Followers

Friday, June 30, 2017

বুদ্ধের আদর্শ ও প্রিয় মানুষ

 বুদ্ধ জগতে অতি প্রিয় সাধনা করে নিজের পবিত্র জীবনের অনুসন্ধান খুঁজে পান। তাঁর চন্দ্রের আঁলোর মতো বিচ্ছুরিত জীবনময় সাধনা মানব জাতিকে দিয়েছে সুন্দরতম অধ্যায়। যে অধ্যায়ে প্রত্যেক মানবের চিন্তাকে সুমহান পথ দেখিয়েছে। বুদ্ধ তাঁর আদর্শ সহজ ভাবনায় উপলব্ধ করতে পারেনি। শরীরের অসহনীয় নিলিমায় কঠোর আচরণের দ্বারা লাভ করেছেন তাঁর বিশ্ব হিতকর সাধনার ফসল। শুধু তপস্যা আর তপস্যা। তিনি কখনো আদর্শ বলির কথা ভাবেনি। প্রাণের অন্ত পরিবেশন করতেও রাজি হয়ে পূর্ণ সাধনায় মন্থর হয়েছিলেন বিশ্বকল্যাণে। বুদ্ধের আদর্শ কোখনো মানব জাতিকে দুঃখদহন করতে পারে না। কারণ তাঁর অন্তর্সাধনা সম্পূর্ণ পবিত্র চেতনাভিত্তিক উপলব্ধিকে আনুকুল্য করে। বুদ্ধ তাঁর ভাবাদর্শকে বিশুদ্ধ পদ্ধতি অনুসরণ করে আত্মবিশুদ্ধির প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। তাই মানব জাতির জন্যে যা বাণী, উপদেশ প্রচারণা করেছেন সেগুলো সম্পূর্ণ আত্মবিশুদ্ধির হেতু। কোখনো আত্মদহনের কথা বলেননি। আত্মদহনের কথা বললেও শুধুমাত্র আদীনব, উপদ্রব, ও বিপদ সংকুলের উদ্দেশ্যে প্রস্তাবনা করেন। কিংবা সেই আত্মদহনের চেতনা থেকে বেড়িয়ে আসতে করুণাচ্ছলে আহ্বান জানিয়েছেন। কোখনো আত্মপাপে পীড়িত হওয়ার উদ্দেশ্যে,দহন হওয়ার উদ্দেশ্যে, ক্লিষ্ট হওয়ার জন্য উপদেশ প্রদান করেননি। তাই বুদ্ধ যেমনি ভাবাদর্শে বিশুদ্ধি পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন আমাদেরও উচিত সেই বিশুদ্ধি সাধনার মাঝে নিজের জীবনময় সাধনাকে উৎসর্গ দেওয়া।
 বুদ্ধের প্রধান চেতনা হলো " প্রাণ " কে ভালোবাসা বা দয়া করা। সেজন্য দুঃখ সাধনা থেকে প্রাণসত্ত্বাকে মুক্তি দেওয়াই প্রথম পর্যায়ের সাধনা। বুদ্ধ সর্বজ্ঞতা লাভ করার আগে Masterplan করেছেন জীবের আত্মমুক্তি ও আত্মবিশুদ্ধি সুখ কীভাবে অর্জন করা যায়। সেই মার্গপন্থাগুলোর নীতিমালা। মনস্তাত্ত্বিক গবেষণামূলে বৌদ্ধদর্শনের অবাকক্ষমতা বিদ্যমান আছে। মানবের মানসিক বেদনাশক্তি অন্ধকারে দহন করে করে কোন আত্মবিনোদন সুখ লাভ করা সম্ভব নয়। যা লাভ করা হয় তাও সাময়িক কারণ। কিন্তু পরিণাম ভয়াবহ। বৌদ্ধজ্ঞান বা বুদ্ধের অভিজ্ঞা সম্পূর্ণ প্রঁকৃতি সম্বন্ধ। প্রকৃতিকে তাল মিলিয়ে যে বাস্তব সম্মত সত্য দর্শনের জ্ঞান উপলব্ধ হয় তা বুদ্ধের সমীপন্থি। প্রত্যেক বোধশক্তিতে উচ্চাকাঙ্খা ও উচ্চতর সাধনার  সমাধি অর্জনের প্রয়োজনীয়তায় হলো বুদ্ধের একান্ত যোগ। বুদ্ধের মহৎ চেতনা বিশ্ব মানবের জন্য শস্যের ঔষধি সরূপ জনহিতকর কল্যাণ বর্ষিত হয়েছে। এর সময় ছিল প্রায় ২৫৬০ বুদ্ধবর্ষ আগে। তাঁর জন্মের শুরুতে ইতর প্রাণীদের প্রাণ এতই স্বচ্চ ও ভাস্বর হলো যে, নিজেদের আনন্দে  বেঁহুশে লাফাঁলাফি করতে থাকে। একের পর এক আনন্দের উচ্ছ্বাস হৃদয়ে ভেঁসে যেতে লাগল। হাতির রবে কাঁঠবিড়ালী সবুজ ঘেঁরা ঝোপ থেকে নাচতে শুরু করে দিল। আহা! কী চাকচিক্য আনন্দের কৌতুহল। বড়ই মধুর! বড়ই মধুর! অনুভব করতে লাগল ফুলের সুবাস চেয়ে হৃদয়ের প্রফুল্ল সুবাস কতই না উত্তম। ছুঁয়েও দেয় মন। এর মতো প্রাণের প্রশান্তি আর মনে হয় নেই। মানব জাতির নৃত্যমঞ্চ আয়োজনের মতো বসালো রমরমা রঙ্গাঙ্গন। কারণ জগৎ গুরুই আবির্ভাব হয়েছে ধরাধমে। আজ থেকে মানুষের শিক্ষা, চেতনা, বোধ, সমাজব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় দরদ ইত্যাদিই সুশাসনে বদলে যাবে। মানব জাতি পাবে অমৃত উপহার। পাবে প্রকৃত মানব মুক্তির শূণ্য আত্মা। জগৎ গুরু মানেই হলো এর সাথে অতুলনীয় সৃষ্টি মানব। তাঁর গুণ, কর্ম, ভাব, শিক্ষা, সাস্থ্য, চেতনার সাথে কোন মহৎ মানবীয় আত্মার তুলনাও নেই, সমানও নেই এবং উত্তমও নেই। ইনিই জগৎ গুরু। ইনিই সম্যক সম্ম্বুদ্ধ! ইনিই বুদ্ধ! বুদ্ধপ্রাপ্তি হয়ে সংঘপ্রতিষ্ঠা, ধর্ম প্রবর্তক করলেন।আবিস্কার করলেন আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ ও চতুরার্য সত্যদর্শন। সময় সন্ধিক্ষণে দিকে দিকে প্রচারনা ও প্রসারনা হয়ে উঠল পরম বৌদ্ধদর্শন। এই দর্শন  কঠিন হলেও আঁচড়ে আঁকড়ে ধরল মানব জাতির শাসন ব্যবস্থায়। বিশ্ব-ব্রম্মাণ্ড সত্ত্বকে নাঁড়া দিয়ে আকুল করল বৌদ্ধের পরম সত্য। দেব,  ব্রম্মাসহ, বিশ্ব প্রাণীসত্ত্বই মাতৃক বুদ্ধের একান্ত অনুগতে আসতে থাকে পরম্পরায় এঁকে এঁকে। তাই আমরাও এখন বুদ্ধের শরণাগত। সুতরাং বুদ্ধ আমাদের প্রিয় মানুষ।
        
                      লিখেছেন→ শ্রীমৎ বীতশোক ভিক্ষু।
                         সুবলং শাখা বন বিহার, জুরাছড়ি।

