উপনিশ্রয়-প্রত্যয়
উপনিশ্রয় প্রত্যয় তিন প্রকার, যথা- আলম্বনোপনিশ্রয়, অনন্তরোপনিশ্রয় ও প্রকৃতি উপনিশ্রয়। তন্মধ্যে আলম্বনোপনিশ্রয় আলম্বনাধিপতি সদৃশ এবং অনন্তরোপনিশ্রয় অনন্তর প্রত্যয় সদৃশ।
প্রকৃতি-উপনিশ্রয় কিরূপ? অতীত, অনাগত, বর্তমান, আধ্যাত্ম ও বাহ্যভূত চিত্ত চৈতসিক ধর্ম, রূপ, নির্বাণ ও প্রজ্ঞপ্তি সমস্তই বর্তমানকালীয় সর্ববিধ চিত্ত চৈতসিক ধর্মের যথোপযুক্ত ভাবে প্রকৃতি উপনিশ্রয় প্রত্যয় হয়।
তথায় বুদ্ধ, ধর্ম ও আর্যশ্রাবকগণ যাঁরা বহুকাল অতীতে পরিনির্বাপিত হয়েছেন, তাঁরা গুরুশিষ্য পরম্পরা আমাদের মতো পরবর্তী প্রজন্মের কুশল উৎপত্তির জন্য প্রকৃতি-উপনিশ্রয় প্রত্যয় হয়। তদ্রুপ পৃথিবীতে অতীতে কালগত হয়েছেন এমন মাতাপিতা, আচার্য, পণ্ডিত শ্রমণ-ব্রাহ্মণ, বিখ্যাত অন্যতীর্থিয় আচার্যগণ, মহাপ্রতাপশালী মহানুভব প্রাচীন রাজাগণ, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কুশল, অকুশল ও সুখণ্ডদুঃখ উৎপত্তির জন্য প্রকৃতি-উপনিশ্রয় প্রত্যয় হয়। তাঁরা পরবর্তী প্রজন্মের কল্যাণের জন্য বহুবিধ সদ্ধর্ম প্রজ্ঞপ্তি, অসদ্ধর্ম প্রজ্ঞপ্তি অথবা নানাবিধ লোকহিতমূলক কাজ পূর্বে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরবর্তী প্রজন্ম তাদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত দান-শীল-ভাবনাদি কুশল কর্ম, লোকাচার, কুলাচার, গোত্রাচার, নানা মতবাদ, নানা কর্মায়তন, শিল্পায়তন, বিদ্যায়, যথাপ্রতিষ্ঠিত গ্রাম, নিগম, ক্ষেত্রভূমি, দীঘি, পুষ্করিণী, বিশাল বিশাল বনভূমি, গৃহ, রথ, শকট, নৌকা, স্বর্ণ, রৌপ্য, মণি, মুক্তা প্রভৃতির উত্তরাধিকারী হয়ে পৃথিবীতে সেগুলোর শ্রীবৃদ্ধি সাধন করে থাকে। অনাগতে মৈত্রেয় (আর্যমিত্র) বুদ্ধ, তাঁর প্রবর্তিত ধর্ম এবং তৎপ্রতিষ্ঠিত সংঘও অনুরূপভাবে বহু মানুষের পুণ্য পারমী উৎপত্তির জন্য প্রকৃতি-উপনিশ্রয় প্রত্যয় হয়। তদ্রুপ এই জন্মের পরবর্তীকালে প্রাপ্তব্য আধিপত্য, প্রভূত বিত্ত-বৈভব সম্পত্তি পূর্ববর্তী বহু মানুষের নানা কর্মানুষ্ঠানের প্রকৃতি-উপনিশ্রয় প্রত্যয় হয়। অনাগত জন্মে উপভোগ্য ভবসম্পত্তি, ভোগসম্পত্তি, মার্গফল, নির্বাণ সম্পত্তি প্রভৃতি পুণ্যকর্মের প্রকৃতি-উপনিশ্রয় প্রত্যয় হয়। যেমন, মানুষেরা হেমন্তকালে ধান্যফল লাভ করব এই আশায় বর্ষাকালে ক্ষেত্রকর্ষণ, শষ্যবপন প্রভৃতি কর্ম শুরু করে দেয় অথবা কর্ম সাফল্যমণ্ডিত হলে প্রভূত ধন-সম্পত্তি লাভ করব এই আশায় আগে থেকেই সুকৌশলে কর্মপ্রয়াস