য, মহাপুরুষেরা যথাসময়ে উপযুক্ত, ভৌগোলিক সীমায়, কাম্য স্থানে উত্তম বংশের পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। এক্ষেত্রে মহামানব সিদ্ধার্থ গৌতম যথানিয়মে তাঁর পিতা রাজা শুদ্ধোধনের ঔরশে রাণী মহামায়ার গর্ভে জন্ম নিয়ে ধরাধামে ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন। জন্ম, জরা, ব্যাধি, মৃত্যু, সন্ন্যাসী এই চার নিমিত্ত দৃশ্য দর্শন করে রাজকুমার সিদ্ধার্থ এ তিথিতে সংসারের মায়া মোহ ছিন্ন করে বুদ্ধত্ব লাভের প্রেরণায় গৃহত্যাগ করেন। পরবর্তীতে ছয় বছর কঠোর তপস্যার মাধ্যমে বুদ্ধত্ব লাভ করে তিনি আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে সারনাথের ঋষিপতন মৃগদাবে তার নবধর্ম (বৌদ্ধ ধর্ম) ধর্মচক্র প্রবর্তন সূত্র দেশনা করেন। পরবর্তীতে মায়ের মৃত্যুর পর একই পূর্ণিমা তিথিতে তিনি মায়াদেবীকে সদ্ধর্ম দেশনার জন্য তাবতিংস স্বর্গে গমন করেন। এ পূর্ণিমাতেই বৌদ্ধ ভিক্ষু সংঘের ত্রৈমাসিক বর্ষাব্রত বা ওয়া অধিষ্ঠান গ্রহণ করেন।
উপবসত শব্দ থেকে ‘উপোসথ’ শব্দের উৎপত্তি। পালি শব্দ ‘উপোসথ’ থেকে উপবাস শব্দের উৎপত্তি। এখানে উপ একটি উপসর্গ। এর অর্থ হল নিকটে বা পাশাপাশি এবং বসত অর্থ হলো বাস করা। সুতরাং উপবসত শব্দের বুৎপত্তিগত অর্থ হল পাশাপাশি বসে ধর্ম শ্রবণ করা। অষ্টমী, অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথিতে উপোসথিকগণ এই আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী বা প্রবারণা পূর্ণিমার সময় দান, শীল, ভাবনা করে আধ্যাত্মিক জীবন গঠন করে। বৌদ্ধমতে উপোসথ চার প্রকার। তা হল- প্রতিজাগর উপোসথ, গোপাল উপোসথ, নির্গ্রন্থ উপোসথ এবং আর্য উপোসথ। উপোসথিকগণ প্রাণিহত্যা করেন না। অপ্রদত্তবস্তু গ্রহণ করেন না। মিথ্যা ভাষণ করেন না। মাদকদ্রব্য সেবন করেন না। ব্রহ্মচর্য আচরণ করেন। কামাচার করেন না। রাতে আহার গ্রহণ করেন না। মালাধারণ ও সুগন্ধদ্রব্য ব্যবহার করেন না। কোনো উঁচু আসনে শয়ন কিংবা উপবেশন করেন না। এগুলো অষ্টাঙ্গ উপোসথিকের অবশ্যই পালনীয় কর্তব্য। উপোসথ আত্মশাসন, আত্মসংযম ও চিত্ত-সাধনাকে নিয়ন্ত্রণ করে। বৌদ্ধজীবনে এটি হচ্ছে প্রজ্ঞা ও ধ্যান সাধনার জন্য মহৎ কাজ। দুঃখের নিবৃত্তির জন্য এ উপোসথ বৌদ্ধজীবন পদ্ধতিতে অত্যন্ত কার্যকর। আষাঢ়ী পূর্ণিমা ও বর্ষাবাসের কার্যক্রমের সঙ্গে উপোসথ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বৌদ্ধ ধর্মে উপোসথের গুরুত্ব খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। ধর্মীয় জীবনযাপনের লক্ষ্যে তথাগত সম্যক সম্বুদ্ধ স্বয়ং উপোসথের প্রবর্তন করেন। উপোসথ হল ধর্মীয় অনুশাসন বা জীবনযাপনের প্রশিক্ষণ শিবির।