Wednesday, June 28, 2017

কায সুত্তং - কায় সূত্র

(গ) কায সুত্তং- কায় সূত্র
২৩.১। “হে ভিক্ষুগণ, কোনো কোনো (অকুশল) ধর্ম আছে যা কায় দ্বারা প্রহাণযোগ্য বাক্য দ্বারা নয়; কোনো কোনো ধর্ম আছে যা বাক্য দ্বারা প্রহাণীয় কায় দ্বারা নয়; কোনো কোনো ধর্ম আছে যা প্রজ্ঞা দ্বারা দর্শনেই প্রহাণতব্য কায় কিংবা বাক্য দ্বারা নয়।
২। ভিক্ষুগণ, কীরূপ ধর্ম আছে যা কায় দ্বারা প্রহাণযোগ্য বাক্য দ্বারা নয়?
ভিক্ষুগণ, এক্ষেত্রে ভিক্ষু কায়ের দ্বারা সামান্য মাত্রায় অকুশলগ্রস্ত হয়। তা বিজ্ঞ-সব্রহ্মচারীগণ জ্ঞাত হয়ে কায়িক অকুশলগ্রস্ত ভিক্ষুকে এরূপ বলেন, ‘হে আয়ুষ্মান, আপনি কায় দ্বারা সামান্য পরিমাণে অকুশলগ্রস্ত হয়েছেন। সেহেতু, আপনি উত্তমরূপে কায় দুশ্চরিত্র ত্যাগ করে কায় সুচরিত্র অনুশীলন করুন। সে বিজ্ঞ-সব্রহ্মচারীদের দ্বারা এরূপে উপদিষ্ট হয়ে কায় দুশ্চরিত্র ত্যাগ করে কায় সুচরিত্র অনুশীলন করে। ভিক্ষুগণ, 
সেহেতু ইহাকে বলা হয়-‘কায় দ্বারা প্রহাণযোগ্য, বাক্য দ্বারা নয়।’
৩। ভিক্ষুগণ, কীরূপ ধর্ম আছে যা বাক্য দ্বারা প্রহাণীয় কায় দ্বারা নয়?
ভিক্ষুগণ, এক্ষেত্রে ভিক্ষু বাক্য দ্বারা কিঞ্চিৎ মাত্রায় অকুশলগ্রস্ত হয়। তা বিজ্ঞ সব্রহ্মচারীরা জ্ঞাত হয়ে বাচনিক অকুশলগ্রস্ত ভিক্ষুকে এরূপ বলেন, ‘হে আয়ুষ্মান, আপনি বাক্য দ্বারা কিঞ্চিৎ মাত্রায় অকুশল প্রাপ্ত হয়েছেন। সেহেতু, আপনি উত্তমরূপে বাচনিক দুশ্চরিত্র ত্যাগ করে বাচনিক সুচরিত্র অনুশীলন করুন। সে বিজ্ঞ-সব্রহ্মচারীদের দ্বারা এরূপে উপদিষ্ট হয়ে বাচনিক দুশ্চরিত্র ত্যাগ করে বাচনিক সুচরিত্র অনুশীলন করে। ভিক্ষুগণ, সেহেতু ইহাকে বলা হয়-‘বাক্য দ্বারা প্রহাণযোগ্য কায় দ্বারা নয়।’
৪। ভিক্ষুগণ, কীরূপ ধর্ম আছে যা প্রজ্ঞা দ্বারা দর্শনেই প্রহাণতব্য কায় কিংবা বাক্য দ্বারা নয়?
ভিক্ষুগণ, লোভ হচ্ছে কায় কিংবা বাক্য দ্বারা অপ্রহাণীয় কিন্তু প্রজ্ঞা দ্বারা দর্শনের মাধ্যমে প্রহাণযোগ্য ধর্ম। দ্বেষ-মোহ ও  হচ্ছে কায় কিংবা বাক্য দ্বারা অপ্রহাণীয় কিন্তু প্রজ্ঞা দ্বারা দর্শনের মাধ্যমে প্রহাণযোগ্য ধর্ম। ক্রোধ, উপনাহ (দোষ অন্বেষণ), ম্রক্ষ (অন্যের নিন্দকারী), পলাস (ঘৃণা), মাৎসর্য (কৃপণতা) এ সমস্তও হচ্ছে কায় কিংবা বাক্য দ্বারা অপ্রহাণীয় কিন্তু প্রজ্ঞা দ্বারা দর্শনের মাধ্যমে প্রহাণযোগ্য ধর্ম।
পুনশ্চ, ভিক্ষুগণ, পাপ-ঈর্ষা (পরশ্রীকারতা) হচ্ছে কায় কিংবা বাক্য দ্বারা অপ্রহাণীয় কিন্তু প্রজ্ঞা দ্বারা দর্শনের মাধ্যমে প্রহাণযোগ্য ধর্ম। ভিক্ষুগণ, পাপ-ঈর্ষা কীরূপ? যেমন, গৃহপতি বা গৃহপতি পুত্রের ধন-ধান্য, স্বর্ণ-রৌপ্য বৃদ্ধি পেলে তথায় কোনো কোনো দাস বা অনাহারীর এরূপ চিন্তার উদ্রেক হয় যে ‘অহো, গৃহপতি বা গৃহপতিপুত্রের যাতে ধন-ধান্য, স্বর্ণ-রৌপ্য বৃদ্ধি না হয়।’ আবার, কোনো কোনো শ্রমণ-ব্রাহ্মণ চীবর, পিণ্ডপাত, শয্যাসন, ওষুধ প্রত্যয় ও প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি যথেচ্ছা লাভ করলে অন্যান্য শ্রমণ-ব্রাহ্মণদের এরূপ চিন্তার উদ্রেক হয় যে ‘অহো, এরা চীবর, পিণ্ডপাত, শয্যাসন, ওষুধ প্রত্যয় ও প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি যথেচ্ছা লাভ না করুক।’ ভিক্ষুগণ, একেই পাপ-ঈর্ষা বলে।
পুনশ্চ, ভিক্ষুগণ, পাপ ইচ্ছা বা আকাঙক্ষা হচ্ছে কায় কিংবা বাক্য দ্বারা অপ্রহাণীয় কিন্তু প্রজ্ঞা দ্বারা দর্শনের মাধ্যমে প্রহাণযোগ্য ধর্ম। ভিক্ষুগণ, পাপ ইচ্ছা কীরূপ? যেমন, জগতে কোনো কোনো বীতশ্রদ্ধ ভিক্ষু এরূপ ইচ্ছা বা আকাঙক্ষা পোষণ করে যে ‘আমাকে সকলে শ্রদ্ধাবান বলে জানুক’; কোনো কোনো দুঃশীল ভিক্ষু এরূপ ইচ্ছা বা আকাঙক্ষা পোষণ করে যে ‘আমাকে সকলে শীলবান বলে জানুক’; কোনো কোনো অল্পশ্রুত ভিক্ষু এরূপ ইচ্ছা বা আকাঙক্ষা পোষণ করে যে ‘আমাকে সকলে বহুশ্রুত বলে জানুক’; কোনো কোনো  সংঘপ্রিয় ভিক্ষু এরূপ ইচ্ছা বা আকাঙক্ষা পোষণ করে যে ‘আমাকে সকলে প্রবিবেকসম্পন্ন (নির্জনবিহারী) বলে জানুক’; কোনো কোনো হীনবীর্য ভিক্ষু এরূপ ইচ্ছা বা আকাঙক্ষা পোষণ করে যে ‘আমাকে সকলে আরব্ধবীর্যবান বলে জানুক’; কোনো কোনো (ধর্ম-বিনয়ে) অমনোযোগী ভিক্ষু এরূপ ইচ্ছা বা আকাঙক্ষা পোষণ করে যে ‘আমাকে সকলে মনোযোগী বলে জানুক’; কোনো কোনো অসমাহিত চিত্তসম্পন্ন ভিক্ষু এরূপ ইচ্ছা বা আকাঙক্ষা পোষণ করে যে ‘আমাকে সকলে সমাহিত চিত্তসম্পন্ন বলে জানুক’; কোনো কোনো দুষপ্রাজ্ঞ ভিক্ষু এরূপ ইচ্ছা বা আকাঙক্ষা পোষণ করে যে ‘আমাকে সকলে প্রজ্ঞাবান বলে জানুক’; কোনো কোনো আসবযুক্ত বা আসক্তিপরায়ণ ভিক্ষু এরূপ ইচ্ছা বা আকাঙক্ষা করে যে ‘আমাকে সকলে (বিষয় আশয়ে) অনাসব বা আসবমুক্ত বলে জানুক।’ ভিক্ষুগণ, ইহাকে পাপ ইচ্ছা বলে। ভিক্ষুগণ, এগুলো হচ্ছে কায় কিংবা বাক্য দ্বারা অপ্রহাণীয় কিন্তু প্রজ্ঞা দ্বারা দর্শনের মাধ্যমে প্রহাণীয় ধর্ম।
৫। যদি ভিক্ষুগণ, সেই ভিক্ষুকে লোভ বিহ্বল (অভিভূত) করে বিচলিত করে; দ্বেষ, মোহ, ক্রোধ, উপনাহ বিহ্বল (অভিভূত) করে বিচলিত করে; ম্রক্ষ, পলাস, মাৎসর্য, পাপ-ঈর্ষা ও পাপ-আকাঙক্ষায় বিহ্বল (অভিভূত) করে বিচলিত করে; তবে তার এরূপ জ্ঞাত হওয়া উচিত যে ‘এই আয়ুষ্মান তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন না, যা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত থাকলে লোভ উৎপন্ন হয় না। সেহেতু আয়ুষ্মানকে লোভ অভিভূত করে বিচলিত করে।’ তার এরূপ জ্ঞাত থাকা উচিত যে ‘এই আয়ুষ্মান তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন না, যা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত থাকলে দ্বেষ উৎপন্ন হয় না। সেহেতু আয়ুষ্মানকে দ্বেষ অভিভূত করে বিচলিত করে।’
পুনশ্চ, তার এরূপ জ্ঞাত থাকা উচিত যে ‘এই আয়ুষ্মান তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন না, যা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত থাকলে মোহ উৎপন্ন হয় না। সেহেতু আয়ুষ্মানকে মোহ অভিভূত করে বিচলিত করে।’
পুনশ্চ, তার এরূপ জ্ঞাত থাকা উচিত যে ‘এই আয়ুষ্মান তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন না, যা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত থাকলে ক্রোধ উৎপন্ন হয় না। সেহেতু আয়ুষ্মানকে ক্রোধ অভিভূত করে বিচলিত করে।’
পুনশ্চ, তার এরূপ জ্ঞাত থাকা উচিত যে ‘এই আয়ুষ্মান তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন না, যা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত থাকলে উপনাহ উৎপন্ন হয় না। সেহেতু আয়ুষ্মানকে উপনাহ অভিভূত করে বিচলিত করে।’
পুনশ্চ, তার এরূপ জ্ঞাত থাকা উচিত যে ‘এই আয়ুষ্মান তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন না, যা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত থাকলে ম্রক্ষ উৎপন্ন হয় না। সেহেতু আয়ুষ্মানকে ম্রক্ষ অভিভূত করে বিচলিত করে।’
পুনশ্চ, তার এরূপ জ্ঞাত থাকা উচিত যে ‘এই আয়ুষ্মান তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন না, যা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত থাকলে পলাস উৎপন্ন হয় না। সেহেতু আয়ুষ্মানকে পলাস অভিভূত করে বিচলিত করে।’
পুনশ্চ, তার এরূপ জ্ঞাত থাকা উচিত যে ‘এই আয়ুষ্মান তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন না, যা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত থাকলে মাৎসর্য উৎপন্ন হয় না। সেহেতু আয়ুষ্মানকে মাৎসর্য অভিভূত করে বিচলিত করে।’
পুনশ্চ, তার এরূপ জ্ঞাত থাকা উচিত যে ‘এই আয়ুষ্মান তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন না, যা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত থাকলে পাপ-ঈর্ষা উৎপন্ন হয় না। সেহেতু আয়ুষ্মানকে পাপ-ঈর্ষা অভিভূত করে বিচলিত করে।’
পুনশ্চ, তার এরূপ জ্ঞাত থাকা উচিত যে ‘এই আয়ুষ্মান তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন না, যা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত থাকলে পাপ-আকাঙক্ষা উৎপন্ন হয় না। সেহেতু আয়ুষ্মানকে পাপ-আকাঙক্ষা অভিভূত করে বিচলিত করে।’
৬। যদি ভিক্ষুগণ, সেই ভিক্ষুকে লোভ বিহ্বল না করে বিচলিত না করে; দ্বেষ, মোহ, ক্রোধ, উপনাহ বিহ্বল না করে বিচলিত না করে; ম্রক্ষ, পলাস, মাৎসর্য, পাপ-ঈর্ষা ও পাপ-আকাঙক্ষায় বিহ্বল না করে ও বিচলিত না করে; তবে তার এরূপ জ্ঞাত হওয়া উচিত যে ‘এই আয়ুষ্মান তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন, যা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত থাকলে লোভ উৎপন্ন হয় না। সেহেতু আয়ুষ্মানকে লোভ অভিভূত করে না এবং বিচলিত করে না।’ তার এরূপ জ্ঞাত থাকা উচিত যে ‘এই আয়ুষ্মান তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন, যা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত থাকলে দ্বেষ উৎপন্ন হয় না। সেহেতু আয়ুষ্মানকে দ্বেষ অভিভূত করে না এবং বিচলিতও করে না।’
পুনশ্চ, তার এরূপ জ্ঞাত থাকা উচিত যে ‘এই আয়ুষ্মান তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন, যা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত থাকলে মোহ উৎপন্ন হয় না। সেহেতু আয়ুষ্মানকে মোহ অভিভূত করে না এবং বিচলিতও করে না।’
পুনশ্চ, তার এরূপ জ্ঞাত থাকা উচিত যে ‘এই আয়ুষ্মান তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন, যা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত থাকলে ক্রোধ উৎপন্ন হয় না। সেহেতু আয়ুষ্মানকে ক্রোধ অভিভূত করে না এবং বিচলিতও করে না।’
পুনশ্চ, তার এরূপ জ্ঞাত থাকা উচিত যে ‘এই আয়ুষ্মান তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন, যা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত থাকলে উপনাহ উৎপন্ন হয় না। সেহেতু আয়ুষ্মানকে উপনাহ অভিভূত করে না এবং বিচলিতও করে না।’
পুনশ্চ, তার এরূপ জ্ঞাত থাকা উচিত যে ‘এই আয়ুষ্মান তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন, যা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত থাকলে ম্রক্ষ উৎপন্ন হয় না। সেহেতু আয়ুষ্মানকে ম্রক্ষ অভিভূত করে না এবং বিচলিতও করে না।’
পুনশ্চ, তার এরূপ জ্ঞাত থাকা উচিত যে ‘এই আয়ুষ্মান তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন, যা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত থাকলে পলাস উৎপন্ন হয় না। সেহেতু আয়ুষ্মানকে পলাস অভিভূত করে না এবং বিচলিত করে না।’
পুনশ্চ, তার এরূপ জ্ঞাত থাকা উচিত যে ‘এই আয়ুষ্মান তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন, যা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত থাকলে মাৎসর্য উৎপন্ন হয় না। সেহেতু আয়ুষ্মানকে মাৎসর্য অভিভূত করে না এবং বিচলিত করে না।’
পুনশ্চ, তার এরূপ জ্ঞাত থাকা উচিত যে ‘এই আয়ুষ্মান তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন, যা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত থাকলে পাপ-ঈর্ষা উৎপন্ন হয় না। সেহেতু আয়ুষ্মানকে পাপ-ঈর্ষা অভিভূত করে না এবং বিচলিত করে না।’
পুনশ্চ, তার এরূপ জ্ঞাত থাকা উচিত যে ‘এই আয়ুষ্মান তা প্রকৃষ্টরূপে জানেন, যা প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত থাকলে পাপ-আকাঙক্ষা উৎপন্ন হয় না। সেহেতু আয়ুষ্মানকে পাপ-আকাঙক্ষা অভিভূত করে না এবং বিচলিতও করে না।”

Tuesday, June 27, 2017

বুদ্ধের আদর্শ

বৌদ্ধধর্মে বোধশক্তি বা উপলব্ধি হলো ধর্মদর্শনের গভীরে যাওয়ার পুজিঁ। বোধশক্তি ছাড়াই কোন দর্শনের সাধনাপূর্ণ লাভ করা যায় না। কোন ক্রেতা যেমন পয়সা বিনিময় না থাকলে কোন দ্রব্যই লাভ করতে পারেন না। ঠিক তেমনি বৌদ্ধধর্মে উন্নতি হতে হলে শ্রদ্ধা ও বোধশক্তি বা উপলব্ধি থাকতে হবে। শ্রদ্ধা ও বোধশক্তি না থাকলে বৌদ্ধদর্শনের মাত্রা অর্জন করা যায় না। ব্যক্তিস্বাধীন প্রয়োজনে বোধশক্তি বা উপলব্ধি হলো একান্তই ব্যক্তিগত সাধনাপুষ্ট ব্যপার। সাধনা অধম হলে আত্মশক্তির পূর্ণ বিকাশ দূরে থাক স্বতই আত্ম-উন্মোচনের প্রকৃত জ্ঞানও অর্জন সম্ভব হবে না। বুদ্ধবাণীর ভিত্তিসরুপ চতুরার্য সত্যতো প্রত্যেক বাস্তবসত্ত্বাকে উন্মোচন করে, নির্দেশ করে প্রকৃত মুক্তির দর্শন। ধর্ম্ম আপনার অস্তিত্ত্ব থেকে দুরে নয়। সেই প্রকৃত বস্তুটি অজ্ঞতা আবরণে নির্দিষ্ট আছে। আপনার ভিতরে দেখুন, আত্মানুসন্ধান করুন। ধম্ম স্বতই ব্যক্তিসত্ত্বাকে মুক্তি দিতে লেগেই আছে। কারোর প্রতি মমতাহীন ভাষা, কথা, কায়িক আচরণের বিধান এই ধর্মে নেই। শুধুমাত্র মানুষের
 সমতা রক্ষার প্রয়োজনে গৌতম বুদ্ধ এর বিনিময়ে ভালোবাসা, সহিষ্ণুতা, দয়া, করুণা ও আদরের বিবেচনাটুকু বিধানভূক্ত করেছেন। এ সমষ্ট শিক্ষা নৈতিক পালনের ক্ষেত্রে মানুষ নিজেরাই দায়িত্ববান হতে হবে। মানব জাতির জীবন অবাক চেতনার ধারাশূলে জীবিকার প্রণালীবদ্ধ। মোহশূলে এর সুমহান বিকল্প পথটি খুঁজে পান না। আসলে ব্যক্তিগত আত্ম- উন্মোচন থাকলে সর্বদিক বুদ্ধের সত্যময় সু-পরিকল্পিত বিধান
পাওয়া সম্ভব। প্রকৃত মানব চেতনাকে উন্মোচিত করতে হলে বৌদ্ধদর্শনের সাধনা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় আরোপ মেনে নিতে হবে। তবে বৌদ্ধদর্শনের সাধনা লাভ করতে হলে আত্মবিবেচিত বোধ থাকতে হবে।বৌদ্ধধর্ম সর্বদা আত্মনিবেদিত ধর্ম। এই ধর্ম সব সময় আত্মবিশ্লষণ করে। অন্য কাউকে বিশ্লেষণ করা এই ধর্মের অভ্যাস আনুগত্যতা নেই। আত্মনিবৃতিতার্থে আত্মবিশ্লেষণ। বৌদ্ধধর্ম কারোর প্রতিপক্ষরুপ আচরণের শিক্ষা বা উপদেশ দেয় না। ইহার শিক্ষা শুধুমাত্র পাপ, অপরাধ, এবং অসত্য প্রতিপক্ষ হয়ে কথা বলে, শিক্ষা বা উপদেশ নির্দেশনা প্রয়াস করে। ইহার প্রথম সূত্র: শুধুমাত্র বিশ্বব্রম্মাণ্ডের মানুষ ও প্রাণী সবাই একই প্রেমের ফ্রেমে বাঁধা প্রাণজাতি। অর্থাৎ প্রেম নামক জালেই আবদ্ধ। আত্মনিবৃতির চারিতার্থ পূর্ণ না হলে এই ধর্মের আসনে অধিগত হওয়ার কোন সুরাহা নেই। তাই বুদ্ধ প্রত্যেক চিন্তাকে দৃঢ়ভাবে পরিশুদ্ধ পদ্ধতিতে ব্যবহার করতে বলেছেন। কোন চিন্তার প্রথাকে হুজুগে গ্রহণ বা উপধারণ করতে বলেননি। তিনি এও বলেছেন যে, সততই প্রত্যেক মানুষের চিন্তার উদ্রেক পরাক্রম ও অজেয় পদ্ধতিতে সৃষ্টি হবেই, তাই বলে প্রমত্ততারুপ প্রবাহ মাত্রিকতা অবলম্বন করে সেই চিন্তার স্রোতে নিজেকে হেলিয়ে দেওয়া যুক্তিযুক্ত মনে করা হয় না। বুদ্ধ শুধুমাত্র মনে করেছেন অপ্রমত্ত বা সংযম ভাব পদ্ধতিতে চিন্তাকে ব্যবহার করার প্রয়োজনীয়তাকে। নানা কারণ অস্থিরযুক্ত মনন থেকে মানুষ প্রত্যকটির সমস্যা মুখোমুখি হতে যান। তবু সংযম বা দমন ধারাবাহিকতা পদ্ধতিকে ভূলে যায় প্রত্যেক মতোয়ারা মানুষ। তাই মানুষ মাত্রিক নিজের সমস্যাই নিজেরাই অধিকারী। অথচ বেহাল ভাবুক হয়ে কেউ কাউকে দোষারোপ করার প্রয়োজনে পক্ষ-প্রতিপক্ষ চেতনায় উভয়ই ধ্বংস হতে শুরু করে। এভাবে মানুষের সমাজ সুশীল অবন্থানে ফিরে পেতে পারে না। বুদ্ধ সেটাকে "হিংসা" নামক ধ্বংসাবশেষ অগ্নি নাম দিয়েছেন। ইহাতে দগ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা অবশ্যই আছে। তাঁর কারণে মানুষ ধ্বংস হওয়ারও হেতু নির্দিষ্ট আছে। এই ধ্বংসের পরিক্রমা উন্মিলন করে বুদ্ধ নিষেধও করেছেন মানবজাতিকে→ তোমরা হিংসাগ্নিতে দগ্ধ হইওনা। এর পরিবর্তে তিনি দিয়েছেন- মৈত্রীর অনুশীলনের পদ্ধতি। ইহাই মানব জাতির শান্ত থাকার প্রয়াস। এই সূত্রধরে মানব জাতিরাই একে অপরকে স্নেহদর্শনে আবদ্ধ থাকবে। 

