Followers

Sunday, January 7, 2018

পূজ্য বনভন্তের স্মরণে-


রাস্তায় দু’পাশে সারি সারি দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা নিবেদনে হাজার হাজার শোকাহত মানুষ। প্রত্যেকের হাতে নানা বর্ণের সুবাসভরা নানা রঙের ফুলের তোড়া।  কারো বুকে বুক ধাঁধাঁ অস্বস্তি আর কারো বুকে অশান্ত আত্মগ্লানির ধোঁয়া। সারিবদ্ধ মানুষেরা ভক্তিতে মনে মনে গেয়ে যায় সেই মহান মানবের কীর্তিগান। এভাবেই বিগত ৩০ জানুয়ারী ২০১২ইং এ সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ভক্তদের কাঁদিয়ে চলে গেলেন আর্যপুরুষ শ্রদ্ধেয় বনভান্তে।
তাঁর প্রয়াণের পর থেকে থেমে যায় করুণার মহাসমুদ্র। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে এমন অতল করুণাময়ী মানুষ চির বিদায় নিলেন। চিকিৎসার জন্য পূজ্য বনভান্তেকে  ২৬শে জানুয়ারী ২০১২সালে ঢাকা স্কয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসার কোনো ফল হয়নি তাই তিনি আর ফিরেননি আমাদের শ্রদ্ধার মন্দিরে। আজ তাঁকে স্মরণ করছি অকৃত্রিম শ্রদ্ধাভরে। তিনি ছিলেন আমাদের এক মহান পথপ্রদর্শক।

১৯২০ সালে ৮ই জানুয়ারী এই মহান পুরুষের শুভ জন্ম হয় রাঙামাটির মোরঘোনায়। তাঁর সান্নিধ্যে যারা এসেছিলেন তারা পূজ্য বনভান্তের জীবনাদর্শকে দেখে শ্রদ্ধাভরে বিশ্চিত হয়েছেন। যারা তার আদর্শের ছোঁয়া পায়নি তারা সেই মহান পুরুষের সন্ধানও পায়নি! তিনি ছোটবেলা থেকে ছিলেন ভোগে উদাসীন, ত্যাগে বিমল চন্দ্রের ন্যায়। কখনো স্ত্রী-পুত্র, ধন-জন আধিপত্য কামনা করেননি। একাহারী-একাকী জীবনাদর্শে তিনি ছিলেন আমৃত্যু সঙ্গী। বিশ্বের গুণীদের গুণ হিসাব করলে কীর্তিমান মানুষের ঊর্ধ্বে তিনি। স্ত্রী-পুত্র, ধনে-জনে, আধিপত্যে, মান প্রথিত যশ-বিলাস গুলোকে তিনি দুঃখ, দুঃখ সমুদয় প্রতিপদা ও ভারি বোঝা সদৃশ ভাবতেন। তাই তো স্ত্রী-পুত্র, ধন-জন আধিপত্য তাকে একবিন্দুও স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি ছিলেন প্রজ্ঞাবিমুক্তি ও চিত্তবিমুক্তিতে বলীয়ান পুরুষ। বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক, তার্কিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক সবকিছুর ঊর্ধ্ব শিখরে।
তিনটিলা থেকে ১৯৭৫ সালে রাঙ্গামাটিস্থ গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের পরামর্শক্রমে নব প্রতিষ্ঠিত রাজবন বিহারে এই দুর্লভ মানুষকে আমন্ত্রণ করে  আনা হয় । রাজবন বিহারে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের সমাগম হতো কাঙ্খিত শ্রদ্ধায় পূজনীয়কে পূজা দিতে। এই মহান পুরুষ করুণাসিক্ত হৃদয়ে গ্রহণ করেন হাজারো ভক্তদের অনাবিল কাঙ্খিত শ্রদ্ধা। বীর উচ্ছ্বাসে গেয়ে যান মহান বুদ্ধের বাণী। প্রায় পঞ্চদশকেরও ঊর্ধ্বে অকাতরে জনগণের মাঝে বিলিয়ে যান বুদ্ধের অমৃত বাণী । থাইল্যান্ড, বার্মা, ভারত, শ্রীলঙ্কা, কম্বোডিয়া, ইত্যাদি দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে তার গুণমহিমা। বিভিন্ন গ্রন্থে বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত হয় তাঁর কীর্তি। তাঁর ত্যাগ-তিতিক্ষা ছিলো আমাদের মুগ্ধের কারণ। তিনি তিন দশকেরও অধিক কাল শয়ন ত্যাগে ব্রতী ছিলেন। দীর্ঘ ১২ বৎসর ধরে গভীর বনে ধ্যান করে হয়েছেন আজকের পূজ্য বনভান্তে।

.তাঁর দেশনা সকলকে আত্মজয়ী, আত্ম সচেতনতা, আত্মনিরর্ভুল হতে শেখায়। জাগ্রত করে সমগ্র মানব জাতির পরস্পর ভ্রাতৃত্ববোধ। যেখানে নেই কোনো ভেদাভেদ-বৈষম্য। তাই তিনি ছিলেন আমাদের ঐক্যর ধারক প্রণেতা। দেশের সকল মানুষের মাঝে জাগ্রত করেছেন মানবতাধর্মী বুদ্ধ ইতিহাসের চেতনা। কিন্তু আজ এমন গুণী মানুষকে গুটি কয়েকজনে সঠিক মূল্যায়ন করতে না পারাটা তাদের জন্য খুবই দুর্ভাগ্যের। সরকারীভাবে কোনো অগ্রাধিকার দেওয়া না হলেও লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়েছে। হয়ত জাতিবাদ, বৈষম্যবাদ তাকে মূল্যায়ন না করলেও মানবতা তাকে অবশ্যই মূল্যায়ন করেছিল। জনৈক কবি বলেছিলেন—
গাহি সাম্যের গান,
যেখানে আসিয়া এক হয়ে আছে,
সব বাধা ব্যবধান।
সেখানে মিশেছে
হিন্দু বৌদ্ধ, মুসলিম, খ্রিস্টান।

কৃতজ্ঞতা: শ্রীমৎ বীতশোক ভান্তে।

বৌদ্ধধর্ম কেন সেরা ? -লেখক রাহুল বড়ুয়া

গৌতম বুদ্ধের মহা আবিস্কার প্রতীত্যসমুদপাদ নীতি বা কার্যকারণ নীতির মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক উপায়ে তিনি ধর্মের ব্যাখ্যা করেছেন। বুদ্ধের ধর্মের মূল শিক্ষা হল-

সমস্ত পাপ কাজ থেকে বিরত থাকা, কুশল কর্ম সম্পদান করা এবং নিজের চিত্তকে নির্মল রাখা।

আবার তথাগত বুদ্ধের শিক্ষা সমস্ত মানবজাতির জন্য। জীব জগতের সমস্ত প্রাণীগণ দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ করতে চাইলে তথাগত বুদ্ধের পথ অনুশীলনের মাধ্যমে দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ করতে পারবো। তথাগত বুদ্ধ বলছেন শীল, সমাধি, প্রজ্ঞার অনুশীলন বিহীন কারও দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ করা সম্ভব নয়।শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞার অনুশীলন করতে হলে আমাদের আর্যঅষ্টাঙ্গিক মার্গ বা Eightfold path অনুসরন করতে হবে।
বুদ্ধ আর্যঅষ্টাঙ্গিক মার্গের তিনটি মার্গকে শীলের মুল হিসাবে ব্যাখ্যা করেছেন। এই তিনটি হল- সম্যক বাক্য, সম্যক কর্ম ও সম্যক জীবিকা। তিনটি মার্গকে সমাধি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। এই তিনটি হল- সম্যক প্রচেষ্টা, সম্যক স্মৃতি ও সম্যক সমাধি। দুইটি মার্গকে ব্যাখ্যা করেছেন প্রজ্ঞা হিসেবে। প্রজ্ঞার এই দুই পথ হল- সম্যক দৃষ্টি ও সম্যক সঙ্কল্প। তাই সৎ দৃষ্টি, সৎ সংকল্প, সৎ বাক্য, সৎ চিন্তা,, সৎ কর্ম, সৎ জীবিকা, সৎ প্রচেষ্টা, সৎ স্মৃতি ও সৎ সমাধিকে অষ্ট বিশুদ্ধ পথ বলে অভিহিত করা হয়েছে।
মহামানব বুদ্ধ ছিলেন অহিংসা, ন্যায় ও সাম্যনীতির এক বলিষ্ঠ কণ্ঠ।অনুশাসন ছিল আত্মজয় ও আত্মপ্রতিষ্ঠার পক্ষে। তাই তার ধর্মে কোনো অলৌকিকত্ব নেই, নেই কোনো ঈশ্বরস্তুতি কিংবা ভক্তিবাদ। আছে শুধু বুদ্ধি ও বিবেকশাণিত যুক্তি ও আত্মজিজ্ঞাসা। আছে নিজকে দেখার, জানার ও বিচার করার পরম শিক্ষা। এটাই বৌদ্ধধর্মের মূল দর্শন। বৌদ্ধধর্মে কোনো ধরনের জাতি-বর্ণভেদ নেই, নেই কোনো ধরনের শ্রেণীবৈষম্যও। মানুষ হিসেবে তিনি সবাইকে দেখেছেন একই দৃষ্টিতে, সমজ্ঞানে। তাই বুদ্ধবাণীতে বারবার ধ্বনিত হয়েছে অহিংসা, শান্তি ও বিশ্বপ্রেমের কথা। উচ্চারিত হয়েছে মহাসাম্য ও মহামৈত্রীর কথা।

আরেকটি বিষয় বৌদ্ধধর্মকে অন্যান্য ধর্ম হতে অনন্য করেছে, আর তা হল নির্বাণ। বৌদ্ধধর্ম ছাড়া সকল ধর্মের একমাত্র লক্ষ্য হল স্বর্গ লাভ করা বা নরকে হতে রেহাই পাওয়া। কিন্তু বৌদ্ধধর্ম শুধুমাত্র স্বর্গ নরকেই সন্তুষ্ট নয়। স্বর্গকে গৌতম বুদ্ধ পৃথিবী বা মনুষ্যভূমি হতে একটি উন্নততর আর নরককে একটি নিম্মস্তরের অবস্থা বলে মনে করতেন। তাই তিনি স্বর্গে যাওয়া আর নরক হতে রেহাই পাওয়াকেই মূল বলে গুরুত্ব দেননি। স্বর্গ আর নরককে মানুষ পৃথিবীর মানুষের মতই ভোগ বিলাসে মত্ত বা যন্ত্রনায় কাতর। বুদ্ধ মানুষকে সকল দুঃখ সকল শৃঙ্খল হতে মুক্তি দিতে নির্বাণ লাভের কথা বলেছেন। নির্বাণ হল স্বর্গ ও নরক হতে উন্নততম একটি অবস্থা যেখানে মানুষ ভোগ বিলাস, দুঃখ কষ্টের প্রাপ্তি হতে মুক্ত।নির্বানগামীগণ আনন্দ বেদনা, লোভ, লজ্জা বা ভয় হতে মুক্ত। নির্বাণ প্রাপ্তির পর প্রাণী জন্ম জন্মান্তরের বন্ধন হতে মুক্ত হয়ে চির শান্তি লাভ করে। তাই বলাহয় নির্বাণ পরম সুখ।

বৌদ্ধধর্ম এমন একটি ধর্ম যে ধর্ম প্রচারিত হয়েছে শুধু মাত্র জ্ঞান সুধা বিতরণ ও মৈত্রী করুণা প্রদর্শনের মাধ্যমে। এই ধর্ম প্রচার করতে গিয়ে কোন দিন একটি মানুষকে আঘাত করা হয়নি। শুধু তাই নয় বৌদ্ধধর্ম প্রচার করতে গিয়ে একফোঁটা পশু রক্তও কোনদিন ঝরেনি। অথচ সকল শক্তির উত্স (?) ঈশ্বরের প্রেরিত ধর্ম সমুহের যুদ্ধ বিগ্রহ বা কলহের কারণে পৃথিবীতে সবচে বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। প্রাণীর কথা বাদ দিলাম, ঈশ্বরের কাল্পনিক শক্তির কাছে বা দয়ার কাছে বলি হয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষকে খুন হচ্ছে। বৌদ্ধধর্ম এই পাপ হতে মানুষকে মুক্ত করতে পেরেছে। তাই বৌদ্ধধর্মকে মহাশান্তি মহাপ্রেমের ধর্ম বলা হয়।

মহামানব গৌতম বুদ্ধের জন্ম, চারিত্রিক গুনাবলী, বুদ্ধত্বলাভের প্রক্রিয়া অত্যন্ত মর্যাদাদায়ক। বৌদ্ধধর্মের প্রচার ও ধর্মের আভ্যন্তরীণ দর্শন অত্যন্ত চমৎকার ও সুব্যাখ্যাত। তাই সকল মুক্ত চিন্তার স্বাধীন মানুষ বা সুধী মহলে সমাদৃত। এই ধর্ম প্রচারে যেমন রক্তপাত নেই ধর্মপালনেও নেই কোন হানাহানি। ফলে জোর জবরদস্তী করে বৌদ্ধধর্ম প্রচার করতে হয়না। নির্বাণ লাভের মাধ্যমে এই ধর্মে চিরশান্তি চির মুক্তির বাণী ঘোষণা করা হয়েছে।

