Followers

Saturday, December 31, 2016

দুঃখ ত্যাগের প্রশ্ন-মীমাংসা

                                                          দুঃখ ত্যাগের উদ্যম প্রশ্ন-মীমাংসা

রাজা বলিলেন-ভন্তে, আপনারা অতীত দুঃখ ত্যাগের জন্য চেষ্টা করেন কি? না মহারাজ। তবে কি অনাগত দুঃখ ত্যাগের জন্য চেষ্টা করেন? না মহারাজ। তাহা হইলে বর্তমান দুঃখ ত্যাগের জন্য চেষ্টা করেন কি? না মহারাজ। যদি এই ত্রিকাল দুঃখ ত্যাগের চেষ্টা না করেন, তবে কি জন্য চেষ্টা করিয়া থাকেন? স্থবির বলিলেন-কেন মহারাজ, আমাদের এই বর্তমান দুঃখ নিরোধ হইবে, অন্য দুঃখ উৎপন্ন হইবে না, এই জন্যই আমরা চেষ্টা করি। ভন্তে, অনাগত দুঃখ আছে কি? না মহারাজ। ভন্তে, আপনারা অতিপণ্ডিত, যেহেতু আপনারা অবিদ্যমান দুঃখ ত্যাগের জন্য যত্নশীল। মহারাজ, রাজাদের মধ্যে আপনার এমন কোন শত্রর্ব আছে কি যাহারা আপনার প্রতিদ্বন্ধী? আছে ভন্তে। মহারাজ, আপনারা কি তখন পরিখা খনন করাইয়া থাকেন? প্রাচীর নির্মাণ করাইয়া থাকেন? ফটক অট্টালক করাইয়া থাকেন? ধান্যের যোগার করিয়া রাখেন? না ভন্তে। পূর্বেই সেইগুলি প্রস্তুত থাকে। তবে কি মহারাজ, হস্তী, অশ্ব, রথ, ধনুঃ, অসিচালন প্রভৃতি তখন শিক্ষা দিয়া থাকেন? না ভন্তে, পূর্বেই শিক্ষিত থাকে। ঐরূপ করেন কেন? ভন্তে, অনাগত ভয় অতিক্রমের জন্য। মহারাজ, অনাগত ভয় আছে কি? না ভন্তে। আপনারাও ত মহারাজ অতিপণ্ডিত, যেহেতু অনাগত ভয় নিবারণের জন্য সমস্ত প্রস্তুত রাখেন।


পুনরায় উপমা প্রদান করুন। কেমন মহারাজ, যখন আপনি পিপাসিত হইবেন, তখন জলপান করিবার জন্য কূপ-পুষ্করিণী-তড়াগ খনন করাইবেন কি? না ভন্তে, পূর্বেই প্রস্তুত করা হয়। ঐরূপ করেন কেন? অনাগত পিপাসা নিবারণের জন্য প্রস্তুত করা হয়। আপনার অনাগত পিপাসা আছে কি? না ভন্তে, মহারাজ, আপনারাও ত অতিপণ্ডিত যেহেতু অনাগত পিপাসা নিবারণকল্পে কূপাদি প্রস্তুত করিয়া রাখেন।
পুনরায় উপমা প্রদান করুন।- কেমন মহারাজ, যখন আপনি ক্ষুধার্ত হইবেন, তখন “ভাত খাইব” ভাবিয়া ক্ষেত্র কর্ষণ, ধান্য বপন করাইবেন কি? না ভন্তে, পূর্বেই প্রস্তুত করা হয়। ঐরূপ করেন কেন? অনাগত ক্ষুধা নিবারণকল্পে। মহারাজ, অনাগত ক্ষুধা আছে কি? না ভন্তে। মহারাজ, আপনারাও ত অতিপণ্ডিত, আপনারা ক্ষুধা না হইতে নিবারণের জন্য প্রস্তুত থাকেন। ভন্তে, আপনি সুদক্ষ।

Ajuhn chah


People who have studied a lot and have all the theory down pat, tend not to succeed with meditation because they get stuck at the level of information. In actuality, the mind isn't something which you can really measure using external standards or text books. If it's really getting calm, allow it to become calm. In this way it can proceed to reach the very highest levels of tranquility. My own knowledge of the theory and scriptures was only modest. I've already told some of the monks about the time I was practicing in my third rains retreat; I still had many questions and doubts about samadhi. I kept trying to work it out with my thoughts and the more I meditated, the more restless and agitated the mind
became. In fact it was so bad that I would actually feel more peaceful when I wasn't meditating. It was really difficult. But even though it was difficult, I didn't give up. I kept on practicing, just the same. If I simply did the practice without having any expectations about the results, it was fine. But if I determined to make my mind calm and one-pointed, it would just make things worse. I couldn't work it out. 'Why is it like this?', I asked myself. Later on I began to realize that it's the same as with the matter of breathing. If you determine to take only short breaths, or to take only medium size breaths, or to take only long breaths, it seems like a difficult thing to do. On the other hand, when you are walking around, unaware of whether the breath is going in or out, you are comfortable and at ease. I realized that the practice is similar.Normally, when people are walking around and not meditating on the breath, do they ever suffer because of their breathing? No. It's not really such a problem. But if I sat down and determined to make my mind calm, it would automatically become upadana (attachment), there was clinging in there too. I became so determined to force the breath to be a certain way, either short or long, that it became uneven and it was impossible to concentrate or keep my mind on it. So then I was suffering even more than I had been before I started meditating. Why was that? Because my determination itself became attachment. It shut off
awareness and I couldn't get any results. Everything was burdensome and difficult because I was taking craving into the practice with me.
(Ajahn Chah)

Friday, December 30, 2016

তথাগতের সত্তগণের প্রতি হিতাচরণ প্রশ্নের যুক্তি-তর্ক

                                              তথাগতের সত্তগণের প্রতি হিতাচরণ প্রশ্ন-মীমাংসা

ভন্তে, আপনারা বলিয়া থাকেন-‘তথাগত সত্ত্বগণের অহিত দূর করিয়া হিত সম্পাদন করেন।’ পুনরায় বলেন-অগ্নিস্কন্ধ সূত্র দেশনা সময়ে ষাটজন ভিক্ষুর রক্ত বমি হইয়াছিল, এই কারণে আমি বলিতে চাই তিনি হিতের পরিবর্তে অহিত করিয়াছেন। যদি হিতার্থ ধর্মদেশনা করেন, এই যে রক্ত বমি তাহা মিছা, না হয় হিতার্থ ধর্ম দেশনা এইটি মিছা, ইহার মীমাংসা করুন।
মহারাজ, সত্যই সর্বসত্ত্বের হিতার্থ তথাগত দেশনা করেন, আর এই যে ভিক্ষুদের রক্ত বমি, তাহা তথাগতের কৃতকার্য নহে। সেইটা তাহাদেরই কর্মের প্রভাবে। ভন্তে, বুদ্ধ যদি সেই সূত্র দেশনা না করিতেন, সত্যই তাঁহাদের রক্ত বমি হইত কি? না মহারাজ, তাহারা বাস্তবিক দুর্নীতি- পরায়ণ, তাই বুদ্ধের দেশনা শুনিয়া তাহাদের পরিদাহ উৎপন্ন হইয়াছিল। সেই পরিদাহ কারণে তাহাদের রক্ত বমি হয়। তাহা হইলে ভন্তে, তথাগতই সেই নষ্টের মূল। যেমন ভন্তে, একটি সাপ গর্তে প্রবেশ করিল, একজন লোক মাটি নিবার জন্য তথায় আসিয়া যতই মাটি লইতে লাগিল ততই গর্তটি মাটিতে পূর্ণ হইয়া গেল। কাজেই সাপ নিঃশ্বাস ফেলিতে না পারিয়া গর্তে মরিয়া গেল। তাহা হইলে ভন্তে বলিতে হইবে, পুরুষের কৃত কর্মদ্বারা সাপটি মরিয়া গেল। হাঁ মহারাজ। এই প্রকার ভন্তে, তথাগতই ভিক্ষুদের রক্ত বমির মূল। মহারাজ, তথাগত ধর্মদেশনা করিলেও তাহাদের প্রতি ক্রোধ চিত্ত পোষণ করিয়া করেন নাই। মৈত্রী চিত্তেই করিয়াছেন। এইভাবে ধর্মদেশনা করিলে, যাঁহারা সুনীতিপরায়ণ তাঁহারা ধর্মজ্ঞান লাভ করিয়া থাকেন। যাহারা-দুর্নীতিপরায়ণ তাহাদের পতন হইয়া থাকে। যেমন মহারাজ,

গৌতম বুদ্ধ
আম-জাম-মধুক ফলের গাছ ধরিয়া নাড়া দিলে, সেই গাছে যেই ফলগুলি সারযুক্ত, যেইগুলির বোঁটা শক্ত সেইগুলি থাকিয়া যায়, যেইগুলির বোঁটায় পঁচা ধরিয়াছে, সেইগুলি পড়িয়া যায়। এই প্রকার মহারাজ, বুদ্ধের দেশনায় ক্রোধ চিত্ত নাই, তাই সুশীলের শ্রীবৃদ্ধি হয়, দুঃশীলের পতন হয়। যেমন মহারাজ, কৃষক ধান্য রোপণ করিবার জন্য ক্ষেত্র কর্ষণ করে, সেই কর্ষণের দরুন বহু লক্ষ তৃণ মরিয়া যায়, এই প্রকার তথাগত মৈত্রীচিত্তে ধর্মদেশনা করেন, তাহাতে সুশীলের উন্নতি হয়, দুঃশীল তৃণতুল্য মরিয়া যায়। যেমন মানুষ রসের জন্য ইক্ষু যন্ত্রে পেষণ করে, তখন যন্ত্রের মুখে যেই সব কৃমি থাকে, তাহারা পিষিয়া যায়। সেইরূপ তথাগত পরিপক্ব জ্ঞানদান মানসে সত্ত্বদিগকে   জাগাইতে তিনি ধর্ম-যন্ত্র চালাইয়া থাকেন, তন্মধ্যে যাহারা দুঃশীল তাহারা কৃমির ন্যায় মরিয়া থাকে। ভন্তে, সেই ভিক্ষুরা ঐ ধর্মদেশনায় পতিত হইয়াছে নয় কি? মহারাজ, বৃক্ষ মসৃণকারী গাছটি রক্ষা করিয়া সোজাভাবে পরিশুদ্ধ করে কি? হাঁ ভন্তে, যাহা বর্জনীয়, তাহা ফেলিয়া গাছটাকে রক্ষা করিয়া পরিশুদ্ধ করে। এই প্রকার মহারাজ, তথাগত পরিষদের সকলকে রক্ষা করিতে গেলে জ্ঞানবানদিগকে জ্ঞান দিতে পারেন না, তাই যাহারা দুঃশীল তাহাদিগকে দূর করিয়া জ্ঞানবানদিগকে জ্ঞানদান করেন। যাহারা দুঃশীল তাহাদের নিজের কর্ম প্রভাবেই পতন হইবে। যেমন মহারাজ, কদলী, বাঁশ ও অশ্বতরীর মধ্যে ফল উৎপন্ন হইলে নিজের ফল প্রভাবে তাহারা নষ্ট হইয়া যায়। এই প্রকার দুঃশীলদেরও পতন হইয়া থাকে। যেমন চোরেরা নিজের কুকার্য গুণে নিজের চক্ষু উৎপাটন করে, নিজকে শূলে দেয় ও শিরচ্ছেদ দুঃখ পাইয়া থাকে। এই প্রকার মহারাজ দুঃশীলতা প্রভাবে জিন শাসন হইতে দুঃশীলদের পতন হইয়া থাকে। যেই ষাটজন ভিক্ষুর রক্ত বমি হইয়াছে, তাহা ভগবানের দ্বারাও নহে, অপরের দ্বারাও নহে, কেবল নিজেরই কর্মের দোষে। যেমন কোন পুরুষ জন-সঙ্ঘকে অমৃত দান করিল। বহু লোক সেই অমৃত ভোজন করিয়া নীরোগত্ব প্রাপ্ত হইল, দীর্ঘায়ু লাভ করিল ও সমস্ত বিঘ্ন মুক্ত হইল। অন্য এক পুরুষ সেই অমৃত অন্যায়ভাবে ভোজন করিয়া মরিয়া গেল। মহারাজ, আপনি কি সেই অমৃতদানকারী অপুণ্য প্রাপ্ত হইল বলিবেন? না ভন্তে, এই প্রকার ভগবান দশ সহস্র লোক মণ্ডলে দেবমনুষ্যগণকে দান দিয়াছেন, তন্মধ্যে যাঁহারা পুণ্যবান তাঁহারা ধর্মামৃত প্রভাবে জ্ঞানলাভ করিয়া থাকেন, আর যাহারা হীনপুণ্য তাহারা ধ্বংস হইয়া থাকে। মহারাজ, ভোজন সত্ত্বগণের জীবন রক্ষা করে, তাহাও কেহ কেহ ভোগ করিয়া বিসূচিকা রোগে মরে, তাহাতে কি ভোজনদাতার অপুণ্য হইবে? না ভন্তে। এই প্রকার মহারাজ, তথাগত অযুত লোকমণ্ডলে দেব-মনুষ্যদিগকে ধর্মামৃত দান করিয়া থাকেন। তন্মধ্যে যেই জীবগণ উন্নত, তাঁহারা ধর্মামৃত লাভ করিয়া থাকেন, আর যাহারা অনুন্নত, তাহাদের ধর্মামৃত প্রভাবে ধ্বংস ও পতন হয়। সাধু ভন্তে, নাগসেন।

Thursday, December 29, 2016

স্বাভাবিকাগ্নি ও নরকাগ্নি প্রশ্নের যুক্তিতর্ক


                                                             স্বাভাবিকাগ্নি ও নিরয়াগ্নি প্রশ্ন-মীমাংসা

রাজা বলিলেন- ভন্তে, আপনারা বলিয়া থাকেন-স্বাভাবিক অগ্নির চেয়ে নরকের অগ্নি বেশী গরম। স্বাভাবিক অগ্নিতে ক্ষুদ্র এক টুকরা পাষাণ ফেলিয়া দিলে সারাদিনেও পুড়িয়া ভষ্ম হয় না, অথচ একখানি বৃহৎ পাাষাণ খণ্ড নরকের অগ্নিতে ফেলিয়া দেওয়ামাত্রেই ভষ্ম হইয়া যায়, আমি এই কথা বিশ্বাস করি না। আরার এইরূপও বলেন-নিরয়ে যেই জীবগণ উৎপন্ন হয়, তাহারা বহু সহস্র বৎসর নিরয়ে পক্ব হইলেও ধ্বংস হয় না, ইহাও আমি বিশ্বাস করি না।
স্থবির বলিলেন- মহারাজ, ইহা আপনি কেমন মনে করেন? মকর, কুম্ভীর, কচ্ছপ, ময়ুর, কপোত প্রভৃতিতে যে
স্ত্রী জাতীয় জীব আছে, তাহারা কি চাঁর, পাষাণ কাঁকরসমূহ খাইয়া থাকে? হাঁ ভন্তে, খায়। এইগুলি তাহাদের পেটের মধ্যে গেলেই জীর্ণ হইয়া যায় কি? হাঁ ভন্তে, জীর্ণ হয়। যদি ঐ সমস্ত জীর্ণ হয়, তবে তাহাদের উদরে যে গর্ভ থাকে, তাহা জীর্ণ হয় কি? না ভন্তে। কারণ কি? মনে হয় ভন্তে, কর্মবলে জীর্ণ হয় না। এইরূপ মহারাজ, কর্মবলেই নিরয়বাসীরা বহু সহস্র বৎসর নিরয়ে পাকিয়া ধ্বংস হয় না। উহারা নিরয়ে উৎপন্ন হয়, নিরয়ে বর্ধিত হয়, আর নিরয়ে মরে। ভগবানও দেশনা করিয়াছেন-“যেই পর্যন্ত জীবগণের পাপকর্ম ধ্বংস না হয়, সেই পর্যন্ত নিরয়ে মরে না।”
পুনরায় উপমা প্রদান করুন।- কেমন মহারাজ, সিংহী-ব্যাঘ্রী-দীপী-কুক্কুরীগণ শক্ত অস্থি-মাংস খায় কি? হাঁ ভন্তে খায়। সেইগুলি তাহাদের হজম হয় কি? হাঁ ভন্তে, হয়। তবে তাহাদের উদরের গর্ভ হজম হয় কি? না ভন্তে। কি কারণে? মনে হয় কর্মবলে হয় না। এই প্রকার মহারাজ, নিরয়ের জীবগণ হাজার হাজার বৎসর নিরয় ভোগ করিলেও নষ্ট হয় না।
পুনরায় উপমা প্রদান করুন।- কেমন মহারাজ, সুকোমল শরীরা যবন-ক্ষত্রিয়-ব্রাহ্মণ-গৃহপতিগণের স্ত্রীরা শক্ত খাদ্য-মাংস খায় কি? হাঁ ভন্তে, খায়। তবে কি তাহাদের সেইগুলি হজম হয়? হাঁ ভন্তে, হয়। তাহাদের উদরের গর্ভ হজম হয় কি? না ভন্তে। কি কারণে? কর্মবলে ধ্বংস হয় না। সেইরূপ নারকীরা কর্মফল ভোগ না করিয়া নষ্ট হইতে পারে না। ভন্তে, আপনি সুদক্ষ।