তথাগত সম্যক সম্বুদ্ধ কর্তৃক বৌদ্ধ ভিক্ষুদের জন্য বর্ষাব্রত অধিষ্ঠান বা ওয়ার নিয়ম প্রবর্তন আষাঢ়ী পূর্ণিমার একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। ধর্ম প্রচারের প্রথমাবস্থায় বৌদ্ধ ভিক্ষুরা সারা বছরই নিয়োজিত থাকতেন। তখন বর্ষাব্রতের কোন বিধান ছিল না। যেহেতু বর্ষাকালে ভিক্ষুদের গৈরিক বসন বা চীবর বৃষ্টিতে ভিজে ও মাটি-বালি লেগে নোংরা হয়, রাস্তাঘাট কর্দমাক্ত হয়ে পিচ্ছিল হলে পথ চলায় বিঘœ ঘটে। সবুজ ঘাস, লতা, ক্ষেতের আইল, জমির ফসল ইত্যাদি ভিক্ষুদের পদাঘাতে বিনষ্ট হয়। এ ছাড়া এ সময় পদতলে পিষ্ট হয়ে পোকামাকড়, কীট-পতঙ্গ ও অন্যান্য ছোট ছোট প্রাণীর জীবন নাশেরও যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকে। এসব বিষয় পর্যালোচনা করে তথাগত গৌতম বুদ্ধ আষাঢ়ী পূর্ণিমার দিন ভিক্ষুদের জন্য বর্ষাকালীন বষাব্রতের নিয়ম প্রবর্তন করেন। এটি অবস্থার প্রেক্ষাপটে গৃহিত একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ভিক্ষুরা প্রধানত আষাঢ়ী পূর্ণিমার পরদিন থেকে একটি উপযুক্ত স্থানে তিন মাস ব্যাপী বর্ষাব্রতের অধিষ্ঠান করেন। বর্ষাব্রত পালনের মাধ্যমে ভিক্ষুদের আত্মশুদ্ধি ঘটে ও তাঁদের পারস্পরিক সৌহার্দ্যবোধ বিকশিত হয়। দীর্ঘ সময় ব্যাপী সংযম সাধনা ও বিশ্রামের ফলে তাঁদের নৈতিক উৎকর্ষ সাধিত হয়, দুঃখ-নিবৃত্তির পথ প্রশস্ত হয়। এছাড়া বর্ষাব্রতোত্তর ধর্ম প্রচারে মনোবল বৃদ্ধি পায়। ভিক্ষু সংঘের পাশাপাশি বর্ষাব্রত বা ওয়ার তিন মাস সময়ে গৃহীরা উপোসথ পালনসহ দান, শীল ও ভাবনায় অধিকতর নিয়োজিত থাকার পরিবেশ লাভ করে। অধিকন্তু ভিক্ষুর বর্ষাব্রত পালনের মধ্য দিয়ে ‘প্রবারণা’ উদযাপনের সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং প্রবারণার ধারাবাহিকতায় ‘কঠিন চীবর দান’ সম্পাদনের সুবর্ণ সুযোগ লাভ করা যায়। এখানে স্মরণীয় এই, সিদ্ধার্থ গৌতম গৃহত্যাগের পর নিজের চুল কেটে সত্যক্রিয়া করে সেগুলো আকাশে উড়িয়ে দিলে দেবতারা সেই চুল নিয়ে স্বর্গে চৈত্য তৈরি করেন।
এটি স্মরণে বৌদ্ধরা আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী বা প্রবারণা পূর্ণিমা পর্যন্ত তিনমাস বর্ষাবাস অধিষ্ঠানের পর আকাশ প্রদীপ বা ফানুস উত্তোলনের মধ্য দিয়ে জগতের সকল প্রাণীর সুখ-শান্তি কামনা করা হয়।

লেখক : সাংবাদিক


Read more at http://nirvanapeace.com/buddhism-philosophy/buddhist-philosophy/686#MkyLzg1l1tt6bMlV.99

বৌদ্ধ দর্শন অনুশীলনে জ্ঞান গভীরতা আসে


মানুষ মাতৃক ভাবপ্রসূত অদ্ভূত প্রাণী। এক মূহুর্ত নির্লিপ্ত সময় বিদ্যমান নেই, যা মানুষের মন চিন্তা-ভাবনা থেকে অক্রিয় হয়ে পড়েন। তাঁরা যা ভাবেন তাই বড়ই অদ্ভূত। তাই মানব জাতিই অদ্ভূত শ্রেষ্ঠ প্রাণী। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দর্শনবাদে অতিক্রম করে সাফল্য অর্জন করেছে মানব জাতির অভিজ্ঞতা। পৃথিবীর বিখ্যাত বিখ্যাত দর্শন- ইসলামবাদ, খ্রিষ্টানবাদ, হিন্দুবাদ, ক্যাথলিকবাদ, প্রযুক্তি বিষয়ক বিজ্ঞানবাদ এবং বৌদ্ধবাদ ইত্যাদি ইত্যাদি মতবাদে গবেষণায় অগ্রগতি লাভ করতে করতে মানব জাতির মনস্তাত্ত্বিক দর্শন এখন বিভিন্ন বিভাগে বিভক্ত শিঁখরে এসেছে। তবে মানুষ যে, যেই বিভাগে অনড় থাকুক না কেন, প্রত্যেকটি মতবাদে বিশেষভাবে আবেগবদ্ধ জ্ঞান- বিজ্ঞানের সক্ষমতা অবশ্যই আছে। অর্থাৎ প্রত্যেক বিভাগের মানুষের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাবহুল জ্ঞানলব্ধ ধারণা আছে। তাহলে সেগুলো অস্বীকার করা অমানবিক।  