জীবনটা আসলে কি? এই প্রশ্নে ভাববাদী দার্শনিকগণ আবেগ, বিশ্বাস ও অগাধ ভক্তি নির্ভর হয়ে স্থির করে নিয়েছেন; এমনকি তাঁরা অদ্বিতীয় অনড় বিশ্বাসের জেহাদী ঘোষণা দিয়ে বসেছেন যে, এ জীবন এক অনাদি, অনন্ত মহাশক্তি, যিনি সকলের অদৃশ্য থেকে এ বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সব কিছু আপন খেয়ালে সৃষ্টি ও ধ্বংস করে চলেছেন। আর তাঁর অমোঘ নির্দেশে ও ইচ্ছায় সেই সৃষ্টিকে উত্থান-পতনের স্রোতে মহাপ্রলয় নামক অনিবার্য ধ্বংসের দিকে বহমান রেখেছেন। এ দু’নয়নে দৃশ্যমান চন্দ্র, সূর্য থেকে শুরু করে অসংখ্য অদৃশ্যমান বস্তু ও প্রাণীকূল, ফলমূল, বৃক্ষ-লতা, নদী-নালা, পাহাড়-পর্বত; সব কিছুই তাই সেই অদৃশ্য মহাশক্তির দ্বারা সৃষ্ট, নিয়ন্ত্রিত ও ধ্বংসের অধীন। এই অদৃশ্য মহাশক্তিকে কেহ নাম দিয়েছেন আল্লাহ; কেহ বলেছেন ঈশ্বর; আবার কেহ বা বলেছেন মায়া; কেহ বা প্রকৃতি, নিয়তি ইত্যাদি। বস্তুবাদী, পরীক্ষণ-নিরীক্ষণ পন্থী বৈজ্ঞানিকেরা এ প্রসঙ্গে কী বলেন? এ জীবন ও জগতকে নিয়ে প্রতিনিয়ত উচ্ছারিত যে প্রশ্ন, তাকে তাঁরা দু’ভাগে ভাগ করতে দেখা যায়; জড় ও অজর প্রাণ। জড় বলতে বস্তু বা পদার্থ; যা অণু, পরমাণু দ্বারা গঠিত। এই অণু-পরমাণুর জটিল প্রক্রিয়া হতে উদ্ভব হয় প্রাণের। এখানে তারা অদৃশ্য তৃতীয় কোন শক্তি-মহাশক্তির অসিত্মত্ব্ স্বীকার করতে মোটেই রাজি নহেন। গবেষণাগারে শব ব্যবচ্ছেদের ন্যায় তন্ন তন্ন করে বস্তুকে পরীক্ষণ, নিরীক্ষণ, সংশ্লেষণ, সংযোজন, বিয়োজনের মাধ্যমে ইদানিং কালের জীব বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার ‘জীন’, ‘ক্লোন’। এ সকল পদ্ধতিতে তাঁরা জীবন্ত ভেড়া থেকে মানুষ পর্যন্ত বানানোর অঙ্গীকার এখন করে ফেলেছেন-এমনকি বাস্তবায়িতও করেছেন। একদিকে ভাববাদী ধর্ম প্রবক্তা ও দার্শনিক এবং অপরদিকে বস্তুবাদী বৈজ্ঞানিকগণ; উভয়ে বর্তমান বিশ্বে এখন দুই বিপরীত মেরুতেই অবস্থান গ্রহণ করেছেন। এ ক্ষেত্রে বলা সঙ্গত যে, চর্ম চক্ষুর প্রত্যক্ষ গোচরীভূত, হাতে-নাতে প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক সাফল্যকে, এখন উঁড়িয়ে দেয়ার মতো ক্ষমতা, বর্তমানে কট্টরপন্থী ঘোর ভাববাদীরা পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেছেন ইদানিং কালের বিশ্বে। যায় যায় রব উঠেছে তাই, ভাববাদীদের আকাশ-কুসুম তাসের ঘরে। প্রদীপ নেভার আগে দপ্ করে জ্বলে উঠার ন্যায় তাঁরা এজন্যেই