শুরু করে দেয়। তথায় ধান্যফল লাভ ও ধন-সম্পত্তি লাভ সেই সেই কর্ম প্রচেষ্টার অনাগত প্রকৃতি-উপনিশ্রয় প্রত্যয় এবং সেই সেই কর্ম প্রচেষ্টা ধান্যফল লাভের ও ধন-সম্পত্তি লাভের অতীত প্রকৃতি-উপনিশ্রয় প্রত্যয়। অনুরূপভাবে নানাবিধ কর্মের ভাবী সুফল দেখতে পাওয়ায় ও আকাঙ্খা করায় বহু মানুষ বর্তমানে নানাবিধ পুণ্যকর্ম সম্পাদন করে। তথায় পুণ্যফল হচ্ছে পুণ্যকর্মের অনাগত প্রকৃতি-উপনিশ্রয় প্রত্যয়। আর পুণ্যকর্ম হচ্ছে পুণ্যফলের অতীত প্রকৃতি-উপনিশ্রয় প্রত্যয়। অতএব অনাগত প্রকৃতি-উপনিশ্রয় প্রত্যয়ও অতীত প্রকৃতি-উপনিশ্রয় প্রত্যয়ের ন্যায় অত্যন্ত মহৎ প্রত্যয়।
বর্তমানকালের বুদ্ধগণ, দেব-মনুষ্য-ব্রহ্মাগণ ও মাতাপিতাগণ তাঁদের বর্তমান কালের জীবিত পুত্র- কন্যাদিগের বর্তমান প্রকৃতি-উপনিশ্রয় প্রত্যয় হয়। ইহাই সুবিদিতই।
বুদ্ধাদি জীবিত সত্ত্বগণের উৎপন্ন প্রত্যয় ধর্মই হচ্ছে আধ্যাত্মভূত প্রকৃতি-উপনিশ্রয় ধর্ম। আর বাহ্যভূত প্রকৃতি-উপনিশ্রয় প্রত্যয় হচ্ছে সত্ত্বগণের প্রতিষ্ঠাস্বরূপ পৃথিবী, পর্বত, নদী, সমুদ্র প্রভৃতি এবং সেই সেই সত্ত্বগণের বহু উপকারী অরণ্য, বন, বৃক্ষ, তৃণ, লতাপাতা, পূর্বাহ্ন, অপরাহ্ন, চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র, জল, অগ্নি, বাতাস, শীত, উষ্ণা প্রভৃতি। উক্ত সমস্ত কিছুই সত্ত্বগণের কুশল, অকুশল ও সুখণ্ডদুঃখ উৎপত্তির বলবান প্রত্যয় হয়।
এই সমস্ত মানুষ যদি ‘‘দৃষ্টধর্মে তথা ইহ জীবনেই পরিনির্বাণ লাভ করব’’ এই ভেবে সপ্তত্রিংশ বোধিপক্ষীয় ধর্ম ভাবিত করে অথবা অনাগত বুদ্ধের সময়ে পরিনির্বাণ লাভ করব এই ভেবে পারমী সম্ভার পূরণ করে, তখন নির্বাণই তাদের সেই ধর্মসমূহের উৎপত্তির জন্য বলবান প্রত্যয় হয়।
পৃথিবীতে নানাবিধ ব্যবহারিক ক্ষেত্রের নাম-প্রজ্ঞপ্তি এবং বুদ্ধশাসনে ত্রিপিটক পরিয়ত্তি ধর্মের অন্তর্গত নাম-প্রজ্ঞপ্তিও সেই সমস্ত অর্থ জানার জন্য বলবান প্রত্যয় হয়।
তথায় ‘সংস্কৃত-ধর্ম’ অর্থে যেই ধর্ম প্রত্যয় বিদ্যমান থাকলে উৎপন্ন হয় আর বিদ্যমান না থাকলে উৎপন্ন হয় না। উৎপন্ন হওয়ার পরও প্রত্যয় বিদ্যমান থাকলে টিকে থাকতে পারে আর প্রত্যয় বিদ্যমান না থাকলে টিকে থাকতে পারে না। তাই সেই সমস্ত সংস্কৃত ধর্মের উৎপত্তি বা সি'তির জন্য প্রত্যয় আবশ্যক। নির্বাণ ও প্রজ্ঞপ্তি কিন্তু অসংস্কৃত ধর্ম, যার জন্মও নেই, উৎপত্তিও নেই, ধ্বংসও নেই এবং যা যা নিত্য, ধ্রুব, শাশ্বত। তাই সেই অসংস্কৃত ধর্মের উৎপত্তি বা সি'তির জন্য প্রত্যয় প্রয়োজন হয় না।