Tuesday, January 2, 2018

ধর্ম আমাদের প্রকৃত আধ্যাত্মিক বোধের খোরাক এবং গভীর ভাবাবেগ- শ্রীমৎ বীতশোক ভিক্ষু


ধর্ম গায়ে মাখা বস্তু না। নয় বাহ্যিক বস্তুর নকশার প্রতীকও। এটা অনুভূতির শিহরণে বাঁধা এক প্রাণের সংযোগ। যা নিরন্তর সুখী এবং বিশ্ব মানবের একাত্মতা ভাব মানুষের জন্য। তাঁকে যদি আপনি কোখনো ভাবতে চান, অবশ্যই ভিন্ন একটি অনুভূতি নামক দেয়ালে হেয়াল দিয়ে দূর থেকে তাকান ধর্মের অস্তিত্ত্বর দিকে। যাঁর স্রোতে আপন মন হেড়ে যাবে ঐশ্বরিক দিব্য বস্তুর নিয়তিতে। আমি জানি এমন কিছু ব্যক্তি আছেন, যাঁরা ধর্মপ্রাণ নাম দিয়ে গায়ে মাখেন পবিত্র ধর্মকে। এঁদের মনে কিছুতেই শান্তি লাভ হয় না। কারণ এসব মানুষের অনুভূতির ক্রশটা ছিঁড়তে পারা কঠিন থাকে। যারপরণে সেই ব্যক্তির ভূল নিজের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। আর কোন সৎ আধ্যাত্মিক ব্যক্তিও যদি বলে দেয় উল্টো রিয়েকশান করে তাঁর ভাবের উপর।  অথচ না পায় কোনো আঁলো। আমরা এমন কিছু ভাবি যে, ধর্ম ইতিহাসের কাহিনীর মতো। যেগুলো বই -পত্রিকায়, এবং সংবাদ গণমাধ্যমে পড়ে, ইতিহাসের মতো ভাবি ও জেনে রাখি।  আসলে তেমন কিছু না। যাঁরা ইতিহাসের সারাংশ হিসেবে ধর্মবস্তুটি অনুমান করতে চায়, তাঁদের ঐ গবেষণা হচ্ছে, বাহ্যিক রঙ্গে দেখা কাতাল আকৃতির মতো। যা ভূল অনুমানে মনোনয়ন করা যেতে পারে। ধরূন! কোন এক অজ্ঞাত ব্যক্তি!  কাতাল সম্পর্কে কিছুই জানে না। সে বাহিরের কাঁটা কাঁটা রং দেখে কাতালের সুমিষ্ট গুণ কীভাবে জানবে। যদি সেই ব্যক্তি ভিতরের মিষ্টকষা গুলো না ছিঁড়ে দেখে! তাহলে ব্যক্তির দোষ কী কাতাল নিবে? প্রসঙ্গগতে, ধর্মের বাহ্যিক প্রতিকৃতি দেখে মিথ্যাবান নৃপতিও প্রকৃত স্বাদ জানবে কী করে। সে যদি নিজের সত্যময় আবেগকে নিজের মধ্যে খুঁজে না পায়। তখন ভূল যে নিজের মধ্যে ব্যহমান তাও জানে না। এমন কিছু কল্পনাও করতে পারি না আমরা, ধর্ম যেন শৈশবের বিস্কুট খেলার মতো। যেখানে- সেখানে ঝুলে থাকার অমূল্য বন্তু। আমরা কোখনো ভাবি না, প্রতিনিয়ত নিজের আবেগের স্রোতে ভূল, খারাপ, পাপ, অন্যায় চিন্তাগুলো আবহ পরিক্রমায় বইছে। সেগুলোর মধ্যেই আমরা আমাদের অধর্মের জন্য দায়ী। এই যে, এতগুলো খারাপ এবং ভূল চিন্তার মাঝে কিভাবে ধর্মকে চিনব। কিরূপে ধর্মকে জানব! প্রতিনিয়ত একটার পর একটা খারাপ চিন্তা আমাদের মনকে ব্যস্ত রাখছে। ধর্মের উপলব্ধিতে কীভাবে আমি আপন ঠিকানা খুঁজে নেব? বুদ্ধ তাঁর মনস্তাত্ত্বিক দর্শন অভিধর্ম পিটকে বলেছেন→ মানুষের মন থেকে ভূল চিন্তাকে তাড়ানো খুব কঠিন। যা জেদী শিকারী কুকুরের মতো। অন্যদিকে সৎ এবং ভাল চিন্তাকে তাড়ানো সহজই। যা তুলনা মূলক বনের হরিণের মতো। অথবা নিজের থেকে কুদৃষ্টিকে মুছে ফেলা বিরাট কঠিন। যা পাথরের দেয়ালে খোদাই করা অক্ষরের ন্যায়। অন্যথা মন থেকে সৎভাব চিন্তাকে হারিয়ে ফেলা খুবি সহজতর। যা জলে লেখনির অক্ষর সদৃশঃ। এভাবে কঠিন চিন্তার প্রবাহের মধ্যেই আমাদের জীবন অতীত হচ্ছে অনাবশেষ। ধর্ম বস্তুটির পূর্ণাংশও খুঁজে পাইনি একটি জীবন নয়, হাজার জীবনের বিনিময়েও। আমাদের ভাবতে হবে " ধর্ম আত্ম উপলব্ধির মনন আহার সদৃশ। তাই মন দিয়ে ধর্মের অস্তিত্ত্বকে খুঁজে নেওয়া সহজ। বাইরের গতানুক্রমিক পারিপার্শ্বিক সংগঠিত দৃশ্য থেকে নয়। সেগুলো শুধুমাত্র প্রত্যেক মানুষের প্রত্যেক চিন্তার সুগঠিত আবহ চক্র মাত্র। কাজেই সেই অংশকে নিয়ে আপনার ভাববাদ সৃষ্টির কোনো চুড়ান্ত নেই। ধর্ম মানে আত্মদৃষ্টিই হচ্ছে আত্মসুখের মূল।
সম্মান্বিত পাঠক, আসলে আমার এই প্রবন্ধটি লেখার কারণটা হচ্ছে, গত এক সময় কারোর লেখায় দেখলাম!  সে স্ট্যাটাস করেছে ধর্মকে বেশী গবেষণা করা ঠিক না। বেশি বেশি গবেষণা করলে নাকি "ইমান" চলে যাবে। এই পরিপ্রক্ষিতে।
বিষয়টি ঠিক এরূপ না! ধর্মবোধের গভীরে যাওয়ার ক্ষেত্রে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষের " বোধশক্তি" র পূজিঁ অবশ্যই থাকতে হবে। বিশেষ করে বৌদ্ধধর্মে এই সূত্রটি প্রাণিধান করা হয়েছে। আবার বোধশক্তির সাথে সাথে যথাযথ ভাবে চারটি গুণও নিজের মধ্যে অনুশীলন করতে হবে। যেমন-
১.আত্মসমর্পন
২. আত্মোপলব্ধি
৩. আত্মোৎসুক
৪. আত্মশুদ্ধি ভাব
প্রথমত: আত্মসমর্পন মানে বাহ্যিক সংগঠিত ধর্ম এবং আধ্যাত্মিক সংগঠিত ধর্ম উভয়ই ধর্মে কুশল বিষয়ে নিজেকে সমর্পন করা। সেই কুশল বিষয়ে বিরুদ্ধ না করা।
২. দ্বিতীয়ত: আত্মোপলব্ধি অর্থ হল সেই সু-সংগঠিত ধর্মের বিষয়ে গভীর ভাবে নিজেকে নিবিষ্ট রাখা। বা পুনঃ পুনঃ বিচার করা। যাচাই বাচাই করে আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে গভীর বোধ সৃষ্টি করা।
৩.তৃতীয়ত: আত্মোৎসুক অর্থ হলো কুশল ধর্মসমূহে ইচ্ছাধীন বা সমুৎচ্ছুক থাকা।
৪. চতুর্থত: আত্মশুদ্ধি মানে প্রত্যেক চিন্তার ক্ষেত্রে নিজেকে শুদ্ধভাব বা চিত্তশুদ্ধি রেখে চলতে হবে।
এই চার পদ্ধতি অনুসরণ করলে আরও সহজ হবে।
আমার মনে হয় ধর্ম যতই গবেষণা করা হয় ততই ধর্মের গৌঁড়ামী দূর হয়। বরং ব্যক্তিত্বও খোঁজ পায়। একজন মানুষের কাছ থেকে মুক্তি পায় মানসিক সংকীর্ণতা। তরলীয় এসিড পদার্থ দিয়ে সোনার ময়লাকে পরিস্কার করে সোনাকে নতুনত্ব খাঁটি সোনা করা হয়। জগতে শোধন সুধা দিয়ে মানব জাতির মনকে পবিত্র করা যায়। সেথা হলো একমাত্র ধর্ম। যেই চিরস্থির পরম্পরা মানব জাতিকে উজ্জ্বলতায় আঁলো প্রদান করে। জগতে তথাগত বুদ্ধই এই ধর্মের প্রবর্তক।
বৌদ্ধধর্মে বোধশক্তি বা উপলব্ধি হলো ধর্মদর্শনের গভীরে যাওয়ার পুজিঁ। বোধশক্তি ছাড়াই কোন দর্শনের সাধনাপূর্ণ লাভ করা যায় না। কোন ক্রেতা যেমন পয়সা বিনিময় না থাকলে কোন দ্রব্যই লাভ করতে পারেন না। ঠিক তেমনি বৌদ্ধধর্মে উন্নতি হতে হলে শ্রদ্ধা ও বোধশক্তি বা উপলব্ধি থাকতে হবে। শ্রদ্ধা ও বোধশক্তি না থাকলে বৌদ্ধদর্শনের মাত্রা অর্জন করা যায় না। ব্যক্তিস্বাধীন প্রয়োজনে বোধশক্তি বা উপলব্ধি হলো একান্তই ব্যক্তিগত সাধনাপুষ্ট ব্যপার। সাধনা অধম হলে আত্মশক্তির পূর্ণ বিকাশ দূরে থাক স্বতই আত্ম-উন্মোচনের প্রকৃত জ্ঞানও অর্জন সম্ভব হবে না। বুদ্ধবাণীর ভিত্তিসরুপ চতুরার্য সত্যতো প্রত্যেক বাস্তবসত্ত্বাকে উন্মোচন করে, নির্দেশ করে প্রকৃত মুক্তির দর্শন। ধর্ম্ম আপনার অস্তিত্ত্ব থেকে দুরে নয়। সেই প্রকৃত বস্তুটি অজ্ঞতা আবরণে নির্দিষ্ট আছে। আপনার ভিতরে দেখুন, আত্মানুসন্ধান করুন। ধম্ম স্বতই ব্যক্তিসত্ত্বাকে মুক্তি দিতে লেগেই আছে। কারোর প্রতি মমতাহীন ভাষা, কথা, কায়িক আচরণের বিধান এই ধর্মে নেই। শুধুমাত্র মানুষের সমতা রক্ষার প্রয়োজনে গৌতম বুদ্ধ এর বিনিময়ে ভালোবাসা, সহিষ্ণুতা, দয়া, করুণা ও আদরের বিবেচনাটুকু বিধানভূক্ত করেছেন। এ সমষ্ট শিক্ষা নৈতিক পালনের ক্ষেত্রে মানুষ নিজেরাই দায়িত্ববান হতে হবে। মানব জাতির জীবন অবাক চেতনার ধারাশূলে জীবিকার প্রণালীবদ্ধ। মোহশূলে এর সুমহান বিকল্প পথটি খুঁজে পান না। আসলে ব্যক্তিগত আত্ম- উন্মোচন থাকলে সর্বদিক বুদ্ধের সত্যময় সু-পরিকল্পিত বিধান পাওয়া সম্ভব। প্রকৃত মানব চেতনাকে উন্মোচিত করতে হলে বৌদ্ধদর্শনের সাধনা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় আরোপ মেনে নিতে হবে। তবে বৌদ্ধদর্শনের সাধনা লাভ করতে হলে আত্মবিবেচিত বোধ থাকতে হবে।বৌদ্ধধর্ম সর্বদা আত্মনিবেদিত ধর্ম। এই ধর্ম সব সময় আত্মবিশ্লষণ করে। অন্য কাউকে বিশ্লেষণ করা এই ধর্মের অভ্যাস আনুগত্যতা নেই। আত্মনিবৃতিতার্থে আত্মবিশ্লেষণ। বৌদ্ধধর্ম কারোর প্রতিপক্ষরুপ আচরণের শিক্ষা বা উপদেশ দেয় না। ইহার শিক্ষা শুধুমাত্র পাপ, অপরাধ, এবং অসত্য প্রতিপক্ষ হয়ে কথা বলে, শিক্ষা বা উপদেশ নির্দেশনা প্রয়াস করে। 
ইহার প্রথম সূত্র: শুধুমাত্র বিশ্বব্রম্মাণ্ডের মানুষ ও প্রাণী সবাই একই প্রেমের ফ্রেমে বাঁধা প্রাণজাতি। অর্থাৎ প্রেম নামক জালেই আবদ্ধ। আত্মনিবৃতির চারিতার্থ পূর্ণ না হলে এই ধর্মের আসনে অধিগত হওয়ার কোন সুরাহা নেই। তাই বুদ্ধ প্রত্যেক চিন্তাকে দৃঢ়ভাবে পরিশুদ্ধ পদ্ধতিতে ব্যবহার করতে বলেছেন। কোন চিন্তার প্রথাকে হুজুগে গ্রহণ বা উপধারণ করতে বলেননি। তিনি এও বলেছেন যে, সততই প্রত্যেক মানুষের চিন্তার উদ্রেক পরাক্রম ও অজেয় পদ্ধতিতে সৃষ্টি হবেই, তাই বলে প্রমত্ততারুপ প্রবাহ মাত্রিকতা অবলম্বন করে সেই চিন্তার স্রোতে নিজেকে হেলিয়ে দেওয়া যুক্তিযুক্ত মনে করা হয় না। বুদ্ধ শুধুমাত্র মনে করেছেন অপ্রমত্ত বা সংযম ভাব পদ্ধতিতে চিন্তাকে ব্যবহার করার প্রয়োজনীয়তাকে। নানা কারণ অস্থিরযুক্ত মনন থেকে মানুষ প্রত্যকটির সমস্যা মুখোমুখি হতে যান। তবু সংযম বা দমন ধারাবাহিত পদ্ধতিকে ভূলে যায় প্রত্যেক মতোয়ারা মানুষ। তাই মানুষ মাত্রিক নিজের সমস্যাই নিজেরাই অধিকারী। অথচ বেহাল ভাবুক হয়ে কেউ কাউকে দোষারোপ করার প্রয়োজনে পক্ষ-প্রতিপক্ষ চেতনায় উভয়ই ধ্বংস হতে শুরু করে। এভাবে মানুষের  সুশীল সমাজকে ফিরে পেতে পারে না। বুদ্ধ সেটাকে "হিংসা" নামক ধ্বংসাবশেষ অগ্নি নাম দিয়েছেন। ইহাতে দগ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা অবশ্যই আছে। তাঁর কারণে মানুষ ধ্বংস হওয়ারও হেতু নির্দিষ্ট আছে। বুদ্ধ নিষেধও করেছেন মানবজাতিকে→ তোমরা হিংসাগ্নিতে দগ্ধ হইওনা। এর পরিবর্তে তিনি দিয়েছেন- মৈত্রীর অনুশীলনের পদ্ধতি। ইহাই মানব জাতির শান্ত থাকার প্রয়াস। এই সূত্রধরে মানব জাতিরাই একে অপরকে স্নেহদর্শনে আবদ্ধ থাকবে।
প্রাবন্ধিক: শ্রীমৎ বীতশোক ভিক্ষু
সুবলং শাখা বন বিহার,  জুরাছড়ি।

Tuesday, November 14, 2017

অচলা শ্রদ্ধায় প্রত্যক্ষ ফল


বাংলাদেশ স্বাধীন হবার কয়েকমাস পরের কথা। পড়ন্ত বিকেলে। বনভান্তেকে পানীয় দান করে বাড়ীর পথ ধরলেন প্রতুল বিকাশ চাকমা ও গঙ্গাধন চাকমা। পথের মধ্যে দেখা হল থানা সমবায় কর্মকর্তা জনাব শামসুল হক এবং মৎস্য কর্মকর্তা বাবু সুকুমার বড়ুয়ার সাথে। অমনি শামসুল হল বলে উঠলেন—‘আপনাদের সাথে দেখা হয়ে বেশ ভালো হল। আমি যাচ্ছি বনভান্তের কাছে-বিহারে। তাঁর কাছ থেকে দোয়া ও পরমার্শ নেবে। আমাকে একটু সাহায্য করতে হবে আপনাদেরকে। চলুন, আবার বিহারে। কারণ উনার সাথে তো আপনাদের-ই ভালো পরিচয় রয়েছে। পরিচিত মানুষ হলে কথা বলতে সুবিধা হয়। তদুপরি আমি তো আপনাদের ধর্মীয় রীতি-নীতি জানি না। আমাকে সেসব দেখিয়ে দিতে হবে, উনার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। আপনাদের সাহায্য পেলে আমি সবকথা খুলে বলতে পারবো। আর তিনিও ভালোভাবে পরামর্শ দিতে পারবেন। সুতুরাং আবার বিহারে চলুন। অন্তত আমাকে সাহায্য করার জন্য হলেও।’ শামসুল হক সাহেবের অনুরোধ গৃহীত হল। এবার চারজন মিলে বনভান্তের কাছে আসলেন। প্রতুল বিকাশদেরকে দেখে ভান্তে বলে উঠলেন—তোমরা আবার ফিরে আসলে যে। প্রতুল বিকাশ চাকমা শামসুল হককে দেখায়ে দিয়ে বললেন—ভান্তে, উনি আমাদেরকে নিয়ে আসলেন। আপনার কাছে বিশেষ একটা দরকার আছে উনার। সেই দরকারে উনি এসেছেন। আপনাকে একটা সমধান দিতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে বনভান্তে শামসুল হকের দিকে তাকিয়ে বললেন—কী দরকারে এসেছেন, বলতে পারেন নিদ্বির্ধায়। ভান্তের নিকট হতে এমন আন্তরিকতার ছোঁয়া সাড়া পেয়ে শামসুল হক অভিভূত হলেন। বিনীত ও ভক্তিপূর্ণ চিত্তে সবিস্তারে বলতে লাগলেন তার স্ত্রীর দুরারোগ্য ব্যাধির কথা। বেশ বিধ্বস্ত গলায় বললেন—অনেক চিকিৎসা করেও কিছুতেই রোগ আরোগ্যের দিকে যাচ্ছে না। তাই আপনার নিকট দোয়া নিতে এসেছি। আপনি না বলতে পারবেন না। আপনার প্রতি আমার দৃঢ় বিশ্বাস, অচলা শ্রদ্ধা রয়েছে। আপনি যদি আমার স্ত্রীকে দোয়া করেন, তাহলে ওর রোগ ছেড়ে যাবে। শামসুল হকের কথা শুনে মুচকি হাসলেন ভান্তে। তারপর বললেন—আমি তো কোন ডাক্তার, বৈদ্য বা কবিরাজ নই। যদি সেরূপ একজন হতাম, তাহলে না হয় আপনার স্ত্রীর জন্য ওষুধ দিয়ে দিতাম। প্রেসক্রিপশান লেখা দিয়ে আপনার হাতে ধরিয়ে দিতাম। এখন আমি তো এদু’টো মধ্যে কোনটা-ই করতে পারবো না। এবার ভান্তে অনেক পর্যায়ে ধর্মদেশনা প্রদান করা শুরু করলেন। 
আর্য্যশ্রাবক বনভান্তে

বললেন, পূর্বে জন্মে কেউ যদি কোন প্রাণীকে দণ্ড-অস্ত্রাদি দ্বারা নানাভাবে নির্যাতন-নিপীড়ন করে, তাহলে তাকে এ’জন্মে দুরারোগ্যে ব্যাধিতে ভূগতে হয়। রোগের জ্বালা-যন্ত্রণায় দুঃখ পেতে হয়। কর্মফল শেষ না হওয়া পর্যন্ত আরোগ্য লাভ হয় না। তবে হ্যাঁ, অনেক সময় বর্তমানে পুণ্যকর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে সেই অকুশল কর্মের বিপাক লঘু হয়ে যায়। অনেকে আবার শীলবান, মহাপুরুষের সেবা-পূজায় বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি, আপদ-বিপদ, অন্তরায়-উপদ্রব হতে পরিত্রাণ পেয়ে থাকেন। এভাবে ভান্তে অনেকক্ষণ ধর্মদেশনা প্রদান করলেন। অতঃপর তাদেরকে বিদায় করে দিলেন।
তারা ধীর পায়ে এগুতে থাকলেন থানা সদরের দিকে। শামসুল হকের মুখে কোন কথা নেই। চোখে-মুখে বেশ বিষণ্ণতার চিহ্ন। ধীর পায়ে হাঁটছেন। কিছু পথ অতিক্রম করার পর প্রতুল বিকাশ চাকমার দিকে তাকালেন। আর মনমরা ভঙ্গিমায় বললেন—মাষ্টার, বনভান্তে তো আমার স্ত্রীর রোগের ব্যাপারে কিছুই বললেন না। আমার কী আরও করার আছে, বলুন তো? শামসুল হকের একথা শুনে প্রতুল বিকাশ বললেন—তাহলে আপনি সেব্যাপারে কিছুই বুঝেন নি? শামসুল হক—কেমনে বুঝবো। কই, তিনি তো কিছুই বলেন নি। প্রতুল বিকাশ এবার গঙ্গাধন চাকমাকে জিজ্ঞাসা করলেন—আচ্ছা, আপনি এব্যাপারে কি বুঝেছেন, বলুন তো? গঙ্গাধন চাকমা মাথা নেড়ে বললেন, কী আর বুঝবো। ভান্তে সে ব্যাপারে কিছু বলেছেন বলে তো মনে হয় না। অমনি প্রতুল বিকাশ বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে বললেন—আমি কিন্তু ভান্তের ধর্মদেশনার মধ্যে এব্যাপারে পরোক্ষ অভিমত ধরতে পেরেছি। উনার ইঙ্গিতের কথা ধরতে পেরেছি। আসল কথা হল, মহাপুরুষেরা সাধারণত সরাসরি বলেন না। তাঁরা মানুষের উন্নতি-অবনতি, সুখ-দুঃখ, মঙ্গল-অমঙ্গল, আপদ-বিপদ সবকিছুই জানতে পারেন। তবে সরাসরি সেগুলো বলে দেন না, আকারে-ইঙ্গিতে বলে থাকেন মাত্র। আমাদেরকে সেই ইঙ্গিতে থেকে বুঝে নিতে হয়—কী হবে, কী করতে হবে। আপনাদের মনে আছে কিনা জানি না। শ্রদ্ধেয় ভান্তে দেশনার ফাঁকে বলেছেন, “অনেক শীলবান, মহাপুরুষের সেবা-পূজায় বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি, আপদ-বিপদ, অন্তরায়-উপদ্রব হতে পরিত্রাণ পেয়ে থাকেন।” শ্রদ্ধেয় বনভান্তে যে একজন মহাপুরুষ এটা তো সবাই মানে। আপনিও মানেন। তিনি তো নিশ্চয় বলবেন না যে আমি মহাপুরুষ; আমাকে সেবা-পূজা করলে আপনার স্ত্রী আরোগ্য হয়ে উঠবেন। আমি তো বলবো, আপনি সৎভাবে উপার্জিত বেতনের টাকায় ভান্তেকে কিছু দান করেন। সেটা খাবার জাতীয় দানীয় বস্তুও হতে পারে। তবে ভান্তের প্রতি অচলা শ্রদ্ধা বা পূর্ণ আস্থা রাখতে হবে। একথা শুনে শামসুল হক সাহেবের বোধোদয় হল। হ্যাঁ, তাই তো। ভান্তে সেরূপ বলেছেন বৈকি। মুহূর্তেই তার দেহ-মন স্বস্তিতে ছেয়ে গেলে। সকৃতজ্ঞ চিত্তে বললেন—থ্যাংকস্‌‌, মাষ্টার সাব। আমি তো এভাবে ভাবতে পারি নি। আপনি ঠিক কথা-ই বলছেন। সত্যিই, শ্রদ্ধেয় ভান্তের ইঙ্গিতপূর্ণ কথা আপনি বুঝতে পেরেছেন। আমি আপনার কথামতো কাজ করবো। কয়েকদিন পর শামসুল হক সাহেব বনভান্তের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রেখে তার মাসিক বেতনের ১৫ টাকা দিয়ে খাদ্য-দ্রব্যাদি কিনে দিলেন। আর বাবু গঙ্গাধন চাকমার মাধ্যমে বনভান্তেকে দান করলেন। দান করার একসপ্তাহ পরে শামসুল হক ডাকে একটি চিঠি পেলেন। চিঠির খবরে তিনি মহা খুশি। মহা আনন্দে চিৎকার করে উঠলেন প্রায়। তার মনে আর আনন্দ, উচ্ছ্বাস ধরে না! কারণ তার স্ত্রীর রোগ উপশম হয়েছেন। এ’খবরটি সবার মুখে মুখে হল দু’য়েক দিনের মধ্যে। অমনি বনভান্তের প্রতি লোকজনের আরো বেশি প্রগাঢ় শ্রদ্ধা, বিশ্বাস উৎপন্ন হল।