Wednesday, December 28, 2016

বিজ্ঞাতা প্রশ্ন মীমাংসা


                                                      বিজ্ঞাতা প্রশ্ন-মীমাংসা

রাজা বলিলেন-ভন্তে, বিজ্ঞাতার উপলব্ধি হয় কি? মহারাজ, আপনি কোন্‌ বিজ্ঞাতার কথা বলিতেছেন? ভন্তে, দেহের অভ্যন্তরে যে জীব চক্ষুদ্বারা রূপ দেখে, শ্রোত্রদ্বারা শব্দ শুনে, নাসিকাদ্বারা গন্ধ গ্রহণ করে, জিহ্বাদ্বারা রসাস্বাদ অনুভব করে, কায়ের দ্বারা স্পর্শ-যোগ্য বস্থ স্পর্শ করে ও মনের দ্বারা ধর্ম জানে। যেমন আমরা প্রাসাদে বসিয়া যেই যেই জানালা দিয়া দেখিতে ইচ্ছা করি, সেই সেই জানালা দিয়া দেখি। পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণের যে কোন জানালা দিয়া দেখিতে পারি। এই প্রকার ভন্তে, দেহের অভ্যন্তরে যে জীব আছে, সে শরীরের যেই যেই দরজা দিয়া দেখিতে ইচ্ছা করে, সেই সেই দরজা দিয়া দেখিয়া থাকে। স্থবির বলিলেন, মহারাজ, আমি পঞ্চদ্বার সম্বন্ধে বলিতেছি, তাহা মনোযোগের সহিত শ্রবণ করুন-যদি অভ্যন্তরের জীব আমাদের চারিদিকে জানালা দিয়া দেখার ন্যায় রূপ দেখিয়া থাকে, তাহা হইলে চক্ষু-শ্রোত্র, নাসিকা-জিহ্বা, কায়-মন দিয়া সেইরূপই দেখিয়া থাকিবে, ষড়েন্দ্রিয়ের দ্বারা শব্দ, গন্ধ, রস, স্পর্শ ধর্ম জ্ঞাত হইবে কি? না ভন্তে। তাহা হইলে মহারাজ, আপনার আগের কথার সহিত পরের কথা, পরের কথার সহিত আগের কথা মিলিতেছে না।মহারাজ, আমরা প্রাসাদে বসিয়া জানালাগুলি যখন খুলিয়া দিই এবং বিপুল আকাশ দিয়া মুখটি বাহির করি, তখন ভালমতে রূপ দেখিয়া থাকি, এইরূপ অভ্যন্তরের জীবও চক্ষুদ্বার খুলিয়া দিলে বিপুল আকাশটি ভালমতে দেখিয়া থাকিবে, সেইরূপ অপর ইন্দ্রিয়গুলি ও শব্দাদি জ্ঞাত হইবে কি? না ভন্তে। মহারাজ, আপনার আগের সহিত পরের কথা ও পরের সহিত আগের কথা মিল হইতেছে না।  
       যেমন মহারাজ, দিন্ন নামক এক ব্যক্তি বাহির হইয়া বহির্ফটকে দাঁড়াইল, তবে কি মহারাজ, আপনি জানিবেন, দিন্ন বহির্ফটকে দাঁড়াইয়া রহিয়াছে? হাঁ ভন্তে, জানিব। মহারাজ, দিন্ন ভিতরে প্রবেশ করিয়া আপনার সম্মুখে গিয়া যখন দাঁড়ায়, তখন কি আপনি তাহাকে আমার সম্মুখে দেখিতে পাইতেছি বলিয়া জানিবেন? হাঁ ভন্তে, জানিব। এই প্রকার মহারাজ, অভ্যন্তরে যে জীব আছে, সে কি জিহ্বায় অম্লত্ব, লবণত্ব, তিক্তত্ব, কটুত্ব, কষায়ত্ব, মধুরত্ব রস নিক্ষিপ্ত মাত্রেই জানিতে পারে? হাঁ ভন্তে, জানিতে পারে। সেই রসগুলি পেটের মধ্যে প্রবেশ করিলে অম্লত্ব, লবণত্ব, তিক্তত্ব, কষায়ত্ব, মধুরত্ব জানিতে পারিবে ? না ভন্তে। মহারাজ, আপনার আগের কথার সহিত পরের কথা, পরের কথার সহিত আগের কথা ঐক্য হইতেছে না।
যেমন মহারাজ, কোন পুুরুষ একশত ঘট মধু আনাইয়া মধুর পাত্র পূর্ণ করিল, তৎপর একজন পুরুষের মুখ বাঁধিয়া মধুপাত্রে ফেলিয়া দিল। মহারাজ, সেই পুরুষ কি মধুর মিষ্টতা অমিষ্টতা জানিতে পারিবে? না ভন্তে। কি কারণে? তাহার মুখে মধু প্রবেশ করে নাই বলিয়া। মহারাজ, আপনার আগের কথার সহিত পরের কথা, পরের কথার সহিত আগের কথা ঐক্য হইতেছে না।
ভন্তে, আপনার ন্যায় বাদীর সহিত আলাপ করিতে আমি সমর্থ নহি। আপনি ইহার অর্থ নির্ধারণ করুন।
স্থবির অভিধর্ম সংযুক্ত কথার দ্বারা রাজাকে বুঝাইলেন। মহারাজ, চক্ষুর কারণে রূপে চক্ষু-বিজ্ঞান উৎপন্ন হয়। তাহার সহজাত স্পর্শ, বেদনা, সংজ্ঞা, চেতনা, একাগ্রতা, জীবিতেন্দ্রিয়, মনসিকার। এই প্রকারে এই ধর্মগুলি এক একটির উপকারকরূপে জাত হইয়া থাকে। এই পঞ্চ-স্কন্ধে কোন নির্দিষ্ট বিজ্ঞাতা উপলব্ধি হয় না। তদ্রূপ শ্রোত্রাদিতেও বিজ্ঞাতা উপলব্ধি হয় না। ভন্তে, আপনি সুদক্ষ।


দেহ ও মন কোনটি আগে?