কুশল কুশলের উপনিশ্রয়। শ্রদ্ধার উপনিশ্রয়ে দান দেয়, শীল গ্রহণ করে প্রভৃতি সুবিদিত। তদ্রুপ রাগ তথা লোভের উপনিশ্রয়ে প্রাণী হত্যা করা হয়, চুরি করা হয় প্রভৃতি; উপযুক্ত ঋতু ও ভোজনের উপনিশ্রয়ে কায়িক সুখানুভব হয় প্রভৃতি এবং অকুশল অকুশলের ও অব্যাকৃত অব্যাকৃতের উপনিশ্রয় হ। ইহাও সুবিদিত।
তবে কুশল অকুশললেরও বলবান উপনিশ্রয় হয়। যেমন দান করার পর সেই দানের দ্বারা আত্মপ্রশংসা করে এবং পরকে অবজ্ঞা করে, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। তদ্রুপ শীল পালন করে, সমাধি উৎপন্ন করে এবং প্রজ্ঞাবান হয়েও আত্মপ্রশংসা করে এবং পরকে অবজ্ঞা, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে।
কুশল অব্যাকৃতেরও বলবান উপনিশ্রয় হয়। যেমন চারি ভূমির সমস্ত কুশল কর্ম বা তদন্তর্গত অন্যান্য কুশলসমূহ কালান্তরে চারি ভূমির বিপাক হয়ে অব্যাকৃতের বলবান উপনিশ্রয় হয়। দানপারমী পূরণ করার সময় মানুষ বহু কায়িক দুঃখ ভোগ করে। তদ্রুপ শীলপারমী, নৈষ্ক্রম্য পারমী, প্রজ্ঞা পারমী, বীর্যপারমী, ড়্গান্তি পারমী, সত্য পারমী, অধিষ্ঠান পারমী, মৈত্রী পারমী, উপেড়্গা পারমী পূরণ করার সময়ও মানুষ বহু কায়িক দুঃখ ভোগ করে। ধ্যান-ভাবনা, মার্গ-ভাবনা প্রভৃতি সম্বন্ধেও তদ্রুপ।
আবার অকুশলও কুশলের বলবান উপনিশ্রয় হয়। কেহ কেহ পাপ করার পর পরবর্তীতে উৎকণ্ঠিত হয়ে সেই পাপকে ক্ষয় করার জন্য দান, শীল, ধ্যান, মার্গ প্রভৃতি কুশল কর্ম সম্পাদন করে। সেই পাপই তাদের সেই কুশল কর্মের বলবান উপনিশ্রয় হয়।
অকুশল অব্যাকৃতেরও বলবান উপনিশ্রয় হয়। বহু মানুষ আছে যারা নানা দুষ্কর্ম করে চারি অপায়ে পতিত হয়ে অপায় দুঃখ ভোগ করতেছে। এমনকি ইহ জীবনেই কেহ কেহ নিজের বা পরের দুষ্কর্মের কারণে বহু দুঃখ ভোগ করতেছে। কেহ কেহ দুষ্কর্মের দরুণ প্রভূত বিত্তসম্পত্তি লাভ করে সুখ ভোগ করতেছে। বহু মানুষ রাগ বা লোভমূলক বহু দুঃখ ভোগ করতেছে। তদ্রুপ দ্বেষমূলক, দৃষ্টিমূলক, মানমূলক বহু দুঃখ ভোগ করতেছে।
আবার অব্যাকৃতও কুশলের বলবান উপনিশ্রয় হয়। ধন-সম্পত্তি প্রাপ্তির জন্য দান দেয়, শীল পরিপূর্ণ করে, প্রজ্ঞা পরিপূরণ করে, ভাবনার উপযোগী আবাস, লেন, গুহা, বৃক্ষ, অরণ্য, পর্বত বা ভিড়্গাচর্যার গ্রাম, উপযুক্ত ঋতু, উপযুক্ত আহার লাভ করে সেই সেই ভাবনা অনুশীলন করে থাকে।