সাধু সাধু সাধু

Wednesday, November 8, 2017

বৌদ্ধধর্ম ও বর্তমান বিশ্ব

ধর্ম অর্থ হলো গুণ। নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে কোন বস্তুর ক্রিয়া-বিক্রিয়াই হল উক্ত বস্তুর ভৌত ধর্ম। মানসের ক্ষেত্রে বভ অর্থে একটি মানুষ তার স্বকীয়সত্বার স্বতন্ত্র বৈশিষ্টের দ্বারা যে আদর্শ সৃষ্টি করে তাই তার ধর্ম। এ পৃথিবীতে সৃষ্ট প্রতিটি ধর্মই হল এক একজন (মহাপুরুষের) সাধকের আদর্শ। বুদ্ধের প্রবর্তিত ধর্ম হল বৌদ্ধ ধর্ম, আর বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে পৃথিবীর বর্তমান যে রূপ তাই হল বর্তমান বিশ্ব। বর্তমান বিশ্ব বিজ্ঞানের আশীর্বাদপুষ্ট। সুতরাং বৌদ্ধ ধর্ম এবং বর্তমান বিশ্বকে তুলনা করতে হলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভাবধারার সাথে বৌদ্ধ ধর্মকে তুলনা করতে হবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে এখানে বর্তমান বিশ্বের বৌদ্ধ জনসাধারণ এবং অন্যান্যদের বর্তমান সক্রিয় মৌল ভাবধারার বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। অনেকে বৌদ্ধ ধর্মকে বিজ্ঞানসম্মত ধর্ম বলে দাবী করেন।কিন্তু এ দাবী সম্পূর্ণ অর্থে রাখা যায় না। এখন বৌদ্ধ ধর্ম বিজ্ঞানের ভাবধারায় কতটুকু পরিপুষ্ট অর্থাৎ বর্তমান বিশ্বের ভাবধারার সাথে বৌদ্ধ ধর্মের কতটুকু মিল বা গরমিল রয়েছে তা যথেষ্ট আলোচ্য বিষয়।
পৃথিবী সৃষ্টি, এর উপর অবস্থানরত মনুষ্যজাতি তথা অন্যান্য প্রানী ও বস্তুর সৃষ্টি এবং মহাবিশ্বের বিচিত্র বিষয়টি মানুষের জ্ঞানের অতীত এবং যথেষ্ট বিতর্কিত। বিজ্ঞান মনে করে এসব সৃষ্টির পেছনে কোন সৃষ্টিকর্তা নেই। বিজ্ঞান মনে করে সৃষ্টির আদি অবস্থায় পৃথিবী একটি অগ্নিগোলক ছিল এবং কোন প্রাণের অস্তিত্ব তখন ছিল না। ক্রমবিবর্তন ধারার মধ্যে দিয়ে মানুষ সৃষ্ট জীবকুলের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বে উপনীত হয়েছে। এদিকে কর্মবাদী বৌদ্ধ ধর্মও বস্তবাদকে সমর্থন করে এবং সৃষ্টিকর্তা বিশ্বাসে নাস্তিকপন্থী। তবে এসব সৃষ্টির বিষয়ে কোন বিষয়ে কোন তথ্যই বৌদ্ধ ধর্মে স্পষ্ট নয়। বৌদ্ধ ধর্ম আবার বিজ্ঞানের বিবর্তনবাদ থেকে সতন্ত্র হয়ে দাবী করে যে, জীবকুল একটি ক্রমিকচক্রে আবর্তিত। কর্মানুযায়ী তাদের স্থান নিদিষ্ট হয়ে মানব কিংবা অন্যান্য প্রাণী এবং অন্যান্য অদৃশ্য সত্বায় আবর্তিত হয়। বৌদ্ধ ধর্মে এ ক্রমিকচক্রকে একত্রিশটি লোকভূমি হিসেবে বিভক্ত করা হয়েছে।
বর্তমানে প্রতিক্ষেত্রে স্বীকার করা হয় যে, পৃথিবী একটি রণক্ষেত্র। প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে এখানে বেঁচে থাকতে হয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যৌথ সক্রিয়তায় বর্তমানে মানুষের বিভিন্ন সহজ ও জটিল কর্মধারার উদ্ভব হচ্ছে। এদিকে বৌদ্ধ ধর্মেও কর্মকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, অনিন্দনীয় কর্মই হল ধর্ম। মহাকারুনিকের অভিনব আবিষ্কার ও দুঃখমুক্তির উপায় আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গে সৎভাবে জীবিকার্জনের কথা বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে বলা হয়েছে যে, বৌদ্ধ ধর্ম অর্থনীতিকেও সমর্থন করে। এছাড়া মঙ্গল সূত্রের ৪নং ও ৫নং গাথায় যথাক্রমে বলা হয়েছে যে, শাস্ত্রাদি শিক্ষা করে বহুশ্রুত হওয়া, শিল্প শিক্ষা করা, বিনয়ী ও সুশিক্ষিত হওয়া এবং সুভাষিত বাক্য বলাই উত্তম মঙ্গল এবং মাতা-পিতার সেবা করা, স্ত্রী-পুত্রগণের ভরণপোষণ করা এবং সৎভাবে জীবিকার্জনই উত্তম মঙ্গল। এক্ষেত্রে বর্তমান বিশ্বের ভাবধারার সাথে বৌদ্ধ ধর্মের যথেষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে। তবে বৌদ্ধ ধর্ম সর্বদা শিক্ষাকে সুশিক্ষা এবং কর্মকে অনিন্দনীয় কর্ম হওয়ার গুরুত্বারোপ করছে। প্রকৃতপক্ষে মানুষ নিজের প্রয়োজনের তাগিদে ধর্ম এবং বর্তমান বিজ্ঞান উভয়ই সৃষ্টি করেছে। ধর্মের একটা সম্পূর্ণ দিক এবং আদর্শ থাকে, কিন্তু বিজ্ঞানের কোন দিক নেই। ফলে ধর্মের সাথে বিজ্ঞানের কোন ক্ষেত্রে মিল থাকলেও কোন না কোন ক্ষেত্রে গরমিল থাকে। ধর্ম হল সম্পূর্ণ মানুষের মানবিক বিশ্বাসের সমষ্টি।
বৌদ্ধ ধর্ম একটি সোপানরূপী ধর্ম। এতে অতিসাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে উচ্চতর দার্শনিকদের জন্যও বিভিন্ন কর্মপন্থার উল্লেখ রয়েছে। বৌদ্ধ ধর্মের উচ্চতর পর্যায়ে এমন দর্শনতত্ত্ব রয়েছে যা স্বাভাবিক অবস্থায় মানুষের বোধগম্য নয়। সর্বোপরি অন্যান্য ধর্মের মতো বৌদ্ধ ধর্মেও অদৃশ্য আধ্যাত্বিক শক্তির কথা উল্লেখ রয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, এসব কিছু যথেষ্ট ধ্যান-ধারনার মাধ্যমেই উপলব্ধি করা সম্ভব। ফলে স্বাভাবিক মানুষের জ্ঞানের অতীত থাকে এবং অত্যন্ত রহস্যের প্রভাব বিস্তার করে। এজন্য বৌদ্ধ ধর্মকে বুঝতে হলে অনুরূপভাবে অর্থাৎ ক্রমিকভাবে এক স্তর থেকে অন্যস্তরে যেতে হবে। এছাড়া বৌদ্ধ ধর্মকে কেউ সাধারণ মানুষের কাছে বুঝাতে গেলেও একই সূত্র অনুসরণ করতে হবে। বর্তমানে অনেকে ধর্মকে জনসাধারণের কাছে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হঠাৎ করে উচ্চতর দর্শনতত্ত্বের আশ্রয় নেন। এটা সম্ভবত নিজেকে জনসমক্ষে গুরুগম্ভীর ব্যক্তিত্ব ভাবাপন্ন করে উপস্থাপন করার একটা অপপ্রয়াস, আর যা ব্যাখ্যা তাও বৌদ্ধ ধর্মের দৃষ্টিতে কতটুকু দায়মুক্ত তা বিবেচ্য বিষয়। এভাবে বৌদ্ধ ধর্মের মৌলিক ভাবমূর্তি ক্ষূন্ন হয়। এক্ষেত্রে সরল জনসাধারণ অনেকে অন্ধভাবে সমর্থন করে আর বাস্তবধর্মী বিজ্ঞানের সংস্পর্শে আহুত অনেক বৌদ্ধ জনসাধারণ বৌদ্ধ ধর্মকে অনেকক্ষেত্রে গোপনে এড়িয়ে চলে।

বুদ্ধ তার সমসাময়িক কালে নিজে এবং দ্বারা তার ধর্ম সুন্দরভাবে যুক্তির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করে দিয়েছিলেন। বুদ্ধ যে যে অবস্থায় ছিলেন সেই অবস্থায় যাতে বৌদ্ধ ধর্মের আদর্শ নিয়ে চলতে পারে তার জন্যও ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। যেমন গৃহীদের পঞ্চশীল, উপাসক-উপাসিকাদের জন্য অষ্টশীল, শ্রমণদের জন্য দশশীল, ভিক্ষুদের জন্য ২২৭ শীল ইত্যাদি। এজন্য তখন বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি অনেক মানুষ দুর্বল হয়ে পড়েছিল। বর্তমানে বৌদ্ধ ধর্মকে পুঁজি করে অনেকে উন্নতি লাভ করলেও তুলনামূলকভাবে বৌদ্ধ ধর্ম আজ ক্রম অবনতির সিঁড়িতে। মূলত এর প্রকৃত স্বরূপ বিশ্লেষন করার মতো জ্ঞানীদের যেমন ঘাটতি পড়েছে তেমনি অন্যান্য জনও এটি মূল্যায়নে আদৌ সচেতন নয়। এছাড়া বিশ্বের অনেক বৌদ্ধও বৌদ্ধ ধর্মের আদর্শ থেকে বিচ্যুতিমূলক কর্মকান্ডে জড়িত যাতে মানবিক মৌলিক ধর্মও অপদস্থের স্বীকার হয়। বলা যায় যুগের প্রভাবে ক্রমে ক্রমে মূল্যবোধের অবক্ষয়ের জন্যই বৌদ্ধ ধর্মকে মূল্যায়ন করা আজ সাধারণ মানুষের কাছে দুরূহ হয়ে পড়েছে। বুদ্ধ নিজেই চিন্তা করে শেষ পর্যন্ত বুঝতে পেরেছিলেন যে, পৃথিবীতে তাঁর ধর্মকে মূল্যায়ন করার মত মানুষ আছে এবং এজন্যই তিনি তাঁর ধর্ম প্রচার করেছেন। অতএব একটু সচেতনতার দ্বারা যদি বিশ্বের জনসাধারণ বৌদ্ধ ধর্মকে মূল্যায়নে সক্ষম হয় তাহলে বৌদ্ধ ধর্মের মত একটি কর্মবাদী ধর্মের আদর্শের মাধ্যমে একটি গতিশীল ও সমৃদ্ধশালী পৃথিবী গড়া সম্ভব।
লেখকঃ বিধায়ক চাকমা

Sunday, November 5, 2017

এ ধরণীর গর্বে ধন গৌতম বুদ্ধ

এ ধরণীর গর্বের ধন গৌতম বুদ্ধ
= ড. কাজী নূরুল ইসলাম=
ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ
গৌতম বুদ্ধ কেবলমাত্র বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক বা একজন মহান দার্শনিক নন। তিনি মানবজাতির গৌরব। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়- তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মানুষ। হিন্দু পণ্ডিতদের অনেকে এমনকি মহাত্না গান্ধী গৌতম বুদ্ধকে মনে করতেন একজন অবতার হিসাবে। দীর্ঘদিন ধরে অনেক মুসলিম গবেষক মনে করতেন যে, গৌতম বুদ্ধ একজন নবী ছিলেন। পৃথিবীতে দ্বিতীয় কোন ব্যক্তি নেই যাঁকে নিয়ে এত টানাটানি।তিনি অবতার ছিলেন কি-না বা একজন নবী ছিলেন কি-না তা জানি না, তবে এটুকু নির্দ্ধিধায় বলতে পারি, তিনি ছিলেন এ ধরণীর গর্বের ধন।
মানবতাবাদ এই মহান দার্শনিক মনব কল্যাণের জন্য ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। তিনি সুন্দরী স্ত্রী, শিশু-সন্তান, পিতা-মাতা এবং রাজ্য ত্যাগ করেছেন কোন স্বর্গ লাভের জন্য নয় বা কোন পরমেশ্বরকে পাবার উদ্দ্যেশ্য নয়। তার একমাত্র লক্ষ্য ছিল, মানুষকে কীভাবে দুঃখ-কষ্ট ও হতাশার হাত থেকে মুক্ত করা যায়। দীর্ঘ ছয় বছর ধরে যে কঠোর কৃচ্ছ সাধনার মাধ্যমে দুঃখের হাত থেকে মুক্তির পথের সন্ধান করেছেন তার তুলনা নিনি নিজেই।
তিনি ছিলেন একজন সমাজ সংস্কারক। তিনি হিন্দু ধর্মের বর্ণ প্রথার বিরুদ্ধে প্রচণ্ড সংগ্রামে লিপ্ত ছিলেন দীর্ঘ ৪৫ বছর। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রীয়, বৈশ্য ও শুদ্রের বিভাজন তিনি মানতেন না। সব বর্ণের মানুষকে তিনি সমান দৃষ্টিতে দেখতেন এবং সমভাবে শ্রদ্ধা করতেন। মানব সভ্যতার ইতিহাসে তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি সমাজে সার্বজনীনরূপে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেন। এখন থেকে অাড়াই হাজার বছর আগে এ ধরণের উদ্যোগ যে কত বড় মাপের তা কেবলমাত্র ইতিহাসবিদ এবং সমাজতত্ত্ববিদরাই অনুধাবন করতে পারবেন।
পাশ্চাত্যের অনেকে দাবী করেন যে, দর্শনের উৎপত্তি হয়েছে গ্রীসে। কিন্তু এ কথা সত্য নয়। গ্রীসের প্রথম দার্শনিক থেলিসের জন্মের বহু আগেই গৌতম বুদ্ধের দর্শন এ দেশকে আলোড়িত করেছিল। আজ পাশ্চাত্যের দেশগুলো অস্তিত্ববাদ (-------) যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদ (---------), প্রয়োগ বাদ (----) ইত্যাদি সমকালীন দার্শনিক সম্প্রদায় নিয়ে গর্ববোধ করে। কিন্তু তারা জানেনা এবং আমরাও অনেকে জানি না যে এ সমস্ত দর্শনের জন্ম বিগত একশত বছরে পাশ্চাত্যে হয়নি। এ জাতীয় দর্শনের উদ্ভব ঘটেছে আড়াই হাজার বছর আগে গৌতম বুদ্ধের হাতে।
পাশ্চাত্যে অস্তিত্ববাদের উদ্ভব হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে। এ দর্শনের মূল কথা হলো পৃথিবীর মানুষ দুঃখ কষ্ট বেদনার জ্বালায় অতিষ্ঠ।তাদের অস্তিত্ব আজ বিপন্ন। কাজেই আমাদের চিন্তা-চেতনা-জ্ঞান সাধনার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত কী করে দুঃখের হাত থেকে বাঁচতে পারি। গত শতাব্দিতে পাশ্চাত্যের অস্তিত্ববাদী দার্শনিকগণ যে বক্তব্য উপস্থাপন করে পৃথিবীময় আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন সে বক্তব্যই আরও সহজ এবং সরল করে বলে গেছেন গৌতম বুদ্ধ আড়াই হাজার বছর আগে। তাই অবশ্যই বলতে হবে, তিনি অস্তিত্ববাদী দর্শনের জনক।
যৌক্তি প্রত্যক্ষবাদ দর্শনের ইতিহাসে বিপ্লব এনেছে। এ সম্প্রদায়ের দার্শনিকগণ অধিবিদ্যার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, অধিবিদ্যাকে দর্শনের আলোচনার বাইরে ঠেলে দিয়েছেন। তাদের বক্তব্য হলো যা যাচাইযোগ্য নয় তা-ই অর্থহীন। আর এ কারণেই তারা ঈশ্বর, আত্না, মরণোত্তর জীবন ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনাকে অর্থহীন বলেছেন। কিন্তু পাশ্চাত্যে যোক্তিক প্রত্যক্ষবাদীরা যে কথা বলে সমকালীন বিশ্বে প্রশংসা কুড়াচ্ছেন সে কথাই গৌতম বুদ্ধ অনেক আগে বলে গেছেন। তিনি অধিবিদ্যা বিষয়ক প্রশ্নের উত্তর দেয়া থেকে বিরত থাকতেন। কারণ এ সমস্ত বিষয়ে পক্ষে ও বিপক্ষে অনেক কথা বলা যায়। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত উপনীত হওয়া যায় না। তাই এ বিষয় সর্ম্পকে আলোচনাকে তিনি বলেছেন অর্থহীন। আর এ করণে সার্বিক মূল্যায়নের পর এ কথা অনস্বীকার্য যে তিনিওই যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদেরও জনক।
প্রয়োগবাদী দর্শন মূলতঃ সমকালীন আমেরিকান দার্শনিকদের অবদান বলে মনে করা হয়। এ দর্শনের মূলমন্ত্র হলো যা কাজে লাগে অর্থাৎ যার উপযোগিতা আছে তাই অর্থপূর্ণ বা তাৎপর্যপূর্ণ।যার ব্যহারিক মুল্য নেই বা উপকারে আসে না তা নিয়ে ভাবা বা আলোচনা করা নিরর্থক। প্রয়োগবাদীদের শিক্ষা দর্শন বর্তমান বিশ্বের প্রায় সব দেশেই সাদরে গ্ররহীত হয়েছে। এই দর্শনের যে প্রধান কথা তা হলো প্রয়োজনীয়তা বা ব্যবহারিক মূল্য বা উপযোগিতা। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, গৌতম বুদ্ধ মানব ইতিহাসে প্রথম ব্যক্তি যিনি চিন্তা-চেতনা জ্ঞান সাধনার ক্ষেত্রে উপযোগিতাকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। আর সে কারণে সার্বিক মূল্যায়নের পর নিঃসন্দেহে এবং নির্দ্বিধায় বলা যায়, তিনিই প্রয়োগবাদী জীবন দর্শনের জনক।
জার্মান দার্শনিক শোপেনহাওয়ারের মতে বৌদ্ধধর্ম হলো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধর্ম। এখানে বলা প্রয়োজন যে, গৌতম বুদ্ধের শিক্ষা দ্বারা নীতি বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। কতিপয় বিষয়ে তাদের দর্শন অভিন্ন।
তাঁরা উভয়েই মনে করেন যে, এ জগৎ দুঃখে পরিপূর্ণ এবং আমরা সবাই দুঃখের সাগরে ভাসছি। শোপেনহাওয়ার বলেন যে, “হতে চাওয়া” “বাঁচতে চাওয়া” ইত্যাদি হচ্ছে দুঃখের মূলে। গৌতম বুদ্ধও কামনা বাসনাকেই সমস্ত দুঃখের কারণ বলে মনে করতেন। তিনি বলেন, যেহেতু আমাদের কামনা বাসনার শেষ নেই সেহেতু আমাদের দুঃখের শেষ নেই। শোপেনহাওয়ার বলেন, আমাদের সাধ অনন্ত তাই দুঃখও অনন্ত। তাঁরা উভয়েই মনে করেন যে মৃত্যু আমাদের দুঃখের হাত থেকে বাঁচাতে পারেন না, মৃত্যু দুঃখের ব্যাপারে কোন সমাধান নয়। গৌতম বুদ্ধের শিক্ষাকে শোপেনহাওয়ারের কাছে অন্য যে কোন ধর্মীয় নেতার শিক্ষার চেয়ে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ এবং মানবাজাতির কল্যাণের জন্য অধিকতর গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়েছে আর সে কারনে খ্রিস্টান ঘরে জন্মগ্রহণ করে এবং খ্রিস্ট পরিবেশে বড় হবার পরও তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে বৌদ্ধ ধর্মই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধর্ম।