এখন জেহাদী, ক্রুসেডী, কুরুক্ষেত্রীদের ন্যায় হুংকার দিয়ে বলতে শুরু করেছেন; বিজ্ঞান নামক শয়তানের গলাটিপে মারো, তারা সুন্দর সুষম আদরনীয় মানব সমাজ, সভ্যতার নৈতিক ভ্িতকে একেবারে ধ্বংস করে দিচ্ছে। অথচ হাস্যকর দৃশ্য হলো, সেই ভাববাদী ভক্তবৃন্দ বিজ্ঞানের সাধনালব্ধ যাবতীয় ফসল বিনা দ্বিধায় ভোগ করতে কিন্তু এক পাও পিছিয়ে নেই। কোন অরুচি নেই বৈজ্ঞানিক প্রদত্ত সকল সুযোগ-সুবিধে ও আমোদ-প্রমোদ তাঁরা উপভোগ করতে। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে বিজ্ঞানের বর্তমান অগ্রগতি হাজার হাজার বছরের ভাববাদী ধর্ম ও দর্শনের প্রবল প্রতাপী সিংহাসনে এখন প্রবল ভূমিকম্পের সৃষ্টি করেছে। সুধী পাঠক! যীশু খৃষ্টের জন্মের পাঁচশো বছর আগে এবং হযরত মুহম্মদের এক হাজার বছর আগে প্রচারিত বিশ্বের প্রাচীনতম ধর্মমত মহান বুদ্ধের দর্শন এ প্রসঙ্গে কি বলেন? এই ধর্ম ও দর্শন বিজ্ঞানের বর্তমান অগ্রগতিতে প্রকম্পিত কি? ‘প্রাণ’ সম্পর্কীত বিজ্ঞানের অতি সামপ্রতিক আবিষ্কারের প্রশ্নে কী জবাব দেবে বুদ্ধের ধর্ম ও দর্শন? চারি আর্য সত্য জ্ঞান এবং প্রতীত্য সমুৎপাদ জ্ঞান এ দু’টি শব্দ বুদ্ধ দর্শনের মূল এবং অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চারি আর্য সত্য জ্ঞান অর্থে দুঃখ, দুঃখের কারণ, দুঃখের নিরোধ এবং নিরোধের উপায় জ্ঞান। প্রতীত্য সমুৎপাদ অর্থে জীবন দুঃখের উৎপত্তি ও নিরোধের উপায় সম্পর্কে মনস্তাত্তিক কার্য-কারণ বা হেতু-প্রত্যয় সম্পর্কে জ্ঞান। বুদ্ধ দর্শনের এ দুই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুদ্ধের ধর্ম ও দর্শনকে একদিকে বর্তমান বিশ্বের অপরাপর ধর্ম সমূহের পর্যায়ভুক্ত যেমন করেছে, আবার বস্তু বিজ্ঞানের সাথেও নিজেকে সম্পৃক্ত করেছে গভীরভাবে। প্রাণের সৃষ্টি সম্পর্কে বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে বিশ্ব মানব সমাজের নৈতিক ধস্ নিয়ে অন্যান্য ধর্মের গুরুদের যেই উদ্বেগ, উৎকন্ঠা; সেই উৎকন্ঠা বৌদ্ধ ধর্ম গুরুদের থাকার কথা নহে। কেন থাকবে না, তা বুদ্ধের ধর্ম-দর্শনের মূলতত্ত্ব প্রতীত্য সমুৎপাদ জ্ঞান বা কার্যকারণ তত্ত্বকে নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করলেই বুঝা যাবে। কী বলেন তথাগত বুদ্ধ তাঁর চারি আর্য সত্য ও ‘প্রতীত্য সমুৎপাদ’ নামক তত্ত্ব দর্শনে? প্রিয় পাঠক চলুন, আমরা পর্যালোচনা করে দেখি বুদ্ধের এই চারি আর্য সত্য ও প্রতীত্য