অব্যাকৃত অকুশলেরও বলবান উপনিশ্রয় হয়। মানুষ পৃথিবীতে চক্ষু সম্পদের আশ্রয়ে বহু দর্শনমূলক অকুশল উৎপন্ন করে থাকে। শ্রোত্র সম্পদ (কর্ণ), ঘ্রাণ সম্পদ (নাক), জিহ্বা সম্পদ, কায় সম্পদ প্রভৃতি সম্বন্ধেও অনুরূপ। তদ্রুপ হস্ত সম্পদ। পাদসম্পদ, শস্ত্রসম্পদ, তলোয়ার সম্পদ প্রভৃতি সম্বন্ধেও বলা যেতে পারে। এভাবেই উপনিশ্রয় প্রত্যয় ত্রিবিধ হয়।
এখন সূত্রোক্ত উপনিশ্রয়ের কথা বলা হচ্ছে। কল্যাণমিত্রের উপনিশ্রয়ে পাপমিত্রের উপনিশ্রয়ে, গ্রামের উপনিশ্রয়ে, অরণ্যের উপনিশ্রয়ে প্রভৃতি বহুভাবেই ইহা আলোচিত। অপরদিকে কর্ম, চিত্ত, ঋতু, বীজ ও ধর্মনিয়ম এই পঞ্চনিয়ম ধর্ম সত্ত্বলোক, সংস্কার লোক, অবকাশ লোক নামক তিন লোকের অবিচ্ছিন্নভাবে প্রবাহিত হওয়ার বলবান প্রত্যয় হয়। ইহার বিসত্মারিত অর্থ নিয়ম দীপনীতে আলোচিত হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কি অর্থে ‘আলম্বনোপনিশ্রয়’ বলা হয়? অধিপতিভূত আলম্বনই আলম্বন-স্বভাব সম্পন্ন ধর্মসমূহের বলবান নিশ্রয় বা আশ্রয় হয় এই অর্থে ‘আলম্বনোপনিশ্রয়’।
কি অর্থে ‘অনন্তরোপনিশ্রয়’ বলা হয়? পূর্ববর্তী অনন্তর চিত্তই পরবর্তী অনন্তর চিত্ত উৎপত্তির জন্য বলবান নিশ্রয় বা আশ্রয় হয় এই অর্থে ‘অনন্তরোপনিশ্রয়’। এক্ষেত্রে পূর্বচিত্ত হচ্ছে মাতা সদৃশ আর পরচিত্ত হচ্ছে পুত্র সদৃশ। মাতা যেমন নিজের অনন্তরে পুত্রের উৎপত্তির জন্য বলবান উপনিশ্রয় হয়, তদ্রুপ পূর্বচিত্তই পরচিত্ত উৎপত্তির জন্য বলবান উপনিশ্রয় হয়।
কি অর্থে ‘প্রকৃতি-উপনিশ্রয়’ বলা হয়? পণ্ডিতগণের দ্বারা পৃথিবীতে স্বাভাবিক নিয়মে প্রকটিত উপনিশ্রয়ই হচ্ছে ‘প্রকৃতি-উপনিশ্রয়’। এক্ষেত্রে স্মর্তব্য এই যে, অনন্তরোপনিশ্রয়ের প্রভাব শুধু অনন্তর চিত্তেই প্রসারিত হয়। আর প্রকৃতি-উপনিশ্রয়ের প্রভাব কিন্তু অনেক দূর পর্যন্ত প্রসারিত হয়। যেমন এই জন্মে বিগত কোন দিনে বা মাসে অথবা বৎসরে দেখা, শোনা, ঘ্রাণ নেওয়া, আস্বাদন করা, স্পর্শ করা বা জ্ঞান হওয়া কোন বিষয় পরবর্তী সময়ে উপযুক্ত প্রত্যয় লাভে শতবর্ষ পরেও মনোদ্বারে উপস্থিত হয়। তার অর্থ হচ্ছে এই, পূর্বে দৃষ্ট, শ্রুত বিষয়াদিই সত্ত্বগণ অনুস্মরণ করছে। ঔপাপাতিক সত্ত্বগণ কিন্তু আগের জন্মও স্মরণ করতে পারে। তদ্রুপ মানুষের মধ্যেও কিছু সংখ্যক জাতিস্মর জ্ঞানলাভী আছেন যারা পূর্বজন্ম অনুস্মরণ করতে পারেন। তদ্রুপ অতীতে দৃষ্ট, শ্রুত প্রভৃতি অনেক শতসহস্র বিষয়াদির মধ্যে পরবর্তী সময়ে মাত্র একক্ষণে কোন একটি বিষয় দেখলে বা শুনলে মুহুর্তের মধ্যেই বহু মনোবিজ্ঞান (চিত্ত) দ্রুত প্রসারিত হয়ে উৎপন্ন হয়ে থাকে।
অভিধর্মার্থ কথা