বার্ট্রান্ড রাসেলের মতো দার্শনিকও ছিলেন গৌতম বুদ্ধের প্রতি একান্ত শ্রদ্ধাশীল। জীবনের শেষ পর্যায়ে এক সাক্ষাৎকারে তিনি অপকটে স্বীকার করেন যে, পৃথিবীর অন্য যে কোন ধর্মের তুলনায় তিনি বৌদ্ধ দর্শনকে অধিক পছন্দ করেন। তবে বৌদ্ধ ধর্মের শুরুতে যে শিক্ষা প্রচলিত ছিল কেবলমাত্র সেটাকেই তিনি ভালবাসতেন ও শ্রদ্ধা করতেন। তাঁর মতো এই নিবন্ধকারও মনে করেন যে, বৌদ্ধ ধর্মের প্রাথমিক স্তরেই গৌতম বুদ্ধের শিক্ষা ছিল অবিকৃত। আজ ২৫৫৭ বুদ্ধাব্দের শুরুতেই সংশ্লিষ্ট সকলের প্রার্থনা হোক, গৌতম বুদ্ধের মুল ও অবিকৃত শিক্ষার নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হোক এবং বুদ্ধবাণী সারা পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিরাট ভূমিকা পালন করুক।

লেখক পরিচিতিঃ ড. কাজী নূরুল ইসলাম, প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, বিশ্বধর্মতত্ব বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Tuesday, July 25, 2017

জীবনের প্রকৃত প্রয়োজন সম্পর্কে বুদ্ধ দর্শন

জীবনটা আসলে কি? এই প্রশ্নে ভাববাদী দার্শনিকগণ আবেগ, বিশ্বাস ও অগাধ ভক্তি নির্ভর হয়ে স্থির করে নিয়েছেন; এমনকি তাঁরা অদ্বিতীয় অনড় বিশ্বাসের জেহাদী ঘোষণা দিয়ে বসেছেন যে, এ জীবন এক অনাদি, অনন্ত মহাশক্তি, যিনি সকলের অদৃশ্য থেকে এ বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সব কিছু আপন খেয়ালে সৃষ্টি ও ধ্বংস করে চলেছেন। আর তাঁর অমোঘ নির্দেশে ও ইচ্ছায় সেই সৃষ্টিকে উত্থান-পতনের স্রোতে মহাপ্রলয় নামক অনিবার্য ধ্বংসের দিকে বহমান রেখেছেন। এ দু’নয়নে দৃশ্যমান চন্দ্র, সূর্য থেকে শুরু করে অসংখ্য অদৃশ্যমান বস্তু ও প্রাণীকূল, ফলমূল, বৃক্ষ-লতা, নদী-নালা, পাহাড়-পর্বত; সব কিছুই তাই সেই অদৃশ্য মহাশক্তির দ্বারা সৃষ্ট, নিয়ন্ত্রিত ও ধ্বংসের অধীন। এই অদৃশ্য মহাশক্তিকে কেহ নাম দিয়েছেন আল্লাহ; কেহ বলেছেন ঈশ্বর; আবার কেহ বা বলেছেন মায়া; কেহ বা প্রকৃতি, নিয়তি ইত্যাদি। বস্তুবাদী, পরীক্ষণ-নিরীক্ষণ পন্থী বৈজ্ঞানিকেরা এ প্রসঙ্গে কী বলেন? এ জীবন ও জগতকে নিয়ে প্রতিনিয়ত উচ্ছারিত যে প্রশ্ন,  তাকে তাঁরা দু’ভাগে ভাগ করতে দেখা যায়; জড় ও অজর প্রাণ। জড় বলতে বস্তু বা পদার্থ; যা অণু, পরমাণু দ্বারা গঠিত। এই অণু-পরমাণুর জটিল প্রক্রিয়া হতে উদ্ভব হয় প্রাণের। এখানে তারা অদৃশ্য তৃতীয় কোন শক্তি-মহাশক্তির অসিত্মত্ব্‌ স্বীকার করতে মোটেই রাজি নহেন। গবেষণাগারে শব ব্যবচ্ছেদের ন্যায় তন্ন তন্ন করে বস্তুকে পরীক্ষণ, নিরীক্ষণ, সংশ্লেষণ, সংযোজন, বিয়োজনের মাধ্যমে ইদানিং কালের জীব বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার ‘জীন’, ‘ক্লোন’। এ সকল পদ্ধতিতে তাঁরা জীবন্ত ভেড়া থেকে মানুষ পর্যন্ত বানানোর অঙ্গীকার এখন করে ফেলেছেন-এমনকি বাস্তবায়িতও করেছেন। একদিকে ভাববাদী ধর্ম প্রবক্তা ও দার্শনিক এবং অপরদিকে বস্তুবাদী বৈজ্ঞানিকগণ; উভয়ে বর্তমান বিশ্বে এখন দুই বিপরীত মেরুতেই অবস্থান গ্রহণ করেছেন। এ ক্ষেত্রে বলা সঙ্গত যে, চর্ম চক্ষুর প্রত্যক্ষ গোচরীভূত, হাতে-নাতে প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক সাফল্যকে, এখন উঁড়িয়ে দেয়ার মতো ক্ষমতা, বর্তমানে কট্টরপন্থী ঘোর ভাববাদীরা পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেছেন ইদানিং কালের বিশ্বে। যায় যায় রব উঠেছে তাই, ভাববাদীদের আকাশ-কুসুম তাসের ঘরে। প্রদীপ নেভার আগে দপ্‌ করে জ্বলে উঠার ন্যায় তাঁরা এজন্যেই এখন জেহাদী, ক্রুসেডী, কুরুক্ষেত্রীদের ন্যায় হুংকার দিয়ে বলতে শুরু করেছেন; বিজ্ঞান নামক শয়তানের গলাটিপে মারো, তারা সুন্দর সুষম আদরনীয় মানব সমাজ, সভ্যতার নৈতিক ভ্‌িতকে একেবারে ধ্বংস করে দিচ্ছে। অথচ হাস্যকর দৃশ্য হলো, সেই ভাববাদী ভক্তবৃন্দ বিজ্ঞানের সাধনালব্ধ যাবতীয় ফসল বিনা দ্বিধায় ভোগ করতে কিন্তু এক পাও পিছিয়ে নেই। কোন অরুচি নেই বৈজ্ঞানিক প্রদত্ত সকল সুযোগ-সুবিধে ও আমোদ-প্রমোদ তাঁরা উপভোগ করতে। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে বিজ্ঞানের বর্তমান অগ্রগতি হাজার হাজার বছরের ভাববাদী ধর্ম ও দর্শনের প্রবল প্রতাপী সিংহাসনে এখন প্রবল ভূমিকম্পের সৃষ্টি করেছে। সুধী পাঠক! যীশু খৃষ্টের জন্মের পাঁচশো বছর আগে এবং হযরত মুহম্মদের এক হাজার বছর আগে প্রচারিত বিশ্বের প্রাচীনতম ধর্মমত মহান বুদ্ধের দর্শন এ প্রসঙ্গে কি বলেন? এই ধর্ম ও দর্শন বিজ্ঞানের বর্তমান অগ্রগতিতে প্রকম্পিত কি? ‘প্রাণ’ সম্পর্কীত বিজ্ঞানের অতি সামপ্রতিক আবিষ্কারের প্রশ্নে কী জবাব দেবে বুদ্ধের ধর্ম ও দর্শন? চারি আর্য সত্য জ্ঞান এবং প্রতীত্য সমুৎপাদ জ্ঞান এ দু’টি শব্দ বুদ্ধ দর্শনের মূল এবং অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চারি আর্য সত্য জ্ঞান অর্থে দুঃখ, দুঃখের কারণ, দুঃখের নিরোধ এবং নিরোধের উপায় জ্ঞান। প্রতীত্য সমুৎপাদ অর্থে জীবন দুঃখের উৎপত্তি ও নিরোধের উপায় সম্পর্কে মনস্তাত্তিক কার্য-কারণ বা হেতু-প্রত্যয় সম্পর্কে জ্ঞান। বুদ্ধ দর্শনের এ দুই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুদ্ধের ধর্ম ও দর্শনকে একদিকে বর্তমান বিশ্বের অপরাপর ধর্ম সমূহের পর্যায়ভুক্ত যেমন করেছে, আবার বস্তু বিজ্ঞানের সাথেও নিজেকে সম্পৃক্ত করেছে গভীরভাবে। প্রাণের সৃষ্টি সম্পর্কে বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে বিশ্ব মানব সমাজের নৈতিক ধস্‌ নিয়ে অন্যান্য ধর্মের গুরুদের যেই উদ্বেগ, উৎকন্ঠা; সেই উৎকন্ঠা বৌদ্ধ ধর্ম গুরুদের থাকার কথা নহে। কেন থাকবে না, তা বুদ্ধের ধর্ম-দর্শনের মূলতত্ত্ব প্রতীত্য সমুৎপাদ জ্ঞান বা কার্যকারণ তত্ত্বকে নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করলেই বুঝা যাবে। কী বলেন তথাগত বুদ্ধ তাঁর চারি আর্য সত্য ও ‘প্রতীত্য সমুৎপাদ’ নামক তত্ত্ব দর্শনে? প্রিয় পাঠক চলুন, আমরা পর্যালোচনা করে দেখি বুদ্ধের এই চারি আর্য সত্য ও প্রতীত্য সমুৎপাদ দর্শনকে। স্থুল আবেগ বহুল এবং ভোগ নির্ভর, অসম্যক, অযথার্থদর্শী সাধারণ জীবন এবং দৈহিক নিপীড়নে সুফল হীন কৃচ্ছ সাধন-এ দুই অন্ত ত্যাগ করে দেহ-মনের সুস্থ ভারসাম্য তথা স্বাভাবিকতা নিয়ে, উদ্যম পরাক্রমের মাধ্যমে মহৎ লক্ষ্য অর্জনে যেই চেষ্টা সাধনা তাকে বলা হয় ‘মজ্ঝিম পতিপদা’ তথা মধ্যম পন্থী জীবন চর্যা। বুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় বলা হয়েছে, এভাবেই সম্ভব হয় প্রজ্ঞা নামক গভীর অন্তর্দৃষ্টি অর্জন। এরূপ গভীর অন্তর্দৃষ্টিতেই ধরা পড়ে এ জীবন ও জগত রহস্য। জীবন-দুঃখের চির অবসানে চারি আর্য সত্য দর্শনের ইহাই মূল কথা। বিনা কারণে কোন কার্যই এ পৃথিবীতে সংগঠিত হয় না; বুদ্ধের প্রতীত্য সমুৎপাদ তত্ত্ব দর্শনের মূল কথাও এটি। এ দুই দর্শনের সমন্বয় সাধন দ্বারা সর্ব দুঃখহীন যেই অপার মানসিক সুখ-শান্তি লাভ হয়, তার নাম দেয়া হয়েছে নির্বাণ। অর্থাৎ জীবন-মনের যেই স্তরে সকল প্রকার সংকীর্ণতার বান বা বন্ধনের অসিত্মত্ব আর খুঁজে পাওয়া যায় না, তাহাই নির্বাণ। নিজের ও পরের জীবনেই শুধু নহে; এ বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের জড়-অজড় সব কিছুতেই আমাদের জ্ঞাতে ও অজ্ঞাতে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত; এই ত্রিকালিক সম্পর্কীত হয়ে অবিরাম ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার যেই অনন্ত-বিশাল প্রবাহ বিদ্যমান; তার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে বুদ্ধের প্রতীত্য সমুৎপাদ তত্ত্বের সাথে আধুনিক জড় বিজ্ঞানের কোন বিরোধ নেই। পার্থক্য শুধু বিষয়ের প্রাধান্যতায়। বুদ্ধের প্রাধান্যতা মনের ব্যাপক বিশ্লেষণে; অপরদিকে আধুনিক বিজ্ঞানের প্রাধান্যতা বস্তুর ব্যাপক বিশ্লেষণে। মূলতঃ মনের যেই কৌতুহলী শক্তির প্রয়োগ জড় বিজ্ঞানের মূল ভিত্তি; সেই মনের অপার শক্তির আবিষ্কারক হলেন বুদ্ধ। তাই দেহ মন ও জাগতিক যাবতীয় কর্মকাণ্ডে সৃষ্টা নামক অদৃশ্য কাল্পনিক অসিত্মত্বের অপ্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বস্তু বিজ্ঞানী ও বুদ্ধ উভয়েই সম্পূর্ণ একমত। কারণ বিনা কারণে কোন কিছুর উদ্ভব অসম্ভব। এই অনিবার্য সত্যটি স্বীকার করে নিয়ে বুদ্ধের দর্শন এবং বিজ্ঞানের সিদ্ধান্ত হলো, একক কোন শক্তির দৃশ্য বা অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের সব কিছুকে আনা অসম্ভব। প্রত্যেকটি ঘটনা স্ব স্ব স্বভাব ও পরিস্থিতি সম্ভূত। তারা কার্যকারণ নিয়ম শৃঙ্খলার অধীন, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া মাত্র। জড়-বিজ্ঞান এখন জিনতত্ত্বের মাধ্যমে প্রাণ-বিজ্ঞানে তার জয়-যাত্রাকে অপ্রতিরোধী করে তুলেছে। এই প্রযুক্তি এখন জীবন্ত ভেড়া, এমনকি উর্বর মননশীলতা সম্পন্ন মানব পর্যন্ত বিজ্ঞানের গবেষণাগারে তৈরী করার যোগ্যতায় আশাবাদী হয়ে উঠেছে। আধুনিক প্রাণ বিজ্ঞানের এই সাফল্য, আড়াই হাজার বছর আগের শ্রেষ্ঠ মনোবিজ্ঞানী বুদ্ধের অনাত্মবাদ ও ক্ষণিকবাদকে এক অনন্য স্বীকৃতির আসনেই এখন প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিজ্ঞানের জয় যাত্রায় মহান বুদ্ধকে অগ্রজ বড়ো ভয়ের মর্যাদা দান করলো প্রশ্নাতীতভাবে। অপরদিকে বুদ্ধের দর্শন স্রষ্টাবাদীদেরকেও সঠিক পথ নির্দেশনা দিয়ে থাকেন এই বলে যে কেন আমরা অহেতুক অদৃশ্য মহাশক্তির কল্পনায় আপন বিবেক বুদ্ধির বিসর্জন দিয়ে অন্ধ আবেগের ফানুসে ভাসমান থাকবো? মানুষকে সংযত সুশৃঙ্খল জীবন গঠনের লক্ষ্যে স্বর্গের আকর্ষণ, নরকের ভীতি, সাধারণ মানুষের বোধগম্যতায় আনতে, স্রষ্টা নামক কাল্পনিকতার আশ্রয় না নিয়েও তো পারা যায়। আমাদের এই দেহ মনের প্রতিটি ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার কার্যকারণ ভিত্তিক অনুসন্ধানেও তো সেই স্বর্গ-নরকের অসিত্মত্ব প্রমাণ করা যায়। ভালো কাজের ভালো ফল, মন্দ কাজের মন্দ ফল। ভালো কাজের জন্যে পুরস্কার এবং মন্দ কাজের জন্যে যেই শাসিত্ম, তা দেয়ার জন্যে আমার কর্মই তো একমাত্র নির্ধারক হয়ে পুরস্কার দাতা ও শাসিত্ম দাতা হয়ে থাকে। স্বর্গ-নরক তো মোটেই কাল্পনিক নহে। ইহারা তো একান্তই কার্য-কারণ তত্ত্ব ভিত্তিক কর্ম ও কর্মফলের এক একটি পরিস্থিতি বা অবস্থা মাত্র। ভালো কাজের পুরস্কার, আনন্দ ও তৃপ্তি। আর মন্দ কাজের স্বাভাবিক ফল হবে শাসিত্ম, দুঃখ, তাপ, হাহাকার। স্বর্গ-নরক তো এই ভালো-মন্দের অনিবার্য পরিণতির প্রতীকী শব্দ মাত্র। এমন বাস্তব সত্য নিয়ে এত মুখরোচক গল্প কেন? প্রাণী মাত্রেই সুখ, আরাম, শান্তি, নিরাপত্তা এসবের একান্ত প্রত্যাশী। এটাতো জড়-অজড় নির্বিশেষে প্রাণের স্বভাব ধর্ম। প্রাণের স্বাভাবিক গঠন বৈশিষ্ট্য থেকেই তার এ স্বভাব প্রবৃত্তির জন্ম। জড় প্রাণ সেই উদ্ভিদ লতাপাতা বলুন বা সচল প্রাণ মানুষ পশু পক্ষী কীটপতঙ্গই বলুন; সবাক-নির্বাক সবার মাঝেই তো একই প্রবণতা বিদ্যমান। সুখের প্রত্যাশা আর দুঃখের বিরোধীতা তো সবাই করে। দুঃখের মুক্তি থেকেই তো অনিবার্যভাবে সুখের জন্ম। অতএব, সুখের প্রত্যাশায় এত অবাস্তব গল্প কাহিনী কেন? তাই বুদ্ধ তথাগত এই দুঃখ-মুক্তির জন্যে এ কারণেই উপায় নির্দেশ করলেন, ‘চারি-আর্য-সত্য’ তত্ত্ব-দর্শনের মাধ্যমে। পাঠক, একটু ভাবলেই বুঝতে পারবেন বুদ্ধ প্রদর্শিত এই চারি আর্যসত্য দর্শন কী অসম্ভব রকমে অন্ধ আবেগ এবং সর্বপ্রকার কাল্পনিকতা মুক্ত। ডাক্তার যেমন রোগীর রোগযন্ত্রণা লাঘবের উপায় নির্ধারণে সর্ব প্রথম সন্ধান করেন রোগের বর্তমান লক্ষণ (রোগীর যন্ত্রণা, অসুবিধা, অস্বসিত্ম) কি কি; দ্বিতীয় পর্যায়ে সন্ধান করেন এই রোগের উৎপত্তির সম্ভাব্য কারণ কি কি হতে পারে ; তৃতীয় পর্যায়ে ঔষধ প্রয়োগের মাধ্যমে লক্ষ্য করেন রোগের হ্রাস-বৃদ্ধির গতি-প্রকৃতিকে এবং অন্তিম পর্যায়েই সঠিক ঔষধ প্রয়োগ করেন রোগের সম্পূর্ণ নির্মূল, ধ্বংস সাধনে। চিকিৎসা পদ্ধতির এই অবিকল পদ্ধতিই মহাজ্ঞানী তথাগত বুদ্ধ কর্তৃক অনুসৃত হয়েছে তাঁর চারি আর্যসত্য দর্শনতত্ত্বে। জীবনের যাবতীয় দুঃখের চির অবসানের যথার্থ দর্শন ‘চারিআর্যসত্য জ্ঞান’ ইহা কেবলমাত্র দর্শন নহে, ইহা একান্ত বাস্তবতা ভিত্তিক অনুশীলনধর্মী এক অভাবনীয়, অদ্বিতীয় উপায়। আর এ কারণেই বুদ্ধ তথাগতের কন্ঠে উদগীত হয়েছে-“একায়নো অয়ং ভিক্‌খবে মগ্‌গো সত্ত্বানং বিসুদ্ধিয়া, সোকো পরিদেবানং সমতিক্কমায়, দুঃখ-দোমনস্‌সানং অত্থঙ্গমায়, ঞায়স্‌স অধিগমায়, নিব্বানস্‌স সচ্চি কিরিয়ায়-যদিদং চত্তারো সতিপট্‌ঠান।”
 একমাত্র আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের যথার্থ অনুশীলনধর্মী জীবন গঠনের উপায় এই চারি প্রধান পদ্ধতিতে স্মৃতির অনুশীলন দ্বারাই প্রাণীগণের চিত্ত ও জীবন দৃষ্টি বিশুদ্ধি, শোক পরিতাপের সম্যক অতিক্রম, দুঃখ-দুর্মনাভাবের চির অবসান (অস্তগমন), জ্ঞান অধিগম এবং নির্বাণ সাক্ষাতকরণ সম্ভব হয়।
মহাজ্ঞানী বুদ্ধ প্রবর্ত্তিত চারি আর্য সত্য দর্শনের মূল কথা হলো জীবনে যত প্রকার সমস্যা আছে। সকল সমস্যাকে গভীর মনোনিবেশ সহকারে দুঃখ রূপেই জানা। সে সকল দুঃখের উৎপত্তির কারণ তখন স্বভাবতই তোমার জ্ঞান দৃষ্টিতে ধরা পড়বে। দ্বিতীয় পর্যায়ে তখন তোমার কর্তব্য হয়ে পড়বে দুঃখ উৎপত্তি বা সমস্যার এই কারণকে সজ্ঞানে অতি সাবধানে পরিত্যাগের জন্যে বুদ্ধ প্রদর্শিত অষ্টাঙ্গিক মার্গজীবী হয়ে সাধনায় ঐকান্তিকভাবে নিজেকে সমর্পিত করা। এই চেষ্টা সাধনার সময়ে তৃতীয় পর্যায়ে নিবিষ্ট চিত্তে লক্ষ্য রাখতে হবে উৎপন্ন প্রতিটি সমস্যা কিভাবে কোন পথে, কি উপায়ে একের পর এক বিদায় নিচ্ছে। তাই বৌদ্ধ দর্শনের পরিভাষায় বলা হয়েছে- দুঃখ সত্যকে জ্ঞাত হও, সমুদয় সত্যকে ত্যাগ করো, নিরোধ সত্যকে প্রত্যক্ষ করো এবং মার্গ সত্যকে গঠন করো।
ইহা একান্তই সত্য যে, দুঃখটা হলো প্রাণের স্বাভাবিক চাহিদা সেই ‘সুখ’ লাভের পথে একমাত্র প্রতিবন্ধক। তাই দুঃখ নামক এই প্রতিবন্ধকতাকে দূর করতে হলে মুক্তিকামীর প্রথম কর্তব্য হবে, এ সকল দুঃখের মূল কারণ যথাযথভাবে জানা। এই জানার জন্যে আমরা পূর্বঅভিজ্ঞ জনের অভিজ্ঞতার আশ্রয় নেয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ। অনন্ত জ্ঞানী বুদ্ধই হচ্ছেন আমাদের এই প্রয়াসের পরম নির্ভর যোগ্য আশ্রয়। বুদ্ধের সুগভীর অন্তর্দৃষ্টিতে ধরা পড়েছে যে, লোভ, দ্বেষ এবং মোহ নামক তিনটি মনোবৃত্তিই জীবনের যাবতীয় দুঃখ-ভোগান্তির মূল কারণ। এই লোভ, দ্বেষ, মোহ নামক চিত্তবৃত্তি তথা মানসিকতা গঠনের মূল উপাদান হচ্ছে অভিধর্মে উল্লেখিত বায়ান্ন প্রকার চৈতসিক। এগুলো মহাসতিপট্‌ঠান সূত্রে উল্লেখিত নিয়মে প্রথমে বিশেষভাবে অনুধাবনের চেষ্টা করতে হবে। অর্থাৎ স্মৃতি সাধনায় রত হতে হবে অবিরাম অবিচ্ছিন্ন ভাবে। এতে করে চলমান জীবনের যাবতীয় সুখানুভূতি, দুঃখানুভূতি আর উপেক্ষানুভূতির আবির্ভাব ও তিরোভাব স্বাভাবিক ভাবেই ধরা পড়বে নিজের কাছে। এই জানা ও এই বুঝাকে বলা হয় লৌকিয় সম্যক দৃষ্টি। লৌকিয় সম্যক দৃষ্টি জাত অভিজ্ঞতার ক্রমিক উৎকর্ষতায় যখন (আপন পরের) প্রতিটি চিত্ত ক্ষণের উৎপত্তি ও নিরোধধর্মীতাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব হয়, তখনই অনাসক্ত ভাব জাগ্রত হয়। এভাবে যখন আপন মন অনাসক্ত ভাব প্রাপ্ত হয় তখনই জাগে, লোকোত্তর সম্যক দৃষ্টি। এই যথার্থ জীবন দৃষ্টিই মানব জীবনের সুদুর্লভ সম্পদ। এই সম্পদের অধিকারী যিনি হবেন, তিনিই লাভ করবেন বুদ্ধ তথাগত নির্দেশিত চির অক্ষয় পরম সুখ, পরম শান্তি নির্বাণ। কামনা করি এ মানব জীবনে সকলের কাছে প্রিয় হোক, বুদ্ধ তথাগতের চির সত্য এই দুর্লভ অবদান। 
প্রাবন্ধিক: শ্রীমৎ প্রজ্ঞাবংশ মহাথেরো।
                প্যারিস।