                              লিখেছেন: শ্রীমৎ বীতশোক ভিক্ষু
                      সুবলং শাখা বন বিহার, জুরাছড়ি, রাঙ্গামাটি।

Monday, June 26, 2017

অন্তর্দৃষ্টিভাব পারজ্ঞ ব্যক্তিরাই বৌদ্ধদর্শন লাভ করেন

বৌদ্ধধর্মে বোধশক্তি বা উপলব্ধি হলো ধর্মদর্শনের গভীরে যাওয়ার পুজিঁ। বোধশক্তি ছাড়াই কোন দর্শনের
সাধনাপূর্ণ লাভ করা যায় না। কোন ক্রেতা যেমন পয়সা বিনিময় না থাকলে কোন দ্রব্যই লাভ করতে পারেন না। ঠিক তেমনি বৌদ্ধধর্মে উন্নতি হতে হলে শ্রদ্ধা ও বোধশক্তি বা উপলব্ধি থাকতে হবে। শ্রদ্ধা ও বোধশক্তি না থাকলে বৌদ্ধদর্শনের মাত্রা অর্জন করা যায় না। ব্যক্তিস্বাধীন প্রয়োজনে বোধশক্তি বা উপলব্ধি হলো একান্তই ব্যক্তিগত সাধনাপুষ্ট ব্যপার। সাধনা অধম হলে আত্মশক্তির পূর্ণ বিকাশ দূরে থাক স্বতই আত্ম-উন্মোচনের প্রকৃত জ্ঞানও অর্জন সম্ভব হবে না। বুদ্ধবাণীর ভিত্তিসরুপ চতুরার্য সত্যতো প্রত্যেক বাস্তবসত্ত্বাকে উন্মোচন করে, নির্দেশ করে প্রকৃত মুক্তির দর্শন। ধর্ম্ম আপনার অস্তিত্ত্ব থেকে দুরে নয়। সেই প্রকৃত বস্তুটি অজ্ঞতা আবরণে নির্দিষ্ট আছে। আপনার ভিতরে দেখুন, আত্মানুসন্ধান করুন। ধম্ম স্বতই ব্যক্তিসত্ত্বাকে মুক্তি দিতে লেগেই আছে।
     → শ্রীমৎ বীতশোক ভিক্ষু।
তাই বুদ্ধের উপদেশ অনুশীলন করুন!!
           গাথা→  আত্মদীপো, আত্মশরণ, আত্মাপদীপো জীবিস্সতি।

Friday, June 23, 2017

বনভন্তেকে কি অরহৎ হতে হবে কি??


লেখকঃ- উজ্জ্বল বড়ুয়া বাসু
কেউ বলে বনভান্তে অর্হৎ, আবার কেউ বা বলে বনভান্তে অর্হৎ হলে তাঁর শরীরে ইনজেকশন পুশ করা হলো কেন? কেউ বলে দাহক্রিয়া করলেই তো ধরা পড়তো কোনটা সত্য কোনটা মিথ্যা, আবার কেউবা একটু রঙ লাগিয়ে প্রচার করে ভান্তের দেহ থেকে নাকি দুর্গন্ধ বেরিয়েছে আরো কত কি? আমার প্রশ্ন বনভান্তে কে কি অর্হৎ হতেই হবে?
প্রিয় পাঠক, আমরা মনুষ্যজাতির স্বভাব এটাই যে আমরা মানুষের ভালো দিক গুলো যতটুকু না প্রচার করি তার চেয়ে বেশী প্রচার করতে ইচ্ছুক খারাপ দিকটা। গুণীর সমাদর খুব কমই হয়। কৃতজ্ঞতাপরায়ণ মানুষের বড়ই অভাব। আর তাই সমাজে গুণীর সংখ্যা দিন দিন কমেই যাচ্ছে। যেখানে গুণীর সমাদর হয় না সেখানে গুণী ব্যক্তিরা যে জন্মগ্রহণ করে না।
প্রথমেই অর্হত্ব ফল লাভ নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক, সংক্ষেপে যিনি অরি বা তৃষ্ণার ক্ষয় সাধন করেন তিনিই অর্হৎ। অর্হৎ এর পুনর্জন্ম হয় না। সাধারণত একজন অর্হৎ ই চিনতে পারেন আরেকজনকে অর্হৎকে। অন্যদিকে দাহক্রিয়া শেষে প্রাপ্ত ধাতু দেখে সাধারণ লোকজনেরা অর্হৎ চিহ্নিত করতে পারে। অবশ্য অর্হৎ এর বৈশিষ্ট্য যেমন- নির্ভয়ী, আলস্যজয়ী, নিদ্রাজয়ী, অচঞ্চল এসব গুণ দেখেও অনেকে অর্হৎ বলে ধারণা করতে পারেন তবে এই ধারণা শতভাগ নির্ভূল নাও হতে পারে। তাই নিশ্চিত হওয়ার জন্য দাহক্রিয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।
এবার আসি বনভান্তে অর্হৎ কিনা এই বিষয়ে। ধরুন প্রমাণিত হল বনভান্তে অর্হৎ, তাহলে কি হবে? তাহলে যারা পূজ্য ভান্তেকে মনে অর্হৎ বলে ধারণ করেছেন তারা নিশ্চিত হবেন, তাদের শ্রদ্ধা আরো অনেকগুণ বেড়ে যাবে। সাথে যারা দ্বিধান্বিত ছিলেন কিংবা যারা বনভান্তেকে অর্হৎ মানতে নারাজ তারাও চুপ হয়ে যাবে। তাদের ভূল ভাঙবে।
আচ্ছা যদি প্রমাণিত হয় বনভান্তে অর্হৎ নন তাহলে কি হবে? তাহলে যারা অর্হৎ বলে ধারণা পোষণ করে আছেন মনে তাদের ধারণা ভূল ছিল এটাই প্রমাণিত হবে। আবারো বলছি, বনভান্তেকে কি অর্হৎ হতেই হবে? বনভান্তে যদি অর্হৎ না হন তবে বৌদ্ধ সমাজ কি তাঁর অবদানের কথা ভূলে যাবেন? এটা ভূলে গেলে চলবেনা যা বনভান্তে বৌদ্ধ সমাজে সদ্ধর্মের পুণর্জাগরন সৃষ্ঠি করেছেন। কি করেন নাই তিনি?
পূজ্য ভান্তের আগে কেউ কি শুধুমাত্র সংঘের জন্য বৌদ্ধ হাসপাতাল নির্মাণ হবে এই চিন্তা করেছিলেন? কেউ করুক বা না করুক বনভান্তে বাস্তবে তা করে দেখিয়েছেন। রেঙ্গুন বৌদ্ধ মিশন প্রেস ধ্বংস হয়ে ত্রিপিটক অনুবাদ প্রচার এক প্রকার থেমেই গিয়েছিল। বনভান্তে পুণরায় ত্রিপিটক প্রকাশনী তথা প্রেস চালু করেছেন শুধুমাত্র সদ্ধর্মের প্রচারের জন্য। প্রজ্ঞাবংশ ভান্তেকে পৃষ্ঠপোষকতা দান করেছেন ত্রিপিটক অনুবাদে, ফলে প্রজ্ঞাবংশ ভান্তে ও বনভান্তের অনেক শিষ্য ত্রিপিটক খন্ড অনুবাদ করেছেন অনেকগুলো, অনেকেই এখনও রত আছেন ত্রিপিটক অনুবাদে। ফলে অচিরেই আমরা সম্পূর্ণ ত্রিপিটক বাংলায় পাবো এই আশা এখন আর স্বপ্ন নয়। বনভান্তের প্রেরণায় নির্মিত হয়েছে পালি কলেজ। রাজবন বিহারে নির্মিত হয়েছে পাঁচতলা বিশিষ্ট বৌদ্ধ ধর্মীয় বইয়ের লাইব্রেরী। তাঁর শিষ্যরা এখন মায়ানমার থেকে অভিধর্ম শিখে এসে অভিধর্ম গবেষণা কেন্দ্র তৈরী করবেন সেই আশাও পোষণ করেন।
মূলত সাধনানন্দ মহাস্থবির (বনভান্তে) ছিলেন একজন ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ যাঁর আবির্ভাবে রাঙামাটি হয়ে উঠে পাহাড়ী-বাঙালী, জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষ প্রত্যেকের জন্য এক শান্তির জনপদ। মুসলিম-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সকলের কাছে সমানভাবে পূঁজনীয় হয়ে উঠেন তিনি তাঁর আপন কর্ম মহিমায়। কে হিন্দু, কে বৌদ্ধ, সেটা তাঁর কাছে বড় ছিল না। আমরা সবাই মানুষ আর দুঃখপীড়িত মানুষকে মুক্তির পথ দেখানোই ছিল তাঁর ব্রত। আর তাই এদেশের রাষ্ট্রনায়ক, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক থেকে শুরু করে দূর-দুরান্ত থেকে রাঙামাটির রাজবন বিহারে অসংখ্য মানুষের সমাগম হতো বিভিন্ন সময়ে তাঁকে এক নজর দেখার জন্য, তাঁর মুখনিশ্রিত বাণী শ্রবণের জন্য।
তাঁর অবস্থানের কারণে রাঙামাটিতে প্রাণীহত্য, মাদকদ্রব্য সেবন ও বিক্রয় অনেকাংশেই কমে যায়। রাজনৈতিক সংকটের সময় দেখা গেছে সারাদেশে হরতাল পালিত হলেও রাজবন বিহারে কোন অনুষ্ঠান থাকলে সেই অনুষ্ঠানের প্রতি সম্মান রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সেই হরতালের আওতামুক্ত রাখতো রাঙামাটিকে। রাজবন বিহারে হাসপাতাল নির্মিত হওয়ার পূর্বে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিশেষ দল নিজেদের হেলিকপ্টারে করে তাঁকে সেবা দেওয়ার জন্য হাসপাতালে নিয়ে গেছেন এমনও দেখা যায়।
প্রিয় পাঠক, এরকম অসংখ্য গুণে গুণবান পূজ্য ভান্তে অর্হৎ কি না এটা আজ তাই বড় প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে না। তাকে অর্হৎ হতেই হবে এমন কোন কথা নাই। তিনি অর্হৎ হোন বা না হোন আমাদের হৃদয়ে তাঁর অবস্থান হবে চির সমুজ্জ্বল। তাঁর মহৎ কর্মগুলো তাঁর হয়ে সহস্র শতাব্দী কথা বলবে। অনেকে তাঁর দেহ দাহ করা হচ্ছে না কেন এটা নিয়েও দ্বন্ধে জড়িয়ে পড়ে। তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চায়......

Wednesday, June 21, 2017

তোমরা পোকায় খাওয়া টক আম খাবে না।

বনভান্তে বলেন—ভগবান বুদ্ধের নির্দেশিত মার্গ হল সুমার্গ এবং বুদ্ধের শিক্ষা হল সুশিক্ষা। আমি তো দেখছি বর্তমানে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যে শিক্ষা দেয়া হচ্ছে সেগুলো প্রকৃত সুশিক্ষা নয়। ছাত্র-ছাত্রীরাও কর্ম সংস্থানের সুবিধার্থে একটা সার্টিফিকেট লাভের আশায় সে শিক্ষা গ্রহণ করতেছে। তাই আমি সে শিক্ষাকে পেটের ধান্ধায় শিক্ষা বলে উল্লেখ করি। বুদ্ধের শিক্ষাই উত্তম, এই শিক্ষার মাধ্যমে যাবতীয় দুঃখের পরিসমাপ্তি ঘটে যায়। নির্বাণে পরম সুখ লাভ হয়। একমাত্র বুদ্ধের শিক্ষার মাধ্যমেই দুঃখমুক্তি নির্বাণ লাভ করা যায়। অন্য কোন শিক্ষার মাধ্যমে নির্বাণ লাভ করা যায় না। আমি আমার শিষ্যদেরকে বুদ্ধের শিক্ষাই দিই-অন্য কোন শিক্ষা নয়। বাংলাদেশের প্রত্যেক (ইউনিভার্সিটি) বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক অধ্যাপক আমার নিকট সাক্ষাৎ করতে এসেছে। এবং তারা সবাই স্বীকার করেছে যে তাদের কাছে অসাধারণ জ্ঞান নেই, তারা সাধারণ জ্ঞানের অধিকারী মাত্র। আচ্ছা, তোমাদের কাছে তারা এ’ কথা স্বীকার করবে কি? করবে না। এমন কি অন্য সব ভিক্ষুর কাছেও স্বীকার করবে না। কারণ বর্তমানের ভিক্ষুরাও অসাধারণ জ্ঞানের অধিকারী হতে পারেনি। বনভান্তে জনৈক ভিক্ষুর নামোল্লেখ করে বলেন, সে কিনা বাঘাইছড়ি থানার নির্বাহী কর্মকর্তাকে নমস্কার করে (ওখানকার লোকজন আমাকে বলেছিল)। অথচ আমি বাঘাইছড়িতে ফাং-এ গেলে সেই টি, এন, ও আমার কাছে দানীয় বস্তু সহ সশ্রদ্ধায় সাক্ষাৎ করতে আসে। আচ্ছা, সেই ভিক্ষুটি তাকে যখন নমস্কার করে তখন তার চিত্তে কি উদয় হবে বল তো? বনভান্তেও ভিক্ষু, এই ভিক্ষুটিও ভিক্ষু। কিন্তু তাদের আচরণ তো সম্পূর্ণ বিপরীত। এসব কেন হচ্ছে? ভিক্ষুদের জ্ঞানের দুর্বলতার জন্যই তাদের হীন আচরণ দ্বারা বর্তমান ভিক্ষুদের হীনতাভাব প্রকাশ হচ্ছে। কারণ তারা নিম্নস্তরের সাধনা অনুশীলনে রত রয়েছে। তাদের নিকট উচ্চস্তরের সাধনা বিদ্যমান নেই; উচ্চতর জ্ঞান নেই। দায়কের প্রদত্ত দানীয় সামগ্রী সর্বস্ব হয়ে তারা অবস্থান করছে। 