উপনিশ্রয় প্রত্যয় তিন প্রকার, যথা- আলম্বনোপনিশ্রয়, অনন্তরোপনিশ্রয় ও প্রকৃতি উপনিশ্রয়। তন্মধ্যে আলম্বনোপনিশ্রয় আলম্বনাধিপতি সদৃশ এবং অনন্তরোপনিশ্রয় অনন্তর প্রত্যয় সদৃশ।
প্রকৃতি-উপনিশ্রয় কিরূপ? অতীত, অনাগত, বর্তমান, আধ্যাত্ম ও বাহ্যভূত চিত্ত চৈতসিক ধর্ম, রূপ, নির্বাণ ও প্রজ্ঞপ্তি সমস্তই বর্তমানকালীয় সর্ববিধ চিত্ত চৈতসিক ধর্মের যথোপযুক্ত ভাবে প্রকৃতি উপনিশ্রয় প্রত্যয় হয়।
তথায় বুদ্ধ, ধর্ম ও আর্যশ্রাবকগণ যাঁরা বহুকাল অতীতে পরিনির্বাপিত হয়েছেন, তাঁরা গুরুশিষ্য পরম্পরা আমাদের মতো পরবর্তী প্রজন্মের কুশল উৎপত্তির জন্য প্রকৃতি-উপনিশ্রয় প্রত্যয় হয়। তদ্রুপ পৃথিবীতে অতীতে কালগত হয়েছেন এমন মাতাপিতা, আচার্য, পণ্ডিত শ্রমণ-ব্রাহ্মণ, বিখ্যাত অন্যতীর্থিয় আচার্যগণ, মহাপ্রতাপশালী মহানুভব প্রাচীন রাজাগণ, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কুশল, অকুশল ও সুখণ্ডদুঃখ উৎপত্তির জন্য প্রকৃতি-উপনিশ্রয় প্রত্যয় হয়। তাঁরা পরবর্তী প্রজন্মের কল্যাণের জন্য বহুবিধ সদ্ধর্ম প্রজ্ঞপ্তি, অসদ্ধর্ম প্রজ্ঞপ্তি অথবা নানাবিধ লোকহিতমূলক কাজ পূর্বে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরবর্তী প্রজন্ম তাদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত দান-শীল-ভাবনাদি কুশল কর্ম, লোকাচার, কুলাচার, গোত্রাচার, নানা মতবাদ, নানা কর্মায়তন, শিল্পায়তন, বিদ্যায়, যথাপ্রতিষ্ঠিত গ্রাম, নিগম, ক্ষেত্রভূমি, দীঘি, পুষ্করিণী, বিশাল বিশাল বনভূমি, গৃহ, রথ, শকট, নৌকা, স্বর্ণ, রৌপ্য, মণি, মুক্তা প্রভৃতির উত্তরাধিকারী হয়ে পৃথিবীতে সেগুলোর শ্রীবৃদ্ধি সাধন করে থাকে। অনাগতে মৈত্রেয় (আর্যমিত্র) বুদ্ধ, তাঁর প্রবর্তিত ধর্ম এবং তৎপ্রতিষ্ঠিত সংঘও অনুরূপভাবে বহু মানুষের পুণ্য পারমী উৎপত্তির জন্য প্রকৃতি-উপনিশ্রয় প্রত্যয় হয়। তদ্রুপ এই জন্মের পরবর্তীকালে প্রাপ্তব্য আধিপত্য, প্রভূত বিত্ত-বৈভব সম্পত্তি পূর্ববর্তী বহু মানুষের নানা কর্মানুষ্ঠানের প্রকৃতি-উপনিশ্রয় প্রত্যয় হয়। অনাগত জন্মে উপভোগ্য ভবসম্পত্তি, ভোগসম্পত্তি, মার্গফল, নির্বাণ সম্পত্তি প্রভৃতি পুণ্যকর্মের প্রকৃতি-উপনিশ্রয় প্রত্যয় হয়। যেমন, মানুষেরা হেমন্তকালে ধান্যফল লাভ করব এই আশায় বর্ষাকালে ক্ষেত্রকর্ষণ, শষ্যবপন প্রভৃতি কর্ম শুরু করে দেয় অথবা কর্ম সাফল্যমণ্ডিত হলে প্রভূত ধন-সম্পত্তি লাভ করব এই আশায় আগে থেকেই সুকৌশলে কর্মপ্রয়াস শুরু করে