Monday, July 10, 2017

বুদ্ধের মতে পুনর্জন্মের সরূপ,জ্ঞানমিত্র ভিক্ষু, থাইল্যান্ড হতে



অনেকেই বলেন বুদ্ধের পুনর্জন্ম ব্যাখ্যা কিরূপ, আসলেই কি যেই মানুষ মৃত্যুবরণ করে সেই মানুষই বা তার আত্মাই পুনর্জন্ম নেয়, নাকি মৃত্যুর পর মানুষের(প্রাণীর) আর দেহধারণই হয়না, নাকি বৌদ্ধ ধর্মে(ধম্মে) পুুনর্জন্মই নেই! প্রথমেই বলে নিই বৌদ্ধ ধর্মে পুনর্জন্ম আছে এবং প্রাণীর তৃষ্ণা বা আসক্তির ক্ষয় না হওয়া অবধি পুনর্জন্ম নেয়, তবে তা আত্মার পুনর্জন্ম নয়। বুদ্ধ নিত্য আত্মার অস্তিত্ব অস্বীকার করেছেন। এরকম শ্বাশ্বত আত্মা থাকলে নির্বাণ বা তৃষ্ণাক্ষয়ের বা বন্ধন মুক্তির প্রশ্ন আসে না। নিত্য আত্মাকে অস্বীকার করে বুদ্ধ মধ্যম নিকায়ের সর্বাসব সূত্র (২), অলগর্দোপম সূত্র (২২), ক্ষুদ্রবেদল্য সূত্র (৪৪), সংযুক্ত নিকায়ের খন্ধসংযুক্তের উপায়বর্গের অনাত্মলক্ষণ সূত্র প্রভৃতি সূত্রে আলোচনা করেছেন। বৌদ্ধধর্মে ব্যবহৃত ‘পুনর্জন্ম’ শব্দটি বুদ্ধপূর্বকালীন সময় হতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে বলে অনেকেই ভ্রান্তিবশতঃ বৈদিক ধর্মীয় পুনর্জন্মকে বুদ্ধ নির্দেশিত পুনর্জন্ম বলে ব্যাখ্যা করেন, যা সর্ব্বৈব মিথ্যা এবং বুদ্ধবাণীর অপব্যাখ্যা।  মূলত পুনর্ভব শব্দটিই বৌদ্ধ জন্মান্তর বিষয়ক শব্দ। পুনর্ভব কথার অর্থ হলো পুনর্বার জন্মগ্রহণের প্রবৃত্তি। মানুষ বা জীবের মধ্যে জন্মগ্রহণের প্রবৃত্তি (তৃষ্ণা) বিদ্যমান থাকায় তাকে জন্মগ্রহণ করতে হয়। এই তৃষ্ণাই জীবকে জন্ম গ্রহণ বা দেহধারণ করায়। আসক্তিবশে জীব কর্ম করে, যার ফল হচ্ছে অনাগত ভব। ‘ভব’ হচ্ছে কর্ম যার দরূণ জন্ম হয়। যে অবস্থায় জীব কর্ম করে তা হচ্ছে ভব। ভব থেকে উদ্ভূত হয় জাতি বা জন্ম, কাজেই পুনর্জন্মের কারণ হলো ভব। এখানে উল্লিখিত জাতি শব্দের অর্থ হচ্ছে জন্ম। এটি হচ্ছে পুনঃ প্রতিসন্ধি (জন্ম), অর্থাৎ পুনর্জন্ম বা পুনর্ভব এবং জাতি। প্রত্যুৎপন্নভবের আলোচনায় যে অঙ্গকে ‘বিজ্ঞান বা চেতনা’ নাম দেয়া হয় তাকে অনাগত ভবের সমীক্ষায় ‘জাতি’ বলা হয়। সোজা কথায়, জীব যদি জন্মগ্রহণ না করতো বা শরীর ধারণ না করতো তাহলে তাকে জরামরণের অধীন হতে হতো না, জরামরণাদি বিবিধ দুঃখ হতে মুক্তির কথাও আসতো না। কাজেই জীবের জরামরণের কারণ হলো জাতি বা জন্ম। তৃষ্ণাবশতঃ জীবের বারংবার জন্ম-মৃত্যু এবং আবার জন্ম-আবার মৃত্যুকে বুদ্ধ ‘দ্বাদশ নিদান’ বলেছেন।
(দ্বাদশ নিদান জানার জন্য মধ্যম নিকায়ের ৩৮ নং সূত্র মহা তৃষ্ণাসংক্ষয় সূত্র দেখুন, অথবা পুজ্য জ্যোতিঃপাল মহাথের লিখিত ‘কর্মতত্ত্ব’ বই দেখুন।)আবার অনেকে লিখছেন, পিতার চেতনাই পুত্র রূপে জন্ম নেয় বা পুত্রের চেতনা রূপে জন্ম নেয়। মৃত ব্যক্তি কখনই পুনরায় জন্ম গ্রহণ করে না। কেবলমাত্র প্রজননের মাধ্যমে সন্তান-সন্ততিরূপে তার চেতনার (বিজ্ঞান বা মন) আবির্ভাব হয়; যেটিও বিভ্রান্তকারী ব্যাখ্যা। বস্তুতপক্ষে, পিতার চেতনা বা বিজ্ঞান পিতার নিজের, পুত্রের চেতনা বা বিজ্ঞান পুত্রের; কোনও একজনের চেতনা অপরকোনও জনের নিকট প্রবাহিত হয় না। যদি তাই হয় তবে, পিতার জীবিতাবস্থায় পিতার চেতনা কোথায় যাবে, যারা সন্তানের পিতা নন তাদের কি হবে? পিতার কর্মফল কি পুত্রই ভোগ করবে? পিতা কি তার কর্মের ফল হতে নিষ্কৃতি পাবে? সুতরাং একের চেতনা অপরের কাছে গিয়ে যে উৎপন্ন হয় বলে অনেকের ভ্রান্ত অভিমত, তা বুদ্ধবিরোধি মত। প্রতিটি জীবই নির্বাণ উপলব্ধি না করা অবধি নিজেরই কর্মের সংস্কারবশতঃ মরণের পর বিভিন্ন প্রাণীতে জন্ম নেয় বা পুনর্ভবিত হয়। “মৃত ব্যক্তি কখনই পুনরায় জন্ম গ্রহণ করে না” এই কথা যারা বলেন তারা বুদ্ধবাক্যের অপব্যাখ্যা করেন বুঝে বা না বুঝে।
মধ্যম নিকায়ের ভয়ভৈরব(৪), মহাঅশ্বপুর(৪০) প্রভৃতি বহু সূত্রে বুদ্ধ মুক্তকণ্ঠে জাতিস্মরজ্ঞানবলে কর্মবশতঃ জীবগণের চ্যুতি-উৎপত্তি, সুগতি-দুর্গতি স্বীকার করেছেন। বুদ্ধ নিজেই তাঁর অতীত জীবনে যে বিভিন্ন জন্মপরিগ্রহণ করেছিলেন তার প্রমাণ পাই খুদ্দক নিকায়ের ধর্মপদের জরাবর্গের ১৫৩-১৫৪ নং গাথায়(অনেকজাতি সংসারং); মধ্যম নিকায়ের দ্বিধাবিতর্ক সূত্রে(১৯) । দ্বিধাবিতর্ক সূত্রে বুদ্ধ তাঁর জাতিস্মর বা পুর্বনিবাস অনুস্মৃতি জ্ঞানের দ্বারা বুদ্ধত্ব লাভের রাতে কিভাবে নিজের ও অপর জীবগণের চ্যুতি-উৎপত্তি অবগত হয়েছেন সেই বিষয়ের ধারাবাহিক বিবরণ উল্লিখিত হয়েছে। সেখানে বুদ্ধ বলছেন “...সেই অবস্থায় আমি নানা প্রকারে বহু পূর্বজন্ম অনুস্মরণ করি এক জন্ম, দুই জন্ম, তিন জন্ম, চার জন্ম, পাঁচ জন্ম, দশ জন্ম, বিশ জন্ম, ত্রিশ জন্ম, চল্লিশ জন্ম, পঞ্চাশ জন্ম, শত জন্ম, সহস্র জন্ম, এমনকি শতসহস্র জন্ম, বহু সংবর্তকল্পে, বহু বিবর্তকল্পে, এমনকি বহু সংবর্ত-বিবর্তকল্পে ঐ স্থানে আমি ছিলাম, এই ছিল আমার নাম, এই আমার গোত্র, এই আমার জাতিবর্ণ, এই আমার আহার, এইরূপ আমার সুখদুঃখ অনুভব, এই আমার পরমায়ু, তথা হইতে চ্যুত হয়ে আমি এস্থানে (এই যোনিতে) আমি উৎপন্ন হই, সেখানে ছিল আমার এই নাম, এই গোত্র, এই জাতিবর্ণ, এই আহার, এরূপ সুখদুদুঃখ অনুভব, এই পরমায়ু, তথা হইতে চ্যুত হইয়া আমি অত্র (এই যোনিতে) উৎপন্ন হয়েছি। ইতি আকার ও উদ্দেশ্য, স্বরূপ ও গতিসহ নানাপ্রকারে বহু পূর্বজন্ম অনুস্মরণ করি।” তদ্রুপ অপরাপর প্রাণীগণের জন্ম-মৃত্যু ইত্যাদি। এবং বলেছেন, “বিমুক্ত চিত্তে ‘বিমুক্ত হইয়াছি’ এই জ্ঞান উদিত হল, উন্নত জ্ঞানে জানতে পারলাম চিরতরে “জন্মক্ষয়” হয়েছে। উপরোক্ত বুদ্ধবাণী অনুসারে বুুদ্ধ নিজেই যে বিভিন্ন কূলে জন্ম নিয়েছেন বুদ্ধত্ব লাভের সেই প্রমাণ সুষ্পষ্ট। 
উপরোক্ত ব্যাখ্যায় কারোও চেতনা অপরকারো চেতনারূপে প্রবাহিত হয়নি, হয়না। এবং এতেই বুঝা যায় মৃত ব্যক্তি পুনরায় জন্ম নেয়। খুুদ্দক নিকায়ের মিলিন্দ প্রশ্ন’র লক্ষণ প্রশ্নের দ্বিতীয় বর্গ, এবং বিমতি বিচ্ছেদ প্রশ্ন পরিচ্ছদ দেখুন নাম রূপ বা কে, কিভাবে জন্মগ্রহণ করে তা জানার জন্য।
মহাতৃষ্ণাসংক্ষয় সূত্রে বলা আছে তিনের সংযোগে গর্ভসঞ্চার হয়। মাতাপিতার দৈহিক মিলন হল, অথচ মাতা ঋতুমতী হইলেন না, এবং গন্ধর্বও উপস্থিত হল না, তা হলে গর্ভসঞ্চার হয় না। (মধ্যম নিকায়ের অর্থকথা প্রপঞ্চসূদনী অনুসারে ‘গন্ধর্ব’ অর্থে স্বীয় প্রাক্তন বা কর্মবশে জন্মগ্রহণকারী সত্ত্ব। জনক-জননীর দৈহিক মিলনের সুযোগ নিয়েই গন্ধর্ব মাতৃজঠরে প্রবিষ্ট হয়ে গর্ভসঞ্চার করে )(দেখুন মধ্যম নিকায়, বেণীমাধব বড়–য়ার বাংলা অনুবাদ, মহাতৃষ্ণাসংক্ষয় সূত্রের ফুটনোট)। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যানুসারে, যদি গর্ভ উৎপাদনে সমর্থ পুরুষের শুক্র গন্তব্যস্থানে উপনীত হয় তবেই গর্ভসঞ্চার হয়।) মাতাপিতার দৈহিক মিলন হইল, মাতাও ঋতুমতী হইলেন, অথচ গন্ধর্ব উপস্থিত হল না, তা হলেও গর্ভসঞ্চার হয় না। মাতাপিতার দৈহিক মিলন হইল, মাতা ঋতুমতী হইলেন, গন্ধর্বও উপস্থিত হল, সে ক্ষেত্রেই এই তিনের সংযোগে গর্ভসঞ্চার হয়। এখানে পুনর্জন্মের তিনপ্রকার হেতু বিদ্যমান এবং জেনে রাখা কর্তব্য যে এই তিনজন অবশ্যই তাদের স্ব-স্ব চেতনা নিয়েই থাকে। পিতার চেতনা পুত্রে প্রবাহিত হয় না। জৈবিক কারণবশতঃ পিতা-মাতার কিছু আকার আকৃতি সন্তান সন্ততিতে দৃশ্যমান হয়।
                সুতরাং বুদ্ধ বর্ণিত পুনর্জন্মে মৃত্যুর পর প্রাণীর পুনারির্ভাব হয়, এটা আত্মবাদ নয়। কর্ম সৃষ্টি হলেই, সংস্কার থাকলেই, উপাদান থাকলেই ভব হবে, ভব হলে অবশ্যই জন্ম হবে। যারা আর্যঅষ্টাঙ্গিক মার্গানুযায়ী চলবে তারা কর্ম-সংস্কার-উপাদান ইত্যাদি অবিদ্যা বা অজ্ঞানতার ধ্বংস করতে পারলেই জন্ম নিরুদ্ধ হবে।