ধন পরিহানি, যশ পরিহানি সামান্য মাত্র; কিন্তু প্রজ্ঞা পরিহানি অধিক পরিহানি। মনে রাখবে, ধন সামান্য, যশ সামান্য এগুলোর পরিহানিতে তেমন কিছু আসে যায় না। তদুপরি এসব পুনরায় (সহজে) লাভ করা যায়। কিন্তু প্রজ্ঞার পরিহানি হলে একেবারে রসাতলে যাবে বলে জানবে। তাই আমার সাথে বলো “ধন পরিহানি, যশ পরিহানি সামান্য মাত্র। কিন্তু প্রজ্ঞার পরিহানি অধিক পরিহানি”। আমরা প্রজ্ঞার পরিহানি হতে দেবো না, আমাদের যাতে প্রজ্ঞার পরিহানি না হয়-সে ব্যাপারে সজাগ থাকব। যার কাছে প্রজ্ঞা থাকে, তার কাছে শীলও থাকে। প্রজ্ঞাবান কখনো দুঃশীল হতে পারে না। তাই যারা প্রজ্ঞাবান তারা শীলবান, যারা শীলবান তারা ধার্মিক। শীল-প্রজ্ঞার দ্বারাই দেব-মনুষ্যের মধ্যে জয়যুক্ত হওয়া সম্ভব। দুষ্প্রাজ্ঞ, দুঃশীল হলে সর্বদা পরাজয়ের গস্ন্লানি বহন করে চলতে হয়। পরিহানি ছায়ার মতন অনুসরণ করে। তখন আর দুঃখের সীমা থাকে না। দুষ্প্রাজ্ঞ কাকে বলে? যারা দুঃখ কি, জানে না; দুঃখ সমুদয় কি, জানে না; দুঃখ নিরোধ কি, জানে না; দুঃখ নিরোধের উপায় কি, জানে না; তারাই দুষ্প্রাজ্ঞ। প্রজ্ঞাবান কাকে বলে? যারা দুঃখ কি, জানে; দুঃখ সমুদয় কি, জানে; দুঃখ নিরোধ কি, জানে; দুঃখ নিরোধের উপায় কি জানে; তারাই প্রজ্ঞাবান। তোমরা প্রত্যেক দায়ক-দায়িকাবৃন্দ প্রজ্ঞাবান হও, কখনো দুষ্প্রাজ্ঞ হবে না। প্রজ্ঞাবান হতে পারলেই যথেষ্ট; ধন-যশের চিন্তা করতে হবে না। মনে রাখবে, ধন-যশ সামান্য, তুচ্ছ; প্রজ্ঞাই আসল সম্পদ। তোমাদের যদি প্রজ্ঞার পরিহানি ঘটে তাহলে আমিও লজ্জিত হবো। কাজেই সাবধান, প্রজ্ঞার পরিহানি হয় মত কোন কার্য করবে না। এতে তোমাদের সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি লাভ হবে।
তোমরা জ্ঞান বলে উচ্চতা লাভ করবে। হীন, নীচ কাজসমূহ সম্পাদন করবে না। সেই জ্ঞান কি? চারি আর্যসত্য জ্ঞান। এ’ চারি আর্যসত্য জ্ঞানের দ্বারা তোমাদেরকে উচ্চতা লাভ করতে হবে। চারি আর্যসত্য জ্ঞানের মাধ্যমে মনচিত্ত পাপপঙ্ক হতে অনেক উর্ধ্বে বিচরণ করলে তখন আর অজ্ঞানমূলক নীচ (অকুশল) কর্ম সম্পাদন করা যায় না। মনে রাখবে, এবম্বিধ উপায়ে উচ্চতর জ্ঞান, উচ্চতর সাধনা অনুশীলন করলে প্রকৃত সুখ লাভ হয়, যাবতীয় দুঃখ থেকে চির নিবৃত্তি লাভ হয়। তোমরা উচ্চতর জ্ঞান, উচ্চতর সাধনা অনুশীলন কর। যারা উচ্চতর জ্ঞান ও উচ্চতর সাধনা অনুশীলন করে তারাই সুখী, তারাই দুঃখ থেকে মুক্ত। কখনো নিম্নস্তরের সাধনা ও হীন জ্ঞানের সহিত অবস্থান করো না। যারা হীন জ্ঞান ও নিম্নস্তরের সাধনা অনুশীলন করে, তারা ইহকালেও দুঃখ ভোগ করে, পরকালেও দুঃখ ভোগ করে। তাদের জন্য ইহ-পর উভয়কালও দুর্বিষহ দুঃখপূর্ণ হয়ে থাকে।
পরিশেষে তিনি বলেন—তোমরা ধর্মজ্ঞান, ধর্মচক্ষু লাভ করতে সচেষ্ট থাক। ধর্মজ্ঞান, ধর্মচক্ষু লাভ হলে আর পাপমূলক কর্মসমূহ সম্পাদন করতে পারবে না। কারণ ধর্মজ্ঞান, ধর্মচক্ষু লাভ হলে পাপকর্ম সম্পাদন করতে লজ্জা লাগবে। বর্তমানে তোমাদের ধর্মজ্ঞান, ধর্মচক্ষু নেই বলে পাপকর্ম সম্পাদনে লজ্জা পাচ্ছ না। নিঃসঙ্কোচেই একের পর এক পাপকর্ম সম্পাদন করে যাচ্ছ। যেদিন ধর্মজ্ঞান, ধর্মচক্ষু উদয় (লাভ) হবে, সেদিন হতে যাবতীয় পাপকর্ম পরিত্যাগ করবে। উপস্থিত দায়ক-দায়িকাদের দিকে তাকিয়ে পূজ্য বনভান্তে প্রশ্ন করেন—এখন কেন পাপকর্ম সম্পাদন করতেছ? দায়ক-দায়িকাবৃন্দ একবাক্যে উত্তর দিলেন—ভান্তে, আমাদের ধর্মজ্ঞান, ধর্মচক্ষু লাভ হয়নি বলে। বনভান্তে—হ্যাঁ, ঠিক। যেদিন তোমাদের ধর্মজ্ঞান, ধর্মচক্ষু লাভ হবে সেদিন তোমরা আপনা-আপনি সমস্ত পাপকর্ম পরিত্যাগ করবে, আমাকেও আর বেশি উপদেশ দিতে হবে না। তাহলে তোমাদের কর্তব্য কি? ধর্মজ্ঞান, ধর্মচক্ষু লাভ করতে সচেষ্ট থাকাই তোমাদের কর্তব্য। আমার সাথে বলো “আমাদের অচিরেই ধর্মজ্ঞান, ধর্মচক্ষু লাভ হউক। এই ধর্মজ্ঞান, ধর্মচক্ষু লাভ করে আমরা যাবতীয় পাপ ত্যাগ করতঃ চিরশান্তি, চিরসুখ অর্জনে যেন সমর্থ হই; যাতে আমাদের অধোগতি না হয়, ঊর্ধ্বগতিই হয়; পরিহানি না হয়ে শ্রীবৃদ্ধিই যেন হয়; এবং আমাদের ইহকাল-পরকালে যেন সুখ লাভ হয়।” আমি আবারো বলছি, তোমরা ধর্মজ্ঞান, ধর্মচক্ষু লাভে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হও। কোন প্রকার বিলম্ব বা অবহেলা না করে সেই প্রতিজ্ঞা পরিপূরণে যত্নশীল হও। এতে তোমাদের দিন দিন শ্রীবৃদ্ধি হবে, পরিহানি হবে না; ঊর্ধ্বগতি লাভ হবে, নিম্নগামী হবে না এবং পরম সুখ শান্তির ঠিকানা খুঁজে পাবে। তোমাদের অতিসত্বর ধর্মজ্ঞান, ধর্মচক্ষু লাভ হোক। যাতে তোমাদের সুখ, শান্তি, মঙ্গল বয়ে আনে।
সাধু, সাধু, সাধু

Sunday, June 18, 2017

তোমরা ঢেঁকি শাকের ব্যবসা ত্যাগ কর!


  এক সময় শ্রদ্ধেয় বনভান্তে নিজ আবাসিক ভবনে ভিক্ষুসঙ্ঘকে দেশনা প্রদান প্রসঙ্গে বলেন—তোমরা অজ্ঞান, তৃষ্ণার সহিত কোন কর্ম, কোন বাক্য, কোন চিন্তা করবে না। অজ্ঞান, তৃষ্ণার সহিত কর্ম, বাক্য, চিন্তা করলে দুঃখ পেতে হয়, পাপ সৃষ্টি হয় এবং নরকে পতিত হতে হয়। তাই তোমাদেরকে অজ্ঞান, তৃষ্ণার সহিত কোন কিছু করা ত্যাগ করে জ্ঞানের সহিত ও তৃষ্ণামুক্ত হয়ে কর্ম, বাক্য, চিন্তা করতে হবে। জ্ঞানের সহিত তৃষ্ণামুক্ত হয়ে কর্ম, বাক্য, চিন্তা করতে সক্ষম হলে সুখ, কুশল, জ্ঞান বৃদ্ধি পায়। তজ্জন্য অজ্ঞান, তৃষ্ণার সহিত কর্ম, বাক্য, চিন্তা করা হতে বিরত হয়ে তৃষ্ণামুক্ত হওত জ্ঞানের সহিত কর্ম, বাক্য, চিন্তা করা উচিত। তাতে নির্বাণ লাভ করতেও সহজ হবে। তোমরা যদি নির্বাণ লাভ করতে চাও তাহলে অজ্ঞান, তৃষ্ণা, অকুশল পরিত্যাগ করে জ্ঞান, কুশল, তৃষ্ণামুক্ত হতে চেষ্টাশীল হও। বনভান্তের উপদেশ কি জান? যা দ্বারা জ্ঞান উদয় হয়, কুশল অর্জিত হয় এবং তৃষ্ণা হতে মুক্ত হওয়া যায় তা’ কর। আর যা দ্বারা অজ্ঞান বাড়ে, অকুশল উৎপন্ন হয়, তৃষ্ণা উদয় হয় তা’ পরিত্যাগ কর। এক কথায় অজ্ঞান, অকুশল, তৃষ্ণা উৎপত্তি বন্ধ করে তৃষ্ণামুক্ত হয়ে জ্ঞান, কুশল উদয় করা। অজ্ঞান, অকুশল, তৃষ্ণার মধ্যে যদি মনচিত্ত আসক্ত হয়ে থাকে তবে দুঃখ হতে মুক্তি নেই বলে জানবে। কারণ অজ্ঞান, অকুশল, তৃষ্ণা এগুলো মারভুবন। মারভুবনে অবস্থান করলে কিছুতেই সংসার দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ করা সম্ভব হয় না। তোমরা উচ্চতর জ্ঞান, উচ্চতর সাধনা, উচ্চমনা, উচ্চাকাঙ্ক্ষী হয়ে চিত্তের নিমর্লতা রক্ষা করে অবস্থান কর। তাহলে মনচিত্ত হতে অজ্ঞান, অকুশল, তৃষ্ণা বিদূরীত হয়ে সহজে নির্বাণ লাভ করতে পারবে।
শ্রদ্ধেয় বনভান্তে বলেন—যারা স্বামী-স্ত্রী হয়ে, পুত্র-কন্যা নিয়ে সংসারী হওত কাম্য সুখ ভোগে রত তারা কি করতেছে জান? ঢেঁকী শাকের দোকান দিচ্ছে। রাস্তার ধারে বসে কলাগাছের পাতার উপর ঢেঁকীশাকের পুটলি খুলে বেচাকেনা করতেছে। তাদের সে ব্যবসা দেখতে যেমন অভদ্র, সাধারণ দেখায়, মুনাফাও খুবই কম। খুব বেশি কেনাবেচা করলে ষাট কি সত্তুর টাকার মত পাওয়া যাবে। উপরন্তু সে ব্যবস্যা অনেক কষ্টসাধ্যের তথা বহু পরিশ্রম করতে হয়। তোমরা প্রব্রজিতগণ ঘড়ির দোকান খুঁলে ঘড়ি ব্যবস্যা কর। সুন্দরভাবে দোকান তৈরি করতঃ মূল্যবান উন্নত প্রযুক্তির, সুন্দর ডিজাইনের ঘড়ি আমদানী করে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকার ঘড়ি বিক্রি কর। ঘড়ি ব্যবস্যা একদিকে যেমন ভদ্র, মার্জিত ভাব সম্পন্ন অন্যদিকে তেমনি অনেক বেশি মুনাফা অর্জিত হয়। পরিশ্রমও নেই বললে চলে। তবে সকলের পক্ষে ঘড়ির ব্যবস্যা করা সম্ভবপর হয়ে উঠে না। কারণ ঘড়ি ব্যবস্যা করতে হলে মোটা অঙ্কের পুঁজির প্রয়োজন রয়েছে। প্রথমে কয়েক লক্ষ টাকার বিনিময়ে দোকান প্রস্তুত করে নিতে হবে। তারপর উন্নত প্রযুক্তি, সুন্দর ডিজাইনের ঘড়ি ক্রয়ের জন্য কয়েক লক্ষ টাকার প্রয়োজন হবে। আবার, ঘড়ি বিক্রি করতেও বিক্রেতাকে শিক্ষিত হতে হয়। যেহেতু ঘড়ি বিক্রেতাকে ঘড়ির উন্নত প্রযুক্তি ও ডিজাইন অনুসারে মূল্য নির্ধারণ করতে হয় এবং ক্রেতাদিগকে ক্যাশমেমো প্রদান করতে হয়। শিক্ষিত না হলে এসব সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করা সম্ভব হয় না। এবং ঘড়ির ব্যবস্যায়ও উন্নতি, মুনাফা অর্জিত হবে না। তাই ঢেঁকী শাকের ব্যবসায়ীরা ইচ্ছা করলেও ঘড়ি ব্যবস্যা করতে পারবে না। তাদের ঘড়ি ব্যবস্যা করার মত মোটা অঙ্কের পূঁজি যেমন নেই, তেমনি তারা শিক্ষিতও নয়। লোকোত্তরধর্ম অনুশীলন করাকেই ঘড়ি ব্যবস্যা করা বুঝায়। আর লৌকিকধর্ম করাকে ঢেঁকী শাকের ব্যবস্যা করা বুঝায়। লোকোত্তরধর্মে কোন প্রকার দুঃখ নেই, তৃষ্ণা মুক্ত, স্বাধীন, অনাবিল সুখ লাভ হয়। কিন্তু লৌকিকধর্ম তৃষ্ণাযুক্ত, পরাধীন, দুঃখদায়ক ও দুঃখ উৎপাদক। লৌকিকধর্ম করলে দুঃখের মধ্যে দিনাতিপাত করতে হয়, দুঃখ হতে মুক্তি লাভ করা যায় না। অন্যদিকে মারভুবনে অবস্থান করাকেও ঢেঁকী শাকের ব্যবস্যার সহিত তুলনা করা চলে। আর অমারভুবনে অবস্থান করাকে ঘড়ি ব্যবস্যা সদৃশ বলে জানবে। তোমরা মারভুবনে অবস্থান না করে অমারভুবনে অবস্থান কর। তাহলে ঢেঁকী শাকের ব্যবস্যা ত্যাগ করতঃ ঘড়ি ব্যবস্যা করতে সমর্থ হবে বা লোকোত্তরধর্মে উন্নীত হতে পারবে।
লোকোত্তরধর্ম গ্রহণ করা অর্থ সুপথ অনুশীলন করা। আর লৌকিকধর্ম গ্রহণ করা অর্থ কুপথ অনুসরণ করা। ভগবান বুদ্ধ সত্ত্বদেরকে কুপথ থেকে সুপথে চালিত করেন। তাই বুদ্ধের নির্দেশিত পথকে ন্যায় পথ, সোজা পথ, ঠিক পথ বলা হয়। বুদ্ধ লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি সত্ত্বদেরকে সুপথে পরিচালিত করতে সক্ষম। সারথি যেমন অশ্বদেরকে সঠিক পথে চালিত করে নিয়ে যায়। তাই বুদ্ধের শিক্ষা কোনটা সুপথ, কোনটা কুপথ তা চিহ্নিত করে দিয়ে কুপথ ত্যাগ করে সুপথে পরিচালিত হওয়ার উপদেশ দেন। আমি তোমাদেরকে বলছি, তোমরা বুদ্ধের নির্দেশিত সুপথ অবলম্বন করে কুপথ পরিত্যাগ কর। কামের প্রতি লোভ, কামের আসক্তি, কামের প্রতি অজ্ঞানতা হয়ে হীন মনুষ্যগণ কুপথে পরিচালিত হওত অনন্ত দুঃখ ভোগ থাকে। তোমরা কামকে লোভ, আসক্তি করবে না। এবং কামের প্রতি অজ্ঞানতা হবে না তাহলে সুপথে প্রতিষ্ঠিত থাকতে সমর্থ হবে। মনে রাখবে, একমাত্র বুদ্ধের এ সকল উপদেশেই সুপথে পরিচালিত হতে পারা যায়। বুদ্ধের আবির্ভাবের ফলে জগতে নতুন করে সুখের অধ্যায় আরম্ভ হয়। তাই বলা হয়েছে—
আর্ট: Suponkar Chakma