                                                             দেহ ও মন কোনটি আগে?
                                                    -----ভদন্ত প্রজ্ঞাবংশ মহাথেরো
দেহের উৎপত্তি আগে, না মন বা প্রাণের উৎপত্তি আগে এই নিয়ে বিতর্ক বহু প্রাচীন। পাখি আগে না ডিমটি আগে সৃষ্টিতত্ত নিয়ে এই দ্বান্ধিক বিতর্কের শেষ নেই। ঘন্টার পর ঘন্টা, দিনের পর দিন মাসের পর মাস বছরের পর বছর যুগান্তর চলে গেছে এই নিয়ে তবুও বিতর্কটির যৌক্তিক সমাধান কোন ধর্মপ্রবক্তা, কোন দার্শনিক, কোন বৈজ্ঞানিক অতীতে দিতে পারেননি। ভবিষ্যতেও কেহ দিতে পারবেন না বলে মহাজ্ঞানী বুদ্ধ সতর্ক করে দিয়েছেন। অতীতে এ প্রশ্নের সমাধানে অক্ষম হয়ে কোন কোন ধর্মপ্রবক্তা ঈশ্বর, স্রষ্টা- ইত্যাদি নামক কাল্পনিক অদৃশ্য মহাশক্তিকে আদি খুঁটি রূপে ধরে নিয়ে সৃষ্টি তত্ত্বের মহাকাব্য রচনা করেছেন। অধিকাংশ দার্শনিকগণও তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। তাই তাঁদেরকে বৌদ্ধিক পরিভাষায় শ্বাশ্বতবাদী বলা হয়। ঘোর বস্তুতান্ত্রিক বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিকগণ উপরোক্ত অদৃশ্য শক্তিকে অস্বীকার করেন। তাই মৃত্যুর পর জন্মান্তরবাদ বা স্বর্গ-নরকাদি কিছুতেই তাঁদের বিশ্বাস নেই এ নিয়ে মাথা ব্যথাও নেই। তাঁরা মননের এক নিবিষ্ট গবেষণায় বস্তুকে মানুষের ও জীব জগতের প্রয়োজনে ভোগ স্বাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধির কাজে লাগানোকে চূড়ান্ত প্রাধান্য দিয়ে চলেছেন।
                বৌদ্ধিক পরিভাষায় এ জাতীয় মনন ও প্রবৃত্তিকে উচ্ছেদবাদ বলা হয়। শ্বাশ্বতবাদ ও উচ্ছেদবাদ বুদ্ধের দৃষ্টিতে উভয়েই দুই অন্তবাদী, দুই চরমে অবস্থানকারী। বুদ্ধের দীর্ঘ পয়তাল্লিশ বছরের প্রচার জীবনে তিনি যেভাবে স্বীয় ধ্যান-গবেষণা লব্ধ অভিজ্ঞতাকে জনজীবন তথা জীবন জিজ্ঞাসার সমাধানে ব্যক্ত করেছেন; তা বিচার বিশ্লেষণ করলে প্রতীয়মান হয় যে, বুদ্ধ মতবাদ উপরোক্ত দুই চরম মতবাদের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান নিয়েছে। বুদ্ধ জীবন জিজ্ঞাসার সমাধানে স্রষ্টা ও সৃষ্টিতত্ত্বের প্রচলিত ধ্যান ধারণাকে যেমন গ্রহণ করেননি; অপরদিকে বৈজ্ঞানিকের প্রয়োগবাদ ভিত্তিক বস্তুর অন্তহীন নিছক ভোগাকাঙ্খায় জীবনের সার্থকতা খুঁজে পাননি। বুদ্ধ তাঁর অধীত জ্ঞানে স্পষ্ট দেখতে পেয়েছেন স্রষ্টা ও সৃষ্টি তত্ত্বই হউক অথবা বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদই হউক প্রত্যেকের প্রয়াসের মাঝে রয়েছে মানুষের সুখ শান্তি ও নিরাপত্তার অভাব বোধ। এক কথায় দুঃখ হতে মুক্তিই সকলের প্রকৃত উদ্দেশ্য। অথচ উপরোক্ত তত্ত্ব বা মতবাদ দুটি দুঃখ নামক সমস্যাটি উদ্ভবের মূল কারণ অনুসন্ধান না করে যেভাবে তাঁরা সে সমস্যার সমাধান দিতে চেয়েছেন, সে পথের শেষ পরিণতিতে স্রষ্টা ও সৃষ্টি তাত্ত্বিকেরা জন্ম দিয়েছেন, ধর্ম ও মতবাদের নামে সামপ্রদায়িক হীনমন্যতা। সেই হীনমন্যতার বাড়াবাড়ি পর্যবসিত হয়েছে ধর্মান্ধতা ও মতবাদ অন্ধত্বে। এই অন্ধত্ব শান্তি, সুখ ও নিরাপত্তার পরিবর্তে জন্ম দিয়ে চলেছে জেহাদ, ক্রসেড জাতীয় অসংখ্য সামপ্রদায়িক ও দলগত দাঙ্গা- হাঙ্গামা ও যুদ্ধ বিগ্রহের রক্ত-গঙ্গা। এই পরিণতি কি সুখের, না নিরাপত্তার?
                    ভুল দর্শন, ভুল তত্ত ও ভুল মতবাদের শেষ পরিণতি ঠিক এমনই। মানুষের সুখের জন্যে, মানুষের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্যেই যদি ধর্মমত, দর্শন ও মতবাদের প্রয়োজন হবে-তা কেন তবে আবার সেই মানুষ হননে ইন্ধন যোগাবে? ক্ষমতা ও ভোগলিপ্সা, নেতৃত্বাভিলাষী অহংকার ও শক্তি মদমত্ততা এ সকল কুপ্রবৃত্তিজাত যে কোন মতবাদ, এভাবেই স্ববিরোধিতা প্রকাশ করে থাকে। একই ভ্রান্তির চর্চা আমরা দেখতে পাই আধুনিক বস্তু-তান্ত্রিক দর্শন মাক্স বাদের মধ্যে। ইহা মানুষের মেধা, মনন ও অনালস্য প্রবৃত্তিকে অস্বীকার করে ধনের সমবন্টনে সাম্যবাদের সুখ-শান্তি ও নিরাপত্তা দেখেছেন। ইহা যেমন এক অবিচার-তার চেয়েও মারাত্মক ভুল; শ্রেণী সংগ্রামের অপব্যাখ্যায় হিংসা, জিঘাংসার মাধ্যমে পেশী শক্তিতে শান্তি আনয়নের প্রয়াসে। এই মতবাদ যে সত্য নহে, মাত্র কয়েক দশকের মধ্যেই প্রমাণিত হয়ে গেল সোভিয়েত ও চীনে তাদের আদর্শচ্যুতির মাধ্যমে।
             তথাগত বুদ্ধ তাই সৃষ্টি তত্ত্ব ও বৈজ্ঞানিক বা মাক্সের ভোগতত্ত এ দুই চরম অন্তের কোনটির প্রতি ধাবিত না হয়ে, শুধু মানুষ নহে, প্রাণ নামক বিষয়টির সমগ্র রাজ্যের প্রকৃতঃ স্বভাব, স্বরূপ ও তার গতি প্রকৃতির উপর এক নিবিষ্ট চিন্তা গবেষণা, ধ্যান অনুধ্যানে তিনি নিবেদিত হয়েছিলেন সুদীর্ঘকাল। তাঁর এই ব্যাপক পর্যবেক্ষণ ও বিচার বিশ্লেষণের মূল লক্ষ্যও ছিল এক- প্রাণী জগতের দুঃখের চির অবসান। তিনি দুঃখ মুক্তির এই গবেষণায় চিকিৎসা বিদ্যার পদ্ধতিই অবলম্বন করলেন। কারণ “দুঃখ” জীবনের জন্যে রোগ জাতীয় একটি মহাসমস্যা।
রোগাক্রান্ত রোগী যেমন অস্বসিত্ম ও যন্ত্রণা কাতর হয়ে সেই রোগ-মুক্তির জন্যে ছট্পট্ করে থাকে; একইভাবে প্রাণী মাত্রেই দুঃখকে পছন্দ করে না। সেই দুঃখ হতে মুক্তি লাভের উপায় সন্ধানে তাই সে সদা তৎপর থাকে। বুদ্ধ তাঁর গবেষণা কর্মে চিকিৎসকের ন্যায় চারিটি পর্যায় দুঃখের চির অবসানের জন্যে অবলম্বন করেছেন। যথা-
(১) তিনি আপনপর দুঃখ নামক সমস্যাটির বর্তমান অবস্থাকে ব্যাপক ও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন, চিকিৎসকের ন্যায় সংসার রোগীর নিকিট থেকে জাগতিক দুঃখ রোগের অস্থিত্বকে ব্যাপকভাবে অনুসন্ধান করেছেন।
(২) দ্বিতীয় পর্যায়ে সেই দুঃখের উৎপত্তি কারণকে অনুসন্ধান
করে লোভ, দ্বেষ, মোহ- এই তিনটিকে অবিষ্কার করলেন।
(৩) তৃতীয় পর্যায়ে তিনি দুঃখের বর্তমান অবস্থা ও এই অবস্থার অতীত কারণ অবগত হতে গিয়ে দেখলেন এগুলো নিরোধধর্মী।  এগুলো যে কারণে উৎপন্ন হয়, তার বিপরীত কারণ দ্বারা ধ্বংস হয়। চিকিৎসা জগতে যেমন বিপরীত প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন তা রোগ উপশম করে থাকেন।
(৪) চতুর্থ পর্যায়ে তিনি দুঃখের চির অবসানের সেই পথ নির্দেশ করলেন, আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ অনুশীলনের মাধ্যমে। চিকিৎসক যেভাবে রোগীকে প্রেসক্রিপশন প্রদান করেন। রোগ নিরাময়ে ডাক্তার প্রেসক্রিপশন দানের পর ডাক্তারের দায়িত্ব শেষ হয়। অতঃপর সম্পূর্ণ দায়-দায়িত্ব বর্তায় রোগীর উপর। রোগীকে সেই প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ঔষধ পথ্য সংগ্রহ করতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ঔষধ পথ্য খেতে হবে। যতদিন রোগ আরোগ্য না হয় ততদিন মাঝে মাঝে ডাক্তারকে রোগের পরবর্তী পরিস্থিতি অবগত করাতে হয়।
প্রয়োজন বোধে ডাক্তার ঔষধ পরিবর্তন করে দেন।
      চিকিৎসা বিদ্যার এই পদ্ধতিই নানা সমস্যায় নিত্য জর্জরিত অশান,ত্ম চঞ্চল, বিক্ষিপ্ত চিত্ত সম্পন্ন মানুষকে অবলম্বন করতে হবে তার জীবন দুঃখের চির অবসানে। ইহাই বুদ্ধের আবিস্কার এবং বুদ্ধের শিক্ষা-উপদেশ। এই উপদেশকে বলা হয় চারি আর্যসত্য জ্ঞান এবং প্রতীত্য সমুৎপাদ নীতি জ্ঞান। বুদ্ধ আবিষ্কৃত এই দুই জ্ঞানের পরিচয় এবং তা আয়ত্ব করতে ব্যাপক আলোচনা প্রয়োজন। বর্তমান নিবন্ধে তা সম্ভব নহে বিধায় এখানে সংকেত টুকু মাত্র দেয়া হলো।
১। চারি আর্য সত্য জ্ঞান : (১) দুঃখের সম্পর্কে ব্যাপক জ্ঞান, (২) দুঃখের কারণ তথা লোভ-দ্বেষ-মোহের সম্পর্কে ব্যাপক জ্ঞান অর্থাৎ কত বিচিত্রভাবে দুঃখের এই কারণ সমূহ জীবনে দুঃখের আগমন ঘটায় তা সূক্ষ্মতি-সূক্ষ্মভাবে অবগত হওয়া, (৩) দুঃখের নিরোধে জ্ঞান এবং (৪) সেই দুঃখ নিরোধের উপায় সম্পর্কে জ্ঞান।
২। প্রতীত্য সমুৎপাদনীতি জ্ঞান : (১) অবিদ্যা সম্পর্কে জ্ঞান, (২) অবিদ্যার কারণে উৎপন্ন ‘সংস্কার’ সম্পর্কে জ্ঞান, (৩) সংস্কারের কারণে উৎপন্ন ‘বিজ্ঞান’ সম্পর্কে জ্ঞান, (৪) বিজ্ঞানের কারণে উৎপন্ন ‘নাম-রূপ’ সম্পর্কে জ্ঞান, (৫) নাম- রূপের কারণে উৎপন্ন ‘ষড়ায়তন’ সম্পর্কে জ্ঞান, (৬) ষড়ায়তনের কারণে উৎপন্ন ‘স্পর্শ’ সম্পর্কে জ্ঞান, (৭) স্পর্শের কারণে উৎপন্ন ‘বেদনা’ সম্পর্কে জ্ঞান, (৮) বেদনার কারণে উৎপন্ন ‘তৃষ্ণা’
সম্পর্কে জ্ঞান, (৯) তৃষ্ণার কারণে উৎপন্ন ‘উপাদান’ সম্পর্কে জ্ঞান, (১০) উপাদানের কারণে উৎপন্ন ‘ভব’ সম্পর্কে জ্ঞান, (১১) ভবের কারণে উৎপন্ন ‘জন্ম’ সম্পর্কে জ্ঞান এবং (১২) জন্মের
কারণে উৎপন্ন ক্ষুধা, তৃষ্ণা, রোগ, বার্ধক্য, প্রিয় বিচ্ছেদ, অপ্রিয় সংযোগ, ইচ্ছিত বস্তু অলাভ-এ সকল অনিবার্য দুঃখ সম্পর্কে জ্ঞান।
বর্তমান নিবন্ধের বিচার্য বিষয় “দেহ আগে না মন আগে” এর সম্যক সমাধানে উপনীত হতে পারলে, যেই   মহাসৌভাগ্য একজন ব্যক্তির জীবনে উৎপন্ন হয়; তা হলো উপরোক্ত দুই মহাজ্ঞান; সেই প্রতীত্য সমুৎপাদ নীতিজ্ঞান, এবং চারি আর্যসত্য জ্ঞান। এই মহাসৌভাগ্য লাভের জন্যে মহাজ্ঞানী তথাগত বুদ্ধের উপদেশ
তথা দিক নির্দেশনাকে নিম্নোক্তভাবে উপস্থাপিত করা যায়।
         প্রথমে বিচার করা প্রয়োজন ‘দেহ’ এবং ‘মন’ এ দুটি সম্পর্কে বুদ্ধ কি বলেন। সাধারণ চর্ম চোখের বিশ্লেষণে দেহটা বত্রিশ প্রকার অঙ্গ প্রত্যঙ্গ নিয়ে গঠিত। যথা- চুল, লোম, নখ, দাঁত, চামড়া, মাংস, স্নায়ু, অস্থি, অস্থিমজ্জা, হৃদপিন্ড, যকৃত, ক্লোম, প্লীহা, ফুস্ফুস্, বৃহৎঅন্ত্র, ক্ষুদ্রঅন্ত্র, উদর, বিষ্ঠা, মাথার মগজ, পিত্ত, শ্লেষ্মা, পুঁজ, রক্ত, ঘর্ম, মেদ, অশ্রু, বসা, থু থু, সিকনী, লালা, মুত্র। শব-ব্যবচ্ছেদ বিদ্যায় একটি দেহকে বিভাজিত করলেও প্রায় এই প্রত্যঙ্গ গুলো পাওয়া যায়। বুদ্ধের মতে দেহ নিয়ে এই অভিজ্ঞতাকে চর্ম চোখের সাধারণ জ্ঞান তথা সংজ্ঞা বা সংজানন জ্ঞান বলা হয়। জ্ঞানের ক্রম উৎকর্ষতার এই প্রাথমিক ধাপের পরবর্তী ধাপ হলো বিজানন জ্ঞান। আধুনিক প্রচলিত ভাষায় আমরা তাকে “বিজ্ঞান” বলে থাকি। বিজানন জ্ঞানের এই স্তরে বুদ্ধ ‘দেহ’ কে মোট চারটি অংশে বিভাজন করেছেন। যথা- মাটি, জল, বায়ু এবং তাপ। তিনি দেহ গঠিত
হওয়ার এই চারিটিকে “চত্তারো মহাভূতো” বা চারি মহাধাতু উপাদান বলেছেন। মহাপ্রাজ্ঞ বুদ্ধের দৃষ্টিতে কেবল মাত্র দেহ নহে এই বিশ্ব চরাচরে প্রাণ অপ্রাণ, গ্রহ, নক্ষত্র যতকিছু চোখে দেখা যায় তৎ সমুদয় বস্তুও গঠিত হয়েছে এই চারি মহাধাতু উপাদান দ্বারা। আধুনিক বিজ্ঞান প্রাণ-অপ্রাণ যাবতীয় বস্তুকে অনুপরমাণুতে বিভাজিত করতে গিয়েও এই বস্তু তত্তে উপনীত হয়েছে।
                  বিজ্ঞান জগতে অতি সামপ্রতিক দুটি আবিষ্কার হলো ‘ইন্টারনেট’ এবং ‘জিন প্রযুক্তি।’ বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ ব্যবস্থায় ইন্টারনেট এর সাফল্য পুরো বিশ্বকে এখন হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছে। অপরদিকে ‘জিন প্রযুক্তিতে’ জীবের দেহ ও মনের গঠন কৌশল নিখুতভাবে ধরতে পেরে এখন বিজ্ঞানের গবেষণাগারে ইচ্ছামতো রক্তমাংসের মানুষ তৈরী করছে।
কাল্পনিক ঈশ্বর বিশ্ববাসীরা তাতে বাঁধা দিলেও স্রষ্টা ও সৃষ্টি সম্পর্কে বুদ্ধের আবিষ্কৃত সৃষ্টিতত্ত্বই যে চরম সত্য, আধুনিক বিজ্ঞানীরা বহুকাল পরে বস্তু দিয়ে তা সপ্রমাণ করলেন।
বিজ্ঞানের প্রযুক্তিগত এই সাফল্য প্রমাণ করে দিল বস্তু হতেই প্রাণের জন্ম। তাই বস্তু আগে, প্রাণ পরে।
বস্তুতত্ত্বের এই স্তরে বুদ্ধও দেখিয়েছেন মাটি, জল, বায়ু এবং তাপ এই চারি মহাধাতু উপাদানের প্রত্যেকটির মধ্যে স্থিত থাকে বর্ণ, গন্ধ, রস (নির্যাস), ওজ (শক্তি) এই নামে চারিটি গুণাবলী। মাটি, জল, বায়ু, তাপ এবং বর্ণ, গন্ধ, রস, ওজ-মোট এই আটটি বিষয়কে বলেছেন অষ্টকলাপ। বস্তুতঃ অষ্টকলাপ হতে সম্যুৎপন্ন শক্তিই হলো প্রাণ বা জীবন শক্তি। বুদ্ধের ভাষায় এই জীবন শক্তিকে বলা হয়েছে ‘জীবিতেন্দ্রিয়ং’ ‘বিঞ্ঞানং’।
এই জীবিতেন্দ্রিয় বা বিজ্ঞান নামক শক্তিটি দেহজাত চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহবা ও দেহ এই প্রত্যঙ্গগুলোর সাথে নানা বিষয়ের আঘাত হওয়ার ফলে জন্ম নেয় ‘চিত্ত’ নামক এক জটিল অনুভূতি শক্তি বা ধারণা। এই অনুভূতি শক্তিই কেসেট রেকর্ডারের মতো বর্হিজগত হতে প্রতিনিয়ত সংগ্রহ ও ধারণ করতে গিয়ে ‘চিত্ত’ বা ‘মনের’ যেই স্বভাব গঠিত হয়েছে সে সম্পর্কে বুদ্ধের উক্তি- ‘ফন্দনং চপলং চিত্তং’ অর্থাৎ চিত্তের স্বভাব ধর্ম হলো সদা কম্পমানতা স্পন্দনশীলতা। চিত্তের এই কম্পন ও উল্লম্পনতার কারণ চক্ষু, কর্ণাদির দ্বারা বর্হিজগতের বিষয় বা আলম্বন হতে প্রাপ্ত আঘাত। মনের আরো একটি স্বভাব সম্পর্কে বুদ্ধ বলেছেন “মনো পুব্বঙ্গমো ধম্মা, মনো সেট্ঠো মনোময়” অর্থাৎ চিত্ত দ্বারা আহরিত যাবতীয় বিষয়ের ধারণা, সংরক্ষণ ও পরিকল্পনায়, পরিচালনায় মনই সর্বদা নেতৃত্ব দেয়। মোট কথা পূর্বোক্ত বর্ণনা হতে আমরা এখন অতি সহজে এই চুড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, দেহ হতে মনের উৎপত্তি। অতএব ‘দেহ আগে না মন আগে’ প্রশ্নটির উত্তরে বুদ্ধের ব্যাখ্যায় প্রমাণিত হয়েছে দেহের উৎপত্তি আগে, মনের উৎপত্তি পরে।
মাতৃগর্ভে পিতার শুক্র হতে একটি শিশুর ভ্রুণের উৎপত্তি ও তার ক্রমবিকাশের প্রতি লক্ষ্য করেই আধুনিক জীব বিজ্ঞানও এখন বুদ্ধ আবিষ্কৃত সেই একই তত্ত্বটিতে উপনীত হয়েছে। বুদ্ধ বলেছেন এই দেহধারীগণ আসলে কোন প্রাণী, সত্ত্ব বা জীব নহে; ইহারা “নিস্সত্তো, নিজ্জীবো, সুঞ্ঞো, ধাতুমত্তমেবেতং।” অর্থাৎ প্রাণী বা জীবেরা হচ্ছে আসলে নিষ্প্র্রাণ, নির্জীব, শূন্য। মাটি, জল, বায়ু, তাপ এই চারি মহাধাতু সমষ্টিই হচ্ছে এই প্রাণী জগত। চিত্তের উৎপত্তি ও গতি (বিভিন্ন বিষয়ে চিন্তন, অনুচিন্তন) সম্পর্কে বুদ্ধের অভিমত-“সুদ্ধ ধম্মং পবত্তন্তি।” অর্থাৎ ঘড়ির নিয়ম মাফিক আবর্তনের ন্যায় চক্ষু, কর্ণাদি ইন্দ্রিয় (ংবহংব ড়ৎমধহব) পথে চারি পাশে বিরাজিত পরিবেশ হতে প্রাপ্ত বিষয়বস্তু বা আলম্বনের সংস্পর্শ জাত আঘাতের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়াই হচ্ছে এই চিত্ত প্রবাহ। বিষয় বস্তুর সংস্পর্শজাত চিত্তপ্রবাহ বা কম্পনের অপর নাম সুখ-দুঃখ উপশমাদি বেদনা অনুভূতি বা ধর্ম। সুখ, দুঃখ ও উপেক্ষা এই ত্রিবিধ বেদনা বা অনুভূতি হতে জন্ম নেয় ভালো-মন্দ কর্মের। সেই কর্ম যতক্ষণ পর্যন্ত চিত্ত প্রবাহে বা স্রোতে চিন্তন, অনুচিন্তনের মাধ্যমে আবর্ত্তিত হতে থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে বলা হয় মনোময় কর্ম।
কর্ম তার মনোময় কর্মের সীমা অতিক্রম করে যখন বাক্যে ও দৈহিক অঙ্গ প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে প্রকাশিত হয় তখন তাকে বাককর্ম ও কায়কর্ম বলে। মনোময় কর্মকেই “ধর্ম” বলে বুদ্ধ কর্তৃক উক্ত হয়েছে। সেই ধর্মের পরিণতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে বুদ্ধের দুটি বিখ্যাত উপমা এখানে প্রদত্ত হলো-
“মনো পুব্বঙ্গমো ধম্মা, মনো সেট্ঠ মনোময়া,
মনসা চে পদুট্ঠেন ভাসতি ব করোতি ব,
ততো নং দুক্খ মন্বেতি চক্কং ব বহতোপদং॥”
অর্থাৎ মন চিত্তে উৎপন্ন যাবতীয় মনোময় বিষয় সমূহে নেতৃত্বে দেয়। তাই মন কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরই তা কথায় বা দৈহিকভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। প্রদুষ্ট মনে কথা বললেবা দৈহিকভাবে কোন কাজ করলে তার পরিণতিতে দুঃখ উৎপন্ন হয়। সেই দুঃখ ভারী শকটবাহী বলদের পশ্চাতে ঘূর্ণায়মান চাকার ন্যায় দুষ্কর্মীকে দুঃখ-যন্ত্রণা প্রদান করতে করতে দুষ্কর্মীর অনুসরণ করে। দ্বিতীয় উপমায় বলা হয়েছে :
মনো পুব্বঙ্গমা ধম্মা মনো সেট্ঠ মনোময়,
মনসা চে পসন্নেন ভাসতি ব করোতি ব
ততো নং সুখ মন্বেতি ছায়া বা অনপায়িনী।
অর্থাৎ- চিত্তে উৎপন্ন যাবতীয় মনোময় বিষয় সমূহে মনই নেতৃত্ব দেয়। মন স্থির সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরেই তা বাক্যে বা দেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ দ্বারা প্রকাশিত হয়। তাই প্রসন্ন বা পবিত্র মনে কেহ কোন কথা বললে বা দৈহিকভাবে কোন কাজ করলে, তাতে সুখ উৎপন্ন হয়। সেই সুখ দেহের অপরিত্যাজ্য ছায়ার ন্যায়
সুকর্মীকে সুখ শান্তি প্রদান করে থাকে। বুদ্ধের দর্শনে চিত্তের এই উৎপত্তি এবং গতিটি কিভাবে বর্তমান জীবনটিকে সুখ-দুঃখে সম্পৃক্ত করায় এবং সীমানা অতিক্রম করে বর্তমান জন্ম থেকে জন্মান্তরে পরিভ্রমণ করায়; এখন তা প্রদর্শন করা কর্তব্য। তা না হলে বৌদ্ধরা কিভাবে ঈশ্বরবাদ ও জড় বিজ্ঞানবাদের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান গ্রহণ করে, জীবন ও জগৎ রহস্য সম্পর্কে নিজেদেরকে ভিন্ন অথচ এক অত্যন্ত বাস্তব যৌক্তিক জীবনের অধিকারী হতে পারেন তা অপ্রমাণিত থাকবে। বুদ্ধ বুদ্ধত্ব জ্ঞানলাভের পর মুহূর্তে স্বীয় জীবনের প্রত্যক্ষ উপলব্ধিতে জন্মান্তর সম্পর্কে উক্তি করলেন :-
অনেক জাতি সংসারং সন্ধাবিস্সং অনিব্বিসং;
গহকারকো গবেস্সন্তি দুক্খ জাতি পুনপ্পুনং।
গহকারকো দিট্ঠোসি, পুন গেহং ন কাহসি;
সব্বতে ফাসুকা ভগ্গ, গহকূটং বিসঙ্খিতং।
বিসঙ্খারা গতং চিত্তং তণ্হানং খয়মজ্ঝগা।
অর্থাৎ- দেহ ধারণের ফলে বহু দুঃখ ভোগ করতে হয় দেখে, এই দেহ রূপ গৃহটির নির্মাণ কর্তার সন্ধানে বহুজন্ম পরিভ্রমণ করেছি। কিন্তু তার দেখা না পেয়ে পুনপুনঃ দেহ ধারণের কারণে বার বার বহু দুঃখ যন্ত্রণা আমাকে ভোগ করতে হয়েছে। এবারে এই দেহ গৃহকারকের দেখা পেলাম। তাঁর রচিত গৃহের চুড়া খুঁটি সব
ভেঙ্গে চুড়মার করে দিলাম। তৃষ্ণা নামক ভোগাকাঙ্খা জাত সংস্কারই (চিত্ত) এই গৃহ নির্মাণ কর্তা। এখন আমার সেই তৃষ্ণা ক্ষয় হয়েছে, সংস্কারের বন্ধন হতে চিত্ত বিমুক্ত হয়েছে। তাই দেহ ধারণকারী হে তৃষ্ণা! তুমি এখন পুনঃ দেহ রূপ গৃহ আর নির্মাণ করতে পারবে না।
বুদ্ধ তথাগতের এই স্বগতোক্তিকে বিশ্লেষণ করলে জন্ম থেকে জন্মান্তরে কে এই প্রাণীগণকে নিয়ে যায়-তা দৃশ্যমান হয়। তৃষ্ণা জাত সংস্কারই এই নিয়ামক। তৃষ্ণা হলো মনোপুত বিষয়কে ভোগ করার ইচ্ছা, অমনোপুত বিষয়কে ত্যাগ করার ইচ্ছা, কোন কোন বিষয়ে উপেক্ষা বা উদাসীন থাকার ইচ্ছা। সংস্কার হলো, সেই ভোগ, ত্যাগ আর উপেক্ষা নামক ইচ্ছাকে ভিত্তি করে উৎপন্ন বিষয় বা আলম্বনের মানসিক ছাপ বা ছবি। মৃত্যু শয্যা
শায়িত মুমুর্ষ ব্যক্তি বা এমতাবস্থায় পতিত যে কোন প্রাণীর দেহের সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গ স্নায়ু তন্ত্রীর কর্মশক্তি শিথিল হওয়ার কারণে দেহ অনুভূতিহীন হয়ে গেলেও, তার চিত্ত অনুভূতিহীন হয়ে গেলেও তার চিত্ত তখনো সচল থাকে। সেই চিত্তে উক্ত সংস্কার নামক মানসিক ছবিগুলো তখন মুমুর্ষ ব্যক্তির মানসপটে ফিল্মের ন্যায় আনাগোনা শুরু করে। তৃষ্ণা নামক ইচ্ছা শক্তিটি তখন চুম্বকীয় শক্তিতে পরিণত হয়ে থাকে। জীবনে সেই ব্যক্তি যে ইচ্ছাটির প্রতি প্রবল আসক্ত ছিল বা যে কাজটি প্রতিনিয়ত সম্পাদন করতে করতে সে দারুণ অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল, তার মানসিক ছাপ বা সংস্কারটিই স্বাভাবিক ভাবে তখন তার মুমুর্ষ অবস্থার চিত্ত গতিকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করতে থাকে।
তখন সেই প্রবল গতিময় চিত্ত জোঁকের ন্যায় কম্পিত অবস্থায় কিছুক্ষণ অনুসন্ধান অনুচিন্তনের পর, সেই প্রবলতর শক্তিমান মানসিক ছবিটিকে আলম্বন করে তদনুযায়ী অনুকূল অবস্থানে উল্লম্পন দেয়, এই দেহ ত্যাগ করে অন্যদেহের মাতা-পিতার চিত্ত অনুকূল কোন গর্ভাশয়ে আশ্রয় গ্রহণ করতে। শত সহস্র বর্ষ আগে
উচ্চারিত মানুষ বা প্রাণীকূলের বিশাল শব্দভাণ্ডার যেমন আকাশে স্থিত বায়ুতে ইতর তরঙ্গ শক্তি সৃষ্টি করে এখনো বিরাজ করছে; একইভাবে কোন কোন মানুষ বা প্রাণী মৃত্যুক্ষণে ইচ্ছা শক্তির দুর্বলতা বা গর্ভ নির্বাচনে অক্ষমতার কারণে, উপরোক্ত ভাবে অন্য দেহে আশ্রয় গ্রহণে অক্ষম হলে; কিছুকাল স্বীয় পরিচিত পরিবেশে (জ্ঞাতী স্বজনের আশেপাশে) ইচ্ছা শক্তিরূপে অদৃশ্যে অবস্থান করে থাকে। জীবিত জ্ঞাতীগণ তাদের এই অস্থির অসহায় অবস্থায় পুণ্যদান জনিত ইচ্ছাশক্তি দিয়ে তাদেরকে সাহায্য করে, উত্তম গর্ভে জন্ম ধারণে শক্তি
যোগাতে পারে। বৌদ্ধ ধর্মে ইহাই জন্মান্তরবাদ। এতদূর পর্যন্ত অনাত্মবাদী বৌদ্ধধর্মে এই পর্যন্ত আত্মার স্বীকৃতির পরিধি। এই পরিধিকে বলা হয় সংসার বা লোক চক্রবাল। যতদিন পর্যন্ত মানুষ তথা প্রাণীগণ বুদ্ধ কথিত তৃষ্ণা ও সংস্কারের বন্ধন মুক্ত হতে না পারছে, ততদিন তাকে এই সংসার আবর্তে পুনঃপুন দেহ ধারণ করে, জন্ম থেকে জন্মান্তরে  ধাবিত হতেই হবে। আর ভোগ করতে হবে অনন্ত দুঃখ যন্ত্রণা। ধনী হোক দরিদ্র হোক-সকলেই দেহ ধারণের উপদ্রব যন্ত্রণার অধীন। যে দিন প্রজ্ঞার আলোকে এই দুঃখ যন্ত্রণাকে তীব্রভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে, সেদিন সে তার হাত থেকে মুক্তি কামনায় ছট্পট্ করবেই করবে। তৃষ্ণা আর সংস্কারের বন্ধন ছিন্ন করতে রাজপুত্র সিদ্ধার্থের ন্যায় সংসারের যাবতীয় ভোগাকাঙ্খাকে তখন সে বিষ্টার ন্যায় ত্যাগ করতে পারবে। দেহ ধারণ জনিত ক্ষুধা, শীত-গরম, বৃষ্টি- কাঁদা, মশা-মাছি, রোগ-পীড়া, জরা-বার্ধক্য, প্রিয় বিচ্ছেদ, অপ্রিয় সংযোগ, আকাঙ্খিত বসত্মূ বা বিষয় লাভ না করা, সর্বোপরি মরণভীতি; এসকল অনিবার্য উপদ্রব, দুঃখ-যন্ত্রণাকে গভীর ভাবে উপলব্ধি করতে পারলেই সন্ন্যাসী সিদ্ধার্থের উচ্চারিত বজ্র কঠোর সংকল্পের ন্যায় সেই দুঃখ মুক্তিকামী জনও তখন দাঁত চেপে জিহ্বার অগ্রভাগকে তালুতে ঠেকিয়ে দেহের সমস্ত মাংস পেশী আর মেরুদণ্ডকে লৌহের মতো শক্ত করে উচ্চারণ করবে- ইহাসনে শুষ্য তুমে শরীরং তগস্থি মাংসং প্রলয়ঞ্চ যাতু; অপ্রাপ্য বোধিং, বহুকল্প দুর্লভং, নৈবৎশ্মনাৎ কাযমতস্য লিস্যতে।
এ আসনে শরীর মোর যাক্রে শুকায়ে;
চর্ম অস্থি মাংস যাক সব প্রলয়ে ডুবিয়ে।
বহু কল্প দুর্লভ ধন অপ্রাপ্য বোধি;
টলিবে না আসন হতে প্রাপ্তি অবধি।
জীবন দুঃখ মুক্তির তীব্র অভিলাষী এমন সংকল্প এমন দৃঢ় বীর্য পরাক্রমী না হলে, অন্য কোন শক্তি দিয়ে সংসার মায়ার বন্ধনকে ছিন্ন করা অসম্ভব। অবিদ্যাচ্ছন্ন অনন্ত জন্মের বিশাল সংস্কার রাশী এমন বীর্যবান জীবন-মরণ প্রতীজ্ঞাবদ্ধ জনই উত্তীর্ণ হয়ে থাকেন। তাঁদের মহা সৌভাগ্যবান ভগবান বলা হয় এ কারণেই। লোকুত্তর পুরুষ বা আর্য পুদগল এমন ব্যক্তিগণের মনে তখন আর কোন প্রশ্ন থাকে না-এই সৃষ্টি ও তার স্রষ্টার রহস্য নিয়ে। প্রশ্ন থাকে না আত্মা অনিত্য, না চির শাশ্বত, দেহ আগে না মন আগে-এই নিয়ে।