Saturday, July 8, 2017

ধর্ম প্রবক্তাদের মধ্যে গৌতম বুদ্ধের ব্যক্তিত্ব -ভদন্ত প্রজ্ঞাবংশ মহাথেরো


ধর্মের উৎপত্তি ও প্রয়োজন, মানুষের জাগতিক জীবনে নিত্য দুঃখ ও অশান্তির হাত থেকে পরিত্রাণ লাভের জন্য। ধর্ম প্রবক্তাগণের আবির্ভাব এবং অবদান এ জন্যেই মানব ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ও অবিস্মরণীয়। পৃথিবীর তাবৎ সকল ধর্ম প্রবক্তাগণ ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত মানব সন্তান। কিন্তু তাঁরা নিজেদের ধর্মমতকে সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং সর্বকালের জন্যে অত্যাবশ্যকীয় করার অমোঘ কৌশল হিসেবে নিজেদেরকে অদৃশ্য, সর্বকালীক, সর্বব্যাপ্ত, মহাশক্তিধর স্রষ্টার প্রেরিত একমাত্র প্রতিনিধি বলে প্রচার করেছেন। সেই অতিমানবীয়তার সুবাদে ধ্যান সাধনার কারণ রূপ কষ্ট বা ত্যাগ-তিতিক্ষাকে বরণ করা ছাড়াই, শুধুমাত্র পার্থিব ব্যবহারিক অভিজ্ঞতায় তাঁরা যখন যা বলেছেন, তৎসমুদয় খুব সহজেই সাধারণ মানুষের গ্রহণযোগ্যতা লাভে সক্ষম হয়েছে।  তবে কোন কোন ক্ষেত্রে তাঁদের কিছু কিছু অর্জন বেশ শ্রমলব্ধ বা কষ্টলব্ধ হলেও তাকে তাঁরা  সেই মহাশক্তিধর স্রষ্টার দয়া, করুণা বা আদেশলব্ধ বক্তব্য বলে উল্লেখ করেছেন। অতএব, তাঁদের প্রচারিত ধর্মমতগুলোতে যদি কৃতিত্বের বা প্রশংসার কিছু থাকে, তা তাঁদের নহে-সেই অদৃশ্য মহাশক্তিরই প্রাপ্য। আর সেই অপৌরুষেয়তার সুবাদে, তাঁদের প্রচারিত ধর্মের আদেশ উপদেশ গুলোকে বিচার-বিশ্লেষণ করলে কিছু ব্যবহারিক নীতিবোধ ছাড়া, মৌলিক তত্ত্ব-তথ্য তেমন পাওয়া যায় না। এ কারণে, অনাগতে তাদের এ সকল মত ও পথ উপেক্ষিত হওয়ার ভয়ে তাঁদের কথিত বাক্য যৌক্তিক কি অযৌক্তিক, বাস্তব কি অবাস্তব, ভুল কি শুদ্ধ, প্রযোজ্য কি অপ্রযোজ্য, সংশোধনীয় কি অসংশোধনীয়-এ নিয়ে কোন বির্তকের অবকাশ সেখানে নেই। আদেশকর্তা যা বলেছেন, তা হুবহু সেভাবেই বিনাবির্তকে মেনে নিতে হবে। অন্ধ আবেগজাত ভক্তি বিশ্বাসই এ সকল মতবাদের মূল আশ্রয় রূপে তাই গণ্য হয়।
উপরোক্ত ধারার ধর্ম প্রবক্তাগণের সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী, কিছু খ্যাতনামা ব্যক্তিত্বের নাম বিশ্ব ধর্ম জগতে পরিদৃষ্ট হয়। তাঁরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোন ভাবেই ঈশ্বর বা স্রষ্টার অস্থিত্বে বিশ্বাসী নহেন। অথবা তেমন কোন মহাশক্তির কল্পনাকে, মানবিক তথা জাগতিক রহস্যের উদ্ঘাটনে এবং তৎসংশ্লিষ্ট সমস্যার সমাধানে নিষ্প্রয়োজন বলেও মনে করেছেন। মানুষের কাছে তাঁদের ধ্যান গবেষণালব্ধ অভিজ্ঞতাকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে, তাই তাঁরা প্রায় ক্ষেত্রে যুক্তিবাদ ও মনস্তাত্ত্বিকবাদের আশ্রয় নিয়েছেন। যাদের লক্ষ্য করে তাঁদের এই মতবাদ প্রচার, তাদের নিকট তা গ্রহণীয়, না অগ্রহণীয়; তার যাচাই বাছাইয়ে; সেই সাধারণ মানুষের আপন বিবেক বোধের স্বাধীনতা; তাই তাঁরা সর্বোতভাবে স্বীকার করে নিয়েছেন। এ কারণে, এ সকল ধর্ম প্রবক্তাদের প্রচারিত অভিমত, অন্ধ আবেগ তাড়িত, যু্ক্তিহীন কাল্পনিক ভক্তি বিশ্বাসকে পুঁজি না করে; গণমানুষের মুক্ত বিচার বুদ্ধি ও স্বাধীনতাকে, স্বমতবাদ প্রচারের আশ্রয় রূপে গ্রহণ করেছেন। উপরোক্ত সংক্ষিপ্ত আলোচনার আলোকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হবে যে, গৌতম বুদ্ধের উদ্ভাবিত উপায়ের মধ্যে অতি মানবীয় অলৌকিক কোন পন্থা অবলম্বন করা হয়নি। একান্ত ব্যক্তিগত জিজ্ঞাসা, এবং ব্যক্তিগত  অকৃত্রিম প্রয়াস, এবং তাঁর বুদ্ধি ও মেধার গভীর অনুসন্ধানীর তৎপরতা, তাঁকে দান করেছে অভাবনীয় সাফল্য। তাই ঈশ্বর, স্রষ্টা, অবতার-ইত্যাদি কোন প্রকার অতিমানবীয়তার আশ্রয়ে তিনি নিজ অভিজ্ঞাকে, সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্যে প্রয়াসী হতে; তাঁকে কদাপি দেখা যায়নি। পৃথিবীর তাবৎ সকল ধর্ম প্রবক্তাগণ, যাঁরা প্রচার জগতে ব্যাপকতা পেয়েছেন, সেই যীশুখৃষ্ট এবং হযরত মুহম্মদ (সঃ); তাঁরা সমস্যার উৎপত্তি ও বিনাশের কারণ রূপে স্রষ্টা নামক শক্তিকে নির্দেশ করেছেন। মানুষের ভাল-মন্দ, সুখ-দুঃখ সবকিছু সেই স্রষ্টারই ইচ্ছা নির্ভর। তাই সর্ব প্রকারে, সেই মহাশক্তির সনেত্মাষ বিধানমূলক কিছু নৈতিক কার্যক্রমের উপরেই নির্ভর করবে, মানুষের সুখ-শান্তি, সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা। ব্যক্তিগত কর্মের ফলকে ঈশ্বর নির্ভর করে দিয়ে, সেই ঈশ্বরের প্রতি একান্ত আত্ম নিবেদনই এ সকল ধর্ম প্রচারকদের ধর্ম মতের মূল বক্তব্য। ক্ষুধাটা আমার; তাই খাদ্যের অন্বেষণ, সংগ্রহ এবং খাওয়ার দায়-দায়িত্ব আমারই। তবে ক্ষুধা নিবৃত্তি জাত সুখ দাতা হবেন ঈশ্বর। যুক্তিটি ঠিক এমনই দাঁড়ায়।
ঈশ্বর নির্ভর ধর্মীয় মতবাদের সকল কর্মকান্ড, এমন একটি আত্ম প্রবঞ্চনামূলক হওয়ার কারণে; সে সকল মতবাদের অনুরাগীরা কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, খুব সহজেই তারা আত্ম প্রবঞ্চনামূলক স্ববিরোধী আচরণে লিপ্ত হতে উৎসাহী হয়ে পড়েন। তাই তাঁদের চরিত্রে সুবিধাবাদী, পেশীবাদী, শঠ ও প্রতারণাবাদী প্রবণতা সবিশেষ লক্ষ্যনীয়। স্বীয় মতবাদ অপরের উপর জোর করে, ছলে-বলে-কৌশলে চাপিয়ে দেয়ার ঐতিহাসিক প্রবণতায় তখন তাঁরা জন্ম দেয় কুরুক্ষেত্র, ক্রুসেড ইত্যাদির ন্যায় ধর্মযুদ্ধ এবং এক হাতে ধর্মগ্রন্থ, অপর হাতে অসির উত্তোলন। যুগ বিবর্তনে তাঁদের এই চরিত্র পোষাক বদল করলেও, তা ধারবাহিকভাবে বিদ্যমান থাকে, এ সকল অন্ধ আবেগ সর্বস্ব মতবাদগুলোর মধ্যে; জন্মগত  অভ্যাস, বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের কারণে। যু্ক্তি, বুদ্ধি ও আপন কর্ম নির্ভরতার কারণে, বুদ্ধের মতবাদ প্রচার প্রসারে কোন যুগে, কোন কালে, অস্ত্রশক্তি বা পেশী শক্তির মহড়া প্রদর্শনের অথবা কুট কৌশল অবলম্বনের প্রয়োজন হয়নি। বুদ্ধ তাঁর ধর্মমত প্রচার প্রসারে মানব জাতিকে সর্ব প্রথম উপহার দিয়েছিলেন ত্যাগ এবং নৈতিকতার উচ্চতম গুণে সুপ্রতিষ্ঠিত ‘সংঘ’ নামক সমষ্টিগত জীবনের এক মহতী আদর্শ। এ মহনীয় সমষ্টি হয়ে থাকে বুদ্ধের উপদিষ্ট শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞায় সমৃদ্ধ।
 তৃতীয় পর্যায়ের ধর্ম প্রবক্তাগণ নিজেদেরকে মানবীয় যুক্তিকে ঈশ্বরের সরাসরি ঈশ্বর বলে দাবী করেছেন। আর সেই ঈশ্বরই যুগের প্রয়োজনে দুষ্টের দমনে এবং শিষ্টের পালনে মনুষ্য রূপে পৃথিবীতে আবির্ভূত হন। তাঁরা নিজেই নিজেকে অবতার বলে পরিচয় দিয়েছেন। অথবা তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল পরবর্তী শাস্ত্র রচয়িতারা, সেভাবেই এসব ধর্ম প্রবক্তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য জন সমক্ষে তুলে ধরেছেন। এ শ্রেণীর ধর্ম প্রবক্তাগণের অনুসারীদের বহুত্ববাদী বা অবতারবাদী বলা হয়। তাঁরা আপন বহুমুখি সমস্যার সমাধানে; এক একটি সমস্যার মুক্তিতে এক একজন কাল্পনিক দেব-দেবীর আশ্রয় গ্রহণ করে থাকেন।
ধর্ম প্রবক্তাগণের উপরোক্ত শ্রেণী বিন্যাসের মধ্যে গৌতম বুদ্ধ হলেন, একান্ত ভাবে যুক্তি ও বাস্তববাদী এক অসাধারণ পর্যায়ের ব্যক্তিত্ব। তিনি জন্মগত সূত্রে ছিলেন হিমালয়ের পাদবর্তী রাজ্য কপিলাবস্তু রাজ্যের অধিকারী মহারাজ শুদ্ধোধনের পুত্র। তৎকালীন ধনী-শ্রেষ্ঠী, রাজা মহারাজাদের ভোগ-বিলাসের প্রচলিত উপকরণ সমূহে প্রাচুর্য্যের কোন ব্যতিক্রম ছিল না, তাঁর জীবনেও। শীত, গ্রীষ্ম ও বর্ষা এই তিন প্রধান ঋতু উপভোগী তিনটি পৃথক পৃথক প্রাসাদে তার জন্যে বাড়তি কিছু ভোগ-বিলাসের ব্যবস্থা ছিল।  ভোগের আতিশয্য তাঁর মনে ভোগের প্রতি বিতৃষ্ণার জন্ম দেয়। তৎকালে বারাণসীর শ্রেষ্ঠী পুত্র যশ এর মনেও এমনতরো বিতৃষ্ণা, মহাউপদ্রব রূপে দেখা দিয়েছিল। কিন্তু রাজপুত্র সিদ্ধার্থের মনে তেমনটি না হয়ে, প্রশ্ন দেখা দিল, জাগতিক জীবনে তিনটি অনিবার্য দুঃখ এই ব্যাধি, বার্ধক্য আর মৃত্যুর হাত থেকে চির অব্যহতি পাওয়ার কোন উপায় আছে কিনা। এ নিয়ে জীবন জিজ্ঞাসার তীব্র তাগিদ, তাঁকে ভোগ-বিলাসপূর্ণ রাজকীয় জীবনের পরিবর্তে, ঝুট্ ঝামেলা মুক্ত এবং অতিসংক্ষিপ্ত অথচ মুক্ত বিহঙ্গ সদৃশঃ সামান্য ভিক্ষা নির্ভর সন্ন্যাস জীবন গ্রহণে অনুপ্রাণিত করে। রাজকুমার সিদ্ধার্থের সন্ন্যাস জীবনের দীর্ঘ ছয় বছরের অন্বেষার পুরোটাই ছিল, দুঃখ মুক্তির উপায় সন্ধানে প্রচলিত প্রথাকে নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অনুশীলনের অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ। কিন্তু প্রচলিত কোন পন্থায়, আত্ম-জিজ্ঞাসার সদুত্তর না পেয়ে; একান্ত নিজস্ব উদ্ভাবিত পথই শেষ পর্যন্ত তাঁকে গ্রহণ করতে হলো। আর এ পথে অগ্রসর হতে গিয়ে জীবনের অতীত, বর্তমান ও অনাগত দুঃখের সামগ্রিক স্বরূপটা; তাঁর গভীর জ্ঞান জালে অবশেষে ধরা পড়লো। দুঃখের সেই সর্বগ্রাসী স্বরূপটাকে, তিনি যেভাবে একটি সুশৃঙ্খল উপায়ে গবেষণা ও ব্যাখ্যা দান করলেন; দেখা গেল তা রোগ নিরাময়ে চিকিৎসা শাস্ত্রের সেই সুশৃঙ্খল পদ্ধতির মতোই শৃঙ্খলাবদ্ধ। দেহধারীর নিকট ব্যাধি যেমন একটি অনিবার্য দুঃখদায়ক সমস্যা; তেমনি এই জাগতিক জীবন সংশ্লিষ্ট সমুদয় সমস্যাই তো দুঃখদায়ক। সেই দুঃখের চির অবসানে বুদ্ধ আবিষ্কৃত পদ্ধতির নাম চারি আর্যসত্য জ্ঞান এবং প্রতীত্যসমুৎপাদ নীতি জ্ঞান। এই জীবন সংশ্লিষ্ট বুদ্ধ মতবাদটির প্রচার-প্রসার ও স্থিতির জন্যে প্রয়োজন একান্ত নিবেদিতপ্রাণ। এতে অভাবনীয় ঋদ্ধিশক্তির যেই বিষ্ফোরণ ঘটে, তার চুম্বকীয় আকর্ষণ মানুষের হৃদয় জয় করে নিতে পারে অতি সহজে। তাই সত্যিকার ভাবে বলতে গেলে বুদ্ধমত প্রচারে প্রয়োজন মৈত্রী, করুণা, মুদিতা, উপেক্ষাগুণ সম্পন্ন শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞা সমৃদ্ধ একতাবদ্ধ এক সাংঘিক জীবন। রাজশক্তি, ধনশক্তি বা জনশক্তি বুদ্ধমত প্রচারে অহিংসা নীতি দ্বারা প্রভাবিত হলে, তা সহায়ক উপাদান হয় মাত্র। বিশ্বের ধর্ম প্রবক্তাদের মধ্যে বুদ্ধের ব্যক্তিত্বের ইহাই অত্যুজ্জ্বল বিশেষত্ব ইহাই প্রভেদ।

Thursday, July 6, 2017

ঐতিহাসিক সমন্বয়

ঐতিহাসিক ঘটনার সমন্বয়
লিখেছেনঃ    সুবল বড়ুয়া
আষাঢ়ী পূর্ণিমা বুদ্ধের পাঁচটি ঐতিহাসিক ঘটনার সমন্বয়

সিদ্ধার্থ গৌতম বা তথাগত বুদ্ধ মানবকুলে জন্ম নেয়ার জন্য তাঁর মাতৃগর্ভে (রাণী মহামায়া) প্রতিসন্ধি গ্রহণ, সিদ্ধার্থেও গৃহত্যাগ, সর্বপ্রথম গৌতম বুদ্ধ কর্তৃক ধর্মচক্র প্রবর্তন সূত্র দেশনা বা বৌদ্ধ ধর্মমত প্রচার, প্রাতিহার্য ঋদ্ধি তথা আধ্যাত্মিক শক্তি প্রদর্শন এবং গৌতম বুদ্ধের পরলোকগত মা (রাণী মহামায়া) কে অভিধর্ম দেশনা।
মহামানব সিদ্ধার্থ গৌতম ও তথাগত সম্যক সম্বুদ্ধের জন্মপূর্ব এবং জন্মোত্তর জীবনের পাঁচটি ঐতিহাসিক এই ৫টি ঘটনার সমন্বয় আষাঢ়ী পূর্ণিমা। বৌদ্ধদের পরম কল্যাণময় ও পুণ্যময় তিথি আষাঢ়ী পূর্ণিমা।
এই পূর্ণিমা তিথিতেই তথাগত গৌতম বুদ্ধ ভিক্ষুদের জন্য বর্ষাব্রতের নিয়মও প্রবর্তন করেন। এসব প্রেক্ষাপটে আষাঢ়ী পূর্ণিমা বৌদ্ধদের অত্যন্ত স্মরণীয়-বরণীয় তিথি। বৌদ্ধদের জন্য এটি একটি পরম মুহুর্ত ও শুভ দিন।
বৌদ্ধ শাস্ত্র মতে, বৌদ্ধ জীবন নানা কারণে ঐতিহাসিকভাবে অর্থবহ এবং গুরুত্বপূর্ণ। এই আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে গৌতম বুদ্ধ সিদ্ধার্থ রূপে মায়াদেবীর গর্ভে প্রতিসন্ধি গ্রহণ করেন। উল্লেখ্য, মহাপুরুষেরা যথাসময়ে উপযুক্ত, ভৌগোলিক সীমায়, কাম্য স্থানে উত্তম বংশের পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। এক্ষেত্রে মহামানব সিদ্ধার্থ গৌতম যথানিয়মে তাঁর পিতা রাজা শুদ্ধোধনের ঔরশে রাণী মহামায়ার গর্ভে জন্ম নিয়ে ধরাধামে ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন। জন্ম, জরা, ব্যাধি, মৃত্যু, সন্ন্যাসী এই চার নিমিত্ত দৃশ্য দর্শন করে রাজকুমার সিদ্ধার্থ এ তিথিতে সংসারের মায়া মোহ ছিন্ন করে বুদ্ধত্ব লাভের প্রেরণায় গৃহত্যাগ করেন। পরবর্তীতে ছয় বছর কঠোর তপস্যার মাধ্যমে বুদ্ধত্ব লাভ করে তিনি আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে সারনাথের ঋষিপতন মৃগদাবে তার নবধর্ম (বৌদ্ধ ধর্ম) ধর্মচক্র প্রবর্তন সূত্র দেশনা করেন। পরবর্তীতে মায়ের মৃত্যুর পর একই পূর্ণিমা তিথিতে তিনি মায়াদেবীকে সদ্ধর্ম দেশনার জন্য তাবতিংস স্বর্গে গমন করেন। এ পূর্ণিমাতেই বৌদ্ধ ভিক্ষু সংঘের ত্রৈমাসিক বর্ষাব্রত বা ওয়া অধিষ্ঠান গ্রহণ করেন।
উপবসত শব্দ থেকে ‘উপোসথ’ শব্দের উৎপত্তি। পালি শব্দ ‘উপোসথ’ থেকে উপবাস শব্দের উৎপত্তি। এখানে উপ একটি উপসর্গ। এর অর্থ হল নিকটে বা পাশাপাশি এবং বসত অর্থ হলো বাস করা। সুতরাং উপবসত শব্দের বুৎপত্তিগত অর্থ হল পাশাপাশি বসে ধর্ম শ্রবণ করা। অষ্টমী, অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথিতে উপোসথিকগণ এই আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী বা প্রবারণা পূর্ণিমার সময় দান, শীল, ভাবনা করে আধ্যাত্মিক জীবন গঠন করে। বৌদ্ধমতে উপোসথ চার প্রকার। তা হল- প্রতিজাগর উপোসথ, গোপাল উপোসথ, নির্গ্রন্থ উপোসথ এবং আর্য উপোসথ। উপোসথিকগণ প্রাণিহত্যা করেন না। অপ্রদত্তবস্তু গ্রহণ করেন না। মিথ্যা ভাষণ করেন না। মাদকদ্রব্য সেবন করেন না। ব্রহ্মচর্য আচরণ করেন। কামাচার করেন না। রাতে আহার গ্রহণ করেন না। মালাধারণ ও সুগন্ধদ্রব্য ব্যবহার করেন না। কোনো উঁচু আসনে শয়ন কিংবা উপবেশন করেন না। এগুলো অষ্টাঙ্গ উপোসথিকের অবশ্যই পালনীয় কর্তব্য। উপোসথ আত্মশাসন, আত্মসংযম ও চিত্ত-সাধনাকে নিয়ন্ত্রণ করে। বৌদ্ধজীবনে এটি হচ্ছে প্রজ্ঞা ও ধ্যান সাধনার জন্য মহৎ কাজ। দুঃখের নিবৃত্তির জন্য এ উপোসথ বৌদ্ধজীবন পদ্ধতিতে অত্যন্ত কার্যকর। আষাঢ়ী পূর্ণিমা ও বর্ষাবাসের কার্যক্রমের সঙ্গে উপোসথ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বৌদ্ধ ধর্মে উপোসথের গুরুত্ব খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। ধর্মীয় জীবনযাপনের লক্ষ্যে তথাগত সম্যক সম্বুদ্ধ স্বয়ং উপোসথের প্রবর্তন করেন। উপোসথ হল ধর্মীয় অনুশাসন বা জীবনযাপনের প্রশিক্ষণ শিবির।
তথাগত সম্যক সম্বুদ্ধ কর্তৃক বৌদ্ধ ভিক্ষুদের জন্য বর্ষাব্রত অধিষ্ঠান বা ওয়ার নিয়ম প্রবর্তন আষাঢ়ী পূর্ণিমার একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। ধর্ম প্রচারের প্রথমাবস্থায় বৌদ্ধ ভিক্ষুরা সারা বছরই নিয়োজিত থাকতেন। তখন বর্ষাব্রতের কোন বিধান ছিল না। যেহেতু বর্ষাকালে ভিক্ষুদের গৈরিক বসন বা চীবর বৃষ্টিতে ভিজে ও মাটি-বালি লেগে নোংরা হয়, রাস্তাঘাট কর্দমাক্ত হয়ে পিচ্ছিল হলে পথ চলায় বিঘœ ঘটে। সবুজ ঘাস, লতা, ক্ষেতের আইল, জমির ফসল ইত্যাদি ভিক্ষুদের পদাঘাতে বিনষ্ট হয়। এ ছাড়া এ সময় পদতলে পিষ্ট হয়ে পোকামাকড়, কীট-পতঙ্গ ও অন্যান্য ছোট ছোট প্রাণীর জীবন নাশেরও যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকে। এসব বিষয় পর্যালোচনা করে তথাগত গৌতম বুদ্ধ আষাঢ়ী পূর্ণিমার দিন ভিক্ষুদের জন্য বর্ষাকালীন বষাব্রতের নিয়ম প্রবর্তন করেন। এটি অবস্থার প্রেক্ষাপটে গৃহিত একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ভিক্ষুরা প্রধানত আষাঢ়ী পূর্ণিমার পরদিন থেকে একটি উপযুক্ত স্থানে তিন মাস ব্যাপী বর্ষাব্রতের অধিষ্ঠান করেন। বর্ষাব্রত পালনের মাধ্যমে ভিক্ষুদের আত্মশুদ্ধি ঘটে ও তাঁদের পারস্পরিক সৌহার্দ্যবোধ বিকশিত হয়। দীর্ঘ সময় ব্যাপী সংযম সাধনা ও বিশ্রামের ফলে তাঁদের নৈতিক উৎকর্ষ সাধিত হয়, দুঃখ-নিবৃত্তির পথ প্রশস্ত হয়। এছাড়া বর্ষাব্রতোত্তর ধর্ম প্রচারে মনোবল বৃদ্ধি পায়। ভিক্ষু সংঘের পাশাপাশি বর্ষাব্রত বা ওয়ার তিন মাস সময়ে গৃহীরা উপোসথ পালনসহ দান, শীল ও ভাবনায় অধিকতর নিয়োজিত থাকার পরিবেশ লাভ করে। অধিকন্তু ভিক্ষুর বর্ষাব্রত পালনের মধ্য দিয়ে ‘প্রবারণা’ উদযাপনের সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং প্রবারণার ধারাবাহিকতায় ‘কঠিন চীবর দান’ সম্পাদনের সুবর্ণ সুযোগ লাভ করা যায়। এখানে স্মরণীয় এই, সিদ্ধার্থ গৌতম গৃহত্যাগের পর নিজের চুল কেটে সত্যক্রিয়া করে সেগুলো আকাশে উড়িয়ে দিলে দেবতারা সেই চুল নিয়ে স্বর্গে চৈত্য তৈরি করেন।
এটি স্মরণে বৌদ্ধরা আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী বা প্রবারণা পূর্ণিমা পর্যন্ত তিনমাস বর্ষাবাস অধিষ্ঠানের পর আকাশ প্রদীপ বা ফানুস উত্তোলনের মধ্য দিয়ে জগতের সকল প্রাণীর সুখ-শান্তি কামনা করা হয়।