জগতের নতুন অধ্যায় আরম্ভ হইল,
জগতে শিক্ষা দিতে জগত গুরু এল।
হিংসাহিংসি, দলা-দলি সবি ভুলে যাবে,
সমগ্র বসুধা এবার প্রেমেতে ভাসিবে।
ভগবান বুদ্ধ বিশ্বের সকল জীবের প্রতি মৈত্রী, শান্তি ও কল্যাণের জন্যে তাঁর ধর্ম প্রচার করেছেন। এবং ত্যাগের মাধ্যমে অনাবিল সুখ অন্বেষণের শিক্ষা দিয়েছেন। তাই বুদ্ধের শিক্ষা সত্ত্বদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করে এবং প্রকৃত সুখ অর্জন করতে এক মহৌষধ স্বরূপ। আমি খাগড়াছড়িতে ছাত্রদের মধ্যে বিভেদ দূরকরণার্থে বলেছিলাম—
ভাইয়ে ভাইয়ে জড়িয়ে গলা, মুছে ফেল তোমরা মনের ময়লা,
হর্ষ তেজে দাঁড়াও তোরা, হোক তবে সুখের স্থান।
তোমরা তোমাদের মনের মধ্যে উৎপন্ন হিংসা ময়লাকে বিদূরীত কর। কারণ সে হিংসা ময়লা দ্বারা কখনো শান্তি লাভ হয় না, সুখ বয়ে আসে না। কুলুষিত মনচিত্ত দ্বারা বৌদ্ধধর্ম আচরণ করাও যায় না। তাই তোমরা সেসব ময়লা ধূঁয়ে মুছে ফেল। সে ময়লা কি? লোভ, দ্বেষ, মোহ, মান, মিথ্যাদৃষ্টি, বিচিকিৎসা, আলস্য, ঔদ্ধত্য, নির্লজ্জতা ও নির্ভয়তা এ দশবিধ ক্লেশই মনের ময়লা। ক্লেশ কাকে বলে? যা দ্বারা মনচিত্ত কলুষিত, পীড়িত, ব্যাধিগ্রস্ত, মলিন ও নীচ হয় তাকে ক্লেশ বলে। বুদ্ধ ধর্মপদে বলেছেন, লৌহ হতে উৎপন্ন ময়লা যেমন লৌহকে নষ্ট করে ঠিক তেমনি আপনার চিত্তে উৎপন্ন ময়লা আপনাকেই বিনষ্ট করবে। তাই তোমরা স্বীয় চিত্তের ময়লাকে বিধৌত করে পরিষ্কার হয়ে যাও। কলুষিত চিত্তকে নির্মল করে ফেল। তাহলে চিত্তের কলুষিত ভাব দ্বারা বিনষ্ট হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকবে না। বুদ্ধ আরো বলেছেন, অনাবৃত্তি মন্ত্রের ময়লা, অসংস্কার ঘরের ময়লা, দুশ্চরিত্র স্ত্রীলোকের ময়লা, আলস্য দেহের ময়লা, ইহ-পর কালের ময়লা পাপকর্ম, অবিদ্যাই সর্বপেক্ষা নিকৃষ্ট ময়লা। হে ভিক্ষুগণ! এই ময়লা বর্জন করে তোমরা সকলে নির্মল হও। কর্মকার যেমন রজতের ময়লা একটু একটু বিদূরীত করে, ঠিক মেধাবী ব্যক্তিও আপনার ময়লা ক্ষণে ক্ষণে বিদূরীত করবেন। অর্থাৎ আপনার চিত্তকে নিজের বসে আনবেন। আমি আবারো তোমাদেরকে বলছি, তোমরা অবিদ্যা ময়লাকে বিদূরীত করতঃ চিত্তকে নির্মল কর। নির্মল চিত্তই সকল সুখের আকর।
শ্রদ্ধেয় বনভান্তে বলেন, তোমরা ক্লেশ ত্যাগ কর, স্কন্ধ ত্যাগ কর। ক্লেশ তোমাদের নিত্য দুঃখদায়ক। ক্লেশের কাজ সত্ত্বদিগকে সর্বদা দুঃখ প্রদান করতে থাকা। তাই এ দুঃখদায়ক ক্লেশকে পরিত্যাগ করা অবশ্যই কর্তব্য। আবার পঞ্চস্কন্ধও নিত্য দুঃখ প্রদান করতে থাকে। সেহেতু পঞ্চস্কন্ধকে ত্যাগ করা আবশ্যক নহে কি? হ্যাঁ অবশ্যই। বুদ্ধ বলেছেন—রূপ আমি নই, আমার নয়, আমার আত্ম নয়; বেদনা আমি নই, আমার নয়, আমার আত্ম নয়; সংজ্ঞা আমি নই, আমার নয়, আমার আত্ম নয়; সংস্কার আমি নই, আমার নয়, আমার আত্ম নয়; বিজ্ঞান আমি নই, আমার নয়, আমার আত্ম নয়। যা নিজস্ব নয় তা’ ত্যাগ কর। পঞ্চস্কন্ধ ত্যাগ করলে দীর্ঘকাল হিতসুখ সাধিত হবে। ক্লেশ ও স্কন্ধকে ত্যাগ করতে না পারলে ভীষণ দুঃখ পেতে হয়। তাদেরকে ক্লেশ উন্মাদ ও স্কন্ধ উন্মাদ বলা যায়। ক্লেশ উন্মাদগণ ক্লেশ চেতনা পাপ চেতনা করতঃ নানা অনাচার, অত্যাচারে লিপ্ত থাকে। বর্তমানে যে সব চুরি, ডাকাতি, মারামারি, বন্দুক যুদ্ধ, ভাংচুরের খবর সেসবই ক্লেশ উন্মাদের কাজ। আর স্কন্ধ উন্মাদেরা সব কিছুতেই আমি আমার ধারণা করে সেগুলো নিজের আয়ত্তে আনার চেষ্টায় ব্যাপৃত থাকে। আমার স্ত্রী, আমার পুত্র-কন্যা, আমার ধনজন, আমার জায়গা-জমি বলে বলে এসবের মালিকানা দাবি করাই স্কন্ধ উন্মাদের কাজ।
তোমরা অকৃতজ্ঞ, মিথ্যাদৃষ্টি, নরাধমের সংস্পর্শ ত্যাগ কর। কারণ অকৃতজ্ঞ ব্যক্তি মহাপাপী। কণ্টকময় স্থানে বাস করা কি দুঃখজনক তদপেক্ষা অকৃতজ্ঞ লোকের সহিত বাস করা দুঃখজনক। তারা কখনো উপকারীর উপকার স্বীকার করে না। বুদ্ধ বলেছেন অকৃতজ্ঞ ব্যক্তির কখনো সুখ লাভ হয় না। তোমরা কৃজ্ঞতা স্বীকার করবে, অকৃজ্ঞত হয়ো না। মিথ্যাদৃষ্টি বিপরীত মার্গে পরিচালিত করে। এ মিথ্যাদৃষ্টিই সত্যকে মিথ্যা, মিথ্যাকে সত্য; ন্যায়কে অন্যায়, অন্যায়কে ন্যায় বলে দিক নির্দেশনা করে। তাই মিথ্যাদৃষ্টি সম্পন্ন পুদ্গলের সত্য, ন্যায়, সার লাভ হয় না। মিথ্যাদৃষ্টি বিদ্যমান থাকলে কখনো নির্বাণ লাভ হবে না। নরাধম ব্যক্তি উঁই ইঁদুরের মতন ক্ষতি ছাড়া কোন উপকার সাধন করতে পারে না। বুদ্ধ বলেছেন—
ধরাতলে নারধম, খল আছে যত,
ঠিক তারা উঁই আর ইঁদুরে মতন।
বর্তমানে মানুষগুলো উঁই ইঁদুরের মতন হয়ে গেছে। তারা একে অপরের ক্ষতিসাধন ছাড়া উপকার, মঙ্গল কিছুই করতে পারছে না। তাদের সেসব হীন মানসিকতা সম্পন্ন কাজের দ্বারা দেশের দিন দিন ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে-উন্নতি কিছু হচ্ছে না।
পরিশেষে তিনি বলেন—মার হল পাপী লোকের রাজা। মার মানুষের মনে বিতর্ক উৎপন্ন করে দিয়ে অকুশলকর্মের দিকে ধাবিত করায়। বুদ্ধ যখন বোধিমূলে ধ্যানরত ছিলেন মার তখন ভেবেছিল—এই শাক্যরাজ পুত্র যদি জ্ঞান লাভ করতে পারে; লোকেদের উপদেশ দেয় তাহলে আমাররাজ্য ধ্বংস হয়ে যাবে। কাজেই আমি বুদ্ধকে জ্ঞান লাভ করতে দেবো না। এই ভেবে মার বুদ্ধকে নানাভাবে আক্রমণ করে ধ্যান হতে চ্যুত করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে ছিল। কিন্তু বুদ্ধকে ধ্যান হতে চ্যুত করতে পারে নি। বরং নিজেই পরাজিত হয়েছিল। বর্তমানেও যারা কুশলকর্ম করতে, জ্ঞান লাভ করতে, নির্বাণ যেতে ইচ্ছুক হয় তাদেরকে মার নানাভাবে প্রলোভন দেখায়ে আক্রমণ করবে। মার কুশলকর্ম, জ্ঞান লাভ ও নির্বাণ লাভ করতে শত সহস্র প্রকারে অন্তরায় সৃষ্টি করে দেয়। কারণ এগুলো মারের কর্তব্য। তাই তোমাদেরকে দৃঢ় বীর্যের সহিত নানাবিধ বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করতে হবে। বীর সৈনিকের ন্যায় পিছু না হটে মারের সঙ্গে যুদ্ধে এগিয়ে যেতে হবে এবং মারের সকল প্রকার অশুভ শক্তি পরাহত করে নির্বাণ লাভে সচেষ্ট থাকতে হবে। এভাবে মারের বাধা-বিপত্তি, ছিন্ন-ভিন্ন করতঃ নির্বাণ লাভ করে পরম সুখের অধিকারী হও।
সাধু, সাধু, সাধু