প্রত্যেক মানুষ তাঁদের স্পৃহাবশতঃ অধ্যয়ন নিজেরাই বাচাই করে নেবে।                                           
   এ পর্যায়ে এখন আমি আমার আকর্ষণীয় মতবাদ বৌদ্ধ দর্শনের আলোচনায় আসছি। যেমন বৌদ্ধধর্মের দর্শন অনুশীলনে কীভাবে জ্ঞানের গভীরতা আসে? এ প্রশ্নানুসারে→আমাদের মনে রাখতে হবে- বৌদ্ধধর্ম দু'টি বাস্তব সত্য। উচ্চতর জ্ঞান এবং প্রঁকৃতি সম্বন্ধীয় প্রত্যক্ষ উপলব্ধি বাস্তব জ্ঞান। এই দুইটি জ্ঞান বুদ্ধকে মহামানব সৃষ্টি করেছে। বুদ্ধ ক্ষণে ক্ষণে প্রঁকৃতির সত্য অনুসারে নিজের অভিজ্ঞ জ্ঞান বদলে নিতে পারতেন। তাই বৌদ্ধদর্শনের অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো প্রঁকৃতির সাথে এর গভীর সম্পর্ক। বৌদ্ধদের ধারণা হলো প্রঁকৃতি কারও দ্বারা সৃষ্ট নয়। এক্ষেত্রে বৌদ্ধধর্মে মহাজাগতিক অংশকেও কোন সৃষ্টিকর্তার দ্বারা সৃষ্ট বলে গ্রহণ করে না। তাই মানুষের জীবনের অস্তিত্বও প্রকৃতির একটা অংশমাত্র। বৌদ্ধধর্মে পরোক্ষ জ্ঞানের কোন স্থান নেই। আপনি বৌদ্ধ হিসেবে যা অনুশীলন করবেন,  ভাববেন তাতে সম্পূর্ণ গভীর আবেগের তাড়না থাকতে হবে। কারণ বৌদ্ধজ্ঞান একমূখী শক্তি নয় বরং সৃজনশীল পদ্ধতিমূখী। বিশেষভাবে নিজের চিন্তা, ভাবকে অনুশীলনের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ অনুভূতি অর্জনের সামর্থ্যই হলো বৌদ্ধ দর্শনের গভীরতা অনুশীলন। যত গভীর ভাবে বুদ্ধ মার্গ পদ্ধতি অনুশীলিত করবেন তত বেশি উচ্চতর জ্ঞানের শিঁখরে আপনার অভিজ্ঞতার লক্ষ্য পৌছে যাবে। আপনি প্রশ্নের মাধ্যমেও জানতে পারেন, বৌদ্ধরা কেন এত সুখী? ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া ও ইউনিভার্সিটি অফ উইসকনসিনের দুইদল বিজ্ঞানী পৃথক পৃথক গবেষণাগারে গবেষণা করার পর জানিয়েছেন, বৌদ্ধধর্মাবলম্বীরা প্রকৃত সুখী এবং অন্য ধর্মাবলম্বীদের চেয়ে শান্ত প্রকৃতির হয়। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, বৌদ্ধদের মস্তিস্কের যে অংশটি মানুষের মেজাজ ভাল রাখে এবং ইতিবাচক অনুভূতি সৃষ্টির জন্য দায়ী বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের মস্তিস্কের সেই অংশটি অধিক সক্রিয়। আর একদল বিজ্ঞানী মনে করেন ধ্যানই বৌদ্ধদের শান্তি ও সুখী হতে সাহায্য করে। অন্যদিকে অত্যাধুনিক স্ক্যানিং প্রযুক্তির সাহায্যে বলা হয়েছে ধ্যান নয় বরং আত্মসংযম এবং ইতিবাচক মনোভাবই বৌদ্ধদের সুখী ও শান্ত প্রকৃতির মানুষে পরিণত করে। ভূটান অন্যতম বৌদ্ধদেশ। এদেশের মানুষ বিশ্ব সুখী মানুষদের চেয়ে সবচেয়ে সুখী মানুষ এরা। প্রযুক্তির লিপ্সা এঁদের মনকে জয় করতে