লেখক : সাংবাদিক


Read more at http://nirvanapeace.com/buddhism-philosophy/buddhist-philosophy/686#MkyLzg1l1tt6bMlV.99

বৌদ্ধ দর্শন অনুশীলনে জ্ঞান গভীরতা আসে


মানুষ মাতৃক ভাবপ্রসূত অদ্ভূত প্রাণী। এক মূহুর্ত নির্লিপ্ত সময় বিদ্যমান নেই, যা মানুষের মন চিন্তা-ভাবনা থেকে অক্রিয় হয়ে পড়েন। তাঁরা যা ভাবেন তাই বড়ই অদ্ভূত। তাই মানব জাতিই অদ্ভূত শ্রেষ্ঠ প্রাণী। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দর্শনবাদে অতিক্রম করে সাফল্য অর্জন করেছে মানব জাতির অভিজ্ঞতা। পৃথিবীর বিখ্যাত বিখ্যাত দর্শন- ইসলামবাদ, খ্রিষ্টানবাদ, হিন্দুবাদ, ক্যাথলিকবাদ, প্রযুক্তি বিষয়ক বিজ্ঞানবাদ এবং বৌদ্ধবাদ ইত্যাদি ইত্যাদি মতবাদে গবেষণায় অগ্রগতি লাভ করতে করতে মানব জাতির মনস্তাত্ত্বিক দর্শন এখন বিভিন্ন বিভাগে বিভক্ত শিঁখরে এসেছে। তবে মানুষ যে, যেই বিভাগে অনড় থাকুক না কেন, প্রত্যেকটি মতবাদে বিশেষভাবে আবেগবদ্ধ জ্ঞান- বিজ্ঞানের সক্ষমতা অবশ্যই আছে। অর্থাৎ প্রত্যেক বিভাগের মানুষের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাবহুল জ্ঞানলব্ধ ধারণা আছে। তাহলে সেগুলো অস্বীকার করা অমানবিক।  প্রত্যেক মানুষ তাঁদের স্পৃহাবশতঃ অধ্যয়ন নিজেরাই বাচাই করে নেবে।                                           
   এ পর্যায়ে এখন আমি আমার আকর্ষণীয় মতবাদ বৌদ্ধ দর্শনের আলোচনায় আসছি। যেমন বৌদ্ধধর্মের দর্শন অনুশীলনে কীভাবে জ্ঞানের গভীরতা আসে? এ প্রশ্নানুসারে→আমাদের মনে রাখতে হবে- বৌদ্ধধর্ম দু'টি বাস্তব সত্য। উচ্চতর জ্ঞান এবং প্রঁকৃতি সম্বন্ধীয় প্রত্যক্ষ উপলব্ধি বাস্তব জ্ঞান। এই দুইটি জ্ঞান বুদ্ধকে মহামানব সৃষ্টি করেছে। বুদ্ধ ক্ষণে ক্ষণে প্রঁকৃতির সত্য অনুসারে নিজের অভিজ্ঞ জ্ঞান বদলে নিতে পারতেন। তাই বৌদ্ধদর্শনের অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো প্রঁকৃতির সাথে এর গভীর সম্পর্ক। বৌদ্ধদের ধারণা হলো প্রঁকৃতি কারও দ্বারা সৃষ্ট নয়। এক্ষেত্রে বৌদ্ধধর্মে মহাজাগতিক অংশকেও কোন সৃষ্টিকর্তার দ্বারা সৃষ্ট বলে গ্রহণ করে না। তাই মানুষের জীবনের অস্তিত্বও প্রকৃতির একটা অংশমাত্র। বৌদ্ধধর্মে পরোক্ষ জ্ঞানের কোন স্থান নেই। আপনি বৌদ্ধ হিসেবে যা অনুশীলন করবেন,  ভাববেন তাতে সম্পূর্ণ গভীর আবেগের তাড়না থাকতে হবে। কারণ বৌদ্ধজ্ঞান একমূখী শক্তি নয় বরং সৃজনশীল পদ্ধতিমূখী। বিশেষভাবে নিজের চিন্তা, ভাবকে অনুশীলনের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ অনুভূতি অর্জনের সামর্থ্যই হলো বৌদ্ধ দর্শনের গভীরতা অনুশীলন। যত গভীর ভাবে বুদ্ধ মার্গ পদ্ধতি অনুশীলিত করবেন তত বেশি উচ্চতর জ্ঞানের শিঁখরে আপনার অভিজ্ঞতার লক্ষ্য পৌছে যাবে। আপনি প্রশ্নের মাধ্যমেও জানতে পারেন, বৌদ্ধরা কেন এত সুখী? ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া ও ইউনিভার্সিটি অফ উইসকনসিনের দুইদল বিজ্ঞানী পৃথক পৃথক গবেষণাগারে গবেষণা করার পর জানিয়েছেন, বৌদ্ধধর্মাবলম্বীরা প্রকৃত সুখী এবং অন্য ধর্মাবলম্বীদের চেয়ে শান্ত প্রকৃতির হয়। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, বৌদ্ধদের মস্তিস্কের যে অংশটি মানুষের মেজাজ ভাল রাখে এবং ইতিবাচক অনুভূতি সৃষ্টির জন্য দায়ী বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের মস্তিস্কের সেই অংশটি অধিক সক্রিয়। আর একদল বিজ্ঞানী মনে করেন ধ্যানই বৌদ্ধদের শান্তি ও সুখী হতে সাহায্য করে। অন্যদিকে অত্যাধুনিক স্ক্যানিং প্রযুক্তির সাহায্যে বলা হয়েছে ধ্যান নয় বরং আত্মসংযম এবং ইতিবাচক মনোভাবই বৌদ্ধদের সুখী ও শান্ত প্রকৃতির মানুষে পরিণত করে। ভূটান অন্যতম বৌদ্ধদেশ। এদেশের মানুষ বিশ্ব সুখী মানুষদের চেয়ে সবচেয়ে সুখী মানুষ এরা। প্রযুক্তির লিপ্সা এঁদের মনকে জয় করতে পারেনি। তাঁরা প্রযুক্তিকে ভাবে ইন্দ্রিয় অসংযমের কারণ। ইন্দ্রিয় অসংযম কারণে মানুষের মন সুখীবোধ  থেকে সরে আসে। ভূটানবাসীর জ্ঞান প্রয়োগ ক্ষেত্রে বুদ্ধের জ্ঞান প্রয়োগের যথেষ্ট মিল আছে। বুদ্ধের ভাব সম্পূর্ণ বিয়ষীভূত সঠিক মীমাংসায় অনুভূত হয়েছে। মনের সঠিক সুস্থ ও সুখীবোধ ক্ষেত্রেও দিয়েছে স্থায়ী সমাধান। দুঃখ সূচনা ব্যবধানে বুদ্ধের মার্গ অন্যতম বৈশিষ্ট্য রয়েছে প্রতি পলে পলে বৌদ্ধদর্শন বর্ণনায়। মানসিক প্রশান্তি সংরক্ষণে মানুষের চিন্তা ভাবনায় ব্যাপক উপায় রয়েছে নিজস্ব সঠিক সিদ্ধান্ত এবং প্রজ্ঞাভিত্তিক সমাধানের উপর। বুদ্ধের চেতনা যেমন মুক্তমনা ভিত্তিক ব্যাঞ্জনাময় উপলব্ধি গ্রহণ করার শক্তি রয়েছে, তাঁর বৌদ্ধদর্শন ভিত্তিময় দেশনাও মুক্তমনায় সিক্ত। তাই বুদ্ধের ধর্ম মানে মানসিক বিকাশ এবং মনের প্রকৃত সত্যমাত্রা লাভ করা। মনকে গুরুত্ব বহন করে ইতিবাচক জ্ঞান অর্জনের শক্তি সৃষ্ট করার উপযোগী মানুষের মেনে নিতে হবে। বুদ্ধের পন্থা অবলম্বন করা মানে আত্মসচেতন অবলম্বন করে ইতিবাচক মনোভাব অনুশীলনে নিজেকে ব্যাপৃত রাখা। বুদ্ধ স্বাভাবিকভাবে কোনো বিষয় বা জিনিসকে মেনে নিতে পছন্দ করেনি। তিনি প্রত্যেক বিষয়ে গভীর তত্ত্বমূলক গবেষণা সহকারে মেনে নিতে এবং গ্রহণ করতে পছন্দ ছিলেন। তাঁর বিশেষ পদ্ধতি দু'ভাবে প্রয়োগ করতেন। যেমন সাধারণ সত্য এবং পরমার্থ সত্য। স্বাভাবিকভাবে যে বিষয় বা বস্তুর গুণ, মান, উপাদান, ও বৈশিষ্ট্য থাকবে সেগুলো হলো সাধারণ সত্যের বিষয়। আর যেগুলো বিশেষভাবে বা পারমার্থিকভাবে যে বিষয় বা বস্তুগুলোর গুণ, মান, উপাদান, এবং বৈশিষ্ট্য সম্পর্ক জ্ঞান থাকবে সেগুলো পরমার্থ সত্য হিসেবে ভাবা যায়। অনুভূতির ক্ষেত্রে বৌদ্ধ সাধনার উপায়গুলো সম্পূর্ণ আলাদা। কারণ ইন্দ্রিয়জাত বশত সমষ্ট অনুভূত বিষয়ের চেতনা সবগুলো সুখের অধীনে উৎপত্তি হয় না। কোখনো কোখনো দুঃখের কারণ হয়েও অনুভূতির সূচনা ঘটে থাকে প্রত্যেক মানুষের চিন্তা-চেতনায়। বিজ্ঞানের যাত্রা প্রতিনিয়ত অস্বাভাবিক জ্ঞান তাড়নায় গবেষণা করা হচ্ছে বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞ পরিশ্রমে। ঠিক বুদ্ধের দর্শনে সঠিক মাত্রায় আসা সহজ উপায় নেই। মানুষের থাকতে হয় গভীর মনোনিবেশ অনুশীলনের সক্ষমতা। একজন সাধারণ মানুষের জ্ঞান প্রয়োগের ক্ষেত্রে বৌদ্ধসাধনার স্থানে নিজেকে তুলনা করা চলে না। বৌদ্ধসাধনার অধিকারী হতে হলে গভীর মেধাযুক্ত জ্ঞান প্রয়োগের মানুষ হতে হবে। প্রত্যেক অভিজ্ঞতায় নিজেকে প্রমাণ মিলাতে হবে একজন তাৎপর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্যধারী সঠিক মানুষ। আপনার অনুশীলন হতে হবে সর্বজনব্যাপৃত।বৌদ্ধজ্ঞান সম্বন্ধে আপনার গভীরে পৌছতে হলে অসাধারণ চিন্তা-চেতনা, ভাব সম্প্রসারণ ও মেধাকে কাজে লাগিয়ে নিতে হবে। এবং সুক্ষ্ম বিচার শক্তি দিয়ে মানসিক সমাধান পাওয়ার কোনো উপায় নেই।
লেখক→ শ্রীমৎ বীতশোক ভিক্ষু।
প্রবন্ধক।

Friday, June 30, 2017

বুদ্ধের আদর্শ ও প্রিয় মানুষ

 বুদ্ধ জগতে অতি প্রিয় সাধনা করে নিজের পবিত্র জীবনের অনুসন্ধান খুঁজে পান। তাঁর চন্দ্রের আঁলোর মতো বিচ্ছুরিত জীবনময় সাধনা মানব জাতিকে দিয়েছে সুন্দরতম অধ্যায়। যে অধ্যায়ে প্রত্যেক মানবের চিন্তাকে সুমহান পথ দেখিয়েছে। বুদ্ধ তাঁর আদর্শ সহজ ভাবনায় উপলব্ধ করতে পারেনি। শরীরের অসহনীয় নিলিমায় কঠোর আচরণের দ্বারা লাভ করেছেন তাঁর বিশ্ব হিতকর সাধনার ফসল। শুধু তপস্যা আর তপস্যা। তিনি কখনো আদর্শ বলির কথা ভাবেনি। প্রাণের অন্ত পরিবেশন করতেও রাজি হয়ে পূর্ণ সাধনায় মন্থর হয়েছিলেন বিশ্বকল্যাণে। বুদ্ধের আদর্শ কোখনো মানব জাতিকে দুঃখদহন করতে পারে না। কারণ তাঁর অন্তর্সাধনা সম্পূর্ণ পবিত্র চেতনাভিত্তিক উপলব্ধিকে আনুকুল্য করে। বুদ্ধ তাঁর ভাবাদর্শকে বিশুদ্ধ পদ্ধতি অনুসরণ করে আত্মবিশুদ্ধির প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। তাই মানব জাতির জন্যে যা বাণী, উপদেশ প্রচারণা করেছেন সেগুলো সম্পূর্ণ আত্মবিশুদ্ধির হেতু। কোখনো আত্মদহনের কথা বলেননি। আত্মদহনের কথা বললেও শুধুমাত্র আদীনব, উপদ্রব, ও বিপদ সংকুলের উদ্দেশ্যে প্রস্তাবনা করেন। কিংবা সেই আত্মদহনের চেতনা থেকে বেড়িয়ে আসতে করুণাচ্ছলে আহ্বান জানিয়েছেন। কোখনো আত্মপাপে পীড়িত হওয়ার উদ্দেশ্যে,দহন হওয়ার উদ্দেশ্যে, ক্লিষ্ট হওয়ার জন্য উপদেশ প্রদান করেননি। তাই বুদ্ধ যেমনি ভাবাদর্শে বিশুদ্ধি পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন আমাদেরও উচিত সেই বিশুদ্ধি সাধনার মাঝে নিজের জীবনময় সাধনাকে উৎসর্গ দেওয়া।
 বুদ্ধের প্রধান চেতনা হলো " প্রাণ " কে ভালোবাসা বা দয়া করা। সেজন্য দুঃখ সাধনা থেকে প্রাণসত্ত্বাকে মুক্তি দেওয়াই প্রথম পর্যায়ের সাধনা। বুদ্ধ সর্বজ্ঞতা লাভ করার আগে Masterplan করেছেন জীবের আত্মমুক্তি ও আত্মবিশুদ্ধি সুখ কীভাবে অর্জন করা যায়। সেই মার্গপন্থাগুলোর নীতিমালা। মনস্তাত্ত্বিক গবেষণামূলে বৌদ্ধদর্শনের অবাকক্ষমতা বিদ্যমান আছে। মানবের মানসিক বেদনাশক্তি অন্ধকারে দহন করে করে কোন আত্মবিনোদন সুখ লাভ করা সম্ভব নয়। যা লাভ করা হয় তাও সাময়িক কারণ। কিন্তু পরিণাম ভয়াবহ। বৌদ্ধজ্ঞান বা বুদ্ধের অভিজ্ঞা সম্পূর্ণ প্রঁকৃতি সম্বন্ধ। প্রকৃতিকে তাল মিলিয়ে যে বাস্তব সম্মত সত্য দর্শনের জ্ঞান উপলব্ধ হয় তা বুদ্ধের সমীপন্থি। প্রত্যেক বোধশক্তিতে উচ্চাকাঙ্খা ও উচ্চতর সাধনার  সমাধি অর্জনের প্রয়োজনীয়তায় হলো বুদ্ধের একান্ত যোগ। বুদ্ধের মহৎ চেতনা বিশ্ব মানবের জন্য শস্যের ঔষধি সরূপ জনহিতকর কল্যাণ বর্ষিত হয়েছে। এর সময় ছিল প্রায় ২৫৬০ বুদ্ধবর্ষ আগে। তাঁর জন্মের শুরুতে ইতর প্রাণীদের প্রাণ এতই স্বচ্চ ও ভাস্বর হলো যে, নিজেদের আনন্দে  বেঁহুশে লাফাঁলাফি করতে থাকে। একের পর এক আনন্দের উচ্ছ্বাস হৃদয়ে ভেঁসে যেতে লাগল। হাতির রবে কাঁঠবিড়ালী সবুজ ঘেঁরা ঝোপ থেকে নাচতে শুরু করে দিল। আহা! কী চাকচিক্য আনন্দের কৌতুহল। বড়ই মধুর! বড়ই মধুর! অনুভব করতে লাগল ফুলের সুবাস চেয়ে হৃদয়ের প্রফুল্ল সুবাস কতই না উত্তম। ছুঁয়েও দেয় মন। এর মতো প্রাণের প্রশান্তি আর মনে হয় নেই। মানব জাতির নৃত্যমঞ্চ আয়োজনের মতো বসালো রমরমা রঙ্গাঙ্গন। কারণ জগৎ গুরুই আবির্ভাব হয়েছে ধরাধমে। আজ থেকে মানুষের শিক্ষা, চেতনা, বোধ, সমাজব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় দরদ ইত্যাদিই সুশাসনে বদলে যাবে। মানব জাতি পাবে অমৃত উপহার। পাবে প্রকৃত মানব মুক্তির শূণ্য আত্মা। জগৎ গুরু মানেই হলো এর সাথে অতুলনীয় সৃষ্টি মানব। তাঁর গুণ, কর্ম, ভাব, শিক্ষা, সাস্থ্য, চেতনার সাথে কোন মহৎ মানবীয় আত্মার তুলনাও নেই, সমানও নেই এবং উত্তমও নেই। ইনিই জগৎ গুরু। ইনিই সম্যক সম্ম্বুদ্ধ! ইনিই বুদ্ধ! বুদ্ধপ্রাপ্তি হয়ে সংঘপ্রতিষ্ঠা, ধর্ম প্রবর্তক করলেন।আবিস্কার করলেন আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ ও চতুরার্য সত্যদর্শন। সময় সন্ধিক্ষণে দিকে দিকে প্রচারনা ও প্রসারনা হয়ে উঠল পরম বৌদ্ধদর্শন। এই দর্শন  কঠিন হলেও আঁচড়ে আঁকড়ে ধরল মানব জাতির শাসন ব্যবস্থায়। বিশ্ব-ব্রম্মাণ্ড সত্ত্বকে নাঁড়া দিয়ে আকুল করল বৌদ্ধের পরম সত্য। দেব,  ব্রম্মাসহ, বিশ্ব প্রাণীসত্ত্বই মাতৃক বুদ্ধের একান্ত অনুগতে আসতে থাকে পরম্পরায় এঁকে এঁকে। তাই আমরাও এখন বুদ্ধের শরণাগত। সুতরাং বুদ্ধ আমাদের প্রিয় মানুষ।
        