Saturday, June 17, 2017

তোমরা দুঃখ পেলেও অপরের অনিষ্ট কামনা করবে না

                              তোমরা দুঃখ পেলে অপরের অনিষ্ট কামনা করবে না
এক সময় পরম পূজ্য অর্হৎ বনভান্তে মহোদয় রাজবন বিহার দেশনালয়ে আয়োজিত জাঁকজমকপূর্ণ দানানুষ্ঠানে সমবেত দায়ক-দায়িকাদের উদ্দেশ্যে ধর্মদেশনা প্রদানকালে বলেন—সুখ দুই প্রকার, স্বল্প সুখ ও বিপুল সুখ। তোমরা স্বল্প সুখ পরিত্যাগ করতঃ বিপুল সুখের প্রত্যাশী হয়ে অবস্থান কর। যাদের জ্ঞান থাকে বা যারা জ্ঞানী তারা স্বল্প সুখ ত্যাগ করে বিপুল সুখের প্রত্যাশী হয়। কিন্তু যারা অজ্ঞানী, মূর্খ তারা স্বল্প মাত্র সুখ ত্যাগ করতে পারে না। বুদ্ধ ধর্মপদে বলেছেন—যদি স্বল্প মাত্র সুখ পরিত্যাগ হেতু বিপুল সুখের সম্ভাবনা দেখা যায়, তবে জ্ঞানী ব্যক্তি বিপুল সুখের সম্ভাব্যতা বিবেচনা করে সামান্য সুখ ত্যাগ করবে। মারভুবনে ধর্ম করলে যেই সুখ হয় তা’ স্বল্প সুখ। তোমরা সেই স্বল্প বা সামান্য সুখ করতে গিয়ে অধিক পরিমাণ দুঃখ ভোগ করতেছ। মারভুবনে শতকরা একভাগ মাত্র সুখ বাকী নিরানব্বই ভাগ দুঃখ ভোগ করতে হয়। সেই দুঃখে একে অপরের সহিত ঝগড়া-কলহ, হিংসাহিংসি, রেষারেষি, মারামারি সহ নানা অনাচার-অত্যাচারাদি, অপকর্মে নিয়োজিত রয়েছ। বিপুল সুখ কাকে বলে? অমারভুবন বা নির্বাণরাজ্যকে বলা হয় বিপুল সুখ। নির্বাণরাজ্যে গেলে বিপুল সুখ উপলব্ধি হয়। সেই সুখের চ্যুতি বা মরণ নেই-তা’ অমর। অন্যদিকে, মাররাজ্যের সামান্য সুখ করলে দুঃখ পেতে হয়, মৃত্যুবরণ করতে হয়। তাই আমি বলি কি জান? তোমরা মাররাজ্যের সেই সামান্য সুখ করবে না। সামান্য সুখ করলে তোমাদেরকে বর্ণনাতীত দুঃখ-কষ্ট ভোগ করতে হবে। সংসারের দৈনন্দিন ঘাত-প্রতিঘাতের দুঃখে জর্জরিত হয়ে থাকে তোমাদের জীবন। স্বামী-স্ত্রীতে দুঃখ, পিতা-পুত্রে দুঃখ, মাতা-কন্যায় দুঃখ, ভাইয়ে-ভাইয়ে দুঃখ, বোনে বোনে দুঃখ, পাড়া-প্রতিবেশীতে দুঃখ, আত্মীয়-স্বজনে দুঃখ, বন্ধু-বন্ধুতে দুঃখ ভোগ করতে হয়। কি ঠিক বলেছি তো? হ্যাঁ, ভান্তে ঠিক। এরূপেই দুঃখ পেয়ে চলছি। তোমরা সামান্য সুখ করতে গিয়েই এই দুঃখগুলো পাচ্ছো। তোমরা হয়ত মনে করতেছ আমরা গরিব বলে এ’দুঃখগুলো পাচ্ছি, ধনী লোকেরা সুখেই রয়েছে, তাদের দুঃখ নেই। আবার, অনেকেই বলে ধনী রাষ্ট্রের অধিবাসীরা যেমন—জাপানীরা, আমেরিকানরা সুখেই আছে, তাদের কোন প্রকার অভাব-অনটন, অপ্রাপ্তি.....দুঃখ নেই। তারা কতোই না সুখে রয়েছে। আমাদেরকে যতো দুঃখ পেতে হচ্ছে। কিন্তু এসব কথা মোটেই ঠিক নয়। তাদেরকে হয়ত তোমাদের মতন অভাব-অনটনের দুঃখ পেতে হচ্ছে না, তাই বলে তারা কিছুতেই দুঃখের অতীত নন। তারাও দুঃখের মধ্যেই রয়েছে। দুঃখের ধরণগুলোর মাঝে ভিন্নতা রয়েছে, এটুকু মাত্র তফাৎ। এটা স্বতঃসিদ্ধ যে, মারভুবনের মধ্যে থাকলে দুঃখ অনিবার্য। মাররাজ্যের মধ্যে অকুশলের প্রতি বিশেষ আকর্ষণে তোমরা যে, কলহ-বিবাদ, মারামারি, কাটাকাটি করতেছ সেগুলো কি জান? সেগুলো পাপের সুখ। অকুশলকর্ম সম্পাদনের ফলে যে সাময়িক ও সামান্য সুখের প্রতীতি জন্মে তা’ পরমুহুর্তে অশেষ দুঃখে পরিণত হয়। অজ্ঞানী ব্যক্তিরা সাময়িক সুখের লোভ সংবরণ করতে না পেরে অকুশলকর্ম সম্পাদন করতঃ নিজের জন্য অশেষ দুঃখ-কষ্ট, অশান্তি ডেকে আনে মাত্র। অজ্ঞানী ব্যক্তিরা এটা জানে না বলে সাময়িক সুখের লোভে পাপকর্ম সম্পাদন করে। কিন্তু তারা যদি জানত যে এই সাময়িক সুখের পরিণামে তাদেরকে অশেষ দুঃখ যাতনা ভোগ করতে হবে তাহলে তারা সাময়িক সুখ করা হতে বিরত থাকত।
পূজ্য বনভন্তে

এবার বনভান্তে বলেন—তোমাদের সামান্য সুখ ভোগ করাটা কি রকম হচ্ছে জান? উপমা কথা-ধর, ঘরের কোন এক কোণায় একটি মধুপূর্ণ বাটি রয়েছে। এদিকে একদল পিঁপড়া খাবার খোঁজে গর্ত হতে বের হয়ে ইতস্ততঃ ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ মধুর গন্ধ পেল। সেই গন্ধ ধরে সামনের দিকে অগ্রসর হতে হতে বাটির সন্নিকটে এসে পড়ল। আর বাটিপূর্ণ মধু দেখে মধু পান করার লোভ পেয়ে বসল। সঙ্গে সঙ্গে পিঁপড়াগুলো মধু পান করার জন্য লাইন ধরে একের পর এক মধুবাটিতে ঝাঁপ দিতে লাগল। যেই পিঁপড়া মধু বাটিতে ঝাঁপ দিচ্ছে অমনি আর উঠে আসতে পারছে না, সেখানে তার মৃত্যু হচ্ছে। আশ্চর্যের বিষয় হল, পূর্বগামী পিঁপড়াগুলোর এই করুণ পরিণতি দেখেও পশ্চাদগামী পিঁপড়াদের ভয় জাগ্রত হচ্ছে না, ভাবোদয় হচ্ছে না। তারাও নির্ভীক চিত্তে মধু পান করার লোভে মধু বাটিতে ঝাঁপ দিচ্ছে আর প্রাণ হারাচ্ছে। ঠিক তদ্রূপ তোমরাও পিঁপড়াদের মতন সুখ করতে গিয়ে ইহকাল-পরকালের জন্য মহাদুঃখ, মহা অশান্তিই ডেকে আনতেছ। সেই সামান্য সুখের কারণে ইহকালে যেমন অশেষ দুঃখ-কষ্ট ভোগ করতে হচ্ছে, তেমনি মৃত্যুর পরও চারি অপায়ে পতিত হয়ে বর্ণনাতীত দুঃখ ভোগ করতে হবে। বনভান্তে বলেন—আচ্ছা, পিঁপড়াদেরকে মধু বাটিতে ঝাঁপ না দেয়ার জন্য বারণ করা যাবে কি? ভান্তে, বারণ করা যাবে না। কারণ করলেও তারা তো বুঝতে পারবে না। আমিও তোমাদেরকে সেভাবেই বারণ করতে পারছি না। বারণ করলেও তোমরা বুঝতে পার না। যার ফলে তোমাদেরকে সামান্য সুখ ভোগ করা হতে বিরত রাখতে পারছি না। আবার, তোমরা স্বামী-স্ত্রী হয়ে যে সাংসারিক জীবন-যাপন করতেছ এটাও সামান্য সুখ। সেই সামান্য সুখের পিছনে কতো প্রকার দুঃখ নিহিত রয়েছে তার অন্ত নেই। যেমন—স্বামী মরতে পারে, স্ত্রী মরতে পারে, পুত্র মরতে পারে, কন্যা মরতে পারে, পুত্রবধূ মরতে পারে, জামাই মরতে পারে, নাতি মরতে পারে, নাতনি মরতে পারে। পারে নয় কি? হ্যাঁ ভান্তে, পারে। আর তখন তো দুঃখ শোকের ইয়ত্তা থাকে না। আমি সেরূপ দুঃখ শোকে মূহ্যমান হয়ে বহু বৃদ্ধ লোককেও উচ্চশব্দে, মহাশব্দে বিলাপ করতঃ ক্রন্দনরত অবস্থায় দেখেছি।
পূজ্য বনভান্তে বলেন—নিজকে নিজে উদ্ধার করতে পারলে, নিজকে নিজে দমন করতে পারলে তবেই সুখ লাভ হবে। কিভাবে নিজকে উদ্ধার করতে হয়? ‘আমি আর কখনো পাপকে নিয়ে সুখ করব না’ বলে পাপ হতে বিরত থাকলে নিজকে উদ্ধার করা সম্ভব। পাপকে নিয়ে সুখ করলে নিজকে উদ্ধার করা যায় না। অহং মনোভাব নিয়ে কোন কিছু করলে, অপরের উপর কর্তৃত্ব খাটালে নিজকে দমন করা যায় না। অন্যদিকে বুদ্ধ বলেছেন, নিজে উদ্ধার হলে অপরকেও উদ্ধার করা সম্ভব হয়। আর নিজে উদ্ধার হতে না পারলে অপরকে উদ্ধার করা কখনো সম্ভব নয়। আমার সাথে বলো “আমরা আর পাপকে নিয়ে সুখ করব না”। তা হলে নিজকে উদ্ধার করতে পারবে। কিভাবে পাপকে নিয়ে সুখ করবে না? প্রাণীহত্যা, চুরি, ব্যভিচার, মিথ্যাবাক্য ও নেশাদি দ্রব্য সেবন তথা পঞ্চশীল ভঙ্গ না করা সহ যাবতীয় অন্যায়, অপরাধ, অকুশলকর্ম সম্পাদন করা হতে নিজকে বিরত রেখে। এবং স্বামী-স্ত্রী, পুত্র-কন্যা, নিয়ে সাংসারিক সুখ ভোগে প্রমত্ত না হয়ে। এভাবে পাপকে নিয়ে সুখ না করলে নিজকে উদ্ধার করতে পারবে বলে জানবে। আমি বা অহংকার করা হতে বিরত থাকলে নিজকে দমন করা যায়। মনে রাখবে, নিজকে উদ্ধার ও নিজকে দমন করাই সুখ। নিজকে উদ্ধার এবং দমন করতে না পারলে দুঃখ পেতে হয়। আমি বনভান্তে নিজকে উদ্ধার, নিজকে দমন করতে পারছি বলে, পরম সুখের অধিকারী হয়েছি; আমার আর কোন দুঃখ নেই। তোমরা নিজকে উদ্ধার, নিজকে দমন করতে পারছ না বলে অসহ্য দুঃখ যন্ত্রণায় মুহ্যমান হয়ে রয়েছ। এক মুহুর্তকালও তোমাদের সুখ লাভ হচ্ছে না।
তোমরা কেন দুঃখ পাচ্ছো জান? তোমাদের লজ্জা নেই বলেই তোমরা দুঃখ পাচ্ছো। কি রকম লজ্জা? প্রাণীহত্যা করতে লজ্জা পাচ্ছো না। চুরি-ডাকাতি, সন্ত্রাসী-মাস্তানী, চাঁদাবাজি-ছিনতাই করতে লজ্জা পাচ্ছো না। ব্যভিচার বা পরস্ত্রী/পরকন্যা হরণ করতে লজ্জা পাচ্ছো না। মিথ্যা-কটু-ভেদ-বৃথা বাক্যালাপ করতে লজ্জা পাচ্ছো না। মদ-গাঁজা-আফিং-হেরোইন সহ যাবতীয় নেশা জাতীয় দ্রব্য সেবন করতে লজ্জা পাচ্ছো না। কলহ-বিবাদ, মারামারি, কাটাকাটি, খুনাখুনি করতে লজ্জা পাচ্ছো না। অন্যায়-অবিচার, দুর্নীতিমূলক, অকুশলমূলক কর্ম সম্পাদন করতে লজ্জা পাচ্ছো না। আমার স্বামী, আমার স্ত্রী, আমার পুত্র, আমার কন্যা, আমার আত্মীয়-স্বজন বলে মিথ্যা দাবি করতে লজ্জা পাচ্ছো না। এই সকল অলজ্জী কাজগুলো করতেছ বলে তোমরা দুঃখ পাচ্ছো, অশেষ দুঃখ ডেকে আনতেছ এবং দুঃখ হতে নিজকে বিমুক্ত করতে সমর্থ হচ্ছো না। আমার সাথে বলো ‘আমাদের লজ্জা নেই বলে আমরা দুঃখ পাচ্ছি’। তোমাদের লজ্জা নেই বলে তোমরা নির্দ্বিধায় ‘আমার স্বামী’, ‘আমার স্ত্রী’, ‘আমার পুত্র’, ‘আমার কন্যা’, ‘আমার আত্মীয়-স্বজন্তু, ‘আমার ধন’, ‘আমার বাড়ী’, ‘আমার জায়গা-জমি’ বলতে থাক। আর সেই জন্য তোমাদেরকে কতো প্রকার দুঃখই না সহ্য করতে হচ্ছে। যদি তোমাদের লজ্জা থাকত তাহলে ‘আমার স্বামী’, ‘আমার স্ত্রী’, ....বলতে না। আর দুঃখ ভোগও করতে হতো না। দুঃখ হতে অব্যাহতি পেয়ে যেতে। মানুষের যেখানে নিজের উপরই অধিকার নেই, সেখানে অপরজনকে আমার বলার অধিকার কিরূপেই থাকতে পারে? তাই স্বামী, স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, ধন কোনটাই মানুষের প্রকৃত আপন হতে পারে না। তোমরা অজ্ঞান বলে সেই মিথ্যাকে সত্য মনে করে দুঃখ পাচ্ছো সার। এতে তোমাদের ইহ-পর কোন কালের জন্য সুখ, মঙ্গল সাধিত হচ্ছে না।
শ্রদ্ধেয় ভান্তে বলেন—চাকমা কথায় ‘তুমি দুগ পেলে কার’ মাধাহ্‌ হে ন’ দুঅ। মান্‌চ্যে দুগ পেলে এগজনর মাধাহ্‌ হে দে-দি গরন’। অর্থাৎ তোমরা দুঃখ পেলে কারোর অমঙ্গল, অনিষ্ট কামনা করবে না। অনেকে নিজের দুঃখের জন্য অপরকে দায়ী করতঃ অপরের অমঙ্গল কামনা করে থাকে। ভগবান বুদ্ধ বলেছেন, নিজে দুঃখ পেলে অপরের অমঙ্গল কামনা করবে না। তখন এরূপ বলবে আমি দেহধারণ করেই দুঃখ পাচ্ছি, জন্মগ্রহণ করেই দুঃখ পাচ্ছি। দেহধারণ না করলে দুঃখ পেতাম না, জন্মগ্রহণ না করলে দুঃখ পেতাম না। নিজে দুঃখ পেলে অপরের অমঙ্গল কামনা করলে পাপ হয়। কাজেই নিজে দুঃখ পেলেও অপরের অমঙ্গল কামনা করবে না। আমার সাথে বলো ‘আমরা নিজেরা দুঃখ পেলেও অপরের অমঙ্গল কামনা করব না। আগে অপরের অমঙ্গল কামনা করলেও এখন হতে আর করব না’। তাহলে তোমাদের পাপ হবে না এবং দুঃখও হ্রাসপ্রাপ্ত হবে। তোমরা সর্বদা অকুশলকর্মের প্রতি লজ্জাশীল হয়ে অবস্থান কর। যারা অকুশলকর্মের প্রতি লজ্জাশীল, তাদের দ্বারা অকুশলকর্ম সম্পাদনের কোন সুযোগই থাকে না। অকুশলকর্ম সম্পাদনে তোমরা লজ্জাশূন্য বলে একের পর এক অকুশলকর্ম সম্পাদন করেই যাচ্ছ। যদি লজ্জা শরম থাকত তাহলে এসব করতে পারতে না। চাকমা সমাজে একটা কথা চালু রয়েছে ‘লাজঅ নেই, পাজঅ নেই হ্‌লে ন পারে’। অর্থাৎ যাদের লজ্জা শরম নেই তাদের দ্বারা অকরণীয়, অকথনীয় বলে কিছুই নেই। তোমাদের অলজ্জী হওয়াটা কি রকম জান? উপমা কথা-কোন একটা স্থানে বিশজন মানুষ বিবস্ত্র অবস্থায় লাফালাফি করতেছে। তোমরা কয়েকজন কোথাও যাবার পথে হঠাৎ তাদের সাথে মুখোমুখি হয়ে গেলে; তাদেরকে সে অবস্থায় দেখে তোমাদের মনে কৌতুহল জাগল, আমরাও তাদের মতন হয়ে লাফালাফি করব কি? অন্যদিকে তারাও তোমাদেরকে তাদের মত বিবস্ত্র হয়ে লাফালাফি করতে বার বার ডাকতেছে, উৎসাহিত করাচ্ছে। কি আর করা? শেষমেশ তোমরাও তাদের মতন হয়ে লাফালাফি শুরু করে দিলে-অনায়াসে। ঠিক তদ্রূপ, আমি দেখতেছি বাংলাদেশের (প্রায়) সব মানুষই বিবস্ত্র হয়ে লাফালাফি করতেছে। আর তোমরাও তাদেরকে দেখে বিবস্ত্র হয়ে লাফালাফি শুরু করে দিয়েছ। বাস্তবিক, সঙ্গী না পেলে একা একজনের পক্ষে খুব বেশি পাপ করা সম্ভব হয় না। বর্তমান সময়ে তোমরা পাপকর্ম সম্পাদন করতে সঙ্গী পেয়েছ বলে একের পর এক পাপকর্ম সম্পাদন করেই চলেছ। সঙ্গী না পেলে এতো পাপকর্ম সম্পাদন করতে সমর্থ হতে না। আবার, এ পাপকর্ম কেন সম্পাদন করতেছ জান? তোমাদের চিত্তে জ্ঞান উদয় হচ্ছে না বলে। জ্ঞান উদয় হলে কেহ পাপকর্ম সম্পাদন করতে পারে না। বলা যায়, যে দিন তোমাদের চিত্তে জ্ঞান উদয় হবে সেদিন আর পাপকর্ম সম্পাদন করবে না। এমন কি অন্যজনকে পাপকর্ম সম্পাদনে নির্দেশ প্রদান, উৎসাহ দান এবং অনুপ্রাণিত করেও কিছুতেই পাপকর্ম সম্পাদন করাবে না। সর্বোপরি নিজকে সব ধরণের খারাপ, মন্দ, পাপকাজ হতে বিরত রেখে ভালো, সৎ ও কুশলের মধ্যে নিয়োজিত করতে সচেষ্ট হবে।
পরিশেষে তিনি বলেন—তোমরা আর পাপকে নিয়ে সুখ করবে না এবং চিত্তের মধ্যে ধর্মজ্ঞান, ধর্মচক্ষু উদয় করতে তৎপর থাকবে। আমার সাথে বলো ‘আমাদের চিত্তের মধ্যে ধর্মজ্ঞান, ধর্মচক্ষু উদয় হোক। সেই ধর্মজ্ঞান, ধর্মচক্ষু দ্বারা আমাদের অধঃপতন, চারি অপায় বন্ধ হোক; পরিশেষে পুনর্জন্ম বন্ধ হোক’। মনে রাখবে ধর্মজ্ঞান, ধর্মচক্ষু উদয় হলে অধঃপতন, চারি অপায় এবং পুনর্জন্ম বন্ধ হয়ে যায়, সর্বদা সুখ উপলব্ধি হয়। তোমাদের যদি ধর্মজ্ঞান, ধর্মচক্ষু অর্জিত হয় তখন সবই ঠিক হয়ে যাবে। অর্থাৎ তোমরা যাবতীয় অকুশল, পাপকর্মসমূহ পরিত্যাগ করবে। আমি আবারো বলছি, তোমরা অতি সহসা ধর্মজ্ঞান, ধর্মচক্ষু উদয় করতে তৎপর হও। ধর্মজ্ঞান, ধর্মচক্ষু উদয় না হলে অধঃপতনে পতিত হয়ে চারি অপায়ে পতিত হয়ে, পুনর্জন্ম হয়ে অজস্র দুঃখ-কষ্ট ভোগ করা ছাড়া অন্য গত্যন্তর থাকে না। কিছুতেই প্রকৃত সুখ লাভ হয় না। তাই আমার সাথে বলো ‘আমাদের ধর্মজ্ঞান, ধর্মচক্ষু উদয় হোক। যাতে আমাদের অধঃপতন না হয়; অবনতি না হয়, চারি অপায়ে পতিত হতে না হয়। এবং আমাদের ইহকাল-পরকাল সুখ হোক, উন্নতি হোক, শ্রীবৃদ্ধি হোক; পরিশেষে পুনর্জন্ম বন্ধ হোক’।