Tuesday, December 27, 2016

Shila,samadhi & panna is best tree rule


According to the theory, we say that it's sila, samadhi and then panna; but I've
reflected on this and found that panna underlies all the other aspects of the
practice. You need to fully understand the effects of your speech and actions on
the mind and how it is that they can bring about harmful results. Through
reasoned reflection you use panna to guide, control and thereby purify your
actions and speech. If you know the different characteristics of your actions and
speech which are conditioned by both wholesome and unwholesome mental
states, you can see the place of practice. You see that if you're going to
cultivate sila, it involves giving up evil and doing good; giving up that which is
wrong and doing that which is right. Once the mind has given up doing wrong
and has cultivated doing what is right, it will automatically turn inwards to
focus upon itself and become firm and steady. When it's free from doubt and
uncertainty about speech and actions, the mind will be steadfast and
unwavering, providing the basis for becoming firmly concentrated in samadhi.
This firm concentration forms the second and more powerful source of energy in
the practice, allowing you to more fully contemplate the sights, sounds and
other sense objects which you experience. Once the mind is established with
firm and unwavering calm and mindfulness, you can engage in the sustained
contemplation of form, feeling, perception, thought and consciousness, and with
the sights, sounds, smells, tastes, tactile sensations and mind-objects, and see
that all of these are constantly arising. As a result you will gain insight into the
truth of these phenomena and how they arise according to their own nature.
When there is continuous awareness, it will be the cause for panna to arise.
Once there is clear knowledge in accordance with the true nature of the way
things are, your old sanna and sense of self will gradually be uprooted from it's
former conditioning and will be transformed into panna. Ultimately, sila,
samadhi and panna will merge in the practice, as one lasting and unified whole.
(Ajahn Chah)

Monday, December 26, 2016

বিজ্ঞান ভিত্তিক ধর্মব্যাখ্যা: বিজ্ঞানী আইনস্টাইন


                            এ পৃথিবীকে পরিবর্তন করে দেয়া, হাজার
বছরের শ্রেষ্ঠ পদার্থ বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন, পৃথিবীতে এ
পর্যন্ত যত ধর্মের অবতারনা হয়েছে তার মধ্যে একমাত্র বৌদ্ধ ধর্মেই রয়েছে
আগামী দিনের “কসমিক রিলিজিয়াস” অনুভূতির ধারনা এবং ব্যাপ্তি। রিলিজিয়াস
কসমোলজি হচ্ছে, পৃথিবীর আদি, অন্ত এবং সৃষ্টি সম্পর্কে ধর্মীয় ব্যাখ্যা। সে অর্থে
কসমিক রিলিজিয়ন হলো এমন রিলিজিয়ন বা ধর্ম যা পৃথিবীর সৃষ্টি, আদি এবং অন্ত –
এর সঠিক এবং বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা দিতে পারে। আমরা দেখি, গৌতম বুদ্ধের
শিক্ষা মানুষকে নিজের চিত্তের  নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ধীরে ধীরে
নির্বানের পথে নিজেকে নিয়ে যেতে শেখায়। বুদ্ধ বলেছেন, আমার শিক্ষা
জ্ঞাণীদের জন্যে। তুমি যদি নিজের মন দ্বারা বিভ্রান্ত না হয়ে সেগুলো
সঠিকভাবে পড়তে জানো তবে তুমি এই মহাবিশ্বের প্রকৃত শিক্ষা পাবে।
Among the founders of all religions in this world,
I respect only one man — the Buddha. The main
reason was that the Buddha did not make
statements regarding the origin of the world. The
Buddha was the only teacher who realised the
true nature of the world.
আইনস্টাইন বলেছেন যে পৃথিবীতে যত ধর্মের প্রবর্তক আছে, তাঁদের মধ্যে আমি
শুধু গৌতম বুদ্ধকে শ্রদ্ধা করি। শ্রদ্ধা করার প্রধান কারন হল যে গৌতম বুদ্ধ কোন
পৃথিবীর উৎপত্তির উক্তি ব্যাখ্যা দেননি। শুধু একমাত্র গৌতম বুদ্ধ উপলদ্ধি করেছেন
সত্যিকার অর্থে প্রাকৃতিকভাবে পৃথিবীর উৎপত্তি।
                            আইনস্টাইন বৌদ্ধ ধর্মকে আগামীর একমাত্র
ধর্ম বলে গিয়েছিলেন যা এই পৃথিবীর সমস্ত কিছুর বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যাকে
ধারন করে থাকবে। তাঁর এই কথার পেছনে মূল কারন হলো বৌদ্ধ ধর্মই একমাত্র
চিত্তের নিয়ন্ত্রন, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ বা জয় করা, ঈশ্বর কেন্দ্রীক ধর্মীয় বোধকে
এড়িয়ে যাওয়া, শুধু নিজে কিংবা মানুষ নয় বরং সকল প্রাণীর প্রতি মমত্ববোধ, এবং
সর্বশেষ মানুষকে যে কোন কিছুই অভিজ্ঞতার মাধ্যমে উপলব্ধি, শেখা ও
ধারন করা –এ শিক্ষা গুলোর উপরে ভিত্তি করে দাড়িয়ে রয়েছে। আর একারনেই
আইনস্টাইন বলেছেন, “ভবিষ্যতের একটি কসমিক রিলিজিয়নে যেমন হওয়া দরকার
বৌদ্ধ ধর্মের সেই সকল বৈশিষ্ট্য রয়েছেঃ এটি “ব্যক্তি ঈশ্বর” ধারনাকে
ব্যবহার করে, অন্যের চাপিয়ে দেওয়া কোন “অবিতর্কযোগ্য”ও ঈশ্বর কেন্দ্রীক
ধর্মীয় বিশ্বাসকে অগ্রাহ্য করে।   বৌদ্ধ ধর্ম প্রাকৃতিক এবং আত্মিক দুটি ধারণাকেই
অর্থপূর্ণভাবে একীভূত করতে পেরেছে; এবং এটি প্রাকৃতিক এবং আত্মিক দুই
ক্ষেত্রেই অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান থেকে তৈরী ধর্মীয় অনুভূতির উপরে ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে”।
          (১) এমন আরেকটি বক্তব্যে আইনস্টাইন
বলেছেন, “যদি পৃথিবীতে এমন একটি ধর্মও থেকে থাকে যা আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক চাহিদাকে পূরণ করতে পারবে তবে তা হল বৌদ্ধ ধর্ম। বৌদ্ধ ধর্ম হবে আগামীর কসমিক ধর্ম। এই ধর্ম ভিত্তি
করে অভিজ্ঞতার উপরে, অন্যের চাপিয়ে দেওয়া “অবিতর্কযোগ্য” ধারণার উপরে নয়”।
(২) অন্য আরো একটি বক্তব্যে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, “কসমিক ধর্মীয় অনুভূতি ইতিমধ্যেই প্রারম্ভিক পর্যায়ে বিদ্যমান এবং তা বৌদ্ধ ধর্মে”।
 (৩) গৌতম বুদ্ধ মৈত্রী দ্বারাই চিত্তের জয় সম্ভব একমাত্র বৌদ্ধ ধর্মেই বলা হয়েছে, “সব্বে সত্ত্বা সুখীতা হোন্তু” অর্থাৎ
জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক। এ পৃথিবীর সকল জীবের প্রতি অহিংসা প্রদর্শণ এবং সকল প্রাণীর সুখ কামনা বা মৈত্রী কামনা পৃথিবীর অন্য কোন ধর্মেই
শিক্ষা দেয়না। এই পৃথিবীর সকল প্রাণীই এক একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর এই
সর্বজীবের প্রতি দয়া এবং সকল প্রাণীর প্রতি মৈত্রী প্রদর্শণ মানেই নিজেকে
ছাড়িয়ে গিয়ে, আত্মকেন্দ্রীকতা কে বিসর্জন দিয়ে সমগ্র পৃথিবীর প্রতি
অপ্রমত্ততা প্রদর্শণ। এভাবেই শুরু হয় মানুষের নিজেকে ধীরে ধীরে চিত্তকে
পরিশীলতার প্রক্রিয়া। আইনস্টাইনও ঠিক একই কথা বলেছেন, “একজন
মানুষ “ইউনিভার্স” নামে পরিচিত “সামগ্রীকতা”র অংশ যা কাল এবং স্থানের
মাঝেই সীমাবদ্ধ। মানুষ নিজেই নিজের কাছ থেকে অভিজ্ঞতা নেয়; তার চিন্তা
এবং অনুভূতি অন্য সবকিছুর চাইতে আলাদা কিছু – যা তার সচেতনতার এক ধরনের
দর্শনযোগ্য নিজের মত করে গড়ে তোলা ছায়াপরিবেশ। নিজেদের তৈরী এই ছায়া
পরিবেশ আমাদের জন্যে একটি কারাগারের যা আমাদেরকে নিজেদের
চাহিদা আর আশেপাশের কিছু মানুষের জন্যে আবেগ এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে
দেয়। আমাদের কাজ হওয়া উচিৎ এই ছোট্ট কারাগার থেকে নিজেদের মুক্ত করে
পৃথিবীর সকল প্রাণী এবং সমগ্র প্রকৃতির জন্যে আমাদের আবেগ এবং
ভালোবাসাকে ছড়িয়ে দেওয়া। কেউই এ কাজটি সম্পূর্ণরূপে করতে পারেননা তবে
এটার জন্যে সর্বদা সচেষ্ট থাকাও মুক্তির পথে অনেকটাই এগিয়ে যাওয়া যা
আমাদের চিত্তের ভেতরের নিরাপত্তার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে”।
লক্ষ্য করলে দেখা যায় আইনস্টাইন বলেছেন, “বৌদ্ধ ধর্ম প্রাকৃতিক এবং
               আত্মিক দুই ক্ষেত্রেই অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান থেকে তৈরী ধর্মীয় অনুভূতির
উপরে ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে” (১)। অর্থাৎ সকল প্রাণীর প্রতি মৈত্রী প্রদর্শন
হচ্ছে সমগ্র প্রকৃতিকে ভালোবাসারই একটি নামান্তর অন্যদিকে ধ্যাণ এবং বুদ্ধের
নীতি অনুশীলনের মাধ্যমে নিজেকে বা নিজের চিত্তকে জয় করা, অজ্ঞানতাকে
দূর করে নিজের মাঝে লুকায়িত পরম জ্ঞান বিশালতাকে আবিষ্কার করা হচ্ছে আত্মিক
ক্ষেত্র। লক্ষ্য করুন, বৌদ্ধ ধর্মের সকল শিক্ষা এই দুটি
ক্ষেত্রের উপরেই সর্বোচ্চ জোর দেয় এবং এই শিক্ষা অনুসরণ থেকেই অর্জিত
হতে পারে পরম জ্ঞান এবং পরম মুক্তি – নির্বাণ।  আইনস্টাইনের এই ছায়া পরিবেশের কারাগার মানেই বৌদ্ধ ধর্মের সেই অজ্ঞানতা এবং দুঃখের শৃংখল। যে শৃংখলের আবরণে আমরা পরম জ্ঞাণ, শান্তি
এবং মুক্তি কোন কিছুই দেখতে পাই না।
                        আমরা আমদের আশে পাশের বস্তুগত জীবন
নিয়েই নিজেদের এতটাই ছোট কারাগারের মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলেছি
যে এর বাইরে “নির্বাণ”-এর মাধ্যমে নিজেকে “মুক্ত” করা এবং এই মুক্তিই যে
আসল সুখ তা উপলব্ধি করতে পারি না।  বুদ্ধ বলেছেন, তুমি শুনেছো বলেই কোন
কিছু বিশ্বাস করো না, কোন কিছু বলা হয়েছে বা সবাই বলছে বলেই তুমি তা
বিশ্বাস করো না, ধর্মীয় বইতে লেখা আছে বলেই তুমি তা বিশ্বাস করো না,
তোমার গুরু কিংবা শিক্ষক বলেছেন বলেই তুমি তা বিশ্বাস করো না, প্রজম্ন থেকে
প্রজন্ম কোন কিছু চলে আসছে বলেই তুমি তা বিশ্বাস করো না। নিজের পর্যবেক্ষন,
অভিজ্ঞতা এবং বিশ্লেষন এর পর যদি তুমি দেখো তা যুক্তিযুক্ত এবং সকলের জন্যে
কল্যাণকর তখন কেবল তুমি তা গ্রহণ করো এবং তা ধরে রাখো। ঠিক এই কথাগুলোই
আইনস্টাইন বলেছেন এভাবেন “বুদ্ধ ধর্ম
অভিজ্ঞতা কেন্দ্রীক একটি ধর্ম”। এই পরম জ্ঞানোপলব্ধির পথ নিজেকে
অজ্ঞানতার শৃংখল থেকে মুক্ত করা যে অজ্ঞানতার শৃংখলকে আইনস্টাইন “ছায়া
পরিবেশের কারাগার”-এ মানুষের বসবাস বলে অভিহিতি করেছেন। এই অজ্ঞানতার
মাঝে যার বসবাস সে প্রকৃত সুখ কি তা কখনোই উপলব্ধি করতে পারে না। আর তাই
তার প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠা হয়না। ফলে সেই পরম মুক্তি “নির্বাণ”ও মেলে না।
        আর একারনেই আইনস্টাইন তাঁর একটি বক্তব্যে বলেছেন, “মানুষের সত্যিকারের
মূল্য নির্ভর করে তার আত্মিক “মুক্তি”র ধারনা এবং তা অর্জনের উপরে”।
অনেকেই ধারণা করেন, মনে প্রাণে আইনস্টাইন একজন বৌদ্ধ ছিলেন। তবে
তিনি বৌদ্ধ হন আর না হন তাঁর ধারনা যে বৃথা নয় তার প্রমাণ আমরা বৌদ্ধরাই যারা
প্রকৃতই বৌদ্ধ ধর্ম অনুশীলন করি এবং যারা আজকের যুগেও মুক্তির উচ্চ থেকে উচ্চতর
স্তরে আরোহন করছেন। আর এ পৃথিবীর সমস্ত যৌক্তিকতার ব্যাখ্যা যে বৌদ্ধ
ধর্মের মাঝেই রয়েছে তার পরিপূর্ণ প্রকাশ হয়ত এতোদিনে হয়েই যেতো যদি না
পৃথিবীর শাসন ব্যবস্থা অন্য ধর্মগুলোর জোরপূর্বক আগ্রাসন দ্বারা নির্ধারিত
হতো।