দেয়। তথায় ধান্যফল লাভ ও ধন-সম্পত্তি লাভ সেই সেই কর্ম প্রচেষ্টার অনাগত প্রকৃতি-উপনিশ্রয় প্রত্যয় এবং সেই সেই কর্ম প্রচেষ্টা ধান্যফল লাভের ও ধন-সম্পত্তি লাভের অতীত প্রকৃতি-উপনিশ্রয় প্রত্যয়। অনুরূপভাবে নানাবিধ কর্মের ভাবী সুফল দেখতে পাওয়ায় ও আকাঙ্খা করায় বহু মানুষ বর্তমানে নানাবিধ পুণ্যকর্ম সম্পাদন করে। তথায় পুণ্যফল হচ্ছে পুণ্যকর্মের অনাগত প্রকৃতি-উপনিশ্রয় প্রত্যয়। আর পুণ্যকর্ম হচ্ছে পুণ্যফলের অতীত প্রকৃতি-উপনিশ্রয় প্রত্যয়। অতএব অনাগত প্রকৃতি-উপনিশ্রয় প্রত্যয়ও অতীত প্রকৃতি-উপনিশ্রয় প্রত্যয়ের ন্যায় অত্যন্ত মহৎ প্রত্যয়।
বর্তমানকালের বুদ্ধগণ, দেব-মনুষ্য-ব্রহ্মাগণ ও মাতাপিতাগণ তাঁদের বর্তমান কালের জীবিত পুত্র- কন্যাদিগের বর্তমান প্রকৃতি-উপনিশ্রয় প্রত্যয় হয়। ইহাই সুবিদিতই।
বুদ্ধাদি জীবিত সত্ত্বগণের উৎপন্ন প্রত্যয় ধর্মই হচ্ছে আধ্যাত্মভূত প্রকৃতি-উপনিশ্রয় ধর্ম। আর বাহ্যভূত প্রকৃতি-উপনিশ্রয় প্রত্যয় হচ্ছে সত্ত্বগণের প্রতিষ্ঠাস্বরূপ পৃথিবী, পর্বত, নদী, সমুদ্র প্রভৃতি এবং সেই সেই সত্ত্বগণের বহু উপকারী অরণ্য, বন, বৃক্ষ, তৃণ, লতাপাতা, পূর্বাহ্ন, অপরাহ্ন, চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র, জল, অগ্নি, বাতাস, শীত, উষ্ণা প্রভৃতি। উক্ত সমস্ত কিছুই সত্ত্বগণের কুশল, অকুশল ও সুখণ্ডদুঃখ উৎপত্তির বলবান প্রত্যয় হয়।
এই সমস্ত মানুষ যদি ‘‘দৃষ্টধর্মে তথা ইহ জীবনেই পরিনির্বাণ লাভ করব’’ এই ভেবে সপ্তত্রিংশ বোধিপক্ষীয় ধর্ম ভাবিত করে অথবা অনাগত বুদ্ধের সময়ে পরিনির্বাণ লাভ করব এই ভেবে পারমী সম্ভার পূরণ করে, তখন নির্বাণই তাদের সেই ধর্মসমূহের উৎপত্তির জন্য বলবান প্রত্যয় হয়।
পৃথিবীতে নানাবিধ ব্যবহারিক ক্ষেত্রের নাম-প্রজ্ঞপ্তি এবং বুদ্ধশাসনে ত্রিপিটক পরিয়ত্তি ধর্মের অন্তর্গত নাম-প্রজ্ঞপ্তিও সেই সমস্ত অর্থ জানার জন্য বলবান প্রত্যয় হয়।
তথায় ‘সংস্কৃত-ধর্ম’ অর্থে যেই ধর্ম প্রত্যয় বিদ্যমান থাকলে উৎপন্ন হয় আর বিদ্যমান না থাকলে উৎপন্ন হয় না। উৎপন্ন হওয়ার পরও প্রত্যয় বিদ্যমান থাকলে টিকে থাকতে পারে আর প্রত্যয় বিদ্যমান না থাকলে টিকে থাকতে পারে না। তাই সেই সমস্ত সংস্কৃত ধর্মের উৎপত্তি বা সি'তির জন্য প্রত্যয় আবশ্যক। নির্বাণ ও প্রজ্ঞপ্তি কিন্তু অসংস্কৃত ধর্ম, যার জন্মও নেই, উৎপত্তিও নেই, ধ্বংসও নেই এবং যা যা নিত্য, ধ্রুব, শাশ্বত। তাই সেই অসংস্কৃত ধর্মের উৎপত্তি বা সি'তির জন্য প্রত্যয় প্রয়োজন হয় না।