                      লিখেছেন→ শ্রীমৎ বীতশোক ভিক্ষু।
                         সুবলং শাখা বন বিহার, জুরাছড়ি।

Wednesday, June 28, 2017

কায সুত্তং - কায় সূত্র

(গ) কায সুত্তং- কায় সূত্র
২৩.১। “হে ভিক্ষুগণ, কোনো কোনো (অকুশল) ধর্ম আছে যা কায় দ্বারা প্রহাণযোগ্য বাক্য দ্বারা নয়; কোনো কোনো ধর্ম আছে যা বাক্য দ্বারা প্রহাণীয় কায় দ্বারা নয়; কোনো কোনো ধর্ম আছে যা প্রজ্ঞা দ্বারা দর্শনেই প্রহাণতব্য কায় কিংবা বাক্য দ্বারা নয়।
২। ভিক্ষুগণ, কীরূপ ধর্ম আছে যা কায় দ্বারা প্রহাণযোগ্য বাক্য দ্বারা নয়?
ভিক্ষুগণ, এক্ষেত্রে ভিক্ষু কায়ের দ্বারা সামান্য মাত্রায় অকুশলগ্রস্ত হয়। তা বিজ্ঞ-সব্রহ্মচারীগণ জ্ঞাত হয়ে কায়িক অকুশলগ্রস্ত ভিক্ষুকে এরূপ বলেন, ‘হে আয়ুষ্মান, আপনি কায় দ্বারা সামান্য পরিমাণে অকুশলগ্রস্ত হয়েছেন। সেহেতু, আপনি উত্তমরূপে কায় দুশ্চরিত্র ত্যাগ করে কায় সুচরিত্র অনুশীলন করুন। সে বিজ্ঞ-সব্রহ্মচারীদের দ্বারা এরূপে উপদিষ্ট হয়ে কায় দুশ্চরিত্র ত্যাগ করে কায় সুচরিত্র অনুশীলন করে। ভিক্ষুগণ, 
সেহেতু ইহাকে বলা হয়-‘কায় দ্বারা প্রহাণযোগ্য, বাক্য দ্বারা নয়।’
৩। ভিক্ষুগণ, কীরূপ ধর্ম আছে যা বাক্য দ্বারা প্রহাণীয় কায় দ্বারা নয়?
ভিক্ষুগণ, এক্ষেত্রে ভিক্ষু বাক্য দ্বারা কিঞ্চিৎ মাত্রায় অকুশলগ্রস্ত হয়। তা বিজ্ঞ সব্রহ্মচারীরা জ্ঞাত হয়ে বাচনিক অকুশলগ্রস্ত ভিক্ষুকে এরূপ বলেন, ‘হে আয়ুষ্মান, আপনি বাক্য দ্বারা কিঞ্চিৎ মাত্রায় অকুশল প্রাপ্ত হয়েছেন। সেহেতু, আপনি উত্তমরূপে বাচনিক দুশ্চরিত্র ত্যাগ করে বাচনিক সুচরিত্র অনুশীলন করুন। সে বিজ্ঞ-সব্রহ্মচারীদের দ্বারা এরূপে উপদিষ্ট হয়ে বাচনিক দুশ্চরিত্র ত্যাগ করে বাচনিক সুচরিত্র অনুশীলন করে। ভিক্ষুগণ, সেহেতু ইহাকে বলা হয়-‘বাক্য দ্বারা প্রহাণযোগ্য কায় দ্বারা নয়।’
৪। ভিক্ষুগণ, কীরূপ ধর্ম আছে যা প্রজ্ঞা দ্বারা দর্শনেই প্রহাণতব্য কায় কিংবা বাক্য দ্বারা নয়?
ভিক্ষুগণ, লোভ হচ্ছে কায় কিংবা বাক্য দ্বারা অপ্রহাণীয় কিন্তু প্রজ্ঞা দ্বারা দর্শনের মাধ্যমে প্রহাণযোগ্য ধর্ম। দ্বেষ-মোহ ও  হচ্ছে কায় কিংবা বাক্য দ্বারা অপ্রহাণীয় কিন্তু প্রজ্ঞা দ্বারা দর্শনের মাধ্যমে প্রহাণযোগ্য ধর্ম। ক্রোধ, উপনাহ (দোষ অন্বেষণ), ম্রক্ষ (অন্যের নিন্দকারী), পলাস (ঘৃণা), মাৎসর্য (কৃপণতা) এ সমস্তও হচ্ছে কায় কিংবা বাক্য দ্বারা অপ্রহাণীয় কিন্তু প্রজ্ঞা দ্বারা দর্শনের মাধ্যমে প্রহাণযোগ্য ধর্ম।
পুনশ্চ, ভিক্ষুগণ, পাপ-ঈর্ষা (পরশ্রীকারতা) হচ্ছে কায় কিংবা বাক্য দ্বারা অপ্রহাণীয় কিন্তু প্রজ্ঞা দ্বারা দর্শনের মাধ্যমে প্রহাণযোগ্য ধর্ম। ভিক্ষুগণ, পাপ-ঈর্ষা কীরূপ? যেমন, গৃহপতি বা গৃহপতি পুত্রের ধন-ধান্য, স্বর্ণ-রৌপ্য বৃদ্ধি পেলে তথায় কোনো কোনো দাস বা অনাহারীর এরূপ চিন্তার উদ্রেক হয় যে ‘অহো, গৃহপতি বা গৃহপতিপুত্রের যাতে ধন-ধান্য, স্বর্ণ-রৌপ্য বৃদ্ধি না হয়।’ আবার, কোনো কোনো শ্রমণ-ব্রাহ্মণ চীবর, পিণ্ডপাত, শয্যাসন, ওষুধ প্রত্যয় ও প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি যথেচ্ছা লাভ করলে অন্যান্য শ্রমণ-ব্রাহ্মণদের এরূপ চিন্তার উদ্রেক হয় যে ‘অহো, এরা চীবর, পিণ্ডপাত, শয্যাসন, ওষুধ প্রত্যয় ও প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি যথেচ্ছা লাভ না করুক।’ ভিক্ষুগণ, একেই পাপ-ঈর্ষা বলে।
পুনশ্চ, ভিক্ষুগণ, পাপ ইচ্ছা বা আকাঙক্ষা হচ্ছে কায় কিংবা বাক্য দ্বারা অপ্রহাণীয় কিন্তু প্রজ্ঞা দ্বারা দর্শনের মাধ্যমে প্রহাণযোগ্য ধর্ম। ভিক্ষুগণ, পাপ ইচ্ছা কীরূপ? যেমন, জগতে কোনো কোনো বীতশ্রদ্ধ ভিক্ষু এরূপ ইচ্ছা বা আকাঙক্ষা পোষণ করে যে ‘আমাকে সকলে শ্রদ্ধাবান বলে জানুক’; কোনো কোনো দুঃশীল ভিক্ষু এরূপ ইচ্ছা বা আকাঙক্ষা পোষণ করে যে ‘আমাকে সকলে শীলবান বলে জানুক’; কোনো কোনো অল্পশ্রুত ভিক্ষু এরূপ ইচ্ছা বা আকাঙক্ষা পোষণ করে যে ‘আমাকে সকলে বহুশ্রুত বলে জানুক’; কোনো কোনো  সংঘপ্রিয় ভিক্ষু এরূপ ইচ্ছা বা আকাঙক্ষা পোষণ করে যে ‘আমাকে সকলে প্রবিবেকসম্পন্ন (নির্জনবিহারী) বলে জানুক’; কোনো কোনো হীনবীর্য ভিক্ষু এরূপ ইচ্ছা বা আকাঙক্ষা পোষণ করে যে ‘আমাকে সকলে আরব্ধবীর্যবান বলে জানুক’; কোনো কোনো (ধর্ম-বিনয়ে) অমনোযোগী ভিক্ষু এরূপ ইচ্ছা বা আকাঙক্ষা পোষণ করে যে ‘আমাকে সকলে মনোযোগী বলে জানুক’; কোনো কোনো অসমাহিত চিত্তসম্পন্ন ভিক্ষু এরূপ ইচ্ছা বা আকাঙক্ষা পোষণ করে যে ‘আমাকে সকলে সমাহিত চিত্তসম্পন্ন বলে জানুক’; কোনো কোনো দুষপ্রাজ্ঞ ভিক্ষু এরূপ ইচ্ছা বা আকাঙক্ষা পোষণ করে যে ‘আমাকে সকলে প্রজ্ঞাবান বলে জানুক’; কোনো কোনো আসবযুক্ত বা আসক্তিপরায়ণ ভিক্ষু এরূপ ইচ্ছা বা আকাঙক্ষা করে যে ‘আমাকে সকলে (বিষয় আশয়ে) অনাসব বা আসবমুক্ত বলে জানুক।’ ভিক্ষুগণ, ইহাকে পাপ ইচ্ছা বলে। ভিক্ষুগণ, এগুলো হচ্ছে কায় কিংবা বাক্য দ্বারা অপ্রহাণীয় কিন্তু প্রজ্ঞা দ্বারা দর্শনের মাধ্যমে প্রহাণীয় ধর্ম।
৫। যদি ভিক্ষুগণ, সেই ভিক্ষুকে লোভ বিহ্বল (অভিভূত) করে বিচলিত করে; দ্বেষ, মোহ, ক্রোধ, উপনাহ বিহ্বল (অভিভূত) করে বিচলিত করে; ম্রক্ষ, পলাস, মাৎসর্য, পাপ-ঈর্ষা ও পাপ-আকাঙক্ষায় বিহ্বল (অভিভূত) করে বিচলিত করে; তবে তার এরূপ জ্ঞাত হওয়া উচিত যে ‘এই আয়ুষ্মান তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন না, যা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত থাকলে লোভ উৎপন্ন হয় না। সেহেতু আয়ুষ্মানকে লোভ অভিভূত করে বিচলিত করে।’ তার এরূপ জ্ঞাত থাকা উচিত যে ‘এই আয়ুষ্মান তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন না, যা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত থাকলে দ্বেষ উৎপন্ন হয় না। সেহেতু আয়ুষ্মানকে দ্বেষ অভিভূত করে বিচলিত করে।’
পুনশ্চ, তার এরূপ জ্ঞাত থাকা উচিত যে ‘এই আয়ুষ্মান তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন না, যা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত থাকলে মোহ উৎপন্ন হয় না। সেহেতু আয়ুষ্মানকে মোহ অভিভূত করে বিচলিত করে।’
পুনশ্চ, তার এরূপ জ্ঞাত থাকা উচিত যে ‘এই আয়ুষ্মান তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন না, যা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত থাকলে ক্রোধ উৎপন্ন হয় না। সেহেতু আয়ুষ্মানকে ক্রোধ অভিভূত করে বিচলিত করে।’
পুনশ্চ, তার এরূপ জ্ঞাত থাকা উচিত যে ‘এই আয়ুষ্মান তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন না, যা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত থাকলে উপনাহ উৎপন্ন হয় না। সেহেতু আয়ুষ্মানকে উপনাহ অভিভূত করে বিচলিত করে।’
পুনশ্চ, তার এরূপ জ্ঞাত থাকা উচিত যে ‘এই আয়ুষ্মান তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন না, যা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত থাকলে ম্রক্ষ উৎপন্ন হয় না। সেহেতু আয়ুষ্মানকে ম্রক্ষ অভিভূত করে বিচলিত করে।’
পুনশ্চ, তার এরূপ জ্ঞাত থাকা উচিত যে ‘এই আয়ুষ্মান তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন না, যা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত থাকলে পলাস উৎপন্ন হয় না। সেহেতু আয়ুষ্মানকে পলাস অভিভূত করে বিচলিত করে।’
পুনশ্চ, তার এরূপ জ্ঞাত থাকা উচিত যে ‘এই আয়ুষ্মান তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন না, যা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত থাকলে মাৎসর্য উৎপন্ন হয় না। সেহেতু আয়ুষ্মানকে মাৎসর্য অভিভূত করে বিচলিত করে।’
পুনশ্চ, তার এরূপ জ্ঞাত থাকা উচিত যে ‘এই আয়ুষ্মান তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন না, যা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত থাকলে পাপ-ঈর্ষা উৎপন্ন হয় না। সেহেতু আয়ুষ্মানকে পাপ-ঈর্ষা অভিভূত করে বিচলিত করে।’
পুনশ্চ, তার এরূপ জ্ঞাত থাকা উচিত যে ‘এই আয়ুষ্মান তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন না, যা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত থাকলে পাপ-আকাঙক্ষা উৎপন্ন হয় না। সেহেতু আয়ুষ্মানকে পাপ-আকাঙক্ষা অভিভূত করে বিচলিত করে।’
৬। যদি ভিক্ষুগণ, সেই ভিক্ষুকে লোভ বিহ্বল না করে বিচলিত না করে; দ্বেষ, মোহ, ক্রোধ, উপনাহ বিহ্বল না করে বিচলিত না করে; ম্রক্ষ, পলাস, মাৎসর্য, পাপ-ঈর্ষা ও পাপ-আকাঙক্ষায় বিহ্বল না করে ও বিচলিত না করে; তবে তার এরূপ জ্ঞাত হওয়া উচিত যে ‘এই আয়ুষ্মান তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন, যা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত থাকলে লোভ উৎপন্ন হয় না। সেহেতু আয়ুষ্মানকে লোভ অভিভূত করে না এবং বিচলিত করে না।’ তার এরূপ জ্ঞাত থাকা উচিত যে ‘এই আয়ুষ্মান তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন, যা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত থাকলে দ্বেষ উৎপন্ন হয় না। সেহেতু আয়ুষ্মানকে দ্বেষ অভিভূত করে না এবং বিচলিতও করে না।’
পুনশ্চ, তার এরূপ জ্ঞাত থাকা উচিত যে ‘এই আয়ুষ্মান তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন, যা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত থাকলে মোহ উৎপন্ন হয় না। সেহেতু আয়ুষ্মানকে মোহ অভিভূত করে না এবং বিচলিতও করে না।’
পুনশ্চ, তার এরূপ জ্ঞাত থাকা উচিত যে ‘এই আয়ুষ্মান তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন, যা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত থাকলে ক্রোধ উৎপন্ন হয় না। সেহেতু আয়ুষ্মানকে ক্রোধ অভিভূত করে না এবং বিচলিতও করে না।’
পুনশ্চ, তার এরূপ জ্ঞাত থাকা উচিত যে ‘এই আয়ুষ্মান তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন, যা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত থাকলে উপনাহ উৎপন্ন হয় না। সেহেতু আয়ুষ্মানকে উপনাহ অভিভূত করে না এবং বিচলিতও করে না।’
পুনশ্চ, তার এরূপ জ্ঞাত থাকা উচিত যে ‘এই আয়ুষ্মান তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন, যা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত থাকলে ম্রক্ষ উৎপন্ন হয় না। সেহেতু আয়ুষ্মানকে ম্রক্ষ অভিভূত করে না এবং বিচলিতও করে না।’
পুনশ্চ, তার এরূপ জ্ঞাত থাকা উচিত যে ‘এই আয়ুষ্মান তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন, যা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত থাকলে পলাস উৎপন্ন হয় না। সেহেতু আয়ুষ্মানকে পলাস অভিভূত করে না এবং বিচলিত করে না।’
পুনশ্চ, তার এরূপ জ্ঞাত থাকা উচিত যে ‘এই আয়ুষ্মান তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন, যা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত থাকলে মাৎসর্য উৎপন্ন হয় না। সেহেতু আয়ুষ্মানকে মাৎসর্য অভিভূত করে না এবং বিচলিত করে না।’
পুনশ্চ, তার এরূপ জ্ঞাত থাকা উচিত যে ‘এই আয়ুষ্মান তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন, যা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত থাকলে পাপ-ঈর্ষা উৎপন্ন হয় না। সেহেতু আয়ুষ্মানকে পাপ-ঈর্ষা অভিভূত করে না এবং বিচলিত করে না।’
পুনশ্চ, তার এরূপ জ্ঞাত থাকা উচিত যে ‘এই আয়ুষ্মান তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন, যা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত থাকলে পাপ-আকাঙক্ষা উৎপন্ন হয় না। সেহেতু আয়ুষ্মানকে পাপ-আকাঙক্ষা অভিভূত করে না এবং বিচলিতও করে না।”