সমুৎপাদ দর্শনকে। স্থুল আবেগ বহুল এবং ভোগ নির্ভর, অসম্যক, অযথার্থদর্শী সাধারণ জীবন এবং দৈহিক নিপীড়নে সুফল হীন কৃচ্ছ সাধন-এ দুই অন্ত ত্যাগ করে দেহ-মনের সুস্থ ভারসাম্য তথা স্বাভাবিকতা নিয়ে, উদ্যম পরাক্রমের মাধ্যমে মহৎ লক্ষ্য অর্জনে যেই চেষ্টা সাধনা তাকে বলা হয় ‘মজ্ঝিম পতিপদা’ তথা মধ্যম পন্থী জীবন চর্যা। বুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় বলা হয়েছে, এভাবেই সম্ভব হয় প্রজ্ঞা নামক গভীর অন্তর্দৃষ্টি অর্জন। এরূপ গভীর অন্তর্দৃষ্টিতেই ধরা পড়ে এ জীবন ও জগত রহস্য। জীবন-দুঃখের চির অবসানে চারি আর্য সত্য দর্শনের ইহাই মূল কথা। বিনা কারণে কোন কার্যই এ পৃথিবীতে সংগঠিত হয় না; বুদ্ধের প্রতীত্য সমুৎপাদ তত্ত্ব দর্শনের মূল কথাও এটি। এ দুই দর্শনের সমন্বয় সাধন দ্বারা সর্ব দুঃখহীন যেই অপার মানসিক সুখ-শান্তি লাভ হয়, তার নাম দেয়া হয়েছে নির্বাণ। অর্থাৎ জীবন-মনের যেই স্তরে সকল প্রকার সংকীর্ণতার বান বা বন্ধনের অসিত্মত্ব আর খুঁজে পাওয়া যায় না, তাহাই নির্বাণ। নিজের ও পরের জীবনেই শুধু নহে; এ বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের জড়-অজড় সব কিছুতেই আমাদের জ্ঞাতে ও অজ্ঞাতে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত; এই ত্রিকালিক সম্পর্কীত হয়ে অবিরাম ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার যেই অনন্ত-বিশাল প্রবাহ বিদ্যমান; তার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে বুদ্ধের প্রতীত্য সমুৎপাদ তত্ত্বের সাথে আধুনিক জড় বিজ্ঞানের কোন বিরোধ নেই। পার্থক্য শুধু বিষয়ের প্রাধান্যতায়। বুদ্ধের প্রাধান্যতা মনের ব্যাপক বিশ্লেষণে; অপরদিকে আধুনিক বিজ্ঞানের প্রাধান্যতা বস্তুর ব্যাপক বিশ্লেষণে। মূলতঃ মনের যেই কৌতুহলী শক্তির প্রয়োগ জড় বিজ্ঞানের মূল ভিত্তি; সেই মনের অপার শক্তির আবিষ্কারক হলেন বুদ্ধ। তাই দেহ মন ও জাগতিক যাবতীয় কর্মকাণ্ডে সৃষ্টা নামক অদৃশ্য কাল্পনিক অসিত্মত্বের অপ্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বস্তু বিজ্ঞানী ও বুদ্ধ উভয়েই সম্পূর্ণ একমত। কারণ বিনা কারণে কোন কিছুর উদ্ভব অসম্ভব। এই অনিবার্য সত্যটি স্বীকার করে নিয়ে বুদ্ধের দর্শন এবং বিজ্ঞানের সিদ্ধান্ত হলো, একক কোন শক্তির দৃশ্য বা অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের সব কিছুকে আনা অসম্ভব। প্রত্যেকটি ঘটনা