Sunday, December 25, 2016

বর্তমান নাম-রূপসমূহের একার্থ-নানার্থ প্রশ্ন



                                            বর্তমান নাম-রূপসমূহের একার্থ নানার্থ প্রশ্ন-মীমাংসা

              রাজা বলিলেন-ভন্তে, জন্মগ্রহণ করে কে? স্থবির বলিলেন- মহারাজ, নাম-রূপ। এই বর্তমান নাম-রূপ কি? না মহারাজ, এই বর্র্তমান নামরূপ জন্মগ্রহণ করে না। কিন্তু এই নাম-রূপদ্বারা ভাল-মন্দ যাহা কাজ করা যায়, সেই কর্ম প্রভাবে অন্য নাম-রূপ জন্মগ্রহণ করে। ভন্তে, যদি এই নাম-রূপ জন্মগ্রহণ না করে, তাহা হইলে সে পাপকর্ম হইতে মুক্ত হইবে কি? স্থবির বলিলেন-যদি জন্মগ্রহণ না করে, মুক্ত হইবে। কিন্তু জন্মগ্রহণ করে বলিয়া পাপকর্ম হইতে মুক্ত হইবে না।
               উপমা প্রদান করুন। মহারাজ, কোন পুরুষ একজন লোকের আম চুরি করিল, সে চোরকে ধরিয়া রাজার নিকট আনিয়া বলিল-দেব, এই ব্যক্তি আমার আম চুরি করিয়াছে। চোর বলে-না দেব, আমি তাহার আম চুরি করি নাই। সে যে আম রোপণ করিয়াছিল, তাহা অন্য, আমি যাহা চুরি করিয়াছি, তাহা অন্য। কাজেই আমি দণ্ড প্রাপ্তির যোগ্য নহি। কেমন মহারাজ, সেই চোর দণ্ড পাইবে কি? হাঁ ভন্তে, পাইবে। কেন? সে যাহাই বলুক না, পূর্বের আমটি ছাড়িয়া দিলেও, শেষের আমটি চুরি করার দোষেও, দণ্ড প্রাপ্ত হইবে। এইরূপ মহারাজ, বর্তমান নাম-রূপ যাহা ভাল-মন্দ কার্য করে, তদ্দ্বারা অন্য নাম-রূপ জন্মগ্রহণ করে, সেই কারণে পাপ-মুক্ত হয় না।
          পুনরায় উপমা প্রদান করুন। যেমন মহারাজ, একজন পুরুষ শালি ধান্য চুরি করিল, ... একজন ইক্ষু চুরি করিল....এই উপমাগুলিও আমের ন্যায়।
যেমন একজন লোক হেমন্তকালে আগুন জ্বালিয়া শরীর উত্তপ্ত করতঃ আগুন না নিবাইয়া চলিয়া গেল। সেই আগুনদ্বারা একজন লোকের ক্ষেত্র জ্বলিয়া গেল। ক্ষেত্র স্বামী তাহাকে রাজার নিকট আনিয়া বলিল-দেব, এই ব্যক্তি আমার ক্ষেত্রটি জ্বালাইয়া দিয়াছে। সে বলে-দেব, আমি তাহার ক্ষেত্র দাহ করি নাই। আমি যে আগুন জ্বালিয়াছি, তাহা অন্য, যেই আগুনদ্বারা ক্ষেত্র জ্বলিয়াছে, তাহা অন্য। কাজেই আমি দ-যোগ্য নহি। কেমন মহারাজ, সে দণ্ড পাইবে কি? হাঁ, দণ্ড পাইবে। কি কারণে? সে যাহাই বলুক না কেন, আগের আগুন ছাড়িয়া দিলেও, পরের আগুনে হইলেও জ্বলিয়াছে। কাজেই সে দণ্ড পাইবে। এইরূপই মহারাজ, ভাল-মন্দ কাজ লইয়া জন্মগ্রহণ থাকিলে, নাম-রূপ পাপ-মুক্ত হয় না।
পুনরায় উপমা প্রদান করুন। যেমন মহারাজ, কোন পুরুষ প্রদীপ লইয়া একটি ধাপে উঠিয়া ভোজন করিল, প্রদীপটি জ্বলিতে জ্বলিতে তৃণে ধরিল, তৃণ জ্বলিয়া ঘরে ধরিল, ঘর জ্বলিয়া গ্রাম দগ্ধ হইল। গ্রামবাসীরা তাহাকে ধরিয়া বলিল-কেন তুমি আমাদের গ্রামটি জ্বালাইয়া দিলে? সে বলে-আমি তোমাদের গ্রাম জ্বালাই নাই। আমি যে প্রদীপে ভোজন করিয়াছিলাম, সে অগ্নি অন্য, আর আগুনে যে গ্রাম জ্বলিয়াছে তাহা অন্য। উভয়ে বিবাদ করিতে করিতে রাজার নিকট উপস্থিত হইল। মহারাজ, এখন আপনি কার পক্ষে থাকিবেন? গ্রামবাসীর পক্ষে। কি কারণে? সে যাহা বলুক না কেন, তাহার উৎপন্ন অগ্নিদ্বারা গ্রাম দগ্ধ হইয়াছে। তদ্রূপ জন্মগ্রহণ থাকিলে নাম-রূপ পাপ-মুক্ত হয় না।
             পুনরায় উপমা প্রদান করুন। যেমন মহারাজ, কোন পুরুষ একটি শিশু কুমারীকে বিবাহ মানসে বরণ করিয়া শুল্ক (পণ) প্রদানপূর্বক চলিয়া গেল। কুমারী যখন বয়ঃপ্রাপ্তা হইল, তখন অন্য একজন পুরুষ শুল্ক দিয়া তাহাকে বিবাহ করিল। এমন সময় প্রথম ব্যক্তি আসিয়া বলে-হে পুরুষ, কেন তুমি আমার ভার্যা নিয়া গেলে? দ্বিতীয় ব্যক্তি বলিল-না আমি তোমার ভার্যা নিই নাই, তুমি যেই কুমারীকে শুল্ক দিয়াছিলে, সেই কুমারী অন্য,
             পুনরায় উপমা প্রদান করুন।-যেমন মহারাজ, গোপালকের হাত হইতে কোন পুরুষ একঘটী দুগ্ধ কিনিয়া পুনঃ তাহার হাতে রাখিয়া চলিয়া গেল। বলিল-কল্য লইয়া যাইব। পরদিন সেই দুগ্ধ দধি হইয়া গিয়াছে। সে আসিয়া বলিল-আমার দুগ্ধের ঘটীটা দাও। গোপালক দধির ঘটীটা দিল। দুগ্ধ ক্রেতা বলিল-আমি তোমার হাত হইতে দধি কিনি নাই, আমাকে দুগ্ধঘট দাও। গোপালক বলিল-আমি ঐ সব জানি না, তোমার ক্ষীরই ত দধি হইয়াছে। যদি তাহারা বিবাদ করিয়া আপনার নিকট আসে, আপনি তাহার কি ব্যবস্থা করিবেন? আমি গোপালকের মতেই মত দিব। কেন? দুগ্ধক্রেতা যাহাই বলুক না তাহার দুগ্ধই ত দধি হইয়াছে। এই প্রকারই মহারাজ, বর্তমান নাম-রূপ অন্য, প্রতিসন্ধি (জন্ম) কালে অন্য। কিন্তু পূর্বের নাম-রূপ হইতেই পরবর্তী নাম-রূপ হইয়াছে। সেই কারণে জন্মগ্রহণ থাকিলে নাম-রূপ পাপ-কর্ম মুক্ত হয় না। ভন্তে, আপনি সুদক্ষ।
আর আমি যেই বয়ঃপ্রাপ্তা যুবতী বিবাহ করিয়াছি, এই স্ত্রী অন্য। দুইজনে বিবাদ করিয়া যদি আপনার নিকট উপস্থিত হয়, তখন আপনি কি ব্যবস্থা করিবেন? ভন্তে, আমি পূর্ব ব্যক্তিকেই দিব। কি কারণে? সে যাহাই বলুক না, ঐ শিশু কুমারীই ত যুবতী হইয়াছিল। এই প্রকারই মহারাজ, মরণকাল পর্যন্ত অন্য নাম-রূপ, জন্মগ্রহণ কালে অন্য নাম-রূপ। তথাপি তাহা পূর্ব নাম-রূপ হইতেই উৎপন্ন হয়। সেই কারণে জন্মগ্রহণ থাকিলে নাম-রূপ পাপ-মুক্ত হয় না।

Bhadant Nagarjun Surai

It was a historic day as over ten thousand people had gathered at Deeksha
Bhumi on this big day to lisetn to the Dhamma Deeksha given by Bhadant
Nagarjun Surai Sasai who is still roaring to make India Prabuddha Bharat.
Wonderful to see so many people deciding to embrace a new path of equalikty
and rationality as shown by Buddha. Most important part is that OBCs in
Maharastra have made a beginning. We hope this process will be followed in
other parts of India. Let people realise where they can get human values with
reasoning and human spirit.







জ্ঞান-প্রজ্ঞা প্রশ্ন মীমাংসা

                    
                   
                 রাজা বলিলেন-ভন্তে, যাহার জ্ঞান উৎপন্ন হইয়াছে, তাহার প্রজ্ঞাও কি উৎপন্ন হইয়াছে? হাঁ মহারাজ, যাহার জ্ঞান উৎপন্ন হইয়াছে, প্রজ্ঞাও তাহার উৎপন্ন হইয়াছে। তবে কি ভন্তে, যাহা জ্ঞান তাহাই প্রজ্ঞা? হাঁ মহারাজ, যাহা জ্ঞান তাহাই প্রজ্ঞা। যদি তাহাই হয়, তাহা হইলে সে কি কোন বিষয়ে মোহ প্রাপ্ত হইবে, না হইবে না? মহারাজ, কোন বিষয়ে হয়, কোন বিষয়ে হয় না। ভন্তে, কোন্‌ বিষয়ে মোহ হয়, কোন্‌ বিষয়ে মোহ হয় না? মহারাজ, যেই শিল্প বিদ্যাদি তাহার জানা নাই, যেই দিকে সে যায় নাই, যেই নাম প্রজ্ঞপ্তি তাহার শুনা নাই, এই বিষয়গুলিতে তাহার মোহ আসিবে।
                     কোন্‌ বিষয়ে মোহ আসিবে না? মহারাজ, অনিত্য-দুঃখ-অনাত্ম জ্ঞানে যাহা উত্তমরূপে জানা হইয়াছে, তাহাতে আর মোহ আসিবে না। ভন্তে, তবে মোহ কোথায় যায়? মহারাজ যেইস্থানে জ্ঞান উৎপন্ন হয়, তথায়ই মোহ নিরুদ্ধ হয়। উপমা প্রদান করুন। মহারাজ, অন্ধকার গৃহে যদি কোন পুরুষ প্রদীপ জ্বালে, তখনই অন্ধকার নিরুদ্ধ হয়, আলোকটা জ্বলিতে থাকে। এই প্রকার জ্ঞানালোক উৎপত্তির সঙ্গে সঙ্গেই মোহান্ধকার চলিয়া যায়।
ভন্তে, প্রজ্ঞা কোথায় যায়? প্রজ্ঞাও মহারাজ, নিজের কার্য সাধন করিয়া তথায়ই নিরুদ্ধ হয় বটে, কিন্তু তাহার কার্যক্রম বিনষ্ট হয় না, ভন্তে, আপনি যাহা বলিতেছেন, প্রজ্ঞার কার্য বিনষ্ট হয় না, তাহার উপমা প্রদান করুন। মহারাজ, কোন পুরুষ রাত্রিতে একখানি পত্র পাঠাইতে ইচ্ছা করিয়া লেখককে ডাকাইলেন এবং প্রদীপ জ্বালিয়া পত্রখানি লেখাইলেন। ঐ পত্র লিখার পর প্রদীপখানি নিবাইয়া দিলেন। প্রদীপ নিবিল বটে, লেখা কিন্তু বিনষ্ট হইল না। এইরূপ মহারাজ, প্রজ্ঞা-প্রদীপ নিবিলে ও তাহার লেখারূপ কার্য বিনষ্ট হয় না।
 পুনরায় উপমা প্রদান করুন। মহারাজ, পূর্ব জনপদের লোকেরা প্রত্যেক ঘরে পাঁচ পাঁচটি করিয়া জল পূর্ণ কলসী রাখিয়া থাকে, কারণ যখন ঘরে আগুন লাগিবে, তখন আগুন নিবাইতে পারিবে। আগুন লাগিলে ঐ কলসী ঘরের উপর নিক্ষেপ করে। তদ্দ্বারা অগ্নি নিবিয়া যায়। তবে কি মহারাজ, তাহাদের মনে এইরূপ হয়, ঐ কলসী আমরা পুনঃ ব্যবহার করিব? না মহারাজ, ঐ কলসীর আর প্রয়োজন নাই, তাহাদ্বারা কার্যও বা আর কি হইবে।
                 যেমন মহারাজ, পঞ্চ কলসী, তেমন শ্রদ্ধা-বীর্য-স্মৃতি-সমাধি-প্রজ্ঞা এই পঞ্চেন্দ্রিয়। যেমন সেই মনুষ্যেরা, তেমন সাধকগণ। ক্লেশগুলি অগ্নিতুল্য দ্রষ্টব্য। যেমন পাঁচটি কলসীদ্বারা আগুন নিবাইয়া দেয়, তেমন পঞ্চেন্দ্রিয় ক্লেশাগ্নি নিবাইয়া দেয়; ক্লেশাগ্নি একবার নিবিয়া গেলে, আর জ্বলিয়া উঠিবে না। এই প্রকারই মহারাজ, প্রজ্ঞা নিরুদ্ধ হয়। কিন্তু তাহার কার্যক্রম নিরুদ্ধ হয় না।
 পুনরায় উপমা প্রদান করুন। যেমন মহারাজ, কোন বৈদ্য পাঁচটি শিকড় পিষিয়া রোগীকে সেবন করাইল, তদ্দ্বারা রোগীর রোগও সেরে গেল, সে কি পুনঃ ঐ পঞ্চ শিকড়ের প্রয়োজন মনে করে? না ভন্তে, তাহা আর কি করিবে। তেমন মহারাজ, পঞ্চ শিকড় শ্রদ্ধাদি পঞ্চ ইন্দ্রিয়। বৈদ্য সাধকতুল্য। ব্যাধি ক্লেশতুল্য। ব্যাধিত পুরুষ পৃথগ্‌জন বা সাধারণ লোক। পাঁচটি শিকড়ে যেমন রোগীর রোগ সারে, তেমন পঞ্চেন্দ্রিয়দ্বারা ক্লেশ ব্যাধি সারিয়া যায়, আর পুনরায় উৎপন্ন হয় না। এইরূপ প্রজ্ঞার নিরোধ হয় বটে, কিন্তু তাহার কৃতকার্যের নিরোধ হয় না।
                     পুনরায় উপমা প্রদান করুন। যেমন মহারাজ, পাঁচটি বাণ লইয়া এক যোদ্ধা যুদ্ধ করিতে গেল। সে পঞ্চ বাণ মারিয়া শত্রর্ব সৈন্য পরাজয় করিল। সে কি ঐ বাণ পাঁচটি প্রত্যাশা করে? না ভন্তে, সে তাহা আর কি করিবে। তেমন মহারাজ, শ্রদ্ধাদি পঞ্চেন্দ্রিয় পাঁচটি বাণ; যোদ্ধা সাধক; শত্রর্ব-সৈন্য ক্লেশ। যেমন পাঁচটির বাণে শত্রর্ব-সৈন্য ধ্বংস করে, তেমন পঞ্চেন্দ্রিয় ক্লেশসমূহ ধ্বংস করে। ক্লেশ ধ্বংস হইলে আর উৎপন্ন হয় না। প্রজ্ঞা ও প্রজ্ঞার কার্যও তদ্রূপ।” ভন্তে, আপনি সুদক্ষ।