সাধু, সাধু, সাধু

Friday, June 16, 2017

নিজের কতটুকু জ্ঞান হয়েছে সে সম্বন্ধে আত্মপরীক্ষক হয়ে অবস্থ

                            নিজের কতটুকু জ্ঞান উদয় হয়েছে সে সম্বন্ধে আত্মপরীক্ষক হয়ে অবস্থান কর

এক সময় পূজ্য বনভান্তে নিজ আবাসিক ভবনে ভিক্ষুসঙ্ঘকে ধর্মদেশনা প্রদান প্রসঙ্গে বলেন—তোমরা যদি অজ্ঞান অবস্থায় থাক তাহলে তোমাদের মনচিত্ত কি করতেছে? কোথায় যাচ্ছে? কি (আলম্বন) নিয়ে অবস্থান করে? এসব কিছুই জানতে পারবে না। অজ্ঞানীদের পক্ষে মনচিত্ত সম্বন্ধে জানা সম্ভব নয়। কিন্তু জ্ঞানীরা তাদের মনচিত্ত কি করতেছে? কোথায় যাচ্ছে? কি নিয়ে অবস্থান করে? সব কিছুই জানতে পারে। তারা সর্বদা স্বীয় চিত্তকে পর্যবেক্ষণ করে থাকে। তাই স্বীয় চিত্ত সম্বন্ধে তারা সম্পূর্ণ জ্ঞাত থাকে। তোমরাও প্রত্যেকে নিজের চিত্ত সম্বন্ধে পরিজ্ঞাত হয়ে অবস্থান কর। তোমাদেরকে স্বীয় চিত্ত কি করতেছে? কোথায় যাচ্ছে? কি নিয়ে অবস্থান করে? সেগুলো পর্যবেক্ষণ করতঃ চিত্তকে দেখতে হবে, জানতে হবে। এটাকে বলে জ্ঞান। এরূপে জ্ঞানের সহিত অবস্থান করতে সক্ষম হলে সুখ লাভ হয়। যারা নিজের চিত্ত কি করতেছে? কোথায় যাচ্ছে? কি নিয়ে অবস্থান করে? এসব কিছুই জানে না, আমি তাদেরকে তির্যক প্রাণীর (গরু, ছাগল) মত হয়ে অবস্থান করতেছে বলে থাকি। এবার শ্রদ্ধেয় ভান্তে ভিক্ষুসঙ্ঘকে প্রশ্ন করেন—তোমাদের চিত্ত কি করে, কোথায় যায়, কি নিয়ে থাকে, সেগুলো তোমরা জান কি? ভান্তে, সব সময় জানা সম্ভব হয় না। জানতেই হবে; না জানলে তো তোমাদেরকেও অজ্ঞানীই বলতে হবে। জ্ঞানীরা সর্বদা স্বীয় চিত্তকে পর্যবেক্ষণ করে থাকে। চিত্ত কি করতেছে? কোথায় যাচ্ছে? কি নিয়ে অবস্থান করে? এসব বিষয় জানাই তো জ্ঞানীদের কাজ। স্বীয় চিত্ত সম্বন্ধে জানাটা জ্ঞান, আর না জানাটা অজ্ঞান। যারা জ্ঞানের সহিত অবস্থান করে তারা স্বীয় চিত্ত সম্বন্ধে জানতে সক্ষম হয়। কিন্তু যারা অজ্ঞানের সহিত অবস্থান করে তারা স্বীয় চিত্ত সম্বন্ধে জানতে অক্ষম। পূজ্য বনভান্তে ভিক্ষুসঙ্ঘকে প্রশ্ন করে বলেন—এখন তোমরাই বলো, তোমরা জ্ঞানী হবে নাকি অজ্ঞানী হবে?  ভান্তে, আমরা জ্ঞানী হবো। যারা জ্ঞানী তারা স্বীয় চিত্ত কি করে? কোথায় যায়? কি নিয়ে থাকে? সবই দেখতে পায়, জানতে পারে। কিন্তু যারা অজ্ঞানী তারা স্বীয় চিত্ত কি করে? কোথায় যায়? কি নিয়ে থাকে? কিছুই দেখতে পায় না, জানতে পারে না। তবে তাদের চিত্ত কি বসে রয়েছে? চিত্তের স্বভাব কোন না কোন একটা করেই যাওয়া। সেটা ভালোর দিক হোক আর মন্দের দিক হোক। আর অজ্ঞানীদের চিত্ত তো মন্দের দিকেই ধাবিত হয়। স্বীয় চিত্ত সম্বন্ধে জানে না বলে অজ্ঞানীরা বিবিধ পাপ করে অনন্ত দুঃখের শিকার হয়। কারণ চিত্তকে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে চালিত না করলে কুকর্মের দিকে ধাবিত হয়, কুকর্ম হতে ফিরায়ে আনা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই আবারো বলছি, তোমাদেরকে অবশ্যই স্বীয় চিত্ত সম্বন্ধে জানতে হবে। আমার সাথে বলো “আমাদের চিত্ত কি করতেছে? কোথায় যাচ্ছে? কি নিয়ে অবস্থান করে? এগুলো আমাদেরকে জানতে হবে, দেখতে হবে”। তোমরা যদি সেরূপ জ্ঞানের সহিত অবস্থান করতে সমর্থ হও, তাহলে সুখের অধিকারী হতে পারবে। বুদ্ধ বলেছেন—হে ভিক্ষুগণ! আপনাকে আপনি পরীক্ষা করবে। অর্থাৎ নিজের চিত্তে কতটুকু জ্ঞান উদয় হয়েছে, সেটা পর্যবেক্ষণ করা। আমার চিত্তে এতকুটু জ্ঞানের উদয় হয়েছে, সে সম্বন্ধে আত্মপরীক্ষক হয়ে অবস্থান করা। বনভান্তে ভিক্ষুসঙ্ঘের উদ্দেশ্যে বলেন, তেমাদের কাজ হল নিজের জ্ঞান সম্বন্ধে (নিজকে নিজে) পরীক্ষা করে দেখা। তোমাদেরকে কোন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে কোন প্রফেসার বা প্রিন্সিপালের নিকট পরীক্ষা দিতে হবে না। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা সমূহ প্রকৃত জ্ঞানের পরীক্ষা নয়; অজ্ঞানের পরীক্ষা। সেরূপ পরীক্ষা দ্বারা স্বীয় চিত্ত সম্বন্ধে কিছুই জানা যায় না। পূজ্য বনভান্তে প্রশ্ন করেন—তোমাদের পরীক্ষা কি রকম? ভান্তে, আমার নিজের কতটুকু জ্ঞান অর্জিত হয়েছে সেটা পরীক্ষা করা। হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। অপরকে পরীক্ষা করা নয় নিজকে নিজে পরীক্ষা করাই জ্ঞানীদের কাজ। তোমরা সর্বদা নিজের কতটুকু জ্ঞান উদয় হয়েছে সে সম্বন্ধে আত্মপরীক্ষক হয়ে অবস্থান কর। এতে জ্ঞান বৃদ্ধি পাবে, দুঃখমুক্তি নির্বাণ লাভ করা সহজ হবে।
তোমরা কোনকিছু দেখলে শুধুমাত্র ‘দেখছি, দেখছি’ বলে স্মৃতি করবে। মানুষ দেখছি, কুকুর বিড়াল দেখছি, পুরুষ দেখছি, মহিলা দেখছি, অমুককে দেখছি, সমুককে দেখছি ইত্যাদি বলে দৃশ্যতঃ বিষয়ে চিন্তা করা যাবে না। কারণ দৃশ্যতঃ বিষয়ে ‘আমি মানুষ দেখেছি, পুরুষ দেখেছি, মহিলা দেখেছি’ বলে বিচার করলে তাতে সেই সেই বিষয়ে চিত্ত উৎপন্ন হয়। আর সে চিত্তের দ্বারা তখন কাম-ক্রোধাদি ভাবগুলোর উদয় হতে থাকে, রিপুসমূহ মনে স্থান খুঁজে পায়। এ অবস্থায় রিপুসমূহ মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলে ধ্যান ভঙ্গ হয়ে যায়। মনকে ধ্যান বিষয়ে ফিরায়ে আনতে দুঃখ পেতে হয়। কোন শব্দ শুনলেও শুধুমাত্র ‘শুনছি (বা শব্দ) শুনছি’ বলে স্মৃতি করবে। মানুষের শব্দ শুনছি, পশু-পক্ষীর শব্দ শুনছি, পুরুষের শব্দ শুনছি, মহিলার শব্দ শুনছি, কথাবার্তার শব্দ শুনছি, গানের শব্দ শুনছি, বাঘের শব্দ শুনছি, ভলস্ন্লুকের শব্দ শুনছি, হাতির শব্দ শুনছি, অমনুষ্যের শব্দ শুনছি (ভূত-প্রেত-যক্ষ) ইত্যাদি বলে শব্দকে বিচার করা যাবে না। কারণ শব্দকে অমুকের শব্দ, সমুকের শব্দ বলে চিন্তা করলে সেই সেই বিষয়ে চিত্ত উৎপন্ন হয়। সেই চিত্ত বিবিধ প্রকারে দুঃখ সৃষ্টি করে থাকে। কোন গন্ধ নাকে এলেও শুধুমাত্র ‘গন্ধ (বা গন্ধ পাচ্ছি), গন্ধ’ বলে স্মৃতি করবে। মানুষের গন্ধ পাচ্ছি, বাঘের গন্ধ পাচ্ছি, বানরের গন্ধ পাচ্ছি, পুরুষের গন্ধ পাচ্ছি, মহিলার গন্ধ পাচ্ছি, সুগন্ধ পাচ্ছি, দুর্গন্ধ পাচ্ছি বলে গন্ধকে বিচার করতে পারবে না। কারণ ‘এটা অমুকের গন্ধ’, ‘সেটা সমুকের গন্ধ’ বলে বিচার করলে সেই সেই চিত্ত উৎপন্ন হয়। সেই চিত্ত বিবিধ দুঃখের হেতু হয়ে থাকে। কোন কিছুর রসাস্বাদন করলেও শুধুমাত্র ‘খাচ্ছি (বা গিলছি) খাচ্ছি’ বলে স্মৃতি করবে। কি খাচ্ছি? কিসের টক্‌ খাচ্ছি? কিসের মিষ্টি খাচ্ছি? কিসের ঝাল খাচ্ছি? ইত্যাদি বলে খাদনীয় দ্রব্যে বিচার করা যাবে না। কারণ তাতে সেই সেই বিষয়ে চিত্ত উৎপন্ন হয়ে বিবিধ দুঃখ সৃষ্টি করে থাকে। মনে কোন চিন্তা উদয় হলেও শুধুমাত্র ‘চিন্তা করছি’ বলে স্মৃতি করবে। কি বিষয় চিন্তা করছি তা’ বিচার করা যাবে না। কারণ তাতে সেই সেই বিষয়ে চিত্ত উৎপন্ন হয়ে বিবিধ দুঃখের হেতু হয়ে থাকে। এভাবে সর্বদা স্মৃতির সহিত অবস্থান করবে। যাতে কোন কাম-ক্রোধাদি ভাবগুলো উদয় হতে না পারে। রিপুসমূহ মনে স্থান খুঁজে না পায়। অজ্ঞান দূরীভূত হয়ে জ্ঞান বৃদ্ধি পেতে থাকে। পূজ্য বনভান্তে ভিক্ষুসঙ্ঘকে প্রশ্ন করেন—এসব উপদেশ মনে থাকবে তো? ভান্তে, থাকবে। তাহলে সর্বদা স্মৃতির সহিত অবস্থান কর। ইহাই জ্ঞান লাভ ও দুঃখমুক্তি নির্বাণ উপলব্ধি করার উপায়।
তিনি আরো বলেন—তোমরা কখনো মূর্খের সঙ্গে মিশতে যাবে না। মূর্খের সঙ্গে মিশলে বা বন্ধুত্ব করলে বিবিধ দুঃখ, দুর্দশা, দুর্ভোগ পোহাতে হয়। বিপদ যেন নিত্য সঙ্গী হয়ে অনুসরণ করতে থাকে। মূর্খের সংসর্গে কোন উপকার, মঙ্গল সাধিত হয় না; বরং পরিহানি, অধঃপতন সুনিশ্চিত হয় মাত্র। বলা যায়, মূর্খের সংসর্গ সর্বনাশই ডেকে আনে। তাই মূর্খ থেকে সর্বদা দূরে সরে থাকা বাঞ্ছনীয়। কখনো মূর্খদেরকে বিশ্বাস করতে নেই। কিন্তু পণ্ডিতের সঙ্গে বন্ধুত্বের কোন বিকল্প নেই। তাদের সহিত মিশলে কোন বিপদে পড়তে হয় না; অধঃপতন, পরিহানি হবার শঙ্কা থাকে না। বরঞ্চ তাদের সৎগুণ আপন জীবনে প্রতিফলিত হয়ে নিজের উন্নতি, শ্রীবৃদ্ধি ও সুখ বর্ধিত হয়। তাদের সান্নিধ্যে সদ্ধর্মের জ্ঞানচক্ষু উদয় হয়, সুবুদ্ধি জাগ্রত হয়; দুঃখমুক্তি নির্বাণ লাভের পথও সুগম হয়ে থাকে। তাদের সংসর্গই করা উচিত। এটি বলার অপেক্ষা রাখে না যে, মূর্খের সংসর্গ সব সময় পরিত্যাজ্য আর পণ্ডিতের সংসর্গ সর্বপ্রকার কাম্য। তাই তো বলা হয়েছে—
করিয়া মূর্খের সনে পণ্ডিত বিহার,
জ্ঞানযোগে সর্বপাপ করি পরিহার।
দুঃখমুক্তি নির্বাণ প্রত্যক্ষ করতে হলে তোমাদের প্রবল বীর্যের সহিত সাধনামার্গে অগ্রসর হতে হবে। শত বাধা, বিপত্তিতেও নিরুৎসাহ হওয়া যাবে না। এমন কি সেই লক্ষ্য অর্জনে জীবনপণ বাজি রাখতেও প্রস্তুত থাকতে হবে; কোন অবস্থাতে পিছপা হতে পারবে না। বুদ্ধের সময়কালীন ভিক্ষুগণ কি রকম সংকল্প করে জঙ্গলে প্রবেশ করত জান? ‘আমি বীর্যরূপ কবচ দ্বারা কায়া, জীবনের মমতা ত্যাগ করে কাননে প্রবেশ করব; অরহত না হওয়া পর্যন্ত এ’কানন হতে বের হবো না। ভগবান বুদ্ধও গৃহত্যাগ করার পর গয়াধামের নৈরঞ্জনা নদীর তীরে এসে এরূপে সংকল্প করেছিলেন—
করিয়াছি পণ করে প্রাণপণ,
মুক্তির পথ অন্বেষিব,
সাধিতে নারিলে নৈরঞ্জনা নদী তীরে,
এ জীবন বিসর্জিব।
তোমাদেরকেও ভগবান বুদ্ধ প্রমুখ সেই ভিক্ষুগণের দৃঢ় বীর্যপূর্ণ সাধনাকে স্বীয় জীবনের আদর্শরূপে গ্রহণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। জঙ্গলে গিয়ে সাধনা করার সময় যদি কখনো চিত্তে দুর্বলতা ভাব প্রকাশ পায় তখন ভগবান বুদ্ধপ্রমুখ ভিক্ষুগণের সেই বীর্যদৃপ্ত সংকল্পের কথা স্মরণ করবে। তাহলে চিত্তে পুনরায় অসাধারণ মনোবল ফিরে আসবে। সেরূপ অসাধারণ মনোবল ও অপরাজেয় বীর্য দ্বারা বীর বিক্রমের সহিত মারকে পরাজিত করা যায়। কারণ প্রবল ইচ্ছাশক্তির কাছে তৃষ্ণাকেও হার মানতে হয়। তোমরা যদি একান্তই নির্বাণ লাভের আত্ম-প্রত্যয়ী হয়ে সাধনায় নেমে পড়, তাহলে তোমাদের নির্বাণ অধিগত হবেই। সেরূপ আত্মপ্রত্যয়ী সাধনা করতে পারবে কি? ‘আমি অরহত্ব লাভ না করা পর্যন্ত কোন অন্ন-পানীয় স্পর্শ করব না, রুম হতে বের হবো না’ এরূপ দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হয়ে ভাবনায় বসতে পারবে কি? প্রবল বীর্য বলে বলীয়ান হলে পারবে-অন্যথায় নয়। কিন্তু তোমাদেরকে সেরূপ বলীয়ান বলে মনে হচ্ছে না। এবার পূজ্য বনভান্তে ভিক্ষুসঙ্ঘকে প্রশ্ন করেন—বুদ্ধের সময়কালীন ভিক্ষুগণ কি রকম সংকল্পবদ্ধ হয়ে সাধনা করেছিল? ভান্তে, তাঁরা এরূপে সংকল্পবদ্ধ হতো ‘আমি বীর্যরূপ কবচ দ্বারা কায়া জীবনের মমতা ত্যাগ করে কাননে প্রবেশ করব; অর্হৎ না হওয়া পর্যন্ত এ’কানন হতে বের হবো না’। হ্যাঁ, বুদ্ধের সময়কালীন ভিক্ষুগণ সেরূপ দৃঢ় বীর্যবান ছিলেন। তোমরাও তাঁদের মত দৃঢ় বীর্যবান হতে সচেষ্ট থাক।