স্ব স্ব স্বভাব ও পরিস্থিতি সম্ভূত। তারা কার্যকারণ নিয়ম শৃঙ্খলার অধীন, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া মাত্র। জড়-বিজ্ঞান এখন জিনতত্ত্বের মাধ্যমে প্রাণ-বিজ্ঞানে তার জয়-যাত্রাকে অপ্রতিরোধী করে তুলেছে। এই প্রযুক্তি এখন জীবন্ত ভেড়া, এমনকি উর্বর মননশীলতা সম্পন্ন মানব পর্যন্ত বিজ্ঞানের গবেষণাগারে তৈরী করার যোগ্যতায় আশাবাদী হয়ে উঠেছে। আধুনিক প্রাণ বিজ্ঞানের এই সাফল্য, আড়াই হাজার বছর আগের শ্রেষ্ঠ মনোবিজ্ঞানী বুদ্ধের অনাত্মবাদ ও ক্ষণিকবাদকে এক অনন্য স্বীকৃতির আসনেই এখন প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিজ্ঞানের জয় যাত্রায় মহান বুদ্ধকে অগ্রজ বড়ো ভয়ের মর্যাদা দান করলো প্রশ্নাতীতভাবে। অপরদিকে বুদ্ধের দর্শন স্রষ্টাবাদীদেরকেও সঠিক পথ নির্দেশনা দিয়ে থাকেন এই বলে যে কেন আমরা অহেতুক অদৃশ্য মহাশক্তির কল্পনায় আপন বিবেক বুদ্ধির বিসর্জন দিয়ে অন্ধ আবেগের ফানুসে ভাসমান থাকবো? মানুষকে সংযত সুশৃঙ্খল জীবন গঠনের লক্ষ্যে স্বর্গের আকর্ষণ, নরকের ভীতি, সাধারণ মানুষের বোধগম্যতায় আনতে, স্রষ্টা নামক কাল্পনিকতার আশ্রয় না নিয়েও তো পারা যায়। আমাদের এই দেহ মনের প্রতিটি ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার কার্যকারণ ভিত্তিক অনুসন্ধানেও তো সেই স্বর্গ-নরকের অসিত্মত্ব প্রমাণ করা যায়। ভালো কাজের ভালো ফল, মন্দ কাজের মন্দ ফল। ভালো কাজের জন্যে পুরস্কার এবং মন্দ কাজের জন্যে যেই শাসিত্ম, তা দেয়ার জন্যে আমার কর্মই তো একমাত্র নির্ধারক হয়ে পুরস্কার দাতা ও শাসিত্ম দাতা হয়ে থাকে। স্বর্গ-নরক তো মোটেই কাল্পনিক নহে। ইহারা তো একান্তই কার্য-কারণ তত্ত্ব ভিত্তিক কর্ম ও কর্মফলের এক একটি পরিস্থিতি বা অবস্থা মাত্র। ভালো কাজের পুরস্কার, আনন্দ ও তৃপ্তি। আর মন্দ কাজের স্বাভাবিক ফল হবে শাসিত্ম, দুঃখ, তাপ, হাহাকার। স্বর্গ-নরক তো এই ভালো-মন্দের অনিবার্য পরিণতির প্রতীকী শব্দ মাত্র। এমন বাস্তব সত্য নিয়ে এত মুখরোচক গল্প কেন? প্রাণী মাত্রেই সুখ, আরাম, শান্তি, নিরাপত্তা এসবের একান্ত প্রত্যাশী। এটাতো জড়-অজড় নির্বিশেষে প্রাণের স্বভাব ধর্ম। প্রাণের স্বাভাবিক গঠন বৈশিষ্ট্য থেকেই তার এ স্বভাব প্রবৃত্তির জন্ম। জড় প্রাণ সেই উদ্ভিদ লতাপাতা বলুন বা সচল প্রাণ মানুষ পশু পক্ষী কীটপতঙ্গই বলুন; সবাক-নির্বাক সবার মাঝেই তো একই প্রবণতা বিদ্যমান। সুখের প্রত্যাশা