বৌদ্ধধর্ম সার (Buddhism in a Nutshell-part-04

বৌদ্ধ ধর্মসার ★ Bhuddhism in a Nutshell -o4
===================================
বৌদ্ধধর্ম কি নৈতিক বিধান ?
এটা সন্দেহাতীত যে বৌদ্ধধর্ম এমন এক সমুন্নত শীল (নৈতিক বিধান) ধারণ করে, যা পূর্ণতায় ও পরার্থপর প্রকৃতিতে অনুপম। এ শীল ভিক্ষুদের জীবন যাত্রার জন্য একরূপ এবং গৃহীদের জন্য ভিন্ন প্রকার। কিন্তু বৌদ্ধধর্ম সাধারণ শীল ( নৈতিকতা) হতে অনেক বেশী। শীল (নৈতিকতা) বিশুদ্ধি-মার্গের প্রথম ধাপ এবং শীর্ষ উঠবার একটি উপায়; নিজে শীর্ষ নয়। মুক্তিলাভের জন্য শীল পালন অত্যাবশ্যক হলেও পর্যাপ্ত নয়। তা প্রজ্ঞাসংযুক্ত হওয়া উচিৎ। শীল বৌদ্ধধর্মের ভিত্তি এবং প্রজ্ঞাই এর চরম শীর্ষ।
কোন বৌদ্ধ শীল (নৈতিক নিয়ম) পালনের সময় কেবল নিজেকে নয়, সকলকে এমন কি সর্ব প্রাণীকে অবলম্বন করে পালন করেন।
বৌদ্ধধর্মের শীল যেমন কোন সন্ধিগ্ধ প্রত্যাদেশের উপর প্রতিষ্ঠিত
নয়, তেমন, এটা কোন বিশিষ্ট বুদ্ধিমান ব্যক্তির মস্তিষ্ক প্রসূত
আবিষ্কারও নয়। বস্তুতঃ তা প্রামাণ্য ঘটনা ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উপর প্রতিষ্ঠিত যুক্তি-বিচার সমন্বিত ব্যবহারিক বিধি। এটা উল্লেখ্য যে, বৌদ্ধের চরিত্র গঠনে কোনও বাহ্যিক অলৌকিক শক্তির প্রভাব নেই। বৌদ্ধধর্মে পুরস্কার বা শাস্তি দেবার কেউ নেই। সুখ-দুঃখ প্রত্যেকের কৃতকর্মের অপরিহার্য ফল। ঈশ্বর কর্তৃক সুখ- দুঃখ দানের প্রশ্ন কোন বৌদ্ধের মনেও আসে না। পুরস্কারের প্রত্যাশা বা শান্তির ভয় তাঁর পুণ্যার্জনের বা পাপবিরতির প্রেরণাদায়ক নয়। প্রত্যেক বৌদ্ধ তাঁর ভবিষ্যৎ কর্মফল সম্পর্কে সচেতন। বোধি বা প্রজ্ঞা লাভে প্রতিবন্ধক বলে তিনি পাপে বিরত এবং সহায়ক বলে পুণ্য কর্মে রত হন। কেহ কেহ আছেন ভাল বলে সৎকাজ করেন এবং মন্দ বলে পাপ কর্ম হতে বিরত হন।
বুদ্ধ জ্ঞান লাভের জন্য তাঁর বিশেষ উচ্চাঙ্গের শীল সম্বন্ধে অনুগামীদের নিকট এ
প্রত্যাশা করেন যে তাঁরা যেন  যত্নসহকারে ধম্মপদ, সিগালোবাদসুত্ত, ব্যগ্গপজ্জসুত্ত,
মঙ্গলসুত্ত, করণীযমেত্তসুত্ত, পরাভবসুত্ত, বসলসুত্ত, ধম্মিকসুত্ত প্রভৃতি পাঠ করেন।
নীতিশিক্ষা হিসেবে এ শীল অন্য সব নীতি বিধানের ঊর্ধ্বে। কিন্তু শীল বৌদ্ধধর্মের
আদি, অন্ত নয়। এক অর্থে বৌদ্ধধর্ম দর্শন নয়; অন্য অর্থে কিন্তু সব দর্শনের সেরা
দর্শন। এক অর্থে ইহা ধর্ম নয়, অন্য অর্থে কিন্তু সর্ব ধর্মের সেরা ধর্ম। ইহা অতীন্দ্রিয়বিদ্যার মার্গ
 যেমন নয়- তেমন আচরণ সর্বস্বও নয়। ইহা সন্দেহবাদ যেমন নয়, তেমন প্রমাণহীন বদ্ধ ধারণাও নয়। ইহা কৃচ্ছ- সাধনা যেমন নয়, তেমন ইন্দ্রিয়ভোগাসক্তিও নয়। ইহা একান্ত সুখবাদ যেমন নয়, তেমন একান্ত দুঃখবাদও নয়। ইহা শাশ্বতবাদ যেমন নয়, তেমন উচ্ছেদবাদও নয়। ইহা ইহলৌকিক যেমন নয়, তেমন পারলৌকিকও নয়। ইহা প্রজ্ঞালাভের এক অসাধারণ মার্গ। বৌদ্ধধর্মের জন্য মূল পালিতে ব্যবহৃত শব্দ "ধম্ম", যার আভিধানিক অর্থ 'ধারণ করা'। এই পালি শব্দের যথার্থ অর্থজ্ঞাপক ইংরেজি প্রতিশব্দ পাওয়া যায় না।
যা বাস্তব তা-ই 'ধম্ম'। ইহা বাস্তবতার মতবাদ। ইহা দুঃখমুক্তির উপায় এবং নিজে মুক্ত। বুদ্ধের আবির্ভাব হোক বা না হোক ''ধম্ম" চির বিদ্যমান। প্রজ্ঞাদীপ্ত বুদ্ধ একে সাক্ষাৎ করে করুণার্দ্র চিত্তে জগদ্বাসীর নিকট প্রকাশ না করা পর্যন্ত তা মানুষের দৃষ্টিহীন চোখে গোচরীভূত হয় না।
"ধম্ম" কারো হতে দূরে নয়, বরং সবার সাথে ঘনিষ্ঠভাবো যুক্ত। বুদ্ধ পরিনির্বাণ সূত্রে বলেছেন :-
"আত্মদীপ এবং আত্মশরণ হয়ে জীবন যাপন কর; ধর্মদীপ এবং ধম্মশরণ হয়ে জীবন যাপন কর। বাহ্যিক আশ্রয়ের অন্বেষণ করো না"।
★ লেখক :
@ মূল ইংরেজি : নারদ থের
@ বাংলা অনুবাদ : শ্রীকিরণ চন্দ্র ব্রহ্ম
বুদ্ধ পূর্ণিমা, ৪ঠা জ্যৈষ্ঠ, ১৩৮৮
ফোটো: সংগৃহীত

Saturday, December 24, 2016

চক্ষুবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞান প্রশ্ন

                                            চক্ষুবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞান প্রশ্ন-মীমাংসা

                     রাজা বলিলেন-“ভন্তে, চক্ষু-বিজ্ঞান যেখানে উৎপন্ন হয়, মনোবিজ্ঞানও সেখানে উৎপন্ন হয় কি?” “হাঁ মহারাজ।” “ভন্তে, চক্ষুবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের মধ্যে কোন্‌টি প্রথমে, কোন্‌টি পরে উৎপন্ন হয়? মহারাজ, প্রথম চক্ষুবিজ্ঞান পরে মনোবিজ্ঞান উৎপন্ন হয়।” “তাহা হইলে কি ভন্তে, চক্ষুবিজ্ঞান মনোবিজ্ঞানকে আদেশ করে-আমি যেখানে উৎপন্ন হইব, তুমিও সেখানে উৎপন্ন হইও? অথবা মনোবিজ্ঞান চক্ষুবিজ্ঞানকে আদেশ করে-যেখানে তুমি উৎপন্ন হইবে, আমিও সেখানে উৎপন্ন হইব?” “না মহারাজ”, “পরস্পরের তেমন কোন আলাপ হয় না!” “তবে ভন্তে, কি প্রকারে যেখানে চক্ষুবিজ্ঞান উৎপন্ন হয়, সেখানে মনোবিজ্ঞানও উৎপন্ন হয়?” “মহারাজ, তাহা নিম্নত্ব, দ্বারত্ব, পরিচয়ত্ব, ব্যবহারত্ব ভেদে উৎপন্ন হয়।” “ভন্তে, নিম্নত্ব হেতু কি প্রকারে যেখানে চক্ষুবিজ্ঞান উৎপন্ন হয়, সেখানে মনোবিজ্ঞান উৎপন্ন হয়?”
উপমা প্রদান করুন।- মহারাজ, তাহা কেমন মনে করেন, যখন বৃষ্টি হয়, তখন জল কোন্‌ দিক দিয়া গমন করে?” “ভন্তে, যেইদিকে নিম্ন, সেইদিক দিয়া গমন করে।” যদি অন্য সময় বৃষ্টি হয়, সেই জল কোন্‌ দিক দিয়া গমন করে?” “পূর্বে যেই দিক দিয়া জল গিয়াছে, এখনও সেইদিক দিয়া গমন করিবে।” “কেমন মহারাজ, আগের জল কি শেষের জলকে এমন আদেশ করে যে-আমি যেইদিক দিয়া যাইতেছি, তুমিও সেইদিক দিয়া যাইও। শেষের জল কি আগের জলের প্রতি আদেশ করে যে-যেই দিক দিয়া তুমি যাইবে, আমিও সেইদিক দিয়া গমন করিব।” “না ভন্তে, তাহাদের পরস্পরের তেমন আলাপ নাই। নিম্নতা হেতু জল চলিয়া যাইতেছে।” “সেইরূপ চক্ষুবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞানও নিম্নত্ব হেতুই উৎপন্ন হইয়া থাকে।”ভন্তে, দ্বারত্ব হেতু কি প্রকারে যেইখানে চক্ষুবিজ্ঞান উৎপন্ন হয়, সেইখানে মনোবিজ্ঞানও উৎপন্ন হয়?
উপমা প্রদান করুন।- “মহারাজ, আপনি এইটি কেমন মনে করেন? রাজার সীমান্ত নগরে সুদৃঢ় প্রাচীর ও ফটক আছে, কিন্তু দরজা একটি, যদি কোন পুরুষ নগর হইতে বাহির হইতে চায়, কোন্‌ দ্বারদিয়া সে বাহির হইবে? “ভন্তে, দরজা দিয়া বাহির হইবে।” “যদি অপর একজন পুরুষ বাহির হইতে চায়, সে কোন্‌ দ্বার দিয়া বাহির হইবে?” পূর্ব-ব্যক্তি যেই দ্বার দিয়া বাহির হইয়াছে, সেও সেই দ্বার দিয়া বাহির হইবে। “কেমন মহারাজ, আগের পুরুষ, শেষের পুরুষকে এইরূপ আদেশ করে কি, আমি যেইদিক দিয়া যাইতেছি, তুমিও সেইদিক দিয়া যাইও? অথবা শেষের পুরুষ আগের পুরুষকে বলে কি, তুমি যেইদিক দিয়া যাইতেছ, আমিও সেইদিক দিয়া যাইব।” “না ভন্তে”, “তাহাদের পরস্পরের আলাপ নাই।” দ্বার আছে বলিয়া গমন করে। সেইরূপ চক্ষুবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞানও দ্বারত্ব হেতুই গমন করে।
               ভন্তে, পরিচয়ত্ব হেতু কি প্রকারে যেখানে চক্ষুবিজ্ঞান উৎপন্ন হয়, সেখানে মনোবিজ্ঞানও উৎপন্ন হয়?
উপমা প্রদান করুন।- মহারাজ, আপনি এইটি কেমন মনে করেন? প্রথম একটা গাড়ী চলিয়া গেল, তৎপর দ্বিতীয় গাড়ীটা কোন্‌ দিক দিয়া যাইবে? ভন্তে, আগের গাড়ী যেই দিক দিয়া গিয়াছে, শেষের গাড়ীটিও সেই দিক দিয়া যাইবে। কেমন মহারাজ, আগের গাড়ী কি শেষের গাড়ীকে আদেশ করে- আমি যেই দিক দিয়া যাইতেছি, তুমিও সেই দিক দিয়া যাইও। অথবা শেষের গাড়ী আগের গাড়ীকে কি আদেশ করে-তুমি যেই দিক দিয়া যাইবে, আমিও সেই দিক দিয়া যাইব।” “না ভন্তে”, “তাহাদের পরস্পরের আলাপ নাই। “পরিচয় হেতুই যাইতেছে।” “সেইরূপ চক্ষুবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞানও পরিচয় হেতুই গমন করে।
ভন্তে, কি প্রকারে ব্যবহার হেতু যেইখানে চক্ষুবিজ্ঞান উৎপন্ন হয়, মনোবিজ্ঞানও সেইখানে উৎপন্ন হয়?
উপমা প্রদান করুন।- “মহারাজ যেমন, মুদ্রা গণনা, সংখ্যা লেখা প্রভৃতি শিল্প বিদ্যায় প্রথম আরম্ভকারীর ভুল হইয়া যায়, পরে সাবধানে ব্যবহার করায় আর ভুল হয় না। সেইরূপ চক্ষুবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞানও ব্যবহার ভেদে উৎপন্ন হয়।
       শ্রোত্র, ঘ্রাণ, জিহ্বা, কায়-মন ও তদ্রূপ উপমেয়। ভন্তে, আপনি সুদক্ষ।