নির্বান প্রভাবিত ইস্যু কেন

নির্বান যুক্তিশীল প্রভাবিত ইস্যু কেন?
 বৌদ্ধ সমাজ ব্যাপক শিক্ষা বিহিত দর্শনের মধ্যে দিয়ে  আদিকল্যান, মধ্যেকল্যান, এবং অন্তেকল্যানের শিক্ষা সমাদৃতভাবে ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। এই শিক্ষার মাধ্যমে বৌদ্ধদর্শনের উচ্চতা ও ঋজুতা অনুমান করা চলে। মানুষের অধিশীল, অধিচিত্ত, অধিপ্রজ্ঞা এই ত্রিবিধ বিদ্যা অর্জন করতে এই শিক্ষার ব্যাপক গুণাবদান নিহিত রয়েছে। মানবের মধ্যে আত্মপরিশোধিত আর্য্যমানবগণ প্রকৃত বৌদ্ধদর্শনের স্বকীয়তা লাভ করে জগৎ নিবৃতির প্রমাণভিত্তিক মুক্তি পেয়ে জন্মবাদ খণ্ডন করে গেছেন। তাও কঠোর তপস্যার অধ্যয়ন সরুপ অথবা আত্মজয় সরুপ।আত্মনিবৃতিতার্থে নির্বাণ দর্শন।  ইহা বৌদ্ধধর্মের দার্শনিকবৃত্তির চরম লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য। জীবনের চরম পর্যায় বৌদ্ধদর্শনের এ স্তর।এখন আত্মনিবৃতি কি? আত্মনিবৃতি বলতে বুঝায়- আত্মকলুষ, আত্মপাপেচ্ছা, আত্মহীনধর্মতা, আত্মপাপাচরণ থেকে নিজের স্বকীয় দুস্কার্য স্বভাবের চির মুক্তি পাওয়া। চিত্তানুভূতি প্রত্যেক মানব বা স্বত্ত্বকে সারথির ন্যায় ইচ্ছানুসারে পর্যাপদ করছে। মনস্তাত্ত্বিকসৃষ্ট  লোভ, দ্বেষ, মোহময়তা ভাব থেকে আমাদের নিবৃতির মূলাকাঙ্খায় নির্বান দর্শনের যৌক্তিকতা আছে।  দশবিধ ক্লেশ-( লোভ, দ্বেষ, মোহ, মান, মিথ্যাদৃষ্টি,বিচিকিৎসা, স্ত্যানমিদ্ধ,ঔদ্ধত্য, অহ্রী, অনপত্রপা) মানসিক ভারাক্রান্তরোগগুলো হচ্ছে মানষের হীনভাব,  হীনাভ্যাস, হীনসংস্কার। বুদ্ধ আত্মনিবেদিত মানসিক রোগগুলো নিচিহ্ন করে আত্মজয় হয়েছেন। তিনি পরম অভিজ্ঞা দর্শনে জ্ঞাত হলেন যে, শারীরিক রোগের চেয়ে মানসিক সংশ্লিষ্ট রোগসমূহে প্রত্যেক মানুষের ক্ষেত্রে নিষ্পেষিত দুঃখ, অন্তরায়, ও আদীনব আছে। মানসিক রোগ প্রত্যেক মানব জাতিকে শোষিত, নিষ্পেষিত, দলিত করছে। কারণ বুদ্ধ প্রমাণ করেছেন যে, খারাপ চিন্তা-চেতনা, বুদ্ধি, কৌশলগুলো প্রত্যেক মানুষকে আত্মাঘাত করে দুঃখ সৃষ্টির একমাত্র উপাদান।
 তাই ইহা মানব জাতির প্রধান আদীনব বলে বৌদ্ধধর্মের প্রবর্তক গৌতম বুদ্ধ ঘোষণা করেন। আসলে ইহা পারমার্থিকভাবে চিরন্তন সত্য। প্রত্যেক মানব জাতির মানসিকগত সুস্থ বিচার ও সমাধার পরিশিষ্টে ঐহিক -পারত্রিক সুখ-শান্তি রচনা করার শক্তি নিজেদের আছে। তাই বুদ্ধ আত্মনিবেদিত সুকৌশলী ভাল দিক চিন্তা-চেতনাগুলিকে প্রকাশ্যে মার্জিতভাবে উপদেশ নিদর্শন করেন ভিক্ষুসংঘ এবং জনসাধারণের মহলে। নির্বান আসলে বৌদ্ধ পরিভাষায় শব্দবোধক অর্থ থাকলেও কোখনো স্থানভিত্তিক অবস্থান নির্দেশ করে না। শব্দটির তাৎপর্য যেমন নি- অর্থ  ধাতু নিষ্পন্ন, নিরর্থক বা নাই বুঝায়। বাণ -অর্থ তৃষ্ণা, আসক্তি, আকৃষ্টতা বুঝায়। তৃষ্ণা,আসক্তি, আকৃষ্টতা থেকে ছিন্নভাব থাকা। প্রকৃতঅর্থে, নির্বাণ হলো সেই ধর্ম সকল দুঃখ, তৃষ্ণা, প্রেমভাব থেকে পুরিপূর্ণ অবসান। ইহা বৌদ্ধধর্মের লোকত্তর জ্ঞানের পরমার্থ সত্য নির্দেশ করে। স্বভাবত নির্বাণ শান্তিময় বা শান্তি স্বভাব অভিজ্ঞাভাব। একজন মানুষের তৃষ্ণাশক্তি ও কর্মশক্তির শেষ মূহুর্তে এ সত্য দর্শন লাভ হয়। প্রবর্তনকাল সত্ত্ব তৃষ্ণারজ্জুতা বিমুক্ত না হলে নির্বাণ দর্শনও হয়না। অবিদ্যা ধ্বংসের প্রদান উপকরণ হিসেবে নির্বানের লক্ষ্য অপরিসীম। মানবীয় জীবন বিপদ সংকুলের কারণে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন ফল বা ভাগ্য প্রাণীগণ ভোক্তা হয়। সত্য হিসেবে কর্মভাগ্যের বাইরে প্রাণীগণ নেই। সব সময় কর্মচক্রের সার্কেলে নিজের অবস্থান অটুট আছে। বিশিষ্ট দর্শনবিদ নাগসেন- পৃথিবীর একছত্র পরিচালক রাজা মিলিন্দের প্রশ্নে উত্তরে বলেছেন যে, নির্বান এমন একটি অনুমান করার দৃশ্য যা প্রদীপের অগ্নির মতো। প্রজ্ঝলিত প্রদীপ যখন নিভে যায় তখন নির্দিষ্ট অগ্নি কোথায় যায় খেয়ালহীন ভাবে নিবৃতি হয়। অথচ অগ্নি ছিল। ঠিক নির্বান দর্শনলাভী মানুষ্যগণের চিত্তক্ষণও এভাবে নিবৃতি পায়। যা অদৃশ্য রুপে নিরবসান হয়। চিত্তনিবৃতি ক্ষণে মানুষ্য বা সত্ত্বকুলের কর্ম ও জন্মশক্তি মলিন বা ক্ষয় হয়। ইহা পরম সাদৃশ্য নামই নির্বান দর্শন।