আর দুঃখের বিরোধীতা তো সবাই করে। দুঃখের মুক্তি থেকেই তো অনিবার্যভাবে সুখের জন্ম। অতএব, সুখের প্রত্যাশায় এত অবাস্তব গল্প কাহিনী কেন? তাই বুদ্ধ তথাগত এই দুঃখ-মুক্তির জন্যে এ কারণেই উপায় নির্দেশ করলেন, ‘চারি-আর্য-সত্য’ তত্ত্ব-দর্শনের মাধ্যমে। পাঠক, একটু ভাবলেই বুঝতে পারবেন বুদ্ধ প্রদর্শিত এই চারি আর্যসত্য দর্শন কী অসম্ভব রকমে অন্ধ আবেগ এবং সর্বপ্রকার কাল্পনিকতা মুক্ত। ডাক্তার যেমন রোগীর রোগযন্ত্রণা লাঘবের উপায় নির্ধারণে সর্ব প্রথম সন্ধান করেন রোগের বর্তমান লক্ষণ (রোগীর যন্ত্রণা, অসুবিধা, অস্বসিত্ম) কি কি; দ্বিতীয় পর্যায়ে সন্ধান করেন এই রোগের উৎপত্তির সম্ভাব্য কারণ কি কি হতে পারে ; তৃতীয় পর্যায়ে ঔষধ প্রয়োগের মাধ্যমে লক্ষ্য করেন রোগের হ্রাস-বৃদ্ধির গতি-প্রকৃতিকে এবং অন্তিম পর্যায়েই সঠিক ঔষধ প্রয়োগ করেন রোগের সম্পূর্ণ নির্মূল, ধ্বংস সাধনে। চিকিৎসা পদ্ধতির এই অবিকল পদ্ধতিই মহাজ্ঞানী তথাগত বুদ্ধ কর্তৃক অনুসৃত হয়েছে তাঁর চারি আর্যসত্য দর্শনতত্ত্বে। জীবনের যাবতীয় দুঃখের চির অবসানের যথার্থ দর্শন ‘চারিআর্যসত্য জ্ঞান’ ইহা কেবলমাত্র দর্শন নহে, ইহা একান্ত বাস্তবতা ভিত্তিক অনুশীলনধর্মী এক অভাবনীয়, অদ্বিতীয় উপায়। আর এ কারণেই বুদ্ধ তথাগতের কন্ঠে উদগীত হয়েছে-“একায়নো অয়ং ভিক্খবে মগ্গো সত্ত্বানং বিসুদ্ধিয়া, সোকো পরিদেবানং সমতিক্কমায়, দুঃখ-দোমনস্সানং অত্থঙ্গমায়, ঞায়স্স অধিগমায়, নিব্বানস্স সচ্চি কিরিয়ায়-যদিদং চত্তারো সতিপট্ঠান।”
একমাত্র আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের যথার্থ অনুশীলনধর্মী জীবন গঠনের উপায় এই চারি প্রধান পদ্ধতিতে স্মৃতির অনুশীলন দ্বারাই প্রাণীগণের চিত্ত ও জীবন দৃষ্টি বিশুদ্ধি, শোক পরিতাপের সম্যক অতিক্রম, দুঃখ-দুর্মনাভাবের চির অবসান (অস্তগমন), জ্ঞান অধিগম এবং নির্বাণ সাক্ষাতকরণ সম্ভব হয়।
মহাজ্ঞানী বুদ্ধ প্রবর্ত্তিত চারি আর্য সত্য দর্শনের মূল কথা হলো জীবনে যত প্রকার সমস্যা আছে। সকল সমস্যাকে গভীর মনোনিবেশ সহকারে দুঃখ রূপেই জানা। সে সকল দুঃখের উৎপত্তির কারণ তখন স্বভাবতই তোমার জ্ঞান দৃষ্টিতে ধরা পড়বে। দ্বিতীয় পর্যায়ে তখন তোমার কর্তব্য হয়ে পড়বে দুঃখ উৎপত্তি বা সমস্যার এই কারণকে সজ্ঞানে অতি সাবধানে পরিত্যাগের জন্যে বুদ্ধ প্রদর্শিত অষ্টাঙ্গিক মার্গজীবী হয়ে সাধনায় ঐকান্তিকভাবে নিজেকে সমর্পিত করা। এই চেষ্টা সাধনার সময়ে তৃতীয় পর্যায়ে নিবিষ্ট চিত্তে লক্ষ্য রাখতে হবে উৎপন্ন প্রতিটি সমস্যা কিভাবে কোন পথে, কি উপায়ে একের পর এক বিদায় নিচ্ছে। তাই বৌদ্ধ দর্শনের পরিভাষায় বলা হয়েছে- দুঃখ সত্যকে জ্ঞাত হও, সমুদয় সত্যকে ত্যাগ করো, নিরোধ সত্যকে প্রত্যক্ষ করো এবং মার্গ সত্যকে গঠন করো।