কুশল কুশলের উপনিশ্রয়। শ্রদ্ধার উপনিশ্রয়ে দান দেয়, শীল গ্রহণ করে প্রভৃতি সুবিদিত। তদ্রুপ রাগ তথা লোভের উপনিশ্রয়ে প্রাণী হত্যা করা হয়, চুরি করা হয় প্রভৃতি; উপযুক্ত ঋতু ও ভোজনের উপনিশ্রয়ে কায়িক সুখানুভব হয় প্রভৃতি এবং অকুশল অকুশলের ও অব্যাকৃত অব্যাকৃতের উপনিশ্রয় হ। ইহাও সুবিদিত।
তবে কুশল অকুশললেরও বলবান উপনিশ্রয় হয়। যেমন দান করার পর সেই দানের দ্বারা আত্মপ্রশংসা করে এবং পরকে অবজ্ঞা করে, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। তদ্রুপ শীল পালন করে, সমাধি উৎপন্ন করে এবং প্রজ্ঞাবান হয়েও আত্মপ্রশংসা করে এবং পরকে অবজ্ঞা, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে।
কুশল অব্যাকৃতেরও বলবান উপনিশ্রয় হয়। যেমন চারি ভূমির সমস্ত কুশল কর্ম বা তদন্তর্গত অন্যান্য কুশলসমূহ কালান্তরে চারি ভূমির বিপাক হয়ে অব্যাকৃতের বলবান উপনিশ্রয় হয়। দানপারমী পূরণ করার সময় মানুষ বহু কায়িক দুঃখ ভোগ করে। তদ্রুপ শীলপারমী, নৈষ্ক্রম্য পারমী, প্রজ্ঞা পারমী, বীর্যপারমী, ড়্গান্তি পারমী, সত্য পারমী, অধিষ্ঠান পারমী, মৈত্রী পারমী, উপেড়্গা পারমী পূরণ করার সময়ও মানুষ বহু কায়িক দুঃখ ভোগ করে। ধ্যান-ভাবনা, মার্গ-ভাবনা প্রভৃতি সম্বন্ধেও তদ্রুপ।
আবার অকুশলও কুশলের বলবান উপনিশ্রয় হয়। কেহ কেহ পাপ করার পর পরবর্তীতে উৎকণ্ঠিত হয়ে সেই পাপকে ক্ষয় করার জন্য দান, শীল, ধ্যান, মার্গ প্রভৃতি কুশল কর্ম সম্পাদন করে। সেই পাপই তাদের সেই কুশল কর্মের বলবান উপনিশ্রয় হয়।
অকুশল অব্যাকৃতেরও বলবান উপনিশ্রয় হয়। বহু মানুষ আছে যারা নানা দুষ্কর্ম করে চারি অপায়ে পতিত হয়ে অপায় দুঃখ ভোগ করতেছে। এমনকি ইহ জীবনেই কেহ কেহ নিজের বা পরের দুষ্কর্মের কারণে বহু দুঃখ ভোগ করতেছে। কেহ কেহ দুষ্কর্মের দরুণ প্রভূত বিত্তসম্পত্তি লাভ করে সুখ ভোগ করতেছে। বহু মানুষ রাগ বা লোভমূলক বহু দুঃখ ভোগ করতেছে। তদ্রুপ দ্বেষমূলক, দৃষ্টিমূলক, মানমূলক বহু দুঃখ ভোগ করতেছে।
আবার অব্যাকৃতও কুশলের বলবান উপনিশ্রয় হয়। ধন-সম্পত্তি প্রাপ্তির জন্য দান দেয়, শীল পরিপূর্ণ করে, প্রজ্ঞা পরিপূরণ করে, ভাবনার উপযোগী আবাস, লেন, গুহা, বৃক্ষ, অরণ্য, পর্বত বা ভিড়্গাচর্যার গ্রাম, উপযুক্ত ঋতু, উপযুক্ত আহার লাভ করে সেই সেই ভাবনা অনুশীলন করে থাকে।