Friday, December 23, 2016

মেঘীয় স্থবিরের উপখ্যান



                 গাথাপ্রসঙ্গ : ‘‘ফন্দনং চপলং চিত্তং” ‘‘স্পন্দিত চঞ্চল চিত্ত”- ইত্যাদি ধর্মদেশনা বুদ্ধ চালিকা পর্বতে বাস করার সময়ে আয়ুষ্মান মেঘিয়কে উদ্দেশ্য করে ভাষণ করেছিলেন।
বুদ্ধ চালিকা পর্বতে অবস্থানকালে আয়ুষ্মান মেঘিয় তাঁর (বুদ্ধের) সেবা করতেন। একদিন তিনি বুদ্ধের নিকট উপস্থত হয়ে তাঁকে বন্দনা করে বললেন- ‘‘ভন্তে, আমি গ্রামে যেতে ইচ্ছা করি।” বুদ্ধ আয়ুষ্মান মেঘিয়কে ‘‘যাও” বলে অনুমতি দিলেন। অনন-র আয়ুষ্মান মেঘিয় পূর্বাহ্ন সময়ে পাত্র-চীবর নিয়ে গ্রামে ভিক্ষায় প্রবেশ করলেন। গ্রামে ভিক্ষা করে ফিরে এসে ভোজনান্তে ক্রিমিকালা-নদীর তীরে গিয়ে পুনঃপুন চঙ্ক্রমণ ও পরিভ্রমন করতে করতে একটি আম্রকানন দেখে ভাবলেন- ‘‘এই আম্রকানন কতই প্রসাদ জননী! কতই রমনীয়া! ইহাই ধ্যানের জন্য উপযুক্ত স্থান। ভগবান আমাকে অনুমতি দিলে আমি এই আম্রবনে ধ্যানার্থ আসব।”
অতঃপর আয়ুষ্মান মেঘিয় ভগবানের নিকট উপস্থিত হয়ে তাঁকে বন্দনা করলেন এবং একপার্শ্বে উপবেশন করে বললেন- ‘‘ভন্তে, আমি পূর্বাহ্ন সময়ে পাত্র-চীবর নিয়ে গ্রামে ভিক্ষায় প্রবেশ করেছিলাম। সেখানে ভিক্ষা করে ভোজনান্তে ফিরবার সময় ক্রিমিকালা-নদীর তীরে গমন করলাম। সেখানে পদব্রজে পুনঃপুন চঙ্ক্রমণ করতে করতে প্রসাদ জননী রমনীয়া এক আম্রকানন দেখে ভাবলাম- ‘এই আম্রকানন কতই প্রসাদ জননী! কতই রমনীয়া! ইহাই ধ্যানের জন্য উপযুক্ত স্থান। ভগবান অনুমতি দিলে আমি এই আসব।’ ভন্তে, ভগবান যদি আমাকে অনুমতি দেন তবে আমি ঐ আম্রবনে ধ্যানের জন্য যাব।” আয়ুষ্মান মেঘিয় এরূপ বললে বুদ্ধ তাঁকে বললেন- ‘‘হে মেঘিয়! এখন আমি একাকী, অন্য কোন ভিক্ষুর আগমন পর্যন- অপেক্ষা কর।” বুদ্ধ এরূপ বলার পরও আয়ুষ্মান মেঘিয় দ্বিতীয়বারেও একই প্রার্থনা করলেন। বুদ্ধও দ্বিতীয়বারে একই উত্তর দিলেন। তৃতীয়বারেও আয়ুষ্মান মেঘিয় একই প্রার্থনা করলে বুদ্ধ বললেন- ‘‘হে মেঘিয়! যখন যেতে চাচ্ছ, তখন আর কি বলব। যদি সময় মনে কর, তবে তাই কর।”
অনন-র আয়ুষ্মান মেঘিয় আসন থেকে উঠে বুদ্ধকে অভিবাদন করে সেই আম্রবাগানের দিকে অগ্রসর হলেন। সেখানে গিয়ে আম্রবাগনে ধ্যান করার সময় তাঁর কাম-চিন্তা, ক্রোধ-চিন্তা ও হিংসা-চিন্তা বার বার বেশিভাবে মনে উঠতে লাগল। অবশেষে এই ত্রিবিধ পাপজনক অকুশল বিতর্ক দ্বারা আবদ্ধ হয়ে চিত্তকে দমন করতে না পেরে ধ্যান থেকে উঠে বুদ্ধের নিকট গমন করলেন। সেখানে গিয়ে বুদ্ধকে বন্দনা করে একপাশে বসলেন এবং তাঁর কাম-বিতর্কাদির কথা বুদ্ধকে প্রকাশ করলেন। বু্‌দ্ধ তখন আয়ুষ্মান মেঘিয়কে উপদেশ দিয়ে বললেন- ‘‘হে মেঘিয়! চিত্ত-বিমুক্তি বা আর্হত্ত্ব-ফল-সমাধি অপূর্ণ থাকলে পাঁচটি ধর্ম দ্বারা তা পরিপূর্ণ হয়। সেই পাঁচটি ধর্ম কি কি? হে মেঘিয়! চিত্ত যখন সম্পূর্ণ বিমুক্তি লাভ করতে পারে না তখন কল্যাণ-মিত্র বা সৎগুরুর আশ্রয় নিতে হয়, কল্যাণ-মিত্রের সাহার্য নিতে হয় এবং তিনি যা বলেন কায়মনে তদনুযায়ী আচরণকারী হতে হয়। হে মেঘিয়! অমুক্ত ব্যক্তির চিত্ত সম্পূর্ণ বিমুক্তি-লাভ করার জন্য এই প্রথম উপায়। ইহা কল্যাণ-মিত্রতা।
হে মেঘিয়! দ্বিতীয়তঃ ভিক্ষুকে শীলবান হতে হয়, বিনয়শীলে প্রতিষ্ঠিত থাকতে হয়। চলাফেরা আচার-গোচর সুন্দর করতে হয় ও অল্পমাত্র পাপেও ভীত হতে হয় এবং শিক্ষাপদসমূহ গ্রহণ করে তদনুযায়ী আচরণ শিক্ষা করতে হয়। হে মেঘিয় অনর্হতের অর্হৎ হবার জন্য এটি দ্বিতীয় ধর্ম।
হে মেঘিয়! তৃতীয়তঃ এমন সকল আলাপ করতে হয় যাতে মন নিষ্পাপ ও উন্মুক্ত হয়, সংসার দুঃখে একান- উৎকণ্ঠিত হয় এবং সংসারে অ েরররররররনননরনভিরতি ও আসক্তিহীন হয় এবং যা চিত্তের নিরোধ ও উপশম আনয়ন করে আর যা বিশেষ জ্ঞান, সম্বোধি ও নির্বাণ প্রদান করে। উক্ত প্রকারের বাক্যালাপ ইচ্ছামতে সহজে বেশিভাবে লাভ করতে পারলে চিত্ত পাপ থেকে মুক্ত হয়। চিত্ত বিমুক্তি লাভের উপায় স্বরূপ ইহা তৃতীয় ধর্ম।
হে মেঘিয়! চতুর্থতঃ ভিক্ষুকে পাপ পরিত্যাগের জন্য ও পুণ্য লাভের জন্য উৎসাহী, শক্তিমান ও দৃঢ় পরাক্রমশালী হয়ে বিচরণ করতে হয় এবং সর্বদা নিষ্পাপ ধর্মপরায়ণ হতে হয়। ইহা অনর্হতের অর্হত্ত্ব ফল লাভের চতুর্থ উপায়।
হে মেঘিয়! পঞ্চমতঃ ভিক্ষুকে জ্ঞানবান হতে হয়, স্কন্ধসমূহের উৎপত্তি ও বিলয় জ্ঞানদায়িনী প্রজ্ঞাসম্পন্ন হতে হয়, যেই জ্ঞানের দ্বারা নির্বাণ সম্মুখীভূত হয়, সাংসারিক আনন্দ নাশ হয় ও সম্যকরূপে দুঃখের ক্ষয় সাধন হয়, সেরূপ জ্ঞান লাভ করতে হয়। হে মেঘিয়! অনর্হতের অর্হত্ত্ব ফল লাভের এটি পঞ্চম উপায়।
হে মেঘিয়! যে ভিক্ষু সৎগুরুর সেবা করে, কল্যাণ-মিত্রের সাহার্য গ্রহণ করে, সৎগুরুর প্রতি যার বেশি টান, সে-ই আশা করতে পারে যে, সে শীলবান হতে পারবে, চারি অপায় ও সংসারবর্ত দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ করতে পারবে। হে মেঘিয়! কল্যাণ-মিত্র-সেবী, কল্যাণ-সহায় ও কল্যাণ-মিত্রের প্রতি চিত্তাকর্ষণ সম্পন্ন ভিক্ষুই আশা করতে পারে যে সে পাপ ত্যাগ ও পুণ্য বৃদ্ধির জন্য উৎসাহ-উদ্যোগ সম্পন্ন হবে, শক্তিমান ও দৃঢ় পরাক্রমশালী হবে; শীলবান, প্রাতিমোক্ষ সংযমে সংযত, আচার-গোচর সম্পন্ন পাপভীরু হবে, শীল গ্রহণ করে পালন করবে, মনের পবিত্রতা সাধক চিত্তের বিকাশক একান- নিষ্কৃতি, বিরাগ, নিরোধ ও শানি-র আবাহক অভিজ্ঞা, সম্বোধি ও নির্বাণদায়ক মার্গ ইচ্ছামত সহজে লাভ করতে পারবে এবং যেই জ্ঞানের দ্বারা উদয় অস- সম্বন্ধে জানা যায়, আর্য নির্বাণ লাভ ও সম্যক দুঃখের ক্ষয় করা যায় সেই জ্ঞানে জ্ঞানবান হবে।”
অনন-র বুদ্ধ মেঘিয়কে সম্বোধন করে আরো বললেন- ‘‘হে মেঘিয়! তুমি ঐ সময় গুরুতর অপরাধ (অন্যায়) করেছ। মেঘিয়! তোমাকে বলেছিলাম যে আমি একাকী আছি, যতক্ষণ না অন্য কোন ভিক্ষু আসে তুমি আমার নিকট থেকে চলে যেও না। কিন' তুমি আমাকে একাকী রেখে চলে গেছ। এরূপ আচরণ করলে কোন ভিক্ষুই তার চিত্তকে বশ (দমন) করতে পারবে না। কারণ চিত্ত অত্যন- লঘু। ইহাকে নিজের বশে রাখতেই হবে।”- ইহা বলে বুদ্ধ এই গাথা দুইটি দেশনা করেছিলেন। (দেশনাবসানে মেঘিয় স্থবির স্রোতাপত্তিফলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন এবং অন্যান্য অনেকেও স্রোতাপন্ন হয়েছিলেন। উপস্থিত জনগণের নিকটও এই ধর্মদেশনা সার্থক হয়েছিল)।
ব্যাখ্যা
ফন্দনং : স্পন্দনশীল। এখানে স্পন্দনশীল বলতে রূপাদি পঞ্চ আলম্বনের দ্বারা সদা টলায়মান বুঝতে হবে।
চপলং : চঞ্চল অর্থাৎ একই অবস্থায় বেশিক্ষণ থাকতে না পারা গ্রাম্য বালকের ন্যায় চিত্ত বেশিক্ষণ একই আলম্বনে বা বিষয়ে থাকতে পারে না বলেই চঞ্চল।
দূরক্‌খং : দূরক্ষ্য অর্থাৎ যেমন ঘেরা দেওয়া শস্যক্ষেত্র হতেও গরু সুযোগ পেলেই শস্য ভক্ষণ করে, রক্ষা করা যায় না, তদ্রূপ এক একটি ‘সপ্রায়’ বা হিতকর আলম্বনেও চিত্তকে বেশিক্ষণ ধরে রাখা যায় না বলেই চিত্তে ‘দূরক্ষ্য’ বলা হয়েছে।
দুন্নিবারযং : দুর্নিবার্য। বিপরীত বা অহিতকর আলম্বন গমন হতে চিত্তকে নিবারিত করা কষ্টকর বলে ‘দুর্নিবার্য’ বলা হয়েছে।
উসুকারো’ব তেজনং : শর প্রস্থতকারী যেমন শরকে অর্থাৎ যেমন শর প্রস্থতকারী অরণ্য হতে বঙ্কদণ্ড (বাঁকা লাঠি) আহরণ করে এর ছাল ছড়ায়ে কাঞ্জিয় তৈল বা যাগুভাতের উপর ভাসমান ঘন তৈলজাতীয় পদার্থের দ্বারা ম্রক্ষিত করে অঙ্গারগর্তে তপ্ত করে গাছের শক্ত কীলক বা খোঁটার দ্বারা সোজা করে, এমন কি একটি চুলকেও বিদ্ধ করা যায় মত তীক্ষ্ণ ও ঋজু করে ‘‘উজুং করোতি”। পরে তদ্‌দ্বারা রাজা এবং রাজমহামাত্যদের নানাবিধ কোশল প্রদর্শন করে অনেক সৎকার-সম্মান লাভ করে। ঠিক তদ্রূপ ‘মেধাবী’ বা বিজ্ঞ ব্যক্তি স্পন্দনশীলাদি স্বভাবযুক্ত চিত্তকে ধুতাঙ্গ এবং অরণ্যাবাসবশে স্থূল ক্লেশাদি হতে মুক্ত করে শ্রদ্ধারূপ স্নেহপদার্থের দ্বারা সিক্ত করে কায়িক এবং চৈতসিক বীর্যের দ্বারা তপ্ত করে শমথ এবং বিদর্শন ধ্যানের খোঁটায় বেঁধে ঋজু, অকুটিল, দমিত এবং শান- করে। অতঃপর সংস্কারসমূহকে যথাযথভাবে জেনে মহা অবিদ্যাস্কন্ধকে বিদীর্ণ করে ‘ত্রিবিদ্যা-ষড়াভিজ্ঞা-নবলোকোত্তর ধর্ম’ ইত্যাদিকে বিশেষভাবে হস-গত করে অগ্রদক্ষিণার্হ অবস্থা লাভ করেন অর্থাৎ শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেন।পরিফন্দতিদং চিত্তং : এই চিত্ত স্পন্দিত হয় অর্থাৎ যেমন উদকরূপ আলয় হতে উৎক্ষিপ্ত এবং স্থলে নিক্ষিপ্ত মৎস্য জল না পেয়ে ছট্‌ফট্‌ করে, তদ্রূপ পঞ্চ কামগুণরূপ আলয়াভিরত চিত্ত তা হতে উদ্ধার লাভ করে মারের রাজ্য নামক কুমার্গ দূর করতে ‘বিদর্শন কর্মস্থানে’ ক্ষিপ্ত এবং কায়িক-চৈতসিক বীর্যের দ্বারা সন্তাপিত হয়ে ছট্‌ফট্‌ করে, থাকতে সমর্থ হয় না। এরূপ অবস্থা হলেও বিদর্শন ধুর ত্যাগ না করে মেধাবী ব্যক্তি উপরিউক্ত নিয়মে ঋজু কর্মনীয় সম্পাদন করে থাকেন। অন্য ব্যাখ্যা হচ্ছে- এই মাররাজ্য বা ক্লেশবর্ত্মকে ত্যাগ না করে স্থিত চিত্ত সেই বারিজ মৎস্যের ন্যায় ছট্‌ফট্‌ করে। সেজন্য ‘‘মারধেয্যং পহাতবে” যে ক্লেশবর্ত্ম নামক মাররাজ্যের দ্বারা ছট্‌ফট্‌ করে তা পরিত্যাজ্য।
মর্মোদ্‌ঘাটন : শর প্রস্থতকারী যেমন শরকে সোজা করতঃ প্রস্থত করে, তদ্রূপ জ্ঞানী ব্যক্তি নিজ স্পন্দনশীল, চঞ্চল, দূরক্ষ্য এবং দুর্নিবার্য চিত্তকে ঋজু করেন অর্থাৎ নিজ বশে আনয়ন করেন।
জল হতে উত্থিত এবং স্থলে প্রক্ষিপ্ত মৎস্য যেমন ছট্‌ফট্‌ করতে থাকে, সেরূপ পঞ্চকামগুণ বিনির্মুক্ত চিত্ত মারের রাজ্য অতিক্রম করার জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকে।
‘‘অস্থির চঞ্চল চিত্ত, দুষ্কর রক্ষণ নিবারণ,
মেধাবী করেন সোজা, ধানুষ্কের শরের মতন।
স্থলেতে উক্ষিপ্ত মৎস্য, জলে যেতে করে ধরফর,
‘মারের’ বন্ধন হতে চিত্ত চাহে মুক্তি নিরন-;র।”