ইহা একান্তই সত্য যে, দুঃখটা হলো প্রাণের স্বাভাবিক চাহিদা সেই ‘সুখ’ লাভের পথে একমাত্র প্রতিবন্ধক। তাই দুঃখ নামক এই প্রতিবন্ধকতাকে দূর করতে হলে মুক্তিকামীর প্রথম কর্তব্য হবে, এ সকল দুঃখের মূল কারণ যথাযথভাবে জানা। এই জানার জন্যে আমরা পূর্বঅভিজ্ঞ জনের অভিজ্ঞতার আশ্রয় নেয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ। অনন্ত জ্ঞানী বুদ্ধই হচ্ছেন আমাদের এই প্রয়াসের পরম নির্ভর যোগ্য আশ্রয়। বুদ্ধের সুগভীর অন্তর্দৃষ্টিতে ধরা পড়েছে যে, লোভ, দ্বেষ এবং মোহ নামক তিনটি মনোবৃত্তিই জীবনের যাবতীয় দুঃখ-ভোগান্তির মূল কারণ। এই লোভ, দ্বেষ, মোহ নামক চিত্তবৃত্তি তথা মানসিকতা গঠনের মূল উপাদান হচ্ছে অভিধর্মে উল্লেখিত বায়ান্ন প্রকার চৈতসিক। এগুলো মহাসতিপট্ঠান সূত্রে উল্লেখিত নিয়মে প্রথমে বিশেষভাবে অনুধাবনের চেষ্টা করতে হবে। অর্থাৎ স্মৃতি সাধনায় রত হতে হবে অবিরাম অবিচ্ছিন্ন ভাবে। এতে করে চলমান জীবনের যাবতীয় সুখানুভূতি, দুঃখানুভূতি আর উপেক্ষানুভূতির আবির্ভাব ও তিরোভাব স্বাভাবিক ভাবেই ধরা পড়বে নিজের কাছে। এই জানা ও এই বুঝাকে বলা হয় লৌকিয় সম্যক দৃষ্টি। লৌকিয় সম্যক দৃষ্টি জাত অভিজ্ঞতার ক্রমিক উৎকর্ষতায় যখন (আপন পরের) প্রতিটি চিত্ত ক্ষণের উৎপত্তি ও নিরোধধর্মীতাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব হয়, তখনই অনাসক্ত ভাব জাগ্রত হয়। এভাবে যখন আপন মন অনাসক্ত ভাব প্রাপ্ত হয় তখনই জাগে, লোকোত্তর সম্যক দৃষ্টি। এই যথার্থ জীবন দৃষ্টিই মানব জীবনের সুদুর্লভ সম্পদ। এই সম্পদের অধিকারী যিনি হবেন, তিনিই লাভ করবেন বুদ্ধ তথাগত নির্দেশিত চির অক্ষয় পরম সুখ, পরম শান্তি নির্বাণ। কামনা করি এ মানব জীবনে সকলের কাছে প্রিয় হোক, বুদ্ধ তথাগতের চির সত্য এই দুর্লভ অবদান।