অব্যাকৃত অকুশলেরও বলবান উপনিশ্রয় হয়। মানুষ পৃথিবীতে চক্ষু সম্পদের আশ্রয়ে বহু দর্শনমূলক অকুশল উৎপন্ন করে থাকে। শ্রোত্র সম্পদ (কর্ণ), ঘ্রাণ সম্পদ (নাক), জিহ্বা সম্পদ, কায় সম্পদ প্রভৃতি সম্বন্ধেও অনুরূপ। তদ্রুপ হস্ত সম্পদ। পাদসম্পদ, শস্ত্রসম্পদ, তলোয়ার সম্পদ প্রভৃতি সম্বন্ধেও বলা যেতে পারে। এভাবেই উপনিশ্রয় প্রত্যয় ত্রিবিধ হয়।
এখন সূত্রোক্ত উপনিশ্রয়ের কথা বলা হচ্ছে। কল্যাণমিত্রের উপনিশ্রয়ে পাপমিত্রের উপনিশ্রয়ে, গ্রামের উপনিশ্রয়ে, অরণ্যের উপনিশ্রয়ে প্রভৃতি বহুভাবেই ইহা আলোচিত। অপরদিকে কর্ম, চিত্ত, ঋতু, বীজ ও ধর্মনিয়ম এই পঞ্চনিয়ম ধর্ম সত্ত্বলোক, সংস্কার লোক, অবকাশ লোক নামক তিন লোকের অবিচ্ছিন্নভাবে প্রবাহিত হওয়ার বলবান প্রত্যয় হয়। ইহার বিসত্মারিত অর্থ নিয়ম দীপনীতে আলোচিত হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কি অর্থে ‘আলম্বনোপনিশ্রয়’ বলা হয়? অধিপতিভূত আলম্বনই আলম্বন-স্বভাব সম্পন্ন ধর্মসমূহের বলবান নিশ্রয় বা আশ্রয় হয় এই অর্থে ‘আলম্বনোপনিশ্রয়’।
কি অর্থে ‘অনন্তরোপনিশ্রয়’ বলা হয়? পূর্ববর্তী অনন্তর চিত্তই পরবর্তী অনন্তর চিত্ত উৎপত্তির জন্য বলবান নিশ্রয় বা আশ্রয় হয় এই অর্থে ‘অনন্তরোপনিশ্রয়’। এক্ষেত্রে পূর্বচিত্ত হচ্ছে মাতা সদৃশ আর পরচিত্ত হচ্ছে পুত্র সদৃশ। মাতা যেমন নিজের অনন্তরে পুত্রের উৎপত্তির জন্য বলবান উপনিশ্রয় হয়, তদ্রুপ পূর্বচিত্তই পরচিত্ত উৎপত্তির জন্য বলবান উপনিশ্রয় হয়।
কি অর্থে ‘প্রকৃতি-উপনিশ্রয়’ বলা হয়? পণ্ডিতগণের দ্বারা পৃথিবীতে স্বাভাবিক নিয়মে প্রকটিত উপনিশ্রয়ই হচ্ছে ‘প্রকৃতি-উপনিশ্রয়’। এক্ষেত্রে স্মর্তব্য এই যে, অনন্তরোপনিশ্রয়ের প্রভাব শুধু অনন্তর চিত্তেই প্রসারিত হয়। আর প্রকৃতি-উপনিশ্রয়ের প্রভাব কিন্তু অনেক দূর পর্যন্ত প্রসারিত হয়। যেমন এই জন্মে বিগত কোন দিনে বা মাসে অথবা বৎসরে দেখা, শোনা, ঘ্রাণ নেওয়া, আস্বাদন করা, স্পর্শ করা বা জ্ঞান হওয়া কোন বিষয় পরবর্তী সময়ে উপযুক্ত প্রত্যয় লাভে শতবর্ষ পরেও মনোদ্বারে উপস্থিত হয়। তার অর্থ হচ্ছে এই, পূর্বে দৃষ্ট, শ্রুত বিষয়াদিই সত্ত্বগণ অনুস্মরণ করছে। ঔপাপাতিক সত্ত্বগণ কিন্তু আগের জন্মও স্মরণ করতে পারে। তদ্রুপ মানুষের মধ্যেও কিছু সংখ্যক জাতিস্মর জ্ঞানলাভী আছেন যারা পূর্বজন্ম অনুস্মরণ করতে পারেন। তদ্রুপ অতীতে দৃষ্ট, শ্রুত প্রভৃতি অনেক শতসহস্র বিষয়াদির মধ্যে পরবর্তী সময়ে মাত্র একক্ষণে কোন একটি বিষয় দেখলে বা শুনলে মুহুর্তের মধ্যেই বহু মনোবিজ্ঞান (চিত্ত) দ্রুত প্রসারিত হয়ে উৎপন্ন হয়ে থাকে।
অভিধর্মার্থ কথা