দুঃখ প্রহাণের উদ্যোগ

দুঃখ প্রহাণের উদ্যোগ
 রাজা বলিলেন-"ভন্তে, নাগসেন!  আপনার অতীত কালের দুঃখ প্রহাণের উদ্যোগ করেন কী?"
"না, মহারাজ!  "
"ভন্তে! অনাগত দুঃখের প্রহাণের নিমিত্ত উদ্যোগ করেন কি?" 
না, মহারাজ!  
ভন্তে! আপনারা বর্তমান দুঃখের প্রহাণের নিমিত্ত উদ্যোগ করেন কী?
"না, মহারাজ! "
"যদি আপনারা অতীত, অনাগত ও বর্তমান এই তিনের কোন কালের দুঃখের প্রহাণের নিমিত্ত প্রযত্ন না করেন তবে কীসের নিমিত্ত প্রযত্ন করেন?"
স্থবির কহিলেন- "মহারাজ! যাহাতে এই দুঃখ নিরুদ্ধ হয় এবং অন্য নূতন দুঃখ উৎপন্ন না হয় তজ্জন্য আমরা উদ্যোগ করি।"
"ভন্তে!  আপনার কি অনাগত দুঃখ আছে?"
"নাই, মহারাজ।"
"ভন্তে! আপনারা অতি পণ্ডিত, যেহেতু আপনারা অবিদ্যমান অনাগত দুঃখের প্রহাণের নিমিত্ত উদ্যোগ গ্রহণ করেন।" 
"মহারাজ "এমন কোন শত্রু রাজারা আছেন কী যাহারা আপনার বিরুদ্ধে অভিযান করেন?"
"হা, ভন্তে!আছেন।"
"মহারাজ! কেমন, আপনি কি যেই সময় পরিখা খনন করান, প্রাচীর নির্মাণ করান, দৃঢ় নগরদ্বার ও অট্টালিকা প্রস্তুত করান এবং রসদ সংগ্রহ করান?"
"না,ভন্তে! পূর্ব হতেই সেই সমস্ত সজ্জিত থাকে।"
"মহারাজ! সেই সময় কী আপনি হস্তী, অশ্ব, রথ, ধনু, ও অসি চালনা শিক্ষা করেন?"
"না, ভন্তে! পূর্বেই শেখা হইয়া থাকে।"
কী কারণে?
"ভন্তে! অনাগত কালের সম্ভাব্য ভয়ের নিবারণের জন্য।"
"মহারাজ! কেমন, অনাগত কোন ভয় আছে কী?"
নাই, ভন্তে!
"মহারাজ! আপনারা অতি পণ্ডিত, যেহেতু অবিদ্যমান অনাগত ভয়ের নিবারণের নিমিত্ত সমস্ত প্রস্তুত রাখেন।"
"ভন্তে। উপমা প্রদান করুন!"
"মহারাজ! যখন আপনি পিপাসিত হন জল পানেচ্ছায় তখনই কী আপনি কূপ, পুস্করিণী ও জলাশয় খনন আরম্ভ করেন?"
"না, ভন্তে! উহা পূর্ব হতেই নির্মিত থাকে।"
"পূর্ব হইতেই কেন নির্মিত থাকে?"
"ভন্তে! অনাগত কালের পিপাসা নিবৃত্তির জন্য প্রস্তুত থাকে।"
"মহারাজ! অনাগত কালের কোন পিপাসা অাছে ককী?"
"নাই ভন্তে।"
"মহারাজ! তাহা হইলে আপনারা অতি পণ্ডিত, যেহেতু যে পিপাসা এখনও উৎপন্ন হয় নাই তাহারর নিবৃত্তির জন্য  কূপাদি নির্মাণ করিয়া থাকেন।"
"ভন্তে!উপমা প্রদান করুন?"
"মহারাজ! যখন আপনি ক্ষুধার্ত হইবেন তখন ভাত খাইবার ইচ্ছায় ক্ষেত্র কর্ষণ করাইবেন, শালিবীজ বপন করবেন কী?"
না, ভন্তে পূর্ব হতেই তাহা প্রস্তুত থাকে।"
"কেন?"
"অনাগত বুভূক্ষার নিবৃত্তির জন্য।"
"মহারাজ! অনাগত বুভুক্ষা বিদ্যমান আছে কী?"
"নাই, ভন্তে।
"মহারাজ! আপনারা অতি পণ্ডিত, যেহেতু আপনারা অবর্তমান অনাগত বুভূক্ষার নিবৃত্তির জন্য পূর্ব হইতেই প্রযত্ন করেন।"
"ভন্তে! নাগসেন!  আপনি দক্ষ!!!!!

Thursday, December 22, 2016

বুদ্ধের মহাপুরুষ লক্ষণ প্রশ্ন

বুদ্ধের মহাপুরুষ লক্ষণ
রাজা বলিলেন- " ভন্তে নাগসেন! বুদ্ধ প্রকৃতপক্ষে বত্রিশ মহাপুরুষ লক্ষণযুক্ত, অশীতি অনুব্যঞ্জন শোভিত, সুবর্ণ বর্ণের দেহধারী, কাঞ্চন সদৃশ চর্মবিশিষ্ট ছিলেন, এবং তাঁহার শরীর হইতে এক ব্যাম পরিমাণ চতুর্দিকে জ্যোতি বিচ্চুরিত হত কি?"
হাঁ মহারাজ! প্রকৃতপক্ষে তিনি ঐরূপ ছিলেন।
"ভন্তে! তাঁহার মাতা-পিতাও কী তদ্রুপ ছিলেন? "
"না, মহারাজ! তাঁহারা সেইরূপ ছিলেন না।" 
"ভন্তে! তাহা হইলে বুদ্ধও সেইরূপ হইতে পারেন না, কেননা পুত্র স্বীয় মাতা কিংবা মাতৃপক্ষের সদৃশ হয়।"
স্থবির বলিলেন! "মহারাজ! কোন শতপদ্ম আছে কি?"
হাঁ ভন্তে! আছে!"
" উহা কোথায় উৎপন্ন হয়?"
"কর্দমে জন্মে এবং জলে বর্ধিত হয়।"
"মহারাজ! বর্ণ, গন্ধ কিংবা রসে পদ্ম কর্দম সদৃশ হয় কী?"
"
"না ভন্তে!"
"বর্ণ, গন্ধ, কিংবা রসে জলের সদৃশ হয় কি?"
"না, ভন্তে!
মহারাজ! এই প্রকারে যদিও ভগবান এইরূপ ছিলেন, কিন্তু তাঁহার মাতা- পিতা সেইরূপ ছিলেন না।"
"ভন্তে নাগসেন! আপনি দক্ষ।"

Wednesday, December 21, 2016

রূপাবচর চিত্তের পরিক্রমা

 রূপাবচর চিত্ত ধ্যান- চিত্ত। শুধুমাত্র ধ্যানকামীগণ এই চিত্তকে অনুশীলন করেন। কামাবচর কুশল চিত্তকে কীরূপে রূপাবচর ধ্যান-চিত্ত উন্নীত করা যায় তাহাই অতি সংক্ষেপে আলোচনা করা যাক। শুধু বিশুদ্ধ জলই যেমন মেঘে পরিণত হইতে ও উন্মুক্ত বাতাসে বিচরণ করতে পারে, তেমনি শীল বিশুদ্ধ চিত্তই ধ্যান-চিত্তে উন্নমিত হতে ও শান্তিতে বিচরণ করিতে সক্ষম হয়। যেহেতু শীল সম্পন্ন জনই সব সময় মনের দিক দিয়ে পরিস্কার থাকেন। সেজন্য এই ধ্যানচিত্ত তাঁহাদের সহজে লাভ করা যায়। যিনি রূপ-চিত্ত বা ধ্যান চিত্ত উৎপন্ন ও গঠন করিতে সঙ্কল্প করেন, তাঁহাকে অতি সাবধানে ন্যূনকল্পে পঞ্চশীল পালন করতে হয়; এবং তাঁহার নির্জ্জন বিহারী হওয়া, অন্ততঃ সাময়িক নির্জ্জনতা, আবশ্যক। বাস-গৃহ,জনিত, জ্ঞাতি-পরিজন- জনিত, সাংসারিক লাভ-ক্ষতি, জনতা, কার্য্যভার,দদেশ ভ্রমণ, শারীরিক ব্যাধি ও গ্রন্থাদি জনিত বাধা, উৎকণ্ঠা পরিত্যাগ আবশ্যকতা খুবি আছে।তৎপর তিনি উপযুক্ত  গুরুর পরামর্শানুযায়ী তদভাবে স্বীয় চরিতানুযায়ী কর্ম্মস্থান=নির্ব্বাচন করিবেন। কর্ম্মস্থান=ভাবনা কর্ম্মের আলম্বন বা বিষয়।
                নির্বাচিত কৃৎস্নে বা আলম্বনে স্থিরদৃষ্টি আবদ্ধ করে একাগ্রতার সহিত উহা চিত্তে মুদ্রিত করিতে পুনঃপুনঃ চেষ্টা করতে হয়; তৎপর সময়ে এমন এক অবস্থা উৎপন্ন হয়, যখন ঐ আলম্বন উন্মীলিত নেত্রে বা নিমীলিত নেত্রে সমপরিমাণে সুস্পষ্ট হয়। ঐ চর্ম্ম চক্ষু দৃষ্ট আলম্বনের নাম  "পরিকর্ম্ম "নিমিত্ত ; এবং এই মনচক্ষু দৃষ্ট আলম্বনের নাম "উৎগ্রহ নিমিত্ত" উৎগ্রহ অর্থ মনোগ্রহীত। মনের বিশেষ পদ্ধতিতে দর্শন কার্য্য। এই উৎগ্রহ নিমিত্তে চিত্তকে একাগ্রতা করিতে করিতে সময়ে এমন এক অবস্থা উৎপন্ন হয় যেন, ঐ নিমিত্তের অভ্যন্তর হইতে এক নির্ম্মল, উজ্জল  আকার বহির্গত হহচ্ছে বলিয়া ধারণা হয়। এই অবস্থাপন্ন নিমিত্ত "প্রতিভাগ নিমিত্ত"।  পরিকর্ম্ম ও উৎগ্রহ নিমিত্ত লইয়া যে ধ্যান তাহা "পরিকর্ম্ম ধ্যান"।  অকম্পিত "প্রতিভাগ নিমিত্ত" লইয়া যে ধ্যান তাহা "উপাচার -ধ্যান"।
     প্রতিভাগ নিমিত্তের উৎপত্তির সঙ্গে সঙ্গে চিত্তের পঞ্চ নীবরণ স্তম্ভহীন গৃহের দশাপ্রাপ্ত হয়। এখানেই উপচার বা কাম-লোকের ধ্যান-চিত্তের আরম্ভ হয়। এই উপচার ধ্যানের চিত্ত কামাবচরের " সৌমনস্য সহগত জ্ঞান সম্প্রযুক্ত কুশল চিত্ত"।  কিন্তু শুস্ক-বিদর্শক অর্হৎ হলে কামাবচরের "সৌমনস্য -সহগত-জ্ঞান সম্প্রযুক্ত-ক্রিয়া-চিত্ত।
এই উপচার ধ্যান-চিত্তের প্রথম জবনের পারিভাষিক নাম "পরিকর্ম্ম" অর্থাৎ ধ্যান-চিত্ত উৎপত্তির পূর্বাবস্থা বা প্রস্তুত হইবার চিত্ত। দ্বিতীয় জবন "উপচার" অর্থাৎ ধ্যান-চিত্তের সমীপচারী ক্ষণ বুঝায়। এই উপচারের পরবর্তী জবন "অনুলোম"। অনুলোম -চিত্ত-ক্ষণে চিত্ত সম্পূর্ণ নির্ম্মল হয়ে ধ্যান চিত্তে পরিস্ফুট হবার উপযুক্ত হয়। অনুলোমের পরবর্তী জবন "গোত্রভূ"।  এই গোত্রভূ জবন পর্য্যন্ত কামাবচরের "উপচার"ধ্যান।  এই গোত্রভূ জবনের পরবর্তী জবনই "অর্পণা জবন"।  এই অর্পণা জবনই রূপাবচরের ধ্যান-চিত্ত।  প্রতিভাগ নিমিত্তের উৎপত্তিতে কামচ্ছন্দ, ব্যাপাদ, স্ত্যানমিদ্ধ, ঔদ্ধত্য-কৌকৃত্য, বিচিকিৎসা,এই পঞ্চনীবরণ উত্থানশক্তি হীন হয় বলিয়া চিত্ত উপাচার -সমাধি প্রাপ্তত হয়। ধ্যানাঙ্গের উৎপত্তিতে অর্পণার উৎপত্তি হয়। বিতর্ক -বিচার-প্রীতি-সুখ-একাগ্রতা-ই ধ্যান চিত্তের মূখ্য অঙ্গ বা উপকরণ।
অর্পণা চিত্তের পূর্ণ একাগ্রতা ;ইহাই পূর্ণ ধ্যানের অবস্থা। রূপাবচর কুশল চিত্ত, এই প্রকারে সম্যক সমাধি দ্ধারা, শীলকে ভিত্তি করে সম্যক স্মৃতি, ও সম্যক ব্যায়ামের সাহায্যে উৎপন্ন করা যায়। এই রূপ চিত্তই কুশল গুর কর্ম্ম সম্পাদন করে। ইহাই রূপাবচর চিত্তের পরিক্রমা অনুসারে সংক্ষেপ বিবরণ করা হল।

Tuesday, December 20, 2016

বেদনা সমুুদয় জ্ঞান



  বেদনা কি সত্য? দুঃখ সত্য। এই সত্য হচ্ছে বিদর্শনের মূল বিষয়। দুঃখকে দুঃখরূপে জানতে না পারলে সমুদয় সত্য অবিদ্যা ও তৃষ্ণা উৎপন্ন হয়। আর এই সমুদয় সত্যই পুনঃপুনঃ দুঃখ সত্যকে উতপন্ন করে। সে জন্য বিদর্শন ভাবনা বা চিত্তের একাগ্রতা অনুশীলন করার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে দুঃখ সত্যকে যথাভূতভাবে জেনে নেওয়া। সমুদয় সত্য বিদর্শন ভাবনা অনুশীলনের বিষয় নয়।কারণ সমুদয় সত্য প্রহাণতব্য বিষয় বা ধর্ম। কিন্তু বেদনা যে দুঃখ সত্য তা সাধকগণ কিভাবে জানেন, সাধক যখন সম্যক স্মৃতি অনুশীলনে রত থাকেন, তখন তিনি জানেন যে, ছয়টি স্থানের মধ্যে যে কোন একটি স্থানে স্পর্শের কারণে বেদনা একমূহুর্তও স্থিতি থাকেনা- উৎপন্ন হওয়ার সাথে সাথে বিলয় প্রাপ্ত হচ্ছে। সে জন্য বলা হয়েছে "উপ্পাদ বয় পটিপীলিনাত্থায় " অর্থাৎ এই উদয় -বিলয় ধর্মই সত্ব জীবগণকে প্রতিনিয়ত প্রপীড়ন বা দুঃখ প্রদান করে। এ কারণে উদয় বিলয় ধর্মকেই "দুঃখ" বলা হয়।
           কিন্তু দেখা যায়, অনেক সাধকই আছেন যারা স্মৃতি অনুশীলনকালীন সময়ে পায়ে ব্যথা কোমরে ব্যথা, মাথা ব্যথা ও ঝিনঝিন করে এবং সর্বাঙ্গে উৎপন্ন ব্যথাকেই দুঃখ সত্যরূপে জানেন। তারা এই ব্যথাকে অনেক ধৈর্য্য -সহ্য করে ঘণ্টা দু'য়েক বসে থাকার পর পরবর্তীতে দেখা গেল কোন ব্যথা বেদনা আর নেই।
দেহটা একেবারেই হালকা পাতলা হয়ে গেল- যেমনটি শূণ্যমার্গে ভাসমান তুলার ন্যায় অনুভব হচ্ছে। এই অবস্থা সাধকের অত্যন্ত স্বস্তিকর ও আরাম দায়ক- যা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভাবনার আসনে বসে থাকলেও কোন অস্বস্তিকর বোধ হয় না। সাধক তখন মনে করেন যে, ব্যথাকে আমি জয় করেছি, ব্যথা  আমার হাতে পরাস্থ। এই ভেবে তিনি অনেক আনন্দিত ও উৎফুল্ল হন। কিন্তু দেখা যায়, পরবর্তীতে ধ্যানে বসলে একই অবস্থা। অর্থাৎ ব্যথা আবার নতুনভাবে শুরু। এভাবে তিনি অনেক সময় ব্যথার প্রতি বিরক্ত হয়ে ধ্যান আসন হতে উঠে পড়েন এবং ভাবনার প্রতি অবশেষে অনিহার সৃষ্টি হয়।
    সে জন্য সাধকগণ জেনে রাখা ভাল যে, তিনি কোন দুঃখ নিয়ে বিদর্শন ভাবনা অনুশীলন করবেন। দুঃখ তিন প্রকার। যথা-দুক্খ দুক্খং, সঙ্খরা দুক্খং,  এবং বিপরিণাম দুক্খং।
১. দুক্খ দুক্খং:- নাম-রূপ দুঃখ সত্য হওয়া সত্তেও ক্ষুধার কারণে, পিপাসার কারণ, শীত-উষ্ণতার কারণে অথবা একই স্থানে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে দাঁড়িয়ে থাকলে, বা শুয়ে থাকলে দেখা যাবে কোমরে ব্যথা, মাথায় ঝিনঝিন করা ও সর্বাঙ্গে বেদনা উৎপন্ন হওয়াকেই দুক্খ দুক্খং বা দুঃখ দুঃখতা বলে।
২.সঙ্খরা দুক্খং:- নাম-রূপ পঞ্চস্কন্ধ সর্বদা উদয় বিলয়ধর্মী। আর এই উদয় বিলয় জনিত যে প্রপীড়ন বা দুঃখ তাকেই সঙ্খরা দুঃখতা বলে।

৩. বিপরিণাম দুকখং:- বৃদ্ধ, রোগগ্রস্থ, দৈহিক অক্ষম হওয়া, চুল পাকা, দৃষ্টিশক্তি লোপ পাওয়া, লোলচর্মা হওয়া  দন্তপতন ইত্যাদি ইত্যাদি বিপরীত হওয়ার দরুণ যে দুঃখ তাকেই বিপরিণাম দুঃখতা বলে।
 দুখ মুক্তিকামী সাধকগণ  যদি উপরোক্ত তিন প্রকার দুঃখের মধ্যে থেকে দুঃখ দুঃখতা ও বিপরিণাম দুঃখতা, দিয়ে বিদর্শন ভাবনা অনুশীলন করেন, তাহলে বিদর্শন মার্গ জ্ঞান উৎপন্ন হবে না। এবং শ্বাশত দৃষ্টি, উচ্ছেদ দৃষ্টি ও সৎকায় দৃষ্টিকেও প্রহান করতে পারবেনা। কেবলমাত্র "সংবেগময় জ্ঞান" লাভী হবেন। তাই বিদর্শন ভাবনাকে দুঃখময় ভাবে উপলব্ধি করার প্রয়াস থাকতে হবে।