পারেনি। তাঁরা প্রযুক্তিকে ভাবে ইন্দ্রিয় অসংযমের কারণ। ইন্দ্রিয় অসংযম কারণে মানুষের মন সুখীবোধ  থেকে সরে আসে। ভূটানবাসীর জ্ঞান প্রয়োগ ক্ষেত্রে বুদ্ধের জ্ঞান প্রয়োগের যথেষ্ট মিল আছে। বুদ্ধের ভাব সম্পূর্ণ বিয়ষীভূত সঠিক মীমাংসায় অনুভূত হয়েছে। মনের সঠিক সুস্থ ও সুখীবোধ ক্ষেত্রেও দিয়েছে স্থায়ী সমাধান। দুঃখ সূচনা ব্যবধানে বুদ্ধের মার্গ অন্যতম বৈশিষ্ট্য রয়েছে প্রতি পলে পলে বৌদ্ধদর্শন বর্ণনায়। মানসিক প্রশান্তি সংরক্ষণে মানুষের চিন্তা ভাবনায় ব্যাপক উপায় রয়েছে নিজস্ব সঠিক সিদ্ধান্ত এবং প্রজ্ঞাভিত্তিক সমাধানের উপর। বুদ্ধের চেতনা যেমন মুক্তমনা ভিত্তিক ব্যাঞ্জনাময় উপলব্ধি গ্রহণ করার শক্তি রয়েছে, তাঁর বৌদ্ধদর্শন ভিত্তিময় দেশনাও মুক্তমনায় সিক্ত। তাই বুদ্ধের ধর্ম মানে মানসিক বিকাশ এবং মনের প্রকৃত সত্যমাত্রা লাভ করা। মনকে গুরুত্ব বহন করে ইতিবাচক জ্ঞান অর্জনের শক্তি সৃষ্ট করার উপযোগী মানুষের মেনে নিতে হবে। বুদ্ধের পন্থা অবলম্বন করা মানে আত্মসচেতন অবলম্বন করে ইতিবাচক মনোভাব অনুশীলনে নিজেকে ব্যাপৃত রাখা। বুদ্ধ স্বাভাবিকভাবে কোনো বিষয় বা জিনিসকে মেনে নিতে পছন্দ করেনি। তিনি প্রত্যেক বিষয়ে গভীর তত্ত্বমূলক গবেষণা সহকারে মেনে নিতে এবং গ্রহণ করতে পছন্দ ছিলেন। তাঁর বিশেষ পদ্ধতি দু'ভাবে প্রয়োগ করতেন। যেমন সাধারণ সত্য এবং পরমার্থ সত্য। স্বাভাবিকভাবে যে বিষয় বা বস্তুর গুণ, মান, উপাদান, ও বৈশিষ্ট্য থাকবে সেগুলো হলো সাধারণ সত্যের বিষয়। আর যেগুলো বিশেষভাবে বা পারমার্থিকভাবে যে বিষয় বা বস্তুগুলোর গুণ, মান, উপাদান, এবং বৈশিষ্ট্য সম্পর্ক জ্ঞান থাকবে সেগুলো পরমার্থ সত্য হিসেবে ভাবা যায়। অনুভূতির ক্ষেত্রে বৌদ্ধ সাধনার উপায়গুলো সম্পূর্ণ আলাদা। কারণ ইন্দ্রিয়জাত বশত সমষ্ট অনুভূত বিষয়ের চেতনা সবগুলো সুখের অধীনে উৎপত্তি হয় না। কোখনো কোখনো দুঃখের কারণ হয়েও অনুভূতির সূচনা ঘটে থাকে প্রত্যেক মানুষের চিন্তা-চেতনায়। বিজ্ঞানের যাত্রা প্রতিনিয়ত অস্বাভাবিক জ্ঞান তাড়নায় গবেষণা করা হচ্ছে বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞ পরিশ্রমে। ঠিক বুদ্ধের দর্শনে সঠিক মাত্রায় আসা সহজ উপায় নেই। মানুষের থাকতে হয় গভীর মনোনিবেশ অনুশীলনের সক্ষমতা। একজন সাধারণ মানুষের জ্ঞান প্রয়োগের ক্ষেত্রে বৌদ্ধসাধনার স্থানে নিজেকে তুলনা করা চলে না। বৌদ্ধসাধনার অধিকারী হতে হলে গভীর মেধাযুক্ত জ্ঞান প্রয়োগের মানুষ হতে হবে। প্রত্যেক অভিজ্ঞতায় নিজেকে প্রমাণ মিলাতে হবে একজন তাৎপর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্যধারী সঠিক মানুষ। আপনার অনুশীলন হতে হবে সর্বজনব্যাপৃত।বৌদ্ধজ্ঞান সম্বন্ধে আপনার গভীরে পৌছতে হলে অসাধারণ চিন্তা-চেতনা, ভাব সম্প্রসারণ ও মেধাকে কাজে লাগিয়ে নিতে হবে। এবং সুক্ষ্ম বিচার শক্তি দিয়ে মানসিক সমাধান পাওয়ার কোনো উপায় নেই।
লেখক→ শ্রীমৎ বীতশোক ভিক্ষু।
প্রবন্ধক।