মহাজ্ঞানী বুদ্ধ প্রবর্ত্তিত চারি আর্য সত্য দর্শনের মূল কথা হলো জীবনে যত প্রকার সমস্যা আছে। সকল সমস্যাকে গভীর মনোনিবেশ সহকারে দুঃখ রূপেই জানা। সে সকল দুঃখের উৎপত্তির কারণ তখন স্বভাবতই তোমার জ্ঞান দৃষ্টিতে ধরা পড়বে। দ্বিতীয় পর্যায়ে তখন তোমার কর্তব্য হয়ে পড়বে দুঃখ উৎপত্তি বা সমস্যার এই কারণকে সজ্ঞানে অতি সাবধানে পরিত্যাগের জন্যে বুদ্ধ প্রদর্শিত অষ্টাঙ্গিক মার্গজীবী হয়ে সাধনায় ঐকান্তিকভাবে নিজেকে সমর্পিত করা। এই চেষ্টা সাধনার সময়ে তৃতীয় পর্যায়ে নিবিষ্ট চিত্তে লক্ষ্য রাখতে হবে উৎপন্ন প্রতিটি সমস্যা কিভাবে কোন পথে, কি উপায়ে একের পর এক বিদায় নিচ্ছে। তাই বৌদ্ধ দর্শনের পরিভাষায় বলা হয়েছে- দুঃখ সত্যকে জ্ঞাত হও, সমুদয় সত্যকে ত্যাগ করো, নিরোধ সত্যকে প্রত্যক্ষ করো এবং মার্গ সত্যকে গঠন করো।
ইহা একান্তই সত্য যে, দুঃখটা হলো প্রাণের স্বাভাবিক চাহিদা সেই ‘সুখ’ লাভের পথে একমাত্র প্রতিবন্ধক। তাই দুঃখ নামক এই প্রতিবন্ধকতাকে দূর করতে হলে মুক্তিকামীর প্রথম কর্তব্য হবে, এ সকল দুঃখের মূল কারণ যথাযথভাবে জানা। এই জানার জন্যে আমরা পূর্বঅভিজ্ঞ জনের অভিজ্ঞতার আশ্রয় নেয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ। অনন্ত জ্ঞানী বুদ্ধই হচ্ছেন আমাদের এই প্রয়াসের পরম নির্ভর যোগ্য আশ্রয়। বুদ্ধের সুগভীর অন্তর্দৃষ্টিতে ধরা পড়েছে যে, লোভ, দ্বেষ এবং মোহ নামক তিনটি মনোবৃত্তিই জীবনের যাবতীয় দুঃখ-ভোগান্তির মূল কারণ। এই লোভ, দ্বেষ, মোহ নামক চিত্তবৃত্তি তথা মানসিকতা গঠনের মূল উপাদান হচ্ছে অভিধর্মে উল্লেখিত বায়ান্ন প্রকার চৈতসিক। এগুলো মহাসতিপট্ঠান সূত্রে উল্লেখিত নিয়মে প্রথমে বিশেষভাবে অনুধাবনের চেষ্টা করতে হবে। অর্থাৎ স্মৃতি সাধনায় রত হতে হবে অবিরাম অবিচ্ছিন্ন ভাবে। এতে করে চলমান জীবনের যাবতীয় সুখানুভূতি, দুঃখানুভূতি আর উপেক্ষানুভূতির আবির্ভাব ও তিরোভাব স্বাভাবিক ভাবেই ধরা পড়বে নিজের কাছে। এই জানা ও এই বুঝাকে বলা হয় লৌকিয় সম্যক দৃষ্টি। লৌকিয় সম্যক দৃষ্টি জাত অভিজ্ঞতার ক্রমিক উৎকর্ষতায় যখন (আপন পরের) প্রতিটি চিত্ত ক্ষণের উৎপত্তি ও নিরোধধর্মীতাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব হয়, তখনই অনাসক্ত ভাব জাগ্রত হয়। এভাবে যখন আপন মন অনাসক্ত ভাব প্রাপ্ত হয় তখনই জাগে, লোকোত্তর সম্যক দৃষ্টি। এই যথার্থ জীবন দৃষ্টিই মানব জীবনের সুদুর্লভ সম্পদ। এই সম্পদের অধিকারী যিনি হবেন, তিনিই লাভ করবেন বুদ্ধ তথাগত নির্দেশিত চির অক্ষয় পরম সুখ, পরম শান্তি নির্বাণ। কামনা করি এ মানব জীবনে সকলের কাছে প্রিয় হোক, বুদ্ধ তথাগতের চির সত্য এই দুর্লভ অবদান।
প্রাবন্ধিক: শ্রীমৎ প্রজ্ঞাবংশ মহাথেরো।
প্যারিস।




